Home Tell me who I am 2 Tell me who I am 2 part 23 (2)

Tell me who I am 2 part 23 (2)

Tell me who I am 2 part 23 (2)
আয়সা ইসলাম মনি

কারানের কপালে সদ্য সার্জিক্যাল ব্যান্ডেজ লাগানো হয়েছে, যার নিচ থেকে হালকা লালচে আভা সাদা গজ কাপড়ের সূক্ষ্ম তন্তু ভেদ করে উঁকি দিচ্ছে। প্যারামেডিক খাটের একপাশে বসা মিরা। একটা বিধ্বংসী ঝড় বয়ে গেছে তাদের ওপর দিয়ে, যার রেশ এখনো ধমনিতে র*ক্তের গতি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
“তুমি আসলেই একটা দামড়া বাচ্চা, কারান। আমি বুঝতে পারছি না দুটো বাচ্চা আমি একসাথে কীভাবে সামলাবো।”
কারান মিরার কাঁপতে থাকা হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় নিল। বুড়ো আঙুল দিয়ে মিরার আঙুলের জোড়গুলো সামান্য চেপে ধরে সে স্বভাবসুলভ বাঁকা হাসল, “এর জন্যই বড়োদের অ্যাডভাইস শুনতে হয়। আগেই তো বলেছিলাম, অ্যাটলিস্ট পাঁচটা বছর শুধু আমাকে হ্যান্ডেল করো, বেগম। তারপর না হয় জুনিয়র কারান এনে দিতাম।”

মিরার চোখের কোনায় জমা হওয়া নোনা জল তখনো শুকায়নি, গালের ওপর তার দাগ স্পষ্ট। “এখন তো মনে হচ্ছে সেটাই পারফেক্ট সিদ্ধান্ত ছিল। নাহলে পৃথিবীর কোন বাপ নিজের বউয়ের প্রেগন্যান্সির খবর শুনে এভাবে বোকার মতো কার অ্যাক্সিডেন্ট করে শুনি?”
“তোমার বাচ্চার বাপ করে। ইউনিক, ইউ নো।”
“একটা থাপ্পড় দেব! একদম মজা করবে না।”
কারান হঠাৎ করেই একটু গম্ভীর হওয়ার ভান করল, চোখের দৃষ্টি সরু করে মিরার দিকে তাকিয়ে বলল, “সব তোমার কর্মফল, স্টারলিং। আই’ম প্রিটি শিওর তুমিই ইচ্ছে করে প্র’টেকশন সরিয়ে আমার সাথে এই বেইমানিটা করেছ। নাহলে এই থার্ড পারসন হুট করে কীভাবে ডাউনলোড হলো? শোনো মিরা, ও যদি আমার খাবারে ভাগ বসায়, ওকে কিন্তু উল্টো ঝুলিয়ে ওর বাম পিটিয়ে লাল করে দেব। এসেছে নিজের ইচ্ছায়, এবার নিজের খাবার যেন নিজে বানিয়ে খায়। বাবার মতো কর্মঠ হওয়া উচিত ওর। কারণ ওর ড্যাডি এত হার্ডওয়ার্ক না করলে ও আসতই না।”

মিরার ফরসা গাল দুটো মুহূর্তের মধ্যে লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। কারানের এই অকপট, বেহায়া রসিকতায় সে অভ্যস্ত, তবুও প্রতিবারই সে পরাস্ত হয়। সে কারানের চওড়া বুকের ওপর একটা কিল মেরে মুখ ফিরিয়ে নিল, “অসভ্য লোক একটা! নষ্ট, নির্লজ্জ পুরুষ। নিজের তো ওই সময় কোনো হুঁশ থাকে না!”
কারান মিরার চিবুকটা তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের খাঁজে আলতো করে ধরে নিজের দিকে ঘোরাল। চাপা গলায় বলল, “একদম আমার বাচ্চার বাপকে ব্লেম দেবে না। বউকে আদর করার সময় আমার হুঁশ থাকে না, দ্যাটস ট্রু। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমি জেনেশুনে এমন ব্লান্ডার করব।”
“তো? আমি করেছি?” মিরা চোখ বড় বড় করে তাকাল।
“নয়তো কে? তুমি আমার খাবারের কম্পিটিটর আনবে আর নিজের সৈন্য বাড়াবে বলেই ডেফিনেটলি এই প্ল্যান করেছ।”

​মিরা বিরক্ত হয়ে তার শরীরটা একটু সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল, “উহ, সরো তো তুমি!”
কারান মিচকে হেসে মিরার কোমরটা একহাতে জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে হেঁচকা টানে টেনে নিল। মিরার কানের লতির খুব কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “সত্যি করে বলো, কীভাবে এল? আই’ম আ ভা’র্জিন ম্যান, বেবি। আমি তো এমন কোনো ক্রাইম করেছি বলে মনে হয় না!”
“আবার? এবার কিন্তু আসলেই ঘুসি মারব!” মিরা হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কারানের চোখের সামনে ধরল।
কারান মিরার গাল দুটো দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে তার ঠোঁট দুটো পুঁটি মাছের মতো গোল করে দিল। এরপর মুখটা এদিক-ওদিক সামান্য দোলাতে দোলাতে বলল, “তোমাকে রাগতে দেখলে এত কিউট লাগে কেন, বেবি? জাস্ট কামড়ে খেয়ে ফেলার মতো সুইট।” কথাটি শেষ করেই দাঁত দিয়ে কামড় দেওয়ার একটা ভঙ্গি করল সে।
মিরা কপাল কুঁচকে কারানের কপালের সেই তাজা ব্যান্ডেজটার ওপর তর্জনী দিয়ে টিপ সইয়ের মতো একটু চাপ দিল।

কারান তৎক্ষণাৎ চোখ জোড়া সংকুচিত করে নিজের কপালে হাত দিল। যদিও ব্যথার চেয়েও সেখানে অভিনয়ের আমেজটাই বেশি ছিল, “আউচ! এখনই জুলুম শুরু করে দিয়েছ?”
মিরা এতক্ষণের শক্ত কাঠিন্যের বাঁধ ভেঙে অত্যন্ত সাবধানে কারানের চওড়া বুকের ওপর নিজের মাথাটা এলিয়ে দিল। তার চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়া এক ফোঁটা নোনা জল কারানের পাতলা সুতির শার্টের তন্তু ভেদ করে তার তপ্ত ত্বকে গিয়ে আছড়ে পড়ল। কারানের হৃৎপিণ্ডের দ্রুত আর ছন্দময় ওঠানামা মিরার কানে এসে লাগছিল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভেজা গলায় বলল, “আমার যে কষ্ট হচ্ছে, কারান। কতটা ব্লা’ড লস হয়েছে তোমার আইডিয়া আছে? তুমি এতটা ইমপালসিভ কেন বলো তো? এবার তো বাবা হতে চলেছ, এখন তো অ্যাটলিস্ট জীবন নিয়ে একটু সিরিয়াস হওয়া যায় নাকি?”
কারান বাঁ হাতটা মিরার পিঠের ওপর আলতো করে বুলিয়ে দিতে লাগল। হাসপাতালের স্লাইডিং উইন্ডো দিয়ে বাইরে তাকাল সে। আকাশে তখন মেঘের ঘনঘটা, নিকষ কালো অন্ধকার গ্রাস করেছে চরাচর, আর থেকে থেকে মৃদু বাতাসের ঝাপটায় জানালার কাচগুলো হালকা কেঁপে উঠছে। কারান কিছুটা উদাসীনভাবে বলল, “এসব কী, বউ? তুমি ভালো করেই জানো তোমার চোখের পানিতে আমার ক্রনিক অ্যালার্জি আছে, ডিরেক্ট বুকে এসে লাগে। তাও আমাকে পেইন দিচ্ছ? তাও আমার এই ক্রিপলড অবস্থায়?”
মিরা দ্রুত হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখ দুটো মুছে নিল। এরপর আবার কারানের বুকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে বলল, “তোমার জন্যই তো! আমার সামান্য চোখের পানি দেখতে পারো না, আর তোমার কপাল দিয়ে যে র*ক্ত ঝরছিল, সেটা আমি কীভাবে সহ্য করি? কে বলেছিল ড্যাং ড্যাং করে বাইরে যেতে? আমার ভীষণ রাগ হচ্ছে তোমার ওপর।”

কারান সামান্য হেসে মিরার রেশমি চুলের সুবাস বুকে টেনে নিয়ে সেখানে ঠোঁট ছোঁয়াল, “সামান্য একটু কেটেছে, সুইটহার্ট। অপোজিট সাইডের লোকটা দয়ালু ছিল বলে লাস্ট মোমেন্টে গাড়িটা ঘুরিয়ে নিয়েছে। ইশশ, বেচারাকে নিশ্চয়ই ওর বউ অভিশাপ দিয়েছিল, নাহলে ওভাবে আইসিইউতে যেতে হয়!”
মিরা এবার দাঁত চেপে কারানের বুক থেকে মুখ তুলে তাকাল। তার চোখের নরম আবেগ উবে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে একরাশ রাগ দানা বাঁধল, “হ্যাঁ, তোমার বউয়ের মতো, তাই না?”
“উঁহুঁ, আমার বউয়ের সাথে কারও তুলনা হয় না,” কারান মিরার কপালে নিজের ঠোঁট দুটো আলতো করে ছোঁয়াল। “আমার বউ আর আমার চাইল্ড—দুটোই মা শা আল্লাহ। নাহলে এত স্ট্রং প্রটেকশন পেনিট্রেট করেও এভাবে আমাকে না জানিয়েই সারপ্রাইজ এন্ট্রি নিয়ে নিল!”
মিরা খপ করে হেসে ফেলল। কারানের মুখের একদম কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “তুমি লাস্ট টাইম প্রটেকশন নাওনি, কারান। আই মিন, একদম ফার্স্ট মোমেন্টে না হলেও… লাস্টের দিকে।”
কারান থমকে গেল। তার চোখের গভীর মণি জোড়া এক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গেল, “সিরিয়াসলি?”
“সিরিয়াসলি,” মিরা মাথা নাড়িয়ে নিশ্চিত করল।
কারান এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করল, “সবই উত্তেজনার ফল। তুমি আমাকে এতটা উত্তেজিত করে তুলেছিলে যে আমার সেলফ-কন্ট্রোল ছিল না। এই সুইট পানিশমেন্ট এবার তোমার ওপর কড়ায়-গন্ডায় উসুল করব, দেখে নিও।”

​”একদম দুষ্টুমি করবে না, কারান। আমরা হসপিটালে আছি।”
কারান মিরার মাথাটা ডান হাতে টেনে আবার নিজের বুকের একদম গভীরে চেপে ধরল। সে তার চিবুকটা মিরার নরম চুলে ঘষে ফিসফিসিয়ে বলল, “অন্তত দশ মাসের জন্য আমার সব রোমান্টিক দুষ্টুমি লক করে রাখলাম। পরে ইন্টারেস্টসহ একদম সুদে-আসলে উসুল করে নেব। উইথআউট অ্যানি ডিসকাউন্ট।”
বেশ কিছুক্ষণ কেবিনের নিরিবিলি পরিবেশে মিরা কারানের বুকে মাথা রেখে শুয়ে রইল। বাইরের বৃষ্টির মৃদু আওয়াজ আর এসি-র হালকা শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিল না। হঠাৎ মিরা কারানের চোখের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল, “জানো, তোমার নীল চোখগুলো আমার কেন জানি অনেক বেশি পছন্দ! স্পেশালি যখন তুমি অনেক ভালোবাসা নিয়ে আমার দিকে তাকাও।”
কারান হালকা হাসল, তার বুকের ওঠানামা মিরা টের পেল। “আর আমার কাছে পুরো তুমিটাই। তবে…”
“স্পেশালি আমার চুল, তাই তো?”

