Home তোমার নামের রোদ্দুরে তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ২২

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ২২

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ২২
আশফিয়া হিয়া

বিয়ের বাড়ির চারিদিকে হৈচৈয়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ফারিশ এক পাশে চেয়ারে বসে ফোণ স্কোল করছে। রুহানি ভীষণ ছটফট করছে ফারিশের সাথে তার ঝগড়া হয়েছে। বিয়ে বাড়িতে আসার পর থেকেই তার ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আলোপ করেছে। এটা করো না সেটা করো না। শাড়ি পড়বে না। তাই রাগ করে সেও চার কথা শুনিয়ে দিয়েছে। বলতে বলতে একটু বেশিই বলে ফেলেছিল। রাগের মাথায় এটাও বলেছে আমার লাইফ আমি যা ইচ্ছে করবো তুমি বলার কে? ব্যাস সেটায় কাল হয়ে দাঁড়াল। ফারিশ আর একটা কথাও বলেনি চুপচাপ ফোণ কেটে দিয়েছিল। ফারিশের আসার খবর শুনেই সে ব্যালকনিতে তার জন্য অপেক্ষা করছিল। ব্যালকনি থেকে উঠানের দিকটা স্পষ্ট দেখা যায়। ফরিশকে চেয়ারে বসতে দেখে সে আর দেরি করল না ছুটে নিচে চলে এল। এসেই ফারিশের পাশে ধপ করে বসে পড়ল। ফারিশ তারদিকে দেখেও দেখলো না৷ চুপচাপ ফোণ দেখায় মনোযোগ দিল। রুহানি তার হাত থেকে ফোণটা কেড়ে নিল।

– ” কি সমস্যা ইগনোর করছো কেনো আমাকে?”
ফারিশ এবারো কোনো জবাব দিল না।
– ” সরি।”
– ” ফর ওয়াট?”
– ” আমার তোমাকে এভাবে বলা উচিত হয়নি।”
– ” তোমার লাইফ তুমি যা কিছু বলতেই পারো এসব নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যাথা নেই। ”
রুহানি উঠে দাঁড়াল এরপর ফারিশের হাত দুটো ধরে জোড় করে টেনে ভেতরের দিকের নিয়ে এল। ফারিশের কিছুটা ইচ্ছে ছিল বলেই সে টেনে নিতে পেরেছে নাহলে এত বড় মানুষটাকে জোর করে টেনে নেয়া সম্ভব!বাড়িতে প্রবেশ করতেই ফারিশ তার হাত ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নিল। রুহানি তাকে তাকে দুই হাত দিয়ে জাপ্টে ধরল।

– ” সরি সরি এইবারের মতো মাফ করে দাও প্লিজ। রাগের মাথায় বলে ফেলেছি।”
– ” রাগের মাথায় ঠিক কথায় বলেছো।”
– ” এই দেখো কান ধরে উঠবস করছি আর করবো না।”
রুহানি সত্যি সত্যি কান ধরে উঠবস করতে লাগল। ফারিশ বুকে হাত গুজে তার কান্ড দেখতে লাগল। পাঁচবার উঠবস করেই রুহানি বলল,
– ” একি আমি কান ধরে উঠবস করছি তুমি আমাকে আটকাবে না?”
ফারিশ নির্লিপ্ত গলায় বলল,
– ” না।”
রুহানি এবার তার গাল দুটো টেনে ধরে বলল,
– ” ওরেএএ বাবুটা থাক আর রাগ করে না । তোমাকে চকলেট কিনে দেব।
ফারিশটা বিরক্তি নিয়ে তার হাত সরিয়ে দিলেও অন্যদিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। তবে সেটা রুহানি খেয়াল করেনি।

