নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩৭ (২)
রূপন্তী সরকার
ইয়াশফা বারান্দার রেলিংয়ের ওপর নিজের দুই হাত রাখল। বাইরের কালো মেঘ চিরে তখন ঝুম ঝুম করে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির ঠান্ডা জলের ছাঁট এসে লাগছে ওর মুখে-চোখে। ও পাশে রাখা গিটারটার দিকে এক পলক তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই অবিরাম বৃষ্টির শব্দ আর একাকীত্ব ওর মনের ভেতর এক ঝটকায় টেনে নিয়ে এলো সেই অভিশপ্ত দিনের কথা। আজকের এই বৃষ্টির দিনেই ওর মনটা ডুব দিল অতীতের সেই অভিশপ্ত দিনে যেদিন ঋষভ ওকে একলা ফেলে এই বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল।
অতীত…
ইয়াশফার যখন ঘুম ভাঙল, তখন ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে দুপুরের চড়া আলো এসে পড়েছে বিছানায়। ও ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল দুপুর ১২টা বেজে গেছে। ও টের পেল ওর পুরো শরীরে এক অসহ্য আর তীব্র ব্যথা। ও বিছানা থেকে একটু উঠতে গিয়েই থমকে গেল। নজরে পড়ল গায়ের ওপর সাদা চাদরটার দিকে সেখানে ছোপ ছোপ রক্তের লাল দাগ লেগে আছে। ইয়াশফা আঁতকে উঠল। কিসের দাগ এগুলো? পরমুহূর্তেই ওর মাথায় কাল রাতেট কথা এক এক করে জ্যান্ত হয়ে ভেসে উঠল। কাল রাতে ও নিজের অজান্তেই ঋষভের কতটা কাছাকাছি চলে গিয়েছিল, নিজের সবটুকু সঁপে দিয়েছিল ঋষভকে। ইয়াশফা লজ্জায় আর আবেশে একদম থমকে রইল। ও বিছানার পাশের খালি জায়গাটার দিকে তাকাল, কিন্তু সেখানে ঋষভ নেই। চারপাশটা সুনসান।
কোথায় গেল লোকটা? ইয়াশফা মনে মনে ভাবল হয়তো কোনো জরুরি কাজে বাইরে গেছে। মনের এক কোণায় এক চিলতে লজ্জা এসে ওকে গ্রাস করল। আজকে রাতে ঋষভ যখন অফিস থেকে ঘরে ফিরবে, ও কীভাবে ওই লোকটার সামনে গিয়ে মুখ দেখাবে? ছিঃ! ভাবতেই ওর গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে গেল। ও আবার ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখল ১২:২০ বেজে গেছে। ও আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে খাট থেকে লাফ দিয়ে নেমে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেল। ঝটপট ফ্রেশ হয়ে ও আলমারি থেকে একটা সুন্দর কালো রঙের থ্রি পিস বের করে পরে নিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভেজা চুলগুলো একটু গুছিয়ে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। আজকে ওর মনের ভেতর কেন জানি এক অদ্ভুত খুশির হাওয়া বইছে।
কিন্তু নিচে নামামাত্রই ওর সেই খুশির আমেজটা একটু থমকে গেল। ড্রয়িংরুমে পরিবারের সবাই একসাথে বসে আছে, সোফায় বসা রিদের মুখটা আজ বড্ড বেশি থমথমে আর ভার হয়ে আছে। ওর চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ছায়া। ইয়াশফা এগিয়ে গিয়ে রিদের একদম পাশের খালি সোফাটায় বসল। ও রিদের হাতটা হালকা ছুঁয়ে ভারি গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে, বাবা? মুখটা এমন করে আছেন কেন?”
রিদ তখন অন্যমনস্ক হয়ে ডুবে ছিল। ইয়াশফার গলার আওয়াজে ওর ধ্যান ভাঙল। রিদ নিজের মুখের সেই কড়া ভাবটা কোনোমতে একটু সহজ করে ইয়াশফার মাথায় হাত রেখে বলল, “কই, কিছু না তো মা। তুমি খেয়েছো কিছু?”
মিহি পাশেই সোফায় বসে ওদের কথা শুনছিল। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু মলিন হেসে বলল, “না, ও তো এই মাত্রই ওপরে ঘুম থেকে উঠে নিচে নামল। চলো ইয়াশফা, আগে খেতে চলো।”
মিহি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ইয়াশফাকে সাথে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল
ইয়াশফা খেতে খেতেও আড়চোখে ড্রয়িংরুমের সেই থমথমে পরিবেশটার দিকে তাকিয়ে রইলো।
ইয়াশফা ডাইনিং টেবিল থেকে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে সোফায় ল্যাপটপ নিয়ে শুভ্র বসে ছিল। ইয়াশফাকে এগিয়ে আসতে দেখে শুভ্র নিজের হাতের কাজটা একপাশে রাখল। ও আদর করে ইয়াশফার গালটা আলতো টেনে দিয়ে হেসে বলল, “হেই চিকমিকি! কী হয়েছে, কী চায় তোমার?”
