Home obsession vs love obsession vs love part 24

obsession vs love part 24

obsession vs love part 24
নিরুর কল্পনারাজ্য

প্রায় বিকেলের দিকে ঐশীকে দেখতে আসছে পাত্রপক্ষ। অকস্মাৎ আয়োজন হলো এবারে। অধরা তৈয়ারির মাঝেই মির্জা বাড়ির মেঝো কন্যার পাত্রীদেখার ব্যবস্থা হচ্ছে। মালিহা বেগম অতি দ্রুত এসব করালেন। কেনো তা সবার অজানা। এমনকি তিনি আইয়ুশকে জানিয়েছেন দুপুরের দিকে। সকলকেই দুপুরের খাওয়ার সময় বলা হয়েছে পাত্রপক্ষের আসার কথা। আয়ুষ অফিস থেকে এসেছিলো। এরপর আর যায়নি। ঝিলিক ও দুপুরের দিকে চলে এসেছে। পাত্রপক্ষের আসার কথা ঘোষণা করার পরমুহূর্ত হতেই তিয়া-তোতার মাঝে অন্যরকম এক উদ্দীপনা দেখা গেলো। তিয়া গতকালের সেই ম্যাভিয়াস কেইভারের পেন্থ হাউজের ব্যাপারখানা মাথা হতে ঝেড়ে ফেললো। স্বাভাআিক হওয়ার তাগিদে সে বর্তমানে নিজেকে আবিষ্ট রাখার এক সচেতন সিদ্ধান্তে সে উপনীত হলো। তার অন্যতম কারণ হলো গতকাল সারাটাক্ষণ সে এসব ভেবেছে এবং নিজের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে। তাই আপাতত এসব দুঃস্বপ্ন ভেবে নিজেকে ধাতস্থ রাখার এক কঠিন প্রয়াস সে চালাচ্ছে। অবশ্য তারা তো বিশ্বাস-ই করতে পারলোনা যে তাদের আপুকে দেখতে আসা হচ্ছে। একইসাথে হতবাকতা এবং আনন্দের মিশ্র এক অনুভূতির সমারোহ তাদের মাঝে। বাড়ির বড় ছেলে এবং বড় মেয়ের বিয়েতে তারা মোটেই আনন্দ করতে পারেনি। এবার তাহলে নিশ্চয় তা ঘটছেনা। তারা দ্রুত নিজেদের রুম হতে তলপিতলপা গুছিয়ে ঐশীর রুমে স্থানান্তরিত হলো। ঐশীকে তৈরি করাতে হবে তাদের। কত কাজ! তাদের খুশির অন্ত রইলোনা। ঐশীর কক্ষে যেতেই তারা অবাক হলো। চোয়াল ঝুলে পড়লো বিস্ময়তায়। ঐশী বেলকনিতে বসে। যাকে আজ দেখতে আসা হচ্ছে তার খবর নেই? বাহ! তারা গুটিগুটি পায়ে তার কাছে পৌঁছালো। কাছে পৌঁছাতেই বিস্মিত হয়ে শুধালো,

— আপু, তুমি এখানে কেনো?
ঐশী চমকালো। সে মোটেই এসময় তাদের আশা করেনি। সে তো ডুবে ছিলো সকালে বলা নির্ঝরের কঠোর সব বাক্যে। তাদের দেখেই সে নিজের বিষন্নতা লুকোলো। জবাবে ম্লান কন্ঠে বললো,
— এমনিই বসেছি। কিছু বলবি তোরা?
তিয়া বললো,
— কিছু বলবো মানে?
তোতা মাঝে বাধ সাধলো,
— যাহ-বাবা! তুমি পাত্রী, তোমার জন্য আমাদের ঘুম হারাম হয়ে পড়েছে আর তুমিই কি-না বলছো কিছু বলবো কি-না?
ঐশীর যেনো হুশ ফিরলো। সে আনমনে চেয়ে প্রশ্ন করলো ক্ষণিক থমকে,
— হু? পাত্রী?
তিয়া জবাব দিলো তার,
— জ্বী, পাত্রী। মহারাণী যেনো আজই জন্মেছে। ওদিকে বড়আম্মু আয়োজন করে মরছে আর এদিকে তিনি নিজের দেখতে আসার কথা ভুলেছে। এখন চলো তো, সাজবে চলো। আমাদের হবু দুলাভাই যেনো একদম অজ্ঞান হয়ে যায় তোমায় দেখে।

