তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ২৪
আশফিয়া হিয়া
সবুজ গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে আঁকাবাঁকা রাস্তায় গাড়ি এগিয়ে চলেছে হালকা বাতাসে আরুর মনটা প্রশান্তিতে ভরে উঠেছে। গাড়ির জানালায় মাথা রেখে সুন্দর আবহাওটা উপভোগ করছিল আরু। হঠাৎ রুদ্ধ তার মাথাটা টেনে ভেতরে দিকে নিয়ে এল। আরু তার দিকে তাকাতেই রুদ্ধ ধমক দিয়ে বলল মাথা যেন বাইরে না যায়। আরু আর কি করবে চুপচাপ বসে রইল। সামনে থেকে এসব শুনে নিধি সহ্য করতে পারছে না। রুদ্ধর সাথে তার বিয়ের কথা চলছে বিষয়টা শুনেই তো সে এগিয়েছে। সত্যিকার অর্থে রুদ্ধ একজন সুপুরুষ এমন পুরুষকে বিয়ে করতে কে না রাজি হবে। সেও রাজি হয়ে গিয়েছিল। তবে এখন তো মনে হচ্ছে রুদ্ধ তার ব্যাপারে ইন্টারেস্ট নয়। কিছুক্ষণ আগেই তো সে যখন রুদ্ধর পাশে বসতে চেয়েছিল রুদ্ধ তাকে সামনে পাঠিয়ে দিল। আরুকে যত্ন করে খাবার ও খাইয়ে দিল। সবটাই তার চোখে পড়েছে এগুলো কি শুধু বোন হিসেবেই করেছে? তার তো ভিন্ন কিছু মনে হচ্ছে। নিধি আর কিছু ভাবতে চাইল না বাড়ি গিয়েই মাকেই বলবে সব।
___________________
বৃষ্টি মানেই একটা আলাদা অনুভূতি—রোমান্টিক, শান্ত, কখনো আবার বিষণ্ণ। চারিদিকে বৃষ্টির পানিতে থৈ থৈ করছে। ঘড়িতে এখন রাত ৮ টা। সারাদিন জার্নি করে আরুর ক্লান্ত লাগছিল। বাড়িতে এসেই ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। বৃষ্টির ঝাপটায় তার ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। জানালা খোলা থাকায় বৃষ্টির পানি এসে তার চোখ – মুখ ভিজিয়ে দিল। এত সুন্দর বৃষ্টি দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারল না। দৌড়ে বেলকনি চলে গেল। হাত দিয়ে কতক্ষণ বৃষ্টির জলকণাগুলো ছুঁয়ে দিতে লাগল। তবে এভাবে কি আর মন ভরে বৃষ্টিকে উপভোগ করা যায়?। তাই ঘর থেকে বের হয়েই চুপিচুপি ছাদের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। ছাদে যাওয়ার সিঁড়িতে যেতে হলে রুদ্ধর রুম পেরিয়ে যেতে হয়। রুদ্ধ আরুকে চোরের মতো সেদিকে যেতে দেখে যা বোঝার বুঝে গেল। তার চোখ মুখ শক্ত হয়ে এল। ভাবল ছাদে গিয়েই মেয়েটাকে ইচ্ছে মতো বকবে। রাতের বেলা বৃষ্টিতে ভেজার সাহস কে দিয়েছে পিচ্চটাকে । যদি জ্বর হয় তখন কে সাফার করবে?
আহি নিজের রুমের বারান্দায় বসে কফি নিয়ে বৃষ্টি বিলাস করছে। বৃষ্টি তারও খুব পছন্দের তবে সময়ে – অসময়ে গা ভেজাতে সে একদমই পছন্দ করে না। সে হাত দিয়ে বৃষ্টির পানিগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে ও একটু পর পর কফির মগে চুমুক দিচ্ছে। পাশের বারান্দা থেকে একগাদাঁ পানি এসে তার গায়ে পড়ায় সে হকচকিয়ে সেদিকে তাকাল। ইয়াজকে তার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসতে দেখে ইয়াজের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকাল। ইয়াজ মুখের হাসি থামিয়ে বলল,
– ” চোখ নিচে চোখ রাঙাচ্ছিস কাকে তুই?”
– ” তোমাকে দেখতে পাচ্ছ না?”
– ” বেয়াদব মেয়ে বড় ভাইকে চোখ রাঙাতে লজ্জা করে না?”
– ” তোমার ছোট বোনের পেছনে লাগতে লজ্জা করে না?”
