তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৩১
জেরিন আক্তার
এক বিকেলে প্রাণেশা বসে বসে আচার খাচ্ছে। এগুলো রাজিয়া বেগম নিজে বানিয়েছেন প্রাণেশার জন্য। অন্যদিকে রোকেয়া বেগমও আচার বানিয়ে পাঠিয়েছেন। প্রাণেশা আপনমনে আচার খাচ্ছিলো। স্নিগ্ধ এসে পাশে বসল। প্রাণেশা স্নিগ্ধকে একটু আচার খাইয়ে দিলো। কিন্তু স্নিগ্ধ এগুলো খাওয়ায় অভ্যস্ত নয় বলে নাক মুখ কুঁচকে নিলো। বলে উঠল, এতো টক খাও কি করে? প্রাণেশা উত্তরে কিছুই বলল না। স্নিগ্ধ খেতে পারে না সেটা তার দোষ। প্রাণেশার কি?
স্নিগ্ধ ওর সাথে কিছু কথা বলতে বলতে অফিসের কাজ করতে ল্যাপটপ নিয়ে বসল। প্রাণেশা আচারের বোয়ামটা রেখে স্নিগ্ধর পাশে এসে শুয়ে ওকে খোচাতে থাকে। কিন্তু স্নিগ্ধ সিরিয়াস কাজে থাকায় ও বুঝতে পেরে স্নিগ্ধর গালে একটা চুমু দিয়ে চলে গেলো। স্নিগ্ধ এতে মুচকি হাসলো।
সুবহা নিজের রুমে বসে কাপড় ভাঁজ করছিলো। প্রাণেশা রুমে ঢুকে বিছানায় বসে কিছুক্ষন কথা বলে কয়েকটা জামাকাপড় ভাজ করে দিয়ে চলে এলো স্নিগ্ধর রুমে। স্নিগ্ধকে তখনও কাজ করতে দেখে ও বলল,
“এতো কাজ করেন কেনো? একটু ফ্রি থাকেন না কেনো?”
স্নিগ্ধ বলল,
“কিছু লাগবে নাকি? আর এই হয়ে গিয়েছে একটু আছে। এরপরে তোমার সাথে কথা বলছি।”
প্রাণেশা শুয়েই রইলো।
এদিকে সুবহা জামাকাপড় ভাজ করে কাভার্ডে রেখে সৌরভকে কল দিলো।
“কি করছেন?”
“ঘুম থেকে কফি খাচ্ছি। তুমি কি করছো?”
“কিছুনা। আচ্ছা আপনি আসবেন না?”
সৌরভ হেসে বলল,
“মাত্র এখানে এলাম আর এখনই যেতে বলছো?”
“ভালো লাগছে না আপনাকে ছাড়া। মিস করছি।”
“মিস করছো কতখানি?”
“অনেক অনেক অনেক মিস করছি।”
সৌরভ হেসে বলল,
“হুমম মিস করতে থাকো। এরপরে সব একবারে শোধ করে দিবো।”
সুবহা টুকটাক হাসি-তামাশা করে শেষে বলে উঠল,
“শুনুন একটা কথা।”
“শুনছি বলো।”
“আপনি কিন্তু বেশি চিন্তা করবেন না প্রাণেশাকে নিয়ে। আমরা আছি বুঝলেন!”
“হুমম। দেখে রেখো। আর নিজেরও যত্ন নিও। আমায় মিস করতে করতে শরীরের বারোটা বাজিওনা। এসে যদি দেখি একটু চিকন হয়ে গিয়েছো তাহলে খবর আছে।”
“ঠিক আছে চিন্তা করবো না। আপনিও সাবধানে থাকবেন।”
প্রাণেশার প্রেগনেন্সির ৭ মাস চলছে,
এখন একেবারেই সিঁড়ি উঠানামা করতে দেওয়া হয়না ওকে। খাবার থেকে শুরু করে সব উপরেই। তবুও মেয়েটা কথা শোনে না, একেকসময় একাই এসে ড্রইং রুমে বসে থাকবে।
আজ সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজ পড়ে বিছানায় বসে বই পড়ছিলো। স্নিগ্ধ রুমে ঢুকলো। হাতে প্রাণেশার জন্য কিছু শপিং করে এনেছে। প্রাণেশা স্নিগ্ধকে দেখে অভিমানী কণ্ঠে বলল,
“কতবার কল দিয়েছি ফোন কই আপনার? আসতে বলেছে কে?”