ইয়াশফা নিজের ওরনাটা একটু আঙুলে জড়াতে জড়াতে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল, “আপনার ভাই কই?”
শুভ্র ওর এই হঠাৎ ভাইদের খোঁজ নেওয়া দেখে একটু দুষ্টুমি মাখা চোখে তাকাল। ও ভ্রু নাচিয়ে বলল, “কে? মুগ্ধ নাকি ঋশ?”
ইয়াশফা নিজের মুখটা নিচু করে আস্তে সুরে জবাব দিল, “ঋশ।”
শুভ্র নিজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটিয়ে তুলল। ও ইয়াশফাকে আরেকটু খ্যাপানোর জন্য বলল, “উমম আমি তো জানি না পিচ্চি। হয়তো কোনো জরুরি কাজে বাইরে গেছে। কেন বলো তো? তুমি কি ওকে বেশি মিস করছো? আমি কি এখনই কল করে এই বিষয়টা ঋশকে জানিয়ে দেবো, হ্যাঁ?”
শুভ্রর এই রসিকতা শুনে ইয়াশফার গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে গেল। ধমকের সুরে বলল, “ধ্যাত! সেরকম কিচ্ছু না!”
কথাটা বলেই ও আর এক সেকেন্ডও শুভ্রর সামনে দাঁড়িয়ে না থেকে ঝড়ের গতিতে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। ও রুমে ঢুকে দরজাটা হালকা করে ভেজিয়ে বারান্দার রেলিংয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের দিকে তাকিয়ে ওর মনের ভেতর কেন জানি এক অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছিল। মনটা কেমন কেমন করছে, কোথাও ও এক ফোঁটা শান্তি পাচ্ছিল না। বুকটা এক অজানা আশঙ্কায় বারবার কেঁপে উঠছিল।
ও বারান্দা থেকে আবার ঘরের ভেতরে বিছানার কাছে ফিরে এলো। ঘরের টেবিলটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ ওর হাতের ধাক্কা লেগে টেবিলের ওপর রাখা একটা কাগজ নিচে মেঝেতে ছিটকে পড়ল। কাগজটা দেখতে একটা চিঠির মতো ভাঁজ করা। ইয়াশফা একটু ভ্রু কুঁচকে নিচু হয়ে মেঝে থেকে কাগজটা হাতে তুলে নিল। ও নিজের কাঁপতে থাকা আঙুল দিয়ে আলতো করে চিঠির ভাঁজটা খুলল। আর ঠিক তখনই চিঠির ভেতরের সেই চেনা, ধারালো হাতের অক্ষরের লেখাগুলোর ওপর চোখ পড়া মাত্রই ওর পুরো শরীরটা এক সেকেন্ডে পাথরের মতো জমে গেল! ওর হাত-পা থরথর করে কাঁপতে লাগল, ভেতরের কান্নাগুলো গলার কাছে এসে দলা পাকিয়ে গেল। চারপাশের পুরো পৃথিবীটা যেন ওর চোখের সামনে এক পলকে অন্ধকার হয়ে এলো।
চিঠিতে লিখা ছিলো
প্রিয় ঋশের সাকুরা,
প্রথমেই বলে রাখি আমি কিন্তু তোমাকে আমার বউ বলে মানি না। তোমাকে ছুঁয়েছি কেন। সারাজীবন তোমার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিতে পারব না জেনেও কেনো ছুয়েছি তোমাকে? নিজের সমস্ত সীমাবদ্ধতা আর পরিণতির কথা জেনেও তোমার এতটা কাছে চলে এসেছিলাম কেনো? তোমার হৃদয়কে, তোমার অনুভূতিগুলোকে, তোমার নিস্পাপ জীবনের একটা অংশকে গভীরভাবে ছুঁয়েছি কেনো?
