আমি অভিশাপ পৃথ্বীর শেষ পর্ব
ইসরাত জাহান দ্যুতি
চোখের ঝাঁপি মেলে পায়ের কাছে নাওফিলের দেখা পেল দীধিতি৷ উদ্বাস্তুর মতো দেখাচ্ছে তাকে। মাথা নুইয়ে কেমন নিশ্চল হয়ে বসে থাকতে দেখে অবিলম্বেই দীধিতির মনে পড়ে গেল একটু আগেও এই মানুষটা ওকে ভয় পায়িয়ে দিয়ে পাগলের মতো কাঁদছিল। তড়িঘড়ি করে উঠতে গিয়েই বাধা পেল হাতে।
‘আরে উঠো না‚ স্মরণ’‚ মাভিশা জলদি চেপে ধরল ওকে। ‘স্যালাইন দিয়েছি তোমাকে। শুয়ে পড়ো।’
‘স্যালাইন কেন?’ বিরক্তি প্রকাশ করল দীধিতি‚ ‘এসবের কোনো দরকার নেই। খোলো তো এটা।’
তখনই মাথাটা তুলে তাকাল নাওফিল‚ ‘দরকার আছে। রাখতে দাও ওটা।’ গম্ভীর কণ্ঠের নীরসতা দীধিতি শুনতেই আচমকা কেঁদে ফেলল অভিমানী বাচ্চার মতো‚ ‘তুমি দূরে কেন আছ? আমার পাশে এসো।’
চোখজোড়া তখনো ভেজায় ছিল নাওফিলের। শোকের মাতম থামলেও আত্মাটা ছটফট করছে অদৃশ্য বিষ যন্ত্রণায়৷ ইচ্ছা করছে কোথাও একটা চলে যেতে—যেখানে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া যায়। ভীষণ দমবন্ধ লাগছে তার। দীধিতিও ঠিক বুঝল তার ওই হাঁসফাঁস। আর তা বুঝতেই আবারও উঠতে চেষ্টা করল নাওফিলের কাছে যাওয়ার জন্য৷ মাভিশা আবারও জোরাজোরি করতে থাকল ওর শরীরের অবস্থা বোঝানোর চেষ্টা করে। হাতের পিঠে চোখের কোন মুছে নাওফিল তখন ইশারা করল মাভিশাকে বেরিয়ে যেতে।
মারিহামকে সামলাতে তাকে ব্যস্ত রাখছে ওদিকে ইয়াসিফ৷ রাতের খাবারের আয়োজন করছে দুজন রান্নাঘরে৷ মাভিশা বেরিয়ে গিয়ে তাই নিজের ঘরেই পা বাড়াল৷
নাওফিল ঘরের দরজাটা বন্ধ করে এসে বসল দীধিতির কাছে৷ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল মৃদুস্বরে‚ ‘ব্লাড প্রেসার লো তোমার। ডিনার করে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়বে।’
কোনো তোয়াক্কা করল না দীধিতি নাওফিলের কথাগুলোর। নিজেকে সমর্পণ করল নাওফিলের বুকে‚ আঁকড়ে ধরল তাকে দু হাতে৷ বুকে মুখ গুঁজেই ফুঁপিয়ে উঠল সে‚ ‘আমি ভয় পাচ্ছি তোমাকে নিয়ে৷ তুমি আর কোনোদিন ওভাবে কেঁদো না প্লিজ।’
‘কাঁদব না’‚ ফিসফিসানি কণ্ঠ শোনাল নাওফিলের। চোখজোড়া বন্ধ তার। বন্ধ চোখের কোন উপচেই গড়াল বিষাদ নোনাজল।
চারপাশে পাহাড় বিস্তৃত এলাকার মাঝে কাঠ আর ইট-পাথরের ঘর। ছোটো ছোটো টিলার ওপরেও কিছু ঘর-বাড়ি দেখা যায়। গ্রামের মানুষগুলোর প্রধান পেশা চাষাবাদ। অত্যাধুনিক মেশিনের সাহায্যে চাষের কাজ তারা নিজেরাই করে৷ সরকার তাদের সর্বোচ্চ সহায়তা করে থাকে।
গাড়ির জানালা থেকে গ্রামটা মুগ্ধ হয়ে দেখছিল মাভিশা। জানালার বাইরেই সবার মনোযোগ। কেবল নাওফিল সবার মাঝে থেকেও কোথাও হারিয়ে গেছে যেন৷ তাকে উদাসীন দেখালেও কিছু একটা চিন্তাভাবনাতে মগ্ন আসলে। হঠাৎ পাশ থেকে দীধিতি জিজ্ঞেস করে উঠল‚ ‘আর কতদূর?’ নাওফিলের কাঁধে মাথা রেখে আছে সে। বেশ অনেকক্ষণ ধরেই বসে থাকার কারণে অধৈর্য হয়ে উঠেছে।
‘কী জানি! এসেছিলাম তো একবারই৷ তাই ভুলে গেছি পথ।’ মাভিশা বলল।
মারিহাম বসে আছে ইয়াসিফের পাশে আর ইয়াসিফ ওর নির্দেশনা অনুযায়ী এগিয়ে চলছে দীর্ঘদিনের অপেক্ষিত গন্তব্যে—জায়িন‚ আয়মানের সমাধিস্থলে। দীধিতির প্রশ্নে ইয়াসিফ মারিহামের দিকে তাকাল। সেও জানতে চায় আর কতদূর।
‘মিনিট দশেক। সামনের মোড়ে গিয়েই হাতের বাঁয়ে হোটেল পাবো৷’ ওদের কৌতূহলের সমাপ্তি ঘটাল মারিহাম।
সকালের নাশতা শেষ করে ইয়াসিফ আর নাওফিল প্রিপেইড টুরিস্ট সিমকার্ড নিয়ে নিয়েছে আগে। তারপর রওনা হয়েছে ওরা গন্তব্যের উদ্দেশে। এখন দুপুর গড়াচ্ছে। প্লেন জার্নি করা যেত। কিন্তু দীধিতির শরীরের অবস্থা বিবেচনা করে নাওফিল গাড়ি নিয়েছে। হঠাৎ করেই বেচারি গতরাত থেকে একটু বেশিই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তা যে নাওফিলের অবস্থা দেখেই সেটা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না কারও৷ এত নাজুক হৃদয়ের দীধিতিকে মজবুত করার জন্য চারটা বছর কত বিরহ স্বীকার করে দূরে রইল নাওফিল। কিন্তু সে কি জানত হাজারভাবে দীধিতি নিজেকে কঠিন করতে পারলেও তার দূরাবস্থা ওকে সব সময়ই দুর্বল করে তুলবে? নিজেকে তাই নাওফিল কষ্টেসৃষ্টে সামলে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
হোটেলে তিনটা রুম নিয়ে ঘণ্টা দুই বিশ্রাম করল ওরা। বিকেল নাগাদ বেরিয়ে পড়ল মারিহাম ওদের নিয়ে। কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে এসে পৌঁছতেই নাওফিলের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল সহসা। গাড়িটা রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে তর্জনী আঙুলের ইশারায় মারিহাম দেখাল সামনের কয়েকটা বাড়িকে‚ ‘ওই বাড়িগুলোর বদলে মাত্র একটাই বাড়ি ছিল ওখানে। সেটাই ছিল আব্বু আম্মুর বাড়ি।’
রাস্তা থেকে নেমে এলো ওরা। গোটা কয়েক ইট-পাথরের ঘর-বাড়ির দিকে তাকিয়ে নাওফিল মনশ্চক্ষুতে কল্পনা করল ছবিতে দেখা বাড়িটাকে আর বাবা-মাকে। মারিহাম এগোতে এগোতে ধরে আসা গলায় বলল‚
‘বাড়ির পেছন দিকে আব্বু-আম্মুকে একই কবরে শোয়ানো হয়েছিল।’
‘একই কবরে?’ অবাক কণ্ঠে বলে উঠল ইয়াসিফ।
‘হ্যাঁ‚ স্যামুয়েল টেলর বলেছিল প্রায় ছাই হয়ে গিয়েছিল তারা৷ শরীর আলাদা করার উপায় ছিল না।’ বলতে গিয়ে এবার কেঁদেই ফেলল মারিহাম।
দীধিতি শোনা মাত্র নাওফিলের হাতটা শক্ত করে ধরল। কিন্তু নাওফিলের হাতটা রইল শিথিল। ওর আঙুলের ভাঁজে আঙুল গুঁজল না দেখে নাওফিলের মুখপানে তাকাতেই কান্না পেয়ে গেল ওরও৷ মুখটা নির্বিকার নাওফিলের৷ অথচ নীরব অশ্রু ভীড় করে আছে তার দু চোখে।
‘কবরটা চিহ্নিত করতে পেরেছিল স্যামুয়েল আঙ্কেল?’ জিজ্ঞেস করল ইয়াসিফ।
‘জায়গাটা তখন তো ফাঁকা ছিল৷ পরবর্তীতে জনবসতি গড়ে উঠলে কবরটা হারিয়ে যেতে পারে এ চিন্তা করেই সমাধিফলকের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল তারা। এই জমির মালিকের কাছে চিঠিও দিয়েছিল যেন সুরক্ষিত থাকে কবর৷ দুর্ঘটনার কথাও যেন পুলিশ অবধি না যায়। জমির মালিককে টাকা খায়িয়ে সে ব্যবস্থাও করেছিল।’
ওরা এসে দাঁড়াল পাহাড়ের অভিমুখে। সমতল জায়গাটিতে বেশ কিছু গাছ-পালার ভীড়ে একটু ফাঁকা স্থানে খুঁজে পেল সমাধিক্ষেত্র। সেখানে আরও কয়েকটি কবরের দেখা পেল ওরা৷ তা দেখে সন্দিহানের মতো জিজ্ঞেস করল নাওফিল‚ ‘এখানে কি গোরস্থান করা হয়েছে?’
