Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ৪৯

মহামায়া পর্ব ৪৯

মহামায়া পর্ব ৪৯
তুশকন্যা

ভোরের আলো ফুটতেই তিন রমণীর ব্যস্ততার প্রহর শুরু হলো। তড়িঘড়ি ঘুম থেকে উঠে তিনজনেই ভার্সিটির জন্য প্রস্তুতি নিল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে আইজেল কিংবা সাবা’র আচরণে খানিক পরিবর্তন দেখল আনায়া। অবশ্য এটারই আশংকা করেছিল সে। দুজন কোনোভাবেই আনায়ার সাথে খুব একটা কথা বলছে না বিধায়, শেষমেশ আনায়া নিজেই দুজনের কাছে এগিয়ে গেল। আইজেল নিশ্চুপ রইলেও, হঠাৎ সাবা তির্যক সুরে বলল,

“এখন আমাদের কাছে কেনো এসেছিস? দুদিন হলো জার্মানিতে আসিসনি আর টইটই করে দুনিয়া সুদ্ধ ঘুরে বেড়াচ্ছিস। কাল তোর চিন্তায় আমাদের কি অবস্থা হয়েছিল,জানিস কিছু? কত রাত করে বাড়ি ফিরেছিস কে জানে! একটা কিছু হোক না, ওয়েট কর! আমি সোজা তোর বাবাকে ফোন করে সব’টা জানিয়ে দেবো।”
মুহূর্তেই আনায়া হকচকিয়ে গেল। এখানে আবার তার বাবাকে টেনে আনার কি দরকার। তাকে জানে মারবে নাকি এই মেয়ে!
আনায়া নিজেকে শান্ত রেখে বলল,
“আই’ম রিয়েলি সো সরি! আমার ফোনে কোনো নজরই ছিল না আর…আচ্ছা সরি, আমার খেয়াল রাখা উচিত ছিল।”
আনায়া ইনিয়েবিনিয়ে কথা কাটাতে চাইল। সাবা তাচ্ছিল্য করে বলল,
“তোর সরি তোর কাছেই রাখ।”
আইজেল আর বিষয়টাকে বাড়তে না দিয়ে বলল,
“হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে। আর আনায়া, আমিও বলতে বাধ্য হচ্ছি যে তোমার আচরণে দুদিনে বেশ পরিবর্তন এসেছে। এর কারণটা কি বলতে পারবে?”
আইজেলের তীক্ষ্ণ প্রশ্নে আনায়া আরো ভড়কে গেল। বলল,

“মানে?…আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।”
আইজেল ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
“তুমি কিসের জব করছো? এতোরাত করে বাড়ি ফেরাটা কি ঠিক? অন্তত ফোনটার দিকে খেয়াল রাখো। আমাদের তো চিন্তা হয়, তাই না মেয়ে?”
আনায়া আর কথা না পেঁচিয়ে দ্রুত এই ঝামেলা কাটিয়ে উঠতে চাইল। সে ইনয়ী-বিনয়ী আচরণে আলতোসুরে বলতে লাগল,
“সরি,সরি,সরি। আর কখনো এমন হবে না। আসলে ঐ কোম্পানিতে স্যালারি অনেক ভালো তো…তাই কাজের প্রেসারটাও অনেক। কি করব বলো?”
সাবা এবার ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“কিন্তু হঠাৎ তোর এতো কিসের টাকার প্রয়োজন পড়ল যে, আলাদা করে পার্টটাইম জব করতে হচ্ছে? আঙ্কেল তো মাসে মাসে যথেষ্ট বড় একটা এমাউন্ট তোকে পাঠায়,তবে?”
আনায়া প্রশ্নের উত্তর গোছাতে গিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। পাশ থেকে আইজেল তার সাপেক্ষে বলল,
“সাবা, সবসময় ফ্যামিলির উপর নির্ভরশীল না হয়ে আত্মনির্ভরশীল হওয়াটা কি খারাপ? আমার মনে হয়না আনায়া খারাপ কিছু করছে। তবে ওর নিজের খামখেয়ালী নিয়ে আরেকটু সচেতন হওয়া প্রয়োজন।”

সকালের আলোচনা কোনোরূপ এভাবেই কেটে গেল। তিন দস্যি মেয়ে এবার ভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। সাবা চলে গেল নিজের ডিপার্টমেন্টে আর আনায়া-আইজেল চলল তাদের ডিপার্টমেন্ট। আজকেও শুরুতে প্রফেসর ভিকে নামক সেই যন্ত্রমানবের ক্লাস আছে। কিন্তু আনায়া আজ এই বিষয়টায় খুব একটা খুশি হতে পারছে না। হঠাৎ করে এক রাতের মাঝেই লোকটার উপর তার বেশ রাগ কিংবা আক্রোশ জমেছে। ফলাফলসরূপ এখন তার চোখে-মুখে চপলতার পরিবর্তে এক থমথমে গম্ভীর্য ফুটে উঠেছে।
পাশে আইজেল একের পর এক গল্প-আলাপ করলেও, আনায়ার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে কেবল একমনে হু-হা করে চলেছে।