কারান একটু অবাক হয়ে তাকাল, “জানো?”
মিরা তার বুকে আঙুল দিয়ে ছোট ছোট বৃত্ত আঁকতে আঁকতে হাসল, “বুঝি!”
কারান চোখ জোড়া আলতো করে বুজে তার বাহুডোরে মিরাকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে রইল। গত কয়েকটা সপ্তাহে তাদের জীবনের ওপর দিয়ে যে ভয়ানক সাইক্লোন বয়ে গেছে, তাতে মিরাকে একটুও শান্তিময় মুহূর্ত উপহার দিতে পারেনি সে। হৃদয়ের গহিন থেকে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল কারানের। মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করল, আর কোনো অশুভ ছায়াকে তাদের সংসারের সুখের আঙিনায় প্রবেশ করতে দেবে না। এখন থেকে তার পৃথিবী গড়ে উঠবে শুধু তার অনাগত সন্তান, মিরা আর তার একান্ত আপন মানুষদের ঘিরে। পরিবারের আর একটি সদস্যকেও সে অকালে হারিয়ে যেতে দেবে না।
বেশ কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতায় কাটার পর হঠাৎ মিরার মাথায় একটা চঞ্চল বুদ্ধি খেলে গেল। সে কারানের চওড়া বুকের ওপর একটা সুমধুর চুমু খেল। আলতো সেই ছোঁয়ায় কারানের বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দনের গতি আচমকাই বেড়ে গেল। মিরা নেশাভরা চোখে নিজের সুকোমল আঙুলগুলো আলতো করে তার বুকের উপর বোলাতে শুরু করল। হাতের স্পর্শ ধীরে ধীরে উঠে এলো কারানের কণ্ঠনালির ওপর। কারান হুট করেই তার ক্ষিপ্র, পুরুষালি হাত দিয়ে মিরার ঘাড়ের পেছন দিকটা শক্ত করে চেপে ধরল। মিরার মাথাটা টেনে নিজের একদম মুখের সামনে নিয়ে এলো। কারানের শ্বাস-প্রশ্বাস তখন অনেকটাই অসম এবং দ্রুতগতির হয়ে উঠেছে।

“প্লিজ মিরা, ডোন্ট সি’ডি’উস মি,” কারান গম্ভীর গলায় বলল, “আই লাভ ইউ, বাট আই লাভ মাই চাইল্ড ইকুয়ালি। সো, ডোন্ট মেক মি ডু সামথিং ক্রেজি।”
মিরা একটু ওপরে উঠে এল, কারানের আরও কাছাকাছি। কারানের ঠোঁটের কোণে নিজের ঠোঁটের আলতো ছোঁয়া দিয়ে সে মাদকতায় ঢোক গিলল। তার চোখ জোড়া তখন আবেশে কিছুটা ভারী, কণ্ঠস্বর নেশালো শোনালো, “তোমাকে এই ব্যান্ডেজ আর ইনজুরি নিয়েও কেন যেন বড্ড বেশিই সুদর্শন লাগছে, কারান।”
কারান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে মিরার ঠোঁট নিজের দাঁত দিয়ে আলতো করে কামড়ে ধরল, এবং একই সাথে জামার নীচ থেকে তার কোমরে হাত গলিয়ে টেনে তাকে আরও ওপরে উঠিয়ে নিল। দুজনের ঠোঁট এখন পরস্পরের খুব কাছাকাছি, নিশ্বাসের উষ্ণতা একে অপরের ত্বকে আছড়ে পড়ছে। কোমরের স্পর্শকাতর অংশে কারানের হাতের শক্ত চাপ লাগতেই মিরা সামান্য ককিয়ে উঠল। কিন্তু সে-ও হুট করেই কারানের ওষ্ঠাধর নিজের দাঁত দিয়ে শক্ত করে কামড়ে ধরল। অথচ কারান মোটেও চোখ বন্ধ করল না; সে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল মিরার দিকে। মিরা কিছুক্ষণ পর তার ঠোঁট মুক্ত করতেই দেখা গেল কারানের ঠোঁটের কোণে হালকা র*ক্ত জমছে।

কারান বাঁকা হেসে মিরার রেশমি চুলের গোছা হুট করেই নিজের মুঠোয় শক্ত করে টেনে ধরল। মিরা সামান্য অপ্রস্তুত হতেই কারান তার ধারালো দাঁত বসিয়ে দিল মিরার কানের নরম লতিতে। সেখানে দাঁতের চাপ দিতেই মিরা আবেশে চোখ বুজে ফেলল, তার বুক দ্রুত ওঠানামা করতে লাগল। কারান একই স্পর্শকাতর জায়গায় বারবার তার ঠোঁট আর দাঁতের ঘর্ষণ তৈরি করতে লাগল। তীব্র ভালোবাসার কামড়ে জায়গাটা গাঢ় লালচে আভা ধারণ করল। কারান মিরার চুলে নিজের মুষ্টি আরেকটু শক্ত করে ধরল।
এরপর সরাসরি মিরার ঠোঁটের একদম কাছাকাছি গিয়ে হাস্কি স্বরে ফিসফিস করল, “আদরের ব্যাপারে আমি মোটেও কম্প্রোমাইজ করব না, জান। তাতে যদি তোমার পেইন হয়, আই উইল গিভ ইউ মোর।”
কারানের চোখের নেশাতুর চাহনি মিরার হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে দিল। সে এক চিলতে শয়তানি হাসিতে কারানের গালে একের পর এক আলতো চুমু আঁকতে লাগল। কারান নিজের ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরে ভেতরের প্রবল শারীরিক উত্তেজনাকে আটকে রাখল। সে অত্যন্ত সতর্ক যে এই মুহূর্তে আবেগের বশে এমন কোনো ভুল করা যাবে না যা মিরার শারীরিক অবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে।
মিরা কারানের কানের একদম কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে মনে করিয়ে দিল, “তুমি বোধহয় ভুলে যাচ্ছ হানি, তোমার পায়েও কিন্তু যথেষ্ট ইনজুরি আছে!”
কারান এক ভ্রূ উঁচিয়ে কপট হেসে জবাব দিল, “পায়ে ইনজুরি হলে কী হবে? আমার এলইডি তো একদম পারফেক্টলি ওয়ার্কিং, ডার্লিং।”

কারানের এমন সরাসরি আর বোল্ড জবাবে মিরা এবার সত্যিই ভীষণ লজ্জা পেয়ে গেল। সে তড়িঘড়ি করে কারানের ওপর থেকে সরে বিছানার একপাশে গুটিসুটি মেরে বসল। মনে মনে ভেবেছিল কারানের সঙ্গে তার স্টাইলেই একটু ফ্লার্ট করবে, কিন্তু শেষমেষ নিজেই তার পাতা জালে ধরা পড়ে গেল। সে নিজের দুই হাতের মুঠোয় মুখ লুকিয়ে লজ্জা ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগল। আর কারান বালিশে মাথা এলিয়ে দিয়ে মিরার এই লাল হয়ে যাওয়া ফরসা মুখশ্রী বেশ আয়েশ করে উপভোগ করতে লাগল।
কিন্তু মিরা নিজেকে সামলে নিয়ে অন্য একটা প্ল্যান করল। কারানের দিকে তাকাতেই দেখল, কারান এখনো কেমন যেন মোহময় দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে, যেন সে মনের ক্যানভাসে মিরার অন্য কোনো নগ্ন রূপের স্কেচ আঁকছে।
মিরা হালকা খুকখুক কাশি দিয়ে হঠাৎ প্রসঙ্গ বদলে বলল, “আচ্ছা কারান, আমার গলার গান কি তোমার ভালো লাগে?”

কারান বেশ বিস্মিত হলো। এমন উত্তপ্ত রোমান্টিক আবহের মাঝে এই অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে সে ঠোঁট উল্টালো। তবে পরক্ষণেই সে গভীর ও শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল, “২০১৬ সালের অক্টোবর মাসের ৪ তারিখ, বিকেল ঠিক ৪টা বেজে ১৩ মিনিট। তুমি বেলকনিতে দাঁড়িয়ে মাধবীলতা গাছে পানি দিতে দিতে গুনগুন করে একটা ওল্ড ক্লাসিক গান গেয়েছিলে। ওই গানটা আমি ভীষণ উপভোগ করেছিলাম, কারণ ওটা আমার ওয়ান অব দ্য মোস্ট ফেভারিট গান। আমি দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে প্রায় তিন মিনিট ধরে নিস্তব্ধ হয়ে তোমার সেই সুর শুনছিলাম। ওটা আমি কখনোই ভুলব না।”
মিরা সম্পূর্ণ হতবাক হয়ে গেল। শুষ্ক গলায় ঢোক গিলে সে বেশ কিছুক্ষণ নিষ্পলক চোখে কারানের দিকে তাকিয়ে রইল। মনের ভেতরের বিস্ময়টা সামলে নিয়ে কী বলবে বুঝতে না পেরে আমতা আমতা করে বলল, “কিন্তু… কিন্তু ওটা তো অসম্ভব, কারান! তুমি তো তখন অফিসিয়াল শিডিউলের কারণে রাত নয়টার আগে কখনো বাড়িই ফিরতে না।”

“ভাগ্যিস সেদিন নিয়তি আমাকে একটু আগে ফিরিয়েছিল। আসলে জরুরি একটা কনফিডেনশিয়াল ফাইল নিতে শর্ট ভিজিটে এসেছিলাম। আই ফিল নো শেম টু অ্যাডমিট মিরা, আমি প্রথমবার তোমার প্রেমে পড়েছিলাম আমাদের বাসর রাতে, এক বুক অনিশ্চয়তা নিয়ে। আর দ্বিতীয়বার ঠিক ওই দিন, ওই ক্ষণে।”
“বা…সর রাতে? কিন্তু কীভাবে?” মিরা এবার সত্যিই বিভ্রান্ত, তার চোখের মণি জোড়া কৌতূহলে বড় বড় হয়ে গেল। “তুমি তো তখন আমাকে দেখোওনি। আই মিন, পুরো সময়টাই তো আমাদের মাঝে একটা ডিসটেন্স ছিল। একটু বুঝিয়ে বলো না, প্লিজ!”
কারান ডান হাতের তর্জনী দিয়ে মিরার কপাল বেয়ে নেমে আসা অবাধ্য চুলের গুচ্ছ কানের লতির পেছনে গুঁজে দিতে দিতে বলল, “এত হাইপার হতে হবে না, মাই লাভ। কেন আমার হবু বেবির মাকে এত মেন্টাল প্রেশার দিচ্ছ? রিল্যাক্স।”

মিরা কারানের এই প্রটেক্টিভ কেয়ার দেখে আলতো করে চোখ নামিয়ে হাসল। “অথচ আমার নিজেরই একদম মনে নেই যে আমি তখন কোন গান গুনগুন করছিলাম। আর তুমি সাল, তারিখ, এমনকি ঘড়ির কাটার মিনিট অবধি নিখুঁতভাবে মনে রেখেছ! কী এমন গান ছিল ওটা, যা তোমার হার্টকে এতটা টাচ করেছিল?”
কারান কোনো উত্তর না দিয়ে পাশের ওক কাঠের সাইড টেবিল থেকে একটা স্টিলের সার্জিক্যাল ফরসেপ তুলে নিল। মিরা তার এই কাণ্ড দেখে কিছুটা অবাক ও কৌতূহলী হয়ে কারানের আরও একটু কাছে ঘেঁষে এল। কারান ঠিক সেই সুযোগটার অপেক্ষাতেই ছিল; সে হুট করে তার বাম হাত বাড়িয়ে মিরার ওড়নার সাথে ম্যাচিং করা খোঁপায় গোঁজা কাঁটাটা আলতো টানে খুলে দিল।
মুহূর্তের মধ্যে মিরার ঘন, কালো রেশমি চুলের রাশি জলপ্রপাতের মতো তার পিঠ বেয়ে নিচে নেমে এলো। মিরা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে ভ্রূ কুঁচকে তাকাতেই কারান তার হাতের সেই মেটালিক ফরসেপটি দিয়ে টেবিলের কাচের ওপর হালকা রিদমিক টুংটাং শব্দ তুলল। তারপর সে মাদকতাময় কণ্ঠে গেয়ে উঠল,

