Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪৯

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪৯

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪৯
রিদিতা চৌধুরী

চারপাশটা তখন একদম নিস্তব্ধ। ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাত পার করে অনেক দূর চলে গেছে। কেবল দূরের কোনো কুকুরের মৃদু ডাক আর জোনাকির মিটিমিটি আলো রাতের গভীরতাকে আরও নিবিড় করে তুলেছে। একটানা ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে চারপাশের নীরবতা যেন আরও বেশি ভারী হয়ে উঠেছে।
রাত তখন প্রায় তিনটা বাজে। আরবানের কাঁধে মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে পৃথা। রিদির ঘর থেকে আনার পর থেকে মেয়েটা কয়েকবার বমি করে একদম নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। অসহায় এক দৃষ্টিতে পৃথার দিকে তাকিয়ে আছে আরবান। মাত্র দুই দিন আগেও যখন পৃথার মুখে বাবা হওয়ার সুসংবাদটা শুনেছিল, খুশিতে আরবানের চোখে জল চলে এসেছিল। সেই অনুভূতিটা ছিল একদম অন্যরকম—যেটা কাউকে বলে বোঝানো সম্ভব নয়।
কিন্তু আজ পৃথার এই কষ্টার্জিত অবস্থা দেখে নিজের ভেতর তীব্র এক আফসোস দানা বাঁধছে। পৃথার চুলে হাত বুলিয়ে, ভেঙে আসা কণ্ঠে সে ফিসফিস করে বলে উঠল,

— “বেশি খারাপ লাগছে, লাজুক লতা? আমার মনে হচ্ছে আমাদের সিদ্ধান্তটাই ভুল ছিল। বাচ্চার ব্যাপারে আমাদের আরও কিছুদিন পরে ভাবা উচিত ছিল। তোমার এই কষ্ট আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারছি না!”
পৃথা আরবানের অপরাধী দৃষ্টি দেখে ঠোঁটে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল। ক্ষীণ অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— “আমার একদম কষ্ট হচ্ছে না, বরং অনেক আনন্দ হচ্ছে! মা হওয়ার অনুভূতিটা সত্যিই অদ্ভুত সুন্দর। আপনি একদম টেনশন করবেন না, আমি একদম ঠিক আছি। মাঝে মাঝে একটু শরীর খারাপ লাগে, এই যা!”
অথচ সত্যি বলতে, পৃথার ভেতরটা তখন চরম কষ্টে ভেঙে পড়ছিল। সারাদিন পেটে এক দানাও কিছু না পড়ায় অনবরত বমিতে তার শরীর যেন বিদ্রোহ করছিল। তবুও ভালোবাসার মানুষটিকে একটুও চিন্তায় ফেলতে চাইছে না সে।
পৃথার এই লুকোচুরি বুঝতে পেরে আরবান বিছানার পাশেই রাখা ছোট ড্রয়ার থেকে কিছু শুকনো খাবার বের করে তার সামনে বাড়িয়ে দিল। খাবারগুলোর দিকে তাকাতেই পৃথার নাক-মুখ আরও কুঁকড়ে গেল—ওগুলো দেখলেই তার বমি পাচ্ছে। কিন্তু এই অবস্থাতেও খালি পেটে রাখা বিপদজনক বুঝে, আরবান মায়া আর একটু জোর মিশিয়েই তাকে অল্প কিছু খাইয়ে দিল।
খাওয়া শেষ হতেই পরম যত্নে পৃথাকে শুইয়ে দিল আরবান। তারপর কপালে একটা চুমু দিয়ে, পুনরায় হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। মাত্র ঘণ্টাখানেকের জন্য আসা হলেও, পৃথার এমন করুণ অবস্থা দেখে তার ফিরতে অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে।

ভোর প্রায় পাঁচটা। চারপাশের স্নিগ্ধ নীরবতা ভেদ করে বিছানায় এক অপরূপ আবেশ। আষ্টেপৃষ্ঠে রিদিকে নিজের কোলবালিশের মতো জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে সৌহার্দ্য। ঘুমের ঘোরে রিদিও একটা ছোট্ট খরগোশছানার মতো লেপ্টে আছে তার উন্মুক্ত বুকের গভীরের শান্ত আশ্রয়ে।
হঠাৎ করেই ঘরের সেই গভীর ঘুমন্ত নীরবতা চিরে তীক্ষ্ণ শব্দে বেজে উঠল সৌহার্দ্যের ফোনটা। বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে, চোখ বন্ধ রেখেই হাত বাড়িয়ে ফোনটা কানে ঠেকাল সে। ওপাশের কথা শুনে গলার সমস্ত ক্লান্তি আর বিরক্তি ঝেড়ে ফেলে তার কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই হয়ে উঠল পেশাদার ও গমগমে,
— “ওকে, গেট দ্য ওটি রেডি। আই’ম অন মাই ওয়ে। কল ডক্টর সুজন অ্যান্ড টেল হিম টু কাম ইমিডিয়েটলি। কুইক!”
কলটা কেটে দিয়ে সৌহার্দ্য যখন রিদির বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে উঠতে চাইল, অমনি রিদি ঘুমের আলস্যেই তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। রিদির কপালে আলতো একটা চুমু এঁকে সৌহার্দ্য নরম অথচ দৃঢ় কণ্ঠে ফিসফিসাল,

