Home উপসংহারে তুমি সিজন ২ উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৫

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৫

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৫
রুহানিয়া ইমরোজ

পরদিন ভোরবেলা। নরম কুয়াশার চাদরে ঢেকে আছে আকাশটা। চারপাশ তখনও আঁধারে নিমজ্জিত। পেঁজা তুলোর মতো মেঘরাশির মেলা বসেছে নভমন্ডলে। মৃদু হাওয়ায় দুলছে জানালার পর্দা। আবহাওয়া খুব একটা ভালো না। ভারি বর্ষণ হওয়ার সম্ভাবনা প্রকট৷
আবহাওয়া শীতল থাকা সত্ত্বেও ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে গেছে চিত্রা। সবে জ্বরটা ছেড়েছে বিধায় কিঞ্চিৎ দুর্বল অনুভব করছে। গলা শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গেছে। কী হয়েছিল মনে করতে ঘোলাটে দৃষ্টি মেলে সিলিংয়ের দিকে তাকায় সে। আচমকা তার মানসপটে ভেসে উঠে কিছু চিত্র।
গতকাল ক্লান্ত শরীরে কলেজ থেকে ফিরে কোনোমতে শাওয়ার নিয়ে ভেজা চুলেই গা এলিয়ে দিয়েছিল চিত্রা৷ হাতের তীব্র যন্ত্রণা আর ভেজা চুলে ঘুমানোর ফলেই ভয়ানক জ্বরটা কাবু করে ফেলে তাকে। এরপর আর কিছু মনে নেই চিত্রার।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরলয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে। লম্বা একটা হামি তুলে লম্বাটে চিকন হাতখানা চোখের সামনে ধরে। ক্ষতটা এখনও শুকায়নি। কোনো ঔষধ না দেওয়ায় ভয়ংকর ভাবে ফুলে উঠেছে জায়গাটা৷ চিত্রা আলতো ভাবে মুঠো পাকানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। খুব যন্ত্রণা দিচ্ছে জায়গাটা। তাই অহেতুক বৃথা চেষ্টা করতে গেল না। ওভাবেই ছেড়ে দিল ক্ষতটাকে।
ভীষণ ক্ষুধা লেগেছে চিত্রার। এমুহূর্তে উঠে, ফ্রেশ হয়ে কিছু না খেলে যে কোনো সময় জ্ঞান হারিয়ে বসবে ও। তখন আর কলেজে যাওয়া হবে না৷ কলেজ মিস দিলে পড়া বুঝবে না। তার পক্ষে আলাদা করে কোচিং কিংবা প্রাইভেটে পড়াও সম্ভব নয় তাই সমস্ত ভবনা ঝেড়ে ফেলে ফ্রেশ হতে গেল।

ভোর পাঁচটা পয়তাল্লিশ মিনিট। অন্যান্য দিনের মতোই ল্যাপটপে মুখ গুঁজে বসে আছে ভূমিকা। ফ্রিল্যান্সার হওয়ায় প্রায়ই রাত জাগতে হয় তাকে। অনেকদিন তো রাত পেরিয়ে দিনের সূচনা ঘটে যায়। কম্পিউটার স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকা ভূমিকা টের পায় না সেসব। সত্যি বলতে ও টের পেতে চায় না। জীবনের ভয়ংকর অতীত থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায় কেবল।
এই সুন্দরতম পৃথিবী বিষাক্ত লাগে ওর কাছে। মৃত্যুকে আপন করতে মন চায় কিন্তু একজনের গা ছুঁয়ে দেওয়া ওয়াদা বারংবার আঁটকে দেয় তাকে। ভীষণ রাগ লাগে ভূমিকার, খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করে মানুষটাকে। যে অলরেডি মৃত তাকে আর কীভাবে মারবে সে?
মানুষটা মৃত, এই উপলব্ধি পুনরায় রক্তক্ষরণ ঘটায় তার বুকের অন্তস্তলে। মানুষটার হাসিমাখা মুখশ্রী, তার কন্ঠ স্বর আজও কানে বাজে ভূমিকার। বাস্তব লাগে সেসব অথচ চোখ মেললেই সব হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। ঘুমের অভাবে লালচে হয়ে যাওয়া চোখজোড়া বুঁজে চেয়ারে হেলান দেয় ভূমিকা। কম্পিউটার স্ক্রিনে ভেসে ওঠা সব গুরুত্বপূর্ণ মেইল, মেসেজ আর নোটিফিকেশন ওভাবেই পড়ে থাকে। আজ মানুষটা মত্ত অন্য কারও খেয়ালে৷
আচমকা পানির ঝাপটা চোখমুখে পড়ায় চোখ মেলে তাকায় ভূমিকা। এতক্ষণ বহুকষ্টে আঁটকে রাখা চোখের পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে৷ বৃষ্টির বেগের সাথে তার কান্নার শব্দ বাড়ে। মেঘলা আকাশের পানে চেয়ে দাঁতে দাঁত চেপে শুধায়,

