মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫০ (২)
jannatul firdaus mithila
“ মস্তিষ্ক বলে তোকে মে’রে ফেলি, মায়ের প্রতিশোধ বলে কথা! আর পাগলাটে মন বলে — তুই শুধু আমার থাক! বিনিময়ে পুরো দুনিয়া গোল্লায় যাক।”
কন্ঠে এক অদ্ভুত নিগূঢ়তা মুগ্ধের। চোখদুটো প্রাণোচ্ছল! তামাকে পোড়া বাদামী ঠোঁটদুটো শুষ্কতায় জড়িয়েছে। জিভের সিক্ত ডগা ঠেলে আলতো করে ভিজিয়ে নিচ্ছে তা। হুট করেই সুদর্শনের বুকটায় নেমেছে দুর্ভিক্ষের প্রখর খরা! যে খরা বোধহয় অবসানের স্বাদ পাবে কেবলমাত্র মায়াবিনীর একমাত্র প্রত্যক্ষ দর্শনে। একফোঁটা পানির অভাবে তৃষ্ণার্ত বাকহীন পক্ষী যেমন তীব্র খরায় ছটফটিয়ে উঠে, ঠিক তেমনিভাবে যুবকের বুক পিঞ্জরের অভ্যন্তরে আঁটকে থাকা হৃদয় নামক অঙ্গটি ছটফটাচ্ছে যেন। সে কাঁপছে! রূঢ় মানবের ওমন পাহাড়সম দেহটা কাঁপছে। আবারও তার অবচেতন বেহায়া মন ভীষণ বাজেভাবে মেয়েটাকে কাছে পেতে চাইছে। কিন্তু রূঢ় মানব যে খারাপের খোলসে আবৃত সুপুরুষ! ছোট্ট মেয়েটার সাথে হুটহাট নিষিদ্ধ কিছু করে ফেলার ভয়ে নিজেকে শাসিয়ে করছে কাবু। দু’হাতে সজোরে চাপড় বসাচ্ছে নিজেরই গালে। বারবার নিজের অভ্যন্তরীণ পৌরুষ্য পশুটাকে শাসিয়ে আওড়াচ্ছে,
“ ওহ ফা’ক! থাম! থাম বলছি। শি ইজ স্টিল ঠু ইয়াং। ও তোর রূঢ়তা সহ্য করতে পারবে না। পারবে না!”
নিজের সাথেই দ্বন্দ্বে লিপ্ত মুগ্ধ। থামতে পারছেনা কোনমতেই। শারীরিক অবস্থা বেগতিক দেখে তড়িঘড়ি করে উঠে পা বাড়াল কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যাবার উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে নিজের মাথাটা শক্ত হাতে চাপড়াচ্ছে মুগ্ধ। শরীরে অভাব অনুভব করল — তীব্র নেশার। মেয়েটার মারাত্মক নেশা থেকে কিছুটা হলেও নিস্তার পাওয়া উচিত। নয়তো নিজ অজান্তেই হয়তো জোরপূর্বক করে বসবে অনেককিছু।
মাথার ওপর বইছে ঝর্ণা! ঝিরিঝিরি শীতল পানির বেগ এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে পারস্য সুন্দরীর দুধে-আলতা গা! পানির তীব্র উপস্থিতিতে ধুয়েমুছে যাচ্ছে রমণীর ক্রন্দনরত চোখদুটো। অশ্রুরা সব নির্বিকারে গড়িয়ে যাচ্ছে পানির সখ্যতায়। রমণী কুঁজো হয়ে বসে আছে ওয়াশরুমের তকতকে টাইলসের মেঝেতে। রাত বাজে প্রায় দেড়টা! বাইরে এখনো ভারী তুষারপাত বইছে। তন্মধ্যে গ্রিজারের উষ্ণ জল ছাড়াই বরফ ঠান্ডা পানির নিচে বসে আছে সে। ক্ষণে ক্ষণে কাঁপছে তার ক্ষুদ্র তনু। তবে এ কম্পনের পেছনে আদৌও পানির শীতলতা দায়ী? না-কি বুক ভরা চাপা আর্তনাদের? তা নিয়ে খোদ বড্ড শঙ্কায় আছে মানবী। তার ক্ষুদ্র হৃদয়খানা ভেঙে চুরমার হয়েছে আজ। পেলব মুখখানা দু’হাঁটুর ভাঁজে লুকিয়ে রেখে বিড়বিড় করে উগড়ে দিচ্ছে নিজের চাপা কষ্টগুলো!
“ কেনো করলে এমনটা এলেক্স? কেনো করলে? কি করিনি আমি তোমার জন্য? সে-ই শুরু থেকে যখন যা বলেছিলে, বিনাবাক্যে আমি তা-ই মেনেছি, তাই তাই করেছি। বিলিয়েছি নিজের সর্বস্ব! রাতের পর রাত নিজের নৈতিকতা বিলিয়ে তোমায় খুশী করেছি — কেবলমাত্র তোমাকে আপন করে পাবার লোভে। তাই বলে কী আমি বড্ড লোভী ছিলাম এলেক্স? কি এমন কমতি ছিল আমার মধ্যে — যা আমি বিনে মিলা পূর্ণ করল? এমনটাই যদি হওয়ার ছিলো, তাহলে আমার সাথে এতবড় নাটক কেনো করলে এলেক্স? কেনো করলে?”
চিৎকার দিচ্ছে হায়া। অতিরিক্ত কষ্টে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে দু’হাতে টানছে নিজের চুল। চোখদুটো পানির বিপরীতে বুঁজে রেখে অস্ফুটে আওড়াল,
“ আই ওন্ট ফরগিভ ইউ্য এলেক্স!”
প্যালেসের নিচতলার প্রশস্ত করিডর দিয়ে ব্যস্ত পায়ে হাঁটছে এডউইন। হাতে তার একখানা ওয়াকিটকি! ফোনের ওপাশে কাকে যেন তীব্র ক্ষোভে ঝেরে বলছে,
“ কি করছিস তোরা? একটা সামান্য কাজ দিয়েছি তাও যদি ঠিকঠাক মতো করতে না পারিস, তাহলে তোদের বাঁচিয়ে রেখে লাভ কী বাস্টার্ডস?”