প্রকাণ্ড আকৃতির ক্লাসরুমে ঢুকে দুজন সামনের সারি হতে খানিকটা পেছনের দিকে, কোণায় চুপচাপ বসে পড়ল। নির্ধারিত সময়টুকু ঘনিয়ে আসতেই, গম্ভীর থমথমে এক মেজাজ নিয়ে প্রফেসর ভিকের আগমন হলো। কালো ফর্মাল শার্ট-প্যান্ট কিংবা বুটের সাথে, গায়ে একখান ব্ল্যাক-এ্যাশ মিশ্রিত রঙের টুইড ওভারকোট। চুলগুলো অবিন্যস্ত মনে হলেও তা যথেষ্ট গোছালো; বাম হাতের কব্জিতে সিলভার হ্যান্ডওয়াচ আর ডানহাতে কিছু ফাইল ও রেফারেন্স বই। অন্যান্য দিনের চেয়ে আজকে তাকে একটু অন্যরকম ও বিশেষ মনে হওয়ায়, কমবেশি সকলেই ক্লাসের শুরুতে কিছুটা আনমনে ফিসফিস করে নিল।
না! এখন আর আনায়া’র মনে তাকে দেখে বিশেষ কোনো আলোড়নের সৃষ্টি হলো না। বাদবাকি স্টুডেন্টদের মতো সে স্বেচ্ছায় চুপটি করে বসে রইল। অতঃপর ক্লাস শুরু হলো। রুলস মোতাবেক কেউই অন্তত এই ক্লাসে কানাঘুষা কিংবা ফিসফিসানোর দুঃসাহস করতে চাইল না।

প্রফেসর সাহেব নিজের মতো লেকচার দিচ্ছেন, রেফারেন্স বুক হতে নানান নোট তুলে দিয়ে পেছনের মস্তবড় বোর্ডটায় একের পর এক সমীকরণ কিংবা জটিল হিসাবনিকাশ বোঝাচ্ছেন। যেন বর্তমানে নিজের এই পেশাদারিত্বের কাজটুকু ব্যতীত তার অন্য কোনোদিকেই নজর দেবার মতো নূন্যতম সময় নেই। অন্যদিকে জোর করে হলেও প্রত্যেকেই কাটকাট লেখায় সেসব নোট খাতায় তুলে নিতে ব্যস্ত।
থমথমে রূদ্ধশ্বাস মুহূর্তটুকু বেশ ভালোভাবেই আজ কেটে গেলেও, ক্লাসের মাঝ পর্যায়ে প্রফেসর ভিকে হঠাৎ বইয়ের পাতায় নজর রেখেই, ক্লাসের এক কোণার দিকে হাত তুলে ইশারা করে জার্মান সুরে বলল,
“স্ট্যান্ড আপ!”
আজ মনযোগ দিয়ে নোট করার চক্করে আনায়া’র হুঁশেও ছিল না,এই যন্ত্রমানব শেষমেশ তাকেই দাঁড় করাবে। আশেপাশে বসে থাকা আইজেল সহ বাকিরাও কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়ে ভাবল—এইমূহূর্তে প্রফেসর কাকে দাঁড়াতে বলছে!

তবে আনায়া’র হয়তো বুঝতে খুব একটা দেরি হলো না। ততক্ষণে প্রফেসর সাহেব তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মুখ তুলে আনায়া’র দিকেই তাকিয়েছে। দুজনের শান্ত-থমথমে দৃষ্টি একে-অপরের সাথে মিলে যেতেই, আনায়া ভারী শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল।
আনায়া দাঁড়ানো মাত্রই প্রফেসর তার কাটকাট জার্মান সুরে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“বোর্ডে যে থার্মোডাইনামিক সাইকেলের সমীকরণটা লিখেছি, ওটার সেকেন্ড ল’ অ্যানালাইসিস কী হবে? এক্সপ্লেইন দ্য এনট্রপি জেনারেশন ইন দিস স্পেসিফিক স্টেট।”
​আনায়া শুরুতেই কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও নিজের ভেতরের জড়তা কাটিয়ে স্পষ্ট স্বরে জার্মান ভাষায় উত্তর দিতে লাগল। ভুল করে অন্য কোনো ভাষা প্রয়োগ করলে তখন আবার নতুন ঝামেলা। সে বেশ গুছিয়েই সমীকরণের প্রথম অংশটুকু ব্যাখ্যা করল। ভেবেছিল একটা প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়ে দিলেই হয়তো কেনীথ এবার থেমে যাবে এবং তাকে বসতে বলবে। কিন্তু না, এই কঠোর পুরুষ তেমন কিছুই করল না। সে আনায়ার উত্তরের রেশ ধরেই, চোখের পলক না ফেলে লাগাতার আরও একটি জটিল প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,

​”উত্তরের প্রথমাংশ ঠিক থাকলেও লজিক্যালি একটা গ্যাপ রয়ে যাচ্ছে। যদি সিস্টেমে ইরিভার্সিবিলিটি বেড়ে যায়, তবে এফিশিয়েন্সির গ্রাফে তার ইমপ্যাক্ট কেমন পড়বে? ডিরাইভ দ্য রিলেশন রাইট নাও।”
​হঠাৎ এই পাল্টা প্রশ্নে আনায়ার অবস্থা ভেতর থেকে একদম নাজেহাল হয়ে উঠল। ক্লাসের শত শত শিক্ষার্থীর সামনে কেনীথের এই তীক্ষ্ণ ও জেরা করার মতো চাউনি তার স্নায়ুর ওপর ক্রমশই প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছিল। সে শুকনো ঢোক গিলে মস্তিস্কে দ্রুত হিসাব মেলাতে লাগল। এই লোক আসলে তার সাথে কোন শত্রুতার রেশ মেটাচ্ছে, তা সে কোনোভাবেই বুঝতে পারছে না।
গানিতিক হিসেব মেলানোর পাশাপাশি আনায়া এ-ও ভাবল,—”এভাবে প্রশ্নের নামে জেরা করে, কোনোভাবে কি উনি গতরাতে আমায় ঠেসেঠুসে খাওয়ানোর খরচা তুলছেন? কিন্তু আসার সময় তো টাকা আমি সিটের পাশে রেখে এসেছিলাম। উনি কি তা দেখেননি?”

