Home প্রিয় জারুলফুল প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৬

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৬

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৬
সাদিয়া সাদু

দুপুর ‌বারো টা দিগন্ত আর জারুল পাশাপাশি হাঁটছে । দিগন্তের কোলে দিয়া ঘাড় এগিয়ে ঘুমিয়ে আছে । মেয়েকে বক্ষে জড়িয়েই হেঁটে চলছে দু’জন । ‌ ফুটপাত দিয়ে হেটে যাচ্ছে , দুজনের মাঝে নীরবতা ।
দিগন্ত কয়েকবার ঘার ঘুরিয়ে তাকায় , কিছু কিছু বলতে গিয়েও গিলে ফেলে । জারুল বিষয়টা বার কয়েক লক্ষ্য করে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে । কিন্তু কিছু বলে না।
চলে যায় মিনিট কয়েক ।‌ কিছু সময় পর গলা পরিষ্কার করে দিগন্ত । গম্ভীর মুখে বলে।

_’ ছয় বছর আমাকে আমার মেয়ে থেকে এবং মেয়েকে আমার থেকে দূরে রাখার কারণ কি মিসেসে খান ? ‘
জারুল ঘার নামিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে।
ঢোঁক গিলে , গলার মাঝে আটকে আসা দলা পাকানো কান্নাগুলো আটকানোর চেষ্টা করে । উপর থেকে যতই শক্ত থাকার চেষ্টা করুক ভেতর থেকে খুবই দুর্বল সে ।‌
দিগন্ত ডান হাতে মেয়েকে আগলে রেখে বা হাতটা জারুল এর কাঁধের উপর রাখে । সে হয়তো যেই মুহুর্তে তার মনের পরিস্থিতি বুঝতে পারছে । জারুল হাতটার দিকে তাকিয়ে দিগন্তের দিকে তাকায় । টলমল করছে চোখের পানি। তিরতির করে ঠোঁট কাঁপছে ‌ । ছয় বছর আগের বিভীষিকাময় পরিস্থিতির কথা মনে হতেই কলিজা ফেটে যাচ্ছে তার । না চাইতেও দুই গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে । তিরতির করছে অধর দুইটা ।
দিগন্ত অবাক হয় খুব । তার কথা প্রশ্নটাতে এতোটা রিয়েক্ট করবে জারুল সেটা হয়তো সে ভাবতেই পারেনি । জারুল এর কান্নায় মুখাবয়ব দেখে দিগন্ত একটা শ্বাস ফেলে কাঁধে রাখা হাতটা মাথা স্পর্শ করে মুলায়েম কণ্ঠে বলে ।

_’ তাক বলতে হবে না চলো ।‌’
জারুল টলমলে চোখে আবারো থাকাল দিগন্তের শান্ত মুখের দিকে । দুইজন হাটতে হাটতে পনেরো মিনিটের মধ্যেই চলে আসে কড়াইল বস্তির সামনে ‌ । রাস্তায় আর কোনো কথা হয় নি তাদের মাঝে ।
দিগন্ত ঘুমন্ত মেয়েটাকে জারুল এর কোলে এলিয়ে দিয়ে সে চলে আসতে নিলে জারুল দিগন্তের হাতটা চেপে ধরে ।
দিগন্ত হাত চেপে ধরা হাতটার দিকে অনুসরণ করে জারুল এর মুখের দিকে তাকায় ‌ ।
_’ চলো । ‘
জারুল টেনে নিয়ে আসে ‌ । কড়াইল বস্তি ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু বিল্ডিং দু তলায় ।

জারুল আর দিগন্ত প্রবেশ করে বাড়িতে ।
দিগন্ত ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে বাসা খানা। একদম নীরব মনে হচ্ছে মা মেয়ে ছাড়া তেমন কেউ থাকে না । ঘর দেখতে দেখতে দিগন্ত গম্ভীর মুখে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় ।
_’ তুমি একা থাকো ? বাবা মা কোই ? ”
_’ আসো । ‘ জারুল মেয়েকে কোলে নিয়ে বেডরুমে যেতে যেতে বলে ।‌ দিগন্ত ও তার পিছু পিছু যায় ‌ । রুমে প্রবেশ করতেই চোখ যায় খাটের মাঝে শুয়ে থাকা মধ্যবয়স্ক নারীর দিকে । যার মুখ দিয়ে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে লালা । পাশ থেকে একটা ১৬ কি ১৭ বছরের মেয়ে তা পরিষ্কার করছে ‌ ।
মুখটা খানিকটা বেঁকে রয়েছে । সটান হয়ে শুয়ে আছে সে , কোনো নড়াচড়া করতে পারে না ।
দিগন্ত বিস্ময় দৃষ্টিতে একবার বিছানায় তাকাচ্ছে তো আরেক বার জারুলের দিকে তাকাচ্ছে যে এই মূহূর্তে মেয়েকে শোয়াতে ব্যস্ত ।‌
দিগন্ত বড় বড় চোখে তাকিয়ে আনমনেই বলে ।

