ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৪
নওরিন কবির তিশা
মধ্যগগনের সূর্যটা আজ অগ্নিবর্ষণ করছে, চরাচর জুড়ে এক ক্লান্তিকর, উত্তপ্ত হাঁসফাঁস। কাঠফাঁটা রৌদ্রের দাপটে বিপর্যস্ত জনজীবন। কলেজে আজ আদ্রিতার অনুপস্থিতিতে তিয়াশা কোনমতে প্রেজেন্টেশন টা বুঝিয়ে দিয়েই বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল তবে মাঝপথেই থামতে হয়েছে ওকে।
রৌদ্রতাপে মাথার ছাতি ফেটে যাওয়ার উপক্রমে তপ্ত পিচগলা রাজপথের তীব্র দাবদাহ থেকে বাঁচতেই তিয়াশা তৎক্ষণাৎ ও আশ্রয় নিয়েছে পার্শ্ববর্তী এক শান্ত ক্যাফেতে। ক্যাফের কৃত্রিম সুশীতল আবহে পা রাখতেই তপ্ত শরীরে যেন এক লহমায় স্বস্তি নেমে এলো ওর। একটি ফাঁকা টেবিলে বসে কাউন্টারের দিকে চেয়ে ও ইশারায় ডাকতেই চটপটে ওয়েটারটি এসে বিনীত ভঙ্গিতে দাঁড়াল টেবিলের পাশে। তীব্র তৃষ্ণা আর ক্লান্তি জুড়াতে ও কোল্ড কফির আদেশ দিতেই সে মৃদু হেসে প্রস্থান করল।
অপেক্ষার অলস ক্ষণগুলো কাটাতে তিয়াশা অবহেলায় ওর স্মার্টফোনটি হাতে নিল। বাহ্যিক জগতের তীব্র কোলাহল ভুলে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অন্তহীন স্ক্রলিংয়ে নিমগ্ন। ঠিক তখনই এক জোড়া সুদৃশ্য জুতো এসে থামল ওর টেবিলের সম্মুখে। স্ক্রিন থেকে চোখ তোলার আগেই নিস্তব্ধতা ভাঙলো এক মার্জিত পৌরুষ কণ্ঠস্বর,,
“এক্সকিউজ মি!”
তিয়াশা ধীরলয়ে চোখ তুলে তাকাল। মুহূর্তের জন্য ওর চোখের পলক স্তব্ধ হয়ে গেল। সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষ অবয়বটি প্রায় ছয় ফুট দীর্ঘ, মেদহীন সুঠাম ও ঋজু শরীরের গড়ন; যা এক নজরেই যেকোনো মানুষের মনে সমীহ জাগাতে বাধ্য। পরনে নিখুঁত ইস্ত্রি করা নেভি ব্লু ফরমাল শার্ট, যার হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে গুটানো, চওড়া কবজিতে বাঁধা দামি মেটালিক ঘড়ি।
গায়ের রঙে রোদে পোড়া এক তামাটে আভা, তীক্ষ্ণ নাসিকা, সুবিন্যস্ত চিবুক আর এক জোড়া গভীর, তীক্ষ্ণ চোখ আর ঠোঁটের কোণে মৃদু, প্রায় অদৃশ্য এক কেতাবি সৌজন্যের হাসি। তিয়াশা যখন সেই সম্মোহনী সৌন্দর্যের বিশ্লেষণে তৎপর, তখনই পুরুষটি নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে মৃদুস্বরে বললেন,
“মাইসেল্ফ, এসপি রুদ্রদ্বীপ সিনহা।”
নামটা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই তিয়াশার মস্তষ্কের সুপ্ত কোষগুলো এক লহমায় সজাগ হয়ে উঠল। ‘রুদ্রদ্বীপ সিনহা!’ এই তো মাত্র কদিন আগেই ওর বাবা ড্রয়িংরুমে বসে খবরের কাগজ হাতে অত্যন্ত সমীহের সাথে এই তরুণ, সৎ পুলিশ অফিসারের গল্প করছিলেন। অপরাধ দমনে যাঁর কড়া পদক্ষেপের কথা এখন শহরের সবার মুখে মুখে।
তিয়াশা তৎক্ষণাৎ নিজের ঘোর কাটিয়ে চেয়ার ছেড়ে ব্যস্ত সমস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। ও আমতা আমতা করে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই রুদ্রদ্বীপ হাত ইশারায় ওকে আশ্বস্ত করে মৃদু হাসলেন,,
“আরে আরে, বসুন, বসুন! আপনিই তো তিয়াশা চৌধুরী?”
