Home লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৫

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৫

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৫
নুসাইবা আরা নুরি

আসরের নামাজের কিছুক্ষন বাদেই রেসটুরেন্ট এর নিচের কাজি অফিস থেকে পবিত্র ভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় মেহেরাজ আর শ্রেয়সী।তারপর মেহেরাজ শ্রেয়সীকে নিয়ে আবার উপরে চলে আসে।শ্রেয়সীর এখন ভীষন লজ্জা লাগছে যা দেখে মেহেরাজ মনে মনে হাসে।আর যাই হোকেবার কেও আর তাদের আলাদা করতে পারবে না।তাদের বিয়ে শেষ।

মেহেরাজ পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা গোল্ড এর বাক্স বের করে তারপর সেটা খুলে একটা স্বর্নের ব্রেজলেট পরিয়ে দেয় শ্রেয়সীর ডান হাতে।শ্রেয়সী সেদিকে তাকিয়ে থাকে এক দৃষ্টিতে।লোকটা কতো সাবধানে তার হাতে স্পর্শ করছে।যেনো টোকা দিলে তার লাগবে।মেহেরাজ এবার কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলে কাপটা দূরে সরিয়ে রেখে শ্রেয়সীর সামনে ফাইল টা আবারো এগিয়ে দিয়ে শান্ত শীতল কন্ঠে বলে,
-সারাজীবনের জন্য আমার জীবনে পদার্পন করার জন্য আপনাকে স্বাগতম মিসেস মেহেরাজ মির্জা।
মেহেরাজের শেষ কথাটুকু শুনে শ্রেয়সীর ভীষণ ভালো লাগে সাথে ভীশন লজ্জা ও পাই।মেহেরাজ শ্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে বলে,
-তো ম্যাডাম ফাইল এ তো আমাকে বিশ্বাস করে সাইন করলেন কি লেখা আছে পড়ে দেখলেন না।
মেহেরাজের কথায় মুখ তুলে চায় ফাইলের দিকে শ্রেয়সী। মেহেরাজ শ্রেয়সীর দিকে ফাইল টা আরো এগিয়ে দেয়।শ্রেয়সী সেটা দেখে স্মীত হেসে নিচু কন্ঠে বলে,
-আমি আপনাকে বিশ্বাস করেছি।আর আমার এত টুকু বিশ্বাস আছে যে আপনি আমার বিশ্বাসের অমর্যাদা করবেন না।
শ্রেয়সী কথায় গর্বে বুক ফুলে উঠে মেহেরাজের।স্ত্রী হিসেবে প্রতিটা পুরুষ এমন কাওকেই চাই হয়তো।মেহেরাজ শ্রেয়সীর লজ্জায় লাল হয়ে ব্লাশ করা গাল দুটোর দিকে তাকিয়ে একটা শুকনো ঢোক গিলে বলে,

-সব পড়া লাগবে না তিন নাম্বার পেজ এর শেষ বাক্য গুলো পড়ো।
-নাহ থাক।
-আরে পড়ো।
মেহেরাজের জোরাজোরি তে শ্রেয়সী ফাইল খুলে।তিন পেজের একটা দলিল।তিন পেজেই মোট ৬ টা সিগ্নেচার শ্রেয়সীর আর মেহেরাজের একটা।শ্রেয়সী দেখেছে এটা বিয়ের কাবিনের কাগজ তাও শেষ পেজ বের করলো।মুহুর্তে শ্রেয়সীর চক্ষুদয় বড় বড় হয়ে যায় লেখাগুলো দেখে।শ্রেয়সী শুরু থেকে পড়তে শুরু করে,
-আমি শ্রেয়সী শেখ।নিজের ইচ্ছায় আমার স্বামী মেহেরাজ মির্জার সাথে তার করা চুক্তিতে স্বাক্ষর করিলাম।আমার স্বামি আমাকে যখন যা বলিবে আমি তখন তা করিতে বাধ্য থাকিব।এমনকি যদি কখনো আমার পরিবার আমার ডিভোর্স করিয়ে আমার স্বামীর থেকে আমাকে আলাদা করে দিতে চাই তাহলে আমি তাকে আবার বিবাহ করিব এবং তার পনেরো সন্তান এর জননী হবো।প্রতিটা সন্তান এর পিতা হবে আমার স্বামি মেহেরাজ মির্জা এবং মাতা আমি নিজে।আর আজ থেকে আমি প্রতিদিন তাকে দিনে দুইবার করে চুমু দিতে বাধ্য। যদি আমি চুমু দিতে মানা করি তাহলে সে আমাকে জোর করে চুমু খেতে পারবে।এবং আমার ঠোঁট যতক্ষন ইচ্ছা সে নিজের দখলে রাখতে পারবে।আমি বাধা দিলে আরো কয়েকবার বেড়ে যাবে প্রতিবার বাধা দেওয়াই।
এটুকু পড়ে শ্রেয়সীর কথা বলার ভাষা হারিয়ে গেলো।এ কি অবস্থা সে কেন না পড়ে এতো বড় ভুল করে ফেললো।শ্রেয়সী আর বাকি টুকু পড়তে পারলো না।তার আগেই মেহেরাজ শ্রেয়সীর হাত থেকে ফাইল টা কেড়ে নিয়ে বলল,