“আলগা করো গো খোপার বাঁধন
দিল ওহি মেরা ফাস গায়ি…
দিল ওহি মেরা ফাস গায়ি…
বিনোদ বেনির জরিন ফিতায়
বিনোদ বেনির জরিন ফিতায়…
আন্ধা ইশক মেরা কাস গায়ি
আন্ধা ইশক মেরা কাস গায়ি…”
লাইনটা শেষ করেই কারান হুট করে মিরাকে টেনে একদম নিজের বুকের সেন্টারে নিয়ে এল। মিরা তখনো ঘোরলাগা ঘোরের মধ্যে অবশ হয়ে আছে। সে যখন ওদিন বারান্দায় গেয়েছিল, তখন নিশ্চয়ই সুরটা এতটা পারফেক্ট ছিল না, যতটা নিখুঁত আর রোমান্টিক এখন কারানের কণ্ঠে শোনাচ্ছে। কারান এবার মিরার সেই উন্মুক্ত, সুবাসিত চুলে নিজের মুখটা সম্পূর্ণ ডুবিয়ে দিয়ে আবেগময় কণ্ঠে গেয়ে চলল,

“তোমার কেশের গন্ধে কখন
লুকায় আসিলো লোভী আমার মন…
তোমার কেশের গন্ধে কখন
লুকায় আসিলো লোভী আমার মন…
বেহুঁশ হো কার গির পারি হাথো ম্যায়
বেহুঁশ হো কার গির পারি হাথো ম্যায়
বাজু বান্ধ ম্যায় বাস গায়ি
বাজু বান্ধ ম্যায় বাস গায়ি…”
কারানের ঠোঁটের ছোঁয়া মিরার ঘাড়ের ত্বকে শিহরন জাগিয়ে তুলল।
“আলগা করো গো খোপার বাঁধন
দিল ওহি মেরা ফাস গায়ি
দিল ওহি মেরা ফাস গায়ি…”
কেবিনের ভেতর তখন পিনপতন নীরবতা। মিরা তখনো কারানের ভালোবাসার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে তার বুকের স্পন্দন শুনছে। কারান মিরার চুলে মুখ গুঁজে রেখেই একটা গভীর শ্বাস নিয়ে বলল, “আই থিংক এবার তোমার টার্ন, সুইটহার্ট। এবার তাহলে তুমি একটা গান শোনাও!”
হঠাৎ করেই মিরার ঘোর কেটে গেল, এবং তার মনস্তাত্ত্বিক ক্যানভাসে শয়তানি বুদ্ধি খেলে গেল। সে হুট করে মুখটা কারানের একদম সামনে এনে চোখের মণি জোড়া নাচিয়ে বলল, “আসলেই গাইব? শিওর?”

“হুম।”
“পরে কিন্তু আমাকে ব্লেম দিতে পারবে না, বলে রাখলাম।”
“গাও না,” কারান অত্যন্ত মরিয়া হয়ে মোলায়েম গলায় বলল। সে তখন সত্যি একটি খাঁটি মেলোডির জন্য অপেক্ষা করছিল।
মিরা চোখ বন্ধ করে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর টেবিল থেকে পানির গ্লাসটা তুলে এক চুমুক পানি খেয়ে গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিল। কারান মনে মনে ১০০% নিশ্চিত ছিল যে তার বউ নিশ্চয়ই এখন কোনো রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের গভীর প্রেমের গান গেয়ে তার মন জুড়িয়ে দেবে। সে ঠোঁটের কোণে একটা প্রশান্তির হাসি নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
ঠিক তখনই মিরা সমস্ত রোমান্টিকতার বারোটা বাজিয়ে, সম্পূর্ণ লোকজ টোনে গলা ছেড়ে গেয়ে উঠল,
“আমার জীবন ধন্য হলো স্বামীর আদর পাইয়া
কত নারী আফসোস করে আমার দিকে চাইয়া…”
কারানের মুখের সেই ডিভাইন হাসিটা এক সেকেন্ডের মধ্যে ফ্রিজ হয়ে গেল। তার চোখের পলক স্তব্ধ। মিরা কিন্তু থামল না, সে আরও একটু এক্সপ্রেশন যোগ করে গাইতে লাগল,
“টাকা-পয়সা সোনা দানায় কোনো শান্তি নাই
মনের শান্তি বড় শান্তি জেনে রাখেন ভাই…”

শেষের লাইনটা গাওয়ার সময় মিরা আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে হুট করে কারানের দুই গালে নিজের কোমল হাত দুটো দিয়ে চেপে ধরে, হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে গেয়ে উঠল,
“আমার লক্ষ্মী জামাই…!”
কারানের চোখ জোড়া তখন বিস্ময়ে ও আতঙ্কে চড়কগাছ। সে কপালে হাত রেখে, সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে অসহায়ের মতো প্রায় আর্তনাদ করে উঠল, “আল্লাহ! ইয়া আল্লাহ! তোর পায়ে পড়ি মিরা, দোহাই লাগে, প্লিজ আমাকে আর মেন্টাল টর্চার করে কোমায় পাঠাস না!”
কারানের এমন ট্রমাটাইজড রিয়েকশন দেখে মিরা হাসতে হাসতে প্রায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হসপিটালের হাই-লো বেডের কিনারা থেকে পড়েই যাচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে কারান তার ইনজুরি আর ব্যথার কথা ভুলে ক্ষিপ্র গতিতে মিরার হাত ধরে নিজের দিকে একটা হ্যাঁচকা টান দিল, যেন তার অসাবধানী বউ কোনোভাবেই চোট না পায়। মিরার এমন মুক্তো ঝরার মতো খিলখিল হাসি দেখে কারানের ঠোঁটের কোণেও মুচকি হাসি ফুটে উঠল। তবে সে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে মিরার নরম হাতের পিঠে হালকা একটা চাপড় মেরে কৃত্রিম রাগে বলল, “তুমি আসলেই একটা জঘন্য বউ! আস্ত একটা শয়তান মেয়ে।”

মিরা তখনও হাসির রেশ কাটাতে পারছিল না, তার বুক ওঠা-নামা করছিল। আর কারান এক দৃষ্টিতে, গভীর মুগ্ধতা নিয়ে তার এই চঞ্চল রূপের দিকে তাকিয়ে রইল। হাসপাতালের একঘেয়ে নিষ্প্রাণ পরিবেশেও মিরার এই প্রাণোচ্ছলতা যেন এক টুকরো বসন্তের হাওয়া এনে দিয়েছিল। একটু পর মিরা নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে ঝুঁকে কারানের গালে একটা ভালোবাসার নরম চুমু দিল। তার কণ্ঠস্বর এবার বেশ শান্ত ও দায়িত্বশীল শোনাল, “আচ্ছা, তুমি তাহলে একটু রেস্ট নাও। আমি বাইরে একবার সবার সাথে কথা বলে, ডক্টরদের প্রেসক্রিপশনটা চেক করে তোমার জন্য খাবারের অ্যারেঞ্জমেন্ট করে আসছি।”
‘বাইরে যাওয়া’ আর ‘সবার সাথে কথা বলা’-র প্রসঙ্গটা শোনা মাত্রই কারানের মুখের অবয়ব মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল। বিগত কয়েক সপ্তাহের ব্যস্ততা, কতগুলো ঝড়, আর এই আকস্মিক দুর্ঘটনার পর মিরাকে সে এতক্ষণে একটু নিজের একান্তে পেয়েছে; এখন সে এক সেকেন্ডের জন্যও তার এই অমূল্য সম্পদকে নিজের চোখের আড়াল করতে রাজি নয়। কারানের শক্ত চোয়ালের রেখাগুলো আরও দৃঢ় হলো, কণ্ঠস্বর গম্ভীর ও ভারী করে সে বলল, “কোথাও যাবে না তুমি। আমার বউ আমার চোখের আড়াল হবে, তাও আবার এই কনসিভ করার ক্রিটিক্যাল অবস্থায়, এটা আমি মোটেও টলারেট করব না।”

মিরা হাত দুটো কোমরে রেখে এক প্রকার আকাশ থেকে পড়ার ভান করল, “আজব কথাবার্তা! খাবার-দাবার কিছু আনব না নাকি? তুমি একদম চুপচাপ পেশেন্টের মতো শুয়ে থাকো কারান। বেশি নড়াচড়া করলে এবার কিন্তু তোমার ভালো ঠ্যাংটাও ভেঙে দেব বলে রাখলাম!”
কারানের কণ্ঠ এবার আরও কঠিন হয়ে উঠল, “আমি কী বলেছি শোনোনি? এখানে বসে থাকবে, আমি আমার বউকে দেখব। আমি কল করে স্পেশাল খাবারের ব্যবস্থা করছি। তুমি এই কন্ডিশনে বাইরে ঘুরে বেড়াবে আর আমার বউকে হসপিটালের সবাই দেখবে, তাই তো? দ্যাটস নট গোয়িং টু হ্যাপেন!”
“কোথায় ঘুরোঘুরি দেখলে তুমি? আর এখানের হসপিটাল ফুড কি তোমার মুখে রুচবে?” মিরা ভ্রূ কুঁচকে যুক্তি দিল, “আমি অলরেডি রোমানা ভাবিকে কল করে বাসা থেকে ফ্রেশ খাবার আনতে বলেছি। আর আমার স্বামীর কেয়ার অন্য কেউ এসে করবে, এটা আমি মোটেও সহ্য করতে পারব না। তাই খাবারটা রিসিভ করতে আমাকেই যেতে হচ্ছে।”
কারান মিরার হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিল। “মিরা, তুমি প্রেগন্যান্ট! এই বেসিক ফ্যাক্টটা কি বারবার ভুলে যাচ্ছ?”

মিরা একটু আদুরে মুখভঙ্গি করে ঝুঁকে কারানের সেই শক্ত হাতের ওপর আলতো করে একটা ওষ্ঠস্পর্শ দিল। কারান যখন ভাবল মিরা হয়ত সারেন্ডার করছে, ঠিক তখনই মিরা কারানের কপালের ব্যান্ডেজের ঠিক পাশে একটা মাঝারি গোছের টোকা মারল। আচমকা ক্ষতের পাশে ধাক্কা লাগায় কারান উফ করে হাত সরিয়ে নিজের কপাল ডলতে লাগল।
মিরা বেশ ভালো করেই জানত, এই চাতুরীর আশ্রয় না নিলে কারান কোনোভাবেই তার হাত ছাড়ত না। ঠোঁটের কোণে একটা বিজয়ী হাসির রেখা ফুটিয়ে মিরা নিজের শ্যাম্পেইন-বেইজ রঙের থ্রি-পিসের ওপর ওভারকোটটা জড়িয়ে নিল। এরপর নিখুঁতভাবে ওড়নাটা মাথায় প্যাঁচিয়ে নিল, যেন একটি চুলও অবাধ্য হয়ে বাইরে বেরিয়ে না আসে। সবশেষে সার্জিক্যাল মাস্কটা মুখে টেনে দিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল সে।
কারান বিছানায় শুয়েই ক্ষোভে চেঁচিয়ে উঠল, “মিরা! এই মেয়েটা এত অবাধ্য কেন?” সে কিছুটা মরিয়া হয়ে বিছানা ছেড়ে ওঠার চেষ্টা করতেই কপালে আর পায়ে ব্যথার টান লাগল, আবার ল্যাব্রিন্থাইন সিস্টেমের ভারসাম্যহীনতার কারণে মাথায় চক্কর দিয়ে উঠল, ফলে সে আবার বালিশে মাথা এলিয়ে দিতে বাধ্য হলো। দাঁতে দাঁত চেপে সে নিজের মনেই বিড়বিড় করল, “জাস্ট সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরি আমি! ওর হাত-পা বেঁধে, গলায় পাড়া মেরে ওর সবচেয়ে অপছন্দের ভুনা খিচুড়ি টানা চার দিন খাওয়াব। বেয়াদব মেয়ে একটা, স্বামীর কোনো কথাই শোনে না!”