ওপাশের ব্যাক্তিবর্গের প্রতিনিধির বাক্যালাপ শোনা যায়নি তেমন। এডউইন চোয়াল শক্ত করছে ক্রমশ। ক্ষুব্ধতায় গটগটিয়ে হাঁটা ধরল প্যালেসের সম্মুখ দুয়ার পানে। রাজকীয় সিঁড়ির গায়ে কদম কেবল পড়ল তার, ওমনি পেছন থেকে ভেসে এলো ভয়ার্ত সপ্তদশী রিনরিনে কন্ঠ!
“ এ-এডউইন!”
থমকায় এডউইন! চামড়া গোটায় কপালের। রয়েসয়ে ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকাতেই দৃশ্যমান হলো — অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা তটস্থ মাহিকে। তৎক্ষনাৎ কপালের ভাঁজগুলো আর-ও কিছুটা গাঢ় হলো গম্ভীর মানবের। দৃষ্টি যথাযথ নুইয়ে ফেলে গমগমে গলায় আওড়াল,
“ বলুন সিগনোরা!”
শুকনো ঢোক গিলল মাহি। ক্ষুদ্র পাদু’টো তার ধীরলয়ে এগোলো সম্মুখে। দোটানাগ্রস্থের ন্যায় হাসফাস করছে সে। তা আড়দৃষ্টে বোধহয় বেশ খেয়াল করল এডউইন। তড়িঘড়ি করে নজর ঘুরিয়ে এনে তাক করল সম্মুখে। পরমুহূর্তেই গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
“ কিছু বলার থাকলে সোজাসুজি বলে ফেলুন মনস্তার’স সিগনোরা। আমার তাড়া আছে! পেন্টহাউজে যেতে হবে।”
“ আমিও যাব!”
কথার পিঠে এহেন অকপট উত্তর মোটেও আশা করেনি এডউইন। হতভম্বতায় ডুবল সে। উদগ্রীব হয়ে তক্ষুনি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ কেনো?”
সপ্তদশী অস্থিরতায় হাত কচলাচ্ছে অনবরত। নতমুখে পা দিয়েই খুঁটছে পায়ের নখ। লকলকে জিভের ডগায় কোনমতে কথা সাজিয়ে মিনমিনিয়ে বলল,
“ বিস্ট বলেছিল — কিউটির সাথে দেখা করে যেন তারাতাড়ি পেন্টহাউজে ফিরে আসি।”
গম্ভীর হলো এডউইন। তার মুখাবয়বের অভিব্যক্তি ধরাছোঁয়ার বাইরে! মাহি’র কথা শেষ হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ব্যস্ত যুবক ব্যগ্র কন্ঠে বলে ওঠে,
“ ঠিক আছে চলুন!”
পেন্টহাউজের শিমার চ্যাম্বার! যা রুশদী কিংয়ের রেস্ট নেবার কক্ষ হিসেবে পরিচিত। কক্ষের দুয়ার আঁটকে রাখা ভেতর থেকে। দরজার বাইরে উৎকন্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এডউইনসহ একঝাঁক প্রশিক্ষিত চিকিৎসক! অথচ রূঢ় মানব দুয়ার খুলছে না। এডউইন বিচলিত হলো। কক্ষের দারপ্রান্তে এডজাস্ট করা সেন্সরের সম্মুখে দাঁড়িয়ে, মাথা নুইয়ে ফের অনুমতি চাইবার ভং ধরে আওড়াল —
“ মনস্তার! প্লিজ ওপেন দ্য ডোর। আই থিংক ইউ্য নিড ট্রিটমেন্ট রাইট নাউ!”
কক্ষ হতে টুঁ-শব্দটিও বেরোয়নি। এডউইন আশাহত হলেও হাল ছাড়ল না। ফের সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে সেন্সরের সম্মুখে ঘাড় ঝোঁকাতেই ওপাশ থেকে কাঁচের স্লাইডিং দরজাটা শব্দহীন গতিতে খুলে গেল দুপাশ দিয়ে। এডউইন থামল। মুহুর্ত ব্যয়ে ত্রস্ত কদমে প্রবেশ করল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে। উদ্বিগ্ন চোখদুটো তার আনমনে সামনে তাকাতেই দেখল — অদূরের মখমলি ডিভানের কোলে দাম্ভিকতার সঙ্গে বসে আছে মনস্টার। দৈবাৎ শক্তিতে কেমন রূঢ়তার সঙ্গে বাঁকা হয়েছে তার ঘাড়। অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তৎক্ষনাৎ দৃষ্টি ঝোঁকায় এডউইন। নিরবে পা ঠেলে এগিয়ে আসে সম্মুখে। দৃষ্টিযুগল তীক্ষ্ণ হতেই দৃশ্যমান হলো — মনস্তারের পায়ের কাছে অবহেলিত আকারে পড়ে আছে বেশকিছু ব্যবহৃত সিরিঞ্জ! শূন্য কাঁচের শিশি! ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে এডউইন। ধীরলয়ে নিঃশব্দে হাঁটু গেঁড়ে বসল মেঝেতে। টেবিলের ওপর গা বাঁকিয়ে গড়িয়ে থাকা বক্স-ট্রে তে একে একে মেঝে হতে তুললো সব।
পরক্ষণে ঘাড় বাকিয়ে তাকাল অদূরের দুয়ার ঠেসে দাঁড়িয়ে থাকা চিকিৎসকদের পানে। চোখের বিচক্ষণী নিরব ইশারায় সকলকে ভেতরে ঢুকবার আদেশ দিয়ে ওঠে গম্ভীর পুরুষ। এহেন নিরব আদেশ পেয়ে কাঁপতে কাঁপতে কক্ষে প্রবেশ করে ডাক্তারগণ। হাতে তাদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি! মাথা নুইয়ে রেখে কোনমতে এগোচ্ছেন তারা। পদযুগলের গতিতে হুট করেই টান পড়ল ডিভানের অভিমুখে এসে। দু’জন মধ্যবয়স্ক রাশিয়ান চিকিৎসক উদ্যোত হলেন মনস্তারের ট্রিটমেন্ট করতে। হাতে থাকা ডক্টর’স ব্যাগখানা টেবিলের ওপর রেখে, গজ বের করলেন পরক্ষণে। কাপত্রয়ী হাতে তুলোর নরম অংশ নিয়ে মনস্টারের ক্ষতস্থানে এগোতে গেলেই আচমকা বেচারা চিকিৎসকের পেট বরাবর ক্ষিপ্রতায় বসল এক লাথি! এহেন অতর্কিত আক্রমণের তাল সামলাতে না পেরে বেচারা কেমন ছিটকে গিয়ে পড়ল কয়েক হাত দূরে। এডউইন হতভম্ব! ভড়কানো দৃষ্টে আহত চিকিৎসকের পানে তাকাতেই কর্ণকুহর ভেসে এলো রূঢ় মানবের হিং স্র গর্জন!
