Home প্রফেসর জিয়ান কায়সার প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৮

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৮

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৮
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না

রিত্তিকা তাড়াহুড়ো করে ফোনটা সাইলেন্ট করে ফেলল। কিন্তু জিয়ান স্যারের রাগী চাউনি তখনো তার ওপর থেকে সরল না।।
“ইজ দিস হোয়াট আ রিংটোন সাউন্ডস লাইক?! ডোন্ট ইউ হ্যাভ দ্য মিনিমাম সেন্স টু সাইলেন্স ইয়োর ফোন বিফোর এন্টারিং দ্য ক্লাস? লিভ মাই ক্লাস রাইট নাউ। জাস্ট আউট!”
বাট স্যার…
__”জাস্ট শাট আপ, মিস রিত্তিকা! আপনি নিজেকে কী মনে করেন, হ্যাঁ? আপনি যখন যা খুশি তাই করবেন, আর আমি রোবটের মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখব? ভাবছেন আপনাকে আমি কিছুই বলব না? জাস্ট ওয়াও! মানতেই হবে, ন্যূনতম ভদ্রতাবোধ বা শিক্ষা আপনার ভেতর নেই। পড়াশোনার নামে ভার্সিটিতে এসে ইয়ার্কি মারেন আপনি! আমার তো এটাই মাথায় ঢুকছে না যে, আপনার মতো একটা মেয়ে এই ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেল কীভাবে, মিস?!” প্রফেসর জিয়ানের কণ্ঠস্বর তখন রাগে কাঁপছিল।
​জিয়ানের করা এই চরম অপমানে রিত্তিকার ফর্সা মুখটা মুহূর্তে লাল হয়ে উঠল। সে নিজের আত্মসম্মান ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে তীব্র অথচ কাঁপানো গলায় বলল,

__ “দেখুন স্যার! আপনি আমাকে এভাবে অপমান করতে পারেন না আর আমার পড়াশোনা বা যোগ্যতা নিয়ে কোনো কথা বলার অধিকার আপনার নেই!”
__​”আপনি একজন প্রফেসরের মুখে মুখে তর্ক করছেন! লাইক সিরিয়াসলি?! আপনার সাহস তো কম নয়, মানতেই হবে। জাস্ট গেট আউট ফ্রম মাই ক্লাস!” জিয়ান হাত উঁচিয়ে দরজার দিকে ইশারা করল।
রিত্তিকা আর একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। অপমানে, ক্ষোভে তার চোখ দুটো নোনা জলে টলমল করে উঠল। সে দ্রুত টেবিল থেকে নিজের ব্যাগটা টেনে নিল এবং ক্লাস থেকে হনহন করে বেরিয়ে গেল।
​প্রফেসর জিয়ান এর আগেও বহুবার তাকে সবার সামনে ছোট করেছে, কারণে-অকারণে অপমান করেছে। কিন্তু কখনো রিত্তিকার কখনো খারাপ লাগেনি,সে কখনো কারোর কথা গায়ে মাখে না , কখনো অন্যার কথায় সে এতটা কষ্ট পায়নি। কিন্তু আজ? আজ জিয়ানের করা প্রতিটি বিষাক্ত শব্দ তীরের মতো এসে তার কলিজায় বিঁধেছে। বুক ফেটে কান্না আসছিল তার।

​ভার্সিটি থেকে সোজা বাড়ি ফিরে এল রিত্তিকা। ড্রয়িংরুমে কারো দিকে না তাকিয়ে, কোনো কথা না বলে সে সোজা নিজের রুমে গিয়ে ভেতরের দিকে শক্ত করে দরজাটা লক করে দিল।
​কিছুক্ষণ পরেই মা শানজাদা ইসলাম রিত্তিকার রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। দরজায় মৃদু নক করে চিন্তিত গলায় বললেন,
__ “রিত্তি? বাড়ি ফিরেই এভাবে ধপ করে ঘরের দরজা আটকে দিলি যে? কিছু হয়েছে রে মা?”
​ভেতর থেকে রিত্তিকা নিজের কান্নার বেগ আড়াল করার জন্য গলাটা যথাসম্ভব স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। জবাব দিল, “না মা, কিছু হয়নি। শরীরটা একটু ম্যাজম্যাজ করছে, কেমন যেন ভালো লাগছে না। একটা শাওয়ার নিয়ে একটু ঘুমাবো।”

