Naar e Ishq part 40
তুরঙ্গনা
বিশাল বড় রান্নাঘরটায় একটা থমথমে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। কাউন্টার টপের ওপর গুটিসুটি মেরে, ভীষণ কাচুমাচু হয়ে বসে আছে সুহিন। মাঝরাতের এই শেষভাগে এসে পুরো বাড়ির গম্ভীর পরিবেশের সাথে নিজের এই অদ্ভুত অবস্থানটা তাকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। তার পরনে কেবল একটা সাদা রঙের শার্ট—যেটা মূলত কেকের।
মাঝরাতে গোসল সারার পর এখানে পরার মতো উপযোগী কোনো জামাকাপড় হাতের কাছে না থাকায়, শেষমেশ কেকের এই শার্টটাই গলিয়ে নিতে হয়েছে তাকে। সুহিনের পিঠ বেয়ে নেমে যাওয়া দীর্ঘ বাদামী চুলগুলো এখনো সম্পূর্ণ ভেজা; সেখান থেকে অনবরত টপটপ করে পানি ঝরছে। পানির ফোঁটাগুলো শার্টের কাঁধ আর বুকের অবাধ্য অংশগুলোকে ভিজিয়ে লেপ্টে দিচ্ছে গায়ের সাথে। সুহিন চরম বিব্রত বোধ করে দুই হাঁটুর ওপর আঁটসাঁট হয়ে থাকা শার্টের প্রান্তটা দুহাতে টেনেটুনে কোনোমতে আরেকটু নিচে নামানোর বৃথা চেষ্টা করছে। লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় তার নিজেরই নিজের দিকে তাকাতে ইচ্ছে করছে না।
কাউন্টার টপের ওপর বসা সুহিনের এই ছটফটানি আর তীব্র অস্বস্তিটুকু সরাসরি না তাকিয়েও, আড়চোখে খুব ভালো করেই পরখ করে নিচ্ছে কেকে। সে নিজেও সুহিনের থেকে একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে। কেকে-র পরনে অত্যন্ত সাধারণ একটা কালো রঙের ট্রাউজার আর টিশার্ট, সে-ও খানিক আগে গোসল সেরে নিয়েছে। মাঝরাতের এই শেষ প্রহরে কিছুটা বিরক্তি আর ক্লান্তি নিয়ে সে এখন ব্যস্ত তার বউটার জন্য কিছু একটা তৈরিতে। মিক্সার গ্রাইন্ডারের জারটায় কিছু তাজা ফলমূল আর ফ্রেশ ক্রিম ঢেলে সে একটা স্মুদি বানাতে বানাতে গভীর ভাবনায় মগ্ন হলো।
গত দু-তিন ঘণ্টার পুরো ঘটনাটা কেকে-র মাথার ভেতর একনাগাড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই সামান্য সময়ে তার প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি কিছু ঘটে গেছে। দীর্ঘদিনের সমস্ত ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটার পর, তার ভেতরের জমে থাকা উন্মাদনার স্থায়িত্ব ছিল বড়জোর মাত্র সাতটা মিনিট! আর ঠিক তার পরপরই সুহিন সোজা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কিভাবে কী থেকে কী হয়ে গেল, কেকে-র বোধগম্য নয়।তার চটপটে মাথাটা তখন পুরোপুরি শূন্য হয়ে গিয়েছিল। এত রাতে মেয়েকে নিয়ে কী করবে, তা-ও যেন মাথায় খেলছিল না। অস্থির চিত্তে বারবার সুহিনের জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ হচ্ছিল। অবশ মস্তিষ্কে কেবল একটা ভাবনা—‘সাত মিনিট? মাত্র সাত মিনিটেই সব শেষ? এই মেয়েকে নিয়ে আমি সারাটাজীবন কিভাবে পার করব?’
তখন হাজারো চেষ্টা করেও সুহিনের জ্ঞান ফেরানো যায়নি। কোনো উপায় না দেখে নিরূপায় হয়ে কেকে তাকে নিয়ে সোজা হসপিটালের উদ্দেশ্যে ছুটেছিল। হসপিটালে পৌঁছানোর পর সেখানে আরেক দফা যাযাবর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে, অবশেষে ডাক্তারদের শুশ্রূষায় সুহিনের জ্ঞান ফেরে। কেকেও আর এক মুহূর্তও দেরি না করে তাকে নিয়ে বাড়ি চলে আসে।
বাড়িতে ফেরার পর নতুন কোনো কথার অবকাশ রাখেনি সে। সুহিন তখনও কী থেকে কী হয়ে গেল তা বুঝতে না পেরে অবোধের মতো চেয়ে ছিল। কেকে তাকে ফ্রেশ হতে বলে নিজেও ফ্রেশ হয়ে, সোজা চলে আসে কিচেনে—তার খাওয়া-দাওয়ার তোড়জোড় করতে।
সবকিছু মনে করে কেকে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করল। ততক্ষণে মিক্সারের ভেতরের স্মুদিটা তৈরি হয়ে গেছে। একটা কাঁচের গ্লাসে স্মুদিটা ঢেলে, তাতে একটা স্ট্র গুঁজে সে সুহিনের দিকে এগিয়ে দিল। সুহিন আর নতুন করে কোনো কথা বাড়াল না; অপরাধীর মতো মুখ করে চুপচাপ দুহাতের মুঠোয় গ্লাসটা আগলে ধরল।
এত বড় এক গ্লাস স্মুদি একা শেষ করা এই মুহূর্তে তার পক্ষে অসম্ভব, কিন্তু কেকে-র সামনে কোনো কিছু বলার মতো সাহস বা মানসিক জোর—কোনোটাই এখন তার নেই।
সামান্য একটু চুমুক দিয়ে সুহিন চোরের মতো কেকের দিকে মুখ ফেরাল। কেকে কথা না বলে কেবল চোখের ইশারায় জানতে চাইল, সব ঠিক আছে কিনা। তার চোখের ভাষা বুঝতে পেরে সুহিন জোর করে একটু হেসে মৃদু স্বরে বলল,
”মজা হয়েছে!”
কেকে গম্ভীর মুখে একটা ভারী শ্বাস ফেলে হুকুমের সুরে বলল,
“পুরোটা শেষ কর।”
বলেই সে সুহিনের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নতুন কিছু রান্নার প্রস্তুতিতে হাত দিল। কাউন্টার টপের ওপর চপিং বোর্ডটা টেনে নিয়ে অনবরত ঠকঠক শব্দে বেশ কিছু সবজি কাটতে শুরু করল। কাটাকাটির গতি আর চেহারার গম্ভীর ভাবমূর্তি পাশ থেকে আড়ষ্ট হয়ে বসে বসে দেখছিল সুহিন। রান্নাঘরের এই ভারী নীরবতা আর কেকের নিস্পৃহতা সহ্য করতে না পেরে সে আচমকা আমতা আমতা করে প্রশ্ন করে বসল,
”আপনি কি আমার উপর রেগে আছেন?”
