তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৩১
আশফিয়া হিয়া
রুদ্ধ ড্রাইভ করছে, তার পাশে ইয়াজ বসেছে। পেছনে আরু রুহানি ও আহি একসাথে বসেছে। তিনজন গাড়িতে ওঠার পর থেকেই গল্প শুরু করে দিয়েছে, যেটাতে বিরক্ত হয়ে ইয়াজ কানে হেডফোণ গুজে বসে আছে। রুদ্ধ এবার মৃদ্যু ধমক দিয়ে তিনজনকে থামিয়ে দিল। আরু রুদ্ধর দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটল, যেটা রুদ্ধ মিররে স্পষ্ট দেখতে পেল। রুদ্ধ মাথা নিচু করে হালকা হাসল। এই মেয়েটার সবকিছুই তাকে মুগ্ধ করে। পাঁচ মিনিট চুপ থেকে তিনজন ফিসফিস করে আবার কথা বলছে। রুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ড্রাইভিং এ মনোযোগ দিল। এদের বলে কোনো লাভ আছে?
তুষারের হলুদের প্রোগ্রাম ছাদে আয়োজন করা হয়েছে। তুষারদের বাড়ির ছাদটা বিশাল বড় সেখানেই একপাশে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে ও স্টেজের সামনে সকলের বসার জন্য খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। রুদ্ধ তষারদের বাড়ির সামনে এসে তাকে কল করল। তুষার, ফারিশ, সাদমান তিনজনই নিচে এল। তুষার রুদ্ধর কাঁধে হাত দিয়ে বলল,
– ” কিরে শালা এসেছিস তাহলে?”
সাদমান বলল,
– ” সকাল থেকে ওরে যা তেল মারতে হয়েছে এত তেল বাস্তবে হাতে পেলে তো বড়লোক হয়ে যেতাম।”
রুদ্ধ দুজনকে চোখ রাঙিয়ে পেছনে ইশারা করল। পেছনে তাকাতেই তাদের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। পেছনে তিনটে সুন্দরী ছেলে ও অল্প বয়স্ক যুবক দাঁড়িয়ে আছে। যাদের মুখে মৃদ্যু হাসি ফুটে আছে। ফারিশ তো তাদের ভালো করেই চেনে বাড়ির হবু জামাই তবে সাদমান তুষার আরুকে কখনো ছবিতেও দেখেনি, রুদ্ধর কাছে হাজারবার দেখতে চেয়েও পাট্টা পায়নি তারা। রুদ্ধর একটাই কথা ছিল যখনই দেখবি সামনা – সামনি এছাড়া দেখা চলবে না। একসময় তারাও হার মেনে নিয়েছে। ফারিশের থেকে তারা মোটামুটি আরু সম্পর্কে ধারণা করে নিয়েছে তাই তারা আন্দাজেই আরুর দিকে তাকিয়ে বলল,
– ” তুমিই নিশ্চয়ই আরু?”
আরু হালকা হেসে মাথা নাড়াল। সে কিছুটা অবাকও হয়েছে। সবাই থাকতে তাকেই কেনো এভাবে জিজ্ঞাসা করল এটা ভেবে৷ তার মানে তার ব্যাপারে উনারা আগে থেকেই জানে, নিশ্চয়ই রুদ্ধ ভাই বলেছে। আরু উওর করতেই দুজনে একসাথে মাশাল্লাহ বলে উঠল। সাদমান তুষারকে ফিসফিসিয়ে বলল,
– ” দুজনকে কি সুন্দর মানিয়েছে তাই না, ওদের দেখে বোঝায় যাচ্ছে না ওদের এতটা এইজ গ্যাপ। ”
– ” ঠিক বলেছিস।
সাদমান আরুর দিকে তাকিয়ে বলল,
– ” এই পিচ্চিটা কে গো?”