-“ সুখের কথা বলে শোকের কাফনে কেনো জড়ালে আমায়? ভালোই তো ছিলাম একলা জীবনে, কাঁধের বোঝা কমাবে বলে বুকের ক্ষত বাড়ালে কেনো? চুপ থেকো না, উত্তর দাও বর্ষণ। আই নিড এন্সার… স্পিক আপ, ড্যাম ইট।
বলেই ফোঁপাতে লাগে। তার চোখমুখে জ্বলজ্বল করছে ক্রোধ আর কাতরতা। অজানা অভিমানে কন্ঠনালি রুদ্ধ সবসময় গর্জন তর্জন করা মানুষটা কথা বলতে পারছে না। শিশুদের ন্যায় অবুঝ চোখে চেয়ে আছে স্রেফ৷ তার কষ্ট বাড়াতে, বেলকনিতে আচানক কারও অবয়ব উঁকি দেয়। ভূমিকা চোখ বুঁজে অসহায়ের ন্যায় কেঁদে উঠে, দু পাশে মাথা নাড়িয়ে বলে,
-“ তুমি কেবলই মিছে অবয়ব, আমার মানুষটা মিশে গেছে মাটিতে। তার দেহাংশ বিলীন হয়ে গেছে, আমার বলতে শুধু স্মৃতিটুকুই আছে।
এতটুকু বলে চোখ মেলে তাকায় ভূমিকা। অবয়বটা নেই। হারিয়ে গেছে অজানায়। ভূমিকা এবার ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কেঁদে উঠে। শ্বাস টেনে ফিসফিসয়ে বলে,

-“ আর কক্ষণো ফিরবে না সে৷ জড়িয়ে নিবে না আমায় বুকে। বর্ষণের বউ রানী বলে ক্ষেপাবে না। রাগ করলে পিঠে চড়িয়ে শহর ঘুরাবে না, অভিমান ভাঙাতে পায়ে পড়ে চোখের পানি ফেলবে না, ব্যথা পেলে অস্থির হবে না, অসুস্থ হলে কোলে তুলে হেঁটে বেড়াবে না, আমার পছন্দ নয় বলে নিজের শখ কুরবানি দিবে না। তার মত করে কেউ ভালোবাসবে না..
বিড়বিড়িয়ে আরও নানান কথা বলে ভূমিকা। যতক্ষণ বৃষ্টি ঝরে, ততক্ষণ আকাশপানে চেয়ে উন্মুখ হয়ে বসে রয় সে। অভিমানী চোখে চেয়ে শ’খানেক অভিযোগের বুলি আওড়ায়। বর্ষা নামলেই বর্ষণের স্মৃতিতে দিগ্বিদিক ভুলে বসে ভূমিকা। নিজের খোলস থেকে বেরিয়ে এসে নানান ধরনের পাগলামি করে।তার ভেতরকার হাহাকার রাগ, অভিমান কিংবা অভিযোগ রুপে বেরিয়ে আসে।
তার বেঁচে থাকার জন্য এটা খুবই জরুরি। রক্ত পাম্প করার যন্ত্র, কথার ভার সইবার সক্ষমতা রাখে না। তার তো কেউ নেই দুঃখ শেয়ার করার মতো। এককালে যে ছিল সে-ও ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছে। পুরোপুরি বিপরীত চরিত্রের হওয়া সত্ত্বেও নিয়তির লিখনে একে অপরের হয়েছিল তারা। বিয়ে নামক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল। সে সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। এক মরণঘাতী অসুখ ধ্বংস করে দেয় সবকিছু।এতিম ভূমিকা নিজের একমাত্র প্রাণ প্রিয় স্বামী কে হারায়।এরপর আর সুখ ধরা দেয়নি তার জীবনে।
একের পর এক ঝড় সামলে ভূমিকা নির্জীব হয়ে গেছে। কেনোকিছুর প্রতি আগ্রহ কাজ করে না তার। দুনিয়াটা কে মিছে মায়া মনে হয়। যেখানে বাস করে কিছু চরম স্বার্থপর মানুষ। এদেরকে জাস্ট ঘেন্না লাগে ভূমিকার৷ এজন্যই তো নিজেকে খোলসে আবৃত করে নিয়েছে৷