— “আমাকে যেতে হবে, জান, ছাড়ো!”
ঘুমজড়ানো পিটপিট করে চোখ মেলে সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে রিদি আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল—
— “এত সকালে কেন যেতে হবে?”
সৌহার্দ্য এক টানে তার কোমরটা আরও কাছে টেনে নিয়ে কানে কাছে মুখ নিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,
— “ইমার্জেন্সি এসেছে, জান!”
কথাটা কানে যাওয়ার সাথেই রিদির আলস্য ভেঙে গেল, সে নিজেই সৌহার্দ্যকে ছেড়ে দিল। সৌহার্দ্যও আর এক মুহূর্ত নষ্ট না করে একটা সাধারণ টি-শার্ট আর জিন্স প্যান্ট হাতে দ্রুত ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল।
সৌহার্দ্য বাথরুমে ঢুকতেই রিদি বিছানা ছেড়ে চটজলদি রান্নাঘরে গিয়ে তার জন্য হালকা কিছু নাস্তা তৈরি করে নিয়ে এল। ওদিকে সৌহার্দ্য ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলগুলো ঠিক করে নিচ্ছে। রিদির হাতে নাস্তার প্লেট দেখে সে ঘড়ির কাঁটার দিকে এক পলক তাকিয়ে ব্যস্ত গলায় বলে উঠল,
— “আমার সময় নেই, হার্ট! তুমি খেয়ে নাও, আমাকে এখনই বের হতে হবে।”
কিন্তু রিদি যেন আজ নাছোড়বান্দা। সৌহার্দ্যর কথায় বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে সে চোখ দিয়ে কড়া শাসন করে বলে উঠল,
— “না খেয়ে এক পাও ফেলতে পারবেন না! আমি ভালো করেই জানি, একবার হাসপাতালে গেলে দুপুর পর্যন্ত আপনার নিজের খাওয়ার কথা আর মনেই থাকবে না। তাই আমাকে রাগাবেন না বলছি, চুপচাপ ভালো ছেলের মতো এটা খেয়ে নিন!”
বউয়ের এই নাছোড়বান্দা অধিকারবোধ দেখে সৌহার্দ্য আর নিজের গম্ভীরতা ধরে রাখতে পারল না। প্লেটটা রিদির হাত থেকে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে সে পিছন থেকে রিদিকে জড়িয়ে ধরে আয়নার সামনে দাঁড়াল। আয়নায় দুজনের একসঙ্গে প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে সে গম্ভীর কিন্তু আদুরে কণ্ঠে ফিসফিসাল,
— “মিসেস সৌহার্দ্য, আজকাল আপনি আমাকে একদমই ভয় পাচ্ছেন না দেখছি, ব্যাপার কী, হুম?”
রিদি এক হাত উপরে তুলে সৌহার্দ্যের যত্ন করে গোছানো চুলগুলো একটু এলোমেলো করে দিয়ে মিষ্টি হেসে বলল,
— “ভয় তো পাইই! যখন ওই বাঘের মতো চোখ করে তাকান, তখন মনে হয় আমার এই ছোট্ট বুকটা কেঁপে বুঝি বেরিয়ে আসবে!”
রিদির এই নিষ্পাপ আর ছটফটে কথা বলার ভঙ্গি দেখে সৌহার্দ্য আর হাসি আটকে রাখতে পারল না। রিদিকে পরম যত্নে ছেড়ে দিয়ে নিজে সামান্য খেয়ে তাকেও খাইয়ে দিল। তারপর রিদির কপালে একটা স্নিগ্ধ চুমু এঁকে সে ঘর ছেড়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।

সকাল প্রায় নয়টা ছুঁই ছুঁই। কচি রোদে ঝলমল করছে কলেজ মাঠটা। সবুজ ঘাসের ওপর একটা বেঞ্চে বসে আছে রিদি, সুমি, পৃথা আর সায়েম। চারপাশের কোলাহলের মাঝেও একটা চাপা থমথমে ভাব। পৃথা সেই কখন থেকে নাক-মুখ কুঁচকে বাঁকা চোখে রিদির দিকে তাকিয়ে আছে—যেন এখনই গলা টিপে ধরবে। রিদির ভেতরের মেজাজটা চরমে চড়ে গেল। আর সহ্য করতে না পেরে বিরক্তিতে মুখটা ভেংচে সে বলে উঠল—
“সমস্যা কী বল তো? এভাবে গিলে খাচ্ছিস কেন আমাকে? কিছু বলার হলে বল ভাই, তোর এভাবে তাকানো আমার হজম হচ্ছে না!”
রিদির কথা শুনে পৃথা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, চটপট তেড়ে উঠে বলে উঠল—
“তুই যেটা করছিস, ঠিক করছিস? স্যার যদি জানতে পারে তোর কী হবে? এটাকে একপ্রকার চুরি বলে!”
পৃথার এমন কথায় রিদি বিন্দুমাত্র দমল না। বরং মুখের ভেতরটা অদ্ভুত এক ভঙ্গিতে মুচড়ে দিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিল—

“কী হবে? দুটো বাচ্চা হবে? আমি এমন কী অন্যায় করছি, হুম? আমি কি নকল করছি, শিখেই তো পরীক্ষা দিচ্ছি, ওনার কাছে তো ভদ্রভাবে জানতে চাইলে দিতো? আর আমি মোটেও প্রশ্ন চুরি করিনি, আমি শুধু প্রশ্নগুলো চোখ দিয়ে ক্যাপচার করে একবার দেখে নিয়েছি, এটাকে কোনোভাবেই চুরি বলা হয় না, এটা হিডেন ট্যালেন্ট! আর এইটুকু যদি না করতে পারি, কী লাভ প্রফেসর জামাই পেয়ে?”
রিদির মুখে এমন ছটফটে যুক্তি আর খুনসুটি শুনে সায়েম আর চুপ থাকতে পারল না। একগাল হেসে বাহবা দিয়ে সে বলে উঠল—
“একদম ঠিক করছিস! ওর মতো ব্রেনি ছাত্রীর কথা শুনে আমাদের কাজ নেই, তুই এখন থেকে এমন করবি, তাহলে আমাদের টপে থাকা কেউ আটকাতে পারবে না! আর সত্যিই এটাকে চুরি বলে না, এটা হচ্ছে চোখের দক্ষতা!”