“ ইউ্য বাস্টা’র্ডস! ডোন্ট ইউ্য ডেয়ার টু টাচ মি। গেট লস্ট ফ্রম মা’ই আই সাইট!”
যুবকের এহেন হুংকারে কাঁপন ধরে গেল বাদবাকি দক্ষ চিকিৎসকদের সর্বাঙ্গে। মনস্টারের মতিগতির ঠিক নেই! কখন না আবার তাকে ছোঁয়ার অপরাধে গা থেকে হাতটাই আলাদা করে দেয় সকলের। ভয়ডরে তক্ষুনি বেচারারা ছুটে পেলালো কক্ষ থেকে। এদিকে এডউইন চিন্তিত! নিজ উদ্যোগে আগ বাড়িয়ে আরেকটু চেপে এলো বিস্টের পায়ের কাছে। কন্ঠ খাদে নামিয়ে ফের চিন্তিত গলায় শুধালো,
“ আপনার ক্ষতটা ভীষণ গাঢ় মনস্তার। প্রচুর ব্লাড লস হচ্ছে! এক্ষুণি ক্ষততে স্টিচেস না পড়লে সমস্যা হতে পারে।”
মুগ্ধের চোখদুটো বুঁজে রাখা। চোয়াল শক্ত! কন্ঠে ধরেছে চিড়বিড় ভাব।
“ হোক! তাতে তোর বাপের কী? আ’ই সেইড গেট আউট বাস্টা’র্ড।”
কর্কশ যুবকের এরূপ পাল্টা তিরিক্ষি উত্তরে কথা থেমে গেল এডউইনের। ভারী হলো কন্ঠনালী! কিয়তক্ষন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বেপরোয়া উম্মাদ মাফিয়া বিস্টের পানে। মনে মনে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলছে এডউইন! আওড়াচ্ছে,
“ এতোটা ছন্নছাড়া কেনো আপনি মনস্তার? আর কতদিন নিজের ক্ষতগুলো এভাবে উম্মুক্ত রাখবেন? আর কতদিন নিজেকে আবৃত করে রাখবেন এহেন শক্ত খোলসে?”
মনের কোণে উত্থাপিত বাক্যবাণের সঠিক উত্তর পায়নি এডউইন। কেবল ফেলল দীর্ঘ নিশ্বাস। রয়েসয়ে হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায় সে। শরীর ঘুরিয়ে তক্ষুনি পা ঘোরালো উল্টোপথে।
নিস্তব্ধ কক্ষ! মখমলি গোলাকার বিছানায় এপাশ ওপাশ করছে মাহি। চোখ ভর্তি ঘুমের অভাবে বিরক্ত সে। কিউটিকে নিয়ে এলেই পারতো! বিনিময়ে নাহয় আরও ক’খানা বকুনি খেতো। এ আর নতুন কী? চোখদুটো কুঁচকে রেখে ভাবছে মাহি। ঠিক তখনি ঘরের দরজায় শব্দ হলো ঠকঠক! তক্ষুনি চোখ মেলে মাহি। গোছায় কপাল। এতো রাতে আবার কে এলো? মানবীর ভাবনার ঘোরেই ফের টোকা পড়ল দরজার গায়ে। এবার আর বসে থাকল না মাহি। চটজলদি নেমে এলো বিছানা হতে। দ্রুত কদমে দরজার কাছে এসে নব ঘোরালো উল্টো। দুয়ার খুলে সম্মুখে দৃষ্টিপাত করতেই রমণীর চোখজোড়া সামান্য কুঁচকে গেল আপনা-আপনি। সন্দিগ্ধ কন্ঠ ফুঁড়ে অস্ফুটে বেরুলো —
“ এডউইন! আপনি?”
নতমুখে দাঁড়িয়ে আছে এডউইন। গম্ভীর তার মুখাবয়ব। কোনরূপ সময় নষ্ট না করে তক্ষুনি গমগমে গলায় শুধালো,
“ আই হেভ আ রিকুয়েষ্ট ফর ইউ্য মনস্তার’স সিগনোরা।”
কপালের চামড়ায় দগদগে ভাঁজ স্পষ্ট হলো সপ্তদশীর। খানিক গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ কিসের রিকুয়েষ্ট?”
এপর্যায়ে খানিক সময় নিলো এডউইন। ঢোক গিলল পরপর। কন্ঠ খাদে নামিয়ে শুধায়,
“ আপনি তো জানেন সিগনোরা, মনস্তারের ঘাড়ে গভীর ক্ষত হয়েছে। তবে মনস্তার ট্রিটমেন্ট করাতে চাচ্ছে না। এক্ষেত্রে আমার মনে হয় আপনি একটু তার আশেপাশে থাকলে….. ”
“ ওয়েট আ মিনিট! কি বলতে চাচ্ছেন আপনি এডউইন? তার ঘাড়ে ক্ষত হয়েছে, সেটা তার ব্যাপার। এখানে আমি কেনো তার কাছে যাবো?”
