প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না
এদিকে রিত্তিকা বাড়ি ফিরে ক্লান্ত হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। বাইরে প্রচণ্ড গরম, গ্রীষ্মের প্রখর রোদ চারদিকে যেন খাঁ খাঁ করছে। এই তপ্ত রোদে পুড়ে বাড়ি ফিরতে গিয়ে সে একেবারে নেতিয়ে পড়েছে, পুরো শরীর ঘামে ভিজে একাকার।
রিত্তিকার মনে হচ্ছিল ফ্যানের বাতাসও যেন তার গায়ে লাগছে না, চারিদিকের বাতাসও যেন উত্তপ্ত। তাই আর শুয়ে না থেকে কাবার্ড থেকে জামাকাপড় বের করে সে সোজা শাওয়ার নিতে গেল। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ঝরনার নিচে দাঁড়িয়ে মনমতো শাওয়ার নিল রিত্তিকা।
শাওয়ার নেওয়ার পর শরীর ও মনে এক অদ্ভুত শান্তি নেমে এল। সে মনে মনে ভাবল, “উফ! বাইরে যা গরম রে ভাই! প্রতিদিন এমন গরম পড়লে তো আমি দ্রুত চান্দে চলে যাবো!”
বাথরুম থেকে বের হয়ে রিত্তিকা আবার বিছানায় গা এলিয়ে দিল। তারপর কখন যে সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল, তা নিজেও টের পেল না।
কিছুক্ষণ পর রিত্তিকার মা শানজাদা ইসলাম তাকে খাওয়ার জন্য ডাকতে এলেন। কিন্তু মেয়েকে অমন শান্তিতে ঘুমাতে দেখে আর ডাকলেন না,চলে গেলেন।
যখন রিত্তিকার ঘুম ভাঙল, তখন ঘড়িতে রাত ৯টা বাজে। চোখের পাতায় তখনও ঘুমের ঘোর লেগে আছে। আচমকাই তার মাথায় খেলে গেল সেই ‘ডেয়ার’-এর কথা! সেই অচেনা ব্যক্তিটি কি কোনো রিপ্লাই দিল? কৌতুহল সামলাতে না পেরে সে তড়িঘড়ি করে ফোনটা হাতে নিল।
হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকতেই চ্যাটলিস্টের ওপরের নম্বরটা দেখে রিত্তিকার হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ভয়ে তার চোখ জোড়া চড়কগাছ! কোটর থেকে যেন চোখ দুটো বের হয়ে আসার উপক্রম হলো।
”আল্লাহ! এ আমি কী করে ফেললাম!”— রিত্তিকা নিজের কপালে হাত দিল। “এ তো আমাদের ভার্সিটির খরগোশ মার্কা রাগী প্রফেসর জিয়ান স্যার! অচেনা নম্বরে মেসেজ পাঠাতে গিয়ে ভুল করে ওনার নম্বরে পাঠিয়ে দিয়েছি? উনি যদি জানতে পারেন এটা আমি, তাহলে তো আমি শেষ..!
ভয়ে কিছুক্ষণ হাত-পা কাঁপলেও, হঠাৎ করেই রিত্তিকার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল।
সে মনে মনে ভাবল, “ধুর! উনি জানবেনই বা কী করে এটা আমার নম্বর? আর সেদিন ক্লাসে মাত্র পাঁচ মিনিট দেরি করে ঢোকার জন্য আমাকে সবার সামনে কেমন বাঘের মতো বকেছিলেন! আরে, আমি কি ইচ্ছা করে দেরি করেছিলাম? প্রতিশোধ নেওয়ার এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর হয় না। মেসেজ যখন দিয়েই ফেলেছি, তখন আরেকটু জ্বালিয়ে নেওয়া যাক… হি হি!”
রিত্তিকা খিলখিল করে হেসে আবার জিয়ানকে মেসেজ পাঠাল—
“আমি আপনার নাদুসনুদুস বাচ্চার একমাত্র মা হতে চাই।”
মেসেজটা পাঠিয়ে রিত্তিকা শ্বাস বন্ধ করে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবল, দেখি না স্যার এবার কী করেন! কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ পার হলেও মেসেজটি ‘সিন’ হলো না। রিত্তিকা হতাশ হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠতে যাবে, ঠিক তখনই ফোনের নোটিফিকেশন টিউনটা বেজে উঠল।
রিত্তিকা প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে জিয়ানের রিপ্লাই জ্বলজ্বল করছে।
জিয়ান লিখেছে:
“আপনি কয়টা বাচ্চা নিতে পারবেন জানেমান? আমার কিন্তু আবার তিন ডজন বাচ্চা নেওয়ার ইচ্ছা। পারবেন তো আমাকে এতো বার সামলাতে..?
মেসেজটা পড়ার সাথে সাথে রিত্তিকা ভারসাম্য হারিয়ে ধপাস করে বিছানা থেকে মেঝেতে পড়ে গেল! সে যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। ক্লাসের সেই গম্ভীর, রাশভারী, খরগোশ মার্কা আর এক চুল ছাড় না দেওয়া প্রফেসর জিয়ান কায়সার এমন ঠোঁট কাটা কথা বলছে। রিত্তিকার অবাক হওয়ার সীমা তখন চরমে পৌঁছে গেছে!
ঠিক তখনই রিত্তিকার রুমে তার বড় ভাই ইফাত ইসলাম এসে ঢুকল। মেঝেতে বসে থাকা রিত্তিকাকে দেখে অবাক হয়ে বলল, “কীরে রিত্তি? নিচে বসে আছিস কেন? ঘুম ভেঙেছে তোর?”
