Home ভুলভাল অন্তরাল ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২৩

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২৩

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২৩
মুশফিকা রহমান মৈথি

জুলফিকার পটনভীর বয়স আশির অধিক। সঠিক বয়সটা তিনি নিজেও জানেন না। জাতীয় পরিচয়পত্রে হিসেব করলে তা ঊনআশি। আসল বয়স নিশ্চিতভাবে তারও বেশি। জন্মসাল বৃদ্ধের মনে নেই। তখনের বাবা মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করলে তারা বলতেন,
“ওই যে বন্যা হলো, সেই বন্যার রাতে হয়েছে।”
সেই বন্যা যে ঠিক কবে আর কোন সালে হয়েছে তা কেবল তারাই জানে। হয়তো তারাও জানে না। নবাব বংশীয় হবার পরও নিজের জন্মসাল না জানা হাস্যকর-ই বটে। বয়স এতোবেশী হবার পরও জুলফিকার পটনভীর দেহে আমূল পরিবর্তন আসে নি। হ্যা, এটা সত্য যে তার কানে সমস্যা দেখা গেছে। মেশিন ছাড়া কিছু শুনেন না। চোখে ছানি পড়েছে হালকা। অপারেশন করার বয়স এখন তার নেই। হাটতে গেলে লাঠির প্রয়োজন। হার্টে সমস্যা দেখা গেছে বহু বছর।

এতো সমস্যার মধ্যেও তিনি এখনো সচল, কর্মঠ। বিছানায় বুড়ো মানুষের মতো পড়ে থাকা তার অপছন্দ। ভোরে উঠেন, সময়মত নামায পড়েন। খাবারের কোনো অনিয়ম তিনি করেন না। ঠান্ডা পানি দিয়ে এখনো গোসল করেন। এখনো তার কণ্ঠে সেই তেজ, চাহনীতে উত্তাপ। পটনভী পরিবারের সকল বিষয়ে তার কথাই শেষ। দাপট কমে নি এক বিন্দুও। ম্যানেজার এবং সেক্রেটারি মুহিবের উপর তিনি এক অংশ বিশ্বাস করেন না। মুহিব কামচোর। কিন্তু বহুপুরোনো বিধায় তাকে ছাটাই করতে পারেন না। ছাটাই করতে গেলে মনে পড়ে ঘর ভর্তি অকর্মা। শুধু ওর চাকরি খেয়ে ওর পেটে লাথি দিয়ে কি লাভ?
জুলফিকার পটনভীর একমাত্র ভরসার জায়গা তার নাতী সরফরাজ পটনভী। ছেলেটার মধ্যে তিনি নিজের ছাপ দেখতে পারেন। তার মৃত্যুর পর এই পটনভী বংশের হাল কেউ যদি ধরতে পারে তা হবে এই ছেলেটা। সেই তেজ, সেই রওয়াব, সেই গাম্ভীর্য। এমনটা তার ছেলেরা বা ভাতীজারা কেউ ই পায় নি।
স্নিগ্ধ বৃদ্ধের সামনে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বুকে তার দুহাত বাঁধা। মুখশ্রী বিকারহীন। বৃদ্ধ হুক্কাটা একপাশে রেখে ভারী স্বরে শুধালেন,

“আমি কেন তোমার সাথে কাঞ্চনের বিয়ে দিয়েছি জানো তো?”
“জি, কাঞ্চনের সুরক্ষার জন্য।”
বৃদ্ধ আরাম কেদারায় শরীরটা এলিয়ে দিয়ে বললেন,
“আজ কি সেটা হয়েছে?”
সরফরাজ পটনভী সুস্পষ্ট উত্তর দিলো,
“না।”
“সেই দায় কার?”
“আমার। আমি ওর আশেপাশে থাকতে আর কখনো এমন হবে না।”
“এমনটা তুমি ওর কিডন্যাপের পরও বলেছিলে।”
এবার আর কোনো উত্তর আসলো না শিরদাঁড়া টানটান করে দাঁড়ানো যুবকটির কাছ থেকে। বরং তার মুখশ্রীতে ফুটে উঠল বিরক্তি। কপালে ভাঁজ পড়লো। ভ্রু কুঁচকে এলো। চোয়াল শক্ত হলো। দৃষ্টিতে অস্ফুট রাগ। জুলফিকার পটনভী ধীর গলায় বললেন,

