Home রোমান্টিক ভাইয়া রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬৬

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬৬

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬৬
মহাসিন

বিকেল চারটা। প্রকৃতির গায়ে এখন মৃদু রোদের ছোঁয়া। রোদটা আর তেজি নেই, নরম হয়ে এসেছে। আকাশের নীলিমায় বিভিন্ন রঙের পাখিরা ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে। তাদের কিচিরমিচির আওয়াজে চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে টু’ক’রো টু’ক’রো হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে প্রকৃতি নিজেই গান ধরেছে।
সেই সাথে বইছে মৃদু হাওয়া। এই হাওয়ায় গাছের পাতাগুলো সুরসুর করে দুলছে। জানালার পর্দা উড়ছে হালকা তালে।
বসার ঘরটায় দুটো মানুষ বসে আছে।
একজন রিদি বেগম, আরেকজন মৌসুমী বেগম। দুইজনে মিলে নকশি কাঁথা সেলাই করছে। সুঁই সুতোর প্রতিটি ফোঁড়ে ফুটে উঠছে সুন্দর নকশা।
মৌসুমী বেগমের হাত চলছে।
তার স্বামী রুবেল। শাপলা আর শিখার বাবা। মানুষটা সায়েক আহমেদের বড় ফ্যাক্টরির দারোয়ানের কাজ করে। ভোরবেলা বের হয়, ফেরে রাত দশটায়।
কাঁথা সেলাই করতে করতে রিদি বেগম বললেন,

“আজকে শাপলা শিখার বাড়িতে আসার কথা।কখন ফিরবে ওরা?”
“এই তো, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে। দুই পাগলি।”
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়লো।
টুকটুক শব্দটা কানে যেতেই মৌসুমী বেগমের নিস্প্রভ মুখে এক চিলতে আলো খেলে গেল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো একরাশ প্রতীক্ষার হাসি।
মনে মনে ভাবলেন, “হয়তো আমার শাপলা শিখা এসেছে।”
পাশ থেকে রিদি বেগম মুচকি হেসে বললেন,
” ওদের আর এখন ছোট বাচ্চা ভেবে বকাঝকা করবেন না। ওরা এখন বড় হয়েছে। এই বয়সে একটু বেশি শাসন করতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে।”
মৌসুমী বেগম দৃঢ় গলায় বললেন,
“একটু আধটু শাসন করা ভালো। কিছু না বললে ওরা একদম মাথায় চড়ে বসবে।”
কথাটা বলেই তিনি আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন সদর দরজার কাছে। দরজাটা খুলতেই তিনি চমকে উঠলেন।
বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন রুবেল তার স্বামী।
এত তাড়াতাড়ি ফিরেছেন দেখে মৌসুমী বেগম অবাক হয়ে বললেন,

“একী! আজকে যে এত তাড়াতাড়ি চলে এলেন?”
রুবেল কোনো উত্তর দিলেন না। নিঃশব্দে ঘরের ভেতর পা রাখলেন। তারপর চারপাশে উদগ্রীব চোখে তাকাতে লাগলেন। যেন কাউকে খুঁজছেন।
মেয়ে দুটো এসেছে কি না, সেটাই তার চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কোথাও শাপলা শিখার দেখা নেই।
মৌসুমী বেগম স্বামীর কাছে এগিয়ে এসে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“এভাবে কী খুঁজছেন?”
রুবেল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“শাপলা শিখা কোথায়? এখনো আসেনি? ওরা আজ আসবে তাই তো তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়ে চলে এলাম। কতদিন হলো মেয়েদুটোকে দেখি না।”
মৌসুমী বেগম মাথা নেড়ে বললেন,
“না, এখনো তো আসেনি।”
হঠাৎ চেনা কন্ঠস্বর ভেসে এলো,