‘হুঁ‚ আব্বু-আম্মুর কবরটাকে কেন্দ্র করে জায়গাটিকে ছোটো পরিসরে গোরস্থান করা হয়েছে।’ মারিহাম বলল।
‘কই আব্বু-আম্মু?’ হঠাৎ ভীষণ তাড়া নিয়ে বলল নাওফিল‚ ‘আমাকে দেখাও তাদের কবরটা।’
‘এগোও সামনে। পেয়ে যাবে৷ আমি নতুন করে গ্রেভস্টোন করিয়েছি আর গতমাসে এসেও পরিষ্কার করিয়েছি কবরটা।’
দীধিতির হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নাওফিল ছুটেই গেল এক প্রকার। ইয়াসিফ তার পিছু নিলে দীধিতি তাকে পেছন থেকেই বলল‚ ‘ওর দিকে লক্ষ রেখেন‚ ভাইয়া।’
না ফিরেই হাতের ইশারায় ওদেরকে আশ্বস্ত করে চলে এলো ইয়াসিফ নাওফিলের কাছে। পাশাপাশি চলতে চলতে একে একে সকল সমাধিফলক দেখতে থাকল দু ভাই। অবশেষে একদম শেষ দিকে এসে একটি সমাধিশিলাতে লেখা দেখল “In Loving Memory Of ZAYIN MAHTAB & AYMAN MEHRIN”। দুজনের জন্ম আর মৃত্যুর তারিখ লেখা তারপর।
মন্থর পায়ে হেঁটে নাওফিল কাছে এলো কবরটার। বোঝার উপায় নেই ওখানে কোনো কবর আছে৷ বসে পড়ল সে মাটিতে জাপটে। ইয়াসিফ নিঃশব্দে তার কাঁধে হাত রাখলে কান্নায় মৃদু কম্পিত গলায় বলল নাওফিল‚ ‘এখানে এক সঙ্গে আমার আব্বু-আম্মু ঘুমিয়ে আছে‚ নিহাদ।’ বলেই হাত বাড়াল সে৷ কবরের মাটিতে হাত ছোঁয়াতেই বুকের ভেতরটা ভেঙেচুরে শোকের মাতম ঠেলে এলো তার কণ্ঠে‚ ‘আব্বু… আমার আম্মুউউউ…!’
আচমকা উবু হয়ে পড়ে কবরের মাটিতে দু হাত পেতে মাথা ঠেকিয়ে আবার আহাজারি কান্না শুরু করল নাওফিল। ইয়াসিফ দ্রুত তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে টেনে আনল কবরের কাছ থেকে। নাওফিল ভার ছেড়ে দিলো শরীরের৷ তাকে সামলাতে দু হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ইয়াসিফ। ওর বুকে পিঠ ঠেকিয়ে বসে নাওফিল বিলাপ করে উঠল‚ ‘আমার সহ্য হচ্ছে না রে‚ নিহাদ। আমি মানতে পারছি না এই মৃত্যু৷ এতগুলো বছরে কেউ আসেনি তাদের কাছে… কবরটাকে জিয়ারত করেনি কেউ৷’
‘ভাই‚ এভাবে কাঁদিস না’‚ ইয়াসিফ কান্না আটকে জড়িয়ে ধরল নাওফিলকে। তাকে থামাতে চেষ্টা করল‚ ‘এভাবে কাঁদলে রুহ কষ্ট পায়‚ জানিস না? তোর কান্নায় তারা ছটফট করছে‚ জাদ। থাম‚ ভাই আমার।’
নাওফিল হুঁশে নেই তার‚ ‘আমার আম্মু… আমার মা! কত যন্ত্রণা ভোগ করলে ছোটো থেকে মাগো! মরণও হলো তোমার কী নিষ্ঠুরভাবে! ইয়া আল্লাহ‚ কী দিলে তাকে তুমি? আমি নামাজ শেখার পর থেকে দিন-রাত তোমার কাছে হাত তুলে কত ফরিয়াদ করেছি! তারা যেখানেই থাকুক মৃত হোক আর জীবিত‚ যেন ভালো থাকে। তুমি তো আমার দোয়া কবুল করলে না‚ আল্লাহ…!’
না‚ ইয়াসিফ পারছে না কোনোভাবেই নাওফিলকে সামলাতে৷ এতটা ভেঙে পড়বে নাওফিল তা সে জীবনেও ভাবেনি। বাবা-মার থেকে যুগ যুগ ধরে দূরে থেকেও এমন অসীম ভালোবাসা বুকে পুষে রেখেছিল ছেলেটা! এরও আন্দাজ ছিল না ইয়াসিফের।
আশেপাশের দুয়েকজন পুরুষ চলার পথে থমকে পড়েছে নাওফিলের আহাজারিতে। তারা এসে ওদের পাশে দাঁড়াল। দেখল কান্না ভেজা চোখে ইয়াসিফের অপারগতা। তারা আবেগী হলো ভীষণ। নাওফিলের পাশে বসে তাকে নিজেদের ভাষায় কান্না করতে বারণ করল‚ সান্ত্বনা দিতে থাকল৷
ইয়াসিফ নিরুপায় হয়ে পকেট থেকে ফোনটা বের করে জাকির শেখকে কল করল। এই মুহূর্তে দাদা-দাদী বাবা-মা‚ চাচাকে ভীষণ প্রয়োজন অনুভব করছে সে৷ নাওফিল মায়ের গর্ভের ভাই না হলেও তাকে যেভাবে ভালোবেসে এসেছে সে আর তাওসিফ—নাওফিলের তাই এমন ভঙ্গুর পরিণতি সহ্য করতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে সে খুব।
বেশ অনেকক্ষণ পর রিসিভ হলে ইয়াসিফ ডেকে উঠল ব্যাকুল স্বরে‚ ‘বড়ো কাকু?’
