মেজর কারদার পর্ব ২৪
ফিনারা ঝুমুর
আকাশের বুক চিরে আজ একফালি রুপোলী অর্ধচন্দ্র উদিত হয়েছে। আষাঢ়ের সেই ঘন কালো মেঘের দল আজ যেন কিছুটা ক্লান্ত, তাই গগনে মেঘের ভেলাও আজ নামমাত্র। নিকষ কালো তিমিরে ঢাকা নিঝুম ছাদের এক কোণে রেলিং ধরে একা দাঁড়িয়ে আছে শীর্ষ । ওনার ডান হাতের আঙুলের ফাঁকে জ্বলছে তীব্র এক টুকরো নিকোটিন, যা থেকে নির্গত ধোঁয়া ছাদের শীতল বাতাসে কুণ্ডলী পাকিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে।
“মেজর সাহেব।”
হুট করেই সেই নিস্তব্ধতা চিরে পেছন থেকে ভেসে এলো নিজের সেই পরম প্রিয় রমণীর সুমিষ্ট হাঁক। শব্দটা কান অবধি পৌঁছানো মাত্রই মেজরের সেই পাথুরে দৃষ্টি এক নিমেষে পরম নমনীয় হয়ে উঠল। তপ্ত হৃদয়ের কোণে যেন এক লহমায় প্রশান্তির হাজারো ঝঙ্কার বেজে উঠল। ও নিজের গলার স্বর সর্বোচ্চ কোমল করে শুধাল,
“কিছু বলবে, প্রিয়া?”
শীর্ষর পেছন দিক হতে বিড়াল পায়ে ধীরলয়ে এগিয়ে আসে মেঘ। গায়ের গোল জামাটা রাতের মৃদু বাতাসে আলতো করে দুলছে। মেঘ নিজের বুকের ভেতরের সমস্ত জড়তা কাটিয়ে অত্যন্ত মিষ্টি অথচ চনমনে গলায় বলে উঠল,
“আমার অতীত আর আমার ব্যাপারে আপনাকে আজ কিছু জরুরি কথা জানানোর ছিল, মেজর সাহেব। আর— আমি যদি খুব বেশি ভুল না করে থাকি, তবে আমার প্রতি আপনি দিন দিন সামান্য হলেও বড্ড বেশি দুর্বল হয়ে পড়ছেন!”
নিজের সেই সদ্য আঠারোয় পা রাখা ছোট্ট রমণীর মুখে ওমন প্রগলভ আর সত্য স্বীকারোক্তি শ্রবণ করে শীর্ষ নিজের হাতের সিগারেটটা এক ঝটকায় ছাদের মেঝেতে ফেলে বুট জুতো দিয়ে পিষে দিল। তারপর সম্পূর্ণ ঘুরে দাঁড়াল মেঘের মুখোমুখি।
সে নিজের দীর্ঘ কায়াটা সামান্য একটু নিচু করল, যাতে সতেরো-আঠারোর ওই ছোট্ট মেয়েটার চোখের সমান্তরালে নিজের চোখ দুটোকে রাখা যায়। শীর্ষ নিজের দু-হাত কোমরে ঠেকিয়ে, মেঘের সেই মায়াবী হরিণী অক্ষিতে নিজের গ্রে অক্ষি যুগল জোরালোভাবে ঠেকাল। মেয়েটার চোখের সেই গভীর মোহনীয়তার অতল তরে ডুবতে ডুবতে, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে কড়া ও পুরুষালী হাসি ফুটিয়ে ফের শুধাল,
“বলো মেঘালয়া, তোমার নিজের ডায়েরির এমন কী গোপন কথা আজ আমায় শোনাবে? কী এমন অতীত কথা, যা এই মেজর শীর্ষ কারদারের জানাটা আজ এতটা জরুরি, হ্যাঁ?”