“আমি চলে এসেছি।”
শাপলার গলা শুনে মৌসুমী বেগম আর রুবেল একসাথে ঘুরে তাকালেন। রিদি বেগমও বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
মেয়েকে দেখে রুবেলের ক্লান্ত মুখে এক ঝলক হাসি ফুটে উঠলো।
শাপলা ধীর পায়ে ঘরে ঢুকল। মাথা নিচু। পায়ের আওয়াজটাও যেন কাঁপছে।
মৌসুমী বেগম শাপলাকে একা দেখে চমকে উঠলেন। কপালে ভাঁজ পড়লো। অবাক হয়ে শুধালেন,
“তুই একা কেন? শিখা কোথায়?”
শাপলার গলা কাঁপছে। সে ঢোক গিলে বলল,
“ও… ও আসেনি।”
“মানে?” মৌসুমী বেগমের ভ্রু কুঁচকে গেল।
এরপর শাপলা সব খুলে বলল। একে একে সব কথা।
কথা শেষ হতেই ঘরের বাতাসটা থমকে গেল।
পরমুহূর্তেই রাগে ফেটে পড়লেন মৌসুমী বেগম।
ঠা স করে একটা চ -ড় বসিয়ে দিলেন শাপলার গা’-লে।
শাপলা “উফ” করে মেঝেতে বসে পড়ল। তারপর হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মায়ের পা দুটো
জ ড়ি য়ে ধরল।

“মা… আমি তো তোমারই মেয়ে। একটা ভুল করে ফেলেছি। আমাকে ক্ষমা করা যায় না মা?”
মৌসুমী বেগম চিৎকার করে উঠলেন। চোখে পানি, গলায় -আ -গু -ন,
“আমাকে মা বলে ডাকবি না! মা বলে ডাকার অধিকার তুই হারিয়ে ফেলেছিস!”
শাপলা কান্না ভেজা চোখে বাবার কাছে ছুটে এলো। “বাবা…”
কিন্তু রুবেল একবারও পেছনে ফিরে তাকালেন না। নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
শাপলা মেঝেতে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো।
“আমি বুঝতে পারিনি বাবা… সত্যি বুঝিনি এমন হবে। আমার কী দোষ বলো?”
মৌসুমী বেগমের চোখে এখন রাগ। ঠোঁট কাঁপছে রাগে আর কষ্টে।
“তুই? তুই সবচেয়ে বড় ভুলটা করেছিস। তুই শিখার সঙ্গ দিয়েছিস। তুই মিথ্যে বলেছিস। শুধু মিথ্যে… মিথ্যে…”
গলার স্বর ক্রমেই চড়ে যাচ্ছে।

“আর আমি কী ভুল করেছি জানিস? তোদের পেটে ধরে আমি ভুল করেছি। তোদের জন্ম দিয়ে আমি ভুল করেছি। তোদের বড় করে আমি ভুল করেছি!”
রিদি বেগম পাশ থেকে আর সহ্য করতে পারলেন না। এগিয়ে এসে বললেন,
“ভাবি, এসব কী বলছেন আপনি? চুপ করুন।”
মৌসুমী বেগম হেসে উঠলেন। এই হাসিতে কোনো আলো ছিল না। শুধু বুক ফাটা কষ্ট।
“হ্যাঁ, আমি শুধু চুপই করবো। এটাই তো করে এসেছি সেই প্রথম থেকে। আমাকে সবাই ঠকিয়েছে রিদি। সবাই। নিজের বোন ঠকিয়েছে। নিজের বাবা ঠকিয়েছে। যে মা পেটে ধরলো সেই মাও ঠকিয়েছে। এমনকি নিজের পেটের মেয়েরাও আজ আমাকে ঠকালো।”
তিনি দুই হাতে মুখ ঢাকলেন। কান্না আর চাপা
য- ন্ত্র- ণা একসাথে বেরিয়ে আসছে।