“জ্বী… হ্যাঁ,”
তিয়াশা কিছুটা জড়তা নিয়ে পুনরায় চেয়ারে বসল। ঠিক তখনই চটপটে ওয়েটারটি এসে টেবিলে কোল্ড কফি রেখে বিনীতভাবে চলে গেল। কফির গ্লাস থেকে ঠাণ্ডা বাষ্প উড়ছে। রুদ্রদ্বীপ ওর সামনের চেয়ারটা টেনে বসে অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে বললেন,
“আসলে কিছু আগে স্যারের সঙ্গে আপনাকে দেখেছিলাম। সো, ক্যাফেতে ঢুকেই আপনাকে দেখে চিনতে কোনো প্রবলেম হয়নি।”
তিয়াশা নিজের ওড়নাটা খানিকটা ঠিক করে নিয়ে বলল,
“আসলে বাবা আপনার কথা প্রায়ই বলেন। বাট, আপনি হঠাৎ এখানে? আই মিন, কোনো ইমার্জেন্সি…?”
রুদ্রদ্বীপ মৃদু হেসে বলল,
“নো! অ্যাকচুয়ালি, এদিকটাতে এসেছিলাম। কেসের কাজে বলতে পারেন।”
“ওহ,”
ওদের কথোপকথনের মৃদু গুঞ্জনের মাঝেই হঠাৎ ক্যাফের দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল আরাভ। ওকে এক নজর দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে,প্রচণ্ড কোনো ঝড় বয়ে গেছে ওর ওপর দিয়ে। সদ্যই হয়তো কোনো দু-র্ধ-র্ষ মা/রা/মা/রি বা ধস্তাধস্তি করে এসেছে সে। মাথার চুলগুলো অবিন্যস্ত হয়ে কপালে লেপ্টে আছে, পরনের শার্টের ওপরের দুটো বোতাম ছেঁড়া। ধুলোবালি লেগে পুরো পোশাকটাই বিধ্বস্ত।
ক্যাফেতে পা রাখতেই আরাভের ক্ষুব্ধ চোখ জোড়া গিয়ে পড়ল তিয়াশার ওপর। জানালার বাইরে থেকে আসা উজ্জ্বল আলোয় তিয়াশার ওমন প্রাণোচ্ছল, নিষ্পাপ হাসিটা দেখে মুহূর্তের জন্য আরাভের বুকের ভেতর এক অচেনা ভালোলাগা ছুঁয়ে গেল। কিন্তু সেই ভালোলাগার আয়ু হলো মাত্র কয়েক সেকেন্ড।
পরক্ষণেই যখন ওর দৃষ্টি গেল তিয়াশার ঠিক সামনে বসা রুদ্রদ্বীপের দিকে, আর দেখল তিয়াশা কীভাবে একজন পরপুরুষের দিকে তাকিয়ে অমন মধুর হেসে হেসে কথা বলছে।নিমেষেই আরাভের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ভেতর থেকে এক তীব্র, নিয়ন্ত্রণহীন ক্রোধ মাথার রগে গিয়ে আঘাত করল। কোনো অধিকার বা কারণ ছাড়াই, তিয়াশাকে অন্য কারও সাথে এতটা অন্তরঙ্গভাবে হাসতে দেখে ওর পুরো মেজাজটা মুহূর্তের মধ্যে চড়চড় করে গরম হয়ে গেল। নিজের অজান্তেই ওর দুই হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এল, আঙুলের গিঁটগুলো সাদা হয়ে উঠল।
রক্তিম দৃষ্টি হেনে ও সবে ওদের দিকে এগোতে উদ্যত ঠিক সেই মুহূর্তে পকেটে থাকা মুঠোফোনটা কর্কশ শব্দে কেঁপে উঠল। আরাভ অত্যন্ত বিরক্তি আর আক্রোশ নিয়ে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে একটা অপরিচিত নম্বর জ্বলজ্বল করছে। তিয়াশার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই ও এক ঝটকায় কলটা কেটে দিল। কিন্তু ও দমবার পাত্র হলেও ওপাশের মানুষটা নাছোড়বান্দা। সেকেন্ড কয়েকের মাথায় ফোনটা আবারও সশব্দে বেজে উঠল,
“হোয়াট দ্য হেল!”