ঘড়ির কাঁটায় তখন সাড়ে ছয়টা বাজে। রান্নাঘরে ব্যস্ত হাতে কাজ করছে চিত্রা। নিজের পাশাপাশি ভুমিকার জন্য নাস্তা বানাচ্ছে। গতকল বিকালে দারোয়ানের হাত দিয়ে কিছু বাজার পাঠিয়েছিলেন নিতু মেহবুব৷ চিত্রা সবটা দেখে নিয়ে ব্রেকফাস্টের জন্য ডাল আর পরোটা বানায়। দুপুরে আর আলাদা করে কিছু করবে না। আলু ভর্তা আর ডাল দিয়ে খেয়ে নিবে বলে ঠিক করে৷
তাছাড়া উপায় নেই। ফোলা হাতে জোর দিতে পারছে না। বেশি নাড়াচাড়া করতে গেলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। এমুহূর্তে অসুস্থ হলে টিউশনি এবং পড়াশোনা দুটোই লাটে উঠবে। যা একদমই চায় না সে৷ আনমনে এসবই ভাবছিল চিত্র তন্মধ্যে রান্নাঘরে প্রবেশ করে ভূমিকা।
চিত্রা এক পলক তাকায়। ভূমিকার তেজ দীপ্ত মুখটা মলিন দেখাচ্ছে। চোখগুলো কিঞ্চিৎ ফোলা৷ চিত্রার মন আকুপাকু করে উঠল কারণ জিজ্ঞেস করার জন্য কিন্তু সাহস করে উঠতে পারল না। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে মিনমিনে স্বরে বলল,

-“ আপু? আপনার জন্য সিদ্ধ আটার রুটি বানিয়েছি।
ব্যস, আর কিছু বলতে পারল না। এতটুকু বলে ফাঁকা ঢোক গিলল। ভূমিকা ব্রেড হাতে নিয়ে টোস্টারের দিকে আগাচ্ছিল৷ চিত্রার কথায় থেমে গিয়ে তার চোখে চোখ রেখে শীতল গলায় শুধাল,
-“ কোন স্বার্থে এত দরদ দেখাচ্ছ? আম নট গননা সেভ ইয়্যু ওয়ান মোর টাইম। সো, এসব সিলি কাজকর্ম করে নিজের খরচা বাড়াইও না। পরে আফোস হবে।
নিমেষেই চিত্রার কৌতূহল দম ফাটানো হাসিতে রুপ নেয়। না চাইতেও ফিক করে হেসে ফেলে। কোনো মতে হাসি আঁটকে গ্যাস অফ করে। চা বানানো শেষ। খুব চমৎকার সুগন্ধ ভেসে আসছে। চায়ের পাতিল নামিয়ে ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে দু’টো কাপে ঢেলে নেয়৷ একটা কাপ ভূমিকার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
-“ সুগার ছাড়া কড়া লিকার দিয়ে বানিয়েছি। কান্নায় ভেঙে যাওয়া গলার জোর ফেরাতে কার্যকারী ভূমিকা পালন করে।
চিত্রার হাসির কারণ উদঘাটন করার জন্য ভ্রু কুঁচকে চেয়ে ছিল ভূমিকা। আচমকা শেষোক্ত বাক্যটা শুনে চোখমুখ শক্ত হয়ে যায় তার। দাঁতে দাঁত পিষে গম্ভীর গলায় শুধায়,