স্নিগ্ধ পাশে এসে বসলো। প্রাণেশা অন্যদিক তাকিয়ে রইলো। স্নিগ্ধ প্রাণেশার পেটে হাত রেখে বলল,
“তুমি আর তোমার মা কি রাগ করেছো আমার উপরে?”
প্রাণেশা অভিমানী কণ্ঠে বলল,
“হ্যাঁ রাগ করেছে দুজনই। আপনি ফোন সাথে নেননি কেনো? কতবার কল দিয়েছি?”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“মনে ছিলো না।”
প্রাণেশা অভিমান ভাঙলো না। স্নিগ্ধ প্রাণেশার সামনে বসে নিজের দুই কানে হাত রেখে বলল,
“সরি আর হবে না।”
প্রাণেশা মুখটিপে হেসে বলল,
“সরি বললে হবে না।”
স্নিগ্ধ একটু এগিয়ে এসে বলল,
“চকলেট খাবে? নাকি আইসক্রিম খাবে, কোনটা?”
প্রাণেশা হেসে বলল,
“এসব খাবো না। টক খাবো।”
“এনে দিচ্ছি। ওয়েট!”
প্রাণেশা স্নিগ্ধকে ধরে বলল,
“আরে এখন না, পরে খাবো। এখন আমার পাশে একটু বসুন। কিচ্ছু চাইনা আমার।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশার কপালে চুমু দিয়ে বলল,
“আই লাভ ইউ মাই জান।”
সকালে স্নিগ্ধ ভার্সিটিতে চলে গিয়েছে। প্রাণেশা রুমেই মায়ের ছবি দেখে কাঁদছিলো। এই সময়টায় মেয়েরা তার নিজের মাকেই বেশি কাছে পায়। প্রাণেশা ওর মাকে কোনোদিন দেখেনি, ছুঁয়েও দেখেনি। কতটা আফসোস ওর ও কাউকে বলে বোঝাতে পারছে না। সারাদিনে ২-৩ বার রোকেয়া বেগম কল দিয়ে খবর নেন। রাজিয়া বেগম, কোহিনুর বেগম তো আছেনই।
প্রাণেশা নিজের মায়ের ভেবে ভেবে কিছুক্ষন কেঁদে রুম থেকে বেরোলো। ড্রইং রুমে এসে সোফায় বসলো। রাজিয়া বেগম এসে ওর পাশে বসলেন। প্রাণেশা তার কোলে মাথা রেখে শ্বাস ছেড়ে বলল,
“মেয়েরা যখন প্রথম মা হয় তখন তার নিজের মাকে পাশে পাবে এটাই স্বাভাবিক নয়কি? আর দেখো আমি জন্মের পর থেকেই আমার মাকে পেলাম না।”
প্রাণেশা অনেকটা আফসোস নিয়ে কথাটা বলল রাজিয়া বেগমকে। তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন। প্রাণেশা মলিন হেসে বলল,
“আজ আমার কাছে সব আছে। কিন্তু মা টাই নেই। ভাইয়া মাকে দেখেছে, ছুঁয়েছে, আদরও পেয়েছে। আমি তাকে যদি একবার দেখতে পেতাম…”
রাজিয়া বেগম চোখে পানি নিয়ে বললেন,
“ধুর পাগলী আফসোস করতে নেই। আর কে বলেছে তোমার মা নেই আমরা আছিনা! একদম মন খারাপ করবে না। যদি মন খারাপ করো তাহলে আমি চলে যাবো।”
প্রাণেশা তার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললেন,
“ঠিক আছে। তুমি যা বলবে তাই হবে।”
রাজিয়া বেগম প্রাণেশার মুখপানে তাকিয়ে হাসলেন। অতঃপর ওকে দুহাতে আগলে জড়িয়ে ধরলেন। প্রাণেশার কষ্ট হবেই স্বাভাবিক। কিন্তু রাজিয়া বেগম থাকতে ওকে কষ্ট পেতেই দিবেন না। মেয়ের মতোই আগলে রাখবেন।
তখনই কল দিলো সৌরভ। ও দিনে ২-৩ বার করে কল দিবেই প্রাণেশাকে। বড্ড ভয় পায় কি না। আল্লাহ ভালোই ভালোই একটা সন্তান দিক এই চায়।
প্রাণেশার প্রেগন্যান্সির ৯ মাসের ২য় সপ্তাহ। ডেলিভারি ডেটের আর কিছুদিন দেরি আছে।
দিনটি বুধবার,
সকাল সকাল প্রাণেশা ড্রইং রুমে এসে বসলো। মুখটা মলিন লাগছে।
সুবহা ওকে দেখেই জিজ্ঞাসা করলো,
“কিরে রাতে ঘুমাসনি নাকি? চোখ-মুখ এমন কেনো লাগছে?”
