তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ১০
আশফিয়া হিয়া
পুরোরুম অন্ধকারে আছন্ন হয়ে আছে। জানালার ফাঁক দিয়ে সামান্য আলো রুমে প্রবেশ করছে। পিঠ পর্যন্ত পাতলা সাদা চাদর জড়িয়ে রুদ্ধ ঘুমিয়ে ছিল। হঠাৎ নুপুরের রিনরিনে আওয়াজে রুদ্ধর ঘুম হালকা হয়ে গেল। উপুড় থেকে এবার সোজা হয়ে শুয়েছে। দরজাটা এবার একটু একটু করে ফাঁক করা হচ্ছে। এবার দরজার ফাঁক দিয়ে খুব চেনা – পরিচিত প্রিয় একটা মুখ উঁকি দিল। রুদ্ধকে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরু থতমত খেয়ে মুখ সরিয়ে নিল। সময় নিয়ে নিজেকে ঠিকঠিক করে এবার দরজায় টোকা দিল।
– ” আসতে পারি?”
– ” অর্ধেক তো চলেই এসেছিস বাকিটুকুও চলে আয়।”
রুদ্ধর কন্ঠে স্পষ্ট বিদ্রুপ।আরু ভেংচি কেটে ভেতরে এলো।
– ” বড় মা আপনাকে ডাকতে পাঠিয়েছে।”
– ” আসছি।” আরু উশখুশ করতে লাগল এবার। অহেতুক পায়ের শব্দ তুলে রুদ্ধর মনোযোগ ঘোরাতে চাইছে।
– ” এটা পড়ে আমাকে কেমন লাগছে রুদ্ধ ভাই।” আরু এবার সরাসরি প্রশ্ন করেই ফেলল।
রুদ্ধ আরুর পায়েক দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মনে মনে বলল,
– ” ভয়ংকর সুন্দর।” তবে মুখে বলল।
– ” ভালো লাগছে।”
– ” শুধু ভালো?”
– ” হুম।” আরুর আরো কিছুটা প্রশংসা আশা করেছিল রুদ্ধর থেকে। খারুশ একটা আমার প্রশংসা করতে গেলেই উনার শব্দের ভান্ডার ফুরিয়ে যায়।
– ” কি বিড়বিড় করছিস?”
– ” কিছু না তো।”
– ” তোর মামাতো ভাই আছে না একটা, কি যেন নাম?”
– ” আপনি উনার নাম ভুলে গেছেন উনার নাম তো রোহান। কথাটা বলার সময় আরুর মুখটা বেশ উচ্ছাসিত দেখাল না? রুদ্ধর মুখটা থমথমে হয়ে গেল। বেড থেকে উঠে আরুর মুখোমুখি দাঁড়াল।
– ” আজ যেনো তোকে বেশি হা হা হি হি করতে না দেখি। আর পারলে রুম থেকেই বের হওয়ার প্রয়োজন নেই।”
– ” মামা – মামি আসবে আর আমি রুম থেকে বের হবো না বিষয়টা খারাপ দেখাবেনা?”
– ” শুধুই কি মামা – মামীর জন্য বলছিস?” কথাটা হিসহিসে বলল।
আরু বুঝল রুদ্ধ রেগে যাচ্ছে। আর কেনো রেগে যাচ্ছে সেটাও সে ভালো করেই জানে। এই সুযোগ কি সহজেই হাত ছাড়া করা যায়? আরু এবার রুদ্ধর থেকে খানিকটা পিছিয়ে গেল। রুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে আরুর দিকে চাইল। কি করতে চাইছে ও?
– ” মামা – মামী তো আছেই সাথে রোহান ভাইয়া এতদিন পরে আসছে তার সাথে জমিয়ে আড্ডা দিতে হবে না?” কথাটা বলেই ভো দৌড়।
রুদ্ধ পেছন থেকে আরু বলে ধমকে উঠল। আরু সে ধমক শুনলে তো সে অনেক আগেই রুদ্ধর রুম পেরিয়ে গেছে।
বাড়িতে রান্নার আয়োজন চলছে। আজ অনেক দিন পর মিতা বেগমের বাপের বাড়িত লোকজন আসছে। ভালো মন্দ রান্নার আয়োজন করতে হবে না? রুমা বেগম রোস্ট এ মশরা মেখে মেরিনেট করে রাখছে। সুমিতা বেগম মশলা পেস্ট করছেন। আরু রান্নাঘরে এসে মা – চাচিদের কাজ মনোযোগ দিয়ে দেখল। আরুকে দেখে রুমা বেগম মা – চাচিদের কাজ দেখছে। আর কিছু ভেবে চলেছে।
– ” মা পায়েসটা আমি রান্না করি?”