—“উঁহু…!”
কেকে তার দিকে একবারের জন্যও না তাকিয়ে, সবজি কাটার মাঝেই গম্ভীর মুখে অত্যন্ত সংক্ষেপে উত্তর দিল। সুহিন নিজের অস্বস্তি ঢাকতে জোর করেই স্ট্র দিয়ে আরেকটু স্মুদি গিলে নিল। তারপর সিক্ত গায়ে কাচুমাচু মুখ করে বলল,
”এসবের জন্য হসপিটালে যাবার কোনো প্রয়োজন ছিল না। লোকে কি বলবে?”
সুহিনের মনে মনে লজ্জায় তখন মাথা কেটে যাওয়ার উপক্রম। হসপিটালের ডাক্তার আর নার্সদের জিজ্ঞাসু চাউনি মনে পড়তেই সে আর স্থির থাকতে পারল না। তীব্র লজ্জায় নিজের দৃষ্টি একেবারে মেঝের দিকে নামিয়ে নিল সে।
অথচ কেকে সবজি কাটতে কাটতেই অত্যন্ত স্বাভাবিক ঢঙে নির্লিপ্ত ও কিছুটা খোঁচা মারা স্বরে প্রত্যুত্তর করল,
”হসপিটালে এসবের ট্রিটমেন্ট আছে বলেই নিয়ে গিয়েছিলাম—হাওয়া খাওয়াতে নিয়ে যাইনি আমি।”
কেকের ত্যাছড়া অভিব্যক্তির উদ্দেশ্য সুহিন খুব ভালোমতোই বুঝতে পারল। কিন্তু এইমূহূর্তে যথাযথ প্রত্যুত্তর দেবার মতোও সুযোগ নেই তার। ফলাফল সরূপ সে মাথাটা নুইয়ে মিনমিন করে আওড়াল,
—“সরি!”
কেকে নিজের হাতজোড়া চপিং বোর্ডের ওপর থামিয়ে, ভ্রুযুগল কুঁচকে সুহিনের দিকে মুখ ফেরাল। তির্যক সুরে বলল,
—“কিসের জন্য?”
—“আমার জন্য আপনাকে…শুধু শুধু বিব্রতকর পরিস্থিতিতে….”
সুহিনের কথা শেষ হতে না দিয়েই, কেকে প্রশ্ন ছুড়ল,
—‘আমি কি তোকে কিছু বলেছি?”
সুহিন তার ভাবগতিক দেখে কিঞ্চিৎ ভড়কে গেল। লোকটা হুটহাট এমন ক্ষেপে যায় কেন৷ আবার ক্ষেপেছে কিনা সেটাও তো বোঝা যায় না। সে মিনমিন করে বলতে চাইল,
—“না মানে…”
এবারও রমণী তার কথা শেষ করার সুযোগ পেল না। কেকে অভিযোগ তুলে প্রশ্ন ছুড়ল,
—“ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করিস না?…এইজন্যই তো আজ এই অবস্থা!”
সুহিন ঠোঁট চেপে কিছুটা অসহায়ত্বের সাথে বলল,
—“আমার কি দোষ? আমি নিষেধ করেছিলাম তো আপনাকে!”
—“ওহ হ্যাঁ,তাই তো! সব দোষ তো আমারই। ডোন্ট ওয়ারি, আজকের পর আমি আমার বউকে ছুঁয়েও দেখব না।”
অনেকটা ব্যঙ্গ করেই কেকে তার ত্যক্ত বাণী ঝাড়ল। সুহিনের থেকে নজর সরিয়ে আবারও নিজের কাজে ব্যস্ত হলো। এবার যেন ছুরি আর সবজিগুলোর সাথে তার রাগগুলো নিঃস্তব্ধে প্রকাশিত হচ্ছে। সুহিন আর প্রত্যুত্তর করার মতো কিছু খুঁজে পাচ্ছে না। অবশ্য বলবেই বা কি, ইদানীং সবকিছুই কিভাবে যেন ভেস্তে যাচ্ছে। আর দোষটা ঘুরেফিরে তার ঘাড়েই পড়ছে।
এভাবে প্রায় বেশ কিছুক্ষণ সময় কেটে গেল। কিন্তু দুজনের মাঝে আর কোনো কথাবার্তা হলো না। গুটিয়ে বসে থাকা সুহিন আঁড়চোখে গম্ভীর কেকে’র আপাদমস্তক পরখ করতে করতেই, স্মুদির অর্ধেকের চেয়ে বেশি শেষ করে ফেলেছে। কিন্তু বাকিটা আর গেলা সম্ভব হলো না।
সে আমতাআমতা করে, কেকের উদ্দেশ্যে ডাকল,
“শুনুন, আমি আর খেতে পারব না…”
মূহুর্তেই কেকে তার হাতদুটো থামিয়ে সুহিনের দিকে ফিরল। সুহিন তার চাহুনিতে শুষ্ক ঢোক গিলল। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের প্রয়াসে বলল,
“সত্যিই আর খেতে পারব না। একটা মানুষ আর কত খায় বলুন, প্লিজ বকবেন না।”
কেকে আর কোনো কথাই বলল না। সে হঠাৎ নিজের কাজকর্ম ভুলে অদ্ভুত ভাবে, গম্ভীর-তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সুহিনকে আপাদমস্তক পরখ করতে লাগল। হঠাৎ তার আচরণে এমন ভিন্নতা দেখে, সুহিন খানিকটা অপ্রস্তুত হলো। লোকটার হাবভাব কেমন যেন ঠিক মনে হচ্ছে না। যদিও তার দৃঢ় রহস্যজনক অবয়বে কোনোকিছুই স্পষ্ট নয়। তবুও সুহিন কোনো এক বিশেষ কিছুর আশংকা করে মুখ ফস্কে বলেই ফেলল,
—“প্লিজ,এভাবে তাকাবেন না!”
কেকে নিজের ধ্যান থেকে বেরিয়ে এলো। খেয়াল করে দেখল, হঠাৎ তার অবোধ রমণী অদ্ভুতপূর্বক ভাবে তীব্র আড়ষ্টতা নিয়ে, গায়ের টিশার্টের কোনাকুনি টেনে পা ঢাকতে ব্যস্ত হয়েছে। কিন্তু কেনো? সে তার দিকে তাকিয়ে ছিল এইজন্য?
কেকে তার সমগ্র অস্তিত্বটাকে আবারও ভ্রু উঁচিয়ে একঝলক দেখল। ভ্রুকুটি করে শান্তু সুরে প্রশ্ন ছুড়ল,
—“এভাবে তাকাব না মানে? হোয়াট ডু ইউ মিন?’