মেঘ নিজের কম্পিত ওষ্ঠাধর জোড়া শক্ত করে চেপে ধরল।সে নিজের টলটলে চোখ দুটো সোজা শীর্ষর ওই প্রখর গ্রে চোখের ওপর স্থির রেখে এক বুক কাঁপানো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বড্ড নিষ্প্রাণ গলায় উচ্চারণ করল,
“আমি এক জারজ সন্তান, মেজর সাহেব।”
মেঘের মুখ থেকে এক ফোঁটা হাহাকারের মতো উচ্চারিত এই একটা একটি শব্দ ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেজর শীর্ষ কারদারের কানে যেন ফুটন্ত তরল তৈল ঢালার মতো তীব্র যন্ত্রণা দিল! এক লহমায় ওনার সেই ঝুঁকিয়ে রাখা দীর্ঘ দেহটা একদম ধনুকের মতো সোজা হয়ে গেল। মেজরের সেই তপ্ত, প্রখর গ্রে দৃষ্টি জোড়া মুহূর্তের মধ্যে ছটফট করে উঠে চরম বিস্ময় আর একরাশ প্রশ্নবিদ্ধ চাহনিতে মেলে ধরল মেঘের নিষ্পাপ মুখশ্রীকে। শীর্ষ নিজের ভেতরের প্রবল ধাক্কাটা সামলে নিয়ে প্রায় ধমকের সুরে শুধাল,
“কী যা তা বলছ এই রাতের বেলা, মেঘালয়া? এসব আজেবাজে নোংরা কথা তোমায় কে শিখিয়েছে?”
“অবিশ্বাস করলেই সত্য কখনও মিথ্যে হয় না। চিরন্তন সত্য এটাই -“আমি এক জারজ সন্তান।” কে আমার বাবা, কার রক্ত আমার দেহে বইছে তার কিছুই আমি জানি না।”
শীর্ষ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, আর মেঘ একনাগাড়ে বলে চলল,
“মোসাম্মত শারমিন সুলতানা ছিলেন আমার আসল জন্মদাত্রী, আমার গর্ভধারিণী মা। যাকে আমি জন্মের পর থেকে আজ অবধি কোনোদিন নিজের এই দু-চোখে স্বচক্ষে দেখিনি। একটা সন্তানের কাছে তার মায়ের গায়ের বা আঁচলের সুবাস কেমন হয়, সে সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণাও নেই আমার। আবু সাত্তার আমার আসল জন্মদাতা বাবা নন, নাই বা আলেয়া বানু আমার আসল জন্মদাত্রী মা। তারা সম্পর্কে আসলে আমার আপন মামা আর মামি! ওই শারমিন সুলতানার বড় ভাই হলেন আমার আবু সাত্তার মাস্টার মামা।তার নিজ সন্তান তিন জন, আমি নই তাদের একজন।
মেঘ এক পলক ছাদের ওই একফালি চাঁদের দিকে তাকিয়ে একটা ম্লান হাসি হাসল। তারপর আবার শীর্ষর দিকে চেয়ে বলল,
“আমার সেই জন্মদাত্রী মা পেশায় ছিলেন একজন সাধারণ নার্স। ছিলেন একজন সাধারণ নার্স। আমার জন্মদাতা পিতা নাকি ছিলেন একজন আর্মি অফিসার। কোনো এক অজ্ঞাত আততায়ীদের হাতে মারাত্মকভাবে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি নাকি মুমূর্ষু অবস্থায় সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। আর সে হাসপাতালেরই একজন ডিউটি নার্স ছিলেন ওই শারমিন সুলতানা। ওই অচল লোকটিকে রাতদিন সেবা করতে করতে সে কখন যে নিজের অজান্তেই ওনার মায়ার জালে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন, আর সাথে জড়িয়েছিলেন ওই লোকটিকেও। দুজনের মাঝে প্রণয়ের আগমন ঘটে। ধীরে ধীরে তা এমন এক রূপ নেয়, যা ফসল এ আমি।”
মেঘের গলার স্বর ক্রমশ বুজে আসছিল। ছাদের নিকষ অন্ধকারে শীর্ষর সেই প্রখর, থমথমে মুখশ্রী দেখে ও ভেতরে ভেতরে বড্ড বেশি ভয় পেয়ে গেল। ওর বুকের বাম পাশটা কেমন যেন তীব্র যন্ত্রণায় চিনচিন করে উঠল। এই প্রগাঢ় নীরবতা সহ্য করতে না পেরে ওর মনে হতে লাগল ও বুঝি খুব মূল্যবান কিছু একটা চিরতরে হারাতে চলেছে! সে চোখের কোণের নোনা জলটুকু শাড়ির আঁচলে মুছে আবারও কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে বলতে লাগল,
“আমি শারমিন সুলতানার গর্ভে আসার পর ওই লোকটি তাকে ময়লার মতো ছুড়ে ফেলে অন্যত্র পথ ধরে। আমায় নাকি গর্ভে মেরে ফেলতে চেয়েছিলো, পারে ওই দুটো মানুষের জন্য। যারা আমায় আজ মেয়ের মতো আগলে রেখেছে। আমার জন্মের সাতদিনের মাথায় হাসপাতালের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে মৃত্যুকে বেছে নিয়ে পালায় ওই মহিলা। আমার জন্মদাত্রী, ঘৃণ্য এক পাত্রী।”
“এরপর? আর কী বলতে চাও তুমি?”
