Home বজ্রমেঘ বজ্রমেঘ পর্ব ৪১ (২)

বজ্রমেঘ পর্ব ৪১ (২)

বজ্রমেঘ পর্ব ৪১ (২)
ফাবিয়াহ্ মমো

ক্রমশ ফুলে উঠছিল পেশিবহুল কাঁধ। পিঠের কম্পন বুঝিয়ে দিচ্ছিল দুর্বিনীত রাগ। শাওলিন দুহাতে জড়িয়ে রেখেছে শোয়েবকে। মেরুন শার্টের কাপড়টুকু আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে মুচড়ে নিয়ে বলল,
– শান্ত হোন। যেতে দিন। যা ইচ্ছে বলুক আপনার কান দিতে হবে না। কেউ যখন চাইছে আপনি রেগে গিয়ে ভয়ংকর কিছু করুন, তখন উচিত চুপ হয়ে যাওয়া।
শোয়েব শাওলিনের ডান কাঁধের খোপে নিজের মুখ লুকিয়ে বলল,
– ওকে চুপ করতে বলো। আমি দরজা ভেঙে মৃত্যু ডাকতে চাই না।
শাওলিন গাল ও কানে তপ্ত শ্বাস টের পাচ্ছে। শার্টের ওপর মুঠো আলগা করে তার চুলে আঙুল রাখল। শান্ত-ধীর গলায় বলল,

– এগুলো আপনার মুখের ভাষা না। আপনি বুঝতে পারছেন না উনি আপনার কোন দিকটা প্রকাশ করতে চাচ্ছে। আপনি না চাইতেও নিজের ব্যক্তিসত্তা ভুলে যাচ্ছেন।
শোয়েব হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে ভেতরে ভেতরে কিছু একটা নিয়ন্ত্রণ করল। শাওলিন হয়ত ভাবছে শোয়েব ক্রোধে এমনটা করছে। এই বাক্য, এই ব্যবহার শুধুই বিশ্রী ক্রোধের নামমাত্র বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু গভীর থেকে শোয়েব জানে, এটাই তার সর্বসত্তা। সে এটাকে শান্ত-ভদ্র-সম্ভ্রম চেহারায় মুখোশ বানিয়ে রেখেছিল। পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিকের দিকে এলে এমন সময় রেবেকা বিষবাণ ছুঁড়ল,
– শাওলিন, আজ ঘরের ভেতর যাকে সামলাচ্ছ, তাকে তুমি মহৎ মানুষ ভাবছ। আমি যে ভুলটা করেছি সেটা কেন করেছি একদিন বুঝবে। শীঘ্রই জানতে পারবে ওই মানুষরূপী জানোয়ারটা কত বড়ো ধুরন্ধর। ও তোমাকে শুধুই স্বার্থের কারণে ব্যবহার করছে।
শাওলিন চোখ খুলে ফেলেছে। উনি কী নির্বোধ? কী শুরু করেছে? কীসের ক্ষোভ ঝাড়ছে? শাওলিন বুঝতে পারল বাঁধা দেয়ার শেষ সীমাটা ভেঙে পড়ল। শোয়েব হাত ঢিল করে শাওলিনকে ছেড়ে দিয়েছে। শাওলিন অস্থির সুরে বলল,

– খবরদার, বাইরে কান দিবেন না! আমার কথা শুনুন। তাকান। তাকান বলছি।
শোয়েব নিজের দুগাল থেকে শাওলিনের নরম হাতদুটি সরিয়ে দিল। শাওলিন দরজা থেকে একচুল সরলো না। ঠিক তখনই বাইরে থেকে রেবেকা গলা ভেসে এল,
– শোয়েব, তোমাকে চিনতে আমার ভুল হয়নি। তুমি এক মিথ্যাবাদী, পিশাচ। তোমার বাবা-মা বেঁচে থাকলে তোমাকে ছেলে বলতেও ঘেন্না করতেন। তুমি ওই এতিম মেয়েটাকে নিজের অসাধু ইচ্ছায় ব্যবহার করলে। তুমি কেন ঢাকায় থাকোনি সেটা প্রথম প্রথম না বুঝলেও এখন ঠিক বুঝে গেছি। আর জেনে রেখো, আমাকে খারাপ বানাতে চাইছ না? শাওলিন তোমাকে ভালো থাকতে দিবে না।
রেবেকা ধাম করে দরজা খুলল। শোয়েব খেপে ওঠা শ্বাপদের মতো ফোঁস ফোঁস করছে। হাতের মুঠো, কপালের রগ, চোখের চাহনি যেন হিম মৃত্যুর আগমন বোঝাচ্ছে। শাওলিন এতোটা আতঙ্কগ্রস্ত কখনো হয়নি। শোয়েবকে পাশবিক গলায় বলতে শুনল,