​আনায়া নিজের কাঁপতে থাকা হাত দুটো খাতার ওপর শক্ত করে চেপে ধরে, কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে পুনরায় উত্তর দিতে শুরু করল। সে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে গ্রাফের পরিবর্তনটুকু মুখে মুখে ডিফাইন করল। কিন্তু কেনীথের যেন তাতেও মন ভরল না। সে ডেস্কের ওপর দুহাত রেখে সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকে এসে, আরও এক ধাপ নিরেট স্বরে শেষ প্রশ্নটিও করল,
​”গুড। বাট হোয়াট অ্যাবাউট দ্য থার্মাল বাউন্ডারি লেয়ার? যদি রেনল্ডস নাম্বার দ্বিগুণ করা হয়, তবে হিট ট্রান্সফার কো-এফিশিয়েন্টের ওপর ম্যাথমেটিক্যাল ইফেক্ট কী হবে?”
​এবার আনায়া পুরোপুরি থমকে গেল। ক্লাসরুমের পিনপতন নীরবতার মাঝে নিজের হৃদস্পন্দন যেন সে নিজেই শুনতে পাচ্ছিল। পাশ থেকে লারিসা আর আইজেলও বেশ আতঙ্কিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে বিড়বিড় করল,

“খোদা, এইদিন যেন আমারও আসে একদিন। এই সব কিছুর শোধ আমি তুলব।”
আনায়া দাঁত কিড়মিড়িয়ে ভারী শ্বাস ফেলল। তার সর্বশক্তি আর মেধা এক করে, কেনীথের চোখের দিকে তাকিয়ে, অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে শেষ জটিল সমীকরণটির উত্তরও নিখুঁত জার্মান ভাষায় শেষ করল।
​উত্তর দেওয়া শেষ হতেই পুরো ক্লাসরুমে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এল। কেনীথ কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা না বলে, নিস্পৃহ ও ভাবলেশহীন চোখে আনায়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টিতে কোনো প্রশংসার আভাস তো দূর, সামান্যতম নমনীয়তাও নেই।
​অতঃপর হাতের মার্কার পেনটা পুনরায় তুলে নিয়ে, কোনো রকম রসকস ছাড়া অত্যন্ত শীতল ও রাশভারী গলায় সে আদেশ ছুড়ল,
​”সিট ডাউন।”

বলেই সে বোর্ডের দিকে ঘুরে দাড়াল। সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
“নেক্সট টাইম ক্লাসে রেসপন্স করতে যেন কারো এতটা সময় না লাগে।”
​আনায়া আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে না থেকে ধপ করে নিজের সিটে বসে পড়ল। তার বুকটা তখনো দ্রুত ওঠানামা করছে।পড়াশোনায় ছোট থেকেই বেশ মেধাবী হওয়ার সুবাদে আনায়ার কাছে এইটুকু প্রত্যাশা করাটাও অবশ্য বৃথা নয়৷ তবে সমস্যা হচ্ছে ইদানীংকালে; মেয়েটা ঠিকমতো পড়াশোনাটাও করতে চাচ্ছে না। মাথার মধ্যে যেন আজবসব পাগলামির ভূত ঢুকেছে।
এই যাত্রায় ভালোমতোই বেঁচে গিয়েছে ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল আনায়া। কিন্তু হুট করে কেনীথের প্রতি মেজাজটাও যেন ধীরে ধীরে রুক্ষ হতে লাগল। লোকটাকে কেন যেন এখন আর সহ্য হচ্ছে না। ইচ্ছে করছে ধরে হাত-পা বেধে পিটাতে পারলে তার শান্তি হতো। হ্যাঁ, আনায়ার ভাবনায় এমনই দুঃসাহসিক চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। যেসব ভাবনায় একটা সময় পর আনায়া নিজেই নিজের প্রতি বিরক্ত হচ্ছে।

ক্লাস শেষ হতেই আরো দুটো জটিল টপিকের ক্লাস চলল। মধ্য বয়স্ক হতে বৃদ্ধ—ভার্সিটির নামকরা আরো দুজন প্রফেসর তাদের ক্লাস নিল।ক্লাসগুলো শেষ হতেই যেন একেকজনের হাত-পা সহ মাথা অবশ হওয়ার জো। কোনোমতো ক্লাসগুলো শেষ হতো না হতেই শুনল, আজ তাদের ল্যাবে যেতে হবে। আবার ল্যাব শেষে অডিটোরিয়ামেও একটা ছোট্ট ইভেন্টও আছে।
আইজেল, আনায়া,ব্রাজিলিয়ান লারিসা এবং জার্মান ছেলে জেইন—চারজন বিধস্ত ভঙ্গিতে সবার সাথে তাল মিলিয়ে ল্যাবের দিকে হেটে চলেছে। আনায়ার মেজাজ অতিমাত্রায় খিটখিটে হওয়ায় সে সম্পূর্ণ চুপচাপ। পাশে থাকা আইজেল বিরক্তিতে ফিসফিস করছে,
“আগে জানলে সুন্দরমতো বিয়েটা সেড়ে নিতাম। কে জানত, পড়াশোনা এতো জটিল। আমার তো হাত-পা ছড়িয়ে কান্না করতে ইচ্ছে করছে।”
তার কথা শুনে আনমনা আনায়া তাচ্ছিল্যের সহিত ক্ষীণ হাসল। মনে মনে ভাবল,
“বিয়ে করেছি একযুগ আগে; স্বামীও আছে, শ্বশুর বাড়িও আছে। কিন্তু না আছে সংসার আর না আছে জাতের কপাল। থাকার মধ্যে আছে একটা ভাবের স্বামী। উঠতে-বসতে আমায় নাকানিচুবানি খাওয়ানো ব্যতীত যার আর কোনো কাজ নেই।”