আরাভ দাঁতে দাঁত চেপে এবারও কলটা রিজেক্ট করতে চাইল, কিন্তু পরক্ষণেই একনাগাড়ে আরও দু-তিনবার ফোনটা বাজতেই ওর ষষ্ঠেন্দ্রিয় জানান দিল, কোথাও কোনো বড়সড় গণ্ডগোল হয়েছে। তিয়াশা আর এসপি রুদ্রদ্বীপের ওপর শেষবারের মতো এক ঝলক খু-নি দৃষ্টি হেনে ও ফোনটা কানের কাছে ধরল। ওপাশ থেকে ভেসে আসা হড়বড়ে কণ্ঠস্বর আর ভেতরের খবরটা শোনা মাত্রই আরাভের কপালে কয়েকস্তরের গভীর ভাঁজ পড়ল।
ও ওপাশের মানুষের কথা শেষ হতে দিল না, চোয়াল শক্ত করে চটজলদি কণ্ঠে শুধু বলল,
“আই ‘ম কামিং। জাস্ট হোল্ড অন!”
কথাটা বলেই ও আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। দ্রুত পদক্ষেপে প্রস্থান করলো সেখান থেকে।
“আজ এসপি রুদ্রদ্বীপ সিনহার সাথে দেখা হয়েছিল বাবা।”
তাহের চৌধুরী ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে মাত্র বসেছেন, ঠিক তখনই তিয়াশা চটপটে পায়ে এসে ওর ওনার ঠিক পাশের চেয়ারটায় বসে খবরটা দিল। তাহের চৌধুরী রুটির টুকরোটা মুখে তুলতে গিয়েও থামলেন। কিছুটা অবাক হয়ে মেয়ের দিকে চেয়ে শুধালেন,
“রুদ্রদ্বীপের সাথে? কোথায়? ও তো এখন একটা স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিমের লিড দিচ্ছে। হঠাৎ ওর সাথে তোর দেখা কীভাবে হলো?”
তিয়াশা পানির গ্লাসটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বলল,
“আরে বাবা, কলেজ শেষে প্রচণ্ড গরম লাগছিল। তাই পাশের ক্যাফেটাতে একটু বসেছিলাম। ওখানেই উনি নিজে এসে আমার সাথে কথা বললেন। বললেন, তোমার সাথে নাকি ওনার ভাব আছে বেশ। মানে তোমার সাথে আগে কাজ করেছে আর কি।”
তাহের চৌধুরীর ক্লান্ত মুখে এতক্ষণে এক চিলতে চওড়া হাসি ফুটে উঠল। মেয়ের মাথায় আলতো টোকা দিয়ে বললেন,
“হবে না কেন? ও যেমন ব্রিলিয়ান্ট, তেমনই সৎ। ডিপার্টমেন্টের জুনিয়রদের মধ্যে ও আমার অন্যতম ফেভারিট।”
ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া ওঠা তরকারির বাটি হাতে প্রবেশ করলেন রেহানা বেগম। টেবিলের ওপর বাটিটা সশব্দে নামিয়ে রেখে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। কৃত্রিম রাগে মুখটা কুঁচকে বললেন,
“হবে না কেন! বাপে-ঝিয়ে যখন এক ফ্রেমে বসো, তখন তো দুনিয়ার সব পুলিশি কাসুন্দি এক টেবিলে এসে হাজির হয়! সারাদিন শুধু বাবা আর মেয়ে মিলে এই ক্রাইম, ডিপার্টমেন্ট আর আইনের গল্পই করে যাও। এই ঘরের যে একটা মানুষ সকাল থেকে তোমাদের জন্য উনুনপাড়ে খাটছে, তার খবর কি কেউ রাখো?”