“আমি অপরাধবোধে ভুগতে চাই না আর। সেবারের এক অপরাধ আমাকে এখন অবধি খামচে ধরে আছে। মেহরিনের বিয়ে দিয়েছিলাম এই ভেবে যে মেয়েটা সুখী হবে। আমার ছেলে সালমান তাকে সুখী করবে। কিন্তু অপদার্থটা মেহরিনকে এমন সময় ছেড়ে গেছে যে সময়ে মেহরিনের তাকে সবচেয়ে বেশি দরকার। মেহরিনের মেয়েটাও মায়ের ভাগ্য নিয়ে এসেছে। আমি তার উজ্জ্বল ভবিষ্যত এবং আমার পাপমোচনের জন্য সালমানের সম্পত্তি ছাড়াও আমার নিজস্ব কিছু জমিজমা লিখে দিয়েছি। এখন বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সম্পত্তির মালিক আমার নাতনী কাঞ্চন। সেটাই তার কাল হয়েছে। আমার বয়স হয়েছে। আজ বাদে কাল আমি কবরে শুয়ে থাকবো। তখন আমার ঔরসেরাই প্রথম হামলে পড়বে ওই মেয়েটার উপর। পটনভী পরিবারে যেন তার স্থানটা শক্ত থাকে সেকারণেই কিন্তু তোমার সাথে তার বিয়েটা আমি দিয়েছি। কি ভুল বলছি সরফরাজ?”
স্নিগ্ধ শক্ত গলায় বললো,
“না, আপনি ভুল বলেন নি। আমি আমার ব্যর্থতা স্বীকার করছি।”

স্নিগ্ধকে মনে হলো সে তার সুপিরিয়র কোনো অফিসারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মিশনে কোনো ক্রুটি হলে সেই দায়ভার তারা এভাবেই স্বীকার করে। কাঞ্চনের সাথে বিয়েটাও মিশনের থেকে কম নয়। সরফরাজ পটনভীর জীবনের সবথেকে বড় মিশন তার কাঞ্চনকে নিজের জীবনের সাথে চিরকালের জন্য বেঁধে ফেলা।
কাঞ্চনের বয়স এখন বাইশ পার হয়ে তেইশে পড়েছে। তার দাদাজান তার নামে ঠিক কি কি সম্পত্তি লিখে দিয়েছেন সেই বিষয়ে মেয়েটি অজ্ঞাত। পটনভী বংশের বিষয়সম্পদের প্রতি তার আগ্রহ নেই। কাঞ্চনের আগ্রহ শুধু এই বাড়ি থেকে পালানোর। নিজের একটা ছোট্ট জগত তার। ফেসবুকে ভিডিও বানায়, সেখান থেকে তার উপার্জন হওয়া শুরু হয়েছে। সে অপেক্ষায় আছে যখন শত ডলার হবে তখন ক্যাশআউট করে ভালো লেন্স কিনবে। ম্যানেজার মুহিব কাকা যে টাকা তাকে মাসিক খরচা দেয় সেটাই তার জন্য যথেস্ট। সেই টাকা জমিয়ে জমিয়ে ভিডিও বানানোর নানাবিধ যন্ত্রাদি সে কিনেছে। এটাই তার দুনিয়া। ট্রাভেল করার নেশা তাকে উন্মাদ করে তুলেছে। যদি পটনভীরা তাকে কিছু নাও দেয় তাতেও কোনো আফসোস নেই। সুতরাং তার পক্ষে কখনো জানা সম্ভব নয় যে বড় কাকা তার নামের শেয়ার সিগনেচার নকল করে বিক্রি করে দিয়েছেন।