– রেবা, যদি মানুষের বাচ্চা হয়ে থাকো, পালাবে না!
শাওলিন দুহাতে দরজা আগলে দাঁড়িয়ে রইল। কথাগুলো শুনে শুধু ঢোক গিলল সে। মনে মনে যে ভয়ংকর আশঙ্কাটা করছে, সেদিকে দৃকপাত করে বলল,
– কান দিবেন না। আবারও বলছি আপনি শুধু এদিকে মনোযোগ দিন।
আর কোনো ভাষা অবশিষ্ট নেই। কথায় মানুষটাকে থামানো যাচ্ছে না। শেষ ভরসা হয়ে উঠল স্পর্শ।শাওলিন অভাবনীয় একটা ব্যাপার ঘটাল। শোয়েবের মাথাটা খামচে মিষ্টি ঠোঁটদুটো তার ঠোঁটের কাছে তুলে দিল। শোয়েব আক্রোশে শ্বাস ছাড়ছে। শাওলিনকে আগ্রাসী থাবায় ধরতে গিয়ে ওর পেছনে থাকা কাঠের দরজায় হাত ভর দিল। তুলোর মতো নরম তুলতুলে ঠোঁটদুটি কাঙালের মতো বুঝে নিল সে। অনভিজ্ঞ শাওলিনকে তার অভিজ্ঞ আদরে বিহ্বল বিবশ করে তুলল। বাইরে চাকার ঘর্ষণে পরিবেশ শব্দময়। দুজনই বুঝতে পারল রেবেকা চলে যাচ্ছে। দরজা বন্ধের শব্দ পেতেই শোয়েব পাজকোলে শাওলিনকে উঠিয়ে নিল। একমুহুর্তের জন্যও শাওলিনকে মুক্ত করেনি। ঘর আঁধারে আচ্ছন্ন। খোলা জানালাগুলো দাপুটে হাওয়ায় ঘর শীতল করেছে। রাস্তা থেকে আসা স্বল্প ঘুম ঘুম আলোয় চোখ সয়ে আসে। শাওলিন সেই আলোতে দেখল শোয়েবের উন্মত্ততা, তার ব্যাকুল মুখায়ব, তার পুরুষালী ভ্রুঁ দুটোর অভিব্যক্তি, কখনো কুঁচকাচ্ছে, কখনো মসৃণ। ডানদিকের ভ্রুঁতে পূর্বপরিচিত কাঁটা দাগ দেখতে পাচ্ছে। শাওলিন জোরপূর্বক নিজেকে মুক্ত করে ওই কাটা স্থানে আলতো আঙুল ছুঁয়ে দিল। সেখানে ঠোঁট গাঢ় চুমু এঁকে দিল শাওলিন। দুহাতের কোমল তালু ক্লিনশেভ গালদুটোকে শক্ত করে ধরল। শোয়েব নীরব। চোখদুটো বোজা। তার শ্বাসের উষ্ণতা শাওলিনের গলা ছুঁয়ে দিচ্ছে। শাওলিন মৃদু গলায় বলল,

– রাগ কমলো? নাকি আরো অবশিষ্ট আছে?
শোয়েব কথা বলল না। চোখের চাহনি ধীরে ধীরে নরম হয়ে এল। হাতের মুঠো শিথিল হয়ে গেল। শাওলিন আবার শুধাল,
– আপনার বডিগার্ড দুজন এসেছে?
শোয়েব বিবশ চোখে দুবার দুদিকে মাথা নাড়াল। শাওলিন দেখল বাতাসে ঘরের সবকিছু উড়লেও মানুষটার চুল উড়ল না। ঐশ্বর্যের বলা ক্রুকাট ছাঁটের কথা মনে পড়ে যায়। হঠাৎ প্রশ্ন করল,
– গাড়ি কী নিজেই চালিয়েছেন?
এবার শোয়েব বলল। দৃঢ়, কঠোর, প্রস্তর স্বরে,
– হুম।
শাওলিন বিছানায় থাকলেও পিঠের নিচে শোয়েবের একটা হাত রাখা ছিল। হাতটাকে সরাতে বলল না। বরং পাশের বালিশটা দেখিয়ে বলল,
– মাথা রাখুন।
শোয়েব ওদিকে একঝলক তাকিয়ে ওর দিকে ফিরল। ধীরে না সুলভ মাথা নেড়ে বলল,
– ওখানে না।
শাওলিন বিভ্রান্ত চোখে তাকাল। প্রশ্নসুরে বলল,