“আমি কি মানুষ না? আমার কি কোনো স্বপ্ন আশা থাকতে নেই? আমার সাথেই কেন এমন হয় বলতে পারো রিদি? যখন নিজের কাছের মানুষগুলো এভাবে ঠকায়… তখন বুকের ভেতরটা কেমন করে, তুমি জানো?কতো স্বপ্ন ছিলো শিখার খুব ভালো জায়গায় বিয়ে দিবো! বড় করে আয়োজন করবো!”
শাপলা আর সহ্য করতে পারলো না। উঠে দাঁড়িয়ে মাকে জ ড়ি য়ে ধরলো শক্ত করে।
“মা, কান্না করো না এভাবে। প্লিজ। আমি সত্যি বুঝতে পারিনি এমন হবে মা…”
তারপর ধীরে ধীরে মায়ের কাছ থেকে সরে দাঁড়ালো। মায়ের চোখের পানি মুছে দিতে দিতে ফুঁপিয়ে বলল,
“তোমাকে কেন ঠকিয়েছে বলো মা? ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি… আজ বলো।”
মৌসুমী বেগম শূন্য চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন। গলা বুজে আসছে।
“আমার মা বাবা… যারা আমাকে বি –ক্রি করতে চেয়েছিলো। শুধু চায়নি রে, বি—- ক্রিও করে দিয়েছিলো। আমার মামা সেদিন আমাকে ফিরিয়ে না আনলে…”
কথা অসম্পূর্ণ রেখেই চুপ করে গেলেন।
শাপলা মায়ের হাত চেপে ধরলো। “তারপর? তোমার বোন কেন ঠকালো মা?”
মৌসুমী বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চোখের পানি মুছে বললেন,

“সময় হলে বলবো।”
এক মুহূর্ত থেমে আবার বললেন, “আচ্ছা, তুই শিখার ঠিকানাটা দে।”
শাপলার কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে মৌসুমী বেগম আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন না। ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
পেছনে শাপলা কান্না নিয়ে দৌড়ে নিজের ঘরে চলে গেল। তার পিছু পিছু রিদি বেগমও ছুটলেন শাপলা কে সামলাতে।
ঘরটা ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু দেয়ালে লেগে আছে এক মায়ের ভাঙা কান্নার প্রতিধ্বনি।

সময় গড়িয়ে রাত নেমেছে। চারপাশে নিস্তব্ধতা।
শাপলার রুমে হালকা আলো জ্বলছে। সে জানালার পাশে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। চোখের পানি থামছেই না।
রিদি বেগম মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
বসার ঘরটাও থমথমে।
এমন সময় দরজা খুলে মৌসুমী বেগম ফিরলেন। মুখটা ফ্যাকাসে। চোখের নিচে কালি। একরাশ হতাশা আর কষ্ট নিয়ে তিনি ঘরে ঢুকলেন।
তিনি গিয়েছিলেন শিখাকে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু শিখা আসেনি। কোনো কথা না বলে মৌসুমী বেগম সোজা নিজের রুমে চলে গেলেন। দরজাটা শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল।
শাপলা এখানেই অতীত বলা বন্ধ করে দিলো।
নীলাঞ্জনা অধৈর্য হয়ে বলল,

“তারপর কী হলো শাপলা? বলো।”
শাপলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। এর পর দীর্ঘশ্বাস ফেলল ধীর গলায় বলল,
“তারপর যা হলো, তা তো সবারি জানা।”
কলি অবাক হয়ে বলল, “কী জানা?”
শাপলার ঠোঁটের কোণে তেতো হাসি।
“ঠিক তিন দিন পর। সেই ভয়ংকর বাক্সটা এলো। গিফট পেপার দিয়ে মোড়ানো একটা বড় বাক্স।”
সিয়াম কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“আমার মা তোর মাকে কীভাবে ঠকালো? কী করেছিলো?”
“তা মা আর কখনো বলেনি।”

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬৫

সবাই চুপ। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে গেল।
শাপলা উঠে দাঁড়াল। একবার সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার সব কাহিনী বলা শেষ। আমার অতীতের সাথে বর্তমানের কি রা লে র কী সম্পর্ক আমি জানি না। এবার পু লি শই বের করুক।”
কথাটা বলেই সে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল।
যাওয়ার সময় ঠোঁটের কোণে একটা হালকা, ভয়ংকর বাঁকা হাসি খেলে গেল।

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here