আমাকে ক্ষমা করে দিও, সাকুরা।
বিশ্বাস করো, তোমাকে আঘাত দেওয়ার ইচ্ছে আমার কখনো ছিল না। আমি শুধু নিজের অজান্তেই তোমাকে এতটা ভালোবেসে ফেলেছিলাম যে দূরে থাকার শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলেছিলাম। নিজেকে সামলাতে পারি নি, তোমার বুকে মাথা রাখলে আমার অনেক শান্তি লাগে ইয়াশ, তাই কাল সারারাত আমি তোমার বুকেই ঘুমিয়েছি।
আজ আমি তোমাকে না জানিয়েই এই বাড়ি ছেড়ে এমন কি সব কিছু ছেড়ে চলে যাচ্ছি। কেন যাচ্ছি, কোথায় যাচ্ছি
সেটা এই মুহূর্তে কাউকে বুঝিয়ে বলার মতো কোনো ভাষা আমার জানা নেই। তবে হ্যাঁ, একটা জরুরি কাজে যাচ্ছি, কিছু পাপ এবং পাপির বিনাশ করতে যাচ্ছি। কবে ফিরবো আমি জানি না, কিংবা আদৌ কোনোদিন তোমার খারাপ বর তোমার কাছে ফিরে আসতে পারবে কি ন, সেটাও জানি না।
হয়তো এটাই তোমার সাথে আমার শেষ দেখা, আমার তোমাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না ইয়াশ, তুমি আমার ছোট্ট মুরগির বাচ্চার মতো বউ, আমার ক্ষমতা থাকলে আমি এই সময়টাকে সারা জীবনের জন্য থামিয়ে দিতাম পাখি, আর মন ভরে দেখতাম তোমার ঘুমন্ত নিষ্পাপ চেহারাটা, যখন তুমি এই চিঠিটা পড়বা, তখন আমি হয়তো এই দেশের সীমানা বা এই পৃথিবী ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছি। আজকে তোমাকে আমি অনেকগুলো নামে সম্মোধন করেছি কিন্তু কেনো করেছি জানিনা। আমার দেওয়া এই নাম গুলো শুধু তোমার জন্য বউ। এই নামগুলোতে তোমাকে যেনো কেউ না ডাকে। আর আমি যদি কখনো বেঁচে ফিরি, তখন হয়তো তুমি অনেকটা বড়ো হয়ে যাবে, জানো ইয়াশ তোমার মতো বাচ্চার সাথে যখন আমার বিয়ে হলো তখন আমিও ভেবেছিলাম পাপার মতো আমিও তোমাকে নিজ হাতে বড় করবো, কিন্তু তা আর সম্ভব হলো না। আমার জন্য কখনো অপেক্ষা করো না সাকুরা, আমি নিজেও জানিনা আমি ফিরবো কিনা। হয়তো সত্যিই আর কখনো ফিরবো না। তুমি মানুষের মতো মানুষ হও, অন্যায়ের সাথে কখনো আপোষ করবে না ইয়াশ, যদি কখনো ন্যায় বিচারের জন্য অন্যায় করতে হয় তাহলে তুমি সেই অন্যায় করবে। মনে রাখবে কারো বিচার কেউ করতে পারে না, তাই নিজের বিচারক নিজেকেই হতে হবে”
ইতি: ঋশ
ইয়াশফা হাতের চিঠিটা শক্ত করে ধরে এক জায়গায় একদম নিথর হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। ওর মাথাটা যেন সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে গেছে। ঠিক তখনই ঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল রিদ। রিদকে দেখামাত্রই ইয়াশফা অবশ পা দুটো কোনোমতে টেনে এক ছুটে ওর কাছে চলে গেল। ও কাঁপতে কাঁপতে হাতের ওই চিঠির টুকরোটা রিদের দিকে বাড়িয়ে দিল। রিদ হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নিল। তারপর শান্ত মুখে ওটার ওপর চোখ বোলাল। পুরো চিঠিটা পড়া শেষ হওয়ার পরও রিদের চোখ-মুখে অদ্ভুত এক নীরবতা। ওর মাঝে কোনো রকমের অস্থিরতা বা আশঙ্কার এতটুকু অনুভূতি প্রকাশ পেল না। ওকে দেখে মনেই হচ্ছে না যে ঋশ সত্যিই এভাবে পুরো পরিবারকে ফেলে চলে গেছে! ইয়াশফা রিদের এই পাথরের মতো চেহারা দেখে ডুকরে উঠে বলল, “এসব কী বাবা? ও কোথায় গেছে?”
রিদ চিঠিটা ভাঁজ করে টেবিলে রাখলো তারপর ইয়াশফার মাথায় আলতো করে হাত রেখে স্বাভাবিক গলায় বলল, “কেঁদো না এটাম বোম। ওইসব বেয়াদবের জন্য কেঁদে কোনো লাভ নেই। কাঁদলেই তো আর ও হুট করে ফিরে আসবে না। সামনে তোমার পরীক্ষা, এখন মন দিয়ে ওটার পড়াশোনা করতে হবে।”
কথাটা বলেই রিদ ওখান থেকে ধীরপায়ে করিডোর দিয়ে চলে গেল। ওর যাওয়ার ঠিক পরমুহূর্তেই ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল মিহি। ইয়াশফা আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে মিহির দিকেও চিঠিটা এগিয়ে দিল। মিহি চিঠিটা পড়া মাত্রই ওর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি ঝরে পড়তে লাগল, ও এক নীরব কান্নায় ভেঙে পড়ল। ইয়াশফা নিজের চোখের পানি মুছে অবুঝের মতো চেয়ে রইল। ও কিছুতেই বুঝতে পারছে না এই বাড়ির মানুষগুলোর এমন অদ্ভুত আচরণ কেন? নিজের ছেলে, এভাবে না বলে চলে গেল, অথচ এদের বড় কোনো প্রতিক্রিয়া নেই কেন? এরা সবাই এতটা চুপ হয়ে আছে কীসের জোরে? ইয়াশফা মিহির হাত দুটো আঁকড়ে ধরে বড্ড করুণ গলায় বলল, “আন্টি… আপনার ছেলে আমাকে একলা রেখে চলে গেছে!”
