Home আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১৮

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১৮

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১৮
সাবিলা সাবি

কক্ষের ভেতর নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। বিছানার পাশের নরম কার্পেটের ওপর মুখোমুখি বসে আছে লিওন আর হিয়া। মাঝখানে নিচু কাঠের টেবিল, তার ওপর পরিপাটি করে সাজানো দাবার বোর্ড।
কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না।
দুজনের দৃষ্টিই স্থির হয়ে আছে বোর্ডের ওপর।
হিয়া আলতো করে সাদা গুটিগুলোর একটি পন দুই ঘর এগিয়ে দিল। অধরের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,
“Your turn, দিলবার.”
লিওন কোনো উত্তর দিল না। কয়েক সেকেন্ড বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থেকে নিজের প্রথম চাল দিল।
খেলা শুরু হলো।
প্রথম কয়েকটা চাল ছিল একেবারে শান্ত। কেউ তাড়াহুড়ো করছে না। দুজনই প্রতিপক্ষের খেলা বুঝে নিতে চাইছে।

হিয়া একটি ঘুঁটি এগোলে, লিওন তার জবাব দিচ্ছে। লিওন একটি চাল দিলে, হিয়া বিন্দুমাত্র দেরি না করে পাল্টা চাল বসিয়ে দিচ্ছে।
পাঁচ মিনিটের মধ্যেই বোর্ডের মাঝখানটা জমে উঠল।
একের পর এক গুটি সামনে এগোচ্ছে, আবার ফিরে যাচ্ছে। কোথাও আক্রমণ, কোথাও প্রতিরক্ষা।
লিওনের মুখে আগের মতোই কোনো ভাবান্তর নেই। তার চোখ শান্ত, কিন্তু সেই শান্ত চোখের আড়ালে প্রতিটা চাল হিসাব করে এগোচ্ছে তার মস্তিষ্ক।
অন্যদিকে হিয়াও কম যায় না।
সে দাবার গুটিগুলো এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ছুঁয়ে দিচ্ছে, যেন আগেই জানে পরের কয়েকটা চাল কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
হঠাৎ লিওন নিজের নাইটটা এমন এক ঘরে নিয়ে গেল, যেখানে সাধারণ খেলোয়াড়রা সচরাচর গুটি রাখে না।
হিয়ার আঙুল মাঝপথে থেমে গেল।
সে বোর্ডের দিকে ঝুঁকে ভালো করে অবস্থানটা দেখল।
এক সেকেন্ড…
দুই সেকেন্ড…
তারপর অধরের কোণে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল।

“Not bad…”
লিওন নির্বিকার গলায় বলল,
“শুরুই করেছি মাত্র।”
হিয়া এবার নিজের বিশপ সরাল। চালটা এতটাই নিখুঁত ছিল যে মুহূর্তের জন্য লিওনের ভ্রু কুঁচকে গেল।
সে আরেকবার পুরো বোর্ডটা দেখে নিল। মনে মনে বুঝল, এই মেয়েটা শুধু দাবা খেলতে জানে না—প্রতিপক্ষকে ফাঁদে ফেলতেও জানে।
খেলা যত এগোতে লাগল, দুজনের মুখের শান্ত ভাবটা তত কমতে শুরু করল। এখন আর কেউ কাউকে খোঁচা দিচ্ছে না।
দুজনেই পুরো মনোযোগ দিয়েছে বোর্ডে।
কিছুক্ষণ পর লিওন হঠাৎ রানিটাকে এমনভাবে চাল দিল, যাতে একসঙ্গে দুটো গুটির ওপর চাপ তৈরি হলো।
হিয়া কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ হয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে মাথা তুলে লিওনের দিকে তাকাল। চোখে স্পষ্ট প্রশংসার আভাস।

“ইমপ্রেসিভ…”
লিওন ঠান্ডা গলায় বলল, “এখনই মুগ্ধ হয়ো না। খেলা এখনও অনেক বাকি।”
হিয়ার হাসিটা আরও গভীর হলো।
“সেটাই তো চাই, অফিসার লিওন। সহজে জিতে গেলে মজা কোথায়?”
আবার নেমে এল নীরবতা।
ঘরের ভেতর শুধু দাবার গুটি সরানোর ক্ষীণ শব্দ।
দুজনেই বুঝে গেছে, আজকের খেলায় ভুল করার সুযোগ মাত্র একবার। আর সেই একবারের ভুলই নির্ধারণ করবে কে হারবে, আর কে জিতবে।
খেলা যত এগোতে লাগল, বোর্ডের অবস্থান তত জটিল হয়ে উঠতে লাগল। একসময় এমন অবস্থা তৈরি হলো যে, হিয়ার রাজার চারপাশে থাকা প্রায় সব গুটিই চাপে পড়ে গেল।
লিওন ধীরে ধীরে নিজের রানিটা এগিয়ে দিল।
তারপর একটি রুক এমন জায়গায় বসাল, যেখান থেকে পুরো বোর্ড তার নিয়ন্ত্রণে চলে এল।
হিয়া কয়েক মুহূর্ত বোর্ডের দিকে স্থির তাকিয়ে রইল।
প্রথমবারের মতো তার ভ্রু সামান্য কুঁচকে উঠল।
সে একবার ডানদিকে, আবার বামদিকে তাকিয়ে সম্ভাব্য সব চাল হিসাব করল। তবু কোনো সহজ পথ খুঁজে পেল না।
লিওনের অধরে হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।