মায়ের এমন অভিমানে তিয়াশা খিলখিল করে হেসে উঠল। ও চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলল,
“ওলে আমার জান আম্মুটা! রাগ করে না তো। তুমি রান্না করছিলে বলেই তো আমরা একটু পুলিশ-পুলিশ খেলছিলাম। দাও দেখি, আজ আমার ফেভারিট কী রান্না করেছ?”
রেহানা বেগম মেয়ের গালে একটা আদরের চড় মেরে বললেন,
“তোর ফেভারিট গরুর মাংস আর গরম ভাত করেছি। নে, এবার দুই পুলিশ অফিসার শান্ত হয়ে বসো তো, ডিনারটা শেষ করি।”
গভীর নিশীথিনী স্তব্ধতার চাদর মুড়ি দিয়ে ধরণীর বুকে শয়ান। বাতাসের দীর্ঘশ্বাস অলসভাবে ঝাউগাছের পাতায় শিহরণ জাগিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। নিশীথের প্রহরে রাজধানীর বুকে দিনের আলোয় দাপিয়ে বেড়ানো উন্মাদনা লোপ পেয়েছে খানিকক্ষণ আগেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আনোয়ার খানের রাজপ্রাসাদসম অট্টালিকাটি এখন নিস্তব্ধ, কেবল করিডোরের নিওন আলোটা একাকী প্রহর গুনছে।
আকস্মিক প্রধান ফটক খোলার তীক্ষ্ণ শব্দে সেই গুমোটবদ্ধ স্তব্ধতা খানখান হয়ে ভেঙে পড়ল। আরাভ ওর স্পোর্টস কারটা অস্বাভাবিক ক্ষিপ্রতায় পোর্টিকোয় থামিয়ে টলমলে পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল। ওর অবয়বে উশৃঙ্খলতার ছাপ স্পষ্ট অবিন্যস্ত চুল, আধখোলা শার্ট, নেশাগ্রস্ত নয়ন। লিভিং রুমে তখনো আনোয়ার খান গম্ভীর মুখে বসে ছিলেন; ছেলের এই অবস্থায় ফেরা তাঁর কাছে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হলেও আজকের আরাভের অবয়বে অস্বাভাবিকতা স্পষ্ট।
আরাভ টলতে টলতে সোফার সামনে এসে দাঁড়াল। বাবার বিস্ফোরক নেত্রের তোয়াক্কা না করেই ও স্থির গলায় বলে উঠল,
“আই ওয়ানা ম্যারি তিয়াশা চৌধুরী,বাবা।”
আকস্মিক আরাভের এহেন অযৌক্তিক দাবিতে আনোয়ার খানের হাতে থাকা কফির মগটা কাঁপল খানিকটা। তিনি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন,
“হোয়াট? তুমি কি বলছো নিজে বুঝতে পারছো, আরাভ? আর ইউ ইন ইয়োর সেন্সেস? ইজ্য দ্যাট আ জোক আরাভ?”