রফিকুল্লাহ পটনভীর এই সাংঘাতিক কাজটা এতো গোপনে করা যে জুলফিকার পটনভীর চোখকেও ফাঁকি দিতে সক্ষম। জুলফিকার পটনভী ব্যপারটা জেনেছেন অনেক পরে। তখন থেকেই বৃদ্ধের দুশ্চিন্তা শুরু। তার মৃত্যুর পর কাঞ্চনকে এরা এক বিন্দু সম্পদ দিবে না। কাঞ্চনের বাবা সালমান পটনভীকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে বছর পাচেক। কারণ আজ চব্বিশ বছর তার কোনো খোঁজ নেই। সুতরাং সালমানের অংশের অর্ধেক সম্পত্তি-ই পাবে কাঞ্চন। বাকিটা অন্যদের মধ্যে ভাগ হবে। কিন্তু যে চাচা ভাতিজীর সই নকল করে তার শেয়ার বিক্রি করে দিতে পারে তারা যে কাঞ্চনকে কিছুই দিবে না তাতে সন্দেহ নেই জুলফিকার পটনভীর। নিজের ছেলে, ভাতিজাদের বিশ্বাস নেই। তারা আরোও সাংঘাতিক হয়ে যেতে পারে। এই কারণেই একটা শক্ত কাঁধের প্রয়োজন যে কাঞ্চনকে আগলে রাখবে৷ সরফরাজের থেকে বিশ্বাসযোগ্য পুরুষ দ্বিতীয়টি জুলফিকার পটনভীর চোখে পরে নি। সরফরাজ শুধু কাঞ্চনের হক আদায় করে দিবেই না, এই পটনভী মঞ্জিলের শক্তভাবে অবস্থান নিতে সাহায্য করবে। এই সব কিছু ভেবেই সরফরাজকে তিনি কাঞ্চনকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন।

জুলফিকার পটনভী ভেবেছিলেন সরফরাজ রাজী হবে না। কারণ কাঞ্চন এবং সরফরাজ দুমেরুর দুজন মানুষ। তাদের স্বভাবের মিল নেই। সরফরাজ যতটা গম্ভীর, ধীরস্থির, শৃঙ্খলাপরায়ন, মিতভাষী; কাঞ্চন ততটাই উড়ণচণ্ডী, বেপরোয়া, মুক্তমনা, স্বাধীনচেতা। কোনোভাবেই একজন কাঠখোট্টা মানুষের সাথে এমন স্বভাবের নারীকে মানায় না। মেয়েটি কখনোই সরফরাজের আধিপত্য মেনে নিবে না। সরফরাজ কখনো তার স্বেচ্ছাচারিতা মেনে নিবে না। তবুও জুলফিকার পটনভী নিজের নাতীকে প্রস্তাবটি দিয়েছেন। পুনরায় ভুল করার আশংকা থাকা সত্ত্বেও তিনি কাঞ্চনের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সরফরাজের কাছে বিয়ের প্রস্তাবটা রাখেন তিনি।
জুলফিকার পটনভীকে অবাক করে কাঞ্চনকে বিয়ের প্রস্তাবে সরফরাজ আপত্তি করে নি। বরং দৃঢ় স্বরে বলছিলো,

“আমি রাজি। তবে কাঞ্চন আমাকে বিয়ে করবে না। ওকে সরসরি বললে ও পালিয়ে যাবার ধান্দা করবে।”
“তাহলে কি চাও তুমি?”
“আপনার নাতনী এতোটা সহজ নয় যতটা আপনারা তাকে ভাবছেন। সে এতোটা বেচারীও নয়। তাকে আমার সাথে বাঁধতে হলে কিছু পরিকল্পনা করতে হবে নানাজান। তাও তার অগোচরে। আপনি আমার উপর ছেড়ে দিন নানাজান। আমি কথা দিচ্ছি, আমি আপনার নাতনীকে আগলে রাখবো।“
জুলফিকার পটনভী নিশ্চিন্ত হলেন। স্নিগ্ধের কথামত তিনি প্রীতির সাথে স্নিগ্ধের বিয়ে ঠিক করেন। প্রীতির এই বিয়েতে মত ছিলো না। সে তার বাবাকেও বলেছিলো। স্নিগ্ধর মতো আবেগহীন, রোবটমানবকে বিয়ে করা অসম্ভব। যখন কোনো উপায় পেলো না, তখন সে সরাসরি স্নিগ্ধকেই জানায়,
“স্নিগ্ধ, আপনাকে আমার পছন্দ নয়।“
“আমি জানি।“
“তাহলে আমাকে বিয়ে করছেন কেন?”
স্নিগ্ধ তখন রাশভারী স্বরে বলেছিলো,