“আচ্ছা ঠিক আছে, ফ্রেশ হয়ে নে। আর শোন, আজ কিন্তু তোর দল আসবে বলেছে। নিচে নামিস।” শানজাদা ইসলাম আর কথা না বাড়িয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।
​মায়ের পায়ের আওয়াজ মিলিয়ে যেতেই রিত্তিকা বিছানায় লুটিয়ে পড়ল। —বালিশে মুখ গুঁজে, নিজের কান্নার আওয়াজ চেপে সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। তার মনে শুধু একটা প্রশ্নই বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল—
__”আমি কি এতটাই খারাপ? কেন আমার প্রতি আপনার এত অনীহা, এত অপছন্দ? কী এমন অপরাধ করেছি আমি, যার জন্য প্রতিনিয়ত আপনার এমন অবহেলা আর রুক্ষ আচরণ সইতে হয়?
​কই, অন্য সবার সাথে তো আপনি এমন করেন না! তাদের সাথে আপনার ব্যবহার কত সহজ, কত স্বাভাবিক। তবে শুধু আমার বেলাতেই কেন এত দেয়াল, এত দূরত্ব? কী দোষ ছিল আমার?
​প্রথম দেখাতেই আপনার প্রতি এক অদ্ভুত টান তৈরি হয়েছিল।আপনাকে দেখলেই কেমন জানি লাগতো মনের ভেতরে। আমি জানি, আপনাকে পাওয়া হয়তো অসম্ভব, এক আকাশ কুসুম কল্পনা। তবুও এই অবুঝ মন কোনো এক অলৌকিক আশায় বারবার আপনাকেই চেয়ে যায়, আপনাকেই পাওয়ার চেষ্টা করে।”
কান্না করতে -করতেই রিত্তিকা ঘুমিয়ে গেল।

​ভার্সিটির কোলাহল শেষ করে জিয়ান যখন কায়সার ম্যানশনে নিজের ঘরে ফিরল, তখন তার পুরো মুখাবয়ব জুড়ে এক চরম অসন্তোষের ছায়া। রুমে ঢুকেই সে সশব্দে দরজাটা বন্ধ করে দিল, যেন বাইরের পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি আর বিরক্তি সে এই দরজার ওপাশেই আটকে রাখতে চায়।
​আজ নিজের ওপরই তার প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। এক তীব্র ক্ষোভ আর মেজাজের পারদ যেন কিছুতেই নামছে না। টাইটা টেনে এক ঝটকায় আলগা করে সে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে লাগল। যতবার সে রিত্তিকা নামের ওই মেয়েটা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে, মেয়েটা ততবার কোনো না কোনো উছিলায় তার চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। এই বিষাক্ত উপস্থিতি জিয়ানের সহ্যশক্তির সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
​মনের ভেতরের তীব্র অসন্তোষ উগরে দিয়ে জিয়ান একা একাই বলতে লাগল,
“কেন? কেন তুমি বারবার আমার সামনে আসো? তোমার এই অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি আমার শান্ত জীবনটাকে বিষিয়ে তুলছে। এতদিন তো শুধু ভার্সিটির চার দেওয়ালে তোমাকে সহ্য করতে হতো, এখন আমার এই ব্যক্তিগত জীবনের আশেপাশেও তোমার ছায়া দেখতে পাচ্ছি! যত দূরে, যত আড়ালে তোমাকে ঠেলে দিতে চাই—তুমি তত বেশি করে আমার সামনে এসে পথ আগলে দাঁড়াও।”