আরাভ বাঁকা হেসে টলতে টলতে কাঁচের সেন্টার টেবিলটার ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াল। নেশাগ্রস্থ র’ক্তিম বর্ণ ধারণ করা চক্ষদ্বয়ের ভয়াল দৃষ্টি সরাসরি বাবার বিস্মিত দৃষ্টিতে নিবদ্ধ করে বলল,,
“আই অ্যাম ইন মাই ফুল সেন্সেস, বাবা! আমার তিয়াশা চৌধুরীকেই চাই। ডোন্ট আস্ক মি হোয়াই, জাস্ট মেক ইট হ্যাপেন। ওকে আমার চাই-ই চাই।”
আনোয়ার খান এবার গর্জে উঠলেন,,
“দিস ইজ রিডিকুলাস আরাভ! তুমি কি জানো না তিয়াশা চৌধুরীর বাবা কে? ডিআইজি তাহের চৌধুরী কোনোদিনও তাঁর একমাত্র মেয়েকে তোমার মতো একজনের হাতে তুলে দেবেন না। আর কালকের ওই ব্ল্যাকমেইল ঘটনার পর তো প্রশ্নই আসে না। ডোন্ট বি আ ফুল, আরাভ!”
এক পৈশাচিক জেদ আষ্টেপিষ্টে ধরেছে আরাভকে;ও বাবার বজ্রকন্ঠের তোয়াক্কা না করেই গলার স্বর সপ্তমে চড়িয়ে বলল,,
“আই ডোন্ট কেয়ার অ্যাবাউট হার ফাদার! লিসেন বাবা, তুমিই তো শিখিয়েছো যে পাওয়ার থাকলে সবকিছু কেনা যায়। দেন ইউজ ইয়োর পাওয়ার! তাহের চৌধুরীকে বাধ্য করো। আমার কোনো রিজন নেই, কোনো লজিক নেই—আই জাস্ট ওয়ান্ট হার। তিয়াশা আমার হবে, এটাই শেষ কথা। দ্যাটস ইট!”
আনোয়ার খান কপালে হাত দিয়ে বসে পড়লেন। তিনি শান্ত গলায় বোঝানোর চেষ্টা করলেন,,
“শোনো আরাভ, বিয়ে কোনো ছেলেখেলা নয়। আর ইলেকশন দোরগোড়ায়। এই সময় এমন কোনো পাগলামি করো না যাতে আমাদের মান-সম্মান ধুলোয় মিশে যায়। কুল ডাউন।”
বাবার এই শান্ত উপদেশ আরাভের আগুনের শিখায় যেন ঘি ঢালল। ও টেবিলের ওপর রাখা একটা দামী ফুলদানি এক ঝটকায় মেঝেতে আছড়ে ফেলল। কাঁচের ঝনঝন আওয়াজ নিস্তব্ধ পুরীর নীরবতা ভঙ্গ করে শব্দের ঝড় তুললো। ,,
“জাস্ট শাট আপ উইথ ইয়োর ইলেকশন! সব সময় শুধু তোমার ক্যারিয়ার আর পজিশন? আমার চাওয়ার কি কোনো দাম নেই? ঠিক আছে, তুমি যদি সাহায্য না করো, আমি আমার পথ দেখে নেব। আই উইল ডু ইট মাই ওয়ে!”
“ট্রাই আন্ডারস্ট্যান্ড আরাভ; ইট’স ইম্পসিবল। আদারওয়েজ!”
তাকে কথা শেষ না করতে দিয়ে আরাভ ফের বলল,,“দ্যাট মিন্স তুমি বলছো যে তুমি করতে পারবে না?”
“আরাভ, তুমি নেশার ঘোরে আছো। তুমি নিজের সেন্সে নেই বলেই এখন এরকম ইম্পসিবল আর উল্টাপাল্টা কথা বলছ। তাহের চৌধুরীকে আমি চিনি, তাকে বন্দুকের নলের মুখে দাঁড় করালেও সে তিয়াশাকে তোমার মতো একজনের হাতে তুলে দেবে না। এখন যাও, রুমে গিয়ে ঘুমাও। সকালে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
আনোয়ার খান এগিয়ে এসে আরাভের কাঁধে হাত রাখতে চাইলেন ওকে বেডরুমে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আরাভ এক ঝটকায় বাবার হাত সরিয়ে দিল।
“ঘুমালেই সব ঠিক হয়ে যাবে? নো বাবা ইট’স ইম্পসিবল। আই ওয়ান্ট হার!”