শীর্ষর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা সেই বরফশীতল, চরম হিম কণ্ঠস্বরটা শুনে মেঘ যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই যেন জমে কাঠ হয়ে গেল। ওর মুখের বাকি কথাগুলো গলার মাঝপথে এসে সম্পূর্ণ আটকে গেল। মেজরের এমন পাথুরে ও ভাবলেশহীন রূপ দেখে ওর দু-চোখ বেয়ে অজান্তেই আবারও অশ্রুর ধারা নেমে এল। ও নিজের অবাধ্য বুকটাকে এক হাতে চেপে ধরে কোনোমতে ভাঙা গলায় বলল,
“এই পৃথিবীতে পুরুষ জাতিটাকে আমি সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি, মেজর সাহেব। যার প্রথম এবং প্রধান কারণ আমার ওই জন্মদাতা লম্পট লোকটা। আর দ্বিতীয় মস্ত বড় কারণ হলো আমার একমাত্র বড় বোন ঝিলির ওই বীভৎস মৃত্যু!”
মেঘ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য চোখে ছাদের রেলিংটা খামচে ধরল,
“আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা শেষ করে আমরা সবাই মিলে চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম বেড়ানোর জন্য। কিন্তু সেখান থেকে বাড়ি ফিরে এসে আচমকা শুনতে পাই ঝিলি আপু নাকি তার এক প্রেমিকের হাত ধরে ঘর ছেড়ে পালিয়েছে। ও তখন উচ্চমাধ্যমিকের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ত। আদরের মেয়ের ওমন কলঙ্কিত পালানোর খবর পেয়ে সাত্তার বাবা ভেতরে ভেতরে একদম ভেঙে চুরমার হয়ে যান। লোকসমাজে মুখ দেখাতে না পেরে ও সঙ্গে সঙ্গেই ঝিলিকে ত্যাজ্যপুত্র করে দেন। নোমান ভাই, অভ্র ভাইয়া কেউ সেদিন বাবার ওই কঠিন সিদ্ধান্তের বিপক্ষে একটা কথাও বলেনি। এমনকি– মা নিজেও না।”
মেঘের চোখ দুটোয় তখন অতীতে ঘটে যাওয়া সেই নারকীয় দৃশ্যের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠছে। ও কাঁপতে কাঁপতে বলতে লাগল,
“ওর ঘর ছাড়ার ঠিক দীর্ঘ তিন বছর পর–এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে ঝিলিকে আমরা খুঁজে পাই আমাদের নিজেদেরই বাসার পেছনের এক পরিত্যক্ত ডোবার পাশে। এক্কেবারে সম্পূর্ণ উলঙ্গ, বিবস্ত্র অবস্থায়! সেদিন ভোরে বাবা আর আমি রোজকার মতো একসাথে প্রাতঃভ্রমণে বের হয়েছিলাম, আর তখনই ঝিলি আপুর ওই ক্ষতবিক্ষত দেহটা আমরা উদ্ধার করি। লোকলজ্জার ভয়ে সমাজের সবার আড়ালে রেখে গোপনে ঝিলি আপুর মেডিকেল ট্রিটমেন্ট বা চিকিৎসা চালানো হয়েছিল। সেদিন আমাদের চেনা ডাক্তারবাবু খুব আক্ষেপ করে বাবাকে বলেছিলেন ‘ঝিলি বড্ড মারাত্মকভাবে গ্যাং রেইপ বা গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। ওর শরীরের ভেতরের আর বাইরের অবস্থা বড্ড বেশি সংকীর্ণ, যেকোনো সময় মেয়েটা মারা যেতে পারে।’ জানেন মেজর সাহেব—”
মেঘ মাথা তুলে তাকায় শীর্ষর গম্ভীর আননে। মেঘের থেকে ওনার প্রখর দৃষ্টি এখন বহু দূরে সরে গেছে; শূন্য চোখে চেয়ে আছেন ওই দূর তিমির গগনে। শীর্ষর এই চরম নীরবতা আর উদাসীনতা দেখে মেঘের মনের এক কোণে তীব্র হাহাকার জেগে উঠল। সে মনে মনে এক চিলতে হাসল বড্ড বিষাদ আর ব্যথার হাসি!