– তাহলে কোথায়?
– এখানে। তোমার পাঁজরার কাছে।
শোয়েব বলতে বলতেই মাথা নিচু করতে যাচ্ছিল, শাওলিন আঁতকে ওঠে বলল,
– এখন না!
শোয়েব মাঝপথে থমকে তাকাল,
– তাহলে কখন?
শাওলিন কিছুসময় নিশ্চুপ থেকে বলল,
– দূর থেকে এসেছেন। সারাদিনের জার্নি। গোসল না হোক, হাতমুখ ধুয়ে কাপড় পাল্টে কিছু খেয়ে নিন। রান্না চাপাচ্ছি। যান, ফ্রেশ হয়ে নিন।
শোয়েব ঠোঁটের কোণে হাসির ভাঁজ ফেলে বলল,
– তারপর আমাকে সুযোগ দেবে?
শাওলিন লজ্জায় ডুবে গেল। কী বলবে খুঁজে পেল না। শোয়েব চোখ থেকে চশমা খুলেছে। নীল চোখগুলো দস্যুর মতো তাকিয়ে বলল,
– একাডেমিক ক্যালেণ্ডারে তো চারদিন বন্ধ। কাল থেকে ক্লাস নেই। এই চারদিন এই ঘরেই থাকো?
শাওলিন ভেতরদিকে গালের মাংস কামড়ে ধরল। এই ঠোঁটকাটা লোক একটা পাষণ্ড। ফড়ফড় করে কী বলছে, চোখের এতটুকু পর্দা নেই। হঠাৎ একটা ছুঁতো দেখিয়ে শাওলিন প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,

– জোর বাতাস উঠেছে। হাত ঢিলে করুন। জানালাগুলো লাগানো দরকার। রাস্তার সব ধূলোবালি ঘরে ঢুকে যাচ্ছে!
ধাক্কা দিয়ে শোয়েবকে সরিয়ে শাওলিন উঠে গেল। বিছানা সংলগ্ন জানালায় দুহাতে থাইগ্লাস টেনে দিল। শোয়েব বাঁকা হেসে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বিছানা ছেড়ে উঠল। ড্রয়িংরুমে সোফার পাশে ডাফেল ব্যাগ রেখেছে। চেইন খুলে পোশাক বের করতেই দরজায় কলিংবেল বেজে উঠে। শাওলিনকে ব্যস্ত দেখে শোয়েব উঠে গেল দেখতে। একরাশ ভারিকণ্ঠে বলল,
– কে?
বাইরে সাড়া নেই। শোয়েব আবার বলল,
– কে বাইরে? কথা বলুন।
দ্বিতীয়বারও নিরুত্তর। কিন্তু পরক্ষণেই দেখা গের কলিংবেলে ক্রিংক্রিং বেজে উঠল। শোয়েব ভাবল দরজাটা খুলে দেখবে। রেবেকা নব টেনে বেরিয়েছে, তাই নব মোচড়ে দরজার বাইরে তাকাল সে। সাথে সাথে কপাল কুঁচকে বলল,
– জ্বি, আপনি কে মিস?
বাইরে অসম্ভব সুন্দরী এক মেয়ে। গোল মুখ, গালদুটো পাকা টমেটোর মতো লালচে, উজ্জ্বলবর্ণ গায়ের রঙ, চুলগুলো টানটান সমান। যেন সদ্য রিবণ্ডিং করা। দুহাতে প্লেটে ঢাকা খাবার। বিরিয়ানীর সুস্বাদু ঘ্রাণ ভেসে আসছে। শোয়েব মেয়েটাকে নিরুত্তর দেখে বলল,
– আপনি কী শাওলিনকে চান?
মেয়েটা যেন অচিন রাজ্য থেকে বাস্তব জগতে ফিরে এল। অপ্রস্তুত ভাবে হিমশিম খেয়ে বলল,