মিহি আর নিজের ভেতরের কষ্টটা চেপে রাখতে পারল না। ও ইয়াশফাকে নিজের বুকের ভেতর জড়িয়ে নিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। মিহির কান্নায় পুরো ঘরটা যেন ভারী হয়ে উঠল। কিন্তু ইয়াশফা ওভাবেই ওর বুকের মাঝে জবুথবু হয়ে রইল, ও এক ফোঁটাও কাঁদতে পারল না। এটা অদ্ভুত এক সমস্যা ও সহজে কারো সামনে নিজের চোখ দিয়ে পানি ঝরাতে পারে না, কান্নাটা ভেতরের কলিজা কুঁড়ে খেলেও বাইরে ও একদম পাথর হয়ে থাকে। মিহি ওপাশে পাগলের মতো কেঁদে চললেও ইয়াশফার দিক থেকে কোনো সাড়া-শব্দ মিলছিল না।
হুট করেই ইয়াশফার মনে হলো চারপাশের সবকিছু এক কেমন যেন বনবন করে ঘুরছে। ওর হাত-পা এক সেকেন্ডে বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে এলো এবং ও মিহির গায়ের ওপরই পুরোপুরি হেলে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল! মিহি ইয়াশফার শরীরের পুরো ভারটা পেয়ে আঁতকে উঠল। ও কোনোমতে নিজের পুরো শক্তি দিয়ে ইয়াশফাকে ধরে আগলে রেখে বিছানার ওপর শুইয়ে দিল। ওর চোখে তখন চরম আতঙ্ক। ও ঘর থেকে এক ছুটে দৌড়ে গিয়ে নিচে নেমে চিৎকার করে রিদকে ডেকে আনল। রিদ ওপরে এসে ইয়াশফার এই অবস্থা দেখে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ফ্যামিলি ডাক্তারকে জরুরি ফোন দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক্তার রায়ান কুঞ্জে এসে হাজির হলেন। ওরা সবাই চিন্তিত মুখে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। ডাক্তার বাবু অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ইয়াশফাকে চেকআপ করলেন। তারপর স্টেথোস্কোপটা পকেটে গুঁজে রিদের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, “অতিরিক্ত মানসিক চাপ আর শারীরিক দুর্বলতার কারণে ও হুট করে জ্ঞান হারিয়েছে। ভয়ের কিছু নেই। আমি কিছু জরুরি মেডিসিন লিখে দিচ্ছি, এগুলো নিয়মমতো খাওয়াবেন। আর ওনাকে ঠিকঠাক মতো পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা ওনার মাথায় কোনো রকম টেনশন বা চিন্তার চাপ দেওয়া যাবে না।”
ডাক্তারের এই কথা শুনে মিহি ইয়াশফার কপালে নিজের হাতটা রেখে আবার একটু কেঁদে ফেলল,
এরপর থেকে শুরু হলো ইয়াশফার জীবনের সব থেকে কষ্টের আর কালো দিনগুলো। দেখতে দেখতে ঋষভ চলে যাওয়ার পর দীর্ঘ ৪টি মাস কেটে গেল। যে ইয়াশফা সারাক্ষণ বাড়ি মাথায় করে রাখত, চঞ্চলতায় মুখর থাকত, সে হুট করেই একদম চুপ মেরে গেল। নিজের ভেতরের এই অবর্ণনীয় যন্ত্রণা ও একা একাই গিলতে লাগল। প্রতিদিন নিয়ম করে ও রিদের কাছে যেত, ওর হাত দুটো জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদত আর বলতো, “বাবা, উনাকে একবার ফিরিয়ে এনে দিন না প্লিজ!”
ও সারাক্ষণ মিহির পায়ের কাছে গিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে থাকত। মিহি নিজেও ঋষভের হঠাৎ চলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না, ও নিজেও আড়ালে অঝোরে কাঁদত, কিন্তু ইয়াশফাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা ওনার জানা ছিল না। মিহি ইয়াশফাকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করত না, প্রতিদিন রাতে ও ইয়াশফাকে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে নিয়ে ঘুমাত।
ওদিকে বাড়ির বাকি মানুষেরাও ইয়াশফাকে এই নরকযন্ত্রণা থেকে বের করার জন্য দিন-রাত এক করে ফেলছিল। রুহি, মুগ্ধ, শুভ্র, জ্যোতি আর অদ্রীত সবাই সারাক্ষণ ওর ঘরের চারপাশে ঘুরঘুর করত, নানা রকম হাস্যকর কথা বলে ওরে হাসিখুশি রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করত। রাহা ও এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইয়াশফার পাশে বসে নানারকম গল্প করত যাতে ওর মনটা একটু হালকা হয়। কিন্তু ইয়াশফা যেন এক জ্যান্ত পাথর হয়ে গিয়েছিল। ও আর নিজের ঘর থেকে একদম বের হতো না, দিন-রাত জানালার বাইরে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। ঠিকমতো খাবার মুখে তুলত না, পড়াশোনার তো নামই নিত না।
সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, ওর এসএসসি পরীক্ষার আর মাত্র ১ মাস বাকি ছিল, অথচ সিলেবাসের অর্ধেকও তখনো কমপ্লিট হয়নি। কিন্তু এই পরীক্ষা বা ক্যারিয়ার নিয়ে ইয়াশফার মনে বিন্দুমাত্র কোনো হেলদোল ছিল না। ও সারাক্ষণ নিজের অবুঝ মনকে শুধু মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে বলত “আজকে হয়তো উনি চলে আসবে, না হয় কালকে তো ও পাক্কা ফিরে আসবেই!”