“কী হলো? খেলা কি শেষ?”
হিয়া চোখ না তুলেই শান্ত গলায় বলল,
“তুমি খুব তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলো, বাজপাখি।”
লিওন এবার আরেকটি চাল দিল। তার রুক সরাসরি হিয়ার রাজার সামনে এসে দাঁড়াল। এবার সত্যিই মনে হচ্ছিল, আর মাত্র এক চাল। তারপরই চেকমেট। লিওন পেছনের দিকে হেলান দিয়ে বসল। চোখে আত্মবিশ্বাসের আভা।
“তোমার হার মেনে নেওয়ার অভ্যাস থাকলে এখন থেকেই শুরু করতে পারো।”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না।সে বোর্ডের দিকে ঝুঁকে পড়ল।
একটা…দুইটা…তিনটা…প্রায় এক মিনিট ধরে সে কোনো গুটিই ছুঁল না।
লিওন ভেবেছিল, হিয়া হয়তো বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছে না। কিন্তু পরের মুহূর্তেই হিয়ার অধরে ধীরে ধীরে সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা ফিরে এল। সে আলতো করে নিজের বিশপটা তুলে বোর্ডের এক কোণে বসিয়ে দিল।

চালটা দেখে লিওনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে নিজের রানির দিকে তাকাল। তারপর রাজার দিকে। এরপর পুরো বোর্ডটা নতুন করে দেখতে শুরু করল। তার মুখের আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। কারণ মাত্র একটি চালেই পুরো বোর্ডের ভারসাম্য বদলে গেছে। যে ফাঁদে সে হিয়াকে আটকে ফেলেছে বলে ভাবছিল, সেই ফাঁদের ভেতর সে নিজেই ঢুকে পড়েছে।
লিওন দ্রুত পাল্টা চাল খুঁজতে লাগল।
একটা…দুইটা…তিনটা…
কিন্তু যতবারই হিসাব করছে, ফল একটাই আসছে না। পালানোর কোনো পথ নেই। হিয়া এতক্ষণ ধরে আসলে জয়ের জন্য নয়, এই একটিমাত্র চালের জন্য অপেক্ষা করছিল। হিয়া ধীরে মাথা তুলল।তার চোখে দুষ্টু এক ঝিলিক।
“চেক।”
লিওন শেষ চেষ্টা করল।নিজের নাইট এগিয়ে দিল। কোনো লাভ হলো না। হিয়া সঙ্গে সঙ্গেই রানিটা সরিয়ে শেষ চালটা দিল। অধরের কোণে বিজয়ীর হাসি নিয়ে নিচু স্বরে বলল,

“চেকমেট… দিলবার.”
ঘরের ভেতর কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা নেমে এল। লিওনের দৃষ্টি এখনও দাবার বোর্ডে স্থির। তারপর খুব ধীরে সে মাথা নাড়ল। মুখে অনিচ্ছুক হলেও একফোঁটা স্বীকৃতির হাসি ফুটে উঠল।
“ইমপ্রেসিভ…”
হিয়া হালকা হেসে বলল,
“বলেছিলাম না, তাড়াহুড়ো করে জয়ের আনন্দ করতে নেই। দাবার আসল খেলাটা শেষ চালেই বোঝা যায়।”
দাবার বোর্ডের দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল লিওন। ছোটবেলা থেকেই দাবা তার প্রিয় খেলা। স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি অসংখ্য প্রতিযোগিতায় সে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। সিআইডিতে যোগ দেওয়ার পরও কৌশলগত চিন্তাশক্তি ধারালো রাখতে মাঝেমধ্যেই দাবার বোর্ডে বসত। বছরের পর বছর ধরে অর্জিত সেই অভিজ্ঞতার পরও আজ সে হেরে গেল।
পরাজয়টা তাকে যতটা না কষ্ট দিল, তার চেয়েও বেশি আঘাত করল একটি বিষয়। সে হেরেছে একজন কুখ্যাত আন্তর্জাতিক অপরাধীর কাছে। লিওনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তার অহংকারে অদৃশ্য একটা আঁচড় পড়েছে।

হিয়া লিওনের মুখের প্রতিটি পরিবর্তন গভীর মনোযোগে লক্ষ করছিল। অধরের কোণে বিজয়ীর মৃদু হাসি ফুটিয়ে সে বলল, “চাইলেই তোমাকে জিতিয়ে দিতে পারতাম। তোমার ইগোও অক্ষত থাকত। কিন্তু একটা সমস্যায় পড়ে গেলাম।”
লিওন শীতল দৃষ্টিতে তাকাল। “কী সমস্যা?”
হিয়া সাদা গোলাপের একটি পাপড়ি আঙুলের ফাঁকে ঘুরিয়ে মৃদু স্বরে বলল, “চ্যালেঞ্জটা ছিল তোমার কাছ থেকে একটা চুমু জিতব। এত সুন্দর পুরস্কার আমি হাতছাড়া করি কীভাবে?”
লিওনের চোখে বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল। সে কোনো অবস্থাতেই এই মেয়েটাকে চুমু দেবে না। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে হঠাৎ ব্যঙ্গের হাসি হাসল সে। তারপর নিজের দুই আঙুল অধরে ছুঁইয়ে বাতাসে একটি ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“তুমি শুধু বলেছিলে আমাকে কিস করতে হবে। কোথায় বা কীভাবে করতে হবে, সেটা কিন্তু বলোনি। So… challenge completed.”
এক মুহূর্তের জন্য হিয়া নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। পরের মুহূর্তেই তার হাসি থামানো দায় হয়ে গেল। হালকা মাথা নেড়ে সে বলল, “অফিসার লিওন… তুমি সত্যিই আনপ্রেডিক্টেবল।”
হাসি থামিয়ে হিয়া এবার লিওনের পোশাকের দিকে তাকাল। কালো টি-শার্ট আর ট্রাউজার এখনও আগের দিনের। সে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “গতকাল থেকে একই পোশাক পরে আছো। শাওয়ার নেবে?”
লিওন সংক্ষিপ্তভাবে মাথা নাড়ল। হিয়া উঠে দাঁড়াল।
“চলো।”