বলেই ও মেঝেতে পড়ে থাকা ফুলদানির ভাঙা কাঁচের ওপর সজোরে পা দিয়ে পেষণ করল। আনোয়ার খান ধমকে উঠলেন,,
“আরাভ! অনেক হয়েছে। জাস্ট গো টু ইয়োর রুম। আমি সিকিউরিটি ডাকতে বাধ্য হবো কিন্তু!”
আরাভ এক পা পিছিয়ে বাঁকা হেসে বলল,,
“ইয়্যু অ্যান্ড ইয়্যোর সিকিউরিটি গো টু হেল। তিয়াশা আমার হবে মানে আমারই হবে। আই উইল হন্ট হার টিল দ্য এন্ড!”
আনোয়ার খান কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরাভ ঝড়ের গতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পোর্টিকো থেকে ওর স্পোর্টস কারের ইঞ্জিনের গগনবিদারী গর্জন শোনা গেল। টায়ারের ঘর্ষণে পিচে আগুনের ফুলকি ছুটিয়ে গাড়িটা গেট পেরিয়ে রাতের নিকষ কালো অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। আনোয়ার খান অসহায়ভাবে ডাইনিং রুমের জানালার দিকে তাকিয়ে রইলেন। ক্ষমতার চূড়ায় বসে থাকা এই মানুষটি আজ নিজেরই ছেলের কাছে বড্ডবেশি অসহায় বোধ করছেন।
সময়টা মধ্যরাত; ঘড়ির কাঁটার রাত দুটো ছুঁয়েছে বহুক্ষণ।ডিআইজি তাহের চৌধুরীর সরকারি বাসভবনের সামনে কড়া নিরাপত্তা। বিনিদ্র প্রহরীগণ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিজ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট। সহসা নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে বিকট শব্দ তুলে সেখানে হাজির হলো কালো রঙা আকৃতিতে বেশ বড়সড় এক স্পোর্টস কার। প্রধান ফটকে দায়িত্বরত সিকিউরিটি গার্ডরা কিঞ্চিৎ বিস্মিত ও সতর্ক দৃষ্টি নিবদ্ধ করল সেদিকে। পরমুহূর্তেই ওদের বিস্ময়ের চূড়ান্তের পৌঁছে টলোমলো পায়ে গাড়ি থেকে নেমে এলো আরাভ।
প্রবীণ কেরামত আলী চশমা থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওকে পরখ করার পরমুহূর্তেই বুঝলেন ছেলেটি প্রকৃতপক্ষে নেশাগ্রস্থ। তাই তিনি নিজ অভিজ্ঞতায় পরিস্থিতি সামাল দিতে শান্ত কণ্ঠে শুধালেন,
“ কি চাই?”
ওনাকে একপ্রকার অবজ্ঞা করে সম্মুখে এগিয়ে গেলো আরাভ। ডিআইজি তাহের চৌধুরীর বহুতল ভবন এটা,সে ক্রুর হেসে চিৎকার করে বলল,,
”শ্বশুর আব্ব্বা!!”
আকস্মিক ওর এমন কাণ্ডে বিস্ময়ে থ হয়ে গেলো সবাই।দুজন মোটাতাজা লোক এগিয়ে এসে ওকে সরাতে তৎপর হলেও সেদিকে বিন্দুমাত্র আগ্রহ না দেখিয়ে ও পুনরায় ডাকলো,,
“ ওওও শ্বশুর আব্ব্বা!!”