‘নিহাদ?’ নাম্বার অচেনা হলেও ইয়াসিফের কণ্ঠ চিনতে পেরেই জাকির সাহেব ফোনের ওপাশ থেকে ধমকে উঠলেন‚ ‘কল করার সময় হলো তোদের? এত বড়ো হয়েও মিনিমাল কাণ্ডজ্ঞান হয়নি কারোর! বাড়ির লোকের কী অবস্থা সে খোঁজটুকুও নেওয়ার প্রয়োজনবোধ করিস না তোরা। মারিহামের সাথে কথা বলার জন্য আম্মা কত কান্নাকাটি করছে জানিস?’
অভিভাবক বহুদূরে হলেও তার কণ্ঠটুকু শুনতে পেতেই ইয়াসিফ ছেড়ে দিলো নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টাটুকু৷ ডুকরে উঠল ফোনটা কানে চেপেই‚ ‘আমি জাদকে সামলাতে পারছি না‚ বড়োকাকু। ছোটোকাকু আর কাকির কবরে শুয়ে প্রচণ্ড কান্নাকাটি করছে। একদম সেই চার বছরের জাদ হয়ে গেছে ও। আমি ওকে থামাতে পারছি না‚ বড়োকাকু।’
‘কবর’ শব্দটা তিক্ষ্ণভাবে কানে বিধল জাকির সাহেবের। ফোনের অপরপ্রান্তে নীরব হয়ে গেলেন তিনি। সামনে থাকলে ইয়াসিফ বুঝতে পারত সন্তানতুল্য ছোটো ভাইটার কবর কথাটা শুনেই জাকির সাহেবের বুকের ভেতরও ভাঙন শুরু হয়ে গেছে।
‘কবর? আমার জায়িনের কবরের কথা বললি‚ নিহাদ?’ গলাটা শোনাল জাকির সাহেবের কান্নায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসার মতো আর অবিশ্বাস সেখানে৷ ইয়াসিফ তা শোনার পর আরও বেশি ভেঙে পড়ল যেন। কাঁদতে কাঁদতেই বলল‚ ‘ছোটো কাকু আর কাকি নেই। আরও বহু আগেই তারা পরকালের বাসিন্দা হয়ে গেছে‚ কাকু। তাদেরকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছে আলিয়া…!’ সংক্ষিপ্তেই সে জানিয়ে দিলো জায়িন‚ আয়মানের পরিণতি আর নাওফিলের অবস্থা।
‘জায়িন‚ আমার ভাইরেএএ… ও আমার সোনা ভাই! আর কোনোদিন তোকে দেখতে পারব না আমি৷ কত বকেছি… মেরেছি জাদকে নিয়ে যেতে আসলে। আর ফিরলি না তুই‚ আমার চাঁদ ভাই’‚ ফোনটা কয়েক মুহূর্তের জন্য নামিয়ে রেখে উচ্চস্বরে কাঁদতে শুরু করলেন জাকির সাহেব। ইয়াসিফ তখন আবার ডেকে উঠলে তিনি কোনোমতে সামলে উঠে বললেন‚ ‘আমার জাদকে ফোনটা দে‚ বাপ। আমি কথা বলব আমার বাচ্চাটার সঙ্গে।’
মধ্যবয়স্ক দুজন তখনো নাওফিলের কাঁধ জড়িয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছিল। ইয়াসিফের কথা বলা শেষ হলে তারা কিছু বলল ইয়াসিফকে কুর্দি ভাষাতে৷ তা বুঝতে পারল না ইয়াসিফ৷ বোঝার মতো সময়ও ব্যয় করে কথা বলতে চাইলো না ও৷ বিলাপ করতে থাকা নাওফিলের কানের কাছে ফোনটা নিজেই ধরে রেখে বলল নাওফিলকে‚ ‘কাকু লাইনে আছে‚ জাদ। কথা বল।’
‘আব্বু কই… আমার আম্মু কই… আব্বু নাই‚ আম্মুও নাই। একেবারে ছাই হয়ে গেছে… ফুরিয়ে গেছে আমার আব্বু-আম্মু।’ নাওফিলের এমন বিলাপ ধ্বনিকানে পৌঁছতেই বুক ফাঁটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে চাইলো জাকির সাহেবের কণ্ঠ ছিঁড়ে।
‘আব্বু? আমার জান?’ অফুরান মমতা ভরে ডাকলেন জাকির নাওফিলকে। প্রথমবার তার মুখে ‘জান’ ডাকটা শুনতে পেয়ে নাওফিল বিলাপ সুরেই খেদোক্তি করল‚ ‘তোমার অপরাধী ভাইটা আর কোনোদিন আমাকে চুরি করতে আসবে না‚ আব্বু। আমি আর অপেক্ষায় থাকব না আব্বু-আম্মুকে ফিরে পাবার। ওরা দুনিয়ার জাহান্নামে পুড়ে শেষ৷ আল্লাহ আমার আব্বু-আম্মুকে কত ঘেন্না করে মেরেছে! ওরা শরীরটা নিয়ে তাই কবরে শুতে পারল না।’
‘আল্লাহকে নারাজ কোরো না‚ আব্বু। অভিযোগ কোরো না তাকে নিয়ে। তুমি জানো না আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণকারীকে আল্লাহ পাক শহীদের মর্যাদা দেন? ওদের সমস্ত পাপের সাজা হয়ত দুনিয়া থেকেই দিয়ে পরকালের সাজা থেকে বাঁচিয়ে দিলেন তিনি। ওরা শহীদের সওয়াবপ্রাপ্ত‚ আব্বু। তুমি আর কান্নাকাটি করে ওদেরকে কষ্ট দিয়ো না। বেশি বেশি আমল‚ দোয়া, দান-সদকা, কোরআন পাঠ, কালেমা তায়্যিবার জিকির করে ওদের জন্য সওয়াব পাঠাবে শুধু।
তুমি জলদি ফিরে আসো মারিহামকে নিয়ে৷ তোমার দাদীর অবস্থা ভালো না। যে-কোনো সময় খারাপ কিছু হওয়ার সম্ভাবনা আছে। মারিহামকে দেখার জন্য খুব কান্নাকাটি করছে সে। তারপর সময় করে আমরা সবাই দেখতে আসব ওদের কবরটা।’
কান্না থেমে এলো নাওফিলের। জাকির সাহেবের কথাগুলো তার মস্তিষ্কে গাঁথল ভালোভাবে৷ দাদীর মুমূর্ষু অবস্থার খবরটাও তাকে সামলে উঠতে সাহায্য করল৷ অত্যধিক শোকাভিভূত হয়ে যাওয়ায় বাবা-মার মৃত্যুকে হুকুমি শহীদের মর্যাদা দিয়েছেন আল্লাহ তাআ’লা তা সে ভুলেই গিয়েছিল। এ কথাটাই তাকে শান্ত করল শেষমেশ। জাকির সাহেবের সাথে কথা শেষ করার পর গোরস্থান থেকে বের হতে হতে সন্ধ্যা হয়ে গেল৷ যে ব্যক্তি দুজন ছিল নাওফিলের সঙ্গে‚ তাদের সাথে কথাবার্তা বিনিময় করল মারিহাম। তাদের এতটা আন্তরিকতা প্রকাশ পেল মূলত নাওফিলের মুগ্ধকর নূরানী মুখ আর তার অমন আহাজারি দেখেই৷ মাগরিবের আজান পড়ে যাওয়ায় ঠিক হলো এলাকার মসজিদে নাওফিল‚ ইয়াসিফ নামাজ আদায় করবে আর মেয়ে তিনজন আপাতত গাড়িতেই বসবে৷ তা বুঝতে পেরে ভদ্রলোক দুজন সহাস্য মুখে প্রস্তাব দিলো তাদের ঘরে গিয়ে দীধিতিদের নামাজ আদায়ের জন্য। খুব কাছেই ছিল তাদের বাসা। নাওফিল সম্মতি দিলো এ চিন্তা থেকে যে‚ কিছুটা বিশ্রামের ব্যবস্থা হবে অন্তত দীধিতির জন্য।