“আমি তোমাকে বিয়ে করবো না। তোমার বিয়ে তার সাথেই হবে যাকে তুমি পছন্দ কর। শুধু তোমাকে আমার কথা মত কিছু কাজ করতে হবে।“
প্রীতির কাছে স্নিগ্ধর আদেশ শোনা ছাড়া উপায় ছিলো না। এতো বছরের প্রেমিক যে কি না প্রীতি বলতে পাগল সেই পুরুষকে ছেড়ে এই কাঠখোট্টা পুরুষকে বিয়ে করার কোনো মানে হয় না। বরং স্নিগ্ধকে দেখলেই প্রীতির ভয় করে। কি ভয়ংকর চাহনী।
প্রীতি স্নিগ্ধের কথা মত পার্লার থেকে পালায়। একটা চিঠি লিখে যায় যেখানে পালানোর দোষটা কাঞ্চনের উপর দেওয়া। জুলফিকার পটনভী সেদিন মিথ্যে রাগ দেখায় কাঞ্চনের উপর। বিয়ের ঘোষণার পর কাঞ্চন আবারোও পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ব্যর্থ হয়, স্নিগ্ধ যেন তার রন্ধ্র রন্ধ্র সম্পর্কে অবগত। অবশেষে কাঞ্চনের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই এই বিয়েটা হয়েছে। এটাই জুলফিকার পটনভীর ভয়। মেয়ে কি বাবার মত হবে না? সালমানকে জোর করে বিয়ে দেওয়ার ফল ভোগ করেছে মেহরিন। এখানে কি গল্পটা ভিন্ন হবে। কাঞ্চন জেদি, একগুঁয়ে মেয়ে। সে কি স্নিগ্ধকে মেনে নিবে? এসব চিন্তা আজকাল খুব বেশি যন্ত্রণাদায়ক হয়ে গিয়েছে বৃদ্ধের জন্য। তাই ভারী স্বরে তিনি খুব ধীরে বললেন,

“মেয়েটা খুব পালাই পালাই করে সরফরাজ, তুমি ওকে নিজের সাথে বেঁধে রাখতে পারবে তো?”
“আপনি চিন্তা করবেন না, নানাজান। আমি কাঞ্চনকে এমন এক বৃত্তে জড়াবো, যেখান থেকে পালানোর কোনো পথ থাকবে না। তার প্রতিটি পাতায় আমি থাকবো। আমার ভুলভালকে অন্তরাল করে ওর জীবনের ধ্রুবতারা হয়ে থাকবো. I will make sure of that.”
আত্মবিশ্বাস এবং দৃঢ়তা ছলকালো স্নিগ্ধের কণ্ঠে। জুলফিকার পটনভী ক্লান্ত স্বরে বললেন,
“আমি ওকে সুখী দেখতে চাই। ওর জীবনের সব খামতিগুলো পূরণ হতে দেখতে চাই।“
“I will make her the happiest woman.”
“সে আর তুমি আলাদা। অধৈর্য্য হলে কিন্তু হবে না।“
“জানি, আমি ওকে আমার মত গড়িয়ে নিব। কাঞ্চনের ক্ষেত্রে আমি খুব ধৈর্য্যশীল।“
বৃদ্ধ হাসলেন। সন্দিহান স্বরে শুধালেন,
“তুমি কি শুধু আমাকে খুশী করার জন্যই ওকে বিয়ে করেছো সরফরাজ?”
স্নিগ্ধর ঠোঁটের কোন বাঁকালো। জড়তাহীন স্বরে বললো,