সুহিন এবারও মুখের লাগাম টানতে ভুলে গেল। মিনমিন করলেও, গলাার স্বর জোড়ালো ও স্পষ্টত রেখেই বলল,
“নজর সরান। আপনার নজর ভালো না।”
মূহুর্তেই কেকের তীক্ষ্ণ চোয়াল আরো দৃঢ় হলো। দাঁতে দাঁত পিষে দুপা এগিয়ে একপ্রকার তেড়ে এলো সে,
—“ওয়াইফিইইই…”
মূহুর্তেই সুহিন ভড়কে গেল। চোখ-মুখ খিঁচে কাউন্টার টপের উপরই হাত-পা গুটিয়ে পেছানোর পায়তারা করল,
—“দেখুন রাগ করবেন না আমি শুধু সত্যিটা…”
কিন্তু কেকে তা বাস্তবিক অর্থে হতে দিল। হুট করে রমণীর একটা হাতের উপরই নিজের হাত চেপে ধরল। অন্যহাত চলে গেল রমণীর উন্মুক্ত উরুতে। সুহিন কিছু বুঝে ওঠার আগেই,কেকে তার ফর্সা উরুটাও শক্ত হাতে চেপে ধরল।
নিমিষেই নিজের পুরো ক্ষিপ্ততা নিয়ে ঝুঁকে পড়ল সুহিনের দিকে,
“এখন বল কি বলছিলি? আমাকে তোর রাস্তার বখাটে মনে হয়? বউয়ের দিকে তাকাতেও আমার নজর ঠিক করতে হবে? বল আর কি কি করতে হবে। একদিনেই তুই আমার মেজাজের তেরোটা বাজিয়ে দিয়েছিস। এইজন্য তোকে আমার সহ্য হয়না। ইচ্ছে করে একবারেই চিবিয়ে খেয়ে ফেলি।”
অকস্মাৎ এমন হুমকিধামকি দেখে সুহিন পুরোপুরি স্তব্ধ হলো। অসহায় হরিণছানার মতো ছটফট করে উঠল কেকের বাহুবন্ধনে। কন্ঠস্বর ভিজে উঠল এক নিমিষেই,
“ধমকাচ্ছেন কেনো? আমি তো শুধু…”
—“হু, বল কি?”
সুহিন মুখ ফস্কে দুচারটে কথা হয়তো বলেই দিতো। কিন্তু তার আগেই আবারও তার পুরো জগৎ চক্কর দেওয়ার উপক্রম হলো। চোখের সামনে কেকের ক্ষিপ্ত অবয়বটা দৃশ্যমান হলেও,তার আত্না শুকিয়ে যাচ্ছে কেকে’র অযাচিত স্পর্শের গভীরতায়। কেকে চোখে-মুখে রাগ দেখানোর ভঙ্গি করলেও, তার হাত ঠিকই রমণীর উরু বেয়ে ক্রমশই উপরে উঠে যাচ্ছে। সুহিন উন্মুক্ত সেই একহাতে স্মুদির গ্লাসটা চেপে ধরল। স্পর্শের গভীরতা বাড়তেই, সুহিন চোখ-মুখ খিঁচিয়ে বলে উঠল,
“আ…আপনি আসলেই একটা বদমাশ!”
মূহুর্তেই কেকের হাতখানা থেমে গেল। হাতটা নামিয়ে উরুর ওপর আলতোহাতে আঙুলের রুক্ষ স্পর্শ দিতে লাগল। অথচ দৃষ্টি একটিবারের জন্যও সুহিনের থেকে সরেনি। সে গম্ভীর মুখাবয়বে আচমকা তির্যক হাসি ফুটিয়ে তুলে সুহিনকে একপ্রকার ভড়কে দিল। রমণীর মুখের উপর আরেকটুখানি ঝুঁকে পড়ে ফিসফিস করে বলল,
“এতোদিনে চিনেছিস আমায়?”
তার অভিব্যক্তিতে সুহিন থতমত খেয়ে গেল। বেটা আসলেই একটা শয়তান! সে ভেতরে ভেতরে আতঙ্কিত রইলেও, মুখে রুক্ষ স্বরে বলল,
“সময় থাকতে ভালো যান, নাহলে…’
কেকে তার কথা কেঁড়ে নিয়ে প্রশ্ন করল,
—” নাহলে কি?”
সুহিন উত্তর দেবার সুযোগ পেল না। তার আগেই কেকে বলল,
“সময় ফুরিয়ে গেলে, একদিন আমিও হারিয়ে যাব, তাই না ওয়াইফি?”
এমন একটা মূহুর্তে, কেকের এই গম্ভীর থমথমে কথার অর্থ সুহিনের বোধগম্য নয়। সে চোখে-মুখে সন্দেহের ভাজ ফুটিয়ে তোলার আগেই, কেকে আবারও রহস্যজনক ভাবে ক্ষীণ হেসে বলল,
“সময় থাকতে আমার কদর কর! পরে কিন্তু পাবি না আমায়।”
বলতে না বলতেই আচমকা কেকে তার গলার ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে দিল। সুহিন গুরুতর ভাবনা হতে ছিটকে বেরিয়ে, চমকে উঠল। সর্তক করার প্রয়াসে শুরুতেই বলল,
“কামড়-টামড় দেবেন না, ব্যাথা লাগে!”
কেকে তার কথা শুনল কি শুনল না তা অনিশ্চিত। সে হুট করেই চুমু খাওয়ার ভাবনায় বরাবরের মতোই রমণীর কলারবনে কামড় বসাল। যদিও সেটা খুব তীব্র ভাবে নয়৷ কিন্তু এতে করে সুহিন তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। দুহাত বন্ধ থাকায় কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে, হাত ফস্কে গ্লাসটা খানিকটা নড়তে-চড়তেই সামান্য খানিকটা স্মুদি তার উন্মুক্ত উরুর উপর এসে পড়ল। একইস্থানে কেকের হাত থাকায়, সে কর্মভ্রষ্ট হয়ে সুহিনকে ছেড়ে দিয়ে মুখ তুলল।
সুহিন কাচুমাচু হয়ে বসে কেকের দিকে খানিকটা চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে আছে। কেকে সেদিকে পাত্তা না দিয়ে, নজরটা নিচের দিকে নামাল। রমণীর শ্বেতশুভ্র উরুর ত্বকের উপর পড়া সামান্য স্মুদির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, একটা সময় এই জিনিসটাও তারকাছে লোভনীয় হয়ে উঠল। অবোধ রমণীর পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না যে, কেকে এই মূহুর্তে কি করতে চলেছে৷ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার সন্দিহান দৃষ্টির সামনে কেকে হুট করে তার উরুর একটা পাশ চেপে ধরে, খানিকটা উঁচিয়ে তুলল। সুহিন গ্লাসটা তড়িঘড়ি করে কাউন্টারের টপের উপর রেখে, নিজেকে উল্টে পড়ে যাওয়া হতে সামলে নিল।
ততক্ষণে কেকে নিচের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। সুহিন বিস্ময়ে তার কাঁধ চেপে ধরল। চোখছানাবড়া করে কেকে’র কর্মকান্ড দেখতে রইল তাজ্জব বনে। ততক্ষণে কেকে নিজের ওষ্ঠদ্বয় ও জিভের স্পর্শে স্মুদিটুকু চেটেপুটে খেয়ে নিয়েছে। মূহুর্তেই যেন সুহিনের সর্বাঙ্গ শিউরে উঠল।
কেকে মুখটা তুলতেই সুহিন বিস্ময় ও স্তব্ধতা নিয়ে কেকের তির্যক হাসি ফুটিয়ে তোলা মুখাবয়বের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। অত্যাধিক বিলম্ব না করে তৎক্ষনাৎ সে এক অদ্ভুত ঘৃণ্যতায় বলে উঠল,
—“ইয়াক, ছিহ্ এটা কি করলেন? ওয়াক্…!”