ফারিশ এগিয়ে এসে বলল,
– ” এটা হলো আমার শশুড় বাড়ির সবচেয়ে ছোট সদস্য। আমার ছোট শালিকা, এন্ড আরুর বোন।”
– ” ওওও আরুর বোন তার জন্যই তো এতোটা মিষ্টি।”
কথাটা শুনতেই ইয়াজের মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠল। কথাটা তার পছন্দ হয়নি মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
ফারিশ এরপর ইয়াজের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। রুহানিকে তারা আগে থেকে চেনে বন্ধুর হবু বউ বলে কথা । সাদমান আরুকে এটা ওটা জিজ্ঞাসা করতে লাগল। আরুও ভদ্র মেয়ের মত উওর দিয়ে যাচ্ছে। রুদ্ধ এবার সাদমানেই পায়ে আলতো করে ধাক্কা দিল, চোখ দিয়ে ইশারা করল ওকে উল্টো – পাল্টা কিছু না বলতে। তুষার এবার বলল,
– ” এখানে অনেক কথা হয়েছে বাকি কথা ছাদে গিয়ে হবে চল চল।”
ছাদের ফ্লোরে বসার জন্য আয়োজন করা হয়েছে। তুষার সবাইকে নিয়ে সেখানেই চলে এল। সেখানে আগে থেকেই তুষারদের কাজিনরা উপস্থিত ছিল৷ এত মানুষের মাঝে রুদ্ধ কখনোই কমফোর্ট ফিল করে না, সবার থেকে একটু দুরুত্ব রেখে বসল। আরুকে হাত ধরে টেনে তার পাশে বসাল।
– ” সবাই তো ওদিকে বসেছে, আপনি আমাকে টেনে এখানে বসালেন কেনো?”
– ” চুপচাপ আমার পাশে বসে থাকবি, আশে পাশে প্রচুর ছেলেরা আছে।”
আরু হতবাক হয়ে গেল, মানে এখন আশে পাশে ছেলেরা আছে দেখে সে এখন এভাবে রুদ্ধর সাথে লেপ্টে বসে থাকবে? বাকিরা কি ভাববে তাহলে। আরু একটু দূরে সড়ে বসতেই রুদ্ধ চোখ রাঙাল, আরু আবারোও রুদ্ধর দিকে চেপে বসল। আহিকে ইশারা করল তার পাশে বসতে।
রুদ্ধ ও আরুর সব কাহিনীই সাদমান ও তুষার সুক্ষ্ণভাবে খেয়াল করছিল। সাদমান পকেট থেকে মোবাইল বের করে লুকিয়ে দুজনের কিছু ছবি তুলে নিল। এরপর ইশারায় রুদ্ধর মজা নিতে লাগল। রুদ্ধ তা দেখে তাদের দিকে কটমট করে চাইল। ফারিশ রুহানিকে নিয়ে ছাদের অন্যপাশে চলে গেল। রুহানি চাইলেও থাকতে পারল না তাকে জোর করে নিয়ে গেল ফারিশ।
আহি বোনের পাশে চুপ করে বসে আছে তার বোরিং লাগছে, এখন মনে হচ্ছে না এলেই ভালো হত। সে তার পাশে বসা ইয়াজকে চিমটি কেটে বলল,
– ” এই তোমার বোরিং লাগছে না?”
– ” খুব, মনে হচ্ছে না এলেই ভালো তো সবাই কাপল কাপল মাঝখান দিয়ে শালা আমি একাই সিংগেল।”
– ” তুমি একা নও আমিও আছি, বড় ভাইয়া আর আপুকে দেখো কি সুন্দর লাগছে একসাথে, ফারিশ ভাইয়াও তো রুহা আপুকে নিয়ে গেল। ”
ইয়াজ রাগান্বিত স্বরে বলল,
– ” একটুখানি পিচ্চি নাক টিপলে এখনো দুধ বের হবে, তুই সিংগেল এর কি বুঝিস রে? ”
– ” আমার নাক টিপলে দুধ নয়, আঠালো পানি বের হবে চেক করে দেখো। ”
ইয়াজ নাক – মুখ কুঁচকে বলল,
– ” ইয়াক ছিহহ তুই এত নোংরা আমার বমি পেয়ে যাচ্ছে।”
আহি হালকা শব্দ করে হেসে ফেলল। তাদের ফিসফিস করে কথা বলতে দেখে তুষার বলল,
– ” তোমরা কি নিয়ে ফিসফিস করছো বাচ্চারা?”