সপ্তদশীর এমন টুক পড়া বাক্যে চোয়াল শক্ত হলো এডউইনের। গাম্ভীর্যতা বাড়ল মুখাবয়বে। সে কেমন শক্ত গলায় পরক্ষণেই শুধালো,
“ ভুলে যাবেন না সিগনোরা। মনস্টারের ঘাড়ের ক্ষতটা আপনার জন্যই হয়েছে। অন্তত কৃতজ্ঞতা স্বরূপেই নাহয় চলুন। একবার নিজে থেকে তাকে বলে দেখুন ট্রিটমেন্ট নেয়ার কথা। আমি শিওর সে আপনার কথা শুনবে।”
থমকায় মাহি। কন্ঠস্বরে পড়ল টান। এডউইন তো ভুল কিছু বলেনি। লোকটার ঘাড়ের ক্ষতের জন্য অবশ্যই সে দায়ী। এরূপ আত্মোপলব্ধিতে মাহি’র অপরাধবোধ বেড়ে গেল কয়েকগুণ। বুক ফুলিয়ে একখানা লম্বা নিশ্বাস টেনে আচমকা রাজী কন্ঠে আওড়াল,
“ ঠিক আছে!”
নিরব কামরা। তারচেয়েও বেশি নিরব মুগ্ধ! চোখদুটো বুঁজে রাখা তার। ঘাড় এলিয়ে রাখা ডিভানের কাঁধে। দাঁত খিঁচে সিগার ফুঁকছে রূঢ় মানব। এরইমধ্যে কক্ষের উম্মুক্ত দুয়ার পানে পা টিপেটিপে এসে দাঁড়াল সপ্তদশী! অস্থিরতায় অনবরত কচলাচ্ছে নিজ মোলায়েম হাতদুটো। ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি চাইবার প্রয়াসে যে-ই না মুখ খুলবে ওমনি সম্মুখ থেকে ভেসে আসে রূঢ় মানবের হিং স্র গর্জন!
“ ডোন্ট ইউ্য ডেয়ার বান্দীর মেয়ে! আমার মাথা এখনো ঠান্ডা হয়নি। তাই এক্ষুণি আমার দু-চোখের সামনে থেকে সরে যা। নয়তো আর ১২ দিনের ধার ধারবো না আমি। আজকেই তোর কপালে আমি নামক শনি লাগিয়ে ছাড়ব বলে দিলাম।”
আঁতকে উঠে মাহি। বিভ্রান্তিতে চোখ তুলে কপালে। রূঢ় মানব কি করে টের পেলো তার উপস্থিতি? সে-তো পা টিপেটিপে এসেছে। আওয়াজ হয়নি বিলকুল! তাহলে? সপ্তদশী শঙ্কিত। নিরবে ঢোক গিলে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আওড়াল,
“ আপনি আপনার ঘাড়ের ক্ষততে ট্রিটমেন্ট করতে দিচ্ছেন না কেনো? দেখছেন না কতটা ব্লাড লস হচ্ছে?”
এতক্ষণে ঘাড় তোলে মুগ্ধ। নিখুঁত বাদামী চোখদুটোর র*ক্তলাল দৃষ্টি হুট করেই তাক করল অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মাহি’র পানে। কপাল কুঁচকে খেঁক খেঁক করে আওড়াল,
“ তাতে তোর কী? আমি বাঁচলেই তোর কি? আর মর’লেই বা তোর কী? এখানে এসে এতো আলগা পিরিত দেখাতে হবে না বান্দীর মেয়ে। দূরে যাহ!”
গাল ফোলায় সপ্তদশী। বিরক্তিতে পা ছোটাতে চাইল চলে যাবার উদ্দেশ্যে। তবে পরক্ষণেই অভ্যন্তরীণ মানবিকতার কান্ডারী স্বভাব জেঁকে ধরল তাকে। যার রেশে মেয়েটা না চাইতেও পা রাখল কক্ষে। এদিকে পুচঁকে মানবীর ওমন ঔদ্ধত্য দেখে ভারী অবাক হলো মুগ্ধ। চোখদুটো ক্ষীণ করে নিয়ে গমগমে গলায় শুধালো,
“ কি রে! তুই ভেতরে ঢুকছিস কেনো?”