গেটে বরপক্ষ ও কনে পক্ষের মধ্যে তুমুল তর্ক বিতর্ক চলল কিছুক্ষণ। মেয়ে পক্ষরা তার দাবি পূরণ না পর্যন্ত ছাড়বেই না অন্যদিকে ছেলে পক্ষও কম না। ছেলেপক্ষ থেকে কম বয়সী বেশ কয়েকজন ছেলে এসেছে। ছেলের কাজিন হয়তোবা আহির এদের বেশি বিরক্ত লাগছে। সে এবার লেহাঙ্গা দু হাতে উঁচু করে নুহার হাত ধরে একটু সামনে এগিয়ে এল।
– ” দুলাভাই যে এত কিপ্টে সেটা তো জানতাম না। এত কিপ্টে লোকের কাছে আমাদের বোন দেব না।” তার কথা শুনে মেয়ে পক্ষের সবাই হৈহৈ করে উঠল।
এবার ছেলে পক্ষ থেকে এক ছেলে বলে উঠল,
– ” বাব্বাহ ছোট মরিচের দেখি ঝাল বেশি। তা বেয়াইন আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন আগে দেখিনি কেনো? ”

– ” দেখনি এবার ভালো করে দেখে নিন। এবার আসল কাজটা করুন তো টাকা ছাড়ুন নয়তো আমরাও গেট ছাড়ছি না।” আহির কথা বলার সময় ছেলেটা তার দিকে কেমন করে চেয়ে রইল সেটা দেখে আহি কিছুটা মিইয়ে গেল। নুহাকে সামনে এনে সে কিছুটা আড়ালে দাঁড়াল। সেই সুযোগে ইয়াজ তার হাত ধরে টেনে ভীড় থেকে বের হয়ে এল। আহি অবাক হয়ে তা দিকে তাকাল,
– ” কি হয়েছে এভাবে নিয়ে এলে কেনো?”
ইয়াজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– ” তুই গেটে গিয়েছিস কেনো? ওখানে অনেক ছেলেরা আছে জানিস না?”
– ” আমি তো গেট ধরতে গিয়েছি তখন কি কেউ এসব দেখে?”
ইয়াজ তার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
– ” তোকে এত পাকা কথা বলতে কে বলেছে? বেশি পেঁকে গেছিস তাই না দাঁড়া তোর ব্যবস্থা আমি করছি।”
আহি হতবাক হয়ে বলল
– ” কি করেছি আমি এমন করছো কেনো?”
ইয়াজ অভ্যাসবশত যেই না তার চুলে হাত দিতে যাবে আহি আতঁকে পেছনে সরে গেল।
– ” পাগল হয়ে গেছ! চুলে হাত দিচ্ছো কেনো আমার চুল নষ্ট হয়ে যাবে তো।”
– ” হোক তোর চুল একেবারে নষ্ট হয়ে যাক।”
আহি বিড়বিড় করে তাকে বকতে লাগল।
ইয়াজ এবার প্রচন্ড জোরে ধমক লাগাল,
– ” যেখানে আরু নেই রুহানি আপু নেই সেখানে তুই কি করছিস যা ভেতরে যা।”
তার ধমকের চোটে আহির ঠোঁট কেঁপে উঠল। আশে পাশে অনেকেই তাকিয়েছে সেটা দেখে আহির আরোও কান্না পেয়ে গেল। সে নাক টানতে টানতে বাড়ির দিকে চলে গেল। ইয়াজ মাথার এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করতে করতে বাবা – চাচাদের দিকে এগিয়ে গেল।

একটু পরেই পিহুকে বিয়ে পড়ানো হবে। বরপক্ষের খাবার – দাবারের দিকটা রোহানকেই দেখতে হবে। পরবর্তীতে সে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। আরুর সাথে কথা বলার সময়টুকু সে পাবে না। তাই কথা বলার জন্য এই সময়টুকুকেই সে উপযুক্ত মনে করেছে। আরু ও রোহান যেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে সেটা প্যান্ডেলের পেছনের দিকটায়। এইদিকটাই তেমন কোনো লোকসমাগম নেই তাই সে কথা বলার জন্য আরুকে এখানেই নিয়ে এল। রোহান অনেকক্ষণ ধরেই চুপ করে রয়েছে আরুর এবার ধৈর্যের বাঁধ মানছে না। আর কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে সে রুদ্ধ জানতে পারলে তার খবর করে ছাড়বে।
– ” কি হলো রোহান ভাইয়া কিছু বলছেন না কেনো?”
রোহান গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
– ” তোমাকে আজ ভীষণ সুন্দর লাগছে আরু।”
আরু বিরক্তি কন্ঠে বলল,
– ” আপনি কি আমাকে এখানে এটা বলার জন্য ডেকেছেন?”
রোহান পকেট থেকে একটি লেভেন্ডা রঙের ফুল বের করল। আরু কিছু বুঝার আগেই তার কানে ফুল গুজে দিল। আরু ভীষণ অপ্রস্তুত বোধ করল। কানে গুজা ফুলে হাত দিয়ে অবাক চোখে রোহানের দিকে তাকাল। সেটি দেখেই দূরে দাঁড়ানো রুদ্ধর হাত জোড়া মুঠিবদ্ধ হয়ে এল। রাগে তার চোখ জোড়া ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠছে।