– জ্বি, কিন্তু… আপনি? শাওলিনের কী হন?
মেয়েটার হাবভাব প্রশ্নে শোয়েব সতর্ক হলো। একবার নিজের দিকে তাকাল সে। বুঝে গেল কাহিনি। ফিরে তাকিয়ে বলল,
– শাওলিন আমার ওয়াইফ। আপনার পরিচয়টা, মিস?
মেয়েটা বিরাট ধাক্কা খেল। ক্ষণিকের জন্য চেহারা থেকে হাসি মুছে গেল। কিন্তু দ্রুতই ঠোঁটে কৃত্রিম আভা ফুটিয়ে বলল,
– আপনি স্বামী? ওহ… আচ্ছা। আমি ভেবেছিলাম কোনো রিলেটিভ. . দেবর, ভাই। মা ওর জন্য বিরিয়ানী পাঠিয়েছে।
শোয়েব জলের মতো সব বুঝলেও বাইরে থেকে স্বাভাবিক। প্লেটটা হাতে নিতেই শাওলিন ‘ কে এসেছে? কার সঙ্গে কথা বলছেন? ‘ বলতে বলতে থমকে দাঁড়াল। দরজার বাইরে বাড়িওয়ালার মেয়েকে দেখে নির্বাক, স্তব্ধ। মেয়েটা চওড়া হাসিতে বলল,
– প্লেটটা বুয়ার হাতে পাঠিয়ে দিয়ো। আর তুমি তো সেকেণ্ড ফ্লোরে আসো-ই না। একদিন উনাকে নিয়েও তো আসতে পারো। গল্প হবে।
শাওলিন শুধু হাসি দিল। কেন যেন একটা উত্তরও জোগাল না। মেয়েটা চলে যেতেই দ্রুত দরজা লাগাল শাওলিন। প্লেটটা পাশের ছোটো আলমারির ওপর রেখে শোয়েবের দিকে বলল,
– আপনি এই অবস্থায় ওর সামনে গিয়েছেন?
শোয়েব মনে মনে শয়তানি হাসি দিচ্ছে। কিন্তু বাইরে থেকে পাথর। হিম-কঠোর চোখে তাকাল সে। তারপর পোশাক নিতে নিতে বলল,

– কেউ সিডিউস হলে দায় আমার না।
শাওলিন কখনো হিংসুটে ছিল না। কিন্তু এখন বুকে দাবানল টের পাচ্ছে। প্রচণ্ড আগুন গলায় বলল,
– আপনি শার্ট ছাড়া দরজা খুলেছেন কেন?
– কেউ ব্রেন ছাড়া তাকাবে কেন?
– নিজের দোষ স্বীকার করবেন না? কেউ এলে এভাবে দরজা খোলে? বুকের প্রত্যেকটা খাঁজ দেখিয়ে এখন ভদ্র সাজা হচ্ছে?
– আমি তো জানতাম না রাত পৌণে দশটার দিকে বাড়িওয়ালার মেয়ে আসবে। ছেলেও তো আসতে পারে।
– আপনি একটা কথাও বলবেন না। ওকে চেনেন? ভেতর থেকে যখন কে কে করেছেন, তখনই আপনার ভারি গলা শুনে চুপ হয়ে গেছে।
– আমি ধমকে বলিনি।
– আপনি সালাম দিলেও ধমকের মতো শোনায়।
শোয়েব ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। হিম চাহনি দিয়ে বলল,
– যদি আমার সালাম ধমকের মতো শোনায়, ওই মেয়ে তো আর সামনে আসবে না।
শাওলিন দীর্ঘক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইল। ক্রোধে সারামুখ কঠোর করে বলল,
– মেয়েরা আপনার ধমকের কণ্ঠ ভয় পায় না।
কথাটা শুনে শোয়েব পালটা উত্তরে বলল,