প্রতিত্তোর করেনি মাহি। নিজের সকল ভয়ডর এক অদৃশ্য পর্দার আড়ালে লুকিয়ে শক্ত করেছে মুখ। পায়ের গতি সচল রেখে বলে ওঠে,
“ উঠুন! দ্রুত ট্রিটমেন্ট করতে দিন ডাক্তারদের।”
এপর্যায়ে ঠোঁট ঠেলে বাঁকা হাসে মুগ্ধ। তার কর্ণকুহরে সপ্তদশীর বলা কোনো কথাই ঢোকেনি। উল্টো চোখদুটোয় নেমেছে আচ্ছন্নতা। সে-ই ভয়ানক আচ্ছন্নতা যার রেশে বরাবরের ন্যায় উম্মাদ হয় বেপরোয়া যুবক। দৃষ্টি তার থমকেছে রমণীর হরিণী আঁখিদ্বয়ে। ধীরে ধীরে তা গড়িয়ে নামছে, আটকাচ্ছে সরু নাকের লাল টুকটুকে ডগাটায়। তারপর আবারও গড়ালো রূঢ় মানবের নিগূঢ় দৃষ্টি। তা এবার থামল রমণীর তিরতির করে নড়তে থাকা গোলাপের পাপড়ির ন্যায় অধরযুগলের পানে। তৎক্ষনাৎ অচল হলো নির্দয় মাফিয়া বিস্টের মস্তিষ্ক। অজান্তেই দ্রুত হলো হৃৎস্পন্দন! কন্ঠায় নেমেছে তীব্র খরা। একটুখানি সিক্ত হবার আশায় চাতকের ন্যায় উদগ্রীব মুগ্ধ। শুষ্ক অধরজোড়া জিভ ঠেলে ভিজিয়ে নিলো আলগোছে। ওদিকে মাহি এখনো বলেই যাচ্ছে। তবে এরইমধ্যে রূঢ় মানব আচমকা উঠে দাঁড়াল বসা ছেড়ে। তক্ষুনি থেমে গেল মাহি। মুখাবয়ব থেকে এতক্ষণের গম্ভীর ভাবখানা তার মুহুর্তেই সরে গেল যেন। সর্বাঙ্গে নামল ভয়ের ছাপ। নির্দয় মানবকে সম্মুখে এগোতে দেখে সে-ই ভয় যেন বেড়ে গেল আরও কয়েকগুণ। তৎক্ষনাৎ উল্টো ঘুরে চলে যেতে উদ্যোত মাহি। ক্ষুদ্র কদমজোড়া একটুখানি সামনে আগাতেই আচমকা পেছন থেকে একজোড়া শক্তপোক্ত হাত এসে আঁকড়ে ধরে তার নরম বাঁকানো কটিদেশ! মুহুর্তেই পায়ের গতিতে রুখ পরল মানবীর। কাঁপতে লাগল সর্বাঙ্গ। মুগ্ধ হাসল মৃদু! এক হেঁচকা টানে সপ্তদশীকে টেনে এনে চেপে ধরল নিজ রুক্ষ বক্ষভাঁজের সনে। ঘাড়টা সামান্য ঝুঁকিয়ে এনে মুখ রাখল মেয়েটার কানের কাছে। অতঃপর হিসহিসিয়ে আওড়াল,
“ বলেছিলাম না? কাছে না আসতে! বারণ করা স্বত্বেও এলি কেনো বান্দীর মেয়ে? এবার তো অনেককিছু করে বসব আমি! আমায় থামাবে কে শুনি?”
শুকনো ঢোক গিলে মাহি। কাপত্রয়ী কন্ঠে মিনমিনে স্বরে আওড়ায়,
“ ইয়ে মানে…আমি আসলে…ইচ্ছে করে!”
সপ্তদশীর বাক এলোমেলো। তা শুনেও না শোনার ভান ধরল মুগ্ধ। দক্ষ হাতের কৌশলে তক্ষুনি নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করালো মেয়েটাকে। মাহি হতভম্ব! পরিস্থিতি সামলে ওঠার পূর্বেই আচমকা তার চিবুকে রুক্ষ আঙুল ঠেকায় মুগ্ধ। আঙুলের জোরে মাহি’র ক্ষুদ্র পেলব মুখখানা সামান্য উঁচিয়ে, কন্ঠে ভারী দুষ্ট ছাপ ফুটিয়ে শুধালো,
“ ওহ ফা’ক অফ! ওসব আসল-নকলের হিসেব নাহয় পরে হবে হটি! বাট নাউ…. কাম, লেট’স ডু সামথিং হটা….র!”
ঘৃণায় নাকমুখ কুঁচকে গেল সপ্তদশীর। কন্ঠে বাড়ল তেজ। দু’হাতে তক্ষুনি রূঢ় মানবের বুক ঠেলে ঝাঁঝাল কন্ঠে বলে উঠল,
“ সরুন অসভ্য লোক! ছাড়ুন আমায়।”
শুনল না মুগ্ধ। উল্টো কপট ভাব ধরল নাটকীয়। চোখদুটোয় বিভ্রম লেপ্টে, মুখ নামিয়ে আনলো সামান্য। অতঃপর রয়েসয়ে বৃদ্ধা আঙুলখানা আলতো করে ছুঁয়ে দিলো রমণীর তিরতির করে কাঁপতে থাকা ওষ্ঠপুটে। কন্ঠে দুষ্টুমির প্রলেপ লেপে আওড়ায়,
“ হেই সিগনোরা! লুক — ইউ্যর লিপস আর টকিং।”
ভড়কায় মাহি! ঠোঁট আবার কবে থেকে কথা বলে? বোকা মানবী বোকার ন্যায় অবোধ্যের ছাপ ফোটালো নিজ মুখভঙ্গিতে। সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ মানে? কিসব আবোলতাবোল কথা! ঠোঁট আবার কথা বলে না-কি?”
তৎক্ষনাৎ জিভের ডগায় গাল ঠেললো মুগ্ধ। খানিকক্ষণ নিরবে হেসে পরক্ষণেই ফের আওড়াল,
“ হুম! বলছে তো। এই যে! খেয়াল করে শোন। তোর ঠোঁটদুটো কেমন ইয়েগারলি ডাকছে আমায়! বারবার চিৎকার করে বলছে — কাম মিঃ বিস্ট! প্লিজ বাইট আস।”
লজ্জায় তক্ষুনি রাঙা হলো সপ্তদশীর ক্ষুদ্র মুখ। সহসা মুখ নামিয়ে নিলো নিচে। দাঁতে দাঁত চেপে মুখ ঝামটি দিয়ে বলে ওঠে,
“ যত্তসব ফাউল কথাবার্তা বলবেন না নির্লজ্জ লোক! আপনি আম………”
বাকিটা শেষ করবার ফুরসত দেয়নি রূঢ় মানব। তার আগেই নিজ উদ্যোগে আঙুল ঢুকিয়েছে সপ্তদশীর নরম চুলের গোছায়। সেথায় মৃদু চাপ বসিয়ে মেয়েটার ক্ষুদ্র মুখখানা ফের উঁচিয়ে তুলে, সদ্যোগে নিজ রুক্ষ অধরযুগল দিয়ে আঁকড়ে ধরেছে মাহি’র তিরতির করে কাঁপতে থাকা নরম ওষ্ঠপুট! চোখের পলকে ঘটে যাওয়া সম্পূর্ণ ঘটনায় হতভম্ব মাহি! মানবের অবাধ স্পর্শে কাঁপছে তার ক্ষুদ্র তনু। অথচ রূঢ় মানবের সেদিকে হুঁশ নেই। সে আজ উন্মত্ত! বেপরোয়ার ন্যায় টানছে রমণীর পাতলা অধরযুগল। সে-কি আগ্রাসী ভাব তার। যেন আজন্মের তৃষ্ণা মেটাতে ব্যস্ত সে। মাহি কাঁপছে! দু’হাতে যতটা সম্ভব দূরে ঠেলে দিতে চাইছে লোকটাকে। তবে বালাইষাট! পাহাড়সম মানুষটা নড়লও না একপা। মাহি এবার ডুকরে উঠে। চোখজোড়া নিরবে অশ্রু ঝরাতেই রূঢ় মানব তক্ষুনি চোখ খুলে চাইল। চরম বিরক্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিলো মানবীর ওষ্ঠপুট। পরক্ষণে হুট করেই শক্ত হাতের অমসৃণ থাবায় আঁকড়ে ধরল মাহি’র নরম চোয়াল। চোখদুটোতে আগুন লেপ্টে, চোয়াল শক্ত করে হিসহিসিয়ে আওড়াল,
“ খবরদার বান্দীর মেয়ে! আজকে যা কিছু হয়ে যাক, তুই যদি জ্ঞান হারিয়েছিস, দ্যান আ’ই সয়্যার — আমি তোকে নিজ হাতে জ*বাই করব। মাইন্ড ইট!”
