কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৫৫
লামিয়া রহমান মেঘলা
পরের দিন কায়ান সিকদার নিবাসে যাওয়ার জন্য নিজেদের লাগেজ গুছিয়ে নেয়। সকালের আলো তখন ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। নতুন দিনের কোমল আবহ যেন চারপাশে এক নির্মল প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে।
সেরিনের ঘুম ভাঙতে বেশ বেলা হয়ে যায়। এদিকে কায়ান ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে কারও সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথনে ব্যস্ত। আজ তাকে যেন অন্য দিনের তুলনায় আরও বেশি পরিপাটি আর আকর্ষণীয় লাগছে। তার পরনে বেবি ব্লু রঙের শার্ট, অফ হোয়াইট রঙের ফরমাল প্যান্ট, আর বুকের কাছে ঝুলছে একটি সানগ্লাস। স্নিগ্ধ সকালের আলো তার ব্যক্তিত্বকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।
ভিলায় ফিরে কায়ান দেখতে পেল, সেরিন মাত্র ঘুম থেকে উঠে কিউটলি চোখ ডলতে ডলতে বাইরে বেরিয়ে আসছে। এলোমেলো চুল, ঘুম জড়ানো দৃষ্টি আর নিষ্পাপ মুখশ্রীতে যেন এক অদ্ভুত মায়া লেগে আছে। মেয়েটির এমন শিশুসুলভ সৌন্দর্য দেখে কায়ানের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটি মৃদু হাসি ফুটে ওঠে।
ঘুম ভাঙার পরই সামনে এত সুদর্শন কায়ানকে দেখে সেরিন কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। কায়ান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আলতো করে সেরিনের কোমড় জড়িয়ে ধরে। সেরিন ঘাড় উঁচু করে তার দিকে তাকায়। কায়ান ভালোবাসায় ভরা এক চুমু এঁকে দেয় সেরিনের গালে।
“গুড মর্নিং প্রিন্সেস।”
“গুড মর্নিং।”
“চট্টগ্রাম যাব আমরা। চলো, ফ্রেশ হয়ে নাও।”
“ব্রেকফাস্ট বানিয়েছেন আপনি?”
“হুম।”
সেরিনের ঠোঁটে সঙ্গে সঙ্গে ফুটে ওঠে এক মিষ্টি হাসি। সেই হাসির উষ্ণতায় কায়ানও আবার তাকে আপন করে জড়িয়ে নেয়।
কিছুক্ষণ পর সেরিন ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্টের টেবিলে আসে। দুজন পাশাপাশি বসে সকালের নাস্তা শেষ করে। এদিকে দারোয়ানরা তাদের লাগেজ যত্ন করে গাড়িতে তুলে দেয়। সেরিনও ততক্ষণে সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।
বাইরের নরম সোনালি আলোয় সেরিনকে অপূর্ব সুন্দরী লাগছিল। মৃদু বাতাসে তার চুলগুলো হালকা উড়ে গিয়ে মুখের চারপাশে এক কোমল আবেশ তৈরি করছিল। সকালের নির্মল আলো যেন তার মুখশ্রীর প্রতিটি রেখায় এক অনন্য দীপ্তি ছড়িয়ে দিয়েছিল।
সবকিছু গুছিয়ে দুজন রওনা হলো চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। আজ সেরিন ভীষণ খুশি। কতদিন পর সবার সঙ্গে আবার দেখা হবে, সেই ভাবনাতেই তার মন আনন্দে ভরে উঠেছে।
কক্সবাজার পেরিয়ে গাড়ি যখন চট্টগ্রামের পথে প্রবেশ করল, তখন প্রকৃতি যেন নিজের সবচেয়ে সুন্দর রূপটি মেলে ধরল। রাস্তার দুপাশে সারি সারি সবুজ গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। হালকা বাতাসে পাতাগুলো দুলে দুলে যেন পথিকদের স্বাগত জানাচ্ছে। দূরের টিলা আর পাহাড়গুলো সকালের রোদে নরম সবুজ আভায় ঝলমল করছে। কোথাও কোথাও নাম না জানা বুনো ফুলের রঙিন ছোঁয়া প্রকৃতিকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে।
গাছের পাতার ফাঁক গলে সূর্যের সোনালি আলো রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আলো আর ছায়ার সেই অপূর্ব খেলায় পথ যেন এক মোহনীয় ছবিতে পরিণত হয়েছে। আকাশ ছিল স্বচ্ছ নীল, ভেসে বেড়াচ্ছিল তুলোর মতো সাদা মেঘ। দূর থেকে ভেসে আসা পাখিদের কিচিরমিচির আর বাতাসে মিশে থাকা মাটির স্নিগ্ধ গন্ধ পুরো যাত্রাপথকে আরও মনোমুগ্ধকর করে তুলেছিল। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝ দিয়ে এগিয়ে চলতে চলতে তাদের পথচলা যেন আরও শান্ত, আরও আনন্দময় হয়ে উঠল।