– সমস্যাটা কী? তুমি কী আমার আসাটা মেনে নিচ্ছ না? বেরিয়ে যাব?
শেষ বাক্যে শাওলিন থমকাল। বুকের ভেতর যেন হৃৎপিণ্ডটাই খামচে উঠেছে। শোয়েব হাঁটু ভেঙে মেঝের ডাফেল ব্যাগ ছেড়ে তাকিয়ে আছে। শাওলিন একদৃষ্টিতে চুপচাপ দেখল শুধু। একটা কথাও বলল না। কাঁচের ভাঙা টুকরোগুলো ঝাড়ুর সাহায্যে বেলচায় তুলে নিল। প্রচণ্ড নিস্তব্ধ সুরে বলল,
– আপনি যেতে চাইলে আমি আঁটকানোর কে?
শাওলিন কাঁচ তুলে আর দাঁড়াল না। রান্নাঘরের দিকে দু এক পা যেতেই শোয়েব ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। ঠোঁটের কোণে দস্যু হাসিটা রেখে বলল,
– তুমিও যে জেলাস হও, এটা তো জানা ছিল না শাওলিন।
শাওলিন ধীরে ঘাড় পিছু করল। একপলক নিশ্চুপ থেকে বলল,
– ওই মেয়ে যদি কাল আবার না আসে, আপনি যা বলবেন তাই শুনব। কিন্তু জানি ও আসবে।
শোয়েব কোনো প্রত্যুত্তর করল না। শাওলিন একমুহুর্ত থেমে স্বর শান্ত করে বলল,
– পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর রঙ বোধহয় নীল। আকাশের রঙ যত নীল হয়, ততই তাকে মন্ত্রমুগ্ধ লাগে। আমার সামনে সাক্ষাৎ ওই চোখদুটো নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, আমার যা হয় তা কী অন্যদের বেলায় হয় না? আমি কী এই ভয়ে থাকব না মানুষের অন্তর নাপাক? আমি যাকে ভাগ্যে পেয়েছি, তাকে নিয়ে অন্যরা কীসব ভাবছে আমি কী ওসব বুঝি না? বরং, আপনিই আমাকে বোঝেন না!
শাওলিন সমুখে ফিরে রান্নাঘরে চলে গেল। শোয়েব সেই পথপানে তাকিয়ে রইল নিঃশব্দে। রেবেকার কথার প্রভাব ওর ওপর দেখতে পায়নি সে। একবারের জন্যও তাকে অবিশ্বাস করেনি শাওলিন। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল শোয়েবের। যেন বুঝল, ওই বুকের ভেতর পাঁজরা বন্দি ছোট্ট একটা ঘর আছে। সেই ঘরের একমাত্র স্থায়ী বাসিন্দা শুধুই শোয়েব।

ঢাকার আরেকপ্রান্তে রাত এগারোটার সময়। মিন্টোরোড দিয়ে দ্রুতবেগে ছুটে যাচ্ছে নোয়াহ্ নেভি ব্লু গাড়ি। গাড়িতে একদল সাদা পোশাকধারী লোক। পরিচয় অজ্ঞাত। চালচলন, ব্যবহার সবকিছুতে এক অস্বাভাবিক তীক্ষ্মতা। ড্রাইভ করা লোকটি ঠোঁটের কাছে মাউথপিস এনে বলল,
– যেভাবেই হোক রাতের আঁধারেই এক্সিকিউট করতে হবে! এই সাসপেক্ট কানাগলি দিয়ে বেরিয়ে যায়। ডেঞ্জারাসলি চালাক। কিন্তু এবার না।
মাউথপিস থেকে খুব অস্পষ্ট গলায় কেউ বলল,
– খুব সাবধান। হাতে কোনো প্রমাণ নেই। এমনভাবেই নামচিহ্ন ঘুচিয়ে দেবে, যেন ফরেনসিক ট্রেস না থাকে।
ড্রাইভ করা লোকটি প্রচণ্ড স্নায়ুবিক চাপে আছে। কপালের ডানদিকে ঘামের চিকন রেখা কানের পাশ দিয়ে নেমে গেল। লোকটা ধীরভাবে বলল,
– এখন সাতজন আছি। একটু পর শাহবাগ পৌঁছে যাব। আমাদের ব্যাকাপ লাগবে স্যার।
উচ্চপদস্থ লোকটা ওপাশ থেকে বলল,
– ব্যাকাপ জায়গামতো রেডি থাকবে। তোমরা সেখানে পৌঁছাও।
সংযোগ কেটে গেল। ড্রাইভ করা লোকটা টিস্যু দিয়ে কপালের ঘামটুকু মুছল। গাড়ির স্পিড আরো বাড়াতেই একটা রেসিডেন্সিয়াল এলাকায় প্রবেশ করল। চারপাশ নীরব। দূর থেকে যানবাহনের কোলাহল হালকা ভাবে ভেসে আসছে। গাড়ি থেকে কেউ নামল না। একটা নবম-দশম তলার ভবনের সামনে অন্ধকার কোণে গাড়িটা থামিয়ে দিল। এই রেসিডেন্সিয়াল এলাকায় যে পাহারাদার আছে, সে দূরের বড়ো গেট থেকে এমনভাবে বিষয়টা অগ্রাহ্য করল যেন এখানে কোনো মশাও নেই। গাড়ি তো বহুদূরের কথা। লোকগুলো ঘড়িতে সময় গুণতে লাগল। পেছন থেকে পিনপতন নৈঃশব্দ্যে সামান্য শব্দ ছেড়ে বলল,