কেবিন থেকে বেরিয়ে করিডোরের ওজোরাইজড ঠান্ডা বাতাসের মধ্য দিয়ে কিছুটা দূর যেতেই মিরার চোখ পড়ল ওয়েটিং লাউঞ্জের একটা কর্নারের বেঞ্চের দিকে। সেখানে সম্পূর্ণ গুটিসুটি মেরে, মুখ নিচু করে বসে আছে ইলিজা। মিরার নিখুঁত কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়ল। সে দ্রুত এবং দৃঢ় পায়ে এগিয়ে গিয়ে ইলিজার ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়াল। “এই ধানিলঙ্কা! তুই এই হসপিটালে এই অসময়ে কী করছিস?”
মিরার চেনা কণ্ঠস্বর শোনামাত্রই ইলিজা যেন কারেন্টের শক খেল। সে প্রচণ্ড চমকে উঠে এক ঝটকায় বেঞ্চ ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার চোখ দুটো ভয়ে ও বিস্ময়ে গোল গোল হয়ে গেল। সে মনে মনে আতঙ্কিত হয়ে ভাবল, “মি-মি-মিরু আপু? ওহ নো! আপু এখানে কী করছে? খেয়েছে রে, এবার আমি নির্ঘাত শেষ!”
ইলিজা শুকনো মুখে একটা বড়োসড়ো ঢোক গিলল। এদিকে ইলিজার কাছ থেকে কোনো রেসপন্স না পেয়ে মিরার মনটা হুট করেই অজানা আশঙ্কায় শিউরে উঠল। সে ইলিজার চোখের সামনে নিজের হাতটা নাড়িয়ে আতঙ্কিত ও অস্থির কণ্ঠে প্রশ্ন করতে থাকল, “কী হলো, কিছু বলছিস না কেন? সবকিছু ঠিক আছে তো? আচ্ছা, মা-বাবার আবার… বাড়িতে কারো কোনো বিপদ হয়নি তো?”

“আরে না না, আপু! কী সব অশুভ কথা বলছ! তারা তো একদম ঠিকঠাক আছে। এমনকি…. তারা তো জানেই না যে আমি এই মুহূর্তে হসপিটালে আছি।” একটু দম নিয়ে ইলিজা মিরার একটা হাত নিজের দুই হাতের মুঠোয় চেপে ধরল। তার চোখে-মুখে তখন কাকুতি-মিনতির চরম বহিঃপ্রকাশ। সে নিচু স্বরে অনুনয় করে বলল, “শোনো না এঞ্জেল আপু, তুমি আমার লক্ষ্মী, সোনা, কিউট বোনটা না? প্লিজ, এই ব্যাপারটা বাসায় কাউকে জানিও না। আমি প্রমিজ করছি, সব বুঝিয়ে বলব। প্লিজ আপু, বাসায় কাউকে এই ব্যাপারে কিচ্ছু জানিও না!”
মিরা বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে মাত্রই কঠোর ভাষায় রাগারাগি করতে যাবে, ঠিক তখনই করিডোরের আর্দ্র দেওয়ালের পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘাবয়বের এক যুবক কিছুটা অপ্রস্তুত পায়ে এগিয়ে এল। হালকা ধূসর রঙের শার্টের হাতা কনুই অবধি গোটানো, চোখে চশমা আর অবিন্যস্ত চুলে এক ধরনের আটপৌরে বাঙালি ভাব। যুবকটি মৃদু কণ্ঠে শুধালো, “মিস ইলি, কিছু কি হয়েছে?”
ইলিজা চোখ দুটো বড় বড় করে অগ্নিদৃষ্টি হেনে কাব্যের দিকে তাকাল। কাব্য তার এই বাঘিনি চোখের আকস্মিক অগ্নিস্নানের কারণ কিছুতেই অনুধাবন করতে পারল না। সে বোকা বনে গিয়ে চোখের ইশারায় আবার প্রশ্ন করল, ‘কী হয়েছে?’

ইলিজা নিজের ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে, রাগে চোখ বন্ধ করে মনে মনে কাব্যের চোদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে লাগল, “হাদার হাদা, আস্ত একটা গাধার গাধা! নাটারের ঘরের নাটা কোথাকার! মনটা চাচ্ছে একটা উষ্টা মেরে ব্যাটাকে হসপিটালের বাইরে পাঠিয়ে দিই। এমনিতে তো জ্ঞানের কোনো কমতি নেই, সারাক্ষণ ফিলোসফি ঝাড়ে। আর এখন অসময়ে হুট করে এসে হাজির হয়েছে! এবার মিরু আপুর হাতের চড় আর আম্মুর বেতের বাড়ি—সব, সব এই ব্যাটাকেই খাওয়াব। ক্যাঙারু কোথাকার, লাফিয়ে লাফিয়ে চলে এসেছে!”
মিরা ভ্রূ কুঁচকে গভীর বিস্ময় নিয়ে একবার কাব্যের আপাদমস্তক অবলোকন করল। অথচ কাব্য কিন্তু মিরার দিকে তাকাচ্ছিল না; তার সমস্ত মনোযোগ আর প্রশ্নসূচক ব্যাকুল দৃষ্টি তখনো ইলিজার ওপরই নিবদ্ধ ছিল। মিরার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কেন জানি এক অন্যরকম রসায়নের গন্ধ পেল। হুট করেই তার ক্ষুরধার স্মৃতির পাতায় একটা চেনা অবয়ব ভেসে উঠল। হ্যাঁ, এই ছেলেটাকে সে কোথায় যেন দেখেছে! কয়েক মাস আগের কথা মনে পড়ল, সে যখন ইলিজার জন্য একজন যোগ্য গৃহশিক্ষক খুঁজছিল, তখন এই ছেলেরই চমৎকার জীবনবৃত্তান্ত ইলিজা তাকে দিয়েছিল। কিন্তু তখন সামনাসামনি দেখার সুযোগ হয়নি বলে সে স্পষ্ট মেলাতে পারছিল না।
মিরা একটু ইলিজার দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। স্পর্শ করতেই টের পেল, ইলিজার হাত দুটো বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে থরথর করে কাঁপছে, যেন ওকে প্রচণ্ড শীতে ধরেছে। অথচ মেয়েটা কাঁপছিল ধরা পড়ে গিয়ে আপুর হাতের চড় আর বকুনির চরম ভয়ে। আতঙ্কে ওর ফরসা মুখটা শুকিয়ে একেবারে কালচে হয়ে গেছে। মিরা কণ্ঠস্বর কিছুটা নিচু করে জিজ্ঞেস করল, “এই ছেলে কি তোর সেই প্রাইভেট টিচার? কাব্য?”

মিরার মুখ থেকে সরাসরি কাব্যের নাম শুনে এবার ইলিজার কলিজা শুকিয়ে একদম নাই নাই অবস্থা। এদিকে ইলিজার এমন থরথর কম্পমান অবস্থা দেখে কাব্য দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে এক পা এগিয়ে এসে ইলিজার কাঁধে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে হাত রাখল। পরম মমতায় সে বলল, “কী হয়েছে বলবেন কি, মিস ইলি? ইনি কে?”
“আমার… আমার বড়ো বোন। মিরা আপু,” ইলিজা একদম ফিসফিস করে জবাব দিল।
মিরার নাম জানা মাত্রই কাব্যের ঠোঁটের কোণে আলাদাই প্রশান্তিদায়ক ও অমায়িক হাসি ফুটে উঠল। সে অত্যন্ত ভদ্রতাবশত নিজের অগোছালো চুলগুলো এক হাত দিয়ে ব্যাকব্রাশ করে একটু গুছিয়ে নিল। মনে মনে কিছুটা আক্ষেপ হলো—ইশ, মুখে একটু ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিয়ে এলে হয়ত এই ক্লান্ত ও ছন্নছাড়া ভাবটা কিছুটা কাটত! কে জানে মিরা আপু ঠিক কেমন মানুষ! বোনের জন্য এমন একজন বেকার, আপাত-ভবঘুরে এবং ছন্নছাড়া ছেলেকে হয়ত তিনি মোটেও সুনজরে দেখবেন না। যদিও ইতোপূর্বে ফোনে যখন মিরার সাথে তার যৎসামান্য কথা হয়েছিল, তখন মিরার রুচিবোধ ও ব্যক্তিত্ব তাকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা বলেই মনে হয়েছিল।

কাব্য আরেকটু সামনে এগিয়ে এসে, বিনম্রভাবে চোখ নামিয়ে হেসে বলল, “আসসালামু আলাইকুম, আপা। আপনি একদম ঠিক ধরেছেন। আমিই… মানে আমিই ওর প্রাইভেট টিচার, শেখ আরভিন কাব্য।”
মিরা হুট করেই ছেলেটার চোখের দিকে তাকাল। বয়সে হয়ত তার থেকে কিছুটা ছোটোই হবে, কিন্তু কণ্ঠস্বরে কেমন যেন সুমধুর ও পরিপক্ব ভাব এবং প্রতিটি শব্দের সাথে মিশে থাকা খাঁটি সম্মানবোধ যে কাউকে এক লহমায় মুগ্ধ করতে বাধ্য। মিরার অবচেতনেই ছেলেটার প্রতি একটা সূক্ষ্ম ভালো লাগা আর শ্রদ্ধা কাজ করল। তাও সে নিজের চেহারায় গাম্ভীর্য ধরে রেখে কিছু একটা প্রশ্ন করতে যাবে, কিন্তু কাব্য যেন তার মনের ভেতরে চলতে থাকা সব জটলা আগে থেকেই পড়ে ফেলেছিল।

তাই সে নিজেই অতি চমৎকারভাবে সাফাই গেয়ে বলল, “এখানে কিন্তু ইলিজার কোনো দোষ নেই, আপা। মেয়েটা একটু চঞ্চল আর দুষ্টু, সেটা আমি জানি। তবে আজকে ওকে আসলে আমিই জোর করে বাসা থেকে বের করে এনেছি। অনেকদিন ধরে ও চার দেয়ালের মাঝে বন্দি, বাইরের মুক্ত হাওয়া-বাতাসের ছোঁয়া পায়নি আসলে। যদিও আজ বের হওয়ার প্রধান কারণটা একটু অন্য ছিল। এই হসপিটালের আইসিইউতে আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু অত্যন্ত ক্রিটিক্যাল অবস্থায় ভর্তি। ইলিজাও ওকে পার্সোনালি চেনে। তাই ভাবলাম…”
কাব্যের কথাগুলো শুনতে শুনতে মিরার অবচেতন মন একটা সমীকরণ মিলিয়ে ফেলল। সে মনে মনে আওড়ে উঠল, “তার মানে… কারানের গাড়িটা যে অন্য গাড়ির সাথে ক্র্যাশ করেছিল, সেই বিপরীত লেনের গাড়িটা আর কেউ নয়, এই কাব্যের বন্ধুরই ছিল!”

