তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৫
নীতি জাহিদ
পুরো ধানমন্ডি লেক তিন বার ঘুরা শেষ। ইশান আর না পেরে বাবাকে বলেই বসলো,
-‘ পাপা আর পারছিনা, এবার থামো। এত কিভাবে দৌঁড়ায়।’
ছেলের কথায় মুচকি হেসে ইমরান বসলো। পানি বের করে ছেলেকেও দিলো,নিজেও হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলো। এই লেকটা খুব পরিচিত। সতেরো /আঠারো বছর আগে এখান থেকেই জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিলো। লেকের স্বচ্ছ পানির দিকে তাকিয়ে আনমনে ভাবলো ইমরান। ইশান এর কনুই এর ধাক্কা খেয়ে ছেলের দিকে নজর দিলো।
-‘ পাপা, মিসেস কাকন কাল ফোন দিয়েছিলো। আমাকে বলে কি জানো? তুমি নাকি বিদেশে গিয়ে আরেকটা বিয়ে করবে। তাই তাড়াতাড়ি উনার কাছে চলে যেতে।’
ইমরান আকাশের দিকে তাকিয়ে ছেলেকে বললো,
-‘ তোমার মা হয় ইশান! তুমি যেতে চাইলে যেতে পারো, তবে পাপাকে নিঃস্ব করে যেও না। ‘
ইশান বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। ইমরান ও ছেলেকে জড়িয়ে ধরলো।
-‘ মা ডাকতে ইচ্ছে করেনা। পাপা তুমি দেশে বিদেশে যেখানে খুশি বিয়ে করো।আমার সমস্যা নেই। উনি তোমাকে যে কষ্ট দিয়েছে এরপর আমি কখনো তার কাছে যাবোনা। আমি জানি এখন উনার উদ্দেশ্য কি?’
ইমরান হাসে। ছেলেটা আস্তে আস্তে বড় হয়ে যাচ্ছে তার। কত কিছু বুঝে। না হয় কোনো ছেলে এত সহজে মাকে নিয়ে এসব বলতো না। ইমরান চায়, ছেলে মায়ের আশে পাশে থাকুক। যত কিছুই হোক মা তো। কিন্তু এই ছেলে বাবার কপি। বাবা ছেলে খুনশুঁটি শেষে বাড়ির পথে রওয়ানা দিলো। ইমরান নিজের সাথে সাথে ছেলেকে ও শরীরচর্চায় অভ্যস্ত করে ফেলেছে। সে চায় ছেলে ও তার জীবন টা গুছিয়ে নিক। মা ছেড়ে যে ছেলে বাবাতে অভ্যস্ত হয়ে যায়,আর যাই হোক ওই ছেলের মনোবল ভাঙ্গা এত সহজ নয়। লেকের দিকটাতে ইমরান যখন দেশে আসে তখন হাঁটতে আসে। এছাড়া ইশান বাড়ির বেক ইয়ার্ডে দৌঁড়ায় সোহানের সাথে।
খাবার টেবিলে অনেক গুলো ছেলের ছবি ছড়ানো। মায়া মুখ বাঁকা করে খাচ্ছে। হাসিনা বেগম মেয়েকে ছেলে পছন্দ করে দেখাচ্ছে। মেয়ে কিছুতেই বিয়ে করবেনা। মায়ার কর্মকান্ডে সবাই রীতিমতো বিরক্ত। বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে অথচ এই মেয়ে বিয়ে করছে না। হাসিনা বেগম ধমক দিয়ে বললো,
-‘ দুদিন পর মোনার বিয়া দিমু,আর এই ছেমড়ি এখনো রাজি হয়না। আমি তোরে দুইদিন সময় দিলাম।এর মধ্যে রাজি না হলে জোর কইরা বিয়া দিমু।’
-‘ মা তোমরা জানো আমি কেনো বিয়ে করছিনা।’
কথা শেষ না হতেই মিনহাজ ওখানে চুপ করিয়ে দিলো বোনকে।
-‘ মায়া, আম্মার দেখানো ছেলে গুলো থেকে পছন্দ করে নে। আমি আর কোনো কথা শুনতে চাই না।’
মিনহাজ মোনাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। স্কুল ড্রপ করে অফিসে চলে গেলো। বোনকে নিয়ে মিনহাজের চিন্তার অন্ত নেই। সে জানে বোন কি চায়, যা আদতেও সম্ভব নয়।
মায়া রুমে এসে দরজা আটকে অনেকক্ষন কেঁদেছে। হঠাৎ কাকে যেন ফোন দিলো। অনেকক্ষন কান্নাকাটি করে তাকে বুঝালো। অপর পক্ষ থেকেও বলা হলো যে চেষ্টা করবে।
এরমধ্যে রুমে সালমা ঢুকে একটা খোঁচা দিলো।
-‘ মায়া ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করো। তুমি যেদিকে হাত বাড়াতে চাচ্ছো হাত বাড়িও না পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে। আগের মানুষটা হাতের নাগালে থাকলেও এখন সে দূর আকাশের সূর্য। ধরা যাবেনা,ছোঁয়া ও যাবে না। দু চোখ ভরে দেখতে পারবে।’
মায়া কথা বাড়ায়নি। কম তো চেষ্টা করলো না এতগুলো বছর। কোনো লাভ তো হলো না।
গ্লাসের দরজা দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে দুজন মানুষ কেবিনে ঢুকছে। হাতে কমিক বুকটা নিয়ে সোফায় শরীর এলিয়ে উলটো দিকে ফিরে বই পড়ার ভান করলো। দরজা খুলতেই আনমনে গেয়ে উঠলো,
-‘ আমি প্রেমে পড়ে গেছি ওগো
ওগো জেন্টেল ম্যান, তোমায় দেখে বুকের ভেতর জাগলো ইমোশন, আমি প্রেমে পড়ে গেছি ওগো ওগো জেন্টেল ম্যান।’
দরজা দিয়ে প্রবেশরত দুজন ভদ্রলোক একে অপরের দিকে তাকিয়ে দেখছে। সামনে চেয়ারে বসা ভদ্রলোক মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। অকস্মাৎ হো হো করে হেসে উঠলো মিনহাজ। মেয়েকে বললো,
-‘ কার প্রেমে পড়েছো আম্মাজান?’