আনায়ার কথাগুলো মনের গোপনেই চাপা পড়ল। ওদিকে লারিসা আর জেইন তখন পড়াশোনার আলোচনায় ব্যস্ত। আনায়া’র পাশে থাকা জেইন হঠাৎ সবার উদ্দেশ্যে বলল,
“তোমাদের মধ্যে গান কে গাইতে পারো?”
তার কথা শুনে আইজেল ভ্রু কুঁচকে বলল,
“হাম আভি ল্যাব জা রাহে হ্যাঁয়। এক্সপেরিমেন্ট কে নাম পার তো হামারা দিমাগ ওয়াহীঁ ইন্তেকাল ফারমায়েগা। ওর আব তুম গানে কি বাতেইঁ চ্ছেড় রাহে হো?”
জেইন কিংবা লারিসা কেউই তার কথা বুঝতে না পেরে হা করে তাকিয়ে রইল। আনায়া পাশ থেকে আনমনে আইজেলের কাঁধ চাপড়ে থমথমে সুরে বলল,
“আইজেল বেইবি…কান্ট্রোল, কান্ট্রোল। জিন্দেগী তো এক হাসিনা হে, জো হাসিনা হামরা পাসিনা নিকাল দে।”
মূহুর্তেই আইজেল থমকে গেল। এটা আবার কিরকম কথা। যে কথার নেই আগা নেই মাথা। আইজেল ভ্রু কুঁচকে মুখ বাড়িয়ে আনায়ার দিকে তাকাতেই আনায়া খানিক থতমত খেয়ে গেল। থমথমে মেজাজ মূহুর্তেই উড়িয়ে দিয়ে অপ্রস্তুত সুরে বলল,

“এটাই বলছি যে, ওদের উপর রাগ করে লাভ নেই। ওরা আমাদের ভাষা বুঝবে না। আর… আমার উর্দু তেমন ভালো না। ভুল হলে সরি।”
বলেই সে কথার প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে, জেইনের দিকে তাকিয়ে জার্মানে বলল,
“জেইন তুমি হঠাৎ গানের কথা কেনো জিজ্ঞেস করলে?”
জেইন স্বাভাবিক সুরে বলল,
“ল্যাব-ক্লাস শেষে অডিটোরিয়ামে যে ইভেন্টের জন্য ডেকেছে, ওখানে আজ স্টুডেন্টদের মাঝে অনেকেই গান গাইবে। তোমাদের মধ্যে কেউ গাইবে কিনা, তাই জিজ্ঞেস করলাম।”
আনায়া ভ্রু কুঁচকে খানিক কটাক্ষ করে বলল,
“আমরা জার্মান গান গাইলে, এদেশের ছেলেমেয়ে আমাদের এদেশ থেকেই বের করে দেবে।”
লারিসা পাশ থেকে বলল,

“ভুল ভাবছো, জার্মান গান গাইতে হবে এমন কোনো কথা নেই। যে কোনো ভাষায় গান গাইলেই হবে। সেটা তোমার নিজ দেশের ভাষাই হোক না কেনো!”
এই পর্যায়ে হঠাৎ আইজেল প্রশ্ন করল,
“সবই তো বুজলাম কিন্তু হঠাৎ এই ইভেন্টের কারণটা কি? ক্লাস-ল্যাবের নামে একেকটা বাঁশ দেওয়ার পর, শেষে সার্কাসের জোকার বানিয়ে আমাদের দিয়েই আবার গান গাওয়াবে?”
আইজেলের বিরক্তিতে লারিসা ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
“এভাবে বলো না! শুনলাম আমাদের ডিপার্টমেন্টের একজন প্রফেসর অবসরে যাচ্ছেন। সেটারই একটা এনাউন্সমেন্ট হবে, আর অন্য আরেকজন প্রফেসর সেই সিনিয়র প্রফের র‍্যাং পাবেন।”
লারিসার কথা শুনে আইজেল ভ্রু উঁচিয়ে ভারী শ্বাস ফেলে আওড়াল,
“ওহ আচ্ছা, তাহলে এই ঘটনা।”

এরূপ আরো নানান আলোচনা করতে করতে চারজন সবশেষে ল্যাবে গিয়ে উপস্থিত হলো। ততক্ষণে ল্যাবে যে যার মতো টিম আকারে প্রতিটি ডেস্কের সারিতে উপস্থিত। চারজনের ছায়া দরজার চৌকাঠে পড়তেই, আনায়া একজনের উপস্থিতিতে কিঞ্চিৎ থমকে গেল। পাশ থেকে আইজেলও খানিক কৌতুহল নিয়ে বলল,
“আজ ল্যাবও কি ভিকেই নিবে?”
তার কথা শুনে লারিসা ফিসফিস করে বলল,
“হুঁশ, প্রফেসর ভিকে বলো।”
আইজেল আর কথা বাড়াল না। জেইন অনুমতি নিতেই কেনীথ তাদের দেখেও না দেখার ভঙ্গিতে ভেতরে আসতে ইশারা করল। চারজন মিলে ধীরস্থিরতে ল্যাবের এককোণের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। আগ বাড়িয়ে রিস্ক নেওয়ার কোনো মানেই হয়না। এরচেয়ে ব্যাকবেঞ্চার হওয়া ঢের ভালো।
এই পর্যায়ে আইজেল খানিক মজা করে, জেইনের উদ্দেশ্যে বলল,
“তুমি তো বেশ ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিলে, হঠাৎ আমাদের তিনজনের মাঝে ফেঁসে নিজেকে বরবাদ কেনো করছো?”