রিত্তিকা তাড়াহুড়ো করে ফোনটা লুকিয়ে বিছানায় উঠে বসল। মুখে জোরপূর্বক একটা হাসি টেনে বলল, “হ্যাঁ ভাইয়া, এইতো মাত্র ভাঙল।”
ইফাত বোনের পাশে এসে বসল, “তা নতুন ভার্সিটি কেমন লাগছে তোর? নতুন কোনো ফ্রেন্ড হয়েছে?”
”হ্যাঁ ভাইয়া, বেশ ভালো লাগছে। আর জানো, একটা নতুন ফ্রেন্ডও হয়েছে আমার। মেয়েটা খুব ভালো, একদম আমার মনের মতো!” রিত্তিকা বেশ উৎসাহ নিয়ে বলল।
”বাহ, ভালো। তা প্রফেসররা কেমন? একটা কথা মাথায় রাখিস, ওনারা কিন্তু সম্মানী ব্যক্তি। ওনাদের সাথে কখনো কোনো রকম খারাপ ব্যবহার বা তড়বড়ে স্বভাব দেখাবি না, বুঝেছিস?” ইফতি একটু গুরুগম্ভীর গলায় বলল।
“হুম…!”
ইফাত তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “দুপুরে ভার্সিটি থেকে এসে খাবার খেয়েছিলি?”
রিত্তিকা মাথা নেড়ে বলল, “না ভাইয়া, এসে এত ক্লান্ত লাগছিল যে ফ্রেশ হয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।”
”নিজের শরীরের একটু খেয়াল রাখিস। আর হ্যাঁ, ভার্সিটিতে কিন্তু বেশি দুষ্টুমি করিস না। কলেজ লাইফে তোর নামে কতশত নালিশ এসেছে মনে আছে? ভার্সিটি থেকে যেন এমন কোনো নালিশ বাসায় না আসে!”
রিত্তিকা নিষ্পাপ মুখ করে বলল, “হ্যাঁ… ভাইয়া, তুমি একদম চিন্তা করো না। আমি এবার কিচ্ছুটি করব না, একদম লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থাকব!”
ইফাত মৃদু হেসে বলল, “তোকে সব দিক থেকে বিশ্বাস করলেও, এই এক দিক থেকে তোকে মোটেও বিশ্বাস করি না রে বোন। তুই যত বলিস দুষ্টুমি করবি না, তত বেশি করে করিস। যাই হোক, চল এখন নিচে চল, খেতে যাবি।”
রিত্তিকা খিলখিল করে হেসে উঠল, “হি… হি…! চলো ভাইয়া।”
এই বলে রিত্তিকা তার ভাইয়ের সাথে ড্রয়িংরুমের দিকে চলে গেল।
অন্যদিকে, নিজের ঘরে বসে জিয়ান বাঁকা হেঁসে বলে…
“তোকে যদি একবার খুঁজে পাই রে জানেমান! তোর আমার নাদুসনুদুস বাচ্চার মা হওয়ার শখ আমি এমনভাবে মেটাব যে বাচ্চার নাম শুনলেই তোর জ্বর আসবে! খালি একবার হাতের কাছে পাই তোকে।
কত বড় বদজাত আর বেয়াদব মেয়ে হলে একটা অপরিচিত ছেলেকে এসব আজেবাজে কথা বলে!”
ঠিক তখনই জিয়ানের ছোট বোন জিয়া রুমে ঢুকে তাকে খেতে ডাকার জন্য ডাকল, “ভাইয়া, চলো খেতে যাবে।”
জিয়ান বোনের দিকে তাকিয়ে নিজের রাগটা কিছুটা সামলে নিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “তোর শরীর এখন ঠিক আছে রে জিয়া..?”
জিয়া হাসিমুখে বলল, “হ্যাঁ ভাইয়া, ওষুধ খাওয়ার পর এখন আগে থেকে অনেক বেটার ফিল করছি।”
”তাহলে কাল থেকে নিয়মিত ভার্সিটি যাস। নতুন পরিবেশ, শুরুতে বেশি ক্লাস মিস দেওয়া একদম উচিত হবে না।”
জিয়াও এবার জিয়ানের ভার্সিটিতেই ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছে।
তারপর জিয়ান আর জিয়া—দুই ভাইবোন নিচে খেতে চলে গেল। ডাইনিং টেবিলে বাড়ির সবাই ততক্ষণে উপস্থিত।
জিয়ানের ছোট চাচা আজমল কায়সার জিয়ানকে দেখে বললেন, “কী রে জিয়ান, এত দেরি করে আসলি যে জিয়াকে পাঠাতে হলো তোকে ডাকতে? কোনো সমস্যা?”
প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১
জিয়ান চেয়ার টেনে বসতে বসতে স্বাভাবিক গলায় বলল, “না চাচ্চু তেমন কিছু না। ভার্সিটির কিছু জরুরি অফিশিয়াল কাজ আটকে ছিল, ল্যাপটপে ওগুলোই চেক করছিলাম। তাই একটু দেরি হয়ে গেল।”
পরিবারের সবাই মিলে একসাথে গল্প করতে করতে রাতের খাওয়া শুরু করলেন। খাওয়া-দাওয়ার মাঝখানেই জিয়ানের বাবা নওশাদ কায়সার জিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “জিয়ান, কাল ভার্সিটির ক্লাস শেষ করে তুমি একটু আমাদের অফিসে এসো। ওখানে একটা জরুরি মিটিং আছে, যেখানে তোমার থাকাটা দরকার।”
জিয়ান মাথা নেড়ে বিনীতভাবে বলল, “আচ্ছা বাবা, আমি সময়মতো অফিসে পৌঁছে যাব, তুমি চিন্তা করো না।