-“ মশকারি করছ? জানের ভয় নেই? সেদিন দেখোনি কীভাবে মারলাম ওদের?
হুট করে কোত্থেকে যেনো সাহস পেয়েছে চিত্রা। হাতের কাপটা আরেকটুখানি ভূমিকার দিকে ঠেলে ধরে বলে,
-“ অসহায় মানুষদের দুঃসাহস থাকে না। অবশ্যই ভয় পাই আপনাকে কিন্তু স্বার্থের জন্য কিছু করি না। না তো আপনার থেকে সাহায্য পাওয়ার লোভে তেল দিচ্ছি। দু দিনে একটু হলেও চিনেছি আপনাকে৷ বুঝেছি আপনার মন মানসিকতা। যাক গে সেসব কথা, নিশ্চিন্তে থাকুন, স্বার্থ পূরণ তো দূরে থাক মৃত্যুর পূর্বে এক ফোঁটা পানিও চাইব না বিনিময় হিসেবে৷
এই প্রথম কারও কথায় থতমত খেল ভূমিকা। কিছু একটা ভেবে বাড়ন্ত কাপটা হাতে নিয়ে কৌতূহলী গলায় শুধাল,

-“ তাহলে এসব কেন করছ? আমি কেমন জানার পরও এত আতিথিয়েতার মানে কি?
চিত্রা সাবলীল গলায় জবাব দেয়,
-“ এসব করছি শুধুমাত্র নিজের মনের খোরাক মেটাতে৷ একাকীত্ব ভয়ংকর। মৃত্যু ভয়কেও ছাপিয়ে যায়। আমি এই অসহায়ত্ব নিয়ে মরতে চাই না। এই যে নাস্তা করার বাহানায় আপনি আমার সাথে টেবিলে বসবেন কিংবা সহজ করে দু’টো কথা বলবেন.. এতটুকুই আমার স্বার্থ।
ভূমিকার বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙেচুরে যায়৷ সে ভাবুক হয়। একটা মেয়ে কতটা নিঃস্ব হলে এমন করে বলতে পারে? ঠিক কতটা অসহায় হলে শুধুমাত্র তার সঙ্গ পাওয়ার জন্য ব্যথাযুক্ত হাত নিয়ে তার জন্য নাস্তা বানায়। মনের ভেতরটা একটু নরম হলেও সেটা প্রকাশ করল না। বাহ্যিক শক্ত আচরণ বজায় রেখে বলল,
-“ এটাই লাস্ট টাইম। আর যেনো এমন কিছু করতে না দেখি। যেহেতু একটাই টেবিল তাই সকাল আর দুপুরের খাবারটা একসাথেই খাওয়া পড়বে। তার জন্য আলাদা করে, কষ্ট করে কিছু বানাতে হবে না তোমায়।
নরম সুরে বলতে চাইলেও কেমন যেনো কঠিন শোনাল কথাগুলো। ভূমিকা নিজেই বিরক্ত হলো চিত্রার মলিন মুখ দেখে। কি করবে বুঝতে না পেরে বলল,

-“ দাঁড়িয়ে আছ কেনো? যাও, টেবিলে বসো। দেরি হলে ক্লাসে ঢুকতে দিবে না স্যার৷ ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার ধান্দা করলে নিতু মেহবুব ছক্কা মেরে ছাদনা তলায় বসাবে।
চিত্রা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসল। ভূমিকার সাথে বসে চুপ চাপ নাস্তা সারল। বগা মটরের ঘন ডালের সাথে সিদ্ধ রুটি জমে ক্ষীর। রান্নাটা এত সুস্বাদু হয়েছে, ভূমিকা না চাইতেও রুটির পাশাপাশি একটা পরোটা খায়। খেতে খেতে আচমকা কিছু একটা মনে পড়ে। ন্যাপকিনে হাত মুছে সাবলীল গলায় চিত্রাকে বলে,
-“ নিতু ম্যাডাম তোমাকে দেখা করতে বলেছেন।
চিত্রার বুক ধক করে উঠে। যেটার ভয় ছিল সেটাই হল৷ নিতু মেহবুব কি রিয়েক্ট করবেন ভেবে গলা দিয়ে আর খাবার নামল না। ওর মুখাবয়ব লক্ষ্য করে ভূমিকা বলে উঠল,
-“ জীবনে যত ভয় করে চলবে তত ভীতিকর পরিস্থিতি তে পড়বে। অন্যকে সম্মান করতে গিয়ে আত্মসম্মান হারালে, কাঁদতে হবে আড়ালে। সমীহ করে চলতে যেও না। দুনিয়া তোমায় সম্মান দিবে না। জাস্ট পায়ে পিষে ফেলবে।
কড়া হলেও কথা গুলো সত্য। চিত্রা দ্বিরুক্তি করল না। মস্তিষ্কে গেঁথে নিল। নাস্তা সেরে চটপট রেডি হয়ে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামল। নিতু মেহবুবের সাথে দেখা করে কলেজে যেতে হবে।