ভয়ে তটস্থ মাহি! কেঁপে কেঁপে উঠছে বারবার। এরইমধ্যে মুগ্ধ ফের বিকট শব্দে দিলো এক ধমক!
“ এ্যাই দেড়ব্যাটারী! কান্না থামা।”
সহসাই নিজের উগড়ে পড়া কান্নাগুলো গলা টিপে থামিয়ে দেয় মাহি। বুকের ভেতর জমে থাকা হাহাকারকে কোনোমতে সংবরণ করে দম খিঁচে দাঁড়িয়ে রইল বোকা মানবী! অপরদিকে রূঢ় মানব দৃষ্টি ক্রমেই আরও দুর্বোধ্য বেপরোয়া হলো যেন। এক পা এগিয়ে এসে তক্ষুনি নিঃশব্দে দু’হাতে আবদ্ধ করল সপ্তদশীর কোমল কটিদেশ। পরমুহূর্তেই এক অনায়াস টানে রমণীর তুলোর ন্যায় হালকা দেহখানিকে কোলে তুলে নিল মাফিয়া বিস্ট। এহেন আকস্মিক ঘটনায় আতঙ্কে কেঁপে উঠে মাহি’র ক্ষুদ্র তনু! ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাবার ভয়ে বেভুলা মানবী, বোধবুদ্ধি হারিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দু’পা দিয়ে জড়িয়ে ধরল বলিষ্ঠ পুরুষের ভি-শেইপ, মেদহীন সুঠাম কটিদেশ। মোলায়েম হাতদুটো তার, নিজ অজান্তেই আঁকড়ে ধরল রূঢ় মানবের প্রশস্ত কাঁধ।
এদিকে মানবীর এহেন কান্ড দেখে নির্দয় মানবের অধর কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক তির্যক পরিতৃপ্ত হাসি। দু’হাতের দৃঢ় বন্ধনে মাহিকে নিজের আরও সন্নিকটে টেনে এনে, সে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল মেয়েটার কাপত্রয়ী মুখশ্রীর দিকে। ভয়ার্ত চোখদুটোতে নিজের গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, যুবক আচমকা চোখ টিপে বসল। মাহি হতবাক! কুঞ্চিত দৃষ্টে মানবের পানে তাকাতেই ফের তার নরম তুলতুলে অধরজোড়ার ওপর আক্রমণ বসল মুগ্ধের রুক্ষ ওষ্ঠপুটের। আগ্রাসী গভীর চুম্বনে লিপ্ত হয়েছে রূঢ় মানব। আবেশে বুঁজেছে দুচোখ। মেয়েটাকে কোলে নিয়ে সম্মুখ দেয়ালের পানে এগোচ্ছে রূঢ় মানব। বেপরোয়া উন্মত্তায় মানবীর মসৃণ পিঠখানা আচমকা ঠেসে ধরল কাঁচের স্বচ্ছ দেয়ালে। তার রুক্ষ হাতের অবাধ্য স্পর্শ ধীরে ধীরে ছুঁয়ে দিচ্ছে রমণীর মসৃণ কাঁধ। মাহি’র অস্থিরতা বাড়ছে ক্রমশ। না চাইতেও ক্ষুদ্র বদনে নামছে পরিবর্তন। কুপোকাত হচ্ছে রূঢ় মানবের প্রতিটি আগ্রাসী স্পর্শে।
মুগ্ধ ব্যস্ত! গভীর চুম্বনে মত্ত থেকে আচমকা ভীষণ রূঢ়তার সঙ্গে একটানে মানবীর পরনের জামাটার কাঁধের অংশ ছিঁড়ে ফেলে। মাহি সম্বিত ফিরল এবার। তৎক্ষনাৎ মোচড়ে ওঠে তার সর্বাঙ্গ! অনিষ্টের ভয়ে ফোঁপানোর শব্দ বাড়লেও থামছে না মুগ্ধ। ধীরে ধীরে মেয়েটার অধর ছেড়ে দিয়ে আলগোছে মুখ ডোবালো মানবীর রাজহংসীর ন্যায় মসৃণ কন্ঠায়! মুহুর্তেই শীরঁদাড়া বেয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল মাহি’র। নিঃশ্বাস হলো ভারী! রূঢ় মানবের ধারালো দাঁতের রুক্ষ স্পর্শে কুপোকাত মেয়েটার কন্ঠা। বোধহয় ছিঁড়ে যাচ্ছে চামড়া! ব্যথায় কুঁচকে যাচ্ছে মাহি’র চোখমুখ! কান্নার বেগ বাড়ছে বৈ কমছে না তার।