– ” কে বোন, তোকে এই বাড়িতে কুড়িয়ে এনেছে বুঝেছিস তোর সাথে আমার ভাই বোনের কোনো সম্পর্ক নেই।”
– ” বুঝেছি এইবার এখান থেকে দূর হও।”
ইয়াজ বেলকনি থেকে চলে গেল। আহি সেটা দেখে ভীষণ অবাক হলো। বাবাহ সে বলার সাথে সাথেই চলে গেল। এতটা ভদ্র হলো কবে? পেছন থেকে হাতে টান পড়ায় আহির ভাবনায় ছেদ ঘটল। ইয়াজ আহির হাত টেনে তাকে রেলিং এর সঙ্গে ঠেসে দাঁড় করাল।
– ” দুইদিন ধরে দেখছি ইগনোর করছিস কেনো আমাকে?”
আহি তার কথা শুনে অবাক হলো কিছুটা ইয়াজের থেকে এমন কিছু সে মোটেই আশা করেনি। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
– ” কোথায় ইগনোর করলাম তোমাকে?”
ইয়াজ নিজেদের দূরুত্ব কিছুটা কমিয়ে বলল,
– ” আমাকে বোকা পেয়েছিস?”
– ” তুই বোকা না গাধাঁ একটা। ছাড়ো আমাকে।”
– ” তুই – তোকারি করিস কেনো বেয়াদব?”
– ” তো কি করবো? তুই বুঝিস না আমি রেগে আছি?”
ইয়াজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
– “কেনো?”
আহি মুখ ফুলিয়ে বলল,
– ” তুমি সেদিন আমাকে সবার সামনে বকেছ। সবাই কেমন করে তাকিয়ে ছিল, আমার কি কোনো মান – সম্মান নেই?”
ইয়াজ তার ফুলো গাল দুটোতে চাপ প্রয়োগ করে ব্যাঙ্গ স্বরে বলল,
– ” ওরেহহ বাবুটার মান – সম্মানও আছে?”
ইয়াজের ঠাট্টা মিশ্রিত গলার স্বর শুনে আহির রাগ উঠে গেল। ইয়াজের হাতে কামড় বসিয়ে দিল। ইয়াজ ব্যাথাতুর শব্দ করে হাত সরিয়ে নিল। মুহুর্তের মাঝেই দুজনের মধ্যে দস্তাসস্তি শুরু হলো। বৃষ্টির পানিতে বেলকনি এমনিতেই পিচ্ছিল হয়ে ছিল। দুজনের দস্তাদস্তিতে পিচ্ছিল ফ্লোরে স্লিপ করে দুজনেই ফ্লোরে পড়ে গেল। প্রথমেই আহি পড়েছে আহির উপরে ইয়াজও পড়ে গেল। ব্যাথায় আহি নাক – মুখ কুঁচকে নিল। আহি চোখ বন্ধ করে আহাজারি করতে লাগল।
– ” আল্লাহ আমার কোমরটা একেবারে ভেঙে দিয়েছে গো। এইটা কোন হাতি এসে আমার উপরে পড়েছে গো….
ইয়াজ তার মুখ চেঁপে ধরল,
– ” চুপ কর মিনি বিড়াল কেউ এসে এভাবে দেখলে খারাপ ভাববে গাধাঁ একটা। ইয়াজ ধমকে বলল।
তার ধমক শুনে আহি চুপসে গেল। ইয়াজ ধীরে ধীরে আহির ওপর থেকে উঠে দাঁড়াল। এরপর আহিকেও টেনে তুলল। আহিকে ধরে বেডে বসিয়ে দিয়ে সে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
আরু ছাদে গিয়েই খোলা আকাশে দু হাত মেলে দাঁড়াল। চোখ দুটো বন্ধ করে সে বৃষ্টি অনুভব করতে লাগল। কিছক্ষণবাদেই সামনে কারোর উপস্থিতি টের পেতেই আরুর শরীর শিরশির করে উঠল। সামনের মানুষটার উপস্থিতি সে চোখ বন্ধ করেই বুঝতে পারে। তার শরীরের পারফিউমের ঘ্রাণ বাতাসের সাথে মিশে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। আরু চোখ মেলতেই রুদ্ধকে তার পানে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকতে দেখল। রুদ্ধ আরুর দৃষ্টি দেখে আরুর শরীরে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত চোখ বুলাল। তার সেই চাহনি দেখে আরুর শরীর জড়োসড়ো হয়ে এল। আরু ওড়নাটা ঠিকভাবে গায়ে জড়িয়ে নিল। রুদ্ধ নিজেদের মাঝে দূরুত্ব মেটাতে চাইল। তবে আরু সেটা হতে দিল না সে পেছাতে লাগল। পেছাতে পেছাতে আরুর পিঠ ঠেকে গেল চিলেকোঠার ঘরের দেয়ালের সঙ্গে। আরু চাইলেও আর পেছাতে পারল না। রুদ্ধ দুজনের দূরত্ব একেবারে ঘুচিয়ে দিল। আরুর শরীর ছুঁই ছুঁই করে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে বলল,
– ” পালানোর জায়গা নেই?”