স্নিগ্ধও এসে প্রাণেশার পাশে বসে বলল,
“আমিও একই কথা বলেছি যে তোমাকে এমন লাগছে কেনো? খারাপ লাগছে নাকি?”
প্রাণেশা মোলায়েম কণ্ঠে বলল,
“না খারাপ লাগছে না। এমনেই মনটা ভালো নেই।”
স্নিগ্ধ বলল,
“কিছু খাবে এনে দিবো? নাকি কোথাও ঘুরতে যাবে? যে জিনিসে মন ভালো হবে তাই করছি।”
প্রাণেশা হেসে বলল,
“তেমন কিছু না। একটু পরেই ঠিক হবে।”
স্নিগ্ধ ভার্সিটিতে চলে গেলো আর বাড়ির বাকি ছেলেরা সবাই অফিসে।
দুপুর ২ টার দিকে স্নিগ্ধ ফিরে এলো। প্রাণেশা রুমেই শুয়েছিলো। স্নিগ্ধ প্রাণেশার সাথে কথা বলে শাওয়ার নিতে গেলো।
রাজিয়া বেগম কিছু ফলমুল কেটে নিয়ে এলেন প্রাণেশার জন্য। ট্রে টা ওকে দিয়ে চলে গেলেন। কেননা এই সময়ে প্রাণেশাকে একেবারে নিচে যেতে বারণ করে দিয়েছেন।
ততক্ষনে সুবহা ভাইয়ের জন্য খাবার বেড়ে রাখলো। স্নিগ্ধ এসে খাবার খেয়ে উপরে প্রাণেশার কাছে চলে এলো। প্রাণেশা পাশে বসে কিছু কথাও বলছিলো। কথার তালে তালে তখনই প্রাণেশার পেটটা খুব ব্যাথা শুরু হলো। ও বিছানায় থেকে নেমে ধীর পায়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। কয়েক মিনিট পেরোতেই প্রাণেশা ওয়াশরুম থেকে বের হলো কাঁদতে কাঁদতে।
স্নিগ্ধ তড়িৎ পায়ে এগিয়ে এসে ওকে ধরে অস্থির কণ্ঠে বলল,
“কি হয়েছে খারাপ লাগছে?”
প্রাণেশা কেঁদে কেঁদেই বলল,
“হুট্ করে পেইন শুরু হয়েছে। আর ব্লিডিং হচ্ছে।”
স্নিগ্ধ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে উঠল,
“তুমি কেঁদো না এক্ষুনি হসপিটালে নিয়ে যাবো।”
স্নিগ্ধ চিৎকার করে বাড়ির সবাইকে ডাকলো। এবং সবাই দ্রুত হসপিটালে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো।
প্রাণেশাকে হসপিটালে নিয়ে আসার সাথে সাথে সবাই নিজেদের কাজ রেখেই চলে এসেছে। অন্যদিকে তো আরশাদ খান মেয়েকে দেখে কাঁদছেন। তাকে গিয়ে সাঈদ রেজা চৌধুরী, সিয়াম সামলে নিলেন।
প্রাণেশাকে ওটিতে নিয়ে গিয়ে এমার্জেন্সি সিজার করা হলো। সৌরভ জানতে পেরে সেও পরেরদিন আসার জন্য টিকিট কেটে ফেলল। এখন যেনো কোনো কাজই ওর কাছে ইম্পরট্যান্ট নয়। দেশে গিয়ে বোনের কাছে যাওয়াটাই ইম্পরট্যান্ট।
ওটি থেকে একজন নার্স বের হলেন, তার কোলে ফুটফুটে নবজাতক শিশুটা। স্নিগ্ধ সহ সবাই কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই, নার্স হেসে বলল,
“ছেলে বাবু হয়েছে। জলদি মিষ্টি খাওয়ান।”
সবার মুখ থেকে “আলহামদুলিল্লাহ” শব্দটা উচ্চারিত হলো।
স্নিগ্ধ জিজ্ঞাসা করলো,
“আমার ওয়াইফ সে কেমন আছে?”
নার্স বলল,
তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৩০
“সেও ভালো আছে আলহামদুলিল্লাহ। একটু পরে ওটি থেকে বের করা হবে।”
সবাই হাফ ছাড়লো। সাথে সাথে সৌরভকে কল দিয়ে খুশির খবর জানালো সে তো মহাখুশি। এতক্ষন অনেক চিন্তায় ছিলো। সম্ভব হলে আজই চলে আসতো।