জেইন তার কথায় খানিক হকচকিয়ে গেল। অপ্রস্তুত হয়ে মাথা চুলকে মুচকি হাসল। তার অদ্ভুত আচরণে আইজেলের কিছু একটা সন্দেহ হলেও ঠিক আন্দাজ করতে পারল না।
ওদিকে আনায়া আর লারিসা বেশকিছুদিন ভার্সিটিতে অনিয়মিত থাকায়,আজ হঠাৎ ল্যাবের সাজসজ্জা বেশ কৌতূহল নিয়ে দেখে চলেছে। চোখজোড়া বিস্ময়ে খানিকটা চড়কগাছ হয়েছে। জার্মানির মিউনিখ টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির কিংবা সংক্ষেপে TUM মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাবের যে বিশ্বমানের সুনাম, তা এখানে প্রতিটি কোণায় দৃশ্যমান। চারপাশের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমাহার দেখে তারা কিছুটা অবাক না হয়ে পারল না।

​অটোমেটেড ওয়ার্কস্টেশন বা প্রতিটি ডেস্কের সাথে যুক্ত উন্নতমানের থ্রিডি সিমুলেশন মনিটর এবং রিয়েল-টাইম ডেটা অ্যানালিটিক্স সফটওয়্যার।ল্যাবের একপাশে সুক্ষ্ম মেকানিক্যাল অ্যাসেম্বলির জন্য সারিবদ্ধভাবে রাখা আছে জার্মান প্রযুক্তির নিউমেটিক ও হাইড্রোলিক রোবোটিক আর্মস ও প্রোটোটাইপিং টুলস।হাইজিন স্ট্যান্ডার্ডের ক্ষেত্রে চারপাশ অত্যন্ত নিখুঁত ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। কাঁচের ঘেরা সংলগ্ন ক্যাবিনেটে সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে লেজার সেফটি গগলস, থার্মাল রেজিস্ট্যান্ট গ্লাভস এবং অ্যান্টি-স্ট্যাটিক ল্যাব কোট।বাস্তবিক অর্থেই একটি বিশ্বমানের ল্যাবে যা যা থাকা সম্ভব, তার সবকিছুই খানে বিদ্যমান।
​দুজনের চারপাশটা অবলোকনের মাঝেই, কেনীথ নিজের গায়ের ফর্মাল ওভারকোটটি খুলে একপাশে রাখল। সাদা ল্যাব এপ্রন ও হাতে গ্লাভস গলিয়ে নিতে নিতে সে উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে গম্ভীর স্বরে বলল,
—“প্রত্যেকটা ডেস্কের ওপর একটি করে ইনস্ট্রাকশন ম্যানুয়াল রাখা আছে। কাজে হাত দেওয়ার আগে ওটা প্রত্যেকে একবার ভালোমতো রিডআউট করে নাও। সকলে রুলস-রেগুলেশনস বজায় রাখবে। সামনের কাউন্টারে অ্যাপ্রন, গ্লাভস আর প্রপার সেফটি ইকুইপমেন্ট রাখা আছে। গাইডলাইন পড়া শেষ হলে ওখান থেকে ওগুলো দ্রুত কালেক্ট করে নাও।”

​প্রফেসরের নির্দেশ পাওয়া মাত্রই সবকটা স্টুডেন্ট একসঙ্গে কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই এপ্রন ও গ্লাভস নেওয়ার জন্য জায়গাটিতে বেশ ভিড় জমে উঠল। আনায়া এই জটলা পছন্দ করল না। সে ভিড় থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো নিয়ে, কৌশলে বেরিয়ে এসে ল্যাবের একটি নির্জন কোণায় গিয়ে দাঁড়াল। গায়ের ওপর এপ্রনটা জড়িয়ে নিলেও, একা একা পেছনের বেল্টটা বাঁধতে গিয়ে সে বেশ ঝামেলায় পড়ে গেল। দুই হাত পেছনে নিয়ে সে আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে লাগল বেল্ট দুটোকে একসাথে করার। ঠিক তখনই, কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই, পিঠে এক অপ্রত্যাশিত হাতের স্পর্শ পেয়ে সে চমকে উঠল।
​বিস্ময় আর অস্বস্তি নিয়ে ঝট করে পেছনের দিকে নজর ফেরাতেই আনায়া সম্পূর্ণ স্তব্ধ হলো। তার একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং কেনীথ! কেনীথকে এত কাছে দেখে আনায়া কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে লড়চড় করতে চাইল, কিন্তু কেনীথ অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তার এপ্রনের বেল্টটা টেনে ধরে তাকে এক জায়গায় স্থির দাঁড় করিয়ে রাখল।