এই মিথ্যে অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতেই ওর এক একটা দিন বছরের মতো কাটছিল।
ইয়াশফার এই খামখেয়ালি আর জীবনের এত বড় ক্ষতি রিদ আর সহ্য করতে পারল না। রিদ নিজেই প্রতিদিন কড়া মুখে ওর ঘরে এসে ইয়াশফাকে জোর করে পড়ার টেবিলে বসাত। ও ইয়াশফার মাথায় হাত রেখে ভরসা দিয়ে বলত, “এটাম বোম তুমি মন দিয়ে পড়াশোনা করো, উকিল হতে হবে না? আর আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি আমি নিজে ঋশকে খুঁজে তোমার কাছে এনে দেবো। আর ও না আসলে আমি তোমাকে আমি ওর কাছে নিয়ে যাবো।”
শুধু রিদ-ই নয়, অদ্রীত আর শুভ্রও ওর পড়ার সমস্ত দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। ওরা দুজনে প্রতিদিন নিয়ম করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে ইয়াশফাকে পড়াত। এভাবেই ফ্যামিলির সবার চেষ্টার কারণে মাত্র ১ মাসের মধ্যে কোনোমতে ও সিলেবাসটা শেষ করল। পুরো সিলেবাসটা হয়তো শেষ করা সম্ভব হয়নি, তবে যতটুকু কাভার হয়েছিল, ততটুকুই পরীক্ষায় পাস করার জন্য যথেষ্ট ছিল। এই তীব্র একাকীত্ব নিয়েই ও শেষমেশ এসএসসি পরীক্ষাটা দিল।
ইয়াশফা আগে যেমন মিষ্টি আর গুলুমুলু ধাঁচের একটা মেয়ে ছিল, এই ৪ মাসের অমানুষিক মানসিক অত্যাচারে ও এক্কেবারে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। গায়ের এক ফোঁটা মাংসও যেন আর অবশিষ্ট নেই, বড্ড বেশি চিকন আর ফ্যাকাশে হয়ে গেল ও। মিহির মায়া লাগত মেয়েটার এই করুণ দশা দেখে। ও এক ফোঁটাও খাবার খেতে চাইত না, রাতে সারারাত জেগে কাঁদত বলে চোখের নিচে বড় বড় কালো কালি পড়ে চেহারাটা শেষ হয়ে গিয়েছিল।
এরই মধ্যে মিহি হঠাৎ একটা নতুন জিনিস খেয়াল করল। ইয়াশফা আজকাল যা-ই মুখে তোলে, কয়েক মিনিটের মধ্যে বমি করে দেয়। ওরা ভাবলেন হয়তো গ্যাস্ট্রিক বা না খেয়ে থাকার কারণে এমন হচ্ছে। কিন্তু একদিন স্কুল থেকে শুভ্রর সাথে আসার পথে হঠাৎ করেই ইয়াশফা মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। শুভ্র ভয় পেয়ে ওখান থেকেই ওকে কোলে তুলে নিয়ে এক ছুটে বাড়িতে এলো। খবর পেয়ে রিদ তড়িঘড়ি করে ওদের ফ্যামিলি ডাক্তারকে ডেকে পাঠাল। ডাক্তার এসে ইয়াশফাকে চেকআপ করলেন। ওনার চেকআপ শেষ হতেই ওনার মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। ওরা সবাই যখন দরজার পাশে চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে, তখন ডাক্তার রিদ আর মিহির দিকে তাকিয়ে বললো ইয়াশফা মা হতে যাচ্ছে! ওর পেটে অলরেডি একটা ছোট্ট প্রাণ বড় হচ্ছে। এই খবরটা শোনা মাত্রই ড্রয়িংরুমে থাকা সবার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! রিদ, মিহি, শুভ্র সবার হাত-পা এক সেকেন্ডে জমে বরফ হয়ে গেল। একে তো ওর বয়স কম, মাত্র ১৫ বছর বয়স ওর, তার ওপর বিগত ৪ মাস ধরে না খেয়ে আর মানসিক টেনশনে ওর নিজের শরীরটাই কঙ্কালের মতো হয়ে আছে। ডাক্তার বাবু রিদকে একটু আড়ালে ডেকে কড়া গলায় ওনার ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, “মিস্টার চৌধুরী , এই কাজটা কিন্তু একদমই ঠিক হয়নি। ও ছোট একটা মেয়ে, এই বয়সে ওর নিজের শরীর যেখানে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে, সেখানে এই প্রেগন্যান্সি ওর জীবনের জন্য বড় Risk তৈরি করবে!”