কথাটা শেষ করেই রিদির দিকে হাত বাড়িয়ে দিল সায়েম, দুজনে মিলে এক জোরালো হাই-ফাইভ দিল বাতাসে। এই পুরো কাণ্ডে সুমি একদম চুপচাপ। সে নির্বাক চোখে ওদের মাঝে বসে একহাতে গালে হাত দিয়ে শুধু শুনছিল সব, মুখে রা নেই—কাউকে কিচ্ছু বলছে না সে। কিন্তু পৃথার পেটের ভেতর আগুন জ্বলছিল। ওদের এই নীতিহীন আনন্দ আর নির্লজ্জ আত্মপক্ষ সমর্থন ওর সহ্য হলো না। বসা থেকে এক ঝটকায় উঠে সে সোজা ক্লাসের দিকে পা বাড়াল।
মূলত দুই দিন আগে সৌহার্দ্য যখন গম্ভীর মুখে জানাল যে দুই দিন পরেই তাদের একটা ক্লাস টেস্ট নেওয়া হবে, তখন থেকেই রিদির মাথায় অন্য বুদ্ধি খেলে গেল। সৌহার্দ্যের থেকে একটু কৌশলে ভালোবাসা দেখিয়ে সৌহার্দ্যের পার্সোনাল ড্রয়ারের চাবিটা হাতিয়ে নিয়ে প্রশ্নপত্রটা একবার চোখ বুলিয়ে নিল সে। রিদির অবুঝ মনকে তখন সান্ত্বনা দিয়ে বলল—সে তো আর নকল করে পরীক্ষা দিচ্ছে না, যা দেখছে তা তো শিখেই পরীক্ষা দিচ্ছে! ব্যাস, নিজের সাথে সায়েম আর সুমিকেও প্রশ্নগুলো বলে দিল সে। পৃথাকে বলতে চেয়েছিল, কিন্তু পৃথা সাফ জানিয়ে দিল—ওর লাগবে না, এভাবে পরীক্ষা দেওয়ার চেয়ে না দেওয়াই ভালো!

দরজার কড়া নেড়ে ক্লাসে প্রবেশ করল সৌহার্দ্য। আজ তাকে যেন বড্ড অন্যরকম লাগছে—খুব চেনামুখ অথচ অচেনা এক সুদর্শন রূপ। পরনে শুধু সাধারণ একটা টি-শার্ট আর জিন্স প্যান্ট, গলায় ঝুলছে স্টেথোস্কোপ; দেখে মনে হচ্ছে এইমাত্র বুঝি কোনো জরুরি রোগী দেখে সোজা ক্লাসে এসে ঢুকেছে। নিজের হাত দিয়ে অবাধ্য চুলগুলো একটু পেছনে ঠেলতে ঠেলতে সে গিয়ে দাঁড়াল প্রজেক্টরের সামনে।
রিদি তো মন্ত্রমুগ্ধের মতো হা করে তাকিয়ে আছে সৌহার্দ্যের দিকে—যেন চোখের দৃষ্টি দিয়েই তাকে গিলে খেতে চাইছে! বউয়ের এমন অদ্ভুত ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গায়ে বিঁধতেই সৌহার্দ্য অস্বস্তি এড়াতে গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের লেকচারে মনোযোগ দিল। কিন্তু পড়াতে পড়াতেও সে খেয়াল করল, আজ রিদি ভীষণ মনোযোগ দিয়ে ক্লাসটা করছে। সৌহার্দ্য এক পলক ভ্রু কুঁচকে তাকাল তার দিকে। নিজের অভিজ্ঞতায় সে ভালো করেই জানে, রিদির এমন মন দিয়ে ক্লাস করার কোনো বালাই আগে কখনোই ছিল না! কোথাও যেন একটা বড় ধরনের গড়মিল আছে।