মুহূর্তেই কেকে শয়তানিমূলক তির্যক হাসিটাও মিলিয়ে গিয়ে সেথায় অদ্ভুত বিরক্তিমাখা গম্ভীরতা বিরাজ করল। থমথমে নিরেট স্বরে সে বলল,
—“তোকে দিয়ে কি আদৌও কখনো কিছু হবে?”
সুহিন তটস্থ হতেই সে হতভম্ব হলো। কেকে একরাশ বিরক্তি নিয়ে ত্যক্ত শ্বাস ফেলে তাকে ছেড়ে দিল। পুনরায় কাজের দিকে ফিরে যেতে যেতে বিরবির করে আওড়াল,
“গাধাহ্!”
সুহিন হয়তো তার এই নীরব সম্মোধন এবারও শুনতে পেল না। কিন্তু নিজের খামখেয়ালিতে হঠাৎ নিজেরই আফসোস হতে লাগল। কোথাও না কোথাও গিয়ে মনে হচ্ছে, এগুলো ঠিক হচ্ছে না। এই সম্পর্কটা নিয়ে তার আরেকটু সিরিয়াস হওয়ার প্রয়োজন—যখন কেকে নিজে বারবার এমনটাই চাইছে। কিন্তু এরপরও সুহিন মনে মনে ভাবতে লাগল,
“কিন্তু আমিই বা করব কি? সহজে দুটো কথা বলতে নিলেও ক্ষেপে যায়। গাধা-গাধা করে বাড়ি মাথায় তুলে ফেলে। সবসময় এমনই চলতে থাকলে এই সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে-টা কিভাবে? আবার উনি যে-সব কাজকর্ম করতে পছন্দ করে, সেসবে তো আমি অভস্ত্য নই। ধূর, কোন পাপ করে এখানে এসেছিলাম। তারচেয়ে সারাজীবন একাই থাকতাম, ওটাই ভালো ছিল।”
মনে মনে এসকল ভাবনা ভাবলেও, সুহিনের দৃষ্টি একনাগাড়ে কেকের দিকেই পড়ে আছে। কেকে নিজের মতো ফ্রিজ থেকে এটা-ওটা বের করছে আর মাঝরাতে কিসব রেঁধে চলেছে।—”এখন এসব করার মানে কি? আমি তো এগুলো খাবই না। শুধু শুধু আমায় এখানে বসিয়ে রেখেছে আর নিজেও খেটে মরছে। কিছু বললেই তো আবার ছ্যাত করে উঠবে, শয়তান একটা!”
এরিমধ্যে কেকে নিজ একাগ্রতায় ফ্রিজ থেকে প্লেইন ইয়োগার্ট এর একটা মাঝারি আকৃতির বক্স বের করল। কেকে যেহেতু তার দিকে আর পাত্তা দিচ্ছে না তাই, সুহিন নিজেও বসে বসে তার রান্নাবান্নার রঙঢঙ দেখতে লাগল। মনে মনে ভাবতে লাগল,
“সবকিছুই এমন ভুজুংভাজুং দিয়ে রান্না করার কি খুব প্রয়োজন? টেস্ট হয়তো খারাপ নয় কিন্তু এদেশের অদ্ভুত সব খাবার খেতে খেতে আমার মুখের স্বাদ এখন জাগতিক মোহমায়া ত্যাগ করেছে।”
একদিকে সুহিনের এসকল উল্টোপাল্টা ভাবনার শেষ হচ্ছে না, অন্যদিকে কেকে তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। কিন্তু অভ্যাসগত কারনে রান্নার পাশাপাশি চুলোর পাশে কাউন্টারের কোণায় হাত ঠেকিয়ে, টক-দই খেতে খেতে সে হুট করে নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সুহিনের দিকে নিক্ষেপ করল। এতক্ষণ পর আবারও এই চাহনিতে বিদ্ধ হয়ে সুহিন ভড়কে গেল। না জানি এই লোক এখন কি উল্টোপাল্টা বলে বসে। কিন্তু না, কেকে তার দিকে অদ্ভুত এক নির্লিপ্ততা নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর,হঠাৎ হাতের ছোট চামটা উঁচিয়ে দইয়ের বক্সটার দিকে ইশারা করে বলল,
—“ডু ইউ লাইক ইয়োগার্ট?”
আবারও যেন অপ্রত্যাশিত এক প্রশ্ন। এখানে আসলে ঘটছে-টা কি? আর তাকে এভাবে বসিয়ে রাখার মানেই টা কি? যেতে চাইলে যেতেও দিবে না, অথচ কিছুক্ষণ পরপর হুটহাট একটা অযাচিত প্রশ্ন করে বসবে।
সুহিন নিজেকে সামলে তটস্থ করে, মাথা নাড়িয়ে সহজ মনে বলে ফেলল,
—“হ্যাঁ… টকদই তো ভালোই লাগে।”
অথচ কেকের ভাবগাম্ভীর্যে মনে হচ্ছিল, তার মাথার ভাবনাগুলো সব স্বাভাবিক নেই। যা সুহিন খুব স্বল্প পরিমাণে আন্দাজ করতে পারলেও ঠিক ধরতে পারছে না। ততক্ষণে কেকে আরো একচামচ দই নির্লিপ্ততার সাথে মুখে পুরে দিয়ে, অদ্ভুত এক নির্বিকার ভঙ্গিতে অকপটে বলল,
—“If you want, I can feed you something fresher than it.”
বরাবরের মতোই সুহিন তার কথার অর্থ বুঝতে না পেরে, ভ্রু-যুগল অতিমাত্রায় কুঁচকে আওড়াল,
—“হাহ?”
কেকে তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে, এক চিলতে তাচ্ছিল্যের সহিত তির্যক হাসল। সুহিনের থেকে নজর সরিয়ে নিয়ে, রান্না শেষ করার প্রস্তুতিতে বিড়বিড়িয়ে রমণীকে খানিকটা কটাক্ষ করে বলল,
“কার সাথে কি বলছি—গাধাটা তো কিছুই বুঝবে না।”
এইবার তার কথাটা সুহিনের শুনে নিতে ভুল হলো না। আবারও তাকে গাধা-গাধা করছে। অথচ নিজে যে কিসব ভুলভাল কথা বলে, সেটা দোষের না?