_’ জজারুল তোমার মা ! ‘
জারুল খানিকটা ফিকে হাসলো ।‌
রুম থেকে মেয়েটাকে চলে যেতে বলে ।
মেয়েটা মাথা নিচু করে চলে যেতেই জারুল খাটের কোণায় মায়ের মাথার পাশে বসে বলে ‌ ।
_’ হে আমার মা । আর মা-র এমন অবস্থার জন্য দায়ী আপনার পরিবার । ‘
দিগন্ত হয়তো জানত এমন কিছু একটাই বলবে ।
জারুল আরেকটু হেসে মায়ের মাথার উপর হাতটা রেখে ফের বলে ।
_’ আপনি জানতে চেয়েছিলেন না আপনাকে কেনো আপনার মেয়ের থেকে এবং আপনার মেয়েকে কেনো আপনার থেকে আলাদা করেছি ? যদি আমি এই সেই পথ না ধরতাম তাহলে আমার মা আজ আমার চোখের সামনে থাকতো না । যেরকম আমার বাবা নেই আজ । ‘
কথাটা শোনতেই আবাক চোখে তাকায় দিগন্ত । সে অবাকের উপর অবাক হচ্ছে ।‌
জারুল এর বাবা মা দুজনেই সুস্থ সবল মানুষ ছিলো তাহলে হঠাৎ করে কি হয়ে গেলো যে তাঁদের সংসারটা এইভাবেই ছিন্ন হয়ে গেলো ? জারুল তাদের বাসায় কাজ করে দেখে ভেবেছিলো হয়তো সে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে স্বামী ভালো না তাই কাজ করছে এতো কিছু সে আন্দাজ করতে পারেনি ।
কথা টা শেষ করে একটা শুকনো ঢোঁক দিলে জারুল । চোখ দুইটা ছলছল করে উঠলো তার । কয়েক সেকেন্ডের ভিতরে ছলছল করা চোখ দুইটা থেকে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে পানি । সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে ।

_’ আজ আমাকে এই পরিস্থিতিতে দাঁড় করানোর একমাত্র কারণ হলো আপনাকে ভালোবাসা । গোপনে বিয়ে করে আপনার সন্তানের মা হওয়া । আমার এই পাপের শাস্তি স্বরূপ আজ আমার মা পক্ষাঘাত । ‘
_’ সেইখানে আমার অপরাধ? আমার পরিবারের কে তোমার সাথে এতো বড় অন্যায় করেছে ? কিভাবে করেছে বলো । আই ওয়েন্ট টু এভরিথিং। কে সে অমানুষের বাচ্চা। ‘
দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললো দিগন্ত । চোখ দুইটা রক্তিম হয়ে আছে ।
জারুল একটা ফাঁকা ঢোঁক গিল্লো । দিগন্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শক্ত কণ্ঠে বলে ।‌
_’ আপনার ফিওনসি জিসা শিকদার। কিন্তু তার সাথে আপনার বাড়ির কারো হাত আছে । কার হাত সেইটা জানি না ।‌’
_’ ওরে তো আমি জি*ন্দা কবর দিয়ে দিবো। তার আগে ওর কলিজাটা আমি মেপে দেখবো কত্ত বড় কলিজা ওর । যে আমার স্ত্রী সন্তানের দিকে চোখ দেওয়ার সাহস করলো । ‘
দাঁতে দাঁত চেপে ধরলো দিগন্ত তার চোখ দুইটা আগুনের লেলিহান শিখার মতো লাল হয়ে আছে । যেনো দাও দাও করে আগুন জ্বলছে চোখে । ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছে ।
দাঁতে দাঁত চেপে ধরেই জারুল এর উদ্দেশ্যে ফের প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় ।
_’ কি কি করেছে ও ? কি কি বলেছে সব বলো । টেল মি । ‘
_’ এতো কিছু বলে লাভ কি যা হারানোর তা তো হারিয়েই ফেলেছি । বাবা কে হারালাম মা হলো প্যারালাইসিস । এখন মেয়েটাকে বাঁচাতে পারলেই হলো । ওই শকুনের চোখ পড়েছে আমার মেয়ের দিকে ‌ ।‌’
বলতে বলতে কেঁদে ফেলে জারুল ।
বিছানায় শুয়ে তাকা সালমাও চোখের পানি ফেলছে ।
জারুল যেনো একটা ভরসা করার মতো মানুষ পেলো । কেঁদে যেনো অশান্ত মনটাকে একটু শান্ত করছে ।
কিন্তু দিগন্তের এই কান্নাটা সহ্য হলো না । সে ডোরা সাপের‌ ন্যায় ফোঁসতে ফোঁসতে বের হতে গেলে আটকিয়ে দেয় জারুল ‌।