দুজন টানেলের ভেতর দিয়ে কয়েক মিনিট হাঁটার পর এক বিস্ময়কর জায়গায় এসে পৌঁছাল।
চারপাশে প্রাকৃতিক পাথরের দেয়াল। অনেক ওপরে খোলা অংশ দিয়ে সূর্যের আলো নেমে আসছে। পাথরের গা বেয়ে সরু জলধারা নিচে পড়ছে। সেই পানি জমে তৈরি হয়েছে স্বচ্ছ সবুজাভ জলরাশি। দূর থেকে দেখলে ছোট্ট একটি প্রাকৃতিক লেক বলেই মনে হয়। ঝরনার পানির একটানা শব্দে পুরো পরিবেশ শান্ত হয়ে আছে।
লিওন চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে কপাল কুঁচকে বলল,
“সিরিয়াসলি? এখানে শাওয়ার নেব?”
তারপর সন্দেহভরা চোখে হিয়ার দিকে তাকিয়ে যোগ করল,
“আর তোমাকে তো বিশ্বাস নেই।”
হিয়া হালকা হেসে বলল, “চিন্তা কোরো না। তোমার শাওয়ার নেয়া আমি দেখব না। দেখার ইচ্ছে থাকলে অনেক আগেই দেখতে পারতাম।”
লিওনের দৃষ্টি আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
“বাই এনি চান্স… তুমি আমার রুমে হিডেন ক্যামেরা বসিয়েছ নাকি?”

হিয়া শুধু মুচকি হাসল। একটি শব্দও বলল না। তার সেই নীরব হাসিই লিওনের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিল।
হিয়া আর কিছু বলল না। অধরের কোণে হালকা হাসি রেখে ধীরে ধীরে সেখান থেকে চলে গেল। চারপাশ আবার নীরব হয়ে উঠল। লিওন কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর একজন প্রশিক্ষিত সিআইডি অফিসারের মতো পুরো জায়গাটা খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করল।
পাথরের ফাঁক…ঝরনার মাথা…উঁচু দেয়ালের কোণ…জলধারার আশপাশ…তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এক ইঞ্চি জায়গাও বাদ দিল না। কোথাও কোনো লুকানো ক্যামেরা, সেন্সর কিংবা নজরদারির চিহ্ন চোখে পড়ল না। তবু সে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারল না। হিয়াকে বিশ্বাস করার মতো মানুষ সে নয়। শেষ পর্যন্ত সতর্কতার জন্য কোমরে তোয়ালে জড়িয়েই পানির ভেতর নামল।
স্বচ্ছ সবুজাভ পানিতে প্রথম পা রাখতেই শরীর জুড়ে শীতল একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। এক মুহূর্ত পর সে গভীর একটা ডুব দিল। কয়েক সেকেন্ড পরে পানির ওপর ভেসে উঠতেই ভেজা চুল থেকে টুপটাপ করে পানি ঝরতে লাগল। দুই হাত দিয়ে মুখের পানি মুছে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল সে। কিন্তু সেই শীতল জলও তার ভেতরের বিরক্তিটুকু ধুয়ে নিয়ে যেতে পারল না। মেজাজ এখনও তিরিক্ষি।
এমনিতেই লিওনের স্বভাবের মধ্যে এক ধরনের রুক্ষতা আছে। অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা কিংবা বাড়াবাড়ি আবেগ কোনোটাই তার পছন্দ নয়। আর গত কয়েক দিনে যা যা ঘটেছে, তাতে তার ধৈর্যের সীমা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।

সে মাথা পেছনে হেলিয়ে ঝরনার নিচে দাঁড়াল। ঠান্ডা পানি কাঁধ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। মনে মনে তিক্ত স্বরে বিড়বিড় করে উঠল, “আল্লাহ… ওই মেয়েটার নজর কি আর কোনো সিআইডি অফিসারের ওপর পড়তে পারল না? আমার ওপরই পড়তে হলো?”
কথাটা বলেই নিজের কপালে হাত বুলিয়ে বিরক্তির হাসি হাসল। “সারা জীবনে যত অপরাধীর মুখোমুখি হয়েছি, কেউ এত ঝামেলায় ফেলেনি। একটা আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল আমাকে বিয়ে করার মিশনে নেমেছে… এ রকম পরিস্থিতির জন্য তো সিআইডি ট্রেনিংয়েও কোনো অধ্যায় ছিল না।”
মাথা নেড়ে আবারও ঝরনার নিচে দাঁড়িয়ে রইল সে। ঠান্ডা পানির স্রোত শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু মাথার ভেতর ঘুরপাক খাওয়া সেই একটাই নাম কোনোভাবেই থামছে না—
হিয়া।
ঝরনার নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ আরেকটা চিন্তা মাথায় আসতেই লিওনের মুখ বিকৃত হয়ে গেল। সে দুহাতে মুখে পানি ছিটিয়ে বিরক্ত গলায় বিড়বিড় করল,