– ” দেখো আরু আমি সরাসরি কথা বলতে পছন্দ করি। তোমাকে কথাটা আমি অনেকদিন ধরে বলতে চেয়েও বলতে পারি নি। আমি তোমাকে ভীষণ পছন্দ করি সেটা অনেক আগে থেকেই। তুমি রাজি থাকলে আমি বাড়িতে বিয়ের কথা বলতে চাই।” কথাগুলো এক নিশ্বাসে বলে রোহান থামল। এবার সে উওরের অপেক্ষায় আরু মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
আরু এতটাই অবাক হয়েছে সে কিছু বলতেও পারছে না। সে রোহানের থেকে এমন কিছু মোটেই আশা করেনি। অপ্রত্যাশিত কিছু শুনলে যেমন আমাদের মুখ থেকে কথা বের হতে চায় না আরুর ক্ষেএে ঠিক সেটাই হয়েছে। আরুকে চুপ থাকতে দেখে রুদ্ধ আরোও রেগে গেল। সে তাদের দিকে এগিয়ে যেতে গিয়েও গেল না। সে দেখতে চাইছে আরু ঠিক কি বলে। এরমধ্যে নিধি এসে তার পাশে দাঁড়াল। রুদ্ধ কারোর উপস্থিতি টের পেয়েও সেদিকে ফেরে চাইল না সে এক ধ্যানে আরুর দিকে চেয়ে রইল। নিধি বলল,

– ” ওদের মধ্যে কিছু চলছে নাকি? দুজনকে কিন্তু খুব মানিয়েছে।”
রুদ্ধ তার দিকে অগ্নিঝরা দৃষ্টিটে চাইল। তার সেই দৃষ্টি দেখে রুহানির আর কিছু বলার সাহস হলো না সে চুপচাপ প্রস্থান করল। রুদ্ধ আর দাঁড়াল না সেখানে গটগট শব্দ করে সেখান থেকে যেতে লাগল। তার পায়ের শব্দ এতটাই তীব্র ছিল যা আরু ও রোহানের কান অব্দি পৌছে গেল। আরু রুদ্ধকে দেখেই ভীত হলো। রুদ্ধ তাকে ভুল বুঝবে না তো? সে দীর্ঘশ্বাস টেনে রোহানের দিকে তাকিয়ে এক নিশ্বাসে বলতে শুরু করল,
– ” দেখুন আমি আপনাকে কখনো সেই চোখে দেখিনি। বলতে পারেন আমার জীবনে কাউকে সে চোখে দেখার সুযোগই পায়নি তার আগেই আমার মনটা আমি অন্য জায়গায় দিয়ে ফেলেছি। সেখান থেকে বেরিয়ে এলে আমার মৃত্যু নিশ্চিত। আশা করছি আপনি এই ব্যাপারটা নিয়ে কখনো আর প্রশ্ন করবেন না?”
রোহান ব্যাথিত কন্ঠে বলল,

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ২১

– ” সেই মানুষটা কি রুদ্ধ ভাই?”
আরু ওপর – নিচ মাথা নাড়িয়ে রুদ্ধ যেদিকে গিয়েছে সেদিকে দৌড় লাগাল। রোহান তার যাওয়ার দিকে ব্যাথিত চোখে তাকিয়ে রইল।

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ২৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here