তবে এই মুহূর্তের চরম উত্তেজনার মাঝেও মিরা একটা সত্য মনে মনে স্বীকার করতে বাধ্য হলো, এই ছেলের কথাবার্তার ধরণ এতটা চমৎকার আর পরিশীলিত কেন? এর আগে যখন ফোনেও কথা হয়েছিল, তখনও তার পরিমিতিবোধ মিরাকে মুগ্ধ করেছিল। তার মানে স্বীকার করতেই হচ্ছে, ইলিজার চয়েজ মোটেও মন্দ নয়। মিরার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশ্রয়ের হাসি খেলে গেল।
মিরা আড়চোখে একবার ইলিজার দিকে তাকাল। বেচারি কেমন চুপসে গিয়ে একপাশে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে, মাথা নিচু করে নিজের জর্জেট ওড়নার প্রান্তটা আঙুল দিয়ে খুঁটছে আর পায়ের নখ দিয়ে ফ্লোর ঘষছে। মিরা কিছুটা কৌতুকভরে ইলিজার দিকে আরও এক কদম এগিয়ে গেল। এরপর কাব্যের অলক্ষ্যে একদম নিচু গলায় বলল, “ইনিই তাহলে আপনার সেই স্বপ্নের রাজকুমার, তাই তো মিস ধানিলঙ্কা?”
ইলিজা লজ্জায় একেবারে রাঙা হয়ে উঠল। সে হাত-পা নেড়ে আপুকে আমতা আমতা করে কিছু একটা বোঝাতে যাবে, ঠিক তখনই করিডোরের ওপার থেকে সবুজ পোশাক পরা একজন সিনিয়র ডাক্তার দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলেন। তার হাতে একটা ক্লিপবোর্ড।

তিনি করিডোরের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে ডাকলেন, “এক্সকিউজ মি, এখানে মিস ক্যালিস্তা কে?”
ইলিজা চোখ তুলে ‘আমি’ বলার আগেই পাশ থেকে কাব্য অত্যন্ত ব্যগ্রতা নিয়ে বলে উঠল, “কী হয়েছে, ডক্টর? সব ঠিকঠাক তো? ওর আবার বিশেষ কিছু…”
বলতে বলতে কাব্যের কণ্ঠস্বর মাঝপথেই থেমে গেল। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতে চাইল। যতই হোক, শুভ্রকে সে আসলে মন থেকে নিজের সহোদরের মতো ভালোবাসে। ওদের ছাত্রজীবনের কত শত শত স্মৃতি জড়িয়ে আছে বুয়েটের অ্যাকাডেমিক ভবন প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে নীলক্ষেতের পুরোনো বইয়ের গলিগুলোতে। এভাবে এক লহমায় অবিন্যস্ত এক সড়ক দুর্ঘটনায় বন্ধুকে আইসিইউর বিছানায় নিষ্প্রাণ পড়ে থাকতে দেখাটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।
সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডাক্তার আশরাফ আহমেদ চশমার ফ্রেমটা নাকের ওপর একটু ঠিক করে নিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন, “না না, প্যানিক করার কিছু নেই। পেশেন্ট এখন আউট অব ডেঞ্জার। তবে ওনার বাঁ হাতটা কমপ্লিটলি ফ্র্যাকচার হয়েছে, তাই প্লাস্টার করা। পেশেন্ট জ্ঞান ফেরার পর থেকেই মিস ক্যালিস্তার সাথে একবার কথা বলার জন্য ভীষণ ব্যাকুল হয়ে আছেন।”

এই বলে ডাক্তার করিডোরের ওপাশে চলে গেলে কাব্যের শ্যামল মুখটা এবার বেশ থমথমে আর গম্ভীর হয়ে গেল। মনের ভেতরে মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন শুরু হলেও সে নিজেকে সামলে নিল। মিরার দিকে ফিরে বিনীত সুরে বলল, “আপা, আপনি একটু অনুগ্রহ করে এখানে অপেক্ষা করুন। আমি আর মিস ইলি একটু আমার বন্ধুর সাথে দেখা করে আসি। মাঝপথে আপনাকে একা রেখে যাচ্ছি বলে দয়া করে কিছু মনে করবেন না।”
“না না, একদম ঠিক আছে। আপনারা যান,” মিরা ঠোঁটের কোণে আশ্বাসের হাসি ফুটিয়ে বলল।
কাব্য আলতো করে ইলিজার ডান হাতটি নিজের হাতের তালুর সুরক্ষায় নিল। হাসপাতালের ব্যস্ত করিডোরে ট্রলি, নার্স এবং অন্য রোগীদের আত্মীয়-স্বজনের আনাগোনা ছিল। মিরা লক্ষ্য করল, এত ভিড়ের মাঝেও কাব্য কীভাবে নিজের চওড়া কাঁধ দিয়ে ইলিজার চারপাশে একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করেছে, যাতে অন্য কোনো পরপুরুষের সামান্য স্পর্শও ইলিজার গায়ে না লাগে। আর তার হাত ধরার ধরনটাও ছিল ভীষণ মার্জিত।
আইসিইউর ভেতরে কেবল সেন্ট্রাল অক্সিজেনের হিসহিস শব্দ আর হার্ট রেট মনিটরের গ্রাফ ওঠানামা করছে। শুভ্রের অবস্থা আসলেই বেশ শোচনীয়। অ্যালকোহল সেবন করে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণেই আজ তার এই পরিণতি। বন্ধুর এই চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতায় কাব্যের ভেতরে রাগের আগুন জ্বলছিল, কিন্তু মৃ*ত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা একটা মানুষকে কোনো কঠোর বাক্যবাণ শোনানোর মতো নিষ্ঠুর সে হতে পারল না।

ইলিজা চোখ নামিয়ে কাব্যের সামান্য পেছনে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, কাব্য যতক্ষণ না পর্যন্ত তাকে অনুমতি দিচ্ছে, সে নিজ থেকে শুভ্রের সাথে কোনো বাক্যালাপে জড়াবে না।
এদিকে দরজার হাইড্রোলিক লক খোলার আওয়াজ পেয়ে শুভ্র ক্লান্ত চোখ জোড়া মেলল। তার এক হাত ব্যান্ডেজে মোড়ানো। পায়েও ভারী কাস্ট বসানো। কপালের ডান পাশটা কেটে গিয়ে সেখানে চারটে সেলাই পড়েছে। শুভ্র বেশ কিছুক্ষণ আইসিইউর নীল আলোয় ইলিজার সেই নতজানু, শান্ত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে রইল। এরপর তার চোখ জোড়া গিয়ে স্থির হলো কাব্যের ওপর। দেখল, কাব্য কেমন অধিকারবোধ আর প্রচ্ছন্ন সতর্ক দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে। শুভ্র মনে মনে বেশ ভালোভাবেই বুঝল, কাব্য মোটেও এটা পছন্দ করছে না যে শুভ্র তার জীবনের একমাত্র আরাধ্য নারীর দিকে এভাবে তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে থাকুক।
শুভ্র শুকনো ঠোঁট দুটো জিভ দিয়ে সামান্য ভিজিয়ে নিয়ে একটা ম্লান হাসি হাসল, “তুই একটু বাইরে যাবি, বন্ধু? আমি জাস্ট দু-এক মিনিটের জন্য মিস ক্যালিস্তার সাথে পার্সোনালি কিছু কথা বলব!”
কাব্যের চোখের মণি সংকুচিত হলো, সে পকেটে হাত গুঁজে শীতল কণ্ঠে বলল, “আমি এখানেই একটা কর্নারে বসে থাকি, শুভ্র। আই প্রমিজ, আমি তোদের কনভারসেশনের মাঝে বিন্দুমাত্র ইন্টারফেয়ার করব না।”
“দয়া করে আমার এই শেষ ইচ্ছাটার ওপর একটু দয়া কর, ভাই,” শুভ্র অনুনয় মাখানো স্বরে বলল, “এতটা নির্দয় হোস না! প্লিজ, কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যা। আমি তো আর এই ভাঙা হাত-পা নিয়ে বিছানা থেকে উঠতে পারব না! তাই আবার ভেবে বসিস না যে আমি ইলিজার কোনো ক্ষতি করব!”
শুভ্রের কথায় কাব্য মনে মনে বেশ বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হলো। শুভ্র তার শৈশবের বন্ধু; মনের এক কোণে শুভ্রকে নিয়ে তার একটা সূক্ষ্ম জেলাসি কাজ করে ঠিকই, কারণ শুভ্রও ইলিজাকে মনে প্রাণে পছন্দ করে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সে তার নিজের র*ক্তের চেয়েও প্রিয় বন্ধুকে চেনে না বা বিশ্বাস করে না! শুভ্র বোকার মতো নিজেকে অপরাধী কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে কেন?

“মদ খেয়ে মাথাটাই পুরো ড্যামেজ হয়ে গেছে। মাথায় একটা শক্ত বারি মারলে ছাগলটা ঠিকই লাইনে আসত!” নিজের চিবুক শক্ত করে বিড়বিড় করতে করতে কাব্য রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
কাব্য চলে যাওয়ার পর একটা দীর্ঘ ও ভারী নিশ্বাস ফেলল শুভ্র। সে অনেকক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ইলিজার দিকে। এই মেয়েটা কিছুদিন আগেও যখন তার সাথে কথা বলত, অন্তত সৌজন্যমূলক একটা মৃদু হাসি হলেও উপহার দিত। আর আজ? আজ যেন সে মনেপ্রাণে, নিজের অজান্তেই মেনে নিয়েছে যে এই পৃথিবীতে কাব্য নামক পুরুষটি বাদে বাকি সবাই তার জন্য পরপুরুষ, সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ব্যাপারটা ভেবে শুভ্রের ঠোঁটের কোণে এক টুকরো বিষাদমাখা, করুণ হাসি ফুটে উঠল।
করিডোরের ওজোন-স্মেল্ড বাতাসে আবার এসে দাঁড়াল কাব্য। সে দেখল, ওয়েটিং বেঞ্চের এক প্রান্তে বসে মিরা তার আইফোনটি কানের কাছে ধরে কারও সাথে বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে কথা বলছে।
“হ্যাঁ, ভাবি। তোমাদের ওখান থেকে আসতে আর ঠিক কতক্ষণ লাগবে?” মিরার কণ্ঠস্বর কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিল।
ওপাশ থেকে রোমানা শান্ত গলায় উত্তর দিল, “এইতো মিরা, ট্র্যাফিক জ্যামটা পার হয়ে এসেছি। আর বড়োজোর বিশটা মিনিট লাগবে হসপিটালে পৌঁছাতে।”

মিরা ফোনটা কেটে কপালে হাত দিয়ে বসে রইল। কাব্য কিছুটা সামাজিক ও জেন্টলম্যান সুলভ দূরত্ব বজায় রেখে বেঞ্চের অন্য প্রান্তে এসে বসল। আসলে তার মনের ভেতর প্রবল ঝড় বইছিল। সে মিরাকে কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল, কিন্তু তীব্র ইতস্তত বোধ তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। প্রথম দেখায়, হসপিটালের এমন একটা মুহূর্তে পারিবারিক বা ব্যক্তিগত কোনো গম্ভীর প্রস্তাব দেওয়াটা মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়। তবে ইলিজার মুখে সে মিরার ব্যক্তিত্বের যে বর্ণনা শুনেছে, তাতে কাব্য খুব ভালো করেই জানে, এই নারীর সম্মতি ব্যতিরেকে মিরার পরিবার কখনোই তার মতো এক ছন্নছাড়া যুবকের সাথে ইলিজার পবিত্র সম্পর্ককে মেনে নেবে না।
হাসপাতালের করিডোরে ট্রলির চাকার ঘর্ষণ আর নার্সদের পায়ের শব্দের মাঝেও অনেকক্ষণ দুজনেই একদম নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইল। কাব্য কিছুতেই নিজের ভেতরের শব্দগুলোকে পরিপাটি করে গুছিয়ে নিতে পারছিল না। তীব্র মানসিক উত্তেজনায় তার শ্যামবর্ণ কপালে আর নাকের ডগায় হালকা ঘামের কণা জমে উঠেছে।
এতক্ষণের ভারী নীরবতা ভেঙে হুট করেই মিরা এক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন করে বসল, “আমি যতটুকু ইনফরমেশন পেয়েছি, আপনি আপনার বাবা-মায়ের সাথে থাকেন না; ঢাকার একটা জরাজীর্ণ মেসে একাকী থাকেন। খোলামেলা একটা কথা জিজ্ঞেস করি কাব্য, যদি কোনোদিন আমার আদরের বোনকে আপনার হাতে তুলে দেওয়া হয়, তাকেও কি আপনি ওই মেসে রেখেই সংসার করবেন?”