ডাক্তারের কথাগুলো তীরের মতো গিয়ে বিঁধল রিদের বুকে। ও নিজের দাঁতে দাঁত চেপে, চোয়াল শক্ত করে ঋষভের ওপর ওর ভেতরের সবটুকু রাগ আর আক্রোশ কোনোমতে হজম করল। ও মনে মনে বলল ” শালা তুমি শুধু একবার দেশে এসো তোমাকে আমি চিবিয়ে খাবো”
রিদ নিজেকে কেনোভানে শান্ত করে ডাক্তার কে আশ্বস্ত করল। ডাক্তার বাবু যাওয়ার আগে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে গেলেন যে ইয়াশফার প্রতিটা মুহূর্তের খেয়াল রাখতে হবে, ওরে জোর করে হলেও নিয়ম করে পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে এবং প্রতি সপ্তাহে ওনার রেগুলার মেডিকেল চেকআপের ব্যবস্থা করতে হবে।
মিহি সব সময় ইয়াশফাকে নিজের চোখে চোখে রাখত, তিথিও সব সময় ছায়ার মতো আগলে রাখত ওকে। বাড়ির বড়রা ওকে এক মুহূর্তের জন্যও কোথাও একা ছাড়ত না। এরই মধ্যে আনন্দের খবর নিয়ে রায়ান কুঞ্জে রাহাও প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়ে। একই সাথে ঘরের দুজন গর্ভবতী মেয়েকে সামলাতে গিয়ে বাড়ির সবাই হিমশিম খাচ্ছিল।এভাবেই দেখতে দেখতে ইয়াশফার প্রেগন্যান্সির প্রায় ৭ মাস কেটে যায়। ঠিক তখনই হঠাৎ করে ইয়াশফার পুরো শরীর অনেক ফুলে যায়। একদম চোখ-মুখ আর পা ফুলে ওজনে ভারী হয়ে ওঠে ও। বাড়ির সবাই প্রথমে এটাকে সাধারণ গর্ভাবস্থার লক্ষণ ভেবে হালকাভাবে নিলেও, দিন দিন ফুলাটা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকায় ওরা বেশ ভয় পেয়ে যায়। ইয়াশফা ব্যথায় আর ভারী শরীরে একটুও নড়তে পারত না। সেদিন মিহি ওর ঘরের কাছেই ছিল, কিন্তু ইয়াশফা একা ওয়াশরুমে গিয়ে হঠাৎ মাথা ঘুরে ধপ করে মেঝেতে পড়ে যায়।
পড়ার শব্দ আর ইয়াশফার গোঙানি শুনে মিহি এক ছুটে ওয়াশরুমে ঢুকে চিৎকার করে ওঠে। ও দেখে ইয়াশফার শরীর বেয়ে মারাত্মক ব্লিডিং শুরু হয়েছে। পুরো রায়ান কুঞ্জে হইচই পড়ে যায়। রিদ, মুগ্ধ, শুভ্র সবাই মিলে ধরাধরি করে ওকে দ্রুত হসপিটালে নিয়ে যায়। হসপিটালে পৌঁছানোর পর ইয়াশফার সারা শরীর মারাত্মকভাবে কাঁপতে কাঁপতে খিঁচুনি উঠতে শুরু করে।
ডাক্তাররা দ্রুত ওটি-তে নিয়ে পরীক্ষা করে রিদকে জানান, ইয়াশফা আসলে এক্লাম্পসিয়া (Eclampsia) নামক একটি জটিল ও জীবনঘাতী গর্ভাবস্থার রোগে আক্রান্ত হয়েছে। কম বয়সে মা হওয়া এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে ওর ব্লাড প্রেসার হঠাৎ ডেঞ্জার লেভেলে চলে গেছে। যার ফলেই এই খিঁচুনি আর ব্লিডিং শুরু হয়েছে।
ডাক্তাররা হন্তদন্ত হয়ে ওটি থেকে বেরিয়ে বলেন, “জরুরি সিজার করতে হবে, কিন্তু ওনার শরীরে এক ফোঁটাও রক্ত নেই। এখনই ‘ও নেগেটিভ’ (O Negative) রক্ত লাগবে। এই রক্ত না পেলে ওনাকে বাঁচানো যাবে না।”
ও নেগেটিভ অত্যন্ত দুর্লভ রক্তের গ্রুপ হওয়ায় রিদ, মুগ্ধ আর শুভ্র হসপিটাল থেকে শুরু করে ব্লাড ব্যাংক সব জায়গায় হন্যে হয়ে খুঁজেও কোথাও রক্ত পাচ্ছিল না। সেদিন অদ্রীত শহরে ছিল না, ও ওখান থেকেই খবরটা পাওয়ার সাথে সাথে সব কাজ ফেলে ঝড়ের গতিতে হসপিটালে এসে হাজির হয়। ভাগ্যক্রমে অদ্রীতের নিজের রক্তের গ্রুপও ছিল ও নেগেটিভ অদ্রীত লাইনে শুয়ে ছটফট করতে করতে নিজের রক্ত দেয়।
কিন্তু রক্ত দেওয়ার পরও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয় না। কারণ ইয়াশফার প্রেসার আর খিঁচুনি কোনোভাবেই কমছিল না। ডাক্তার ওটি থেকে মুখ কালো করে বেরিয়ে এসে রিদকে বলেন, “অবস্থা একেবারে হাতের বাইরে মিস্টার চৌধুরী। রক্ত পেলেও খিঁচুনি থামানো যাচ্ছে না, যেকোনো সময় ব্রেন স্ট্রোক হতে পারে। হয় মা বাঁচবে, নয়তো বাচ্চা! কারণ বাচ্চা এখনো অপুষ্ট, মাত্র ৭ মাসের। তার ওপর মায়ের বয়স কম, উনি হয়তো আর বাঁচবে না।”