“আমি কাউকে খুশি করার জন্য কোনো কাজ করি না নানাজান।“
“তাহলে?”
স্নিগ্ধ হালকা করে ঠোঁট নাড়িয়ে বললো,
“I owe her something.”
বৃদ্ধের কানে গেলো না কথাটা। তিনি আবার শুধালেন,
“হ্যা?”
এর মধ্যেই লাবুর মা এসে দাঁড়ালো দরজায়। প্রীতির বিদায় হবে। তাই সবাইকে খবর দিচ্ছে সে। স্নিগ্ধ নানাজানের উদ্দেশ্যে বললো,
“আমি নিচে যাচ্ছি। আপনি বিশ্রাম করুন।“
বলেই সে বেরিয়ে গেলো। জুলফিকার সাহেব গা এলিয়ে দিলেন। ঘুমে চোখ ভারী হয়ে যাচ্ছেন। মনে মনে প্রার্থনা করলেন,
“আল্লাহ, এবার আমার নাতী-নাতনীরা যেন সুখী হয়।“

প্রীতিকে গাড়িতে তুলে দেওয়া হলো। প্রীতি খুব কাঁদলো। কান্নাটা কি আসল নাকি নকল কাজিনমহল জানে না। তবে তাদের দৃষ্টি আঁটকে ছিলো আফনানের দিকে। লোকটার মুখটা কালো লাগছে। বিষাদ জমে আছে। লোকটির জন্য মায়া হচ্ছে। তবে প্রশংসা করা ছাড়া উপায় নেই। নেহায়েত ভদ্রলোক। তাইতো সবকিছুই নিজের মধ্যে চেপে রেখেছেন। কাউকে বুঝতেও দেন নি। তবে প্রীতির থেকে দুরত্ব রেখেছেন যথেষ্ট। অঞ্জনা বললো,
“বেচারাকে দেখে আমার কান্না পাচ্ছে। এমন ভালো পুরুষ পটনভীদের মধ্যে তো হয় না।“
তাশদীদ গলা খাঁদে নিয়ে বললো,
“তুই চাইলে আমি এমন ভেড়া হতে রাজী বিল্লি।“
অঞ্জনা চোখ মুখ কুঁচকে চাইলো। কড়া স্বরে বললো,
“আমি নিজের বংশে বিয়ে করবোই না চান্দু।“
“পাপা কি পারী তুই, যা চাইবি সেটাই হবে।“
“শাট আপ।“
বলেই হনহন করে ভেতরে চলে গেলো অঞ্জনা। “পাপা কি পারী” কথাটা বরাবর তাকে রাগায়। এবং এই কথাটা শুধু তাশদীদ ই তাকে বলে। পৃথুলা তাশদীদের পেটে একটা কনুই দিয়ে গুতা দিলো। তাশদীদ সাথে সাথে বলে উঠলো,
“পেটে মারিস না, বিরিয়ানি বেরিয়ে যাবে।“
“বের হোক।“
“এই রিদম তোর আমদানির মাকে সাবধান কর।“
রিদম কিছু বললো না। পৃথুলার সাথে কথা বলবে না সে। তার দিকেও তাকাবে না। বেহায়া মনটাকে একটু জব্দ করা প্রয়োজন।

স্নিগ্ধ ঘরে এসে ধাক্কা খেলো। পা আটকে গেলো। চোখ গেলো বিছানায়। বিছানায় শুয়ে আছে রিদ্ধি আপুর ছয় মাসের ছেলে হামজা। ছোট্ট তুলতুলে শরীরটা হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। আর কাঞ্চন তার সাথে খেলছে। তার পেটে মুখ ঘষতেই সে খিলখিল করে ফোঁকলা মাড়ি দেখিয়ে হেসে উঠছে। কাঞ্চন তাই আবারোও তার পেটে নাক ঘষছে। বাচ্চা ছেলেটির খিলখিল হাসি গুঞ্জছে স্নিগ্ধের ঘরে। কাঞ্চনের চুল খোলা বলে তুলতুলে হাতটা খপ করে চুল ধরলো, মুখে দেওয়ার চেষ্টা করলো। কাঞ্চন সাথে সাথেই বলে উঠলো,
“আব্বু আমার, এমন করে না। পেট খারাপ হবে।“
বলেই আলতো করে চুল ছাড়ালো। আবারোও নাকে নাক ঘষলো। ফোঁকলা মাড়ি দিয়ে কাঞ্চনের থুতনি কামড়াতে চাইলো গুলুমুলু হামজা। কাঞ্চন আদুরে স্বরে বললো,
“আমার আব্বুর ক্ষুধা লেগেছে? এখন দুদু খাবে? আমরা আর খেলবো না। এখন ই আম্মুকে বলবো আমাদের খাবার দিতে। আমার সোনা বাবা। আমার ভালো বাবা।“

