প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৪
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না
রিত্তিকা ভাইয়ের কথা শুনে মুখ ভেংচালো।
“ধুর, ভালো লাগে না! আমি কি এতটা খারাপ নাকি? থাকব না আর এখানে,”—বলেই রিত্তিকা নিজের ঘরের দিকে হনহন করে চলে গেল।
“কেন তুই মেয়েটার পেছনে লাগিস ইফাত?” ওর মা রান্নাঘর থেকে ধমক দিয়ে বলল।
“আরে মা, আমি তো জাস্ট মজা করছিলাম। ও যে এমন সিরিয়াসলি রাগ করবে বুঝিনি। যাই হোক, আমিও গেলাম,” ইফাত হাসতে হাসতে বলল।
রিত্তিকা ঘরে এসে ধপাস করে বিছানায় বসলো। দেখল অপর দিক থেকে কোনো মেসেজ এসেছে কিনা। নাহ, কোনো মেসেজ আসেনি দেখে ও একদম হতাশ হয়ে গেল। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হলো তার। তারপর সে নিজেই একটা গানের লাইন লিখে মেসেজ বক্সে সেন্ড করে দিল:
Ho teri nazron ne kuchh aisa jadoo kiya
Lut gaye hum to pehli mulakaat mein…!
কিন্তু অপর দিক থেকে মেসেজটা শুধু ‘সিনই হলো, কোনো রিপ্লাই আর আসল না। এটা দেখে রিত্তিকা মুখ ভেংচি কাটলো, তারপর ঘুমিয়ে পড়ল।
রিত্তিকার আজ কলেজে আসতে দেরি হয়ে গিয়েছে। গেট দিয়ে ঢোকার সময় ও বারবার ঘড়ি দেখছিল আর দৌড়াচ্ছিল।
‘আল্লাহ! আমার ভাগ্য ভালো যে ওই খরগোশ মার্কা স্যারের ক্লাস প্রথমে নেই। নাহলে গেটেই আটকে বলত—এতো দেরি কেন হলো? যাও, আমার ক্লাস করা লাগবে না!’—মনে মনে স্যারের নকল করে আওড়ালো সে।
রিত্তিকা ক্লাসে ঢুকে দেখল ওর বান্ধবীরা ওর জন্যই জায়গা রেখে দিয়েছে। ও হাঁপাতে হাঁপাতে আনুশা, নিহারিকা আর জিয়ার সাথে গিয়ে বসল।
“জিয়া, তোর শরীর এখন কেমন আছে রে?” রিত্তিকা ব্যাগটা বেঞ্চে রেখে জিজ্ঞেস করল।
“আলহামদুলিল্লাহ, এখন অনেক ভালো আছি,” জিয়া হাসিমুখে বলল।
“আনিকা আসেনি আজ?” নিহারিকা চারপাশ তাকিয়ে জানতে চাইল।
“ওও… বাঁচা গেল! ও থাকলে ক্লাসে কানের কাছে বকবক করতেই থাকত।”
তারপর প্রথম ক্লাস শেষে সব আবার গল্প শুরু করলো।
এবার সবাই চুপ কর রে প্রফেসর জিয়ান কায়সারের ক্লাস এখন, ২য় পিরিয়ড শুরু হচ্ছে,” আনুশা বললো।
“হ্যাঁ, সবাই চুপ থাকায় ভালো,” জিয়া বললো।
প্রফেসর জিয়ান ক্লাসে প্রবেশ করলো। সবাই তাকে একসাথে সালাম দিল। তিনিও উত্তর দিল।
ডেস্কের ওপর ডায়েরিটা রেখে জিয়ান পুরো ক্লাসের ওপর একবার চোখ বোলালেন। তার কিছুক্ষণ পর সবাইকে অবাক করে দিয়ে একটু বাঁকা হেসে বললেন,
” হেই মিস পুকি পাই, স্ট্যান্ড আপ!”