টানা আধা ঘণ্টা লেকচার দেওয়ার পর সৌহার্দ্যের গম্ভীর গলাটা ক্লাসের পিনপতন নীরবতা ভেঙে ভেসে এল—আজ তোমাদের একটা ছোট ক্লাস টেস্ট নেওয়া হবে। কথাটি শেষ হতে না হতেই সে ডেস্কে রাখা প্রশ্নপত্রগুলো একে একে সবার মাঝে বিলি করতে শুরু করল।
রিদির চোখের সামনে প্রশ্নপত্রটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে ক্ষণিকের জন্যও আর দেরি করল না—ঝড়ের বেগে খাতাটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে তরতর করে কলম চালাতে শুরু করল। খাতার ওপর তার ঝুঁকে পড়ার ভঙ্গিটা দেখে মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে পৃথিবীর তাবৎ দুশ্চিন্তা আর কোলাহল পেছনে ফেলে তার অস্তিত্বের পুরোটাই সঁপে দেওয়া হয়েছে ওই সাদা কাগজের কালো কালির আঁচড়ে! মাথা নিচু করে সে এমন মগ্ন হয়ে লিখছিল, যেন আশপাশে কী হচ্ছে তা দেখার বা ভাবার বিন্দুমাত্র সময় বা ইচ্ছে তার নেই।
সৌহার্দ্য নিঃশব্দ পায়ে এসে দাঁড়াল রিদির ঠিক মাথার ওপর। তার তীক্ষ্ণ চোখের কোণে জমে আছে চেনা সেই সংশয়ের ভাঁজ—আজকের এই অস্বাভাবিক মনোযোগ তার অভিজ্ঞ মনে কিছুটা সন্দেহের সৃষ্টি করছে। শুধু রিদিই নয়, সায়েমের অবস্থাও বেশ অদ্ভুত; অন্যদিন ক্লাসে থাকলে যারা একে অন্যের খাতায় উঁকিঝুঁকি মারত, আজ তারা দুজনেই কেমন যেন অদ্ভুত নীরবতায় একমনে লিখে চলেছে!
সৌহার্দ্য প্যান্টের পকেটে এক হাত গুঁজে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল রিদির ঠিক পাশেই। মাথার ওপর তার এই সন্দেহভরা উপস্থিতি টের পেতেই রিদির বুকটা একবার কেঁপে উঠল, কলম ধরার হাতটাও যেন এক মুহূর্তের থেমে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে কঠোরভাবে সামলে নিয়ে সে আবার লেখায় মন দিল।
নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর সৌহার্দ্য নিজের হাতের ঘড়িটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সময় মেপে নিল। তারপর ঘড়ির কাঁচ থেকে চোখ সরিয়ে ক্লাস রুমের গুমোট নীরবতা ভেঙে এক অদ্ভুত ভারী কণ্ঠে বলে উঠল—

“টাইম আপ, স্টপ রাইটিং!”
বলেই সে সায়েমের দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিল—
“সব আনসার শিট কালেক্ট করে আমার চেম্বারে নিয়ে এসো!”
সায়েম মাথা নেড়ে সায় জানাল। যাওয়ার আগে সৌহার্দ্য এক পলক রিদির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর পায়ে ক্লাসরুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

সৌহার্দ্যের চেম্বারে আনসার শিটগুলো হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সায়েম। চেম্বারের এক কোণে তখন রোগী দেখায় ব্যস্ত সৌহার্দ্য। শেষ রোগীর প্রেসক্রিপশন লেখা শেষ হতেই সে চোখ তুলল সায়েমের দিকে। গমগমে স্বরে নির্দেশ দিল, “টেবিলের ওপর রাখো!”
সায়েম দ্রুত খাতাগুলো টেবিলের ওপর রেখে পিছু ফিরে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হতেই সৌহার্দ্যের রাগান্বিত কণ্ঠ গর্জে উঠল, “স্টপ দেয়ার!”
তক্ষুনি শিউরে উঠল সায়েম। বুকটা কেঁপে উঠল অজানা এক ভয়ে। তবে কি কোনোভাবে সত্যিটা জেনে গেছে সৌহার্দ্য? ঢোক গিলে আমতা আমতা করে সে বলে উঠল, “জ-জ্বী স্যার?”
সৌহার্দ্য ততক্ষণে টেবিল থেকে সায়েম, রিদি আর সুমির খাতাগুলো একে একে টেনে নিয়ে চেক করতে শুরু করেছে। খাতার পাতার ওপর চোখ বুলোতেই তার মুখটা কঠোর হয়ে উঠল। তাচ্ছিল্যের হাসির সঙ্গে ব্যঙ্গাত্মক গলায় সে বলে উঠল, “বাহ্, তোমরা দেখছি রাতারাতি বড্ড মেধাবী হয়ে গেছ! তা হঠাৎ এত মেধার উৎসটা কী?”

ভয়ে গলা শুকিয়ে আসলেও সায়েম কোনোমতে হালকা একটা হাসির প্রলেপ টেনে কাঁপা গলায় বলল, “জ্বি স্যার… আসলে সব কমন চলে আসছিল তো, তাই!”
আর যায় কোথায়! রাগে চোখের মণি লাল হয়ে উঠল সৌহার্দ্যের। সায়েমের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে এমন এক ধমক দিল সে, যাতে পুরো কেবিনটা কেঁপে উঠল, “টেল মি দ্য ট্রুথ নাউ, অর ইউ উইল বি পানিশড টুডে!”
সৌহার্দ্যের এই রূপ দেখে আর রক্ষা নেই বুঝে ভয়ের চোটে গড়গড় করে সব সত্যিটা উগরে দিল সায়েম। কিন্তু সত্যিটা সামনে আসতেই সায়েমের নিজের অবস্থাও হয়ে গেল বেকুবের মতো! সে তো শুরুতে বুঝতেই পারেনি আসল ঘটনা কী। সে তো ভেবেছিল, সৌহার্দ্য নিজেই বুঝি ইম্পর্টেন্ট প্রশ্নগুলো ভালোবেসে তার বউকে জানিয়ে দিয়েছে, আর সেই সুবাদেই রিদি তাদের সাহায্য করছে। কিন্তু কলেজে আসার পর সে জানতে পেরেছিল যে রিদি আসলে সৌহার্দ্যের অজান্তে, সম্পূর্ণ লুকিয়ে ওই প্রশ্নগুলো দেখে নিয়েছিল!
সায়েম দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে সত্যিটা পরিষ্কার করতে চাইল, “স্যার, বিশ্বাস করুন আমি তো…”
কিন্তু সৌহার্দ্য তাকে আর একটা কথাও বলার বিন্দুমাত্র সুযোগ দিল না। রাগে আর বিরক্তিতে ফুঁসতে ফুঁসতে সে বলে উঠল, “চার চোখ, তুমি আমার বউকে এসব কুপরামর্শ দিচ্ছ, তাই না? ওর মাথায় এত বুদ্ধি নেই যে এসব কুবুদ্ধি পাকাবে!”