আরু অসহায় চোখে তার দিকে তাকাল। রুদ্ধ নেশাল স্বরে বলল,
– ” ভেবেছিলাম রাতের বেলা বৃষ্টিতে ভেজার কারণে খুব বকবো। কিন্তু এখানে এসে আমার এমন সর্বনাশ ঘটবে কে জানত?”
তার নেশাল গলার স্বর শুনে আরু লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল। রুদ্ধর থেকে পালানোর পথ খুঁজতে লাগল সে। অনেকক্ষণ ভেজার ফলে ঠান্ডায় আরু ঠোঁট দুটো তিরতির করে কাঁপতে লাগল। রুদ্ধর দৃষ্টি সেদিকে যেতেই শুকনো ঢোক গিলল। দৃষ্টি এদিক ওদিক করতে লাগল। তবুও তার দৃষ্টি ঘুরেফিরে একইদিকে আটকে যাচ্ছে। আজ রুদ্ধ নিজেকে সামলাতে পারছেনা। এতদিনের ধৈর্য আজ এক নিমিষেই ভেঙ্গে ফেলল সে। আরু কোমর ধরে কাছে টেনে আরুর ঠোঁট জোড়া আকড়ে ধরল। আরু কিছু বুঝে ওঠার আগেই যা ঘটার ঘটে গেল। আরু চোখ জোড়া বড় বড় করে রুদ্ধকে দুহাত দিয়ে ঠেলতে লাগল। রুদ্ধ একহাত দিয়ে আরুর দু হাত শক্ত করে চেপে ধরল। অপর হাত আরুর কোমরে বিচরণ করতে লাগল। এক সময় আরু ছটফট থামিয়ে চোখ জোড়া বন্ধ করে ফেলল। রুদ্ধ আরুর ঠোঁট এমনভাবে চেপে ধরেছে যেন সে অনেকদিনের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে। বেশ অনেক্ষণ পর রুদ্ধ আরুকে ছেড়ে দিল। তবে কোমর থেকে হাত সরাল না। আরু জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিতে লাগল। আরেকটু হলেই তার মনে হচ্ছিল সে বোধ হয় শ্বাস না নিতে পেরে আজ মারায় যাবে। রুদ্ধ আরুর দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে রইল। আরুর ঠোঁট জোড়া লাল বর্ণ ধারণ করেছে। রুদ্ধ সেখানে বৃদ্ধা আঙ্গুল বুলিয়ে বলল,
– ” আই ওয়ান্না টেস্ট ইট এগেইন।” বলেই আরুকে কোনো সুযোগ না দিয়েই ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে দিল। আরু রুদ্ধর পিঠের শার্ট মুঠো করে ধরল। কিছুক্ষণ বাদেই রুদ্ধ ছেড়ে দিল তাকে। আরু এবার রুদ্ধর বুকে জোরে ধাক্কা দিয়ে ছাদ থেকে নেমে গেল। রুদ্ধ চিলেকোঠার দেয়ালে হেলান দিয়ে তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে ঠোঁট মুছতে লাগল।
তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ২৩
আরু ঘরে গিয়েই শব্দ করে দরজা আটকাল। দরজার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল। রুদ্ধ তার সাথে আজ এটা কি করল সে ভাবতে পারছে। লজ্জায় রুদ্ধকে সে মুখ দেখাতে পারবে না। আরু দু হাতে মুখ দেখে ফ্লোরে বসে পড়ল। রাতে খাবার খাওয়ার সময় ও আরু ঘর থেকে বের হলো না। রুদ্ধ তার জন্য ড্রাইনিং টেবিলে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছিল। আরু আসবে না শুনে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার আর বুঝতে বাকি নেই পিচ্চিটা কেনো এমন করছে। শেষমেষ দেখা গেল মিতা বেগম গিয়েই আরুকে রাতের খাবার খাইয়ে দিয়ে এল।