“ওহ শিট…”
মাথা নিচু করে কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর একে একে দিনের ঘটনাগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল। একজন আন্তর্জাতিক ক্রিমিনালের সঙ্গে একই টেবিলে বসে দুপুরের খাবার খেতে হয়েছে…তার সঙ্গে দাবা খেলতে হয়েছে…চ্যালেঞ্জের কারণে শেষে একটা ফ্লাইং কিসও ছুড়ে দিতে হয়েছে…ভাবতেই লিওনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে কপালে হাত ঠেকিয়ে অসহায় স্বরে বিড়বিড় করে উঠল,
“হে আল্লাহ… এগুলো যদি সিআইডির কারও কানে যায়, তাহলে তো আমার মান-সম্মান বলে আর কিছুই থাকবে না!”
একটু থেমে নিজের কপালে আলতো চাপড় মারল।
“লন্ডনের বেস্ট সিআইডি অফিসার! আর তার কীর্তি—একটা সাইকোপ্যাথ ক্রিমিনালের সঙ্গে বসে লাঞ্চ করছে, দাবা খেলছে, শেষে আবার ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিচ্ছে!”
সে চোখ বন্ধ করে গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলল।
“না… এই ঘটনাগুলো কবর পর্যন্ত আমার সঙ্গেই যাবে। পৃথিবীর কেউ এগুলো জানতে পারবে না। একটাও না!”

কথাগুলো বলেই আবার ঝরনার পানির নিচে দাঁড়িয়ে পড়ল লিওন। মনে হচ্ছিল ঠান্ডা পানির স্রোতে শুধু শরীর নয়, আজকের অপমানজনক স্মৃতিগুলোও ধুয়ে ফেলতে চাইছে সে।
শাওয়ার শেষ করে লিওন পানি ঝেড়ে ধীরে ধীরে ওপরে উঠে এল। পাথরের পাশে সুন্দর করে ভাঁজ করে রাখা ছিল একটি সাদা বাথরোব। এক মুহূর্ত দ্বিধায় থেকে সেটাই গায়ে জড়িয়ে নিল সে। তারপর ভেজা চুলে হাত বুলাতে বুলাতে ফিরে এল হিয়ার ব্যক্তিগত কক্ষে।
ঘরে ঢুকেই সে থমকে দাঁড়াল। হিয়া সেখানে নেই।
কিন্তু বিছানার দৃশ্য দেখে তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
পুরো কিং-সাইজ বিছানাজুড়ে সারি সারি পোশাক সাজানো। বিভিন্ন রঙের ব্লেজার স্যুট, শার্ট, টি-শার্ট, ট্রাউজার—সবকিছু এমন পরিপাটি করে রাখা যে মনে হলো কোনো নামী ফ্যাশন হাউসের শোরুম কক্ষে এনে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
লিওন ধীরে ধীরে বিছানার কাছে এগিয়ে গেল। একটার পর একটা পোশাক হাতে তুলে দেখল। সবকটিই তার মাপের। শেষ পর্যন্ত তার চোখ গিয়ে থামল একটি সাদা ব্লেজার স্যুটের ওপর। সাদা রং বরাবরই তার দুর্বলতা। সে সেটাই তুলে নিয়ে পোশাক বদলে ফেলল। ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াতেই আবারও বিস্মিত হলো।
টেবিলের ওপর সাজানো রয়েছে তার প্রিয় ব্র্যান্ডের হাতঘড়ি। পাশেই রাখা একই ব্র্যান্ডের পারফিউম, যা সে বহু বছর ধরে ব্যবহার করে আসছে।

সেখানে শেষ নয়।
তার নিয়মিত ব্যবহার করা ময়েশ্চারাইজার, সানস্ক্রিন, হেয়ার ওয়্যাক্স—প্রতিটি জিনিসই ঠিক সেই ব্র্যান্ডের, যেগুলো সে নিজের জন্য সবসময় কিনে। লিওন একটার পর একটা বোতল হাতে তুলে দেখল। ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সবই তার পছন্দ।সবই তার অভ্যাস। ধীরে ধীরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল সে।
তারপর কপালে হাত ঠেকিয়ে অবিশ্বাসের হাসি হেসে বিড়বিড় করে বলল, “হে আল্লাহ… ওটা মেয়ে, নাকি হাঁটতে-ফিরতে একটা সিসিটিভি ক্যামেরা?”
একটু থেমে আবার চারপাশে তাকাল। “আমার কোন ব্র্যান্ডের পারফিউম পছন্দ, কোন ঘড়ি পরি, কোন ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করি… এসব পর্যন্ত জানে কীভাবে?”
তার সন্দেহ আরও গভীর হয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল, হিয়া শুধু তাকে অনুসরণই করেনি বছরের পর বছর ধরে তার জীবনকে নীরবে পর্যবেক্ষণ করেছে। এই উপলব্ধিটাই লিওনের শরীরে অজানা এক অস্বস্তির শীতল স্রোত বয়ে দিল। সবকিছু গুছিয়ে তৈরি হয়ে লিওন এসে বিছানার কিনারায় বসল। ঘরের ভেতর অস্বাভাবিক নীরবতা।
হিয়ার কোনো দেখা নেই। মোবাইল নেই, ল্যাপটপ নেই, টেলিভিশনও চালানোর ইচ্ছে হলো না। কিছুক্ষণ বসে থাকতে থাকতেই বিরক্তি চেপে বসল তার ভেতরে।
চোখ ঘুরিয়ে পাশের বড় বুকশেলফটার দিকে তাকাল সে।