ঐশীর অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। সে অন্যকারো জন্য বউ সাজবে? যাকে সে ভালোবেসেছে তাকে কী পাওয়ার নয় এজনমে? অন্তত সে কী কখনো ঐশীকে মুখ ফুঁটে ভালোবাসি বলবে না? ঐশী তো জানতো এমন কিছুই হবে। তবে এখন কেনো তার এতোটা খারাপ লাগছে?তার এসব ভাবনার মাঝে সেখানে ঝিলিক এসে উপস্থিত হলো। ঝিলিক আসামাত্রই তাদের তিনজনের নজর সরে ঝিলিকের পানে গেলো। হাস্যোজ্জ্বল ঝিলিককে দেখে তিয়া-তোতা তার পানে চেয়ে হাসলো। ঐশী বোকার মতো চেয়ে রইলো তার পানে। তার এসবে আগ্রহ নেই। ঝিলিক এসেই নিজের আপুর কাছে গেলো। মাত্র ফ্রেশ হয়ে এসেছে সে। ফর্সা ত্বকে গাঢ় লাল রঙা এক টু-পিস জড়িয়েছে। সাথে ওড়না। লাল-কমলার মিশেলের কুন্তলবৃন্দ বেণুনি করে গুছিয়ে বেধেছে। তার আগমনের সাথে সাথেই অন্যরকম এক মেয়েলি সুবাসে ভরপুর হয়ে উঠেছে সম্পূর্ণ কক্ষ। ঐশীর নৈকট্যে পৌঁছাতেই একগাল হাসলো সে। বললো,

— কংগ্রেচুলেশন মেঝো আপু, ফিলিংস কেমন হু?
ঐশীর আদলে অনুভূতির ছিটেফোঁটাও দেখা গেলোনা।
সে কেমন মনমরা হয়ে চেয়ে। আচ্ছা, যারা প্রকাশ করতে পারেনা নিজেেদর তাদের ভাগ্য সবসময় এমন কেনো হয়? কেনো তারা মনের কথা খুলে বলতে শিখে না? হতাশাগ্রস্থ বিষাদী রমণী ঐশী মস্তিষ্ক ফেঁটে পড়ছে এমন নানা চিন্তার সমাহারে। ঝিলিক ক্ষণিক থমকে পর্যবেক্ষণ করে নিলো তাকে। শুধালো,
— কী হয়েছে আপু? তোমার মুখটা শুকিয়ে গিয়েছে যে? তুমি কী খুশি নও?
ঐশী থমথমে চোখে চায়– কুঁচকানো কপালে চেয়ে থাকা ঝিলিকের পানে। সে এখন কী করে তাকে বলবে যে সে কাওকে ভালোবাসে? যাকে ভালোবাসে সে এই বংশের-ই পুত্র! তাচ্ছিল্যে হাসলো রমণী। নিজের ভাগ্যের ওপর-ই বোধহয়। মা-টা যে কেনো এভাবে উঠে পড়ে লেগেছে কে জানে! কীই-বা তার চিন্তা-ভাবনা? ঐশী দুপাশে মাথা নাড়ে। নিম্নস্বরে জবাব দেয়,

— কিছু না!
ঝিলিক অবশ্য খেয়াল করলো তার আদলের উদাসীন; খামখেয়ালি ভাবটুকু। অবশেষে, সেও এমন পরিস্থিতে ছিলো। দুঃখ লুকোনোর অন্যতম সহজ এবং সুন্দর উপায় হলো হাসি। এমুহূর্তে ঐশী কী এই পদ্ধতি অবলম্বন করছে কি-না বোঝা গেলোনা সঠিক। তবে ঝিলিকের মনে খটকাটুকু ঠিক জেগেছে। তিয়া-তোতা ঐশীকে নিয়ে তৈরী করতে বসালো। ঐশী যান্ত্রিক কোনো রোবোটের ন্যায় ড্রেসিং টেবিলের সম্মুখে বসে।
নিজেকে ধাতস্থ রাখার আপ্রাণ প্রচেষ্টায় লিপ্ত সে। আইয়ুশের ন্যায় এই ক্ষমতার এক অজেয় অধিকারী সে। দুই-ভাইবোনের মাঝে কারও চোখ-মুখ দেখে তাদের মনের অবস্থা কেওই ধরতে পারেনা। তোতা ভালো মেকআপ জানে। বাহির থেকে কাওকে আনানো হলোনা এতো তাড়াহুড়োর মাঝে। সে বেশ দক্ষতার সহিত ঐশীকে সাজাতে আরম্ভ করলো। ঝিলিক বসে বসে তা দেখলো। তিয়া ঝিলিকের পাশে গিয়ে বসলো। বেডসাইড টেবিল থেকে আপেল তুলে তাতে কামড় বসাতে বসাতে ঐশীর পানে চেয়ে প্রশ্ন ছুড়লো,
— আচ্ছা আপু, বড়মা আমাদের কিন্তু জিজুর নাম-ধাম কিছুই জানায়নি। এতো তাড়াহুড়ো..তোমার আবার প্রেমের বিয়ে নয়তো?
ঐশী আয়নায় জ্বলজ্বল করতে থাকা তিয়ার হাস্যরত অবয়বের পানে নজর নিবিষ্ট করলো। প্রেম আর তাও ঐশী? যাকে প্রেম দিয়েছে সে-ইতো পরিবর্তে দিয়েছে বিষ-বেদনা। সেখানে আবার প্রেম! জবাবে সে ভীষণ শীতল কন্ঠে জবাব দিলো,