সিকদার নিবাস
যদিও কেউ জানত না, আজ কায়ান আর সেরিন হঠাৎ করেই সিকদার নিবাসে চলে আসবে। তবুও সকাল থেকেই বানু মির্জা যেন এক অদ্ভুত টানে বাগানে নেমে পড়েছিলেন। নিজের হাতে গাছ থেকে পেড়ে এনেছেন পাকা আম, কাঁঠাল, লিচু আর নানা রকম দেশি ফল। বাগানের প্রতিটি গাছ যেন বছরের পর বছর ধরে তার স্নেহে বড় হয়ে ওঠা সন্তানের মতো। সেই গাছগুলোর টাটকা ফল দিয়ে তিনি কয়েকটি ঝুড়ি ভরে ঘরে এনে যত্ন করে রেখে দিলেন।
মনের মধ্যে ছিল একটাই ভাবনা। এসব ফল কক্সবাজারে পাঠিয়ে দেবেন। ছেলে আর ছেলের বউ যেন নিজের বাড়ির স্বাদ ভুলে না যায়। অথচ তিনি জানতেনই না, তাকে সারপ্রাইজ দিতেই আজ তার ছেলে আর পুত্রবধূ সিকদার নিবাসে ফিরছে।
সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে লিভিং রুমে এসে শিমুল অবাক হয়ে থমকে দাঁড়াল। চারদিকে ঝুড়ি ভর্তি টাটকা ফল সাজানো। সে কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গেল।
“আম্মা, সেদিন না বিক্রি করে দিলেন সব?”
বানু মির্জা মৃদু হেসে বললেন,
“তোমার শ্বশুরের কি একটু একটু বাগান? সব ফল সেখানে আছে। বাড়িতে যত ফল খাও, সবই এই বাগানের।”
শিমুল ধীরে এসে সোফায় বসল। বানু মির্জা কাজের লোকদের একে একে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে তিনিও এসে সোফায় বসলেন। মুখে বয়সের ক্লান্তি থাকলেও কণ্ঠে ছিল সংসার সামলানোর দৃঢ়তা।
“এসব কাজ শিখে নাও ধীরে ধীরে। আমি আর কয় দিন থাকব?”
শিমুল ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“কেন মা, সেরিনরা কি সারা জীবন কক্সবাজারে থাকবে?”
মুহূর্তেই বানু মির্জার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। শিমুলের কথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা হিংসাটা তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন।
“সে কথা আমি জানি না। আর যা সমস্ত কর্মকাণ্ড করেছো, এতে কায়ানকে কিছু বলার অধিকারও আমি হারিয়েছি। কায়ান যা চায়, তাই করতে পারে। আছো তুমি, এখন তুমি করবে এসব।”
শিমুল অসন্তুষ্ট গলায় বলল,
“আমি কি একাই করব সব?”
বানু মির্জা এবার বিরক্ত হলেন।
“না করতে চাইলে তুমিও জেবরানের সঙ্গে আলাদা থাকতে পারো। আহিকে বলে দেব। ওকে সব সম্পত্তি লিখে দেব। ওই সব দেখবে।”
কথাগুলো বলেই তিনি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। ধীর পায়ে সেখান থেকে চলে গেলেন।
শিমুল নিঃশব্দে সোফায় বসে রইল। মনে মনে নানা হিসাব কষতে লাগল। জেবরান যে চাকরি করে, তাতে সেরিনের মতো বিলাসবহুল জীবন কখনোই সম্ভব নয়। আলাদা হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি কষ্ট তাকে নিজেকেই করতে হবে। এই বাস্তবতাই তাকে আরও অস্থির করে তুলল।
শিমুল এসব ভাবছিল, ঠিক সেই সময় হঠাৎ করেই সিকদার নিবাসের সামনে একটি গাড়ির শব্দ ভেসে এলো। চারপাশের নীরবতা ভেঙে সেই শব্দ যেন সবার দৃষ্টি সদর দরজার দিকে টেনে নিল।
শিমুল ভ্রু কুঁচকে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েক মুহূর্ত পর পাশাপাশি কায়ান আর সেরিন বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।
তাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখে শিমুল বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। শব্দ শুনে বানু মির্জাও বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন। আজ বাড়ির সবাই উপস্থিত।
কায়ান এক মুহূর্ত দেরি না করে এগিয়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল। তারপর ভালোবাসায় মায়ের কপালে একটি চুমু এঁকে দিয়ে হাসিমুখে বলল,
“কেমন আছো আম্মা বেগম?”
বানু মির্জার চোখ মুহূর্তেই ছলছল করে উঠল।
“খুব ভালো, আব্বা। তুই কেমন আছিস?”