“যাক, অন্তত একটা বই পড়া যাবে।” মনে মনে বলেই উঠে দাঁড়াল।
বুকশেলফের সামনে গিয়ে প্রথম বইটা হাতে নিল।
Dark Obsession.
দ্বিতীয়টা।
Haunting Adeline.
তৃতীয়টা।
God of Malice.
চতুর্থটা।
আরেকটা ডার্ক রোমান্স।
লিওনের ভ্রু ধীরে ধীরে কুঁচকে উঠল। সে একের পর এক তাক ঘুরে দেখল। প্রায় পুরো শেলফজুড়েই ডার্ক রোমান্স, অবসেসিভ লাভ, সাইকোলজিক্যাল রোমান্স আর ধূসর চরিত্রের গল্পে ভরা বই।
লিওন দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচু স্বরে বিড়বিড় করল,
“এবার বুঝলাম… ওই মেয়েটা এমন কেন। সারাদিন এসব পড়লে মাথায় ভূত চড়বেই তো!”
কথাটা বলেই নিজের অজান্তেই হালকা হাসল সে। তার নিজের পছন্দ বরাবরই ভিন্ন।
থ্রিলার…ক্রাইম…সাইকোলজিক্যাল মিস্ট্রি…
যেসব বই পড়লে মাথা কাজ করে, আবেগ নয়।
সে আবার তাকের দিকে চোখ বুলিয়ে অবশেষে কোণায় চাপা পড়ে থাকা একটি বই দেখতে পেল।
The Little Stranger.

বইটা হাতে নিয়ে কয়েক পৃষ্ঠা উল্টাতেই তার মুখে স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল।
“অবশেষে একটা পড়ার মতো জিনিস পাওয়া গেল।”
বইটা হাতে নিয়ে আবার বিছানায় ফিরে এল সে। বালিশে হেলান দিয়ে আরাম করে বসে প্রথম পৃষ্ঠাটা খুলল।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই গল্পের ভেতর ডুবে গেল লিওন। বাইরে টানেলের পৃথিবী, হিয়া, বন্দিদশা সবকিছু যেন সাময়িকভাবে মিলিয়ে গেল বইয়ের পাতার আড়ালে। লিওন ধীরে ধীরে বইয়ের পাতায় চোখ বুলিয়ে যাচ্ছিল।
গল্পটা যত এগোচ্ছিল, ততই চরিত্র দুটির টানাপোড়েন গভীর হয়ে উঠছিল। একসময় কাহিনি রোমান্টিক মোড় নিতেই লিওনের কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। সে পাতাটা উল্টে এগিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে কয়েকটি সংলাপ তার মাথার ভেতর আটকে গেল।
তার অজান্তেই মনে ভেসে উঠল হিয়ার মুখ। সাদা গোলাপ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা হিয়া, দাবার বোর্ডের ওপারে বসে থাকা হিয়া…আর সেই অবাধ্য হাসিটা।
লিওন সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঝাঁকাল।

“ননসেন্স!” নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল সে।
আবার বইয়ের দিকে মন দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু যতবারই গল্পের রোমান্টিক অংশে চোখ পড়ছে, ততবারই তার কল্পনায় চরিত্রগুলোর জায়গায় হিয়ার মুখ ভেসে উঠছে।
হঠাৎ কাঁচের বক্সের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হিয়া…
হঠাৎ দাবায় জিতে দুষ্টু হাসি হাসা হিয়া…
হঠাৎ সেই ফ্লাইং কিসের মুহূর্ত…
লিওনের মুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল। সে বিরক্তিতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল,
“না… এটা হতে পারে না।”
পরের মুহূর্তেই এক ঝটকায় বইটা হাত থেকে ছুড়ে দূরে ফেলে দিল। বইটা গিয়ে কার্পেটের ওপর পড়তেই কক্ষজুড়ে চাপা একটা শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো।
লিওন দুহাতে নিজের চুলের ভেতর আঙুল চালিয়ে গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। “আল্লাহ… ওই মেয়েটা আমার মাথার ভেতরেও ঢুকে পড়েছে নাকি?”

তার বিরক্তি এবার নিজের ওপরই। একজন সিআইডি অফিসারের মন এত সহজে বিচলিত হওয়ার কথা নয়।
তবু যতই সে হিয়াকে ঘৃণা করতে চাইছে, গত কয়েক দিনের প্রতিটি ঘটনাই বারবার ফিরে এসে তার চিন্তার ভেতর জায়গা করে নিচ্ছে। এই অনুভূতিটাই তাকে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেল। লিওন মাথা তুলে তাকাতেই দেখল, দরজার ফ্রেমে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হিয়া। এক হাত পকেটে। অন্য হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ।
কিন্তু হিয়ার চোখদুটো স্থির হয়ে আছে শুধু লিওনের ওপর।
সাদা ব্লেজার স্যুটে লিওনকে আজ অন্যরকম লাগছে। পরিপাটি ভেজা চুল জেল দিয়ে সেট করা , কব্জিতে রুপালি ঘড়ি, সাদা শার্টের ওপর ব্লেজারের নিখুঁত ফিটিং—সব মিলিয়ে তার ব্যক্তিত্বটা আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে।
হিয়া কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল। এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত কোনো দৃশ্য সামনে পেয়েছে। তারপর ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকে কফির মগটা টেবিলে রেখে লিওনের সামনে এসে দাঁড়াল।
অধরের কোণে মৃদু হাসি।চোখে অদ্ভুত এক আবেশ। নিচু স্বরে বলল,