– কয়টার দিকে ঢুকতে বলেছে?
ড্রাইভার লোকের পাশের লোকটা বলল,
– মাঝরাতে। যখন কাক-পঙ্ক্ষিও জেগে থাকবে না।
উত্তরে ড্রাইভারের পেছনে বসা একজন বলল,
– এখানে কোনো গোপন আস্তানা আছে?
ড্রাইভার লোকটা বলল,
– এটা তো আবাসিক এলাকা। এদিকে অন্য কারণে আসে। কারণটা মনে হয় আন্দাজ করতে পারছি।
গাড়ির শেষদিক থেকে একটা প্রশ্ন ছুটে এল,
– কী?
– মেয়েঘটিত।
ড্রাইভারের পাশের লোকটা জবাব দিল। অনেকক্ষণ কেউ কিছু বলল না। কিন্তু তারা জানতেও পারল না তাদের অগোচরে আরো একজোড়া গাড়ি জায়গামতো বসে আছে। একটা গাড়িতে আর কেউ নয়, রাফান সিদ্দিকী। অন্যটায়, সাদা ল্যাণ্ড ক্রুজার গাড়িতে মোশাররফ। রাফান স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে অন্যহাতে ফোনে কিছু টাইপ করল। লেখা শেষে পাঠাতেই কিছুক্ষণ অপেক্ষা। এরপর বিপ্ বিপ্ আওয়াজ। ফোনের ব্রাইটনেস সর্বনিম্ন করে নোটিফিকেশনটা দেখল। নতুন আপকামিং ম্যাসেজে লেখা,

– “আজ রাত থাকব।”
রাফান ছোট্ট করে লিখল,
– “মোহাম্মদপুর রেসিডেন্সিয়াল এরিয়ায় বসে আছে। ঠিকানা ভুল।”
– “ঠিকআছে।”
– “মনে হচ্ছে, এবার যাওয়ার সময় খেলা হবে। সবগুলো গাড়ির টায়ার যুদ্ধ করবে। আপনাকেও সাবওয়ে সার্ফাস খেলতে হবে স্যার।”
– “বাংলাদেশের রাস্তায় সাবওয়ে সার্ফাস আর ফ্রি ফায়ার – দুটোই নাহয় খেললাম।”
– “তাহলে ফুয়েল আর ইঞ্চিন দেখে দেব?”
– “মোশাররফকে বলো সিটগুলো দেখে নিতে।”
রাফান দুষ্টু হেসে লিখল,
– “আপনার মাথায় অন্য চিন্তা খাটছে নাকি?”
– “ইয়্যু শ্যূড গেট ম্যারিড, মাই বয়!”
রাফান হাসতে হাসতে লিখল,
– “আই ডু, শোয়েব স্যার। বাট দেয়ার ইজ নো ওয়ান ফর মি হু ক্যান হ্যাণ্ডেল মাই এংগার অ্যাণ্ড মাই অ্যাবসার্ড লাইফ।”

বজ্রমেঘ পর্ব ৪১

শোয়েব ফোনের স্ক্রিনে কথাগুলো পড়ল। দীর্ঘ শাওয়ার নিয়ে এখন ভেজা মাথা টাওয়েলে মুছে নিচ্ছে। নাকে রান্নার সুবাস এসে ধাক্কা মারল। শোয়েব ফোনটা রেখে নিঃশব্দ পায়ে ধীরে ধীরে রান্নাঘরের দিকে গেল। দরজায় দাঁড়িয়ে থমকে গেল শোয়েব। কড়াই থেকে উঠতে থাকা ধোঁয়ার ফাঁকে শাওলিন ডালে রসুন বাগাড় দিচ্ছে। অদ্ভুত এক শান্তি ছড়িয়ে আছে ঘরজুড়ে। কয়েক মুহুর্ত আগেই যে মেয়েটা তার ক্রোধ থামিয়েছিল, এখন সেই মেয়েটাই তার জন্য রাতের খাবার রান্না করছে।

বজ্রমেঘ পর্ব ৪২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here