​আনায়া শুকনো ঢোক গিলে মনে মনে ভাবল, এই লোক আচমকা এখানে কী করছে?
​ততক্ষণে বাকিদের নজর এড়িয়ে অত্যন্ত নিপুণতার সাথে কেনীথ আনায়ার এপ্রনের বেল্টটা টেনে ঠিকঠাকভাবে হুকের সাথে বেঁধে দিল। বেল্ট লাগানো শেষ করে সে পেছন হতে, আলতো করে আনায়ার কানের কাছে ঝুঁকল; নিচু গলায় তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
​”সব জায়গায় পাকনামি করে বেড়াস—কাজের বেলায় কিছু করতে পারিস না কেন?”
​কথাটা শুনেই আনায়া তৎক্ষণাৎ পেছনে ফিরে তাকাল। কেনীথের ললাটে তখন বিরক্তির সূক্ষ্ম ভাঁজ; তীব্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে আনায়ার দিকেই চেয়ে আছে। কাউন্টারের ভিড় ততক্ষণে কমতে শুরু করেছে। চারপাশের মানুষের নজর এড়াতে কেনীথ যেই না নিজের ডেস্কের দিকে পা বাড়াতে যাবে, পেছন থেকে আনায়া অত্যন্ত চাপা গলায় ধারালো স্বরে ডেকে উঠল,

​”থামুন।”
​কেনীথ ভ্রু যুগল কুঁচকে অসন্তোষ নিয়ে পেছনে মুখ ফেরাল। আনায়া ল্যাবের দূরের এক প্রান্তে থাকা, একটি ছেলে আর দুটি মেয়ের দিকে ইশারা করল। মুখে এক চিলতে ত্যাছড়া হাসি ফুটিয়ে, শান্ত সুরে বলল,
​”ঐ ছেলে আর মেয়ে দুটোও তো ঠিকমতো বেল্ট লাগাতে পারছে না। আপনি গিয়ে ওদেরও একটু সাহায্য করে দিন না, ভিকে স্যারররর!”
​রমণীর অভিব্যক্তির খোঁচা এবং শ্লেষাত্মক ইঙ্গিতটি বুঝতে কেনীথের এক মুহূর্তও সময় লাগল না। দুনিয়া উল্টেপাল্টে এদিক-সেদিক হয়ে গেলেও যে এই মেয়ের ত্যাড়ামি আর মুখের ওপর জবাব দেওয়া বন্ধ হবে না, তা সে খুব ভালো করেই জানে। কবে যে এই মেয়ে তার হাতে উত্তম-মধ্যম খাবে, তা কেবল ওপরওয়ালারই মালুম!
​কেনীথ চোখ রাঙিয়ে রাগ দেখাতে চাইল, কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে আর কিছু বলল না। একরাশ থমথমে গাম্ভীর্য মুখে মেখে সে নিজের ডেস্কের দিকে পা বাড়াল।
সে চলে যেতেই আনায়া মুখ ভেঙচিয়ে, নিজের টিমমেম্বারদের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। আইজেল তাকে নিজের পাশে দেখেই প্রশ্ন ছুড়ল,

“আনায়া, দিনদিন তুমি খুবই অদ্ভুত হয়ে যাচ্ছো। হুটহাট চোখের আড়ালে এতদ্রুত কিভাবে চলে যাও, বলতো?”
আনায়া চোখ পিটপট করে শান্ত সুরে বলল,
“ভিড় ছিল দেখে একটু কোণায় গিয়েছিলাম, অদ্ভুত কেনো বলছো?”
আইজেল আর কথা বাড়াল না। ইদানীং আনায়ার কোনোকিছুই তার স্বাভাবিক ঠেকছে না। কিছু না কিছু তো ঝামেলা নিশ্চিত আছে এই মেয়ের মাঝে!

ল্যাবের বিশালায়তন কক্ষজুড়ে এখন কেবল যান্ত্রিক গুঞ্জন আর মৃদু টুংটাং শব্দ। ব্যাচেলর ফার্স্ট ইয়ারের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থীদের জন্য আজকের প্রজেক্টটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের কাজ ছিল মূলত বেসিক মেকানিক্যাল কম্পোনেন্টস অ্যাসেম্বলি এবং থ্রিডি ক্যাড মডেলের সাথে বাস্তবের প্রোটোটাইপের সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা। স্ক্রু-ড্রাইভার, ক্যালিপার্স এবং মাইক্রোমিটারের মতো নিখুঁত পরিমাপক যন্ত্রগুলো একেকটি ডেস্কে চকচক করছে।
এক দক্ষ প্রফেসর রূপে ভিকে তার গম্ভীর পদচারণায় পুরো ল্যাব ঘুরে ঘুরে দেখছিল। ডেস্কের লাইনের মাঝখান দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে উচ্চস্বরে নির্দেশনা দিচ্ছে,
​”লিসেন আপ, এনিওয়ান! ফার্স্ট ইয়ারে তোমাদের বেসিক মেকানিক্সের ওপর গ্রিপ আনাটা সবচেয়ে জরুরি। ডেস্কের ওপর রাখা ব্লু-প্রিন্টটা ভালোমতো খেয়াল করো। ডোন্ট রাশ; প্রতিটি কম্পোনেন্টের অ্যালাইনমেন্ট নিখুঁত হতে হবে। যদি সামান্য এক মিলিমিটারের এদিক-সেদিক হয়, তবে পুরো প্রজেক্ট কিন্তু ফেইল করবে। সো, বি কেয়ারফুল অ্যান্ড প্রিসাইজ।”