“আজ তোমাকে ভীষণ হ্যান্ডসাম লাগছে, দিলবার। এতটাই যে ইচ্ছে করছে… একেবারে খেয়ে ফেলি।”
লিওন একবার চোখ বন্ধ করে পুনরায় ধীর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে তার কোলের ওপর রাখা কুশনটা পাশে রেখে দিল।
এই ধরনের মন্তব্যে অবাক হওয়ার সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। এখন তার বিরক্তিটাও যেন নিয়ন্ত্রিত।
হিয়া সেটা বুঝতে পেরে আরও একটু মজা পেল। সে বিছানার পাশে বসে মাথা সামান্য কাত করে জিজ্ঞেস করল,
“Are you hungry?”
লিওন সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল,
“Yes.”
হিয়া মৃদু হাসল।
“আমার মায়ের তৈরি করা স্পেশাল খাবারটা ট্রায় করবে?”
লিওনের ভ্রু কুঁচকে গেল।
“কোনটা?”
হিয়া নিজের তর্জনী আঙুল দিয়ে আলতো করে নিজের দিকে ইশারা করল। তারপর দুষ্টু হাসিতে বলল,
“এই যে… আমি।”
কয়েক মুহূর্ত লিওন নির্বাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হলো, পৃথিবীর সব আজব ঘটনা তার জীবনেই ঘটার কথা। পরের মুহূর্তেই সে কপালে হাত ঠেকিয়ে বিরক্ত গলায় বলে উঠল,
“রাবিশ! অসভ্য, আস্ত নির্লজ্জ মেয়েমানুষ একটা! এসব কথা বলতে তোমার একটুও লজ্জা করে না?”
হিয়ার হাসি থামার নাম নেই। লিওনের বিরক্ত মুখ, কুঁচকে যাওয়া ভ্রু আর অসহায় রাগ—এসবই তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মজার দৃশ্য। হাসতে হাসতেই সে বলল,
“লজ্জা? সেটা তো অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি, জানেমান। অবশ্য শুধু তোমার কাছেই।”
এদিকে কথা বলতে বলতে কখন যে সন্ধ্যা নেমে এসেছে, কেউ খেয়ালই করেনি। হিয়া লিওনের রাতের খাবারের ব্যবস্থা করে তাকে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে বলে পাশের কক্ষে চলে এল।
টানেলের ভেতর কৃত্রিম আলো আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। ঠিক সেই সময় দরজায় পরপর তিনবার টোকা পড়ল।
হিয়া চোখ তুলে দরজার দিকে তাকাল।

“Come in.”
মার্ক ভেতরে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকেই বন্ধ করে দিল। তার গম্ভীর মুখ দেখেই হিয়া বুঝে গেল, গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটেছে।
সে নিচু গলায় বলল,
“কী হয়েছে?”
মার্ক আর এক মুহূর্ত দেরি করল না।
“মিস্ট্রেস, আমাদের ইনফর্মার কনফার্ম করেছে। আয়মান খান আপনার সঙ্গে জরুরি দেখা করতে চায়। আর একটা খবর… সে খুব শিগগিরই লন্ডন ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।”
কথাটা শুনেই হিয়ার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তে বদলে গেল।
চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
আয়মান যদি এখনই লন্ডন ছেড়ে চলে যায়, তাহলে এতদিন ধরে সাজানো প্রতিশোধের পরিকল্পনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। যে হিসাব এখনও বাকি, সেটা মিটিয়ে না নিয়ে সে কাউকে দেশ ছাড়তে দেবে না।
কয়েক মুহূর্ত নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে হিয়া সিদ্ধান্ত নিল।
“সবাইকে রেডি হতে বলো। খুব দ্রুত আমরা এখান থেকে বের হচ্ছি।”

“Yes, Mistress.” মার্ক মাথা নত করে দ্রুত কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
মার্ক চলে যেতেই হিয়া ধীরে ধীরে আবার লিওনের কক্ষে ফিরে এল। লিওন তখন জানালাবিহীন ঘরটার এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। হিয়াকে দেখেই ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
হিয়া শান্ত স্বরে বলল, “অফিসার, আমাদের চুক্তি এখানেই শেষ। তোমাকে এখনই ছেড়ে দিচ্ছি।”
লিওন স্পষ্ট বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকাল। সে ভেবেছিল, এই মেয়েটা চব্বিশ ঘণ্টা পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোনোভাবেই তাকে মুক্তি দেবে না।
“এত সহজে?” অবাক কণ্ঠে প্রশ্ন করল সে।
হিয়ার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল। “আমার জরুরি একটা কাজ পড়েছে। তাই তোমাকে আর আটকে রাখার সুযোগ নেই।”
লিওন আর কোনো প্রশ্ন করল না। যত দ্রুত সম্ভব এই আস্তানা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়াই এখন তার একমাত্র লক্ষ্য।

সে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ব্লেজারের বোতাম লাগিয়ে নিল।
ঠিক তখনই হিয়া আবার বলল, “তবে একটা ছোট্ট সমস্যা আছে।”
লিওন বিরক্ত চোখে তাকাল। “এবার কী?”
হিয়া খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
“তোমাকে সচেতন অবস্থায় ছেড়ে দিলে আমার আস্তানার পথটা জেনে যাবে। সেটা তো হতে দিতে পারি না।”
লিওনের ভ্রু কুঁচকে গেল। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
“মানে… আমাকে আবার অচেতন হতে হবে?”
হিয়া মাথা নাড়ল। “Exactly.”