সুহিন আচমকা এই ভাবনায় প্রতিবাদসরূপ রুক্ষ স্বরে বলে উঠল,
“আপনি সবসময় আমাকে গাধা বলেন কেন?”
হঠাৎ রমণীর প্রশ্ন শুনে কেকে মুখ ফেরাল। সুহিনকে ভ্রু কুঁচকে তার দিকে ত্যক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে, নূন্যতম ভণিতা না করে অকপটে বলল,
“কারণ তুই গাধার মতো দেখতে!”
মূহুর্তেই সুহিনের সকল তেজ উধাও। স্তব্ধ হয়ে সে কেকের দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে রইল। কেকে তার উদাস ভঙ্গি দেখে, আবারও খানিক বিদ্রুপের সুরে বলল,
“মন খারাপ করে লাভ নেই, এটাই সত্যি।”
লোকটার কোনো কথাই সে ঠিকঠাক বিশ্বাস করতে না পারলেও, মুখের উপর এরূপ একটা কথা শুনে সুহিন যেন সত্যিই ভেতরে ভেতরে অনেকটাই ভেঙে পড়ল। সে কথা বলার মতো কিছুই খুঁজে না পেয়ে, তৎক্ষনাৎ মুখটা ফিরিয়ে নিচে নামিয়ে নিল।
কেকে তার অবস্থা অবলোকন করে, শেষপ্রায় রান্নার চুলোটা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়ে সুহিনের দিকে এগিয়ে এলো। সুহিনের সম্মূখে কিছুটা দুরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে, প্যান্টের পকেটে দু-হাত গুঁজে ঘাঁড়টা কিঞ্চিৎ কাত করল। সুহিনের উদ্দেশ্যে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“মুখ তোল!”
সুহিন তার কথা শুনে মুখটা খানিক উঁচিয়ে তুলতেই, কেকে তার শুঁকনো মুখটার দিকে একনাগাড়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। অত্যন্ত নির্লিপ্ততা নিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে অকপটে সে বলল,
—“এই দেখ, তোর ফেসটাও গাধার মতো। ব্রেইনটাও গাধার মতো। চুলগুলো… উমমম ওটা হয়তো পার্সিয়ান ঘোড়ার লেজের মতো। ঐ বলতে গেলে তোর-ই উন্নত জাত। আর বাকি রইল তোর চোখদুটো; আমার মনে হয় খোদা তোকে বানানোর সময় একটু এক্সট্রা স্পাইসেস এড করতে চোখদুটো জাস্ট নীল রঙের বানিয়ে দিয়েছে। এছাড়া তুই-ই বল, তোর মাঝে আর কোন গুণ-টা আছে? পুরো তুই-টাকেই তো গাধার হিউমান ভার্সন মনে হয়।”
সুহিন আর দৃষ্টি সরাল না৷ অপলকভাবে কেকের দিকে তাকিয়ে রইল। একটা সময় পর তার নীলাভ চোখদুটো সামান্য ভিজে উঠল। যদিও সে কাঁদছে না। কিন্তু কখনো কেকের কথাগুলো সিরিয়াসলি নিতে না পারা সে-ও হঠাৎ অদ্ভুতভাবে তার কথাগুলো শুনে ভেতরে ভেতরে দুমড়েমুচড়ে ভেঙ্গে পড়ল। তবে তা চোখের অশ্রুজল বিসর্জন দিয়ে প্রকাশ করল না।
বরং চোখদুটো আরেকটুখানি জলে ছলছল হতেই, সে নিজের মুখটা পাশে ফিরিয়ে নিল। সবটাই সম্মূখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পরখ করছিল কেকে। হঠাৎ সুহিনের এরূপ অবস্থা দেখে তার টনক নড়ল। স্বাভাবিক ভাবেও তো একটা মেয়ে’কে এসব বলা ঠিক না। সেখানে নিজের বউকে মুখের উপর কিসব বলে দিয়েছে।
কেকে দ্রুততর অবোধ রমণীর কাছে এগিয়ে গেল। দু’হাতে তার কোমড়-পিঠ জড়িয়ে, রমণীর নুইয়ে পড়া দৃষ্টির সাথে নজর মেলানোর প্রয়াসে মাথাটা খানিক ঝুকিয়ে, তাকে কিছুটা আগলে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল,
—“মন খারাপ করেছিস? সরি! আমি মজা করছিলাম।”
সুহিন উত্তর দিল না। তার চোখ দুটো অজান্তেই জলে টলমল করে উঠল। কেকে কাছে না এলে বোধহয় এমনটাও হতো না। তার এমন করুন দশা দেখে, কেকে খানিক চিন্তায় পড়ে গেল। এই মেয়ে সহজে ন্যাকামি করে কাঁদে না ঠিকই, কিন্তু অদ্ভুত ভাবে ভেতরে ভেতরে ঠিকই কষ্ট পায়—যা সহজে প্রকাশ করতে না চাইলে তার চোখে ঠিকই ধরা পড়ে যায়। কেকে তার কন্ঠস্বর তৎক্ষনাৎ নমনীয় করে বলল,
“আই’ম রিয়েলি সো সরি,ওয়াইফি। আমি আর কখনো এমন মজা করব না।”
সুহিন তার উষ্ণতায় নিজেকে খানিক গুটিয়ে নিয়ে বলল,
—“সবসময় শুধু আমার সাথেই এমন মজা করতে ভালো লাগে,তাই না?”
কেকে অত্যন্ত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তার নাকের সাথে নাকের ডগা ঘষে, অকপটে বলল,
“লাগেই তো, খারাপ না!”
সুহিন অভিমানে আর কথা বলল না। তার অভিমান হলেও অভিযোগ করার সুযোগ নেই। সে নিজেকে আরেকটু গুটিয়ে নিতেই, আচমকা কেকে তার চোখে চোখ মিলিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,
“আমি মন থেকে চেয়েছি তোকে, সুন্দর-অসুন্দরে কি এসে যায়?”
একটু থেমে কেকে আবারও বলে,
“তোর সৌন্দর্য নিয়ে আমার মুখ ফুটে বলারও বোধহয় কিছু নেই। আমার বউয়ের সৌন্দর্য কি তা বোঝার জন্য আশেপাশের মাছিগুলোই যথেষ্ট।”
সামান্য এই অভিব্যক্তিও যেন সুহিনের কাছে জটিল মনে হলো। সে ভ্রু কুঁচকে শুধালো,
—“হা…হ? মানে?’
—“নাথিং….”
কেকে অকপটে প্রত্যুত্তর করেই আচমকা তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে চুমু খেল। কিন্তু এতেই সে থামল না। অপ্রস্তুত সুহিনের পিঠে-উরুতে হাতের অযাচিত কাতর স্পর্শে ঘনিষ্ঠ হতে চাইল। কিন্তু সুহিন তৎক্ষনাৎ তার কাঁধ চেপে তাকে থামানোর প্রচেষ্টায় বলল,
—“এটা কি করছেন? একটু আগেই তো বললেন আর আমায় ছুঁবেন না…”
—“তুই না চাইলে ছোঁবো না, কিন্তু তুই তো চাইছিস….”