এদিকে উদ্বিগ্ন এডউইন। মনস্তারের চিন্তায় হাসফাস করতে করতে আচমকা এসে দাঁড়াল রূঢ় মানবের কক্ষের দুয়ারে। আনমনে কিছু একটা বলতে যাবার উদ্দেশ্যে দৃষ্টি উঁচাতেই দু কপোত-কপোতীকে ওমন বেগতিক মুহুর্তে লিপ্ত দেখে হোঁচট খেল এডউইন। দৃষ্টি হলো বিস্ফোরিত! তৎক্ষনাৎ জিভে দাঁত বসিয়ে সরে গেল দুয়ার হতে। দেয়ালের ওপাশে পিঠ ঠেকিয়ে হতবুদ্ধির ন্যায় অস্ফুট কন্ঠে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“ হলি কাউ! আমি তো আপনাকে স্রেফ মনস্তারকে কনভিন্স করতে পাঠিয়েছিলাম সিগনোরা। তবে কনভিন্স যে এভাবেই করবেন — তা তো আমার ধারণাতেও ছিল না।”
মানবীর মসৃণ কন্ঠায় এখনো ডুবে আছে রূঢ় মানবের মুখ! সেথায় আর কোনো অংশে কামড় বসাতে বাকি রাখেনি তার রুক্ষ ধারালো দাঁত। সপ্তদশী এবার কেবল গোঙাচ্ছে! কাঁদতে কাঁদতে ভেঙেছে কন্ঠস্বর। দূর্বল হাতদুটো তার ধীরে ধীরে উঠে এসেছে মানবের প্রশস্ত কাঁধে। গড়াতে গড়াতে আচমকা তাদের ঠাঁই হলো মুগ্ধের ঘাড়ের পিঠে। এরইমধ্যে মুগ্ধ করে বসল আরেক কান্ড! বেপরোয়ার ন্যায় মেয়েটার ঘাড়ের কাছে আচমকা রূঢ়তার সঙ্গে বসিয়ে দিলো নিজ দাঁত। ওমনি ব্যথায় আঁতকে উঠে মাহি। দিনদুনিয়া ভুলে চিৎকার দিয়ে ওঠে মানবী। ভুলবশত আচানক খামচে ধরে মানবের ঘাড়। সহসা ঘাড়ের ব্যথায় দাঁত খিঁচে নেয় মুগ্ধ। তড়িঘড়ি করে মাহি’র কন্ঠা হতে মুখ তুলে একহাতে চেপে ধরে নিজ ঘাড়। মুহুর্তেই হাতে পরশ পায় তরল কিছুর! অর্থাৎ তার দগদগে ক্ষত হতে ফের অবলীলায় গড়াচ্ছে লহু। ব্যথায় মুগ্ধ কেমন চিড়বিড়িয়ে ওঠে,
“ ইউ্য বি’চ! হোয়াট দ্য ফা’ক ইউ হেভ ডান? ওহ গড!”
বলতে বলতেই এক ঝটকায় মেয়েটাকে কোল থেকে নামিয়ে দেয় মুগ্ধ। কুঁচকান মুখে দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে ঘাড়ের ব্যথাটুকু। এদিকে মাহি হেঁচকি তুলছে অনবরত। দু’হাতে আঁকড়ে রেখেছে নিজ কন্ঠা। রূঢ় মানব কেমন চিড়বিড় করতে করতে তক্ষুনি বেডের কাছে এগিয়ে এসে দাঁড়াল। সেথায় অবহেলায় পড়ে থাকা ওভারকোটটা তুলে এনে ছুঁড়ে দিলো মাহি’র দিকে। বজ্র কন্ঠে আওড়াল,
“ গায়ে জড়া এটা!”
ক্রন্দনরত রমণী। সঙ্গে সঙ্গে ক্যাচ ধরেনি ওভারকোটটা। ফলে ওভারকোটের স্থান হয়েছে তার পায়ের কাছে। হেঁচকি তুলতে তুলতে সময় নিয়ে কোটটা তুলে গায়ে জড়ায় মাহি। তা আড়দৃষ্টে পরোখ করে কঠিন গলায় হুংকার ছুঁড়ে মুগ্ধ!
“ এডউইন!”
তড়িঘড়ি করে ছুটে আসে এডউইন। হতচকিত দৃষ্টে রূঢ় মানবের পানে তাকাতেই আঁতকে উঠে সে। মুগ্ধ একহাতে চেপে রেখেছে নিজ ঘাড়। অবলীলায় সেখান থেকে গড়াচ্ছে লহু। চুইয়ে পরছে কাঁধ বেয়ে। মানবের চোখেমুখে ব্যথাতুর ছাপ স্পষ্ট! মুগ্ধ তখন ফের গর্জে উঠে বলে,
“ কল দ্য ডক্টর’স ফাস্ট!”
সাধ্যমত ওপর নিচ মাথা ঝাঁকায় এডউইন। তক্ষুনি ছুটে যায় হুকুম তামিলের উদ্দেশ্য। তার প্রস্থান ঘটতেই মাহি’র পানে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে মুগ্ধ। চোয়ালের পেশি টানটান করে কটমট কন্ঠে চিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“ জানোয়ারের বাচ্চা একটা! সবকিছুতে কুফা না লাগালে হয় না ওর। আমার জীবন যৌবন নষ্ট করার জন্য ওঁৎ পেতে থাকে বেয়াদবটায়! যেদিন সুবিধামত ধরব না, সেদিন একেবারে আধমরা করে ফেলব বান্দীর মেয়ে তোকে!”