নিতু মেহবুবের ড্রয়িংরুমে বসে আছে চিত্রা। ভদ্রমহিলা রান্না ঘরে ব্যস্ত। কঠিন স্বরে চিত্রাকে অপেক্ষা করতে বলে নাস্তা বানাতে গেছেন তিনি। চিত্রা অসহায়ের মতো বসে আছে। ফাঁকে একবার ক্লাসের কথা বলায় বেশ জোরদার ধমক খেয়েছে। ওদিকে হাতে মাত্র আধঘন্টা সময় আছে। এরপর ক্লাস শুরু হয়ে যাবে, তখন আর ক্লাসে ঢোকার সুযোগ থাকবে না।
চিত্রাকে উদ্ধার করতেই বোধহয় ভূমিকার আগমন ঘটে কালো টিশার্টের উপর ডার্ক ব্লু কালার ডেনিম জ্যাকেট জড়িয়েছে। হালকা লালচে বর্ণের চুলগুলো পিঠময় ছড়িয়ে আছে। কালো স্কিনি প্যান্টের সাথে মানানসই উঁচু জুতা পরেছে। এক কথায় লেডি মাফিয়া টাইপের কিলার লুক। ভূমিকার গায়ের রং উজ্জ্বল ফর্সা হওয়ায় ভীষণ সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে। চিত্রা পরপর তিন বার মা শা আল্লাহ বলে।
নিতু মেহবুবের বাসায় ঢুকে চিত্রাকে বসে থাকতে দেখে যা বোঝার বুঝে যায় ভূমিকা। মনে মনে তাকে বিশাল এক ঝাড়ি মেরে, ভদ্র ভাবে নিতু মেহবুবকে ডাকে৷ তার ডাক শুনে পড়িমরি করে ছুটে আসেন তিনি। মুখে টান টান হাসি ঝুলিয়ে আদরমাখা গলায় বলেন,

-“ তুমি এসেছ, কেমন আছ মা?
ভূমিকা ভাবলেশহীন গলায় জবাব দেয়,
-“ আলহামদুলিল্লাহ ম্যাম। আপনি?
নিতু মেহবুব সহজ গলায় জবাব দিলেন,
-“ এইতো আছি। কাজ আর ব্যক্তিগত টানাপোড়নে অতিষ্ঠ জীবন। তোমার খবর বলো, কোনো দরকারে এসেছিলে?
ভূমিকা একটা টাকার বান্ডিল ধরিয়ে দিয়ে বলে,
-“ আগামী এক বছরের ভাড়া। কখন সময় হবে না হবে তাই মাস প্রতি সাত হাজার আর হাবিজাবি বিল দিয়ে টোটাল নব্বই হাজার টাকা আছে। আর একটা কথা বলার ছিল।
টাকাটা পেয়ে নিতু মেহবুব শুধান,
-“ কি কথা.. বলো?
ভূমিকা আড় চোখে চিত্রার দিকে চেয়ে তাকে মিছে ধমক দিয়ে বলে,
-“ কোন বিবেকে বসে আছ? ক্লাসের সময় যে পেরিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে খেয়াল আছে? ফাঁকিবাজ কোথাকার..
চিত্রা বুঝে যায় ভূমিকার ইশারা। ও এক পলক নিতু মেহবুবের দিকে চেয়ে এক দৌড়ে গেট পেরিয়ে যায়। তার এহেনও দুঃসাহস দেকে রুষ্ট হোন নিতু মেহবুব। ভূমিকার আলগা কনসার্ন পছন্দ হয় না উনার। তাকে ভাবনায় ডুবে যেতে দেখে ভূমিকা বলে,