মসজিদ থেকে বেরিয়ে সাঁঝনামা আকাশ তলে দাঁড়াল ইয়াসিফ। নাওফিলের নামাজ শেষ হলে পাহাড় ঘেরা গ্রামের পথে বিষণ্ণ দু ভাই নীরবে হাঁটতে হাঁটতে এগোতে থাকল আবার গোরস্থানের দিকে। গাছ-গাছালিতে ঘেরা জায়গাটুকুতে আলো-আঁধারি৷ ফোনের আলোয় বাবা-মায়ের কবরটা খুঁজে নিয়ে দাঁড়াল নাওফিল কবর জিয়ারতের জন্য। ইয়াসিফ তার পাশেই দাঁড়াল মোনাজাত তুলে। না চাইতেও নাওফিলের মতোই সিক্ত হয়ে উঠল ওর চোখদুটোও। প্রার্থনা শেষে আকাশপানে মুখ তুলে নাওফিল জায়িনের উদ্দেশে বলল‚ ‘আব্বু‚ তুমি এসেছিল দুনিয়ার বুকে এক টুকরো চাঁদ হয়ে। তাই তো তোমাকে ডেকেছিল সবাই নক্ষত্ররাজ। চাঁদের বুকে কলঙ্ক থাকে এ কথার প্রমাণ দিতেই বোধ হয় নিজেকে কলঙ্কিত পুরুষ করেছিলে। কিন্তু তুমি অভিশপ্ত কেন বললে নিজেকে? তুমি অভিশপ্ত হলে আমিও যে তোমারই অংশ। তবে কি আমিও অভিশপ্ত? আমি কত চেষ্টা করেছিলাম কলুষিত না হতে। কিন্তু পারিনি‚ আব্বু… আমি পারিনি। আমিও হয়ত অভিশপ্ত হয়েই জন্মেছি।’
তাওসিফ ফোনে নাওফিলের অবস্থার কথা শুনে আসতে চেয়েছিল ইস্তাম্বুল। কিন্তু দাদীর শরীরের খারাপ পরিস্থিতি জানার পর অস্ট্রেলিয়া থেকেই রওনা হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। কিরণকে নিয়ে সে পৌঁছেও গেছে গতকাল। নাওফিলরা দুটো দিন সময় ব্যয় করে ফ্লাই করেছে। আজ দুপুরে ফ্লাইট পৌঁছল ওদের। প্লেনে ওঠার আগে জাকির সাহেব কলে বলেছিলেন ওদের‚ দাদীর জন্য দোয়া করতে৷ যেন মারিহামকে শেষবারের মতো দেখার জন্য হায়াতটুকু দেন আল্লাহ। খুবই নাজুক অবস্থা তার। মাহতাব সাহেবেরও খাওয়া-দাওয়া নাকি বন্ধ হয়ে গেছে জায়িনের মৃত্যুর কথা জেনে আর সহধর্মিণীর অবস্থা দেখে। তাকেও খেয়াল রাখতে হচ্ছে সবার।
কিন্তু মহান আল্লাহর পরিকল্পনা যে ভিন্নই ছিল। বোধ হয় সকল শোক এক সঙ্গেই নাওফিলের বুকে চেপে দেবেন বলে ভেবে রেখেছেন তিনি।
দাদা-দাদীকে ছেড়ে বিমানবন্দরে কাউকে আসতে বারণ করে দিয়েছিল নাওফিল। কিন্তু মারিহামকে দেখার জন্য খুব অস্থির ছিলেন জাকির সাহেবও৷ তিনি বারণ অমান্য করেই আসতে চেয়েছিলেন। অথচ আসেননি। আসবেন কি-না এ কথা জানার জন্য বাসায় ফোন করতে চাইলো ইয়াসিফ৷ নাওফিল কী যেন ভেবে নিষেধ করল ওকে৷ নাওফিলের ব্যক্তিগত সচিব গাড়ি নিয়ে অপেক্ষায় ছিল৷ তার সঙ্গেই রওনা হলো ওরা গাজীপুরের উদ্দেশে৷ নাওফিল তার সচিবকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চেয়েও করল না। কিন্তু বুক ধড়ফড় করতে থাকল তার আচমকা। ইয়াসিফকে বলল‚ ‘মিহাদকে কল কর তো।’
‘অলরেডি করেছি৷ রিসিভ করছে না।’ চিন্তিত মুখভঙ্গিতে জবাবটা দিয়ে পুনরায় কল করল ফিহাকে। ফিহা রিসিভ করল কলটা। ফোন কানে ঠেকাতেই ওর কান্না গলায় ভেসে এলো‚ ‘ভাইয়া‚ তোরা পৌঁছে গেছিস?’
‘কী হয়েছে?’ সংবাদ খারাপ বুঝতে পেরেও শান্তভাবেই জিজ্ঞেস করল ইয়াসিফ।
‘দাদী কেমন করে শ্বাস টানছে। সবাই কালেমা পড়ছে দাদীর শিথানে বসে। দাদা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। জলদি আয় তোরা।’
ফোনটা কেটে দিয়ে ইয়াসিফ সিটে মাথা এলিয়ে দিলো। চোখজোড়া বুজে ঠোঁট চেপে কতক্ষণ থমকে রইল। সামনের প্যাসেঞ্জার সিটে বসে ও। নাওফিল ডেকে উঠতেই ইয়াসিফ আগের মতো শান্ত গলাতেই জানাল‚ ‘দাদা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সবাই ব্যস্ত দুজনকে নিয়েই। তাই আসতে পারেনি কাকু।’ এক শোকের তাজা যন্ত্রণা এখনো নাওফিলের মনে৷ তাই পুরো খবরটা তাকে জানতে দিতে ওর মন সায় দিলো না।
কিন্তু নাওফিল কি বোকা? তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় আরও আগেই যে খারাপ ইঙ্গিত দিয়েছে। তবুও আর কোনো বাড়তি কথা বলল না সে৷ তুষারকে কল করে শিহাব‚ রাতুল‚ সবুজ‚ রোমান‚ সবাইকে নিয়ে গাজীপুর চলে যেতে বলল। তন্বী আর ঐশী যেন সঙ্গে থাকে সেটা আলাদাভাবে বলে দিলো সে। যদি সত্যিই শোকের বাড়ি পরিণত হয় তবে দীধিতি আর মারিহামের খেয়াল রাখার জন্য দরকার পড়বে মেয়েগুলোর৷
গাজীপুর পৌঁছতে পৌঁছতে বিকাল হয়ে গেল৷ গেটের ভেতর গাড়ি ঢুকতেই ওরা দেখল আলিশান প্রাসাদের মতো বাড়িটার বাগান প্রাঙ্গণে পরিচিত বহু মুখের চলাচল৷ পথিমধ্যে ইয়াসিফ আরও তিনবার কল করেছিল বাড়িতে৷ সবাই বলেছিল ওদেরকে‚ ঠিক আছে দাদী। কিন্তু কথাটা যে মিথ্যা ছিল! জাকির সাহেবের আদেশেই মিথ্যাটা বলা হয়েছিল নাওফিল আর মারিহামের মানসিক অবস্থার চিন্তা করে। দ্রুত আসতে গিয়ে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে! কেবল এই আশঙ্কায় করছিলেন জাকির সাহেব।
জান্নাতি বেগমের প্রাণহীন দেহটা ওপর থেকে নামিয়ে নিচে বসার ঘরের মেঝেতে রাখা হয়েছে। ফিহার সাথে ইয়াসিফ কথা বলার আধা ঘণ্টা পরই রুহ ত্যাগ করে তার শরীরটা। আজ সকালে তিনি যখন ঘুমাচ্ছিলেন তখন তার পাশে দাঁড়িয়েই ইয়াসিফের বাবা জাহিদ সাহেব কাঁদছিলেন জায়িনের জন্য৷ জাকির সাহেবের মতো কখনো স্নেহ‚ ভালোবাসা প্রকাশ না করলেও একমাত্র ভাইটাকে কম ভালোবাসেননি তিনি। জাকির সাহেবের কাছে ভাইয়ের করুণ মৃত্যুর ঘটনা জানতে পেরে দুটো দিন ধরেই হয়ে ছিলেন তিনি এলোমেলো। আলিয়াকে টুকরো টুকরো করে হত্যা না করতে পারার জন্যও আফসোস করছিলেন শোক কান্নায় ভেঙে পড়ে।