সায়েম কিছু একটা বলতে গিয়েও আটকে গেল। কিন্তু সৌহার্দ্যের রাগ তখন তুঙ্গে। ঠান্ডা অথচ হিমশীতল গলায় সে রায় শুনিয়ে দিল, “এক পায়ে দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকো! আর এই শাস্তিটা হলো আমার বউয়ের হাত স্পর্শ করার অপরাধে। কতবার তোমাকে বলা হয়েছে, ওর থেকে দূরত্ব বজায় রেখে কথা বলবে?”
কথাটা শেষ করেই আর এক মুহূর্ত কেবিনে দাঁড়াল না সৌহার্দ্য; হনহন করে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
সৌহার্দ্য চলে যেতেই সায়েম দাঁতে দাঁত চেপে রাগে-অপমানে বিড়বিড় করে উঠল, “হ্যাঁ, খাটাশ কোথাকার! তোর বউ বুঝি খুব নাদান, তাই না? তোর ওই নাদান বউ যে তোকেই দিব্যি গোল খাইয়ে দিচ্ছে, যেদিন নিজে চোখে সেটা বুঝতে পারবি, সেদিন সোজা স্ট্রোক করে পড়ে যাবি! খাটাশের এক নম্বর খাটাশ, বউয়ের কাছে…”
সায়েম আরও কিছু বলতে গিয়েও হঠাৎ সৌহার্দ্যকে চেম্বারে ঢুকতে দেখে সায়েমের গলা আটকে গেল! বুকটা ধরাস করে উঠতেই সে চোখের পলকে মুখের সমস্ত রাগ-বিরক্তি ঝেড়ে ফেলে একদম নিষ্পাপ, বাধ্য ছেলের মতো মুখ বানিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়ল।

দুপুর প্রায় তিনটা বাজে। সৌহার্দ্যের চেম্বারে বসে আছে ফারিস ও সুজন। কিন্তু সৌহার্দ্য তখনো একমনে মোবাইলের স্ক্রিনে কিছু একটা দেখছে, আর তার ঠোঁটের কোণে ঝুলছে এক রহস্যময় বাঁকা হাসি। ফারিস এতক্ষণ ধরে বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে আছে সৌহার্দ্যের দিকে; ওরা আসার পর থেকেই সৌহার্দ্য কেবল ফোনের ভেতর চোখ গুঁজে বসে আছে, তাদের দিকে তাকানোর ফুসরতটুকুও পায়নি।
ফারিস এতক্ষণ ধরে বিরক্তিতে ফুঁসছিল। ওরা আসার পর থেকে সৌহার্দ্য ফোনের ওপর এমনভাবে ঝুঁকে আছে, যেন দুনিয়ায় আর কেউ নেই। ধৈর্য হারিয়ে এবার সে গলা চড়াল, আর ঠাট্টার সুরে বেসুরে গলায় গেয়ে উঠল—
“তুমি দিওনা গো হাসপাতালের বাত্তি নিবাইয়া, আমি অন্ধ ঘরে বন্ধ হয়ে যাব মরিয়া…”
গানটা সবে মাঝপথে, অমনি তেজী গলায় ধমকে উঠল সৌহার্দ্য, ভ্রূ কুঁচকে ফোন থেকে চোখ সরিয়ে চরম বিরক্তি নিয়ে বলে উঠল—

“হোয়াটস ইউর প্রবলেম? আজেবাজে গান গাইছিস কেন ইডিয়ট?”
ফারিস একচুলও দমল না। উল্টো চোখে দুষ্টুমির চকচকে আলো ফুটিয়ে খিকখিক করে হেসে বলে উঠল, “তুই নাকি চেম্বারে মধ্য ভাজা মাছ উল্টিয়ে খেয়ে ফেলেছিস, ঘটনা কি সত্যি?”
বলেই সে সুজনের দিকে ইশারা করল। সৌহার্দ্য সঙ্গে সঙ্গে একটা জ্যান্ত বাঘের মতো রাগী দৃষ্টি ফেলল সুজনের ওপর। সেই চাউনিতে সুজনের গলা শুকিয়ে গেল বটে, তবুও সে একটু থমকে গিয়ে নিজেকে বাঁচানোর ভঙ্গিতে বলে ফেলল, “সত্যিই তো বললাম, এভাবে তাকানোর কী আছে!”
বন্ধুদের এমন খোঁচায় সৌহার্দ্যের ভেতরটা ছাইচাপা আগুনের মতো জ্বলে উঠল। সে কোনোমতে নিজের রাগ আর চোখের কোণের সেই গোপন অস্বস্তি গিলে খেয়ে থমথমে গলায় সাফাই গাইল—
“ইডিয়ট, ওর পেটে ব্যথা ছিল ওই জন্য কোলে করে নিয়ে গেছি, তোরা যেমন ভাবছিস তেমন কিছু না!”
সুজন একটু দমে গেল। কিন্তু সন্দেহ তো সহজে যাওয়ার নয়! সে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে জানতে চাইল, “তাহলে যে বললি কেবিন পরিষ্কার করে রাখতে? আর তোর কোলে রিদি এমন নিস্তেজ ছিল কেন?”
সৌহার্দ্যের কণ্ঠে তখন পাথরের মতো শীতল আত্মপক্ষ সমর্থন—