নয়ন অন্যদিকে ফিরে মুখ টিপে হাসছে। ইমরান তখনো হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে আছে। মনে মনে ভাবছে এই মেয়ে কি বলে এগুলো। লজ্জায় ফেলে দিবে নাতো সবার সামনে। কারো চোখে কেনো ধরা পড়ছেনা ওর এই ইঙ্গিত গুলো। আর আমারই বা বুক ধুকপুক করছে কেনো। মুখের উপর বই রেখেই মিনহাজকে উত্তর দিলো,
-‘ মাই ডিয়ার কিং, তোমার প্রিন্সেস একজন জেন্টাল ম্যানের প্রেমে পড়েছে বুঝলে। তাকে এখন লাগবে। ডার্সি যেমন এলিজাবেথকে ইগ্নোর করতো,সেও আমাকে না দেখার,না বুঝার ভান করে। এনিওয়ে ডোন্ট ওরি, আই উইল উইন হিম। তোমার কাজ করো, লজ্জা লাগে না। মেয়ের মুখ থেকে জামাইর গল্প শুনতে চাও।’
মিনহাজ ইমরান এবং নয়নের দিকে ফিরে বলে,
-‘ খাম্বার মত দাঁড়িয়ে না থেকে ভেতরে আয়। বোস। আমার মেয়ে প্রেমে পড়েছে শুনলিই তো। ভাবছি বিয়ে দিয়ে দিবো কি বলিস?’
“যত তাড়াতাড়ি পারো বিয়ে দেও মিনহাজ ভাই। আমরা বিয়ে খেতে চাচ্ছি। তাও আবার মোনা মামনির। উফ আমি তো কালা চাশমা ডান্স দিব। -নয়ন বললো।”
মোনা তখনো বই এ মুখ করে সোফায় শুয়ে আছে। স্কুল থেকে এসে সোফায় শুয়ে বই পড়ছে। সামনের লোকদের মুখই দেখাচ্ছেনা। ঘাড়ের নিচে চুল।চুলে দুইটা বিনুনী। সাদা, আকাশী রঙ এর স্কুল ইউনিফর্ম। হাতে বেল্টের চামড়ার ঘড়ি। একদম আদুরে বাচ্চা লাগছে। মুখটাই দেখা যাচ্ছে না। নয়নের কথা শুনে নয়নকে বললো,
-‘ হাই ফাইভ নয়ন চাচ্চু,প্লিজ জেন্টাল ম্যানকে বুঝিয়ে নিও,আমাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে। ‘
ওরা হেসে ঠাট্টা করছে। অফিসের পিয়ন অনেক গুলো ফাইল নিয়ে রুমে ঢুকলো। সহসা মোনা সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো ইমরান এর পাশ ঘেঁষে। ইমরান নড়ে চড়ে বসলো।মিনহাজ,নয়ন কি নিয়ে যেন ডিসকাস করছিলো। মোনা ইমরানের কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৪
-‘ আঁড়চোখে তাকাতে হবে না,আমি আপনার সামনে। ‘
ইমরান চমকালো না। ফাইলের দিকে মনোযোগ দিয়ে মুচকি হাসি দিলো। মোনা সামনে থেকে সরে বুকে হাত দিলো। উফ হাসিটা, মাইনর একটা হার্ট অ্যাটাক সহজে হয়ে যাবে।
ইমরান নিজেই নিজের কাজে চমকিত। হাসলো কেন সে!! অদ্ভুত রকম অনুভূতি হলো।