মা ঘুমিয়ে আছে ভেবে জায়িনকে নিয়ে যখন বিলাপ করছিলেন বড়ো ভাইয়ের কাছে‚ দুর্ভাগ্যবশত জান্নাতি বেগম তখন সবই শুনতে পান। তারপর থেকেই তার অবস্থা আরও খারাপের দিকে যায়৷ মৃত্যুর ঘণ্টা দুয়েক আগ পর্যন্তও কেবল জায়িনের নামটাই বারবার উচ্চারণের চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন।
বসার ঘরে পা ফেলতেই আগরবাতির ঘ্রাণে আর চারদিকে সকলে গুনগুন কান্নার আওয়াজে দীধিতির অস্থির লাগতে শুরু করল৷ মারিহামের কাছে এমন পরিস্থিতি নতুন। দাদীর জন্য তেমন মায়া বা আবেগ অনুভব না করলেও ভাই আর ইয়াসিফের থমকে যাওয়া শোকাচ্ছন্ন মুখ তাকে আবেগী করে তুলেছে।
নিথর জান্নাতি বেগমের মাথার কাছে বসে সবার কান্নাকাটি করার দৃশ্য একদম ভালো লাগল না নাওফিলের। ওকে আর ইয়াসিফকে সবাই দেখামাত্রই কান্নার বেগ সবার বেড়ে গেল। হাঁসফাঁস লাগতে শুরু করল আবার নাওফিলের। তার অন্তরটা বড্ড দুর্বল হয়ে পড়ছে বুঝতে পারছে সে৷ আপনজনের মৃত্যু অনায়াসেই মেনে নেওয়ার মতো শক্ত মানসিকতা বোধ হয় নেই তার। ইয়াসিফ এগিয়ে গিয়ে দাদীর কাছে হাঁটু গেড়ে বসে দাদীর মুখের ওপর থেকে কাপড়টা তুলল‚ ঠোঁট চেপে কান্না আটকে কতক্ষণ চেয়ে দেখল দাদীকে। কিন্তু নাওফিলের পা দুটো আটকে আছে একই জায়গাতেই৷ সেই সময় দেখা গেল সিঁড়ি বেঁয়ে নেমে আসছেন মাহতাব সাহেব আর জাকির সাহেব। তাদের ধরে নামানো হচ্ছে। মাহতাব সাহেবকে এখনো অবধি কেউ কাঁদতে দেখেনি৷ কিন্তু তিনি যে বড়োসড়ো ধাক্কা খেয়েছেন তা সকলেই টের পাচ্ছে তার নির্জীবের মতো চেহারাটা দেখে৷ জাকির সাহেব খুব কেঁদেছেন। তাকে সামলাচ্ছেন সোহাইল শেখ।
দূর থেকে নাওফিলের দিকে চোখ পড়ল প্রথমে মাহতাব সাহেবেরই৷ প্রিয় নাতিকে স্থবির হয়ে দাদীর লাশের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এতক্ষণে কেঁদে উঠলেন তিনি। নাতিকে দেখে যে ছোটো ছেলের মুখটা ভেসে উঠেছে মানসপটে!
‘নাওফিল? দাদুরে!’ বলে কাঁদতে কাঁদতে ডেকে উঠলেন নাওফিলকে। তাওসিফ ছিল মাহতাব সাহেবকে ধরে৷ নাতির কাঁধে মাথা এলিয়ে দিলেন তিনি৷ তাওসিফ বসালো দাদাকে সোফায়। নাওফিল দাদার দিকে একবার তাকিয়ে হঠাৎ গম্ভীরস্বরে বলে উঠল ঘরের সবার উদ্দেশে‚ ‘গায়রে মাহরাম যারা আছেন তারা বেরিয়ে যান ঘর থেকে। তারা যেন কেউ মুর্দার মুখ না দেখে।’ বলেই এগিয়ে এসে জান্নাতি বেগমের মুখটা দেখল সে ইয়াসিফের পিছে দাঁড়িয়ে। দেখতে দেখতে তার নীরব অশ্রু বিন্দু পড়ল ইয়াসিফের কাঁধের ওপর। ইয়াসিফ তা দেখে চোখদুটো মুছে উঠে পড়ে বলল‚ ‘নিজেকে শক্ত কর এবার৷ কাজ বাকি অনেক।’
মাহতাব সাহেবের কাছে গেল দুজন৷ ওদের জড়িয়ে ধরে এবার শোক-বিলাপ করে উঠলেন তিনি জায়িনের জন্য‚ স্ত্রীর জন্যও। মারিহামকে সে সময় ইশারায় ডাকল ইয়াসিফ। দীধিতির কাছ থেকে উঠে এসে সে দাদার সামনে দাঁড়াতেই ইয়াসিফ তার পরিচয় দিলো। মাহতাব সাহেব আরও কান্না জুড়লেন মারিহামকে আর নাওফিলকে জড়িয়ে ধরে। কাঁদতে কাঁদতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে নাওফিল আর দীধিতি তাকে নিয়ে চলে গেল অতিথিদের জন্য বরাদ্দ ঘরগুলোর একটাতে। দাদাকে বিছানায় শুয়িয়ে দিয়ে দীধিতিকে বলল নাওফিল‚ ‘এখানেই থাকো দাদার কাছে। আমি ডাকলে তারপর বের হইয়ো।’
‘তুই আমার কাছে বস‚ দাদাভাই।’ নাওফিলের হাতটা টেনে ধরে আকুল সুরে বললেন মাহতাব সাহেব।
কিছুক্ষণ বসে থাকার সিদ্ধান্ত নিলো নাওফিল৷ সেই সময়টুকুতে বিলাপ করতে করতে মাহতাব সাহেব হুঁশ-জ্ঞান হারিয়ে প্রকাশ করে দিলেন এক বিরাট পাপের কথা।
কত কিছুর পর কিশোরী জান্নাতি বেগমকে নিজের বধূ বেশে পেয়েছিলেন তিনি! আপন চাচাতো বোন ছিলেন জান্নাতি বেগম। বংশে বাইরের রক্ত যেন না মেশে তার জন্য নিজেদের ভেতরই বিয়ে শাদি হত। মাহতাব সাহেবের সৎ ভাই আফতাবের সঙ্গে তাই বিয়ে দেওয়া হয়েছিল চৌদ্দ বছর বয়সী জান্নাতি বেগমের৷ অথচ প্রণয়ের সম্পর্ক ছিল তার আঠারো বছরের মাহতাবের সাথে। বড়ো ভাই আফতাব ছিল পঁচিশ বছর বয়সী মেধাবী‚ বুদ্ধিদীপ্ত এক উদারমনা পুরুষ৷ পারিবারিক সকল ব্যাবসার ভারও ধীরে ধীরে তার হাতেই তুলে দেওয়া হচ্ছিল৷ উপরন্তু আফতাবের মা ছিল বড়ো বউ। তাই তারই ক্ষমতা‚ মর্যাদা আর কদরও ছিল বেশি সংসারে৷ বিয়ের দেড় বছরের মাথায় জান্নাতি বেগম মা হলেন। জাকির সাহেব হলেন পরিবারের সকলের কাছে হীরা মানিক। এই পুত্রের জন্যই জান্নাতি বেগম স্বামী আফতাবকেও গ্রহণ করে নিচ্ছিলেন৷ কিন্তু মাহতাব সাহেব নিজের মায়ের প্রতি বাবার অবহেলা‚ অনাদর মেনে নিলেও জান্নাতি বেগমের প্রতি বড়ো ভাইয়ের অধিকার কোনোভাবেই মানতে পারেননি। জাকির সাহেবের যখন ছয় বছর হলো তখনই তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সৎ ভাইকে হত্যা করার। ট্রাক চাপা দিয়ে হত্যা করে দুর্ঘটনায় ভাইয়ে মৃত্যুর গল্প সাজিয়েছিলেন অনায়াসেই৷ তারপর আর জান্নাতি বেগমকে হাসিল করতে কষ্ট করতে হয়নি তার। আজ সেসব কথা মনে করে বিলাপ সুরে বলে উঠলেন‚ ‘আমার পাপের খেসারতই কি আমার ছেলেকে দিতে হলো? আমি কেন মরলাম না? আমাকে ওই কঠিন মরণ কেন দিলো না আল্লাহ? আমি অভিশাপ কুড়িয়েছি আমার বড়ো মার কোল খালি করে৷ আমার ওপর পড়া সেই অভিশাপেই মরল আমার মানিক-ধন।’