ডাক্তারের এই কথা শোনা মাত্রই হসপিটালের করিডোরে মিহি, তিথি আর জ্যোতি হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে। পুরো পরিবারটা এক নিমেষে পাথর হয়ে যায়। রিদ আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে ড. রোহান ইউভানকে জরুরি তলব করে ডাকেন। ইউভান হসপিটালে এসেই ওটি-র পুরো দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়। ও খিঁচুনি কমানোর বিশেষ ড্রাগ দিয়ে মিহির হাত দুটো ধরে শক্ত গলায় বলেছিল, “মাম্মা, তুমি একদম ভেঙে পড়বে না। আমি আমার ইয়াশফাকে বাঁচাবো।”
ইয়াশফাকে যখন সিজার রুমের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, ও আধো বোজা চোখ মেলে রিদের দিকে তাকাল। ওর নিশ্বাসের গতি তখন বড্ড ধীর। ও রিদের হাতটা হালকা খামচে ধরে ভাঙা আর কাঁপো কাঁপো গলায় বলল, “আমি মারা গেলে তো আপনার ছেলেকে আর কোনোদিন দেখতে পাবো না বাবা। আপনি ওনাকে শুধু একটা কথা বলে দিয়েন ওনার সাকুরা ওনাকে ভালোবাসে না।”
ইয়াশফার কথা শুনে রিদের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
মিহি ইয়াশফার কপালে একটা দীর্ঘ চুমু দিল। ওটি-র দরজাটা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত ইয়াশফা নিজের চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো দিয়ে চারপাশের ভিড়ের মাঝে ব্যাকুল হয়ে শুধু ঋষভকে খুঁজছিল যদি শেষবারের মতো লোকটা একবার ওর সামনে এসে দাঁড়াত!
বাইরে করিডোরের মেঝেতে বসে মিহি, রিদ, অদ্রীত, শুভ্র আর মুগ্ধ সবাই মিলে আল্লাহর কাছে হয়ে কাঁদতে কাঁদতে দোয়া করতে থাকে। ওটি-র ভেতরে ইউভান সামলাতে থাকে
ওপরওয়ালার অশেষ রহমতে ইয়াশফা এবং ওর গর্ভের বাবু দুজনের প্রাণই শেষমেশ বাঁচানো সম্ভব হলো। তবে ইয়াশফার অবস্থা একেবারে মরোমরো হয়ে রইল, ও আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে চলে গেল। আর ওদের জন্ম নেওয়া বাবুটা
ইয়ান, ও সাত মাসের অপুষ্ট,
ইয়াশফা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে আগের সেই মরণপণ লড়াইয়ের অতীত থেকে ফিরে এলো বর্তমানে। বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে ঝুম বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ও নিজের মনেই হালকা একটা মলিন হাসি হাসল।
ঠিক তখনই আচমকা ও অনুভব করল পেছন থেকে কেউ একজন জড়িয়ে ধরেছে ওকে! ওর পিঠের সাথে মিশে গেছে এক চেনা বলিষ্ঠ পুরুষালি বুক। ইয়াশফার পুরো শরীরটা শিউরে উঠল। এই স্পর্শটা চিনতে ওর এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। ও নিজের শরীরটা সামান্য নাড়াচাড়া করে হালকা ধমকের সুরে অভিমানী গলায় বলল, “এসেছেন আপনি? ছাড়ুন আমাকে! আর লাগবে না আপনাকে, আমি একাই নিজের আর নিজের বাচ্চার খেয়াল রাখতে পারি। মুখ দেখতে চাই না আপনার!”
ঋষভ কোনো কথা শুনল না। ও এক হ্যাঁচকা টানে ইয়াশফাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। তারপর ওর অভিমানী মুখটার দিকে তাকিয়ে নিজের ঠোঁটের কোণে সেই মুচকি হাসি ফুটিয়ে ওর বুকে গভীর একটা ভালোবাসার চুমু এঁকে দিল। ও অত্যন্ত নিচু আর নেশা জড়ানো স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল, “উমম… চুমু খেতে ইচ্ছে করছে আজ। একটু চুমু না দাও সাকুরা!”