মেজর সাহেবও তবে আর পাঁচটা পুরুষের মতোই ওর এই কলঙ্কিত পরিচয় আর নোংরা অতীতের গল্প শুনে দূরে সরে যাচ্ছেন? মেঘ নিজের বুকের ক্ষতটা চেপে ধরে আবারও বলতে লাগল,
“আমার জীবনের সেই অভিশপ্ত দিনগুলোয় প্রথমবারের মতো আমি বাবা রূপের ওই কঠোর মামার চোখে শ্রাবণের ধারার মতো অশ্রু ঝরতে দেখেছিলাম। মা সেদিন আমার হাত দুটো খামচে ধরে পাগলের মতো বুক ফাটানো চিৎকার করে কেঁদেছিল। হাসপাতালে টানা চিকিৎসার পর প্রায় তিন মাস পর ঝিলি আপু শারীরিক ভাবে কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিল বটে, কিন্তু মানসিকভাবে ও নিজেকে আর কোনোদিন ঠিক রাখতে পারেনি। ওর পবিত্র আত্মাটা যে আগেই মরে গিয়েছিল! ও বারবার নিজেকে শেষ করে দেওয়ার জন্য ছটফট করত, সারাদিন ঘরের দরজা বন্ধ করে এক অন্ধকার কোণে পড়ে থাকত। এভাবেই নরক যন্ত্রণার মতো আরও দিন পনেরো পার হয়ে যায়। তারপর একদিন—”
কথাটা বলতে বলতে মেঘের চোখের সামনে নয় বছর আগের সেই শিউরে ওঠা দুপুরটা জীবন্ত হয়ে উঠল কয়েক বছর পূর্বেই ক্ষত-বিক্ষত স্মৃতি
“ঝিলি! এই ঝিলি আপু, দরজা খোল! আম্মা ও আম্মা! ঝিলি আপা ভেতর থেকে দরজা খুলছে না কেন?”
অনবরত দশ মিনিট ধরে কাঠের দরজায় ছোট ছোট হাত দুটো দিয়ে ধাক্কিয়েও যখন ওপার থেকে ঝিলির বিন্দুমাত্র সাড়া পাওয়া গেল না, তখন মেঘ ভয়ে আর আতঙ্কে গলা ফাটিয়ে আলেয়া বানুকে ডাকতে থাকে।মা রান্নাঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে বলেন,
“কী হয়েছে রে মেঘ? দুপুরের বেলা ওভাবে চিল্লাচ্ছিস কেন হ্যাঁ?”
মেঘ তখন ভয়ে ও কান্নায় ভেঙে পড়ে হিক্কা তুলে বলেছিল,
“ঝিলি আপু ঘরের দরজা খুলছে না আম্মা! আমি সেই কখন থেকে ডেকেই যাচ্ছি, ধাক্কা দিচ্ছি, ও কোনো সাড়াশব্দ দিচ্ছে না তো!”
মেঘের কথা শোনামাত্রই আলেয়া বানুর পুরো দেহ যেন এক অজানা আশঙ্কায় আর চরম ভয়ে মুহূর্তের মধ্যে অসাড় হয়ে আসে। মায়ের ওমন পাথর হয়ে যাওয়া অবস্থা দেখে মেঘ আর এক সেকেন্ডও দেরি করেনি; সে বাড়ির বাইরে ছুটে গিয়ে পাড়া-প্রতিবেশী সবাইকে ডেকে আনে। পুরেনো আমলের শক্ত কাঠের দরজা ভাঙা অতটা সহজ ছিল না। প্রতিবেশী পুরুষরা লোহার শাবল, কুড়াল আর দাঁ নিয়ে এসে অনেকক্ষণের টানা প্রচেষ্টার পর অবশেষে হুড়মুড় করে দরজাটা ভাঙতে সক্ষম হয়।
মেজর কারদার পর্ব ২৩
ভেতরের দৃশ্য দেখার জন্য দরজা ভাঙা মাত্রই মেঘ আর আলেয়া বানু বাইরের কারোর আর তোয়াক্কা না করে এক ঝটকায় ঘরের ভেতরে পা রাখে। আর ভেতরে পা রাখতেই ওনাদের পায়ের তলার মাটি সরে যায়, বুকের ভেতরের পুরো ভিতটা এক লহমায় নড়ে ওঠে!
“ঝুলন্ত দড়ি—ঝিলি–জিহ্বা বের হয়ে আছে–চোখ বড় বড়—”