-অনেক হয়েছে পড়া এবার আমার পাওনা আমাকে দিয়ে দাও।
-আপনার পাওনা মানে??
শ্রেয়সীর কথায় মেহেরাজ ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
-সেখানে কিন্তু উল্লেখ আছে আমি জোর করে আদায় করতে পারবো ভুলে যেওনা সুইটহার্ট।
মেহেরাজের কথা শুকনো ঢোক গিলল শ্রেয়সী।এ কি মুছিবতে পড়লো সে।এই লোকের মনে মনে এই ছিলো তাহলে।শ্রেয়সী কে চুপ থাকতে দেখে মেহেরাজ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়াতে যেতেই শ্রেয়সী তাড়াতাড়ি নিজের হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরলো তা দেখে মেহেরাজ হেসে ফেলল।শ্রেয়সী তা দেখে কিছুটা রাগ মিশ্রিত কন্ঠে বলে,
-আপনি আমার সাথে বেইমানি করলেন অশুদ্ধ লোক।আমি জানলে জিবনেও এমন কিছুতে সিগ্নেচার করতাম না।
শ্রেয়সীর কথায় মেহেরাজ শ্রেয়সীর মুখের দিকে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বলে,
-আগে বললে কি বউ এর থেকে প্রতিদিন দুটো চুমু খেতে পারতাম সুইটহার্ট।তুমি না চাইলেও আমি দিতে পারি।আমি আবার ভিষন দয়ালু বউ এর বিষয়ে।
-চুপ করুন খারাপ লোক।
শ্রেয়সী লজ্জায় মাথা নুইয়ে নেয়।মেহেরাজ চেয়ার থেকে উঠে শ্রেয়সীর পাশের চেয়ারে বসে।শ্রেয়সী কিছুটা কেপে উঠে লজ্জায়।মেহেরাজ পকেট থেকে ফোন বের করে কয়েকটা সেলফি তুলে।তারপর হাতে হাত রেখে একটা ছবি তুলে।শ্রেয়সীর হাতে একটু চুমু খায়।তারপর মেসেঞ্জারে ঢুকে গ্রুপে শ্রেয়সীর মুখ হাইড করে সেন্ড করে দেয় নিজের কাপল পিক।এবার সবাই দেখুক চুপচাপ থাকা মেহেরাজের ও বউ আছে।

রাতের তীব্র শীতল বাতাসে জঙ্গলের ভিতরের গাছ গুলো দুলছে।সমুদ্রে নির্মল বাতাস গা ছুয়ে যাচ্ছে ট্রলারে বসা আনাম মিয়ার।জঙ্গলের ভিতরে ছোট খাল।এই খাল মিশেছে নদীর দিকে আবার সাগরেও।আবার ছোট ছোট খালেও।টলারের বাইরের অংশ ঘুটঘুটে অন্ধকার হলেও ভিতরে হলুদ আভা ছফিয়ে আছে।চেয়ারে বসে আছে আনাম মিয়া।
আনাম মিয়ার সামনেই বস্ত্র*হীন অবস্থায় মাথা নিচু করে হাটুতে মুখ গুজে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছে কয়েকজন নারী।আনাম মিয়া সিগারেট ধরিয়ে টানতে শুরু করে সেফিকে তাকিয়ে।আজকে মিটিং থেকে আসার সময় গার্মেন্টস কর্মীদের তুলে নিয়ে এসেছে।যদিও আগে থেকেই এদের সব কিছু জানা।কেও বাড়ি থেকে পালিয়েছে তো কেও এতিম আবার কেও তো সংসার করবে না বলে কাজের সন্ধানে গার্মেন্টস এ এসেছিলো।সেখান থেকেই চাকরি দেওয়ার মিথ্যা কথা বলে এগুলোকে নিয়ে এসেছে আনাম মিয়া।যদিও আগেই লোক দিয়েই সিয়াম সব ঠিক করে রেখেছিলো বলে আজ নিয়ে আসতে পারলো।
আনাম মিয়া সিগারেট খেতে খেতে সামনে থাকা মেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে পর্যবেক্ষন করলো নেশ খানিক্ষন তারপর তার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা রকি আর তপুকে উদ্দেশ্য করে বলল,