—“না আমি চাইছি না….”
কেকে তার ঠোঁটে চুমু খেতে চাওয়া মাত্রই, সুহিন চোখ-মুখ খিঁচে মুখ ফস্কে বলে ফেলল। তৎক্ষনাৎ কেকেও যেন কিসব ভেবে হঠাৎ তাকে ছেড়ে দিল। সুহিন দ্রুততর নিজেকে সামলে নিয়ে, চোখদুটো মেলে প্রশ্ন করল,
—“কি হলো?”
কেকে দুহাতে নিজের কাঁধ ছোঁয়া চুলগুলো পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে, দীর্ঘ শ্বাস ত্যাগ করে অকপটে বলল,
“চাইছিস না যখন তখন আর জোর না করি….”
বলেই সে সুহিনের থেকে সরে দুপা পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু সুহিন তা হতে দিল না। আচমকা কেকের টিশার্টের বুক ও কাঁধের একাংশ দুহাতে খিঁচে তাকে নিজের দিকে টানল। কেকেও অপ্রস্তুত হয়ে তার দিকে মুখ থুবড়ে পড়ল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কেকে দেখল, সুহিন তার ছোট্ট শরীরের বুকের মাঝে, তাকে দুহাতে শক্তকরে চেপে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। কেকে কিছু বলার আগেই সুহিন ত্যক্ত কন্ঠে বলে উঠল,
—“আপনি এমন কেন, হ্যাঁ?”
সুহিনের এই সামান্য পদক্ষেপটুকুও কেকের জন্য সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। সে রমণীর বক্ষদেশ হতে মাথাটা তোলার চেষ্টা করে, থমথমে গলায় আওড়াল,
—“ওয়াইফি….!”
—“চুপ করুন!”
আচমকা ধমক দিল সুহিন। কেকে আরেকটু অপ্রস্তুত হলো। সে আর নড়াচড়ার চেষ্টা করল না। বরং কি যেন ভেবে নিয়ে বলল,
“সরি বেইবি! কিন্তু তুই ঠিক আছিস তো?”
—“চুপ থাকতে বলেছি না?”
এবারও রমণীর কন্ঠে ঝাঁঝ। কেকে তার কথামতো চুপ রইল। কিছুক্ষণ পর সুহিন অদ্ভুতপূর্বক দীর্ঘ শ্বাস ত্যাগ করে হাতের বাঁধন আগলা করল। কেকে মুখটা তুলে ছোট বাচ্চাদের মতো চোখের পলক ঝাপটে দুবার বউটাকে দেখল। সুহিন ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে ভেজা গলায় বলল,
“আমি জানি, আপনি এইসব বদমাশি ইচ্ছে করে করেন। কিন্তু আমার তো এসব সবসময় ভালো লাগে না।”
রমণীর কথায় কেকেও দুদন্ড চুপ থেকে নিজেকে পুরোপুরি আগের পর্যায়ে দৃঢ় করে, ত্যাছড়া সুরে চোখদুটো সরু করে বলল,
—“তো আর কি করতে বলিস আমায়? তোর জন্য এখন নিজেকে চেঞ্জ করব আমি?”
—“তা বলিনি, কিন্তু…”
সুহিন খানিক অপ্রস্তুত গলায় উত্তর দিতে চাইল, কিন্তু কেকে তাকে থামিয়ে দিয়ে আবারও বলল,
—“কিন্তু কি?
সুহিন নিশ্চুপ হয়ে একনাগাড়ে কেকের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন মুখে বলতে না পারা শব্দগুলো, নীলাভ চোখদুটো দিয়েই প্রকাশ করতে চাইছে। কিন্তু এতেও প্রতিবার নিজেকে ব্যর্থ ভাবছে। তবে কেকে হয়তো তার এই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ হতে দিল না। সে তার চোখের ভাষা অদ্ভুতভাবে খুব ভালোমতোই বুঝে ফেলল। এই বিষয়টা সুহিন আগেও খেয়াল করেছে। লোকটা সত্যিই অদ্ভুত।
কেকে সবটা বুঝেও ইচ্ছেকৃত ঢঙে, রুক্ষ গলায় বা’ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
—“ভালোবাসতে বলছিস? আগেই তো বলেছি, ওসব ভালো-টালো বাসি না তোকে।”
সুহিন এই পর্যায়ে ফিক করে হেসে ফেলল। তার মুচকি হাসিতে কেকে ভ্রু-যুগল অতিমাত্রায় কুঁচকে শুধালো,
—“হাসছিস কেনো?
—“কিছু না…’
সুহিন ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ধরে রেখেই প্রত্যুত্তর করল। ততক্ষণে কেকে তার অববয়ে গুরুগম্ভীর ভাবটা ফুটিয়ে তুলে, শিরদাঁড়া সোজা করে বলতে লাগল,
—“শোন, এসব ভালোবাসা-টালোবাসা ছাড়া তোর যা যা চাওয়ার আছে, নির্দ্বিধায় চাইতে পারিস। আমি তোকে সবকিছুই এনে দেবো।”
সুহিন তার অভিব্যক্তিতে কিঞ্চিৎ মুচকি হাসল। চারপাশে কি প্রকোপ ভাবে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে! আর সেই ঝলকানিতে বারংবার বাড়ির সর্বকোণ নীলচে আলোয় ছেয়ে যাচ্ছে। অথচ আশ্চর্যজনক ব্যাপার, তার আজ একটুও ভয় করছে না। শুধু কি তার সম্মূখে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার জন্য?
সুহিন একবুক ভারী শ্বাস ফেলে প্রত্যুত্তর করল,
—“কিন্তু আমার তো ভালোবাসা চাই৷ আমি চাই আমায় কেউ ভালোবাসুক, অনেক অনেক ভালোবাসুক।”
সহসা কথাটুকু মুখ ফুটে সুহিন কি করে বলে ফেলল, তা তার জানা নেই। কিন্তু উত্তরের আশায় সে ঠিকই চাতক পাখির মতো নীল চোখদুটো দিয়ে দুর্ধর্ষ পুরুষের দিকে চেয়ে রইল।
কিন্তু কেকে তার আচরণে বারবারই কিছুটা অপ্রস্তুত হচ্ছে। তার সাথে সাথে কি এই মেয়েটাও পাগল হতে বসেছে? কোনো ভয়-ডর ছাড়া আজ এমন কথা কিভাবে বলছে সে?
সামান্য ভালোলাগার মাঝেই সে একবুক প্রশান্তির শ্বাস বুকভরে টেনে নিল কেকে। কিন্তু তখনই হঠাৎ তার ভ্রু-যুগল কুঁচকে গেল দুদিন আগের ঘটনায়। এটাই না সেই মেয়ে, যাকে ভালোবাসার কথা জিজ্ঞেস করলে উত্তরে পুরো চৌদ্দ গুষ্টির নাম বলে দেবে, অথচ তার নাম বলবে না। সেক্ষেত্রে আজ এই অবোধ রমণী কেমন ভালোবাসা চাইছে?