দীধিতি বিস্ময়বিমূঢ় চোখে তাকাল নাওফিলের দিকে। কিন্তু নাওফিলকে দেখাল নির্লিপ্ত। তার চেহারা দেখেই দীধিতি বুঝল‚ এই ঘৃণ্য অতীত সে জানত তবে। কিন্তু মাহতাব সাহেবের জন্য ওর মনের মধ্যে প্রবল ঘৃণার অনুভূতি ছাড়া আর কিছু অনুভব করতে পারল না। জাকির সাহেব কতখানি অনাদর আর অবজ্ঞায় বড়ো হয়েছেন তা ও জানে৷ জাহিদ সাহেব আর জায়িনকে চোখের সামনে বাবার স্নেহে মেতে থাকতে দেখেছেন জাকির সাহেব। আর তিনি থেকেছেন তখন নিঃস্বের মতো দূরে পড়ে। একমাত্র মা আর সৎ ভাই জায়িনই ছিল তার হৃদয়ের কাছের৷ কেবল মাহতাব সাহেবের নানান দুর্ব্যবহার ‚ বৈষম্য আর অবহেলার কারণেই বিদেশে একা একা জীবন অতিবাহিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি৷ কিন্তু আল্লাহ পাক তার অবলম্বন করে পাঠালেন তখন নাওফিলকে৷
বাদ এশা জান্নাতি বেগমের জানাজা শেষ হলে খাটিয়ার সামনে ধরল নাওফিল আর ইয়াসিফ৷ পেছনে ধরল তাওসিফ আর জাকির সাহেব। গোরস্থানের দিকে এগোনোর সময় নাওফিল আখিরাত নিয়ে চিন্তামগ্ন হলেও এক ফাঁকে মনে করল দাদীর বুকে শেষবার ঘুমানোর দিনটার কথা৷ জাকির সাহেব ছোটোবেলায় তাকে কড়া শাসনে রাখতেন কিনা! সেদিন কোনো এক অপরাধের সাজাস্বরূপ তাকে সারাদিন আটকে রেখেছিল ঘরে তালা মেরে। জান্নাতি বেগম তালা ভেঙে সেদিন ঘরে ঢুকলে এগারো বছরের নাওফিল তার বুকে পড়ে কাতরস্বরে বলেছিল‚ ‘আমাকে নিয়ে আমার আব্বুর কাছে চলো‚ দাদীবু। আমার আব্বুর মতো কেউ আমাকে ভালোবাসতে পারে না।’
জান্নাতি বেগম নাতির মুখে চুমু খেতে খেতে বলেছিলেন‚ ‘যাব একদিন‚ দাদা। তুই আর আমি একদিন কাউকে না বলেই তোর আব্বুর কাছে চলে যাব।’ বুকচিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো নাওফিলের৷
গোরস্থানে পৌঁছে গেছে ওরা৷ জান্নাতি বেগমকে তার চিরস্থায়ী নিবাসে শুয়িয়ে দিতে দিতে নাওফিল চোখের পানি ছেড়ে দিলো আর বিড়বিড়িয়ে উঠল‚ ‘কথা রাখলে না‚ দাদীবু। আমাকে রেখে তুমি একাই চলে গেলে আব্বুর কাছে৷ কিন্তু আমিও আসব একদিন। অপেক্ষায় থেকো আমার।’
মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা৷ প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে দীধিতির ঘুম ভাঙল। এমনিতেই দিনে-রাতে অসংখ্যবার বাথরুমে দৌড়তে হয় ছোটো কাজের জন্য। শীতের রাতে কী যে কষ্টকর তা৷ তার ওপর খিদে বেড়েছে তার৷ গর্ভাবস্থার চার মাস চলে কিনা! খাবারের ব্যবস্থা নাওফিল শোবার ঘরে করে দিয়েছে ঠিকই৷ কিন্তু কমফোর্টারের ভেতর থেকে বের হওয়ায় তো বিড়ম্বনার। ভাগ্যক্রমে নাওফিল ঘরে থাকলে বা জেগে থাকলে সে-ই এনে দেয় খাবার বিছানাতে। মাঝেমধ্যে চাইলে খায়িয়েও দেয়৷ কিন্তু তাকে তো ঠিকঠাক পাশে পাওয়ায় মুশকিল৷ জান্নাতি বেগমের মৃত্যুরও চার মাস কেটেছে। তারপর কিছুদিন গাজীপুরেই ছিল সে নাওফিলের সঙ্গে৷ কিন্তু মাসখানিক পরই মাহতাব সাহেব‚ জাকির সাহেবের অমতে ওকে নিয়ে নাওফিল চলে এলো উত্তরার বাসাতে৷
মারিহামকে অবশ্য আসতে দেয়নি মাহতাব সাহেব। অদ্ভুতভাবে ইয়াসিফও এখন মাসের বাইশটা দিন গাজীপুরেই থাকছে আর এদিকে তাওসিফ কিরণকে নিয়ে সংসার পেতেছে ঢাকাতে৷ আবার আজই খবর এসেছে মারিহামের সঙ্গে অতি দ্রুতই ইয়াসিফকে জুড়ে দেওয়ার চিন্তা চলছে বাড়িতে। তাতে নাকি ইয়াসিফ‚ মারিহাম‚ কেউ-ই না বলেনি আবার হ্যাঁ-ও বলেনি। তাদের নীরবতাকে তাই সম্মতি ভেবে নিয়েছে সবাই।
পরিবর্তন কেবল সবার মাঝে একটুখানি হলেও নাওফিলের মাঝের পরিবর্তনটা বেশ লক্ষণীয়। শোক কাটিয়ে উঠেছে সবাই। নাওফিলের মাঝেও বাবা-মা বা দাদীর জন্য বিষণ্ণতা আর দেখা যায় না৷ কিন্তু ব্যস্ততা দেখা যায় খুব৷ রাজনীতি‚ ব্যবসা একত্রে সামলানো কষ্টকরই বটে। কিন্তু তবুও নিজের একান্ত মুহূর্ত দীধিতির সাথে কাটানো বা বন্ধু-বান্ধবদের সাথে কাটানোর জন্য সময় সে রাখতই অতীতে। অথচ এখন দেখা যায় সে সময় ঠিকই বের করে। কিন্তু তা কেবল একাকী থাকার জন্য৷ দীধিতি তাই চেয়েছিল অস্ট্রেলিয়া গিয়ে মায়ের কাছে থাকবে৷ তা শুনে নাওফিল কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি৷ কিন্তু একদিন হঠাৎ জেরিনকে আনতে অস্ট্রেলিয়া চলে গেল দীধিতিকে না বলেই৷ অথচ ফিরে এলো সে জেরিনকে ছাড়া। দীধিতিকে দায়সারাভাবে কৈফিয়ত দিলো‚ ‘নতুন বিয়ে হয়েছে তোমার মায়ের৷ তাই তাকে নিয়ে আসা ঠিক মনে হলো না।’