-” একদম না আজ বাড়িতে মানুষজন আসছে আজ আর তোমাকে রান্নাটা নষ্ট করতে হবে না। ”
আরুর মুখটা চুপসে গেল এমনি সারাদিন কাজ করে না বলে মা বকতে থাকে কাজ করতে গেলেই বলবে এটা পারবে না ওটা পারবে না। আরু এবার বড় মায়ের দিকে তাকাল।
– ” থাক না করতে দে ওকে এখন থেকে না করলে শিখবে কিভাবে কদিন পর শশুর বাড়ি যেতে হবে না?”
আরু লজ্জা পেয়ে বিড়বিড় করল,
– “এটাই তো আমার শশুড়বাড়ি। ”
– ” ঠিক আছে রান্না করিস তবে আমাদের রান্না হয়ে গেলে তারপর, এখন এখানে কিছু এলোমোলো করা চলবে না অনেক কাজ এখন।”
– ” আচ্ছা।”
আরু খুশি মনে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল। আজ পায়েস রান্না করে রুদ্ধকে চমকে দেবে।
রান্নাঘর এখন ফাঁকা। পায়েস রান্নার যা যা প্রয়োজন মিতা বেগম সব গুছিয়ে দিয়ে গেছেন। আরুর সাথে আহিও এলো রান্নাঘরে আরুর পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে আর পন্ডিতের মতো আরুকে এটা সেটা বলছে। আরু ওকে আপাতত পাট্টা দিচ্ছে না সে মন দিয়ে পায়েস বানাতে ব্যস্ত। দুধ ঘন করে জাল দিয়ে নিল। এরপর তাতে এলাচের গুড়ো দিল। ভেঙ্গে রাখা চালগুলো দিয়ে ভালোভাবে ফুটিয়ে নিল। চাল ফুটে গেলে তাতে গুড় ও গুড়ো দুধ দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিল। রুদ্ধর গুড়ের এই পায়েস খুব পছন্দের ঘন হয়ে আসতেই বড় বাটিতে ঢেলে ঠান্ডা করল। এরপর সেটা ফ্রিজে রেখে এল। আহি ভেবেছিল আরু হয়তো রান্নাঘর এলোমেলো করে ফেলবে। তবে আরুকে এত গুছিয়ে কাজ করতে দেখে সে ছুটল রুহানির রুমে।
বাড়িতে অতিথিরা চলে এসেছে আরোও আধঘন্টা আগেই। আরু শাওয়ার নিয়ে নিচে নামল। বড়রা সবাই সোফায় বসে কথা বলছে। রুদ্ধ সৌজন্যতার জন্য সামনে বসে টুকটাক কথা বলছে। মুখটা অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে আছে। তার কারণও আছে অবশ্য। তার সামনের সোফাতেই রোহান আহির সাথে কথা বলছে আর ওকে ক্ষেপাচ্ছে। ওদের কান্ড দেখে বড়রাও হাসছে। ওদের দেখে ইয়াজ বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে। তার এইসব আদিখ্যাতা মনে হচ্ছে।আরু আসাতে সবার চোখ তার দিকেই গেল। শাওয়ার নেওয়ার কারণে মুখটা অত্যন্ত সিগ্ধ লাগছে। রুদ্ধ এক ধ্যানে কতক্ষণ আরুর দিকে তাকিয়ে ছিল। আরুও এসেছেই সবার আগে রুদ্ধর দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। এরপর মামা – মামীকে সালাম দিল। মামী ইলিনা বেগম তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে দিল।
– ” তোর পড়াশোনা কেমন চলছে মা?”
– ” ভালো মামা।” বাড়িতে কেউ এলেই পড়াএ কথা বলবে কি এক জ্বালা।
– ” এইএসসিতে ভালো ফলাফল করবে তো?”
– ” ইনশাল্লাহ্।”
তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৯
রোহান আরুকে দেখেই মুচকি হাসল। তার পাশে এসে বসতে বলল। আরু ভয়ে ভয়ে রোহানের একপাশে গিয়ে বসল। ভয়ে সে রুদ্ধর দিকে তাকাতে পারছে না। নিশ্চয় রুদ্ধ চোয়াল শক্ত করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আরু রোহানের পাশে গিয়ে বসতেই রুদ্ধর হাত মুঠিবদ্ধ করে ফেলল।