হামজা তার জিহবা বের করে হাসলো। কাঞ্চন তার গালে চুমু খেতেই শব্দ করে হাসলো হামজা। স্নিগ্ধ দরজায় হেলান দিয়ে স্থির নয়নে তাকিয়ে আছে। দৃশ্যটা তার মনে ধরেছে। এমন একটা দৃশ্য দেখতে সে কখনোই বিরক্ত হবে না। কাঞ্চন কি পারদর্শী ভঙ্গিতে কোলে তুললো ছোট দেহটাকে। দেহটা মিশে রইলো কাঞ্চনের বুকের সাথে। কাঞ্চন তার চুলহীন মাথায় চুমু খেলো। হামজাকে মায়ের কাছে দিয়ে আসার জন্য পা বাড়াতেই দেখলো স্নিগ্ধ দাঁড়িয়ে আছে। কাঞ্চন তার পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে স্নিগ্ধ গাঢ় স্বরে বললো,
“Do you like kids, মিসেস পটনভী?”
“বাচ্চা কে পছন্দ করে না?”
“আমি পছন্দ করি না। কিন্তু মনে হচ্ছে আই হ্যাভ টু লাইক দেম।“
স্নিগ্ধর কথার আগামাথা বুঝতে পারলো না কাঞ্চন। বিরক্ত নিয়ে বললো,
“ফ্রিক।“
বলেই ঘরথেকে বেরিয়ে গেলো সে। স্নিগ্ধর ঠোঁটের কোনায় হাসি উঁকি দিলো।

অঞ্জনাদের ঘুমে গান বাজছে মৃদু বলিউমে,
“নাচ না জানলে উঠোন বাঁকা
যে বলে বলুক রে
তাল বেতালে হেলে দুলে
কোমরটা দুলুক রে
লে চান্স লে
লে চান্স লে
লে চান্স চান্স চান্স
লে পাগলু ডান্স ডান্স ডান্স”
আর উড়াধুরা নাচছে পটনভীরা। প্রীতি আপুর বিয়ে হয়েছে। প্রীতি আপুর মুখোশ উন্মোচন হয়েছে। সুতরাং একটু সেলিব্রেশন তো জরুরি। রাত তখন
বারোটা। সবাই ঘুম। কাঞ্চন উছিলা দিয়ে এখানে এসেছে। স্নিগ্ধ এখন ঘুমে। আজ ধকল গিয়েছে তার। অপারেশনের পর শরীর রেস্ট চায়। তাই সে খুব গাইগুই করে নি। এর মধ্যে রিদম বলল,

“এই হালিম খাবি?”
তাশদীদ অবাক স্বরে বললো,
“এখন বারোটা বাজে।“
“ঢাকা ঘুমায় না ব্রো।“
ইকরাম এবং তাকবীর এক পায়ে রাজী। পৃথুলা বাঁধ সাধলো,
“তোরা ছেলেরা একা একা বের হবি?”
“তো কি দোকা দোকা বের হবো?”
“আমরা কি দোষ করছি?”
তাশদীদ সাথে সাথেই বলে উঠলো,
“শোনো আম্মা, এই রাতে তোমাদের তিন মহতরমাকে দিয়ে বের হলে দাদাজান আমাকে সারিতে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করবে। উনার দু নলা বন্দুকের কথা ভুলে গেছো?”
“ভাই প্লিজ আজকে খেলাও আর্জেন্টিনার। আমাদের নিয়ে চল। এক সাথে খেলা দেখবো।“
অঞ্জনাও বলে উঠলো। রিদমের হাত চেপে ধরলো সে। অনুনয় করে বললো,