“আজেবাজে খেয়েছে তাই বমি করছে! তাই ক্লিন করাতে বলছি, বমির কারণেই হয়েছে, ইডিয়ট!”
সুজন সে সময় কেবিনে পা রাখেনি, তাই সে সরল মনেই সৌহার্দ্যের এই যুক্তিটা বিশ্বাস করে বসলো। নাক-মুখ কুঁচকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলে উঠল, “আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল তোর দ্বারা ওসব হবে না!”
সুজন মেনে নিলেও ফারিসের চোখে ধুলো দেওয়া অত সহজ নয়। সে সৌহার্দ্যের এই চতুর শান্ত ভাবটাকে এক মুহূর্তেই চিনে ফেলল। সৌহার্দ্যের মুখের চেহার উজ্জ্বলতা আর চোখের কোণের সেই লুকানো আলোয় নজর আটকে রেখে ফারিস বাঁকা হেসে তীক্ষ্ণ গলায় গেঁথে দিল—
“তাই বুঝি? তাহলে তুই এত গ্লো করছিস কেন বল তো? আমার তো কেন জানি মনে হচ্ছে ডালমে কুচ কালা হ্যায়? তুই…”
ফারিসকে নিজের কথা শেষ করতে না দিয়ে সৌহার্দ্য চেহারায় একরাশ বিরক্তি ফুটিয়ে বলে উঠল, “আমি ছোটবেলা থেকে গ্লো করা মাল! হঠাৎ গ্লো করার কিছু নেই, আমার এতগুলো বাড়ি থাকতে হাসপাতালে কেন ওসব করতে যাব, ইডিয়ট?”
মুখে বানিয়ে বানিয়ে বেশ সুন্দর করে এই মিথ্যাটা সে ছুড়ে দিলেও ভেতরটাতে একটা সূক্ষ্ম অস্বস্তি কুরে কুরে খাচ্ছিল। কারণ সৌহার্দ্য এমনিতে সহজে মিথ্যা কথা বলে না। তার এই গোবেচারা সাফাই সুজন এক নিমেষে গিলে বিশ্বাস করে নিলেও, ফারিস কিন্তু আগের মতোই তীক্ষ্ণ সন্দেহ নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইল।
নিজের দিকে ফারিসের এমন এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা সহ্য হলো না সৌহার্দ্যের। সে চেয়ার ছেড়ে খাড়াস করে দাঁড়িয়ে পড়ল। রুমের ভারী পরিবেশটা কেটে দেওয়ার জন্য দরজার দিকে এগোতে এগোতে ফারিসের উদ্দেশ্যে শক্ত গলায় বলে গেল—

“তোর পার্টি অফিসে ভাবছি আমার অসম্পূর্ণ কাজটা সারব!”
বলেই লম্বা লম্বা কদম ফেলে কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে গেল সে।
সৌহার্দ্য বের হয়ে যেতেই সুজন রাগে গমগম করতে তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে উঠল, “শালা, আমাকে যা কষ্ট দিচ্ছিস, আমার অভিশাপে তোর বাসরই হবে না! পার্টি অফিস কেন, জঙ্গলেও বাসর করতে পারবি না, সেখানেও তোকে বিরক্ত করার জন্য বাঘ, ভাল্লুক, সাপ বসে থাকবে! কঠিনভাবে বদোয়া দিচ্ছি, সামনে রাখা মিষ্টি শুধু দেখতে থাকবি কিন্তু খেতে পারবি না, খেতে গেলেই গজব আসবে!”
সুজনের এমন রাগী ও অদ্ভুত বকবকানি শুনে ফারিস খিকখিক করে হেসে উঠল। চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে সে সুজনের কাঁধে একটা চাপড় মেরে ঠাট্টার সুরে বলে বসল, “ওকে এভাবে বদোদোয়া দিতে দিতে তুই সৌহার্দ্যের বাচ্চার দাদা হয়ে যাবি! কিন্তু নিজে বাপ হতে পারবি না! ওটা সারহান চৌধুরীর কারখানা থেকে বের হওয়া, আস্ত একখানা ভেজাল প্রোডাক্ট, একদম আলট্রা প্রো-ম্যাক্স! তোর মতো নাদান শিশু এসব বুঝবি না দোস্ত!”