“ভালো।”
এরপর সেরিনও এগিয়ে এসে শাশুড়ির সঙ্গে দেখা করল। তার পরিপাটি চেহারা, মার্জিত পোশাক আর আভিজাত্যে ভরা চালচলন যেন নীরব ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছিল, সে কতটা যত্নে থাকে। তাকে দেখলেই বোঝা যায়, সে বিজনেসম্যান সিকদার কায়ান মাহবুবের স্ত্রী।
সেরিন এগিয়ে গিয়ে শিমুলকে জড়িয়ে ধরল।
“কেমন আছিস আপু?”
“ভালো। তুই?”
“ভালো।”
একে একে সবাই নিচে নেমে এলো। অনেক দিন পর কায়ান আর সেরিনকে একসঙ্গে দেখে সবার মুখেই আনন্দের ছাপ ফুটে উঠল। দীর্ঘদিনের শূন্যতা যেন এক নিমিষেই পূর্ণ হয়ে গেল।
শুধু শিমুলের মনেই সেই আনন্দের কোনো রেশ জাগল না। কেন জানি সেরিনের এই সুখ, এই সম্মান আর এই পরিপূর্ণ জীবন তার ভালো লাগছিল না। বুকের গভীরে জমে থাকা অদৃশ্য ঈর্ষা নিঃশব্দে আরও গাঢ় হয়ে উঠল।
সবার সঙ্গে দেখা করে কায়ান আর সেরিন নিজেদের ঘরে এলো ফ্রেশ হওয়ার জন্য। দীর্ঘদিন পর পরিচিত সেই ঘরে পা রাখতেই এক অদ্ভুত আপন অনুভূতি ঘিরে ধরল দুজনকে। জানালার ফাঁক গলে আসা নরম আলো ঘরের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে এক শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
সেরিন ধীরে ধীরে হাতে থাকা ঘড়িটি খুলে ড্রেসিং টেবিলের সামনে রেখে দিচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই নিজের কোমড়ে দুটি শক্ত অথচ উষ্ণ হাতের স্পর্শ অনুভব করল সে।
হঠাৎ স্পর্শে সেরিনের ঠোঁটের কোণে এক মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। সামনের আয়নায় চোখ পড়তেই কায়ানের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেল। কায়ান নিঃশব্দে এসে নিজের মুখ গুঁজে দিল সেরিনের ঘাড়ে। পরম আদরে সেখানে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে আবার দুষ্টুমিভরা কোমল কামড়ে তাকে অস্থির করে তুলতে লাগল।
“ক, কী করছেন?”
কায়ানের ঠোঁটে ফুটে উঠল মৃদু হাসি।
“এত সুন্দর কে সাজতে বলেছে?”
সেরিন লাজুক কণ্ঠে বলল,
“সাজিনি তো।”
কায়ান ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে আলতো করে সেরিনকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল। গভীর মুগ্ধতায় তার চোখে চোখ রেখে বলল,
“তাহলে আমার বউ এমনিতেই এত সুন্দরী?”
সেরিন কোনো উত্তর দিল না। লজ্জায় তার চোখের পাতা নুয়ে এলো। গাল দুটো ধীরে ধীরে রাঙা হয়ে উঠল। সেই নীরবতাই যেন হাজারো কথার চেয়েও বেশি সুন্দর ছিল।
কায়ান আর অপেক্ষা করল না। অসীম ভালোবাসা আর মমতায় সেরিনের ওষ্ঠযুগল নিজের ওষ্ঠে আলতো করে আগলে নিল। স্পর্শে ছিল না কোনো তাড়াহুড়ো, ছিল শুধু গভীর অনুভূতির কোমল প্রকাশ। যেন দীর্ঘদিনের সব না বলা কথা, সব অভিমান আর সমস্ত ভালোবাসা সেই এক মুহূর্তের নীরবতায় এক হয়ে গেল।
চারপাশের পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। সময় থেমে রইল শুধু তাদের দুজনের জন্য। তারা যেন নিজেদের ছোট্ট এক অনুভূতির জগতে হারিয়ে গেল, যেখানে শব্দের প্রয়োজন নেই, চোখের ভাষাই সবকিছু বলে দেয়।
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৫৪
ঠিক সেই সময় শিমুল কিছু বলতে তাদের ঘরের দিকে এসেছিল। দরজাটি খোলা থাকায় ভেতরে ঢুকতেই সামনে থাকা দৃশ্য দেখে সে আচমকাই থমকে দাঁড়াল।
কয়েক দিন ধরেই জেবরানের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছিল। সংসারে কোথাও যেন শান্তির ছোঁয়া নেই। অথচ ঠিক সেই মুহূর্তে কায়ান আর সেরিনকে এতটা শান্ত, পরিপূর্ণ আর ভালোবাসায় ঘেরা দেখে তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক অস্বস্তিতে ভরে উঠল।
কেন জানি সেরিনের এই সুখ, এই প্রশান্তি আর ভালোবাসায় ভরা জীবনটাকে তার আর সহ্য হচ্ছিল না। বুকের গভীরে জমে থাকা ঈর্ষা নীরবে আরও তীব্র হয়ে উঠল।