-রকি এবার ডেট কবেরে।কত পিস মালের অর্ডার??
আনাম মিয়ার কথায় রকি তাড়াতাড়ি বলল,
-ভাই পঁচিশ পিস। ইন্ডিয়ার দিল্লিতে যাবে।পেমেন্ট করে দিয়েছে।
রকির কথায় বেশ খুশি হলো আনাম মিয়া।এবার নিজের জন্য একটা বাগান বাড়ি কিনবে সিলেট এ আনাম মিয়া।কত দিনের শখ বাগান বাড়িতে থাকার।আনাম মিয়ে হাতে থাকা আধ খাওয়া সিগারেট টা একটা মেয়ের গায়ে ছুড়ে মেরে উটগে দাড়ালো।সিগারেটের আগুন হাতে লাগায় মেয়েটা আরো জোরে কেদে উঠলো জ্বালা করায়।তা দেখে আনাম মিয়া হেসে বলল,
-তপু এই ডারে আমার ঘরে দিবি আজ রাইতে।আর রকি তুই পুলিশ ডারে মাইরা ফালাইছোস??
আনাম মিয়ার কথায় রকি ধীর কন্ঠে বলল,
-জ্বী ভাই।
-তাইলে এই মা*ল গুলারে লইয়া যা।রেডি কর।ভোর রাতে জাহাজ ছাইড়া দিবে।আমি অফিসার ডার লগে কথা বইলা আইতাসি।

কথাটা বলে আনাম মিয়া উঠে দাঁড়ায়।পরনে আজ কালো পাঞ্জাবী।আর কালো লুংগি।আনাম মিয়া লুংগি টা হাটু সমান ভাজ করে টলার থেকে বেরিয়ে গেলো।তারপর বাইরে আগে থেকে দাঁড়িয়ে থাকে মাহাদ নামের লোকটার সাথে বাইরে জাওয়ার জন্য হাটা শুরু করলো।এদিকে আনাম মিয়া যেতেই মেয়ে গুলো জোরে কেদে উঠলো।তবে সেই কথা কারোর কানে যাওয়ার আগেই রকি আর তপু মিলে সবার মুখে কাপড় গুজে আনাম মিয়ার দেখানো মেয়েটার চুল ধরে টেনে টলারে এক পাশের এক ঘরে নিয়ে যায়।তার পর ওর জামা কাপড় দিয়ে পরে নিতে বলে।মেয়েটা একটু আশার আলো নিয়ে ওদের সামনেই পরে নেয়।আর পরেই রকি আর তপু মিলে হাত পা বেধে মুখে কাপড় গুজে টলার থেকে বেরিয়ে পাতাল ঘরের দিকে যাওয়া শুরু করে।তপু একটু বেশি শক্তি শালি হওয়াই মেয়েটারে কান্দে উঠাই নিছে আর রকি মোবাইলের মৃদু আলো ধরে রাস্তা দেখিয়ে এগিয়ে চলছে।

ফাহিমের মন ভালো নেই।সন্ধাই বাড়ি ফেরার পর থেকে সব সময় হাসি খুশি থাকা ছেলেটার মুখে আজ আর হাসি নেই।তা সাহিদা খাতুন খেয়াল করলেও কিছু বলেন নি।কারন তিনি জানেন তার ছেলের কত দায়িত্ব কত বড় বড় কেস সামলায় হয়তো সেজন্যই আজ মন খারাপ।
সন্ধাই সাহিদা খাতুন চা দিয়ে গেলেও ফাহিম তা খাইনি।তা দেখে মাহি ফাহিম কে জিজ্ঞাসা করে,
-কি হয়েছে ভাইয়া তোর আজ মুড অফ কেন দেখছি বাড়িতে আসার পর থেকে মন খারাপ।কিছু কি হয়েছে??
মাহির কথার পিঠে সাহিদা খাতুন সোফায় বসতে বসতে বলে,
-হ্যাঁ বাবা কিছু হয়েছে তোর।এমন মন মরা তোকে দেখতে ভালো লাগছে না বল কিছু হয়েছে??
সাহিদা খাতুনের কথায় ফাহিম মাথা নিচু করেই উত্তর দেয়,
-কিছু হয়নি আম্মু এমনিতেই।

সাহিদা খাতুন বুজে যায় ছেলের কিছু হয়েছে।নয়তো হাসি খুশি ছেলেটা হটাৎ চুপ করে গেলো কেন।কি সমস্যা। সাহিদা খাতুন উঠে ফাহিমের পাশে বসলো।তারপর ফাহিমের মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে কন্ঠে বলল,
-কি হয়েছে বল আমাকে।কোনো সমস্যা হয়েছে।মন খারাপ কেন।তোর মন খারাও থাকলে আমার ভালো লাগে বল।সেই আসা থেকে মন খারাপ।কি হয়েছে বল বাবা আমাকে।
মায়ের কথায় ফাহিম মুখ উচু করে তাকালো।মনের ভিতর তীব্র খচখচানি নিয়ে মায়ের দিকে একবার তাকিয়ে মাথা নিচু করে নিয়ে বলল,

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৪

-আমি তোমার সব কথায় মেনে চলি আম্মু।একটা কথা অমান্য করলে কি খুব বেশি কষ্ট পাবে তুমি।
-না বাবা বল কি কথা আমি কষ্ট পাবো না।
-আমি একজনকে ভালোবাসি আম্মু।আর আমি চাই তাকে বিয়ে করতে।সব কথায় তো আমি শুনি।আমার এই আবদার টা রাখবে আম্মু।মেয়েটাকে আমার করে এনে দিবে।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here