বলেই সে আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে সৌহার্দ্যের পিছন পিছন ছুটল। একা রুমে বসে সুজন শুধু ওদের যাওয়ার পথের দিকে চরম বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে রইল।
বিকাল গড়িয়ে প্রায় পাঁচটা বাজে। রিদির রুমের বিছানায় তখন গভীর ঘুমের আমেজ। দুপুরে কলেজ থেকে ফিরে দারুণ পরীক্ষা দেওয়ার খুশিতে সে নিজের রুমে এসেই বইপত্র এখানে-সেখানে ছুড়ে ফেলেছিল। এরপর মোবাইল স্পিকারে ‘আমের বাগান’ গানটা ছেড়ে দিয়ে উড়াধুরা নেচেছিল। উত্তেজনার সেই ঘোর কাটতে না কাটতেই ক্লান্ত হয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে, তা সে টেরই পায়নি।
আলতো করে রিদির রুমের দরজা ঠেলে রুমে প্রবেশ করলেন শাহেদা চৌধুরী। রিদির ঘুমন্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে তিনি কিছু সময় থমকে দাঁড়িয়ে রইলেন!
এই মেয়েটাকে দেখলে বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে; মনে হয় নিজের আদরের ছোট বোনটা বুঝি তার পাশেই আছে। রিদির মা রমিশা খন্দকার ছিলেন শাহেদা চৌধুরীর জীবনের সবচেয়ে আদরের ধন। রমিশা যখন খুব ছোট, তখনই তাদের মা মারা যান। সেই থেকে নিজের মায়ের স্নেহে ছোট বোনকে বুক আগলে বড় করেছেন শাহেদা চৌধুরী, কখনো মায়ের অভাব বুঝতে দেননি। তাই বাড়ির সবাই রিদিকে মেনে নিতে না পারলেও, তিনি তাকে একটুও পর ভাবতে পারেননি।

রিদির জন্মের পরই তিনি মনে মনে এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন—নিজের এই আদরের বোনঝিকে একমাত্র ছেলের বউ করে চিরকালের মতো নিজের কাছে রেখে দেবেন। সবার অগোচরে আকরাম খানের কাছেও কথাটি বলে রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু আকরাম খান রিদিকে অসম্ভব ভালোবাসতেন, তাই তিনি তাকে সরাসরি কোনো পাকা কথা দেননি। কারণ, তিনি সৌহার্দ্যকে খুব ভালো করেই চিনতেন। ছোটবেলা থেকেই বেপরোয়া আর উগ্র মেজাজের ছেলে হিসেবে সৌহার্দ্যকে তিনি একদমই পছন্দ করতেন না। আকরাম খানের স্পষ্ট কথা ছিল—রিদির মতো শান্ত, স্নিগ্ধ একটি মেয়ের সাথে সৌহার্দ্যের মতো উগ্র স্বভাবের ছেলের কোনো মিলই হতে পারে না! এই নিয়ে তিনি বহুবার শাহেদা চৌধুরীকে সরাসরি না করে দিয়েছিলেন।
অতীতের সেই তিক্ত স্মৃতিগুলো মনে ভেসে উঠতেই শাহেদা চৌধুরীর চোখের কোণ ভিজে উঠল। এক ফোঁটা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ার আগেই তিনি যত্নে শাড়ির আঁচল দিয়ে তা মুছে ফেললেন। এরপর ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে বসলেন রিদির মাথার কাছে।

পরম যত্নে ঘুমন্ত মেয়েটার চুলে হাত বুলিয়ে নরম, আদুরে স্বরে ডাকলেন, “উঠে যা সোনা, আর কতক্ষণ ঘুমাবি? সারাদিন তো কিছু মুখে দিসনি, এবার উঠে খেয়ে নে।”
ঘুমজড়ানো পিটপিট করে চোখ মেলে রিদি সোজা হয়ে বসল। এক লহমায় শাহেদা চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলল, “আম্মু, আমার একদম খেতে ইচ্ছে করছে না! আপনি খেয়েছেন তো?”
শাহেদা চৌধুরী একটু কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বললেন, “আমার খাওয়া শেষ! তুই এখন ওঠ তো। না খেয়ে খেয়ে দিন দিন কেমন কঙ্কালসার হয়ে যাচ্ছিস, একটু হুশ আছে?”
রিদি লাজুক হাসিতে আরও একটু শাহেদা চৌধুরীর বুকের গভীরে মুখ গুঁজে কিছু বলতে চাইল। কিন্তু তার আগেই শাহেদা চৌধুরী কিছুটা ইতস্তত করে বলে ফেললেন, “আচ্ছা আম্মু, বল তো… তোর সাথে বাবুর সব সম্পর্ক এখন ঠিক আছে তো?”

কথার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে রিদি লজ্জায় লাল হয়ে গেল, মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দ বের হলো না। রিদির সেই মিষ্টি লজ্জা দেখে শাহেদা চৌধুরী নিজেই পরিস্থিতি হালকা করতে কথা ঘুরিয়ে হাসিমুখে বলে উঠলেন, “আমি কিন্তু আর কোনো কথা শুনতে চাই না, খুব দ্রুত দাদি হতে চাই! তোদের এই লুকোচুরি আর তালবাহানা আমি আর শুনতে রাজি না। আমাকে জলদি নাতি-নাতনি এনে দে, তারপর তোরা যা খুশি করিস!”
বলেই তিনি রিদিকে বিছানা ছেড়ে খাওয়ার তাড়া দিয়ে ডাইনিং রুমের দিকে পাঠিয়ে দিলেন। আমেনা খালাকে তো তিনি আগেই বলে রেখেছিলেন রিদির খাবারটা গুছিয়ে গরম গরম রেডি রাখতে।