ইয়াজ ভাব নিয়ে বলল,
– ” আমি মোটেই বাচ্চা নয়, ও বাচ্চা মেয়ে এটা ঠিক আছে।”
সাদমান বলল,
– ” তাইতো ও বাচ্চা হতে যাবে কেনো? এত কিউট হ্যান্ডসাম একটা ছেলে।”
আহি তা শুনে আড়ালে ভেংচি কাটলো।
সাদমান এবার আরুকে উদ্দেশ্য করে বলল,
– ” জানো আরু আমাদের রুদ্ধ কিন্তু ভার্সিটিতে বেশ ফেমাস ছিল, তবে সেটা ভালো স্টুডেন্ট হওয়ার জন্য এটা আবার ভাবতে যেয়ো না।”
আরু না বুঝতে পেরে বলল,
– ” বুঝিনি।”
রুদ্ধ গম্ভীর স্বরে বলল,
– ” এত বুঝতে হবে না। ওদের কথায় কানে দেয়ার প্রয়োজন নেই।”
তুষার বলল,
– ” ওমা কান দেবে না কেনো? আমাদের কথা না শুনলে তোমার কিন্তু আজ লস্ট প্রজেক্ট হয়ে যাবে।”
আরু হেসে ফেলল তার কথা শুনে। এরা সবাই খুব মজার এটা সে এতক্ষণে বেশ ভালোই বুঝতে পারছে। আরু রুদ্ধর দিকে একটু চেপে বসে নিচু স্বরে বলল,
– ” শুনিনা একটু, ওনাদের কথাগুলো বেশ মজার।”
তুষার রুদ্ধর দিকে এক চোখ টিপ দিয়ে বলল,
– ” ভার্সিটিতে রুদ্ধ কত প্রেমের প্রোপজাল পেয়েছে জানো? সেদিনও তো আমার এক ক্লাসমেট রুদ্ধর কথা জিজ্ঞাসা করল।”
আরুর মুখটা এবার চুপসে গেল। তার চুপসানো মুখ দেখে তুষার, সাদমান একে অপরের দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হাসল৷ রুদ্ধ দুজনকে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিল। আরুর দিকে তাকিয়ে মৃদ্যু স্বরে বলল,
– ” ওরা মজা করছে তোর সাথে। এগুলো শুনে মন খারাপ করার কিছু হয়নি।”
– ” মন খারাপ কেনো করতে যাব ওরা আপনাকে প্রপোজাল দিয়েছিল আপনি তো দেননি।”
আরুর জবাব শুনে রুদ্ধর মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠল। তা দেখে আরুর মুখেও আপনাআপনি হাসি দেখা দিল।
তুষারকে স্টেজে বসানো হয়েছে। তাকে সবাই একে একে মিষ্টান্ন জাতীয় খাবার খায়িয়ে দিল, ছোট খাটো ফটোশুট করা হলো। এবার নাচ – গানের পালা। তুষারের মেয়ে কাজিনগুলো প্রথমে নাচবে তাই তারা স্টেজে উঠে প্রস্তুতি নিচ্ছে। হঠাৎ স্পিকারে গান বেজে উঠল, গানের তালে মেয়েগুলো নাচা শুরু করল। সবাই বেশ আনন্দের সাথে তাদের নাচ উপভোগ করছে। রুদ্ধর দৃষ্টি স্টেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো গোলুমলু বাচ্চার দিকে।বাচ্চারা দুটো ভীষণ কিউট ছোট শরীরে লাল রঙের শাড়ি জড়িয়েছে ।মেয়েগুলোর নাচ দেখে তারাও সেটা অনুকরণ করছে। তবে আরুর দিক থেকে তাকালে সেটা দেখা যাচ্ছে না, আরু ভাবচ্ছে রুদ্ধ মেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে রয়েছে।সে রাগে ফুসতে ফুসতে বলল,
– ” মেয়েগুলো খুব সুন্দর নাচছে তাই না?”
রুদ্ধ ধ্যান বাচ্চাগুলোর দিকে থাকায় আরুর কথাটা খেয়াল করেনি ওভাবেই বলল,
– ” হুহ।”
– ” ওহ ছেলেরা আমাকে দেখবে বলে এখানে বসিয়ে রেখেছেন, আর নিজে বসে বসে মেয়েদের নাচ দেখছেন,আমি থাকবোই না এখানে।”
আরু উঠে যেতে নিলেই রুদ্ধর ধ্যান ভাঙল। সে আরুর হাত ধরে পুনরায় তার পাশে বসিয়ে দিয়ে বলল,
– ” কি হয়েছে?”