দীধিতি আজ-কাল দেখে‚ রাত তিনটার আগে নাওফিল বিছানাতে আসে না একদিনও। যদিওবা কালেভদ্রে আসে। কিন্তু যন্ত্রমানবের মতো ওর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পর চুপচাপ ঘুমিয়ে যায়৷ সে ঘনিষ্ঠতাও হয় ওদের মাঝে শুধু ওরই ইচ্ছাতে। এই চার মাসের মাঝে ঘটে গেছে আরও একটি দুর্ঘটনা৷ লিয়ামের মৃত্যু হয়েছে৷ স্বাভাবিক মৃত্যু নয়৷ শ্বাসরুদ্ধ করে মারা হয়েছে তাকে। ছেলের হত্যাকারীকে খেপা কুকুরের মতো খুঁজছেন স্যামুয়েল টেলর।
বিছানা ছেড়ে দীধিতি খাবারের পাত্রে হাত বাড়িয়েও কী মনে করে খেলো না। বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। নাওফিল লাইব্রেরির মতো একটা ঘর বানিয়ে নিয়েছে নিজের কাজের জন্য। সে ঘরেই রাতের অর্ধেক সময় কাটিয়ে দেয়৷ তবে সেটা কাজের মধ্যেই৷ কিন্তু দীধিতির কেন যেন মনে হয় কাজের বাহানা কেবল সেটা। না‚ ওর প্রতি অযত্ন বা অনাগ্রহ দেখে না সে নাওফিলের মাঝে৷ মূলত নাওফিলের এমন বিরাট পরিবর্তনটাই ওকে অধৈর্য আর অসহ্য করে তুলছে।
নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে দীধিতি অন্ধকার ঘরটাই দেখতে পেলো কেবল ল্যাপটপ স্ক্রিনের আলো৷ চিবুকে আঙুল ঘষতে ঘষতে নাওফিল কী যেন দেখছে ল্যাপটপে৷ দীধিতি তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে তা সে টেরও পেল না—এতটাই মগ্ন সে স্ক্রিনে৷ যা দেখতে পেল দীধিতি সেই স্ক্রিনে তা দেখার পর প্রচণ্ড রাগে বিরূপ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে পারল না৷ লিয়ামের বোনের ছবিসহ বেশ কিছু তথ্য ইংরেজিতে। যতটুকু চোখ বুলিয়ে পড়তে পারল দীধিতি তা হলো মেয়েটার প্রতিদিনের শিডিউল।
‘তুমি কি ওর প্রতি ইন্ট্রেস্টেড?’ ক্ষিপ্তসুরেই বলে উঠল দীধিতি।
আচমকা ওর উপস্থিতিতে নাওফিল চকিতে পেছন ফিরে কতক পল থমকে রইল। দীধিতি জিজ্ঞেস করল এবার‚ ‘ওর জন্য তোমার আমার সঙ্গে শীতল আচরণ?’
‘স্মরণ‚ কাম ডাউন’‚ বলে ওর হাতটা ধরল নাওফিল। ‘লিয়ামের খুনের ব্যাপারে কথা বলছিলাম তোমার বাবার সঙ্গে। ওর বোনটাকেও সিকিউরিটির মাঝে রাখতে হচ্ছে। তোমার বাবাই একটু আগে কেন কে জানে এই মেয়ের সব কিছু দেখতে পাঠাল।’
জন্মদাতা লোকটার প্রতি এমনতিনেই ভক্তি নেই দীধিতির৷ কোম্পানির কিছু শেয়ার ওর নামে দিয়ে দেওয়াতে আরও বিরক্ত ছিল সে। কেননা এই শেয়ার দেওয়া নিয়ে লিয়াম আর লিয়ামের মা-বোন অসন্তোষ ছিল ওর প্রতি৷ নাওফিলকেও এসব কারণে ভালো ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল৷ তাই সাফসাফ জানিয়ে দিলো দীধিতি‚ ‘তুমি আজকের পর স্যামুয়েল টেলরের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করবে না। এটা আমি আর বরদাস্ত করতে পারছি না।’
‘ও.কে।’ নির্বিকারভাবেই বলল নাওফিল।
‘এখন ঘরে চলো।’
‘আরেকটু পর যাচ্ছি৷ তুমি গিয়ে কিছু খেয়ে শুয়ে পড়ো।’
‘কেন ওকে দেখা শেষ হয়নি?’ চিৎকার করে উঠল দীধিতি হঠাৎ বেজায় রেগে গিয়ে। আরও কিছু বলতে চাইছিল সে৷ তার আগেই নাওফিল ওকে টেনে কোলে বসিয়ে বলল‚ ‘আমি ওই মেয়ের মুখটাতে একবারের বেশি দুবার তাকাইনি‚ স্মরণ।’
‘নাওফিল‚ তুমি চেইঞ্জড। কেন এখন আর আমাকে কাছে পাবার জন্য পাগলামো করো না? কেন আমাকে নিয়ে সময় কাটাও না? আমি মা হচ্ছি এ কথা যেদিন প্রথম জানলে সেদিন ভেবেছিলাম পাগলের মতো খুশি প্রকাশ করবে তুমি। কিন্তু…’
‘স্মরণ‚ আমি তোমাকে বলেছিলাম আগে বহুবার৷ আমাকে তুমি যেভাবে প্রত্যাশা করো সেভাবে আমি নিজেকে প্রকাশ করি কেবল তোমাকে সন্তুষ্ট রাখতেই৷ কিন্তু মূলত আমি খুব বোরিং একটা মানুষ বোধ হয়।’
‘তুমি প্রত্যেকটা মুহূর্তই হাসিখুশি থাকতে। কারণ‚ আমাকে সন্তুষ্ট রাখতে চাইতে৷ এখন আর তা চাও না তাই তো? তার আর প্রয়োজন নেই?’
‘ব্যাপারটা এমন না। আসলে…’ বলতে পারল না নাওফিল। তার ঠোঁট চেপে ধরল দীধিতি নিজের ঠোঁটের সঙ্গে। চুমু খেতে খেতেই নাওফিলের টি-শার্ট খুলতে চাইলে নাওফিল বাধা দিলো কঠিনস্বরে‚ ‘পাগল হয়েছ তুমি? এটা কোনো সঠিক সময় না সঠিক জায়গা?’
‘কেন সঠিক সময়‚ সঠিক জায়গা নয়?’ চিৎকার করে উঠে নাওফিলের কোল থেকে নেমে পড়ল দীধিতি। ‘আগে তো কোনো সময়‚ অসময় ছিল না তোমার কাছে। বেডরুম ছাড়াও তুমি লিভিংরুম‚ ব্যালকনি‚ রুফটপ‚ কিচেন‚ যখন যেখানে ইচ্ছে হয়েছে তখনই আমাকে নিয়ে মনমতো খেলতে। অথচ চার মাসে একেবারে পুরোপুরি ভিন্ন মানুষে পরিণত হয়ে গেলে। এর মানে ঠিক কী বোঝায় আমাকে বলো? আমি তো বুঝতে পারছি না।’
নাওফিল হতবাক হওয়ার সময়টুকুও পেল না৷ কারণ‚ কথাগুলো বলেই দীধিতি আবার তার কোলের ওপর বসে তার বুকে পড়ে কাঁদতে শুরু করল৷ মুড সুয়িং এখন এই মেয়ের নিত্যসঙ্গী৷ তা নাওফিল বোঝে৷ তার ওপর অত্যধিক রাগে বেচারি টেরও পায়নি কী বলেছে সে! মাথা ঠান্ডা হলে যখন মনে পড়বে তখন নিজেই লজ্জায় লাল হয়ে বোবা বনে থাকবে। ওকে বুকের মধ্যেই জড়িয়ে রেখে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে মৃদু হাসল নাওফিল। তারপর বলল‚ ‘সঠিক সময় বলতে আমি তোমার পেটে থাকা মহামান্যের কথা বুঝিয়েছি‚ পাগল। আর সঠিক জায়গার কথা বলেছিও তোমার অসুবিধার চিন্তা করেই। নয়ত আমার কি এতসব দেখার প্রয়োজন পড়ে?’