আকবর সাহেব তেড়ে এলেন,,
“অসভ্য ছেলে!”
আরাভ ওনার দিকে চেয়ে শান্ত স্বরে বলল,, “আরে আরে চাচা, রিল্যাক্স, রিল্যাক্স!একটু রেসপেক্ট দিন। হবু জামাই হই আপনাদের এই বাড়ির। এত হাইপার হচ্ছেন কেন?”
এদিকে তাহের চৌধুরীর নিদ্রার গভীরতা বরাবরই খানিকটা কম। সামান্য শব্দেই তাঁর ঘুম চটে যায়। মাঝরাতের এই আকস্মিক হট্টগোল আর তীব্র চেঁচামেচির আওয়াজ কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই উনি ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলেন। কপালে বিরক্তির ভাঁজ নিয়ে বেডসাইড ল্যাম্প আর ঘরের মূল আলোটা জ্বেলে দিলেন।
পাশের ল্যাম্পের আলোয় রেহানা বেগমও চোখ কচলাতে কচলাতে জেগে উঠলেন। স্বামীর মুখের উদ্বেগের রেখা দেখে তিনিও কিছুটা আতঙ্কিত কন্ঠে শুধালেন,,
“কী হয়েছে গো? মাঝরাতে বাইরে কিসের এত শোরগোল?”
তাহের চৌধুরী গম্ভীর মুখে চাদরটা সরিয়ে বিছানা থেকে নামলেন,
“জানি না। কেউ একজন নিচে চেঁচামেচি করছে। তুমি ঘরেই থাকো, আমি দেখে আসছি।”
রেহানা বেগমও একা থাকতে না পেরে স্বামীর পেছন পেছন দ্রুত পায়ে নিচে নামলেন। লিভিং রুম পার হয়ে সদর দরজার দিকে এগোতেই তাঁদের কানে স্পষ্ট এলো বাইরের সেই মা;তা;ল কণ্ঠস্বর। ড্রয়িংরুমের দরজা খুলে বারান্দার আলোয় আসতেই তাহের চৌধুরীর চোখমুখ ক্রোধে থমথম করে উঠল। ওদিকে এই তীব্র চিৎকার-চেঁচামেচির কারণে তিয়াশারও কাঁচা ঘুমটা এক ঝটকায় ভেঙে গিয়েছিল। ও নিজের ওড়নাটা কোনোমতে গায়ে জড়িয়ে, চোখ ডলতে ডলতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো।
“কী হচ্ছে বাবা এখানে? এত রাতে…”
তিয়াশার কথা শেষ হলো না। ও নিবদ্ধ দৃষ্টিতে তাকাল সদর ফটকের দিকে। সেখানে লাইটের আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে থাকা বিধ্বস্ত, নেশাগ্রস্ত আরাভকে দেখে ওর চোখের পাতা স্তব্ধ হয়ে গেল। নেশার ঘোরে থাকা আরাভের চোখ জোড়া এতক্ষণ প্রহরীদের দিকে থাকলেও, তিয়াশার উপস্থিতিতে সেই দৃষ্টি মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল।
সদ্য ঘুম থেকে ওঠার কারণে তিয়াশার চুলে এক অদ্ভুত বুনো অবিন্যস্ততা, চোখে আলসেমির ঘোর, আর এই নিঝুম রাতের আলোয় ওর সেই নিষ্পাপ, শুভ্র মুখশ্রীকে যেন অপার্থিব কোনো মায়াবী পরীর মতো দেখাচ্ছিল। তিয়াশার ওমন রূপ দেখে আরাভের ভেতরের সমস্ত ক্ষোভ এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে এক গভীর, আদিম মুগ্ধতায় রূপ নিল। ও পলকহীন চোখে শুধু তিয়াশার দিকেই তাকিয়ে রইল।
তাহের চৌধুরী নিজের রাগকে আর সামলাতে পারলেন না। ওনার মেজাজ তখন সপ্তমে চড়ে গেছে। উনি প্রহরীদের দিকে চেয়ে গর্জে উঠলেন,
“কেরামত! আকবর! এই ড্রাংক ছেলেকে এখনো তোমারা আটকে রেখেছ কেন? ধরে বের করে দাও। সাহস কত বড়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে হয়েছ তো কী হয়েছে? আমার বাড়ির সামনে এসে এই নোংরামি!”