সবাই অবাক হয়ে গেল যে, প্রফেসর কাকে ডাকছে। একদিকে রিত্তিকা নিজের দিকে তাকালো, কারণ সেই তো পুরো ক্লাসে একমাত্র পুকি টি – সার্ট পড়ে আছে, সাথে পুকি ক্লিপ। আর মনে মনে ভাবলো—সর্বনাশ, কাল রাতের মেসেজের জন্য ডাকছে না তো, উনি কি কোনোভাবে জেনে গেল যে ওটা আমি। জানলেই বা কি,যা হবে দেখা যাবে।
প্রফেসর জিয়ান ডেস্কে দুহাত ভর দিয়ে আবার বললেন,
“কী হলো?
ইয়েস, মিস পুকি ওরফে রিত্তিকা ইসলাম! আপনাকেই দাঁড়াতে বলছি।”
রিত্তিকা আমতা আমতা করে দাঁড়িয়ে পড়ল এবং নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে বলল, “আমি কী করেছি স্যার?”
“আমি কি আপনাকে বলেছি এখনো যে আপনি কি করেছেন।”
“নো স্যার।”
“তাহলে, বাই দ্যা বে আপনি সিট বেঞ্চে কান ধরে দাঁড়ান..!”
“বাট হোয়াই স্যার, আমি কি করেছি যে আমি সিট বেঞ্চে কান ধরে দাঁড়াবো।
“আপনি কিন্তু প্রফেসরের মুখে মুখে তর্ক করছেন, মিস রিত্তিকা। ভুলে যাবেন না আমি আপনার শিক্ষক। আর একজন স্টুডেন্ট হিসেবে আপনার শিক্ষকের আদেশ নিশ্চয়ই পালন করা উচিত,”—বলেই জিয়ান ধীর পায়ে ডেস্ক ছেড়ে রিত্তিকার বেঞ্চের দিকে এগিয়ে আসলেন। ক্লাসের সবাই তখন হা করে দেখছে যে কি হচ্ছে।
আর খুব আস্তে করে বললেন, “যা বলছি তাই কর, নাহলে সবার সামনে বলবো তুই আমাকে রাতে মেসেজ দিয়েছিস।”
বিস্ময়ে রিত্তিকা চোখ বড় বড় করে তাকালো। স্যার কিভাবে জানলো যে সে মেসেজ দিয়েছে।তারপর রিত্তিকা বানিয়ে বললো,
“কি যা তা বলছেন স্যার আমি কখন আপনাকে মেসেজ দিলাম। আমি তো কিছুই জানি না।”
“যা বলেছি তাই কর নাহলে পুরো ভার্সিটি জানবে তুমি আমাকে মেসেজ দিয়েছো। দেরি না করে সিট বেঞ্চে উঠে কান ধর, নাহলে থাপ্পড়ায়ে গালের নকশা পালটায়ে দেবো মিস পুকি।”
রিত্তিকা আর কথা বাড়ালো না প্রফেসরের কথা মতো কান ধরে দাঁড়ালো। অতঃপর একরাশ ক্ষোভ নিয়ে মনে মনে বললো,
‘আমাকে পুরো ক্লাসের সামনে সিট বেঞ্চে কান ধরে দাঁড় করালেন তাই না প্রফেসর, শুধু একটা মেসেজের জন্য? দেখুন আমি রিত্তিকা কি করতে পারি, এর শোধ তো আমি সুদে-আসলে নিয়েই ছাড়বো।’
ক্লাস শেষ হতেই প্রফেসর জিয়ান চলে গেল, আর রিত্তিকা নিচে নামলো।
জিয়া বললো, “তুই কি করেছিস রিত্তিকা যে স্যার তোকে কান ধরে দাঁড়াতে বললেন..?”
“জানি না আমি!”—বলেই রিত্তিকা আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে ব্যাগটা টেনে নিয়ে দ্রুত ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে বাসার দিকে রওনা দিল।
বাসায় এসে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে বললো, “যা করেছি বেশ করেছি প্রয়োজন পড়লে আবার করবো। সেদিন আমাকে না বকলে তো আর এতটা করতাম না, কিন্তু আজ আবার বেশি করে ফেললেন তাই এটার শোধও আমি নেবো, আর এমন ভাবে নেবো যে আপনি ভাবতেও পারবেন না মিস্টার খারুস।
“জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ…!”