​অন্যদিকে আনায়া নিজের ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে কাজ করার চেষ্টা করছিল ঠিকই, কিন্তু তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল কেনীথের দিকে। সে আড়চোখে দেখছিল, কেনীথ একেকটি ডেস্কের সামনে গিয়ে কিভাবে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে স্টুডেন্টদের হাতের কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছে। কখনো সে নিজেই কোনো কম্পোনেন্ট হাতে নিয়ে জ্যামিতিক ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দিচ্ছে।
​কিন্তু বিপত্তি বাধল অন্য জায়গায়। প্রজেক্টের কাজ বোঝার অজুহাতে যখনই কোনো মেয়ে শিক্ষার্থী কেনীথের সামান্য একটু গা ঘেঁষে দাঁড়াচ্ছে, কিংবা একটু বেশি ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছে, দূর থেকে তা দেখেই আনায়ার ভেতরে যেন তড়িৎপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এক তীব্র নামহীন ঈর্ষায় সে মনে মনে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠতে লাগল। বুকের ভেতরটা কেন অমন তোলপাড় করছে, তার কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে না পেলেও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছিল সে।
​মানসিক এই অস্থিরতার প্রভাব গিয়ে পড়ল তার হাতের কাজে। মেকানিক্যাল পার্টসগুলো জুড়তে গিয়ে সে বারবার তালগোল পাকিয়ে ফেলছিল। স্ক্রু লাগাতে গিয়ে নাট ফেলে দিচ্ছে, আবার ভুল ডায়াগ্রামে হাত দিচ্ছে।

​তার এই অসংলগ্নতা লারিসা, জেইন আর আইজেলের চোখ এড়াল না। আনায়াকে বারবার ভুল করতে দেখে জেইন খানিকটা ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল,
“আনায়া, এসব কী করছ? মনোযোগ দাও! নাটটা উল্টো ঘোরাচ্ছ তো।”
​পাশ থেকে লারিসাও তার হাত টেনে ধরে সতর্ক করল,
“আরে সাবধানে! ওটাকে ওভাবে টেনো না, ভেঙে যাবে।”
​আইজেলও কিছুটা চিন্তিত হয়ে বলল,
“কী ব্যাপার তোমার? হঠাৎ করে নার্ভাস হয়ে পড়লে কেন? একটু সাবধানে কাজ করো।”
​বন্ধুদের এতসব সতর্কবার্তার কোনোটিই আনায়ার কানে পৌঁছাল না। তার পুরো ধ্যান-জ্ঞান তখন আটকে আছে কেনীথের ওই দিকটায়। আর ঠিক এই অন্যমনস্কতার মাঝেই সে ঘটিয়ে ফেলল এক অঘটন। যেন পৃথিবীর বুকে মূহুর্তে মূহুর্তে অঘটন ঘটাতেই এই রমণীর সৃষ্টি।
ডেস্কের ওপর রাখা একটি অত্যন্ত ধারালো প্রোটোটাইপিং কাটিং-টুলস সরাতে গিয়ে, অসাবধানতাবশত তার বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির বেশ খানিকটা অংশ গভীরভাবে কেটে গেল।
​”আহ!”

আনায়ার মুখ থেকে কেবল একটি চাপা আর্তনাদ নির্গত হলো। মুহূর্তের মধ্যে ক্ষতস্থান থেকে দরদর করে রক্ত ঝরতে শুরু করল। তা দেখে পাশে থাকা আইজেল আর জেইন রীতিমতো আঁতকে উঠল। লাল রক্তে ডেস্কের ওপর রাখা সাদা পেপারের একাংশ নিমেষেই ভিজে উঠল। আইজেল দুই চোখে চরম বিস্ময় আর উদ্বেগ নিয়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল,
“ওহ নো! আনায়া, এটা কী করে ফেললে তুমি?”
​ল্যাবের এক কোণে হঠাৎ এই চাপা হট্টগোল আর কানাঘুষা মূহূর্তেই এই শান্ত পরিবেশকে বিঘ্নিত করল। আর নিমেষেই সেই গোলমাল কেনীথের তীক্ষ্ণ নজরে চলে এল। আনায়ার ডেস্কের দিকে চোখ পড়তেই কেনীথের চোখের মণি সংকুচিত হলো। সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। বাকি স্টুডেন্টদের ভিড় ঠেলে, প্রায় হন্তদন্ত হয়ে সে আনায়ার ডেস্কের সামনে এসে হাজির হলো।
​কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই, কেনীথ অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে আনায়ার রক্তাক্ত হাতখানা নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় টেনে নিল। কেনীথের এই আকস্মিক ও তীব্র সান্নিধ্যে আনায়া চরম মাত্রায় অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। হাতের তীব্র যন্ত্রণা যেন এক নিমেষে উবে গেল; তার বদলে এক অদ্ভুত বিস্ময়ের ঘোর তাকে গ্রাস করল। সে শুকনো ঢোক গিলে অবোধের মতো কেনীথের থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
​কেনীথের মুখাবয় তখন এক চরম রণমূর্তিতে রূপ নিয়েছে। কপালে চিন্তার ভাঁজ আর চোখে এক অগ্নিকুণ্ডের উত্তাপ। সে ক্ষিপ্র গলায় আশেপাশের স্টুডেন্টদের আদেশ দিল,
“গো অ্যান্ড গেট দ্য ফার্স্ট এইড বক্স, রাইট নাও!”