এতোদিন ধরে মনের ভেতর জমিয়ে রাখা সবটুকু পাথর, সবটুকু জেদ আর রাগ যেন এই একটা চুমুর ছোঁয়ায় এক পলকে গলে জল হয়ে গেল। ইয়াশফা আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারল না। ও ঋষভের ব্ল্যাক শার্টটা দুই হাতে খামচে ধরে ওর বুকের মাঝে মুখ গুঁজে দিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। ঋষভও নিজের লম্বা, শক্ত বাহু দুটো দিয়ে নিজের গায়ের সাথে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল ইয়াশফাকে। ও ওর চুলে নিজের মুখ গুঁজে দিয়ে আকুল হয়ে বলল, “আর কোথাও যাবো না। কাঁদে না জানবাচ্চা!”
ইয়াশফা অবুঝ বাচ্চার মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে কেঁদে ঋষভকে এতদিনের সব কষ্টের নালিশ দিতে লাগল। আর ঋষভ কোনো কথা না বলে পরম আবেশে ওর চোখের পানি আর ঠোঁটের কোণের কান্নাগুলো নিজের ঠোঁট দিয়ে শুষে নিতে লাগল। দুনিয়ার সব পুরুষেরা ভালোবাসার চুমু দেওয়ার জন্য সাধারণত গাল, কপাল আর ঠোঁট বেছে নিলেও ঋষভের পছন্দ সবসময়ই একদম আলাদা। ওর প্রিয় জায়গা হলো ইয়াশফার পেট, বুক আর গলা এই তিনটা জায়গা। ও ইয়াশফার গলার ভাঁজে, ওর উন্মুক্ত বুকে আর পেটের ওপর নিজের ঠোঁট আর নাক ঘষে তৃপ্তিতে নিজের এতোদিনের জমে থাকা তৃষ্ণা মেটাতে লাগল। ইয়াশফা এবার আর বিন্দুমাত্র বাধা দিল না, ও চোখ বুজে অনুভব করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর ইয়াশফা একটু সোজা হয়ে ঋষভের মুখের দিকে তাকাল। ওর ভেজা চোখ দুটো পিটপিট করে বলল, “আপনি কি আপনার নিজের বাচ্চাকে একবারও কোলে নিবেন না? চলুন, ও ঘরে ঘুমিয়ে আছে।”
বাচ্চা শব্দটা কান পর্যন্ত পৌঁছানো মাত্রই ঋষভ এক সেকেন্ডের জন্য সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। ওর চোখ দুটো খুশিতে আর আবেগে চকচক করে উঠল। ও আর এক মুহূর্তও বারান্দায় দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করল না, একপ্রকার দৌড়েই চলে গেল ঘরের ভেতরের বেডরুমে।
বিছানার ওপর তখন শান্ত হয়ে শুয়ে আছে ওদের ২ বছরের পুচকে ইয়ান। ঋষভ খাটের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো মাত্রই ইয়ান ওর দিকে নিজের বড় বড় চোখ দুটো করে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ঋষভ নিজের ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটিয়ে সাবধানে নিজের দুই হাত বাড়িয়ে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল ইয়ানকে। ও ইয়ানকে নিজের চোখের সামনে উঁচুতে ধরে আবেগ জড়ানো গলায় বলল, “জুনিয়র ঋশ! কেমন আছো তুমি?”
ইয়ান নিজের দাঁতহীন মুখে খিলখিল করে হেসে উঠল! ঋষভ অবাক হয়ে গেল। ও ভালোবাসার পরশ এঁকে দিল ইয়ানের গালে। ও আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি পাপাকে দেখে হাসছো? তার মানে পাপাকে তুমি চেনো? পাপাকে ভালোবাসো তুমি?”
ইয়ান ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে আবারও খিলখিল করে করে হাসল। তারপর নিজের আধো আধো আর ভাঙা গলায় ওর দিকে হাত বাড়িয়ে বলে উঠল, “ইয়ু”
ছেলের মুখ থেকে এই একটা শব্দ শোনা মাত্রই ঋষভের বুকের ভেতরটা সুখে তোলপাড় হয়ে গেল। ও ইয়ানকে বুকে জড়িয়ে ধরে ওর কপালে আর গালে পাগলের মতো কয়েকটা চুমু দিল। তারপর ইয়াশফা যখন ঘরের ভেতর এসে দাঁড়াল, ঋষভ আলতো করে ইয়ানকে ইয়াশফার কোলের ওপর ফিরিয়ে দিল।
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩৭
ইয়াশফা ইয়ানকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে যেমনই চোখ তুলে তাকাল অমনি ও দেখল ওর সামনে কেউ নেই! ঘরের জানালার পর্দাগুলো ঠান্ডা বাতাসে উড়ছে, ঘরটা সুনসান হয়ে আছে। খাটের পাশে কোনো ব্ল্যাক শার্ট পরা ঋষভ দাঁড়িয়ে নেই। ও যা এতক্ষণ দেখছিল, যে স্পর্শ ও অনুভব করছিল তা আসলে কোনো বাস্তব ছিল না! তাহলে এতোক্ষণ ও নিজে নিজেই এসব বলছিলো? আল্লাহ রে মাথা গেছে মনে হয়