— মা যেমন তোকে জানায়নি তেমন আমিও জানিনা।
তিয়া হতবাক হলো। বললো,
— আসলেই?
ঐশী ফিরতি জবাবে কিছু বললো না। তোতা তাদের কথোপকথনে যোগ দিলো,
— আরে চুপ কর তো! আমার ডিস্টার্ব হচ্ছে। চারটার দিকে মেহমান সব চলে আসবে। এখন চুপ থাক।
তিয়া তোতার ধমকে চুপসে যায়। বিরক্তির প্রলেপ লেগে যায় সম্পূর্ণ আদলজুড়ে। ঝিলিক তাদের ঝগড়া দেখছে বসে বসে। তার বুঝে আসছেনা হুটহাট বড়আম্মু এমন অপ্রস্তুত এক আয়োজনের মাঝে এতো তাড়াহুড়োয় কেনো ঐশী কে বিয়ে দিতে চায়ছে। ঝিলিক ঐশীর দিকে তাকালো। বরাবরের ন্যায় আদলে কোনো অনুভূতি নেই। ঝিলিকের খটকা লাগলো কোথাও। ঝিলিক উঠে গেলো। বললো,
— তোমরা বসো, আমি একটু আসছি।
— চলে যাবি?
তিয়া শুধালো,
— হ্যাঁ, কাজ আছে একটু। তোমরা থাকো।

ঝিলিক বেরিয়ে আসলো। করিডোর বেয়ে নিজের রুমের দিকে আগালো। হাত ঘরিতে সে চোখ বোলালো। বিকেল প্রায় সারে তিনটে বাজে। তার কয়েকটা মেডিসিন ও বাকি। দ্রুতপায়ে নিজের রুমে গিয়ে দরজা হাতল টেনে দরজা আবজে দেয় রমণী। ধীরলয়ে বেডসাইড টেবিল হতে একটি ওষুধ বের করে। অতঃপর পানি খেয়ে ওষুধটি মুখে চালান করতেই তা নিমিষেই মিশে গেলো শরীরের সাথে। এবার তার শরীর নরম মেট্রোসের বিছানায় গিয়ে বসলো। হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে শুয়ে সে ধীরে সুস্থে তার ইয়ারবাডস বের করলো। কানের মাঝে গুঁজে অন করতেই তা কানেক্টেড হয়ে গেলো রমণীর দামী ফোনের সহিত। সে ফোন হাতে তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো এক গম্ভীর পুরুষের গলা। ঝিলিকের কর্ণকুহরে তা যেতেই অস্বাভাবিক কাঠিন্যতায় ছেয়ে গেলো রমণীর কন্ঠস্বর। গম্ভীর; শীতল এবং কঠোর স্বরে সে বুলি ছুঁড়লো,
— ইয়েস, হোয়াট ইজ দ্যা নেক্সট মিশন?
ইজ ইট? ওকে ফাইন। আ’ল কল ইয়্যু লেটার!
অতঃপর কল কেটে যায়। ঝিলিক নামক রহস্যে ঘেরা রমণীটির ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে ক্রুর হাসি।