মিরার এমন অপ্রত্যাশিত ও মনস্তাত্ত্বিক গোলকধাঁধায় ভরা প্রশ্নে কাব্য বেশ থতোমতো খেয়ে গেল। তার বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ালেও, সে দ্রুত নিজের স্নায়ুচাপ নিয়ন্ত্রণ করে নিল। এই প্রশ্নটার একটা ইতিবাচক দিকও তার মাথায় এল—তার মানে ইলিজা ইতোমধ্যে তাদের সম্পর্কের গভীরতার কথা বড় বোনকে অকপটে জানিয়েছে। যাক, জীবনের এই কঠিন মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে অন্তত এক ধাপ তো এগোনো গেল! কাব্য চশমাটা নাকের ডগায় একটু ঠিক করে নিয়ে নিজের কণ্ঠস্বরকে একদম স্বাভাবিক ও গম্ভীর রেখে উত্তর দিল, “না, আপা। আসলে অবাস্তব কোনো রূপকথার গল্প শুনিয়ে তো লাভ নেই। আমি অত্যন্ত প্র্যাক্টিক্যাল একটা ছেলে। আমি সত্যিই ওকে কোনো রাজকীয় বড়ো বাড়ি, দামি গাড়ি কিংবা অনেক লাক্সারি কোনো লাইফস্টাইল দিতে পারব না। আমার সেই সামর্থ্য আপাতত নেই। আমি ভেবেছি, বুয়েটের অ্যাকাডেমিক পড়াশোনাটা শেষ হলে একটা ভালো করপোরেট চাকরি বা বিসিএস-এর ট্রাই করব। জানি না কপালে কী আছে, চাকরি পাবো কিনা, সবকিছুই আসলে আল্লাহর ওপর নির্ভর করছে। আমি প্রতি ওয়াক্তের নামাজ শেষে একটা দোয়াই করি, যেন আমার একটা সৎ এবং সম্মানিত কর্মসংস্থান জোটে। যেন সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আমি মিস ইলিকে গর্বের সাথে সবার সামনে রিপ্রেজেন্ট করতে পারি যে, আমার এই আজকের পদবি, আজকের এই অর্জিত সম্মানের সমান অংশীদার আমার প্রিয়তমা, আমার অর্ধাঙ্গী।”

কাব্য যখন জীবনের কঠিন বাস্তবতার কথাগুলো বলছিল, তখন মিরা নিবিষ্ট মনে যুবকের চোখের ভেতরের সততা পরিমাপ করতে লাগল। কাব্য তার ডান হাতের আঙুলগুলো সামান্য নাড়াচাড়া করে আবার বলতে শুরু করল, “আপনার ওই কঠিন প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর এই মুহূর্তে আমার কাছে নেই, আপা। তবে ওকে নিয়ে একটা ছোটোখাটো দুই রুমের ছিমছাম ঘর বাঁধার মতো সামর্থ্য ইন শা আল্লাহ হয়ে যাবে; এই আত্মবিশ্বাস আমার আছে। আর সেই ঘরটা কোনো পারিবারিক দয়ায় নয়, সম্পূর্ণ আমার নিজের কষ্টের উপার্জিত টাকায় হবে। আমি হয়ত ওকে প্রতিদিন টেবিল ভরা দামি মাছ-মাংস খাওয়াতে পারব না; কিন্তু নিজের ছাদবাগানে পরম যত্নে লাগানো গাছ থেকে টাটকা তরকারি পেড়ে এনে, রান্না করে, নিজের হাতে ওকে লোকমা তুলে খাইয়ে দিতে পারব। আমি হয়ত ওকে প্রতি উইকেন্ডে কোনো দামি সেডান কারে করে লং ড্রাইভে বা বছরে একবার বিদেশ ভ্রমণে নিয়ে যেতে পারব না; কিন্তু প্রতি মাসে অন্তত একবার হলেও ওকে নিয়ে রিকশায় করে হুড ফেলে ঢাকা শহরের চেনা পথগুলোয় ঘুরতে যাব। অবসাদে ওর মাথায় খাঁটি সরষের তেল দিয়ে চুলগুলো আঁচড়ে দিতে পারব। ও কোনোদিন অসুস্থ হলে ওর যত্ন নিতে পারব; রান্না করা, জামাকাপড় ধুয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে ঘর ঝাড়ু দেওয়া—সব কাজ আমি নিজে হাসিমুখে করতে পারব। মোট কথা, ওকে সব ধরনের মানসিক প্রশান্তি দেওয়ার শতভাগ সামর্থ্য ও মানসিকতা আমার আছে।”

মিরা বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে কাব্যের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বস্তুগত প্রাচুর্য বা অগাধ টাকা ছাড়াই যে জীবনে সুখী হওয়া সম্ভব, তার জন্য কেবল এমন একজন নিঃশর্ত ভালোবাসার মানুষ পাশে থাকা প্রয়োজন, এই ধ্রুব সত্যটা মিরা খুব ভালো করেই জানে। কিন্তু একজন অভিভাবক হিসেবে কেবল এই আবেগঘন কথাতেই তো আর আদরের ছোট বোনকে একটা বেকার ছেলের হাতে সঁপে দেওয়া যায় না। তাই সে নিজের মুখের গাম্ভীর্য বজায় রেখে কাব্যকে আরেকটু কঠিনভাবে বাজিয়ে দেখার জন্য পরবর্তী তীরটা ছুঁড়ল, “আপনার এই ফিলোসফি শুনতে বেশ ভালো লাগল। কিন্তু আমি যদি একজন অভিভাবক হিসেবে প্র্যাক্টিক্যালি বলি, ইলিজা আপনার চেয়ে অনেক বেটার কোনো রিচ ফ্যামিলির পাত্র ডিজার্ভ করে, এবং আমি ওকে ফিউচারে তেমন কারো সাথেই বিয়ে দিতে চাই… তখন আপনি কী করবেন?”

পুরোটা সময় ধরেই কাব্য মিরার দিকে একবারও তাকায়নি। এবারও সে চোখ নামিয়ে রেখেই মৃদু হাসল। সে মাথা তুলে সামনের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে শান্তভাবেই বলল, “মাঝরাতে আপনার বোনকে পালিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো কাপুরুষ বা মেরুদণ্ডহীন ছেলে আমি নই। আবার ওকে কোনো অন্ধকার ঘরে কিডন্যাপ করার মতো বোকাও আমি নই। তবে হ্যাঁ, ওর ভালোবাসার সম্মানের জন্য আমি নিজের শেষ র’ক্তবিন্দু দিয়ে সমাজের যে-কোনো শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। আমি সত্যি বলছি আপা, আপনি যদি ওর ফিউচার নিয়ে তেমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে যান, তাহলে আমি তো আর আপনার মতো সম্মানিত নারীর সাথে মারামারিতে জড়াব না; তবে আপনার সাথে মুখে মুখে একটা লঙ্কাকাণ্ড ঘটে যাবে অবশ্যই। দরকার পড়লে ঝগড়ায় পিএইচডি করার জন্য পাশের বাড়ির আন্টিদের থেকে কয়েকদিনের স্পেশাল ট্রেনিং নিয়ে আসব। বাট বটম লাইন ইজ, যে-কোনো অবস্থাতেই আমি ইলিজার হাত ছাড়ছি না।”

এই গম্ভীর ও আবেগঘন পরিবেশের মাঝেও কাব্যের ‘ঝগড়ায় পিএইচডি’ আর ‘পাশের বাড়ির আন্টিদের ট্রেনিং’ নেওয়ার রসাত্মক কথা শুনে মিরা নিজের মুখের কঠিন গাম্ভীর্য ধরে রাখতে পারল না; সে মৃদু হেসে ফেলল। তবে একজন পরিপক্ব বিচারকের মতো সে সেখানেই থেমে গেল না। সে একের পর এক মনস্তাত্ত্বিক ও বাস্তবমুখী তীক্ষ্ণ প্রশ্ন কাব্যের দিকে ছুঁড়তে থাকল। আর প্রতিবারই কাব্য অত্যন্ত বিচক্ষণতা, উপস্থিত বুদ্ধি এবং প্রখর রসবোধের সাথে প্রতিটি প্রশ্নের যৌক্তিক উত্তর দিতে থাকল।
মিরার মানুষের চোখের ভাষা পড়ার সহজাত ক্ষমতা আছে। তাই মাত্র কয়েক মিনিটের এই কথোপকথনে সে খুব ভালো করেই অনুধাবন করতে পারল যে, শেখ আরভিন কাব্য কেবল পড়াশোনাতেই বুয়েটের সেরা নয়, বরং এই অল্প বয়সেই সে মানসিক দিক থেকে পরিপক্ব, আত্মমর্যাদাশীল এবং প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন খাঁটি পুরুষ।
মিরা মনে মনে পরম তৃপ্তির শ্বাস ফেলে, নিজের কোটের পকেটে হাত গুঁজে আওড়ালো, “ভেবেছিলাম আমার চঞ্চল আর অবুঝ বোনটা বড্ড সরল, আবেগের বশে যে-কোনো সময় কোনো ভুল মানুষের ফাঁদে ফেঁসে যাবে। কিন্তু মেয়েটা তো নিজের জীবনের জন্য ঠিকই সেরা রত্নটা খুঁজে বের করেছে। আসলেই কাব্য, তোমার এই আত্মসম্মানবোধ আর ব্যক্তিত্বের গভীরতা আর দশটা ছেলের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা… ঠিক যেন আমার বাবার আদর্শের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।” মিরা স্বস্তির হাসি হাসল, যার রেশ তার শান্ত চোখ জোড়ায় স্পষ্ট ফুটে উঠল।

আইসিইউর নিস্তব্ধতার মাঝে অনেকক্ষণ শুভ্রের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ইলিজা এবার তার নতমুখী দৃষ্টি তুলে তাকাল। মনিটরের আলোয় সে দেখল, শুভ্রের চোখের কোণে তপ্ত জল জমেছে। শুভ্র একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে ভাঙা গলায় বলে উঠল, “আমি পৃথিবীর ওই সমস্ত পুরুষের বিরুদ্ধে একাই র*ক্তাক্ত কুরুক্ষেত্র সাজাতে পারব যারা তোমাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রাখে, কিন্তু… শুধু পারব না ওই একটা মাত্র মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে, যাকে তুমি নিজেই পাওয়ার জন্য ব্যাকুল! কার বিরুদ্ধে লড়ব বলো? যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী স্বয়ং তোমার ভালোবাসা এবং আমার পরম বন্ধু!” একটু থেমে কণ্ঠে আরো গভীরতা ঢেলে বলল, “জানো, গত কয়েকটা মাস আমি নিজের সঙ্গে এমন এক যুদ্ধ করেছি, যার প্রতিটা মুহূর্ত ছিল আত্মহননের মতো। শতবার নিজেকে বোঝাতে চেয়েছি, তোমার থেকে দূরে থাকাই আমার জন্য মুক্তি। তোমার নাম ভুলতে চেয়েছি, তোমার স্মৃতিগুলোকে নির্বাসনে পাঠাতে চেয়েছি, এমনকি নিজের হৃদয়কেও বিশ্বাসঘাতক বানানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি হেরে গেছি, মিস ক্যালিস্তা… সম্পূর্ণভাবে হেরে গেছি। তোমার অদৃশ্য মায়াবী বৃত্ত আমাকে এমনভাবে বন্দি করেছে, যেখান থেকে মুক্তির প্রতিটি পথ এসে শেষ হয় তোমার কাছেই।”

শুভ্র তার জন্য এতটা মানসিক যন্ত্রণা পাচ্ছে, এটা দেখে ইলিজার সত্যিই খারাপ লাগছিল। তবে সে নিজের আবেগের কাছে পরাস্ত হতে চাইল না; কারণ সে মনেপ্রাণে শুধু কাব্যকেই তার জীবনের ধ্রুবতারা মেনে নিয়েছে। ইলিজা নিজের ভেতরের দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে নিজেকে শক্ত করে বলল, “আপনি তো কোনো অবুঝ বা অপরিণত বালক নন, শুভ্র। তবুও কেন নিজের লাইফটা নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলছেন? আজকে যদি এই মারাত্মক এক্সিডেন্টে আপনার খারাপ কিছু হয়ে যেত, আপনার মায়ের কী অবস্থা হতো একবারও ভেবেছেন? আন্টিকে কাব্য এখনো কিচ্ছু জানায়নি, কারণ উনি অলরেডি ওনার নিজের অসুস্থতা নিয়ে সাফার করছেন।”
ইলিজার এই যৌক্তিক কথার উত্তরে শুভ্র শূন্য দৃষ্টিতে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “আই উইশ আমি যদি সত্যিই অবুঝ হতাম! কি একটা অবস্থা দেখো, অসম্ভবের প্রতি আমাদের অসম্ভব টান। তোমাকে পাওয়াটা এতটা কঠিন কেন বলো তো?”