– ” কি হয়েছে আপনি জানেন না? আপনি ড্যাবড্যাব করে মেয়েগুলোর তাকিয়ে আছেন, আপনি ওদেরই দেখুন, আমিও এখন তুষার ভাইয়ার ছেলে কাজিনদের দেখব।”
রুদ্ধ তার হাত ধরে থামিয়ে বলল,
– ” মেরে ফেলব একদম।”
শান্ত স্বরে আবারও বলল,
– ” রিল্যাক্স এত হাইপার হওয়ার কিছু হয়নি, আমি ওদের দেখছিলাম না, স্টেজের সামনের বাচ্চা দুটোকে দেখছিলাম।”
– ” আমায় বোকা পেয়েছেন? কোথায় বাচ্চা আমি তো দেখতে পাচ্ছি না।”
রুদ্ধ স্টজের পাশে ইশারা করতেই আরু মাথাটা একটু বাঁকা করে দেখল সত্যিই সেখানে দুটো কিউট গোলগাল বাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে৷ বয়স হয়তো তিনবছর হবে। সে একটু আড়ালে থাকায় দেখতে পায়নি। আরু এবার লজ্জা পেল। মিনমিনে স্বরে বলল,
– ” ওহ আচ্ছা আমি খেয়াল করিনি। বাচ্চাদুটো খুব কিউট তাই না?”
– ” হ্যাঁ ভীষণ।”
ঘড়িতে এখন রাত আটটা। আরু স্টাডি রুমে বই – খাতা নিয়ে রুদ্ধর জন্য অপেক্ষা করছে, রুদ্ধ কিছুক্ষণ আগেই অফিস থেকে ফিরেছে, আরুকে বলেছে বই খাতা নিয়ে বসতে সে ফ্রেশ হয়ে আসছে। রুদ্ধ ফ্রেশ হয়ে টেবিলে বসতেই রুমা বেগম তার জন্য কফি ও হালকা নাস্তা নিয়ে এল। রুদ্ধ কফি মগে চুমুক দিয়ে আরুকে পড়াগুলো বের করতে বলল। আরু কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
– ” আজ আমার পড়া হয়নি।”
রুদ্ধ ধমক দিয়ে বলল,
– ” কেনো পড়া হয়নি।”
আরু হালকা কেঁপে উঠল। এইজন্যই সে এই নিমপাতার কাছে পড়তে চায়নি, একটু কিছু হলেই ধমক দিয়ে তার ছোট হৃদয় এফোড় – ওফোড় করে দেয়। বাইরের থেকে কেউ পড়াতে আসলে একটু তো ছাড় দেয় উনি একটুও ছাড় দিতে নারাজ।
– ” কি বিরবির করছিস?” রুদ্ধ আবার ধমক দিল।
– ” কা..কাল তো আমার ভীষণ মাথা ব্যাথা ছিল তাই পড়তেই পারিনি।”
রুদ্ধ স্কেল হাতে নিয়ে বলল,
– ” দেখি কোথায় ব্যাথা হয়েছে, একটা বারি দিলেই সব ব্যাথা গায়েব হয়ে যাবে, দুদিন পড়ে পরীক্ষা এখনোও ফাঁকি বাজি কোথা থেকে আসে শুনি?”
– ” আর হবে না, কাল থেকে সব পড়া পড়ব প্রমিস।”
রুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে বলল,
– ” মনে থাকবে?”
– ” জ্ব..জ্বী।”
রুদ্ধ তাকে ম্যাথ করতে দিয়ে, নাস্তার প্লেট আরুর দিকে এগিয়ে দিল।
– ” আমি খেয়েছি,আপনি খান।”
তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৩০
রুদ্ধ চোখ রাঙিয়ে তাকাল, আরু প্লেট থেকে এক প্লিস পাকোড়া নিয়ে খেতে খেতে ম্যাথ করতে লাগল। রুদ্ধ কফি খেতে খেতে সেই দৃশ্য তৃপ্তিসহকারে দেখতে লাগল। পাকোড়া তেল কিছুটা আরুর ঠোঁটের কোণে লেগে গিয়েছিল,আরু সেটা মুছার আগেই রুদ্ধ বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে তেল মুছে দিল। আরুর লেখার হাত সেখানেই থমকে গেল।