_’ কোথায় যাচ্ছো? ‘
_’ ওই অমানুষটার কলিজা ভুনা খেতে ।‌’
জারুল চোখের পানি মুছে একটু শান্ত হয়।
দিগন্তকে নিয়ে বসে নিজেও পাশে বসে আস্তে করে বলে ।
_’ আগে তোমার পরিবারের কে এসব করাচ্ছে তাকে বের করতে হবে । এই উল্টাপাল্টা কিছু করলে হিতে বিপরীত হতে পারে ‌ । আমার মেয়েটার উপর কোনো দূর্ঘটনা ঘটতে পারে আজকের তো হলো এইটা । ‘
_’ তাহলে কি করতে হবে ?’
কিছুটা নীরব রইল ।
কিছু মুহূর্ত পর বলে।
_’ তুমি পারবে ? ‘
দিগন্ত নীরব চোখে তাকায় ‌ ।
_’ সব ছেড়ে চলে আসবো । ত্যাগ করে ফেলবো পরিবার ? ‘
হালকা হেসে ফেলে জারুল ।
দিগন্ত বরাবরই তার প্রতি উন্মাদ ।
দুনিয়া ছাড়তে রাজি ছিলো , কিন্তু নিষ্ঠুর নিয়তি তাঁদের কত বছর আলাদা করে রাখলো।
_’ কিছুই ছাড়তে হবে না । সবার সাথে ভালো সম্পর্ক রাখবে এখনের থেকেও। আর কোম্পানিতে লস করাতে হবে যেনো পথে বসে যায় বাকিটা আমি করবো ।‌’
_’হে যায় করো আমার বাড়িতে কাজের লোক হিসাবে যেনো না দেখি । ‘
_’ বাড়িতে কাজের লোক হিসেবে না ঢোকলে কিছুই করতে পারতাম না । ‘
বলে জারুল উঠে চলে যায় । দিগন্ত নীরব চোখে তার চলে যাওয়া দেখে সেও উঠে মেয়েকে দেখে মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে বেরিয়ে আসে ।

দীর্ঘ ছয় বছর পর আবারো হেই ভালোবাসার মানুষের সাথে মন খুলে কথা বলে যেনো নিজেকে একটু হালকা মনে হচ্ছে। একটুখানি ভয় ও লাগছে।
জারুল নিজের মনের কনফিউজ দূর করতে মাকে বলে ।
_’ আচ্ছা মা আমি কি দিগন্তকে বলেন ভুল করেছি ? সে কি আমাদের পক্ষে থাকবে আমি যা বলেছি তা করবে ? মা আমি তারে ডিভোর্স লেটার পাঠালেও সে কিন্তু সাইন করেনি ! তাহলে কি বিশ্বাস করতে পারবো না বলো ।‌’
সালমা বেগম বাঁকা ঠোঁটে হাসির রেখা দেখা দিলো । মায়ের মুখে হাসি দেখে একটু নিশ্চিত হলো জারুল।

জারুল এর বাড়ি থেকে ফিরতে ফিরতে রাত ১১ টা ছুঁই ছুঁই করছে । বাড়ি ফিরতে ফিরতে এগারোটা পেরিয়ে চল্লিশ মিনিট ।
পুরো খান বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। সকল লাইট অফ ‌ । দিগন্ত দরজা খুলে চৌকাঠ পেরুতেই বাড়ির ভিতর থেকে একটা কঠিন গলার আওয়াজ ভেস আসে ।
_’ দাঁড়াও। ‘
দিগন্ত সিঁড়িতে পা রাখতে গিয়েও নামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে ।
_’ ওহ, দাদি বলো ।‌’
জহুরার চাপা কণ্ঠে ফের ভেসে আসে ।
_’ কোথায় ছিলে ? ‘
দিগন্ত মনের আনন্দে সব বলে দিতে গিয়েও মুখটা গম্ভীর করে বলে ।
_’ একটু কাজ ছিলো । ‘
_’ সারাদিন অফিসে যাওনি, এতো রাতে বাসায় ফিরেছো কি করেছো ? ‘
জহুরার কণ্ঠে সন্দেহ।
দিগন্ত স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে ।

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৫

_’ ভেবেছিলাম জিসাকে নিয়ে ঘুরতে যাবো তাই তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরি কিন্তু গাড়ি নষ্ট হয়ে যায় ওইটা ঠিক করাতে করাতে রাত হয়েছে। জানো তো আমার খুব শখের গাড়ি তাই ফেলে আসিনি। ‘
_’আচ্ছা যাও। আর দেরি করবে না জিসা উপরেই আছে । ‘
দিগন্ত আর দাঁড়ায় না বড় বড় পা ফেলে ।চলে যায় ।
জহুরার মনের ভেতর ময়ূর নিত্য করছে যাক শেষমেষ দুজনের মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি হতে যাচ্ছে।

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here