পরেরদিন সকালে রিত্তিকা ভার্সিটি যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে।
রেডি হতে হতে রিত্তিকা বলল, “আমি তো আর ভীতু নই যে সামান্য একটা কারণে ভয়ে ঘরে বসে থাকব। আমি ওই খবিশ, খরগোশ মার্কা প্রফেসরকে কী ভয় পাই? উহু, পাই না তো! তাহলে আমি যাবই ভার্সিটি।”
”আরে রিত্তি, ভুলে গেলি আজ জিয়ার বার্থডে? তুই তো দিন দিন ভুলোমনা হয়ে যাচ্ছিস! ভার্সিটি যাওয়ার পথে ওর জন্য একটা গিফট নিয়ে যাব। কিন্তু কী নিয়ে যাব…?”
“হ্যাঁ, ও তো ফুল খুব পছন্দ করে। আগে ওর জন্য কিছু ফুল নিয়ে নিই। তারপর সবাই মিলে ডিসকাস করে একটা ভালো গিফট কেনা যাবে।”
ভার্সিটিতে যাওয়ার আগে রিত্তিকা একটা ফুলের দোকানে গেল।
“বাহ্! এই বেলি ফুলগুলো তো খুব সুন্দর, কিন্তু এগুলো তো আর জিয়াকে দেওয়া যায় না। ওর জন্য বরং এই গোলাপের তোড়াটা নিই। দেখতে খুব সুন্দর।”
”আংকেল, এই গোলাপের তোড়াটার দাম কত..?
দোকানদার বলল, “৪০০ টাকা।”
”কী! ৪০০ টাকা? মাত্র ছয়টা ফুল আছে এতে, আর আপনি ৪০০ টাকা বলছেন? ইয়ার্কি করছেন আমার সাথে? ২০০ টাকা দেব, নেবেন?”
“না মা, ৩৫০ টাকার কমে দেওয়া যাবে না।”
”৫০ টাকা তো ঠিকই কমালেন, তার মানে এর আসল দাম আরও কম! তাই ২০০ টাকাই রাখেন। তাও বেশি দেওয়া হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমার আবার মায়া বেশি, তাই ২০০ টাকাতেই নিচ্ছি।”
“না, ২০০ টাকাতে আমি দেব না। ৩৫০ টাকা হলে বিক্রি করব, নিলে নাও, না নিলে যাও।”
”ধুর শালা বদজাত বুড়ো! ৩৫০ টাকার কমে দিতেই চাচ্ছে না। আমি রিত্তিকা ইসলাম, ২০০ টাকার বেশি দিয়ে এটা কিনবই না!” মনে মনে বলল সে।
ঠিক আছে, আপনার দেওয়া লাগবে না। আমি পাশের দোকান থেকে নিচ্ছি। ওদের দোকানে আপনার চেয়েও সুন্দর ফুল আছে!”
কিছুক্ষণ দোকানদার চুপ করে রইল। যখন সে দেখল রিত্তিকা সত্যিই চলে যাচ্ছে, তখনই পেছন থেকে ডাক দিয়ে বলল, “আচ্ছা নিয়ে যাও মা, আমার একদম লস করিয়ে দিলে!”
রিত্তিকা এবার একটু ভাব নিয়ে বলল, “তাহলে থাক, দেওয়া লাগবে না আপনার। আমি পাশের দোকান থেকেই নিচ্ছি।”
প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩
“না না, নিয়ে যাও, ২০০ টাকা দিয়েই নিয়ে যাও।”
দোকানদার কিছুটা বাধ্য হয়েই বলল।
তারপর রিত্তিকা ২০০ টাকা দিয়ে ফুলটি দোকানদারের কাছ থেকে নিয়ে নিল।
ফুলটা হাতে পেয়েই মনে মনে বলল, “বলেছিলাম না ২০০ টাকা দিয়েই নেব? হি…হি! নিয়ে নিলাম। যা বলেছি, তাই করেছি!”
তারপর রিত্তিকা ভার্সিটির দিকে হাঁটা ধরল..