নিচে সকলে আয়োজনে ব্যস্ত। আশেপাশে নানা জায়গায় বিভিন্ন রকমের লাইট দিয়ে সাজানো। মির্জা পরিবার চায় তাদের পরিবারের আভিজাত্য যেনো পাত্রপক্ষের মনের খাচায় দাগ কাটে। অপরপাশে আয়ুষ, যে-কিনা এই মুহূর্তে মায়ের সাথে কথা বলায় ব্যস্ত,
— আম্মু, হঠাৎ এসবের মানে কী?
মালিহা বেগম তার বিছানা গোছাতে গোছাতে জবাব দিলেন,
— কোনসব?
আয়ুষের গম্ভীর স্বর,
— তুমি জানোনা কোনসব? ঐশীকে দেখতে আসছে অথচ আমিই জানিনা? কেনো?
মালিহা বেগমের স্বাভাবিক স্বর,
— আরে, ওর সাথে আমার কথা হয়েছে। তোর বাবার বন্ধুর ছেলো ও। দেশে এসেছে আজই। ফোন করে বললো দেখতে আসবে, আমি আপত্তি করিনি। অমন সোনার টুকরো ছেলেকে হাতছাড়া করে লাভ আছে? ভালো ব্যাকরাউন্ড, উচ্চ-বংশীয় ফ্যামিলি।
— ও মতামত দিয়েছে?
— না দেওয়ার কী আছে? ছেলে দেখতে বেশ ভালোই।

আয়ুষের বিরক্তির মাত্রা বাড়ে। কেনো যেনো তার মন মানছেনা। কেবলই মনে হচ্ছে, এই সিদ্ধান্ত বোধহয় তার বোনের জন্য সঠিক নয়। তার সরাসরি ঐশীর সাথে কথা বলা উচিত। সে বেরিয়ে আসে। ততক্ষণে পাত্রপক্ষ চলে এসেছে। সাঁঝ এবং বাড়ির বড়রা মিলে তাদের আপ্যায়নে ব্যস্ত। সে নিজেকে ধাতস্থ করলো। তবে আদল হতে গম্ভীরতার ছায়া হারালো না। সে এগিয়ে যায় ওপরে যাওয়া উদ্দেশ্যে। তবে থামতে হয় তার সাঁঝের ডাকে। যার মোলায়েম কন্ঠ তার পানে,
— এই, শুনুন না! কোথাও যাচ্ছেন কী? অতিথিরা এসেছে। আপনি বাড়ির বড় ছেলে। আব্বুদের সাথে গিয়ে বসুন। নাহলে বিষয়টা বেমানা লাগবে। তাছাড়া, বড় আব্বু আপনার খোঁজ করছিলো।
আয়ুষ থমকায়। একবার মেহমানদের পানে তাকিয়ে কী যেনো ভাবলো। অতঃপর গিয়ে বাপ-চাচাদের সাথে গিয়ে সোফায় বসলো। সেখানে পাত্রপক্ষ হিসেবে কেবল তিনজন উপস্থিত হয়েছে। পাত্রের মা-বাবা এবং পাত্র। আর বাড়তি কোনো লোকজন নেই। আইয়ুশ গিয়ে বসতেই পাত্রের বাবা অর্থাৎ আহনাফ শিকদারের বাবা; শিল্পবতী আহমেদ শিকদার হাস্যরত মুখে শুধালেন,
— তুমি আয়ুষ না? মির্জা গ্রুপের সিইও?
— জ্বী, আমি আয়ুষ মির্জা।

ততক্ষণে তিয়া-তোতা-ঝিলিক ঐশীকে নিয়ে নামছে। উপস্থিত সভাতে নির্ঝরও উপস্থিত। সে আপাতত মা-চাচীদের সাথে হাতেহাতে কিছু কাজ এগিয়ে দিচ্ছে। তার আদলজুড়ে অন্যরকম এক উদ্দীপনার ছোঁয়া। যেনো সে নিজের বোনেরই উৎসবের আয়োজন করছে। সিঁড়ি বেয়ে বউ সেজে নামতে থাকা ঐশীর নজর গিয়ে ঠেকলো তার ওপর। ঘর্মাক্ত চেহারা; কর্মঠ নির্ঝর! তার শখের পুরুষ। কী স্বাচ্ছন্দ্যে তার কাফনের ব্যবস্থা করে যাচ্ছে। অন্যমনষ্ক হয়ে সে চেয়ে রইলো সেদিকপানেই। তার বক্ষস্থল ফাঁকা হয়ে এলো। অথচ আদলে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন নেই অনুভূতির। দুই-ভাই বোন যেনো একে অপরের পরিপূরক। তীব্র কষ্টেও যাদের মন ভাঙে তবু মুখ ফোটে না। শাড়ি পড়েছে সে। মাথায় ঘোমটাও দিয়েছে। তবে অন্যকারও জন্য। হুট করেই নির্ঝরের ব্যস্ত নজর এসে ঐশীর ওপর পড়লো। একমুহূর্তের জন্যতাদের দৃষ্টিমিলন ঘটলো। অথচ পরক্ষণেই পাষাণের ন্যায় দৃষ্টি ফেরালো ঐশী। অন্যান্য সময় নির্ঝর তার পানে চেয়ে অন্তত হাসে। অথচ এখন! তার ভাবনার মাঝেই ডাক পড়ে তার,