“অন্যের আমানতকে কেন মিছেমিছি ভালোবাসছেন? আমি আপনাকে আগেও অবান্তর আশা দিইনি, এখনো বলছি, আমি আসলেই আপনার প্রতি ওই ধরনের কোনো স্পেশাল ফিলিংস রাখি না। সো প্লিজ, আপনি আমাকে ভুলে নিজের জন্য কোনো যোগ্য ও সুশ্রী মেয়েকে খুঁজে নিন।”
শুভ্র অত্যন্ত আকুল ও আর্তিভরা কণ্ঠে বলে উঠল, “আমাকে ভালো বাসতে না পারো, অ্যাটলিস্ট ভালো বাসতে তো দিবা? তোমার আমাকে রিটার্নে ভালোবাসার কোনো দরকার নেই, আমি শুধু তোমাকে দূর থেকে ভালোবেসে যাওয়ার একটা নীরব অধিকার চাইছি। দোহাই তোমার, এই শেষ আশ্রয়টুকু আমার থেকে কেড়ে নিও না।”

ইলিজা এ কথার আর কোনো প্রত্যুত্তর না দিয়ে দ্রুত আইসিইউর ভারী দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলো। আসলে শুভ্রের এই একতরফা প্রেমের আকুলতার কোনো যৌক্তিক জবাব তার কাছে ছিল না। করিডোরের আলোয় আসতেই মিরাকে সামনে দেখে সে আবার থমকে গেল। মনের ভেতর একরাশ দ্বিধা কাজ করল, কী জানি কাব্য আর মিরা আপুর মাঝে এতক্ষণ কী কথা হয়েছে! তারা কি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে?
ঠিক তখনই দূর থেকে কাব্য আর মিরার নিচু স্বরের কথোপকথন তার কানে এলো। কথার সূত্র ধরে সে হুট করেই একটা মারাত্মক সত্য জানতে পারল, শুভ্রের গাড়িটা আসলে কারানের গাড়ির সাথেই অ্যাক্সিডেন্ট করেছে! তবে কারানের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু এ নিয়ে আপাতত বোনের সামনে সে নিজে থেকে কোনো সহানুভূতির টু শব্দও করতে চাইল না। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, সে কারানের প্রতি কী আর সহানুভূতি দেখাবে, তাকেই এখন মিরা মেরে চ্যাপটা করে সহানুভূতি দেখিয়ে দেবে।
ইলিজা চোরের মতো পা টিপে টিপে মিরার দিকে এগিয়ে আসতেই মিরা নিজের বুকে আড়াআড়ি হাত রেখে অভিভাবকসুলভ কঠোরতায় বলল, “বাসায় ঠিক কী বাহানা দিয়ে বাইরে বেরিয়েছিস শুনি?”
ইলিজা আমতা আমতা করে বলল, “বলেছি… বলেছি যে এসএসসি পরীক্ষা তো শেষ, এখন বন্ধুদের সাথে একটু আউটিংয়ে যাব।”

“বাবাহ! এখনই দেখি নিখুঁত মিথ্যা বলা শিখে গেছিস!” মিরা এক হাত বাড়িয়ে ইলিজার কানের লতিটা ধরে সামান্য মোচড় দিল।
“আহ আপু! লাগছে তো, ছাড়ো না! জিজাজি সুস্থ হয়ে উঠুক, ঠিক তোমার নামে সব অভিযোগের লিস্ট করে ওনাকে ধরিয়ে দেব, তখন ভাইয়ার জিম করা হাতের তিন-চারটা টোকা খেলেই বুঝবে মজা!” ইলিজা ব্যথার ভান করে মুখ কুঁচকে বলল।
মিরা নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে একটু বাঁকা হাসল, “ভাইয়ার চামচাগিড়ি পরে করবেন, সন্ধ্যা পার হয়ে যে রাত হয়ে গেছে সে হুঁশ আছে আপনার?”

ইলিজা মুখ বেজার করে কাব্যের পেছনে গিয়ে আড়ালে দাঁড়াল। ইলিজার কাব্যের উপর এই ভরসা দেখে মিরা অজান্তেই মুখের কড়া ভাবটা ভেঙে মৃদু হাসল। সে কাব্যের মুখোমুখি হয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “ওকে একদম সেফলি বাসায় পৌঁছে দেবে, কাব্য। বড় বোন হিসেবে আমি কিন্তু যথেষ্ট স্ট্রিক্ট, সেটা ইন ফিউচার তোমার ক্ষেত্রেও অ্যাপ্লাই হবে, মনে রেখো।”
মিরার এই প্রচ্ছন্ন সবুজ সংকেত ও প্রাজ্ঞ কথায় কাব্যের ঠোঁটে চওড়া, স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারল, মিরা এক প্রকার অলিখিতভাবে ইলিজার সুরক্ষার দায়িত্বটা তার নির্ভরযোগ্য কাঁধেই সঁপে দিয়েছে।

আসাদ আর আশমিনিকে মিরা আগেই অনেক জোরাজুরি করে বাসায় ফেরত পাঠিয়েছে, কারণ আয়াশের সামনে পরীক্ষা, ওর দেখভালের প্রয়োজন। তাছাড়া ইসহাকের অফিশিয়াল ডিউটি ছিল বলে সেও পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক দেখে অনেক আগেই স্টেশন অভিমুখে চলে গেছে। আপাতত হাসপাতালে মিরা বাদেও আছে কারানের বড় ভাই আরিয়ান। সে অবশ্য এতক্ষণ ভেতরে ছিল না, করিডোরের গুমোট ভাব কাটাতে হাসপাতালের বাইরে ওপেন স্পেসে গিয়ে একটা সিগারেট ফুঁকতে গেছে; হাসপাতালের ভেতরে তো আর ওসবের অনুমতি নেই।

এদিকে আরিয়ানের স্ত্রী রোমানা মিরার কথামতো বাসা থেকে গরম ও পুষ্টিকর খাবার নিয়ে মাত্রই গাড়ি থেকে নামল। রোমানাকে গাড়ি থেকে নামতে দেখেই আরিয়ান দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল। রোমানার হাতের ভারী টিফিন বক্সটা নিজের শক্ত হাতে নিয়ে সে বেশ ক্ষোভ ও অভিমানের সুরে বলল, “বড্ড বেশি ত্যাড়া স্বভাবের তুমি, রোমানা। আমি তোমাকে ফোনে এতবার বারণ করলাম যে ড্রাইভারকে দিয়ে পাঠিয়ে দাও অথবা আমি নিজে গিয়ে নিয়ে আসি, তাও তুমি এই রাতে একা একটা মেয়ে মানুষ হয়ে কেন আসতে গেলে? যদিও তোমাকে ‘মেয়ে মানুষ’ বলে শব্দের ভুল প্রয়োগ করে একটা মস্ত বড় ক্রাইম করে ফেললাম! আল্লাহ জানে নারী সমাজ আমাকে এই বোকামির জন্য ক্ষমা করবে কিনা, হয়ত আমার নামে আন্তর্জাতিক মামলাও ঠুকে দিতে পারে! কারণ তুমি বাইরে বাইরে দেখতে অবলা নারী হলেও, ভেতরে ভেতরে যে-কোনো ব্যাটাছেলের চেয়েও ডাবল শক্তি আর জেদ নিয়ে ঘোরো, আমার ঘাউড়া বউ!”

রোমানা আরিয়ানের শেষের ফালতু কথায় কান না দিয়ে, করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে শুরুর দিকের কথার জবাবে বলল, “হুট করে বড্ড বেশি দরদ দেখাচ্ছ যে, মিস্টার আরিয়ান? কী ব্যাপার? কারো পকেট মেরে ধরা খেয়েছ নাকি? এখন নিজের গা বাঁচাতে আমার মতো একজন নামকরা ডিফেন্স লয়ার লাগবে বুঝি?”
“তোমার ওপর দরদ আমার কবে ছিল না, বলো? এখন তোমার পাথরের মনে আমার জন্য দরদ উথলে ওঠে না বলে তো আর আমার জেনুইন ফিলিংস উলটে যাবে না। আমার ভালোবাসা ওয়াই-ফাইয়ের মতো চব্বিশ ঘণ্টাই কানেক্টেড। সমস্যা হলো তোমার হার্টের পাসওয়ার্ড এখনো পাইনি, প্রিয়দর্শিনী,” আরিয়ান পকেটে হাত গুঁজে লম্বা লম্বা পা ফেলে রোমানার পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল।
মেঝেতে রোমানার হিলের খটখট শব্দটা হুট করে থেমে গেল। সে আরিয়ানের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে শান্ত গলায় বলল, “তুমি কি আদৌ জানো আজ ঘরে কী রান্না হয়েছে? মিরা কোন ডিশটা কীভাবে প্যাক করে আনতে বলেছিল, আর কোন সিকোয়েন্সে আনতে হবে, এসব কি তুমি হ্যান্ডেল করতে পারতে? তুমি তো লবণের জায়গায় চিনি দিয়ে বিরিয়ানি টু ফিরনি বানিয়ে ফেলতে, তারপর অসুস্থ রোগীকে সোজা কবরে পাঠাতে! নিজের আন্ডারউইয়ারটা ড্রয়ারে কোন কোনায় থাকে সেটাই তো খুঁজে পাও না, আবার এসেছে হসপিটালের কেটারিং সার্ভিস সামলাতে!”

“ঘুরিয়ে-প্যাঁচিয়ে এত লজিক না দেখিয়ে এক লাইনে বললেই তো পারো যে তুমি আমার বড্ড কেয়ার করো! আমার একটু কষ্ট হোক, সেটা তুমি মন থেকে চাও না,” আরিয়ান ভ্রূ জোড়া সামান্য নাচিয়ে বেশ রসিকতার সাথে ফ্লার্ট করার ট্রাই করল।
রোমানা একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরিয়ানের আপাদমস্তক এমনভাবে দেখে নিল যেন চিড়িয়াখানার কোনো অদ্ভুত জীব দেখছে, “শোনো আরিয়ান, যদি ভবিষ্যতে হসপিটালের আইসিইউর বেডে লটকে শুয়ে থাকতে না চাও, তবে আমার থেকে অন্তত দশ হাত ডিসট্যান্স বজায় রাখো। তোমার ওই ভবিষ্যতের বাতিতে যদি কোনোদিন আমি কেরোসিন ঢেলে দেশলাই ছুঁইয়ে দিই, তখন কিন্তু কেঁদেকেটেও ওই অমূল্য জিনিস আর লাইফে ব্যাক আনতে পারবা না, সোনা! কারণ আমার এই ইউনিক জামাইয়ের মা’ল বাজারে জাস্ট ওয়ান পিসই। সেটার কোনো অল্টারনেটিভ বা সেকেন্ড কপি অন্য কোনো ব্যাটার টিউবলাইটে খুঁজে পাওয়া যাবে না, সো বিহেভ!”
আরিয়ান রোমানার এই মারাত্মক থ্রেটের ভেতরেও মনে মনে বিজয়ের হাসি হাসল। যাক, তার বউ অন্তত ডিরেক্টলি না হলেও ইনডাইরেক্টলি তার ইয়ের একটা জেনুইন প্রশংসা তো করেছে! প্রশংসাটা একটু ‘অন্যরকম’ জায়গায় গেছে, কিন্তু প্রশংসা তো প্রশংসাই! অপমানের মাঝেও মানুষ এভাবেই ছোট ছোট সুখ খুঁজে নেয়।

