তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ১
আশফিয়া হিয়া
-” এত রাতে এখানে কি করছিস”
গম্ভীর পুরুষালী কন্ঠের ধমকে থতমত খেয়ে গেল অরুনিতা। সবাই আরু বলেই ডাকে।
-‘ আ..স. লে”
-” কি আসলে?এতো রাতে তুই আমার ঘরে এসেছিস তোর বাপ – চাচারা জানে?”
আরু রুদ্ধের পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলালো ইশ এত কিউট মানুষটা। তবে মুখটা দেখ কেমন করলার মতো বানিয়ে রেখেছে যেন ওনাকে কোনো তেঁতো জিনিস খাইয়ে দেয়া হয়েছে। রুদ্ধ আরুর সেই দৃষ্টি দেখেও দেখলো না।
– ” কি হলো।” আবার যেন ধমকে উঠলো মানুষটা।
-” ভুলে.. ভুল করে এই রুমে চলে এসেছি।”
– ” আমাকে তোর মতো গাধাঁ পেয়েছিস? নিজের বাড়িতে কেউ ভুল করে অন্য রুমে চলে আসে?”
– আসলে কি বলুন তো রুদ্ধ ভাই আমার এতো ঘুম পাচ্ছিল, চোখে দেখতে সমস্যা হচ্ছিলো। আর হবে না। ” বলেই রুদ্ধকে পাল্টা জবাবটুকু দেয়ার সময় না দিয়েই কোনো রকম দৌড়ে চলে আসলো নিজের ঘরে। রুদ্ধর ঘরের ঠিক দুটো ঘর পরেই একদম কর্ণারের ঘরটা তার। মাঝে আহি ও রুহানির ঘর পড়েছে।
ঘরে এসে হাফ ছেড়ে বাঁচলো আরু। মানুষটা কেমন জানি শুধু খ্যাট খ্যাট করে। অথচ এই মানুষটাকেই ও মন- প্রাণ দিয়ে বসে আছে সেই বুঝ হওয়ার পর থেকে।
আরু এইবার ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে। ছোটবেলা থেকে যৌথ পরিবারেই বড় হয়েছে আরু। আরুর বাবারা তিন ভাই বড় চাচা আসলাম শেখ তার বড় ছেলে শেখ রুদ্ধ মাহতাব মেয়ে রুহানি শেখ।এইবার অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে। ছোট চাচা আজরাল শেখ তার ছেলে ইয়াজ। ইয়াজ এইবার ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে আরুর সাথেই। আরুর বাবা মেজো বড় মেয়ে অরুনিতা শেখ। ছোট মেয়ে আহিয়া ক্লাস এইটে পড়ছে। ছোট থেকেই দেখে আসছে রুদ্ধ ওকে প্রচন্ড শাসনে রাখে। পান থেকে চুন খসলেই লোকটা ওকে ধমকে ধমকে অস্থির করে তোলে। তবুও এই শাসনেও মাঝেই আরু এমনভাবে পিছলে পড়লো যা থেকে বের হলেই ওর মরণ নিশ্চিত।
রুদ্ধ বাবা- চাচাদের সাথে অফিস সামলায়। আজ সকালে অফিস এ যাওয়ার পূর্বে আরু দেখেছিল রুদ্ধ মোবাইলে অনেক্ষণ ধরে মেসেজ করছিল। ব্যাস আরুর মনে সন্দেহ গেল ডুকে এতক্ষণ ফোণে কি করছে নিম পাতাটা। ফোণটা চেক করার জন্য আরু অপেক্ষা করতে লাগলো। রুদ্ধ বাড়ি ফিরে যেই ওয়াশরুমে ডুকলো ওমনি আরু রুদ্ধর ঘরে প্রবেশ করে মোবাইল খুঁজতে লাগলো। মোবাইল হাতে নিয়ে যেই লক খুলতে যাবে অমনি রুদ্ধ এসে হাজির। আরু কোনে রকম ফোনটা লুকিয়ে আস্তে করে ডিভানের সাইডে ফেলে দিয়েছিল ।ভেবেছে রুদ্ধ বুঝতে পারে নি।