আজ ক্লাসরুমে সবার সামনে মেয়েটাকে ওভাবে অপমান করার পর তার মনে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা বা অপরাধবোধ নেই। বরং সে মনে করে, রিত্তিকার মতো মেয়েদের ঠিক এভাবেই শিক্ষা দেওয়া উচিত। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের শক্ত, কঠোর চোখের দিকে তাকিয়ে জিয়ান শীতল গলায় বলল,
“হ্যাঁ, আমি জানি আজ সবার সামনে আমি একটু বেশিই কড়া কথা শুনিয়েছি। কিন্তু এটাই তোমার জন্য একদম উপযুক্ত পাওনা ছিল, মিস রিত্তিকা! তুমি নিজের সীমানা ভুলে যাচ্ছ। তুমি আমার থেকে যে মনোযোগ বা যা কিছু আশা করো—তা কোনোদিনও সম্ভব নয়। তোমার ওই অলীক স্বপ্ন আর সস্তা আবেগ আমার কাছে চরম বিরক্তিকর ছাড়া আর কিছুই নয়, মিস ওভার রিয়াক্টের দোকান!”
একটু থেমে জিয়ান একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সে যেন রিত্তিকার উদ্দেশ্যেই শেষ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করল,
“তোমার ওই কান্নাকাটি আর ন্যাকামো দিয়ে আর যাই হোক, জিয়ান কায়সারকে গলানো অসম্ভব। যত দ্রুত তুমি আমার চারপাশ থেকে বিদায় নেবে, ততই তোমার জন্য ভালো। কারণ আমার জীবনে তোমার ওই আবেগের কোনো স্থান নেই।”

রাত ৯ টা, ​জিয়ান ভারী কদমে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল তার বিশাল বেলকনির দিকে। চারপাশটা কেমন যেন থমথমে, নিঝুম। রাতের আকাশে রুপোলি চাঁদটা আজ আর চেনা আলো ছড়াচ্ছে না; এক টুকরো কালো মেঘের আড়ালে সে নিজেকে সযতনে লুকিয়ে রেখেছে। মনে হচ্ছে, জিয়ানের মনের ভেতরের জমে থাকা কষ্টগুলো যেন প্রকৃতির বুকেও ভর করেছে, তাই চাঁদটাও আজ অভিমানে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে।
​সেই মলিন চাঁদের দিকে একমনে শূন্য চোখে তাকিয়ে রইল জিয়ান। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা আর হাহাকার মোচড় দিয়ে উঠল। নিজের অজান্তেই, অবদমিত কোনো এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় জিয়ানের ঠোঁট গলে সুর বেরিয়ে এলো। সে গেয়ে উঠল—
__”কোথায় পাবো বল.. কোন খানে তুই..!
–কোথায় তোর দেশ আজ যাবোই..!”

ঠিক একই সময়ে, রাতের এই একই প্রহরে, নিজ ঘরের জানালার গ্রিল ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল রিত্তিকা। চোখের কোণে শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগ নিয়ে সে-ও যেন ওই মেঘে ঢাকা চাঁদের মাঝেই কাউকে খুঁজছিল। জিয়ানের দেওয়া প্রতিটা আঘাতের শব্দ তার কানে তখনও প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। রাত গভীর হতে থাকে, আর রিত্তিকা শূন্যতায় তাকিয়ে গুনগুন করে গেয়ে ওঠে তার হৃদয়ের সমস্ত আকুতি—
______​”ভেবেই কেটেছে প্রহর..!
_____আমি তো হয়ে গেছি তোর..!
___জেগে রয়েছি রাত ভর..!
__আমি তো হয়ে গেছি তোর…!”
ঠিক সেই গানের মাঝেই রিত্তিকার ঘরের দরজায় আচমকা ধুপধাপ আওয়াজ উঠল। বাইরে থেকে চিৎকার করে তাকে ডাকতে শুরু করল রিদিতা আর রিহান। তারা রিত্তিকার আপন চাচাতো ভাইবোন, ঘরের প্রাণ। রিত্তিকার থেকে ১ বছরের ছোট তারা। দুইজন জমজ। গত কিছুদিন তারা নানির বাসায় বেড়াতে গিয়েছিল, আর আজই বাড়ি ফিরেছে। রিত্তিকা ভেতর থেকে দরজা না খোলা পর্যন্ত তারা অবিরাম ডেকেই গেল, দরজায় করাঘাত করতেই থাকল।
​বিরক্ত হয়ে রিত্তিকা চোখ মুছে এক ঝটকায় দরজা খুলে দাঁড়াল। রাগ দেখিয়ে বলল,