লিওন বিরক্তিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।আজকের দিনটা এমনিতেই অদ্ভুত ঘটনায় ভরা। আরেকটা যোগ হলে খুব একটা পার্থক্য হবে না। অবশেষে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাথা নেড়ে বলল, “Fine.”
হিয়া ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল। দুজনের চোখ কয়েক মুহূর্ত একে অপরের দিকে স্থির রইল। তারপর কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই হিয়া হাতের পাশের অংশ দিয়ে লিওনের ঘাড়ের নির্দিষ্ট স্নায়বিন্দুতে দ্রুত ও নিখুঁত একটি আঘাত করল। লিওনের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
পরের মুহূর্তেই তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। পা দুটো ভারী হয়ে গেল। সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। ধীরে ধীরে নিস্তেজ শরীরটা সামনে ঢলে পড়ল।
হিয়া এক হাত বাড়িয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।লিওনের মাথাটা এসে ঠেকল হিয়ার কাঁধে। জ্ঞান হারানোর শেষ মুহূর্তেও তার মুখে বিরক্তির ক্ষীণ ছাপ লেগে রইল।
আর হিয়া…সে কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল, দুই হাতে নিজের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে আগলে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই অচেতন লিওনকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গাড়ির পেছনের সিটে বসিয়ে দেওয়া হলো। তার মাথাটা এক পাশে হেলে আছে, গভীর নিঃশ্বাসে বুক ধীরে ধীরে ওঠানামা করছে।
ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল মার্ক। ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়ার আগেই হিয়া ধীর পায়ে গাড়ির পাশে এসে দাঁড়াল। কালো কাঁচের জানালার দিকে সামান্য ঝুঁকে ভেতরে একবার তাকাল সে।
তারপর মাথা তুলে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“মার্ক, কোথায় ওকে নামিয়ে রেখে আসতে হবে, মনে আছে তো?”
মার্ক সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। “Yes, Mistress.”
হিয়ার চোখে কঠোর সতর্কতার ছাপ ফুটে উঠল।
“একটুও ভুল করবে না। নিরাপদে রেখে আসবে। ওর গায়ে একটা আঁচড়ও যেন না লাগে।”
“Don’t worry, Mistress.” সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল মার্ক।

হিয়া আর কিছু বলল না। সে আবার গাড়ির জানালার কাছে ঝুঁকে এল। অচেতন লিওনের শান্ত মুখটার দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। কঠিন স্বভাবের সেই মেয়েটার চোখেও এক মুহূর্তের জন্য কোমলতা নেমে এলো। সে ধীরে ধীরে আরও ঝুঁকতেই মার্ক অপ্রস্তুত হয়ে চোখ তুলে তাকিয়ে ফেলল।
হিয়ার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মুহূর্তেই তার দিকে ঘুরে গেল। সেই এক পলকের দৃষ্টিই যথেষ্ট ছিল।
মার্ক বিব্রত গলায় দ্রুত বলে উঠল, “Sorry, Mistress… আমি কিছুই দেখছি না।”
বলেই সে মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল। হিয়ার অধরে হালকা হাসি ফুটল। সে খুব আস্তে লিওনের কপালের ওপর নেমে থাকা একগুচ্ছ চুল ফু দিয়ে সরিয়ে দিল। তারপর নিঃশব্দে তার অধরে নিজের অধর ছুঁইয়ে দিল ক্ষণিকের জন্য। চুম্বন ভেঙে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“গুডবায়, দিলবার… ভাগ্যে থাকলে আবার তোমাকে আমার কাছেই ফিরে পাব।”
আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না সে। ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে এল। পরের মুহূর্তেই গাড়ির ইঞ্জিন গর্জে উঠল। মার্ক গাড়িটা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে নিল। হিয়া স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, যতক্ষণ না কালো গাড়িটা টানেলের পথ পেরিয়ে অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে গেল।

গাড়িটা চোখের আড়াল হতেই হিয়া দীর্ঘক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশে আবার নেমে এল গভীর নীরবতা। তার মুখের দৃঢ়তা আগের মতোই ছিল, কিন্তু চোখের গভীরে লুকিয়ে ছিল চাপা এক বিষণ্নতা।
ঠিক সেই সময় আকাশ থেকে ডানা ঝাপটানোর পরিচিত শব্দ ভেসে এল। পরের মুহূর্তেই সোনালি ঈগলটা এসে আলতো করে বসে পড়ল হিয়ার কাঁধে। হিয়ার কঠিন মুখে অবশেষে কোমল এক হাসি ফুটে উঠল। সে খুব যত্ন করে ঈগলটার পালকে হাত বুলিয়ে দিল। তারপর কপালটা আলতো করে ছুঁইয়ে নিচু স্বরে বলল,
“এত বড় রিস্ক কেন নিয়েছিলি, শ্যাডো?”
ঈগলটা মাথা কাত করে হিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
হিয়া তার ঠোঁট কামড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আর কখনও এমনটা করবি না। আমি সত্যিই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি যদি কয়েক সেকেন্ড দেরি করতাম…”

বাকিটুকু আর শেষ করতে পারল না সে।তার আঙুলগুলো আরও শক্ত করে শ্যাডোর পালক আঁকড়ে ধরল।
“ও যখন তোকে লক্ষ্য করে বন্দুক তুলেছিল, তখন লুকিয়ে পড়তে পারতিস। কেন তখনও ঘুরছিলি ওর পাশে? কেন?”
তার কণ্ঠে তিরস্কার ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল আতঙ্ক আর মমতা। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে সে আবার বলল,
“শ্যাডো… তোর যদি কিছু হয়ে যেত, আমি নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারতাম না।”
সে ঈগলটার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল।
“শুনে রাখ, আজকের পর আর কখনও নিজের জীবন নিয়ে এমন ঝুঁকি নিবি না। আমার কিছু হয়ে গেলেও না। তুই বেঁচে থাকবি… এটাই আমার আদেশ। বুঝেছিস?”