আরিয়ান খুশিতে গদগদ হয়ে রোমানার কাঁধে আলতো করে একটা হাত রাখল। কিন্তু রোমানা নিজের কাঁধটা এক ঝটকায় সরিয়ে নিয়ে গটগট করে সামনে এগোতে লাগল।
আরিয়ান মাঝপথেই থমকে দাঁড়িয়ে, নিজের অবিন্যস্ত চুলগুলো টেনে আক্ষেপে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, “তুই আমার সাথে সবসময় এমন কেন করিস, শালি? আমি তোকে একটু টাচ করলেই কি তোর গায়ে ফোসকা পড়ে? মনে হয় আমি তোর স্বামী না, তোর পাশের বাড়ির কুচুটে খালাম্মা! কেন এমন করিস হারামজাদি, আমার গায়ে কি ময়লা লেগে আছে?”
“ময়লাই তো!” রোমানা না তাকিয়েই জবাব দিল, “কে জানে শেষ কবে শরীরে পানি ঢেলেছিস আর সাবান ঘষেছিস! আমি তো জাস্ট এই ভয়ে আছি যে, একটু পর হসপিটালের লাউডস্পিকারে আবার কোনো ব্রেকিং নিউজ না শুনতে হয়, যে মিস্টার আরিয়ানের গায়ের ময়লার দুর্গন্ধের কারণেই এই হসপিটালের অর্ধেক রুগি আইসিইউতে স্বেচ্ছায় ভর্তি হয়েছে! বাকিরা জানালা দিয়ে পালিয়েছে।”

বলতে বলতে রোমানা আরিয়ানের থেকে বক্সটা কেড়ে নিয়ে, কারানের কেবিনের ভারী দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল। আর আরিয়ান করিডোরের মাঝখানে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল। নিজের আত্মসম্মানে বেশ বড়োসড়ো একটা ধাক্কা লেগেছে তার। সে মনে মনে হিসাব মেলাতে লাগল—আরে, সে তো তার জাউরা বউয়ের নজরে আকর্ষণীয় আর নিট অ্যান্ড ক্লিন থাকার জন্য দিনে অন্তত দু-দুবার গোসল করে, চড়া দামের পারফিউম স্প্রে করে ঘোরে, আর এই মেয়ে তাকে কি না আস্ত একটা ডাস্টবিন বানিয়ে দিল!
কেবিনের ভেতরে মিরাও ঠিক ওই মুহূর্তেই প্রবেশ করেছে। কারান যে তার অবাধ্য বউয়ের ওপর এতক্ষণের জমিয়ে রাখা সিংহসুলভ রাগটা ঝাড়বে, তার আর বিন্দুমাত্র উপায় রইল না, কারণ ঠিক পেছনেই রোমানা এসে হাজির।

রোমানা কেবিনের সেন্ট্রাল টেবিলটায় টিফিন বক্সটা রাখতে রাখতে কারানের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হেসে বলল, “তোমার নাম তো আমি পরেরবার পিএসসি পরীক্ষার বাংলা উদ্দীপকে ১০ মার্কসের জন্য সেট করে দেব, বদ্দা। প্রশ্ন থাকবে, কোন মহান পিতা নিজে বাপ হওয়ার গোল্ডেন নিউজ শুনে খুশিতে ‘বাপ রে বাপ’ বলে কার ক্র্যাশ করে সোজা হাসপাতালের বেডে লটকে পড়ে আছেন? ঘটনাটি ব্যাখ্যা করো এবং প্রয়োজনীয় চিত্র অঙ্কন করো।”
এতক্ষণ ধরে কারান নিজের ভেতরে যে গাম্ভীর্য আর শাসনের প্রলেপ ধরে রেখেছিল, রোমানার কথায় কারান এবার আক্ষরিক অর্থেই কিঞ্চিৎ লজ্জিত ও অপ্রস্তুত বোধ করল। তবে এটা কোনো কাঁচা প্রেমের লাল হয়ে যাওয়ার মতো রোমান্টিক লজ্জা নয়; এটা হলো তার দীর্ঘদিনের মেইনটেইন করা ডমিনেটিং ও গম্ভীর প্রোফাইলের যে ইজ্জতটা রোমানা এক নিমেষে পাঞ্চার করে দিল, সেই চরম পাবলিক এমব্যারেসমেন্টের লজ্জা।

ঠিক তখনই আরিয়ানও নিজের বোকা ভাবটা কাটিয়ে বুক ফুলিয়ে কেবিনের ভেতরে ঢুকে পড়ল। কারানের ঠোঁটের কোণের সেই তাজা কামড়ের লাল র*ক্ত রোমানারও চোখ এড়ায়নি, তবে সে শালীনতাবশত ঠোঁট চেপে হাসলেও মুখে কিছু বলেনি।
কিন্তু আরিয়ান তো আরিয়ানই, সে হুট করেই কারান আর মিরাকে ডিরেক্টলি নোটিশ করে বেশ উচ্চৈঃস্বরে বলে বসল, “তাই তো বলি! আমাদের এই রূপবতী রমনি কেবিনের ভেতর ঢুকে অতক্ষণ ধরে ঠিক কী এমন সিক্রেট মিশন চালাচ্ছিল! তা ছোট ভাই, হসপিটালের বেডটা কি আস্ত আছে, নাকি অলরেডি ওটার স্প্রিং-টিস্প্রিং ভেঙে তছনছ করে ফেলেছিস? তোর মোটেও এই কন্ডিশনে এমন ওয়াইল্ড কাজ করা উচিত হয়নি, হোয়্যার এজ মিরা অলরেডি প্রেগন্যান্ট! ব্রো, অ্যাটলিস্ট একটা জুনিয়র কারান পৃথিবীতে সেফলি ল্যান্ড করার পর তো আরেকটার জন্য প্রিপারেশন নিবি? নাকি এক ডেলিভারিতেই ক্রিকেট টিম নামানোর ইচ্ছা?”
আরিয়ানের কথা শোনা মাত্রই কারান, মিরা এবং রোমানা—তিনজনই আকাশ থেকে পড়া অবাক চোখে আরিয়ানের দিকে হা করে তাকিয়ে রইল।
এদিকে নিজের ভাশুরের মুখ থেকে এমন নির্লজ্জ রসিকতা শুনে লজ্জায় মিরার শ্বাসনালিতে বাতাস আটকে গিয়ে হুট করেই তীব্র কাশির দমক উঠে গেল।

জানালার ভারী সিল্কের পর্দা সরিয়ে বাইরের আলোর দিকে তাকিয়ে ছিলেন আসাদ চৌধুরী। তার হাতে থাকা প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের ফোনটি তখনো কানের কাছে ধরা। ওপাশে কল রিসিভ হতেই নিজের ভেতরের প্রবল উন্মাদনা আর চেপে রাখতে পারলেন না তিনি। এক বুক উল্লাস নিয়ে বলে উঠলেন, “আমার জাস্ট ইচ্ছে করছে আবারও কোনো রক কনসার্টের স্টেজে ব্যাক করে উরাধুরা ড্যান্স করতে! আই ওন দ্য বেট, রেমি! আই ফাইনালি ওন ইট।”
ফোনের ওপাশে থাকা তার পরম মিত্র আব্দুর রহমান আসাদের এই আকস্মিক ও অসংলগ্ন প্রলাপের বিন্দুমাত্র অর্থ অনুধাবন করতে পারলেন না। মধ্যরাতে এমন উচ্চকিত কণ্ঠস্বর শুনে তার মনে সংশয় জাগল, তার এই পুরোনো বন্ধু আবার বুড়ো বয়সে মেন্টাল ব্যালেন্স হারিয়ে পা’গল হয়ে গেল না তো! তবুও তিনি নিজের কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব স্বাভাবিক ও রাশভারী রেখে উত্তর দিলেন, “মাঝরাতে কল দিয়েই কী সব বলে যাচ্ছিস, আসাদ? আজকাল আমার প্রপার কেয়ার আর অ্যাটেনশন পাচ্ছিস না বলে কি মাথার মেইন তারটা পুরো ছিঁড়ে গেছে তোর? যদিও তোর মাথায় ওটা কবেই বা ঠিকঠাক কানেক্টেড ছিল!”

“আরে আমার নাজায়েজ বউ! শাট আপ অ্যান্ড জাস্ট লিসেন টু মি,” আসাদ ড্রয়িংরুমের নরম সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে একগাল চওড়া হাসলেন, “আমি অফিসিয়ালি দাদা হতে চলেছি, আর তুই হতে যাচ্ছিস নানা! মিরা ইজ প্রেগন্যান্ট, বন্ধু! এবার বল, কবে দেখা করবি আমার সাথে? খুশিতে তোর পিঠে চড়ে একটা উইনিং ড্যান্স দেব আমি! লুঙ্গি ড্যান্সের থেকেও খতরনাক কিছু হবে এবার!”
“কীহ!” এই অভাবনীয় ও পরম আনন্দের সংবাদটি শোনা মাত্রই আব্দুর রহমানের হৃৎপিণ্ড যেন এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। তিনি ড্রয়িংরুমের সোফা ছেড়ে এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়লেন, এবং অন্দরমহলের দিকে মুখ ঘুরিয়ে চিৎকারে ডাকতে লাগলেন, “মমতা! ওগো মমতা, জলদি শুনে যাও! সুসংবাদ! আমরা নানা-নানি হতে চলেছি, মমতা!”
ফোনের ওপাশে মুখ রেখেই তিনি আবার আসাদকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “মমতাকে খুশির খবরটা আগে দিয়ে আসি রে, অ্যাসিড! এই খুশিতে এবার তো আমারও মন চাচ্ছে তোর মাথার ওপর চড়ে ধুমধাম একটা ভাঙড়া নাচ দিতে! আলহামদুলিল্লাহ, হাজার বার আলহামদুলিল্লাহ। কী এক ব্লেসিংয়ের কথা শোনালি রে বন্ধু, আমার তো জাস্ট…”

“কী? এখন বুঝি আমার ফরসা গালে একটা ইমোশনাল চুমু খেতে মন চাচ্ছে?” আসাদ ওপাশ থেকে ভ্রূ নাচিয়ে বললেন, “দুঃখিত রেমি, ওই স্পেশাল অফারের মেয়াদ বহু আগেই শেষ। তোকে ডিসকাউন্টসহ উপযুক্ত সময় দিয়েছিলাম, তখন কাজে লাগাসনি। তো এখন আর আফসোস করে লাভ নেই!”
আব্দুর রহমান এত বড় খুশির সংবাদের মাঝেও রাগে দাঁত চেপে বললেন, “দেখা করতে আসিস তুই একবার সামনে, চ্যাংড়া কোথাকার! তোকে এবার দেশি আলুর সাথে টিকটিকির আস্ত ডিম দিয়ে স্পেশাল এক বাটি স্যুপ বানিয়ে জোর করে খাওয়াব, আসন্ন নাতির জায়েজ দাদা!”
এই বলে পরম তৃপ্তির সাথে ফোনটা কেটে দিলেন তিনি। এরপর বসার ঘর থেকে ড্রয়িংরুমের করিডোর ধরে “মমতা, ওগো মমতা, শুনছ?” বলতে বলতে দ্রুত ভেতরের শয়নকক্ষের দিকে এগিয়ে গেলেন। খুশিতে আর উত্তেজনায় তার আর এক মুহূর্তও তর সইছিল না।

Tell me who I am 2 part 23

এদিকে ওপাশে ফোন কেটে যাওয়ার পর আব্দুর রহমানের কথায় আসাদ প্রথমে হা হা করে বেশ কিছুক্ষণ হাসলেন। কিন্তু সেই হাসির রেশ ফুরিয়ে যেতেই হুট করে তার মুখের অবয়ব সম্পূর্ণ বদলে গেল। তার চোখের কৌতুক উবে গিয়ে সেখানে জমা হলো ক্রূর আর মনস্তাত্ত্বিক কাঠিন্য। জানালার কাচে প্রতিফলিত নিজের প্রতিবিম্বের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে ভারী কণ্ঠে বিড়বিড় করে উঠলেন, “আসাদ চৌধুরী কখনো হারে না, দিস ইজ প্রুভড ওয়ান্স এগেইন। অতীত হোক কিংবা বর্তমান, এবারও তুমি হেরে গেলে নীলপদ্মা… আমি জিতে গেলাম!”

Tell me who I am 2 part 24

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here