কর্মবিরতিতে ৫জন ডক্টর! মাত্রই শেষ করলেন রূঢ় মানবের ৪টে স্টিচেস। ঘাড়ের পিঠে মোটা একখানা ব্যান্ডেজ বসেছে মুগ্ধের। বলা হয়েছে আরাম করতে! অথচ রূঢ় মানব কি আর তা শোনে? ডাক্তারগণ বেরুতেই কাউচে বসে থাকা মাহি উদ্যোত হলো চলে যেতে। গুনে গুনে ২-৩ কদম সম্মুখে এগোতেই আচানক ঘরের দরজাটা আঁটকে গেল পুরোপুরি। মাহি থমকায়। তক্ষুনি নজর ঘুরিয়ে তাকায় মুগ্ধের পানে। সুদর্শন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। একহাঁটু উঁচিয়ে রাখা তার, সেথায় ভর দিয়ে রাখা ডানহাত। বাহাতের তর্জনী উঁচিয়ে মেয়েটাকে ইশারায় কাছে ডাকে মুগ্ধ। মাহি যেতে নারাজ। দু’ধারে মাথা নাড়িয়ে পেছায় কদম। মুগ্ধ তৎক্ষনাৎ অধরে দাঁত বসালো। চোয়াল শক্ত করে ধমকে বলল,
“ তুই আসবি? না-কি আমি কাছে এসে তোর ঘাড় ধরে টেনে আনব কোনটা?”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও পা বাড়ায় মাহি। নতমুখে বিছানার ধারে এগিয়ে এসে দাঁড়াতেই আচানক কব্জিসন্ধিতে টান পড়ল তার। দোদুল্যমান টানে পরমুহূর্তেই নিজেকে আবিষ্কার করল মখমলি বিছানার ডুবন্ত কোলে। তড়াক আঁতকে উঠে মাহি। উঠে যাবার প্রয়াস চালাতেই আবদ্ধ হয় রূঢ় মানবের দৃঢ় বাহুবন্ধনে। তক্ষুনি মেজাজ চটল মেয়েটার। মুখ ঝামটি দিয়ে বলে উঠল,
“ ছাড়ুন আমায়।”
শুনেনি মুগ্ধ! উল্টো বাহুবন্ধনী জোর বাড়িয়ে মেয়েটাকে টেনে আনল বড্ড কাছে। আলতো করে মানবীর ক্ষুদ্র মাথাটা সযত্নে তুলে রাখল নরম বালিশের কোলে। অতঃপর কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরল দু’হাতে। এদিকে তার এহেন উৎপটাং কর্মকাণ্ডে হতভম্ব হতে গিয়েও হয়নি মাহি। কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই রূঢ় মানবের বলিষ্ঠ বড়সড় পা এসে গা জড়িয়ে ধরে তার। তক্ষুনি হাসফাস করতে করতে চেঁচিয়ে ওঠে মাহি!
“ ইয়া আল্লাহ! এটা পা নাকি আস্ত বটগাছ? পা সরান আপনার! আল্লাহ গো! আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।”
থতমত খেয়ে বসল মুগ্ধ! ত্বরিত ঘাড় বাকিয়ে কুঞ্চিত দৃষ্টিতে তাকাল মেয়েটার পানে। পরক্ষণে গোমড়া মুখে সরিয়ে নিলো নিজ পা। স্বস্তিতে এতক্ষণে বুক ফুলিয়ে নিশ্বাস টানল মাহি। হাঁপাতে হাঁপাতে চোখদুটো বুঁজে নিতেই ফের বুকের ওপর অনুভুব করল এক পাহাড়সম ভার! তড়াক চোখ কুঁচকে কাশতে লাগল রমণী। কাশতে কাশতে আওড়াল,
“ আল্লাহ! আবার কি এটা?”
এবারে চোয়াল শক্ত করল মুগ্ধ! জিভের ডগা বেশক’টা গালি এলেও সেগুলো আলগোছে হজম করে নিলো রূঢ় মানব। শক্ত কন্ঠে শুধালো,
“ তোর সমস্যা কি বান্দীর মেয়ে? একটা সামান্য হাতের ভারও সহ্য হচ্ছে না তোর?”
তৎক্ষনাৎ চোখ খোলে মাহি। ঘাড় বাকিয়ে ঝাঁঝাল কন্ঠে বলে ওঠে,
“ আপনার ঐগুলো হাত? না-কি রেললাইনের মোটা মোটা লোহা? এতো ভারী কেনো? আবার বলেন ভার সহ্য করতে পারিনা। বলি আমাকে কি আপনার মতো দৈত্য মনে হয়?”
আকাশ ভেঙে পড়ল মুগ্ধ! মুখাবয়বে লেপ্টে গেল হতভম্বতার ছাপ। হতভম্ব কন্ঠ ফুঁড়ে অস্ফুটে বেরুলো,
“ আমি দৈত্য?”
মুখ ভেংচি কেটে বসে মাহি। তিতিবিরক্ত কন্ঠে বলে,
“ তা নয়তো কী? এমন বড়সড় মানুষদের তো দৈত্যই বলে তা-ই না? কি উঁচু মাথা। তাকাতে গেলে ঘাড় ভেঙে যায়!”
মানবীর নিষ্পাপ স্বীকারোক্তিতে আচমকা ঠোঁট পিষে হাসল মুগ্ধ। আলগােছে হাত উঠিয়ে আনলো মেয়েটার মাথার ওপর। সেথায় আলতো করে বিলি কেটে দিতে দিতে শুধালো,
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫০
“ ঘুমা!”
লোকটার সাথে একই বিছানায় ঘুমাতে নারাজ মাহি। নাক-মুখ কুঁচকে বলে ওঠে,
“ আমি ঘুমাব না!”
সহসা কপাল গোছালো মুগ্ধ। পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে দুষ্ট হাসির রেশ টেনে মেয়েটার উদরে ছোঁয়াল হাত। কন্ঠে শ্লেষাত্মক ভাব নিয়ে শুধালো,
“ ওকে ফাইন বেইব! তাহলে চল, দু’জনে মিলে হ্যাংকি-প্যাংকি করি। তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিই ঘরের! তারপর ক্লান্ত হয়ে গেলে নাহয় একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ব।ওকে?”