দরজায় প্রচন্ড জোরে ধাক্কার আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল আরুর তার মা মিতা বেগমের গলা শুনা যাচ্ছে।
-” আজ একবার বের হ তুই প্রতিদিন লেট করে কলেজে যেতে হয় একবার কলেজ থেকে কম্পেইন আসুক বুঝাবো আমি।
আরু তাড়াতাড়ি উঠে ফ্রেশ হতে গেল এইগুলো তার মায়ের প্রতিদিনের কাহিনী।
আরু কোনোরকম তৈরী হয়ে ডাইনিং টেবিলে বসলো।
– ” আসতে এসো মা পড়ে যাবে তো।” বাবার কথা শুনে বাবার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো অরু। আজাদ শেখ মেয়ের দিকে মায়াময় দৃষ্টিতে তাকিরে রইল। বড্ড আদরের মেয়ে তার। মা মারা যাওয়ার পর যখন আরু তার কোল জুড়ে এলো তখন থেকেই তার মনে হতো তার মা আরুর মাধ্যমে ফিরে এসেছে তাই হাজার দুষ্টিমি করলেই আরুকে তিনি কিছুই বলতে পারে না।
আরু টেবিলে বসেই পাশেই চেয়ারে তাকালো তার একপাশে রুহানি বসেছে অন্য পাশে আহি মাঝখানে সে বসেছে।
– ” ইশ কিভাবে খাচ্ছে দেখো, এই তুই খাওয়াটা এখনো ঠিক মতো শিখলি না?”
– ” তুইও তো কত কিছু জানিস না তাই তো বড় ভাইয়ার কাছে শুধু বকুনি খাস।
তার কথা শুনে রুহানি মিটিমিটি হাসলো। আরু চোখ গরম করে চাইলো।
– ” চুপ শুধু পাকা পাকা কথা। ”
– ” ঠিকই তো বলেছে।
– ” উফফ আপু তুমিও। একেই তোমার ভাই এর জ্বালায় শান্তিতে থাকতেই পারছি না।”
– ” আমার ভাই তোকে কি করলো শুনি?” বলেই ভ্রু নাচালো। অরু থতমত খেয়ে গেল।
– ” এখনো দুজন মিলে গুজর গুজর শুরু করেছে তাড়াতাড়ি খেয়ে উঠ দুজনে তোর মা দেখলে কিন্তু আবার বকবে আরু। ”
বড় মা রুমা বেগমের কথা শুনে আরু তাড়াতাড়ি খাওয়া ধরলো। রুহানি আহিকে নিয়ে গেল স্কুলের জন্য তৈরি করে দিতে । আজকে তার ভার্সিটির অফ ডে। সে বাড়িতেই থাকবে।
খাওয়ার মাঝেই সিড়ি দিয়ে রুদ্ধকে নামতে দেখা গেলো, অরু খাওয়া বাদ দিয়ে তার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। রুদ্ধ দেখেও চোখ সরিয়ে নিল। আরু ভেংচি কাটলো বিড়বিড় করলো,
– ” ঢং।”
– ” কি বিড়বিড় করছিস জলদি খেয়ে উঠ।” মিতা বেগমের কথা শুনে নড়েচড়ে উঠলো আরু। আরুর পাশের চেয়ার খালি দেখে রুদ্ধ আরুর পাশেই এসে বসলো। তাকে দেখে মা – চাচিরা সব ব্যস্ত হয়ে পড়লো খাবার এগিয়ে দিতে। রুদ্ধ বাবা- চাচাদের সাথে টুকটাক ব্যবসা নিয়ে কথা বলল।
সবার খাওয়া শেষ হতেই যে যার মতো উঠে পড়লো। আরু পড়েছে মুশকিলে সে তো উঠে যেতেই চাইছে কিন্ত এই নিমপাতা তার হাত ধরে রেখেছে চাইলেও ছাড়াতে পারছে না।
– ” ছাড়ুন। আমার দেরি হচ্ছে।”
– ” আমার ফোন ধরেছিলি কেনো?”
আরুর বুকের ভেতরটা ধ্বক করে উঠলো, গন্ডারটা এটাও দেখে নিয়েছে। এখন কি হবে?