দীধিতি বুক থেকে মুখটা তুলতেই নাওফিল ওকে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। হা হা করে হেসে উঠে বলল ওকে‚ ‘আগে কী যেন বলতে? তোমার নাকি এসবে আগ্রহ কম? আমি ঠান্ডা না মেরে গেলে তো তোমার অ্যাগ্রেসিভনেস দেখায় হত না।’
আর কোনো জবাব দিলো না দীধিতি৷ ঘাপটি মেরে রইল নীরবে নাওফিলের বুকের মধ্যে৷ শোবার ঘরের দিকে যেতে যেতে নাওফিল তখন ভেবে চলল পুরোপুরি ভিন্ন চিন্তা। দীধিতি যদি কোনোদিন জানে লিয়ামের নিঃশ্বাস বন্ধ করেছে নিজ হাতে ওর স্বামী মানুষটিই? কিংবা দীপ্ত লন্ডন যাবার পর চিরতরের জন্য হারিয়ে গেল ওর প্রিয় স্বামীর জন্যই? এই যে ফিহা আমেরিকা থেকে ফিরে বিয়েতে আজও আগ্রহী নয়৷ স্বামী-স্ত্রীর অন্তরঙ্গতার বিষয়টিতে ভীষণ অদ্ভুত ভয় গ্রাস করে নিয়েছে তাকে৷ কেন নিয়েছে? কারণ‚ এর পেছনেও ওর এই স্বামী পুরুষটিই দায়ী। যে প্রেমিকের সঙ্গে প্রণয়ে লিপ্ত হয়েছিল সেখানে‚ সে পুরুষ ছিল নাওফিলের হাতের পুতুলের মতোই। শারীরিক‚ মানসিক‚ উভয়দিক থেকেই ভয়ঙ্করভাবে ওই পুরুষটি ফিহাকে নিপীড়িত করেছে৷ যা চাইলেও ফিহা কারও কাছে প্রকাশ করতে পারেনি৷ ভাইয়েরা তাকে শাস্তির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য দূরে পাঠালেও তারাও আজ অবধি জানে না‚ তাদের প্রাণ প্রিয় ভাই নাওফিল কখনোই ছাড় দেয়নি এবং দেবেও না। এসব জেনে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে দীধিতি? তা জানার ইচ্ছা একদমই নেই নাওফিলের। যদি কোনোদিন দীধিতি স্বচক্ষেও দেখে তাকে খু্ন করতে। সেটা দীধিতিকে অবিশ্বাস করানোর মতো বহু পন্থা জানা আছে তার৷ দীধিতির সাইকোলজি নিয়ে খেলাটা তার কাছে যে খুবই সোজা৷ আর তাছাড়া মানুষকে ভালো ম্যানিপুলেট করতে পারার গুণটাই বা কেন রয়েছে তার?
এমনকি স্বয়ং মাহতাব শেখও তো ছাড় পাননি। তার অতীতের পাপের গল্পটা জানত কেবল নাওফিলই৷ জাকির শেখ তাকে বারণ করেছিলেন কোনোদিন কাউকে না জানাতে। নাওফিল সে কথা রেখেছিল বটে৷ কিন্তু যখন মানুষটা দীধিতির জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠলেন‚ তখন নাওফিল বহু ভাবনাচিন্তার পর দাদাকে গোপনে শান্ত করে দিলেন এই সত্য উন্মোচনের ঠান্ডা হুমকি দিয়েই৷ যদিও হুমকিস্বরে বলেনি সে। কিন্তু তাতেই কষ্ট পেলেন মাহতাব শেখ‚ নাতিকে ভয়ও পেলেন৷ শেষ বয়সে এসে সারাজীবনের অর্জিত সম্মান হারাতে চাননি তিনি। নয়ত কি আর এমনি এমনি তিনি থেমে গেলেন? মানুষটা নাওফিলকে ভালোও বাসেন প্রচণ্ড৷ সেজন্যই কষ্ট পেলেও নাতিটাকে কাছছাড়া করতে চান না।
আজ অবধি যেই নাওফিলের জীবনের জন্য হুমকির কারণ হয়েছে। তাকেই শাস্তি দিতে বাধ্য হয়েছে নাওফিল। দীধিতির ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হয়নি এবং আগামীতেও হবে না৷ লিয়াম ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছিল ভীষণ তার আর দীধিতির প্রতি৷ ওদের হত্যার পরিকল্পনাও করেছিল স্যামুয়েলের আড়ালেই। কিংবা স্যামুয়েল টের পেলেও তেমন জোরালোভাবে শাসন করেনি ছেলেকে। তাই তো অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিল নাওফিল ছেলেটাকে শেষবারের জন্য সুযোগ দিতে৷ সুযোগটা গ্রহণ করেনি লিয়াম। লিয়ামের বোনও যদি এমন ক্ষতির কারণ হয় তাই আগেভাগেই তার ব্যাপারে আদ্যপ্রান্ত জেনে রাখছে সে৷
দীপ্ত পৌঁছে গিয়েছিল নাওফিলের অতি গোপন পরিচয়ের কাছে৷ নয়ত বন্ধুকে কখনোই সে পরিবার হারা করত না। ‘The Killer Whale cub’ নাওফিলকে আন্ডারওয়ার্ল্ডে অভিহিত করা হয় কেবল এ কারণেই যে‚ সে জগতের বিশেষ কিছু ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে নাওফিল জড়িয়ে পড়েছে বহু আগেই। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করতে হয়েছিল তাকে প্রথম বাইশ বছর বয়সে। অস্ট্রেলিয়াতেই জায়িনকে প্রচণ্ড মাত্রায় ঘৃণা করা পুরোনো এক শত্রুর আক্রমণের শিকার হয়েছিল সে। নিজেকে বাঁচাতে তাকে খুন করতেই হয়েছিল৷ এই এক খুনের কারণে আরও কতশত বার সে আক্রমণের শিকার হলো তা হিসাবহীন৷ সে সময়ই নাওফিল বুঝল‚ সহজ সাধারণভাবে সে বাঁচতে চাইলেও সে পারবে না টিকে থাকতে৷ তার জন্য জায়িন মাহতাব আর আয়মান মেহরিনের সন্তান পরিচয়ই যথেষ্ট যে। ইয়াসিফ আর তাওসিফও সবটা জানার পর বুঝতে পারল‚ সত্যিই নাওফিল কোনোদিন পারবে না জন্মদাতার ফেলে আসা অন্ধকার জগতের বাইরে থেকে নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করতে৷ ভাইয়ের নিরাপদ জীবন ওদের কাছে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তাই সব জেনেও এই দু ভাই নাওফিলের ঢাল হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করেছে৷ আর গোপন রেখে গেছে সবটা জাকির শেখ এবং মাহতাব শেখের থেকেও।
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৯২
দীধিতিকে বিছানায় শুয়িয়ে ওকে নিজের সর্বোস্ব ভালোবাসাটুকু দিয়ে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নাওফিল মনে মনে বলল‚ ‘আমার স্বরূপ যদি চিরকালই এড়িয়ে চলতে হয় আমার প্রিয়জনকে সন্তুষ্ট করতে‚ তবে তা-ই হোক। একটা জীবনে অভিনয় করে ভালো থাকা গেলে অভিনয়ই শ্রেয়।’
সমাপ্ত