কেকে খানিকটা বিরক্তি নিয়ে, সুহিনের গা ঘেঁষে দাঁড়াল। তার উরুর দুপাশে কাউন্টার টপের উপর দুহাত ঠেকিয়ে তার দিকে বেশ খানিকটা ঝুঁকে পড়ল। অথচ আশ্চর্যজনক ভাবে, এবার সুহিন সামান্যও ঘাবড়ালো না। আর না পেছনে সরে যাবার নূন্যতম চেষ্টা চালাল। সে স্থির দৃষ্টিতে কেকের নিকষিত তীক্ষ্ণ চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে রইল একনাগাড়ে।
কেকে একরাশ সন্দেহ নিয়ে কটাক্ষের সুরে বলল,
“হাহ! তোর ভালোবাসা চাই? ভালোবাসা কি বুঝিস তুই?”
সুহিন সাথে সাথে শান্ত স্বরে প্রত্যুত্তর করল,
—“না, বুঝি না। কিন্তু আমি চাই, ভালোবাসা কি—তা কেউ তার নিজের মতো করে ভালোবেসে আমায় বুঝিয়ে দিক।”
কেকে তার দিকে ঝুঁকে পড়া অবস্থাতেই খানিকটা থমকে গেল। মিনিট দুয়েকের মতো অপলক দৃষ্টিতে সুহিনকে দেখতে লাগল। দুজনের অবয়বেই কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া নেই। দুজনেই শান্ত, নিস্তব্ধ। যেন সমগ্র ঝড়ের উথাল-পাতাল ঢেউ দুজনের অন্তরালে গ্রাস করেছে। দুজন দু’জনার চোখের অতলে হারিয়ে যাচ্ছে; একে-অপরের তপ্ত নিশ্বাসে মিশে যাচ্ছে। কিন্তু কোনোকিছুই তাদের বাহ্যিক আচরণে প্রকাশ পাচ্ছে না।
এরিমধ্যে হঠাৎ নীরাবতা ভেঙে, কেকে অস্ফুট ভগ্নদশায় রমণীকে আশ্বস্ত করতে নীচুকন্ঠে হাস্কিস্বরে বলল,
—“ভালোবাসি আর না বাসি, আই প্রমিজ—তুই চিরকাল আমারই থাকবি। শুধু আমার!”
সুহিন প্রত্যুত্তের সুযোগ পেল না। কেকে একমুহূর্তও বিলম্ব না করে, অকস্মাৎ দুহাতে রমণীর কোমড় ও উরু আঁকড়ে নিজের দিকে হেঁচকা টানে টেনে নিল। কোমড়ে হাতের বাঁধন দৃঢ় করে, অন্যহাতটা চলে গেল রমণীর গ্রীবায়। সুহিন কিছু বুঝে ওঠার আগেই কেকে তার ওষ্ঠদ্বয় আঁকড়ে ধরল। এক মূহুর্তেই সে উন্মাদ, উগ্র আর বেপরোয়া হয়ে উঠল। সুহিন শুরুতে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত হয়ে ছটফট করতে নিলেও, পরমুহূর্তেই সে হঠাৎ নিজের অস্বস্তি থামিয়ে শান্ত হলো। তবে এই স্থিরতা যেন নতুন উন্মাদনার প্রকাশ।
কেকের মতো এই পর্যায়ে সুহিনও উন্মাদ হয়ে উঠল। দুহাতে কেকের ঘাড় কাঁধ জড়িয়ে ধরতেই, কেকে তাকে হেঁচকা টানে নিজের কোলে তুলে নিল। সুহিনও তাকে নিজের দুপায়ের সংযোগে আঁকড়ে ধরল। কিন্তু পাগলামির এই চরম পর্যায়ে অসাবধানতার বসে হঠাৎ কাউন্টার টপের উপর থেকে গ্লাসটা নিচে পড়ে ভেঙে গেল। কাঁচের টুকরো আর স্মুদির তরল চারপাশে ছড়িয়ে গেল; তবুও দুজনের উন্মাদনায় সামান্য ব্যাঘাত ঘটল না।
সুহিন বরাবরই নিজেকে এই ধরনের পাগলামিতে অনভ্যস্ত বলেই জেনে এসেছে। কিন্তু যখনই সে কেকে’র সংস্পর্শের গভীরতায় একটুখানি খেয়ালি হয়ে ওঠে—তখনই যেন সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যায়। কেকে যতটা পাগলামি করতে পছন্দ করে, সুহিনও ঠিকই ততটুকু উন্মাদ হয়ে ওঠে। যা মুখে স্বীকার না করলেও, প্রকৃত পক্ষে এমনটাই ঘটে।
রুদ্ধশ্বাস মূহুর্তটুকু দীর্ঘের চেয়েও দীর্ঘ হলো। দুজন দুজনের সাথে লেপ্টে রইল, ঘুচে গেল কিঞ্চিৎ পরিমাণ দুরত্ব। কেউই কাউকে ছাড়ল না অথচ লাগাতার পাগলামিতে সুহিনের এখন শ্বাসকষ্ট যেন মাথায় চড়ে গিয়েছে। কিন্তু সে ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা না করে, উল্টো আরো দৃঢ়হাতে কেকের ঝাঁকড়া চুল ও কাঁধ আঁকড়ে ধরল।
রান্নাঘরের মতো পরিবেশে নিজেদের অবস্থানটা খানিক জুতসই না লাগায়, কেকে তাকে নিয়ে ধীরে ধীরে সেখান থেকে বেরিয়ে এলো। বরাবরের মতোই তার হাতের বিচরণ এখন রমণীর পিঠ ও উরুর নরম ত্বকে। প্রতিমুহূর্তে সুহিন ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠলেও, তার কোনো কিছু করারই যেন কোনো সাধ্য নেই। বরং সে নিজেও চাইছে, এই রুদ্ধশ্বাস মূহুর্তটুকু আরো দীর্ঘ হোক। কিংবা সময় থমকে যাক, আর এই উন্মাদনা চিরতরে দুজনের মাঝে বন্দী হোক।
কিন্তু সময় তো আর কারো জন্য থেমে থাকে না। সে চলে তার নিজস্ব গতিতে। মাঝরাতের রুদ্ধশ্বাস ঝড়-বৃষ্টি এই ভোররাতে থেমে গেলেও, মাঝেমধ্যেই আকাশ কাঁপিয়ে তুমুল সব বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সেই ঝলকানিতে কাঁচঘেরা অত্যাধুনিক বাড়ির অন্তরালও আলোকিত হচ্ছে মুহুর্মুহুে। কিন্তু বেপরোয়া হয়ে ওঠা দুই উন্মাদের কোনোকিছুতেই খেলায় নেই।
এদিকে বিদ্যুতের ঝলকানির মাঝেই হঠাৎ বাড়ির সদর দরজার সামনে উপস্থিত হলো চারটে ছায়া। ইভেন্ট শেষে চারবন্ধু স্বশরীরে বাড়িতে উপস্থিত হয়েছে। দরজায় ডিজিটার লকের কারণে চাবি খোঁজার বাড়তি কোনো ঝামেলা পোহাতে হলো না৷ ফারিস নিজেই পাসওয়ার্ড চেপে তৎক্ষনাৎ দরজাটা খুলে ফেলল।
শেষরাতে চারবন্ধু শান্ত ভঙ্গিতে খোশমেজাজে হাসাহাসি করতে করতেই দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল। কিন্তু বেশিদূর আর এগোতে পারল না। দরজার চৌকাঠেই চারজনের পা থমকে গেল। কয়েক জোড়া চোখ অবাধ বিস্ময়ে স্তব্ধ হলো।
সিঁড়ি ও ড্রইংরুমের সংলগ্ন এককোণে কেকের অবয়বে উল্টো ঘুরে একজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে। যার কোল পেঁচিয়ে লেপ্টে আছে আরেক মানবী। এতো ঘনিষ্ঠতায় দুজনের মাঝে লাগাতার কি চলছে তা আর কারো বুঝতে বাকি নেই। অথচ দুজনে নিজেদের মাঝে এতোটাই উন্মাদ হয়েছে যে, চারজনের উপস্থিততেও কারো টনক নড়ছে না।
মাঝরাতে কোনো মেয়ের সাথে কেকে’কে এই অবস্থায় দেখে, বিস্ময়ের সকল সীমা ছাড়িয়ে,তালহার কন্ঠস্বর হয়ে অস্ফুটে নির্গত হয়,
“কেকে?”