-“ আমার নয়েজ পছন্দ নয়। নিরিবিলি বলেই সুন্দর বাসা ছেড়ে এই পুরাতন বিল্ডিংয়ে বাসা নিয়েছি। ওই মেয়ের থেকে শুনলাম, বাসায় নাকি বাচ্চারা পড়তে আসবে। এটা আমি এলাউ করতে পারব না।
নিতু মেহবুব দ্বিধায় পড়ে যান। কোনোভাবেই ভূমিকার বিরুদ্ধে যাওয়া যাবে না। এমনটা হলে চিত্রার খাওয়ার খরচটুকুও উনাকেই বহন করতে হবে। দোটানায় পড়ে গেলেন তিনি। ঝোপ বুঝে কোপ মারল ভূমিকা। গলা ঝেড়ে বলল,
-“ আমি ক’দিন যাবত পিএ খুজঁছিলাম। ঘরের কাজের পাশাপাশি রান্নাবান্না করতে পারবে এমন কেউ। মেয়েটা দেখলাম সবই পারে। আপনি চাইলে ওকে আমার পিএ হিসেবে রাখতে পারি৷ বেতন হাজার বিশেক দিব। হবে না?
নিতু মেহবুব চকিতে তাকান। ভূমিকা এ কথা বলছে তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে উনার। মানুষকে অবিশ্বাস করা ভূমিকা তার কাছে পিএ পোস্টের জন্য মেয়ে চাইছে, ব্যপারটা হজম করতে পারছেন না তিনি। বিস্মিত ভাব লুকিয়ে মিছে হাসি টেনে তিনি বলেন,

-“ উত্তম প্রস্তাব। ওর সাথে কথা বলে তোমাকে জানাব।
ভূমিকা আর কথা না বাড়িয়ে চলে যায়৷ নিতু মেহবুব দ্বিধান্বিত হয়ে চেয়ারে বসে পড়েন। কি করবেন ভেবে পান না৷ চিত্রার পেছনে হিউজ টাকা খরচ হচ্ছে। এই বদরাগী মেয়েটার অফার একসেপ্ট করলে খরচাটা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে কিন্তু এতে করে চিত্রার উপর প্রভাব খাটাতে পারবেন না তিনি। তাকে শাসন করার এক্তিয়ার থাকবে না। মেয়েটাকে কন্ট্রোল করা যাবে না৷
চিত্রা তো তার মহড়া। ওকে গ্রাম থেকে তুলে এনেছেন নিজের স্বার্থের জন্য। স্বার্থের হিসেব মেলাতে তিনি ডুবে গেলেন অতীতের স্মৃতিচারণে৷

চিত্রার মা তথা চৈতী বেগম ছিলেন বিশ্ব সুন্দরী। তার পেছনে অসংখ্য মানুষ পাগল ছিল কিন্তু সাহসী এবং চরিত্রবান হওয়ায় কখনোই কাউকে পাত্তা দেননি। তিনি ছিলেন চেয়ারম্যানের সাহেবের মেয়ে। এলাকায় তার দাপটই ছিল অন্যরকম। নিতু মেহবুব দরিদ্র পরিবারের অতি সাধারণ ঘরনার মেয়ে ছিলেন।
একসাথে স্কুল যাওয়ার সুবাদে দুজনের মধ্যে খুব চমৎকার সম্পর্ক গড়ে উঠে। একে অপরকে অন্ধের মত ভীষণ বিশ্বাস করতেন তারা। একজন ব্যথা পেলে অন্য জনের চোখে জল জমতো। ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। অনেকেই জ্বলতো তাদের দেখে। শিক্ষকেরা উদাহরণ হিসেবে পেশ করতেন তাদের সম্পর্কটাকে।
সবকিছুই ঠিকঠাক যাচ্ছিল। এসএসসি দিয়ে কলেজে পড়ার জন্য ঢাকার এক আত্মীয়র বাসায় উঠে তারা। যদিও নিতু মেহবুবের পরিবার তাকে আর পড়তে দিতে চায়নি কিন্তু চৈতী বেগমের অনুরোধ এবং তৎপরতার জন্য বাধ্য হয়ে তারা সায় দিয়েছিলেন। চেয়ারম্যানের একমাত্র কন্যাকে রুষ্ট করার সাহস ছিল না কারো।
নিতু মেহবুবের সমস্ত খরচ বহন করতেন চৈতী বেগম।