“ব্রাজিলকে হেরো সেভেনাপ বলবো না। প্রমিস। প্লিজ নিয়ে চল।“
রিদম তাকালো তাশদীদের দিকে। তাশদীদ একটু চিন্তা করে বললো,
“রেডি হো, আমরা গাড়ির চাবি চুরি করে আনতেছি।“
কাঞ্চনের সব জামাকাপড় ভেজা। জিন্স এই বর্ষায় শুকাচ্ছে না। সে তাই পা টিপে টিপে স্নিগ্ধর ঘরে গেলো। স্নিগ্ধ তখন চোখ বুজে শুয়ে আছে। আস্তে করে স্নিগ্ধের একটা অফওয়াইট শার্ট বের করলো সে। বেরিয়ে যাবার সময় ভারী স্বর কানে এলো,
“আমার পরা শার্টটা চেয়ারে আছে। সারা সন্ধ্যা পরেছিলাম। ওইটা পরতে পারিস।“
চোখ বন্ধ করেই কথাটা বললো স্নিগ্ধ। কাঞ্চনের গলা শুকিয়ে গেলো। আমতা আমতা করে বললো,
“আমার গেঞ্জিতে কোক পড়ে গেছে। তাই উধার নিচ্ছি। তুমি ঘুমাও।“
বলেই ছুট দিলো। স্নিগ্ধ জানতে পারলে আর নাইটআউট হবে না। ছেলেরা বড়চাচার ঘর থেকে চাবি চুরি করে আনলো। মেয়েরা একেবারে রেডি। পৃথুলা কালো একটা কুর্তি পড়েছে। ওড়ণাটা মাফলারের মতো গলায় ঝুলিয়েছে। চোখে সানগ্লাস। ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক। কাঞ্চন স্নিগ্ধের শার্টটা কোনোভাবে পরেছে। চুল ঝুটি করেছে। তার চোখেও চশমা। অঞ্জনা একটা স্কার্ট পরেছে শুধু। সানগ্লাস সে পরে নি। তাশদীদ তিনজনের এমন সাজ দেখে বললো,

“মহতারমারা, আমরা ফ্যাশান শো তে যাচ্ছি না। কুত্তাও তোদের দেখবে না।“
কাঞ্চন তাকে থামিয়ে বললো,
“এটাকে অরা বলে। তুই বুঝবি না, মূর্খ।“
পৃথুলা তার সানগ্লাসটা খুলে কাঞ্চনের হাতে দিলো। সে জুতা পরবে, সানগ্লাসের জন্য দেখতে পারছে না। বললো,
“Hold my jennie glasses”
“Yes, My queen.”
রিদম মুখ বাঁকালো। অঞ্জনাকে শুধালো,
“তোর অরা নাই? সানগ্লাস তুইও পরতি। গান্ধির তিন কানা বান্দর সাজতি।“
“আমি চশমা খুললে দেখতে পারি না। তাই পরি নি।“
তাশদীদ পাশ থেকে বললো,
“ওর অরা উড়ে যায়। ব্যাপার না বিল্লি, আমার হাতে ওড়না বেঁধে দে, আমি হব তোর দৃষ্টি।“
“শাট আপ।“

সাতজন পটনভী মঞ্জিলের ঘুমের সুযোগ নিয়ে আসলেই বেরিয়ে পড়লো। উদ্দেশ্য খেলা দেখবে, হালিম খাবে, বুড়িগঙ্গার ঘাটেও ঘুড়ে আসবে। দাদাজানের জাগার আগে ফিরে আসবে সেটাই উদ্দেশ্য। কিন্তু উদ্দেশ্য সফল হলো না। খেলা তো দেখাই হলো না। উল্টো কাজিনমহলের স্থান হলো রমনা থানার জেলে। জেলের শিকের ফাঁক থেকে কাঞ্চন মুখ বাড়িয়ে পানে ঠোঁট লাল করা ওসির উদ্দেশ্যে বললো,

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২২

“স্যার, বিশ্বাস করেন আমরা ভালো ঘরের ছেলেমেয়ে। আমার তো পার্ফেক্ট হাজবেন্ডও আছে, সে র‍্যাবের অফিসার। একটা ফোন করতে দিন প্লিজ। আমার হাসবেন্ডটা আমাকে না পেয়ে মনে হয় এখন কাঁদছে।“

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here