“কী হয়েছে রে তোদের? একদল আবা*ল কোথাকার! কানের কাছে এসে এত ভ্যা ভ্যা করছিস কেন বল তো? শান্তিতে একটু থাকতে দিবি না?”
রিহান দুই হাত উল্টে আকাশ থেকে পড়ার ভান করে বলল,
“যাহ বাবা! এখন আমরা এক নিমেষেই আবা*ল হয়ে গেলাম? মাত্র দুটো দিন বাড়িতে ছিলাম না, এর মধ্যেই আমাদের এভাবে ভুলে গেলি? বাহ্ রে বাহ্! তোর ভালোবাসা তো খুব ভালো!”
​রিত্তিকা ভ্রু কুঁচকে বলল, “এত নাটক করিস কেন বল তো তোরা? যা তো এখান থেকে, একদম ভালো লাগছে না।”
​এবার রিদিতা যোগ দিল। সে ন্যাকা কান্নার মতো করে নাকে কান্না জুড়ে দিয়ে বলল, “ও আচ্ছা! আমরা এখন নাটক করছি? আমরা তোর জন্য এত করে বলছি, আর
তুই…”
তাদের এই পাগলামি দেখে রিত্তিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নরম সুরে বলল, “উফ, থাম তোরা ভাই! আর কান্নাকাটি করতে হবে না।”
​রিহান আর রিদিতা একযোগে হেসে উঠে বলল, “তাহলে চল আমাদের সাথে নিচে চল। সবাই একসাথে গল্প করব।”
​রিত্তিকা বুঝতে পারল এদের হাত থেকে নিস্তার নেই। সে মলিন হেসে বলল, “চল, না হলে তো তোরা থামবি না, আমি জানি।” এই বলে রিত্তিকা নিজের ভেতরের কষ্টটাকে আড়াল করে তাদের সাথে নিচে চলে গেল।

— অন্যদিকে, কায়সার ম্যানশনের সেই নীরব বেলকনিতে তখন জিয়ানের গান শেষ হয়েছে। কিন্তু চারপাশের শূন্যতা যেন আরও ঘনীভূত হয়েছে। জিয়ান বেলকনির এক কোণে রাখা নরম সোফাটায় ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিল। রাতের শীতল হাওয়াও তার মনের ভেতরের উত্তাপ কমাতে পারছিল না।
​সে ধীরহস্তে পকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটের ভাঁজে ধরল। লাইটারের মৃদু আলোয় জিয়ানের গম্ভীর মুখটা এক মুহূর্তের জন্য জ্বলে উঠেই আবার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৭

​বাতাসে আলতো করে ছেড়ে দেওয়া হালকা ধোঁয়ার অবয়বগুলো যেন জিয়ানের ভেতরের সমস্ত অব্যক্ত ক্ষোভ, জেদ আর এক অদ্ভুত অস্থিরতার গল্প বলছিল। সেই ধোঁয়াটে মায়া অন্ধকার রাতে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছিল, আর জিয়ান শূন্য চোখে তাকিয়ে দেখছিল কীভাবে চারপাশের পরিবেশটা এক নিবিড়, বিষাদময় নিস্তব্ধতায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here