এটা নিয়ে কখনো বড়াই করেননি উল্টো নিজের সব টুকু দিয়ে উনাকে ভালো রাখার চেষ্টা করতেন। চিত্রার মতো উদার স্বভাবের ছিলেন তিনি। তার এহেনও মন মানসিকতা দেখে তৎকালীন মেয়রের ছেলে আফিফ মাহতাব তার প্রেমে পড়ে যান। মিছেমিছি প্রেম নয়, জটিল অঙ্কের কঠিন প্রেম।
চৈতী বেগম পাত্তা দেননি। এসব কে ভুয়া বলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতেন। আফিফ সাহেব যেনো বেলাগাম ঘোড়া। দিকবিদিকশুন্য হয়ে কেবলমাত্র চৈতী বেগমের পিছু ছুটতেন। নিতু মেহবুবের কাছে বড্ড রোমাঞ্চকর লাগতো বিষয়টা। মায়াও হতো আফিফ সাহেবের জন্য। চৈতী বেগম ছিলেন অটল। তিনি কোনোমতেই গলতে চাননি। ভবিষ্যতে বিশাল কিছু হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার।
স্বপ্নটা স্বপ্নই রয়ে যায়। মনের অজান্তেই আফিফ সাহেব এর প্রেমে পড়ে যান তিনি। প্রেয়সীর সাড়া পেয়ে মেয়র পুত্র,আফিফ সাহেব তখন উন্মাদ পুরুষ। এখনকার মত নোংরামি বলতে কিছু ছিল না তখন। হাত ধরা দূরের বিষয়, চোখাচোখি হলেই লজ্জায় নুইয়ে পড়ত দু’জন। পত্রের প্রেম ছিল তাদের। এক বছরের সম্পর্কে তিনশ চৌষট্টি খানা চিঠি আদান প্রদান হয়েছিল ডাকযোগে।

পঁয়ষট্টি তমটা লেখা হলেও কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায় যায়নি। তার পূর্বেই ঘটে গেছিল অঘটন। চেয়ারম্যান সাহেবের কান অব্দি পৌঁছে গেছিল মেয়ের প্রেমের খবর। সেটা আর কেউ নয় বরং নিতু মেহবুবই জানিয়েছিলেন।
ঘৃণ্য কাজটা করার কারণ ছিল, তিনি ভীষণ রকমের ভালোবেসে ফেলেছিলেন আফিফ মাহতাব নামক মাথা পাগল মানুষটাকে। যে কোনো মূল্যে তাকে নিজের করে পেতে চাওয়ার দরুন বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন প্রাণ প্রিয় বান্ধবীর সাথে। একটাবারও ভাবেননি পরিণতি সম্পর্কে।
এরপরের ঘটনা ছিল হৃদয়বিদারক। চেয়ারম্যান সাহেব উনার একমাত্র মেয়েকে জোরজবরদস্তি করে তুলে দেন এক জালিম পুরুষের হাতে। চৈতী বেগমের চরম অমতে সম্পন্ন হয় বিবাহের কার্যক্রম। প্রেমিকার বিয়ের খবর কানে পৌঁছাতেই ঢাকা ছেড়ে রংপুরে এসে হাজির হন আফিফ সাহেব। তার হৃদয় কাঁপানো কান্নার স্বর আর আহাজারি আজও কানে বাজে নিতু মেহবুবের। মাথা পাগল লোকটা যতক্ষণে উন্মাদের মতো দৌড়ে আসে ততক্ষণে সবকিছু শেষ হয়ে গিয়েছিল। নিতু মেহবুব কবুল করে নিয়েছিলেন অন্য কাউকে।