ঈগলটা যেন কথার উত্তর দিল। মাথাটা হিয়ার গালের সঙ্গে আলতো করে ঘষে একবার ডানা ঝাপটাল।
হিয়া মৃদু হেসে তাকে বুকের কাছে টেনে নিল। পৃথিবীর কাছে সে ছিল নিষ্ঠুর ক্রিমিনাল ভাইপার। কিন্তু এই সোনালি ঈগলটার কাছে সে কেবল একজন মানুষ, যে নিজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গীকে হারানোর ভয় পায়।
শ্যাডোর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে হিয়ার চোখের সামনে হঠাৎ বহু বছরের পুরোনো একটি রাত ভেসে উঠল।
সেই রাতটাও ছিল বৃষ্টিভেজা। আকাশ যেন অবিরাম কেঁদে যাচ্ছিল। আর সেই বৃষ্টির নিচে একা হেঁটে চলেছিল হিয়া। তখন তার জীবনে বলে কিছু অবশিষ্ট ছিল না। প্রিয় মানুষ, বিশ্বাস, আশ্রয় সবকিছু হারিয়ে দিশেহারা এক সর্বহারা পথিকের মতো উদ্দেশ্যহীনভাবে রাস্তা ধরে হাঁটছিল সে।
চারদিকে ঘন অন্ধকার। হঠাৎ জঙ্গলের ধারের ঝোপ থেকে ক্ষীণ এক আর্ত শব্দ ভেসে এল। হিয়া থেমে গেল।
শব্দটা অনুসরণ করে এগিয়ে যেতেই তার চোখে পড়ল ছোট্ট একটা ঈগলছানা। ভেজা মাটির ওপর অসহায় হয়ে পড়ে আছে। ডানার একপাশে আঘাতের চিহ্ন। সম্ভবত উড়তে গিয়ে কোনো গাছের ডালে কিংবা পাথরে ধাক্কা খেয়ে বাসা থেকে নিচে পড়ে গিয়েছিল। বৃষ্টির ঠান্ডায় ছোট্ট শরীরটা কাঁপছিল।
হিয়া হাঁটু গেড়ে বসে ঈগলছানাটাকে দুই হাতের তালুতে তুলে নিল। অবুঝ প্রাণীটা ভয়ে কাঁপছিল ঠিকই, তবু তার ক্ষুদ্র নখগুলো হিয়ার আঙুল শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল।

সেদিন প্রথমবার অনেক দিন পর হিয়ার পাথরের মতো শক্ত হৃদয়ে অদ্ভুত এক অনুভূতি জেগে উঠেছিল। সে নিজের হুডি খুলে ঈগলছানাটাকে বুকের কাছে লুকিয়ে নিল, যাতে বৃষ্টির এক ফোঁটাও তার গায়ে না লাগে। সেই রাতেই তাকে নিজের আস্তানায় নিয়ে এসেছিল হিয়া।
নিজের হাতে ক্ষত পরিষ্কার করেছিল, ওষুধ লাগিয়েছিল, ড্রপার দিয়ে খাবার খাইয়েছিল। দিন গড়িয়েছে, মাস কেটেছে। ছোট্ট অসহায় ঈগলছানাটাই ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে আকাশের রাজায়।
আর হিয়ার কাছে সে শুধু একটি পাখি হয়ে থাকেনি। সে হয়ে উঠেছে তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী তার ছায়া।
তাই তো তার নাম রাখা হয়েছিল—শ্যাডো।
টানেলের ভেতরে ফিরে আসতেই হিয়ার মুখের কোমলতা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। আবার ফিরে এল সেই পরিচিত ঠান্ডা, হিসেবি নেতৃত্ব।
সে একবার চারপাশে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“সবাই শুনে রাখো। এই মুহূর্ত থেকে পুরো আস্তানা খালি করা হবে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফাইল, অস্ত্র, সার্ভার, ডকুমেন্ট বা ইকুইপমেন্ট এখানে পড়ে থাকবে না। সবকিছু গুটিয়ে ফেলো।”

তার নির্দেশ শোনা মাত্র সবাই কাজে লেগে গেল। যে যেটার দায়িত্বে ছিল, সেটাই দ্রুত সরিয়ে নিতে শুরু করল।
হিয়া আবার বলল,”কেউ কোনো চিহ্ন রেখে যাবে না। এখানে আমাদের অস্তিত্বের প্রমাণ বলতে কিছুই থাকবে না। আমি ফিরে এসে যদি একটা ভুলও দেখি, কেউ রেহাই পাবে না।”
তার কণ্ঠের কঠোরতায় পুরো টানেলজুড়ে নেমে এল চাপা নীরবতা।মার্ক, ইভানা, জ্যাক প্রত্যেকেই জানত, মিস্ট্রেসের এই নির্দেশ অমান্য করার সাহস কারও নেই।
হিয়া এবার ইভানার দিকে তাকাল।
“বাইক রেডি করো। আমরা এখনই বের হচ্ছি।”
ইভানা এক মুহূর্তও দেরি করল না। “Yes, Mistress.”
কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব প্রস্তুতি শেষ হয়ে গেল।

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১৭

কালো লেদার জ্যাকেটের চেইন টেনে তুলে হিয়া শেষবারের মতো ফাঁকা হয়ে আসা আস্তানার দিকে তাকাল।
তারপর ধীর গলায় বলল, “চল। এবার আয়মান খানের সঙ্গে দেখা করার সময় হয়েছে।”
পরের মুহূর্তেই বাইকের ইঞ্জিন গর্জে উঠল। হিয়া সামনে, ইভানা তার পেছনে। টানেলের অন্ধকার পেরিয়ে তারা দ্রুত ছুটে চলল নতুন এক চ্যালেঞ্জের দিকে।

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here