এর পরে কি শব্দ উচ্চারণ করা উচিত, তা তালহা জানে না। বরং তার আগেই পাশ থেকে জায়ান বিস্ময়ের সাথে বলে উঠল,
“ওটা কেকের বোন সুহিন না?”
একমুহূর্তেই যেন সকলের মাথায় বাজ পড়ল। সুহিনের মুখটা কেকের দীর্ঘ অবয়বের আড়ালে ঢাকা পড়ায় প্রথমে কেউই বুঝতে পারেনি, কেকে’র সাথে ঐ মেয়েটা কে। কিন্তু যখনই জায়ান সুহিনের নাম উচ্চারণ করল, তখন তারাও আন্দাজে নিশ্চিত হলো যে—হ্যাঁ,ওটা সুহিনই!
কিন্তু বিপত্তি ঘটাল সাদ। বাকিরা স্তব্ধ বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেও, সাদ যেন এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারল না। কেকে’র কোনো মেয়ের সাথে মাঝরাতে এমন অন্তরঙ্গ অবস্থায় থাকাটা যতটা অপ্রত্যাশিত, তার চেয়েও বেশি বিস্ময়কর সেই মেয়েটা সুহিন হওয়া।
সাদের পুরো দুনিয়াটাই যেন চক্কর দিতে লাগল। ঐদিকে মানবযুগল নিজেদের খেয়ালে হারিয়ে গেলেও, সাদ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে হাত-পা অবশ ঢঙে আলগা করে ছেড়ে দিল। মাথা ঘুড়ে পড়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে নড়েচড়ে উচ্চকন্ঠে গলাভাঙা স্বরে চেঁচিয়ে উঠল,
—“আইলারে আইলা! খোদা তুমি আমারে এ কি দেখাইলা?”
অকস্মাৎ পরিচিত কারো কন্ঠস্বরে সুহিন নিজের আবেশে বুঁজে নেওয়া চোখদুটো একপলকে খুলে ফেলল। নিজেদের অবস্থা বুঝে তার চোখদুটো ছানাবড়া হলো। যদিও কেকে তখনও তার পাগলামিতে মগ্ন। মিনিট দশেক হয়ে গেলেও ঠোঁট ছাড়ার নাম নেই। কিন্তু সুহিন আর কালবিলম্ব না করে,এবার সোজা কেকের কাঁধে ও বুকে দুহাতে সজোরে ধাক্কা দিল।
মূহুর্তেই কেকে রমণীর ওষ্ঠদ্বয় ছেড়ে দিয়ে কিঞ্চিৎ বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকাল। কিন্তু সেই দৃষ্টির তোয়াক্কা আপাতত সুহিন করছে না। কারণ তার ভীত-সন্ত্রস্ত চোখদুটো পড়েছে দরজার চৌকাঠে। সুহিন যেন বিস্ময়ে কেঁদেই ফেলবে এমন দশা।
কিন্তু এই সুযোগও সে পেল না। দূর্বল চিত্তের রমণীর দুচোখ অকস্মাৎ সাদের ভয়াবহ নাজেহাল অবয়ব ও বিস্ফোরিত চোখদুটোর সাথে দৃষ্টি মিলতেই—দুজনে যেন একযোগে হুঁশ হারাল।
শুরুতে সাদ-ই নিজের জ্ঞান হারিয়ে আচমকা ধাড়াম করে মুখ থুবড়ে ফ্লোরে পড়ে গেল। সে পড়ে যেতেই অপ্রত্যাশিত সেই আওয়াজে কেকের হুঁশ ফিরল। ভ্রু-যুগল অস্বাভাবিক মাত্রায় কুঁচকে, সে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। মূহুর্তেই বাকি বন্ধুদের মতো সেও যেন স্তম্ভিত। তিন জোড়া চোখ কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে তার দিকেই নিবদ্ধ। আর আরেকজন হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে ফ্লোরের উপর। কিন্তু ততক্ষণে আরো এক অঘটনও ঘটে গেল। সাদ অজ্ঞান হয়ে পড়ে যেতেই, কেকে’র কোলের সাথে লেপ্টে থাকা সুহিনও নিজের জ্ঞান হারাল। রমণীর তার সর্বাঙ্গের ভর ছেড়ে দিয়ে পেছনের দিকে হেলে পড়ল।
Naar e Ishq part 39
তাকে সামলাতে গিয়ে কেকে দ্রুততর নজর ফিরিয়ে দেখল, সুহিন তার হাত-পা অবশ ভঙ্গিতে ছেড়ে দিয়েছে। বদ্ধচোখে মাথাটা পেছনের দিকে হেলিয়ে দেওয়ার সাথে সাথে তার একগোছা ভিজে চুল প্রায় ফ্লোরের সাথে গিয়ে ঠেকেছে। সুহিনের এই দশায় কেকে চিন্তিত নয় বরং অতিমাত্রায় বিরক্ত হলো। বিরক্তিতে নিজের তীক্ষ্ণ চোয়াল ধারালো চাকুর চেয়েও তীক্ষ্ণ করে, সাদ এবং সুহিন—দুজনকে একত্রে উদ্দেশ্য করে দাঁত কিড়মিড়িয়ে আওড়াল,
“গাধার দল!”