— মেঝো আপু, ওই দেখো তোমার ফিয়ন্সে।
ঝিলিক তাদের পেছনে। সে ধীরলয়ে আসছে। পরণে তার একটি কালো রঙা পাকিস্তানি থ্রি-পিস। লম্বা-ঘন জিঞ্জার রঙা চুলগুলো বরাবরের ন্যায় বেণুনিতে বাধা। আদলে তার বিন্দুমাত্র হাসির লেশ নেই। আছে কেবল নির্লিপ্ততা এবং তীক্ষ্ণতা। ঐশীকে নিয়ে বসানো হলো পাত্রপক্ষের সম্মুখে। আহনাফ—দেখতে বড্ড সুন্দর। ডিসেন্ট পুরুষ; সর্বেসর্বা। অথচ ঐশীর তার প্রতি একবিন্দুও আকর্ষণ জন্মায় না। অথচ সেই পুরুষটির নির্লিপ্ত দৃষ্টি তার ওপরেই। ঐশী আসতেই তাকে আলাদা সোফায় বসানো হলো। আয়ুষ নিজের ছোট বোনটাকে আগা-গোড়া পর্যবেক্ষণ করলো। বোঝার চেষ্টা করলো–মেয়েটার মনে কী চলছে। ঐশীকে দেখে আহনাফের মা মুখ খুললেন। বললেন,

— ঐশী! কত বড় হয়ে গিয়েছে। তখন এ’বাড়িতে আসলে দেখতাম–কেমন ছোট ছোট ফ্রগ গায়ে ঘুরতো সারা বাড়ি। আহনাফের সাথে সে-কী ভাব ছিলো। ভাগ্য দেখো। সেই আহনাফের-ই বউ হতে চলেছে বাচ্চাটা।
বড়রা হেসে উঠলো। ওসমান মির্জা বললেন,
— হ্যাঁ, একদম ঠিক বলেছেন ভাবি। ভাগ্য সত্যিই কখন কার সাথে কী করে বলা যায়না।
সাঁঝ এসে তাদের নাস্তা এনে দিলো। গোলাপি রঙা শাড়িতে তাকে কোনো রাজকুমারীর চেয়ে কম সুন্দর মনে হলোনা। অস্বাভাবিক সুন্দর। গালদুটো লাল হয়ে রয়েছে। পাত্রের মা চিনতে না পেরে শুধায়,
— এটা..এটা কী আমাদের সাঁঝ?
সাঁঝের পরিবর্তে শাহদাদ মির্জা জবাব দিলেন,
— হ্যাঁ, ও সাঁঝ ই। আমার বড় মেয়ে।
— ওমা, তাই নাকি? কত বড় হয়ে গিয়েছে ও!
সাঁঝ মিষ্টি হাসলো। মহিলাটি এবার আয়ুষের নিকট প্রশ্ন ছুড়লেন,
— শুনেছি আয়ুষ নাকি বিয়ে করেছো? তা তোমার ওয়াইফের নাম কী আয়ুষ
আয়ুষ থমকে গেলো। গম্ভীর আদল আরও খানিকটা কাঠিন্যতায় ছেয়ে গেলো। বিচলিত মন তার একটাবার ফিরে চায়লো ঝিলিকের পানে। ঝিলিক সকলের পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে। মেয়েটা যে কেনো দাঁড়িয়ে রয়েছে! এই মুহূর্তে সে কঠোর ভঙ্গিমায় অন্যপাশ ফিরে। আইয়ুশ না চাইতেও অনুভূতির দাবানলে পিষ্ঠ হয়ে চোয়াল শক্ত করে উত্তর দিলো,