একমাত্র মেয়ের বিয়েতে ঝামেলা করার জন্য গ্রামের ছেলেপুলে দিয়ে আফিফ সাহেব কে গাছের সাথে বেঁধে বেধড়ক মারধর করেন চেয়ারম্যান সাহেব৷সেই নির্মমতা থামানোর জন্য আকুতি পর্যন্ত করেছিলেন চৈতী বেগম কিন্তু তিনি থামেননি। মেয়রের ছেলে বলে প্রাণে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন কেবল৷
চৈতী বেগম সইতে পারেননি পিতার নিষ্ঠুরতা। এজন্যই বিদায়ের পর জীবিতকালে আর কোনোদিন চেয়ারম্যান বাড়িতে পা রাখেননি। না তো বলেছিলেন কোনো কথা৷ স্বামীর সংসারে খুব একটা সুখে ছিলেন না তিনি। প্রতি দিন কিছু না কিছু নিয়ে মারধর করা হতো তাকে। তার পিতার চোখে সুযোগ্য পাত্র আসলে একজন অযোগ্য স্বামী ছিলেন। নিতু মেহবুব শুনেছেন, মৃত চৈতী বেগম কে শেষ গোসল দেওয়াতে আসা মহিলারা তার গায়ের ক্ষত দেখে আঁতকে উঠেছিলেন৷ সারা বাড়ি জেনেছিল, মৃত মানুষটাকে ঠিক কতটা নৃশংসভাবে একটু একটু করে মারা হয়েছে।
প্রিয়তমার মৃত্যু আফিফকে ভেঙে চুরে গুঁড়িয়ে দেয়। সে ভেবেছিল, কোনো একদিন কিংবা শেষ বয়সে মানুষটা কে নিজের করে পাবে। এই আশায় অপেক্ষা করছিল। তাকে আরও একবার ঠকিয়ে মানুষটা চিরকালের জন্য হারিয়ে যায়। আফিফ তাকে শেষবার দেখতে পায়নি,সে সুযোগ তার হয়নি কিন্তু কবর পরিদর্শনে করেছে এবং এখনও তা বহাল আছে। আফিফ চিত্রলেখাকে একবার দেখতে চেয়েছিল কিন্তু আশিকুর শিকদার তা মঞ্জুর করেননি।

এতকিছুর ভিড়ে নিতু মেহবুবও সেই মানুষটাকে নিজের করে পাননি। বহু চেষ্টা করেছেন, পাগলামি করেছেন কিন্তু আফিফ সাহেব বারংবার একটা কথা বলে তাকে ফিরে দিয়েছেন, “আমার পাশে অন্য নারীর ছায়ামূর্তি তার পছন্দ নয় সেখানে বেগানা নারীকে জীবনসঙ্গী কীভাবে বানাই? ”
কিছু মানুষ অসম্ভব রকমের ভালোবাসার ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। আফিফ সাহেব তন্মধ্যে অন্যতম। একজনকে ভালোবেসে নিজের সমস্তটাই উৎসর্গ করে দিয়েছেন তিনি। আজও বুকপকেটে সেই চিঠিখানা থাকে উনার৷ চৈতী বেগমের কবরে গিয়ে প্রত্যেকবার সেই চিঠি পড়ে শুনিয়ে জবাবের আশায় সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। তার পাগলামির অন্ত নাই। এতকিছুর পরেও ওই মাথা পাগল মানুষটাকে নিজের করে পাওয়ার লোভ ছাড়তে পারেননি নিতু মেহবুব। তাইতো চিত্রলেখাকে নিজের সাথে করে এনেছেন।

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৪

ওকে দত্তক নেওয়ার বাহানায় যদি মানুষটার জীবনের সাথে জড়িয়ে যাওয়া যায় তবে তো ক্ষতি নাই। মূলত এজন্যই চিত্রা নামক উটকো ঝামেলাকে স্বেচ্ছায় নিজ গৃহে ঠাঁই দিয়েছেন। অথচ তিনি ঘুণাক্ষরেও টের পাননি, এই কুচিন্তা ঠিক কতবড় সর্বনাশ ঘটাতে চলছে।

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here