তিনি আরাভের দিকে এগিয়ে এসে তীব্র ধমকের সুরে বললেন,
“আরাভ খান! গেট লস্ট ফ্রম হেয়ার! নিজের লিমিট ক্রস কোরো না। কালকের ভুলের পর আজ আবার এই ধৃষ্টতা? ইয়্যু আর আন্ডার অ্যারেস্ট হতে পারো এই মুহূর্তে, জাস্ট লিভ!”
কিন্তু আরাভ তাহের চৌধুরীর এই তীব্র বাণ, পুলিশি হুমকি বা রেহানা বেগমের আতঙ্কিত চাহনি—কোনো কিছুতেই বিন্দুমাত্র কান দিল না। ওর চোখ তখনো তিয়াশার ওপর আটকে। ও তিয়াশাকে উদ্দেশ্য করে ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক, বিজয়ী হাসি ফুটিয়ে তুলল।তাহের চৌধুরীর দিকে সামান্য ঘাড় ফিরিয়ে ও মায়াবী অথচ অত্যন্ত শীতল কণ্ঠে বলল,
“চিল, ডিআইজি সাহেব! এত হাইপার হলে প্রেশার বেড়ে যাবে। আমি তো জাস্ট আমার হবু ওয়াইফকে এক নজর দেখতে এসেছিলাম। অ্যান্ড ট্রাস্ট মি, শি ইজ জাস্ট বিউটিফুল!”
“স্টপ ইট, আরাভ!”
তাহের চৌধুরী এবার ক্ষোভ আর তীব্র অস্বস্তিতে চেঁচিয়ে উঠল,
“তুমি এই মুহূর্তে এখান থেকে যাবে, নাকি আমরা সত্যি ফোর্স ইউজ করব?”
আরাভ ওনাল সেই রাগী মুখের দিকে তাকিয়ে বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে এক পা পিছিয়ে গাড়ির দরজায় হাত রাখল। তাহের চৌধুরীর চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে এক চূড়ান্ত থ্রেটের সুরে বলল,
“তাহের চৌধুরী সাহেব, আপনি যতই ডিআইজি হোন আর যতই পাওয়ার দেখান না কেন—আই ডোন্ট জাস্ট কেয়ার! আপনার এই আদরের মেয়েকে আমি নিজের করেই ছাড়ব। পারলে আটকে দেখান! দুনিয়ার কোনো ফোর্স আপনার মেয়েকে আমার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না। দিস ইজ মাই ওপেন চ্যালেঞ্জ টু ইউ!”
ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৩
কথাটা শেষ করেই ও তিয়াশাকে লক্ষ্য করে একটা ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দিয়ে বাঁকা হাসল। পরমুহূর্তেই প্রহরীরা ওকে ধরতে যাওয়ার আগেই ও ক্ষিপ্র গতিতে স্পোর্টস কারে গিয়ে বসল।ইঞ্জিনের সেই চেনা গগনবিদারী গর্জন তুলে, টায়ারের ঘর্ষণে পিচের রাস্তায় ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে গাড়িটা অন্ধকারের বুকে হারিয়ে গেল। পেছনে রেখে গেল এক থমথমে, আতঙ্কিত আর ক্রোধে উন্মত্ত পরিবেশ। তাহের চৌধুরী মুষ্টিবদ্ধ হাতে দাঁড়িয়ে রইলেন, আর তিয়াশা তীব্র ক্ষোভ-অস্বস্তি আর অজানা আশঙ্কায় শিউরে উঠে মায়ের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।