— সাঁঝ..সাঁঝ মির্জা।
আয়ুষের উত্তরে ঝিলিকের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো বক্র হাসি। সে বোধহয় এমন উত্তর-ই আশা করছিলো। অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে এসবে তার মোটেই আগ্রহ নেই। সে আয়ুষের পানে চায়লো। যার চেহারা এখন বিরক্তি এবং শিথিলতায় ভরপুর। ঝিলিক এটা অন্তত বুঝেছে–যে হয়তো কোথাও না কোথাও আয়ুষ এসব নিজ ইচ্ছায় করছেনা। তবে কেনো করছে এবং ঝিলিকের সন্দেহ সত্যিই সঠিক কি-না তা তো ঝিলিক আয়ুষের মুখ থেকেই শুনবে। আর তার জন্য এক এবং একমাত্র অস্ত্র হবে’….’ [আপনারাই গেস করুন। হেহে।]
ভাবনার মাঝেই তার ডাক পড়লো,
— এটা..এটা কে?
ঝিলিকের পানে চেয়ে আহনাফের মা শুধালো। ঝিলিক কারও অপেক্ষা না করে নিজেই উত্তর দিলো,
— আমি ঝিলিক মির্জা। ডটার অব শাহদাদ মির্জা।
তিনি হেসে উঠলেন। অতঃপর আরও বহু বহু আলাপ চললো তাদের মাঝে। নির্ঝর সেখানেই বসে। তার মুখে একবিন্দুও অনুশোচনা অথবা অনুভূতির লেশমাত্র নেই। উটে তার মনে হলো-এসব যত দ্রুত শেষহবে ততই মঙ্গল। কেননা ঐশী এবং তার মাঝে যে অস্বস্তিকর এক পরিবেশ গড়ে উঠেছে তার সমাপ্তি সে টানতে চায়।তাদের কথোপকথনের মাঝেই বেল বাজলো। সকলের মনোযোগ সেদিকটাতেই আকৃষ্ট হলো। তারা সকলে কথা বলছিলো। তা দেখে তিয়া বললো,

— আমি যাচ্ছি!
তিয়া এক দৌড়ে গিয়ে সদর দরজাখানা খুলে দিলো। বাহির থেকে তখন সায়ন এলো। কানে ফোন এবং হাতে ব্লেজার নিয়ে। সে তিয়ার পানে চায়লো অব্দি না। দ্রুততায় ভেতরে ঢুকে গেলো। যেনো তার কোনো গুরুত্বপূর্ণ এক কার্য সম্পন্ন করা বাকি। সে সোজা এসে তার কক্ষের দিকে চলে গেলো। আহনাফের বাবা আহমেদ শিকদার শুধালেন,
— ও কে?
ওসমান মির্জা জবাব দিলেন,
— ও..ও হলো আমার এক বন্ধুর ছেলে। সায়ন। দেশে এসেছে কিছুদিন হলো। চলে যাবে কিছুদিন পর। তাই আমাদের বাড়িতে এসে উঠেছে।
— আচ্ছা? তাই তো আমি চিনতে পারলাম না।

obsession vs love part 23

তিয়া তখন সদর দরজা বন্ধ করার তোড়জোড় চালাচ্ছিলো। তখুনি আচমকা স্লিপ করলো তার পা জোড়া। পায়ের সাথে পা লেগে উবু হয়ে পড়তে চায়লো তার শরীর। তবে, তার আগেই শক্ত এক পুরুষালি হাত এসে ঝাপ্টে ধরে ফেললো তাকে। তিয়া চোখমুখ খিঁচে বুজে ফেললো। অথচ পরক্ষণেই তার চোখদুটো মেলে গেলো অজানা এক শিহরণে। কারও পুরুষালি হাতের শক্ত স্পর্শে। ধপাস করে চোখ মেললো সে। চোখ মেলা মাত্রই যাকে সে দেখলো তার জন্য মোটেই তার কায়া প্রস্তুত ছিলোনা। ম্যাভিয়াস কেইভার? সেই খুনী, মাফিা টা? চেহারায় সে কী গাম্ভীর্যতা! চোয়াল শক্ত। সাথে, সাথে ভ্রু দু’খান পরিপূর্ণ শিথিল। তিয়া তাকে দেখে ঘাবড়ালো। এতোটাই যে, পরমুহূর্তেই জ্ঞান হারালো সেখানে। তা দেখে এতোক্ষণের গম্ভীর এবং সর্বদা না হাসা পুরুষ, রুশদী মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনালের ডানহাত— নিকোলাসের ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুঁটে উঠলো!

obsession vs love part 24 (2)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here