​প্রফেসরের এমন বজ্রকণ্ঠ শুনে সবার আগে জেইন আর আইজেলই ল্যাবের ক্যাবিনেটের দিকে ছুটে গেল ফার্স্ট এইড বক্সটা আনার জন্য। ল্যাবের বাকি শিক্ষার্থীরা তখন উৎসুক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে আছে। কেনীথ চারপাশের লোকচক্ষুর তোয়াক্কা না করে নিজের পকেট থেকে একটি ধবধবে সাদা রুমাল বের করল; অত্যন্ত সাবধানে আনায়ার ক্ষতস্থানে চেপে ধরল। কেবল আনায়ার কান অব্দি পৌঁছায় এমন নিচু স্বরে, প্রচণ্ড রাগান্বিত চাপা কন্ঠে বলে উঠল,
“দেখেশুনে কাজ করতে পারিস না, ইডিয়ট!”
​কেনীথের এই আচমকা ধমকে আনায়া যেন আরও তটস্থ হয়ে পড়ল। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সে আবারও একটা শুষ্ক ঢোক গিলল। ততক্ষণে রক্তের প্রবাহ এতটাই বেশি ছিল যে রুমাল ভেদ করে ডেস্কের বেশ কিছুটা অংশ লাল হয়ে উঠেছে।
​পর মুহূর্তেই আইজেল আর জেইন হাপাতে হাপাতে ফার্স্ট এইড বক্সটি এনে কেনীথের সামনে রাখল। কেনীথ আর এক সেকেন্ডও সময় অপচয় করল না। সে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে রুমালটি সরিয়ে রক্তটুকু পরিষ্কার করল এবং ক্ষতস্থানে অ্যান্টিসেপটিক লিকুইড লাগিয়ে দিল।
​এতক্ষণ কাটার জায়গায় এক ধরনের অবশ অনুভূতি থাকায় তীব্রতা বোঝা যায়নি। কিন্তু তরল ঔষধটুকু ক্ষতের ওপর স্পর্শ করতেই আনায়া যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল। তীব্র ব্যথায় সে নিজের চোখ-মুখ শক্ত করে খিঁচে নিল।

​আনায়ার এই যন্ত্রণাকাতর মুখচ্ছবি দেখে কেনীথের চোয়াল আরও শক্ত ও দৃঢ় হয়ে উঠল। তার ভেতরের রাগটা যেন আরও চড়ে গেল। এই মুহূর্তে সবার সামনে মুখে চারটে কড়া কথা শোনানোর চেয়ে, এই অসভ্য-খামখেয়ালি মেয়েটার গালে ঠাস করে দুটো চড় বসিয়ে দিতে পারলে বোধহয় তার শান্তি হতো! কিন্তু সে নিজের রাগটা আপাতত ভেতরেই চেপে রাখল।
​অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সাবধানতার সাথে, কেনীথ ক্ষতস্থানের ওপর একটি ছোট ব্যান্ডেজ টেপ শক্ত করে লাগিয়ে দিল। ল্যাবের আশেপাশের বাকি শিক্ষার্থীরাও ততক্ষণে বেশ কৌতুহল আর কিছুটা উদ্বেগ নিয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। ‘ভিকে’ নামটা কেবল ইউরোপের নামকরণ রহস্যময় রকস্টার ব্যান্ডের লিডার, রেসার কিংবা সফল ইন্ডাস্ট্রিয়াল টাইকুনের নয়। সে বিশ্ব র‍্যাংকিং এ অন্যতম এক প্রকৌশলী ভার্সিটির একজন প্রফেশনাল প্রফেসর; এই ঘটনাটি যেন শিক্ষার্থীদের মনে অন্য কোনো রসালো ভাবনা বা সন্দেহের জন্ম না দেয়, তাই ব্যান্ডেজ করা শেষ হতেই সে নিজেকে দ্রুত সামলে নিল। চোখের পলকে নিজের ভেতরের সমস্ত উদ্বেগ আর রাগ-চিন্তা ঝেড়ে ফেলে, পুনরায় সেই চেনা থমথমে গুরুগম্ভীর ব্যক্তিত্বের আড়ালে নিজেকে ঠেকে নিল।
ল্যাবের বাদবাকি সবার উদ্দেশ্যে গম্ভীর কণ্ঠে দৃঢ়তার সাথে বলল,

“এভরিথিং ইজ আন্ডার কন্ট্রোল…। সবাই নিজেদের ডেস্কে ফিরে যাও এবং বাকি কাজটুকু মনোযোগ দিয়ে শেষ করো। অ্যান্ড বি কেয়ারফুল উইথ দ্য টুলস, নেক্সট টাইম যেন এমন কেয়ারলেসনেস আর না দেখি।”
​কথা শেষ করেই সে আর সেখানে দাঁড়াল না। অত্যন্ত দৃঢ় পায়ে সম্মূখে নিজের মেইন ডেস্কের দিকে এগিয়ে গেল। কেনীথ চলে যেতেই লারিসা দ্রুত আনায়ার পাশে এসে দাঁড়াল। সে আনায়ার ব্যান্ডেজ করা হাতখানা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পরখ করতে করতে থমথমে বিস্ময়ের সাথে বলে উঠল,
“বাপ রে! ওনাকে রূঢ় ভেবে সবাই কত ভয় পায়! অথচ দেখো, উনি কতটা ভালো।”

মহামায়া পর্ব ৪৮

​লারিসার কথা শুনে জেইন আর আইজেলও যেন এক অবাস্তব ঘোরের মধ্য থেকে জেগে উঠল। তাদের চোখেও তখন বিস্ময়ের রেশ। এদিকে আনায়া নিজের ব্যান্ডেজ করা আঙুলটার দিকে ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। কেনীথের হাতের দৃঢ় বাঁধন কিংবা আঙুলের ছোঁয়া যেন এখনো তার ত্বকে লেগে আছে।
​লারিসার প্রশংসামূলক বাক্যটা কানে আসতেই আনায়ার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় ও তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। সে নিজের কাঁটা হাতের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
​”ভালো নাকি অতিভালো, পুরুষ নাকি মহাপুরুষ… তা তো সময় এলেই বোঝা যাবে।”

মহামায়া পর্ব ৫০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here