রাত তখন প্রায় দশটা। বইয়ের পাতাগুলোর ওপর রিদির চোখ স্থির থাকলেও মনটা ছটফট করে অন্য কোথাও ঘুরছিল। ঘণ্টাখানেক আগেই সৌহার্দ্য ফোন করে কড়া নির্দেশ দিয়েছে—কয়েকটা নির্দিষ্ট চ্যাপ্টার শেষ করে রাখতে হবে, বাড়ি ফিরে সে ধরে বসবে। সৌহার্দ্যের এই অতিরিক্ত শাসন আর পড়াশোনা নিয়ে কড়াকড়ি রিদির একদম অসহ্য লাগে। রিদি যে পড়াশোনায় খুব খারাপ বা পড়তে একদম চায় না, তা কিন্তু নয়; বরং একটু মনোযোগ দিয়ে চেষ্টা করলেই সে ভালো ফল করতে পারে। কিন্তু জীবনের নানা টানাপোড়েন আর ঝক্কিঝামেলায় পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহটাই দিন হারিয়ে গেছে।
মাঝে মাঝে রিদির খুব ইচ্ছে করে সৌহার্দ্যকে সোজা সাপটা বলে দিতে—এত হাবিজাবি না পড়িয়ে শুধু ফার্স্ট প্রফের প্রশ্নগুলো জোগাড় করে দিলেই তো হয়! তাহলে তো কোনো প্যারা না নিয়েই সে খুব ভালো করে সব মুখস্থ করে ফেলতে পারত। কিন্তু সে কথা সৌহার্দ্যের সামনে উচ্চারণ করার সাহস রিদির বুকের কোথাও নেই। সৌহার্দ্য যখন ওই বাঘের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়, তখন ভয়ে রিদির কলিজা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। ওই চাহনি দেখলে রিদির মাঝে মাঝে মনে হয়, বাঘের চোখের সামনে পড়ার চেয়ে কয়েকটা চড়-থাপ্পড় খাওয়াও বুঝি ঢের ভালো ছিল!

এমন সব এলোমেলো ও বিতিক্ত চিন্তার মাঝেই হঠাৎ ঘরের নীরবতা ভেঙে পাশে এসে দাঁড়াল সৌহার্দ্য। রিদির চোখের সামনে একটা অ্যানসার শিট বাড়িয়ে দিয়ে সে রহস্যময় গলায় দাঁড়িয়ে রইল।
ভ্রু কুঁচকে খাতাটার দিকে তাকিয়ে রিদি হতভম্ব সুরে জিজ্ঞেস করল, “এটা কী?”
সৌহার্দ্য আরও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “তোমাদের টেস্ট পরীক্ষার অ্যানসার শিট!”
রিদি কিছুতেই মেলাতে পারল না—যে মানুষ খাতা কাটার নামই নেয় না এক সপ্তাহের আগে, সে হঠাৎ আজই বাড়িতে খাতা এনে হাজির করল কেন? সৌহার্দ্যের চোখের দিকে সরাসরি তাকানোর সাহস না পেলেও, খাতাটার দিকে তাকিয়ে রিদি একটু ইতস্তত করে বলেই ফেলল, “আপনি তো এক সপ্তাহের আগে খাতা হাতেই নেন না, তাহলে এবার এত…?”

তার কথা শেষ হওয়ার আগেই সৌহার্দ্য এক গমগমে গম্ভীর স্বরে বলে উঠল, “হুম, বাট এবার আমার বউ এত ভালো পরীক্ষা দিছে যে, খুশিতে আমি তার খাতাটা স্পেশালভাবে সবার আগে কেটেছি। দেখ তো জান, তোমার মনমতো হয়েছে কি না?”
সৌহার্দ্যের মুখে ‘জান’ ডাকটা শুনলেও তার গলার বরফশীতল টোনে রিদির বুকটা কেঁপে উঠল। ভয়ে ভয়ে একটা শুকনো ঢোক গিলল সে। কাঁপাকাঁপা হাতে খাতাটা তুলে পাতার ওপরে চোখ বোলাতেই রিদির তো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল! খাতার ঠিক মাঝখানে বড় বড় দুটো শূন্য জ্বলজ্বল করছে।
হতভম্ব হয়ে ফ্যাকাশে চোখে খাতার দিকে তাকিয়ে রইল রিদি। মুহূর্তের মধ্যে রাগে, অভিমানে আর দুঃখে তার সারা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। রাগে ফেটে পড়ে সে সরাসরি প্রতিবাদ জানিয়ে বলে উঠল, “আপনি আমার স্বামী নাকি আমার জন্মশত্রু বলুন তো? সব সময় আমার সাথে এমন শত্রুতা কেন করেন আপনি? আমি কত ভালো করে লিখেছি, বিশে বিশ পাওয়ার কথা! আপনি আমাকে কোন আক্কেলে এই দুটো শূন্য দিলেন?”

সৌহার্দ্য রিদির এই রাগের তেজকে বিন্দু পরিমাণ পাত্তা না দিয়ে আরও বেশি বিরক্ত ভরা কণ্ঠে বলে উঠল, “মাথা মোটা স্টুপিড একটা! আমি তো অবাক হচ্ছি, একটা মানুষ কতটা গাধা হলে প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পরও পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখতে গিয়ে প্রতিটা টপিক আউলঝাউল করে ভুল লিখে আসে?”
কথাটা শেষ করেই সৌহার্দ্য রিদির মাথায় তার বৃদ্ধাঙ্গুলের একটা টোকা দিয়ে বিরক্তি ঝেড়ে আবারও বলে উঠল, “এই গোবর-ঢাসা মাথা নিয়ে কোন বলদ তোমাকে ডাক্তারি পড়তে পাঠাল?”
সৌহার্দ্যের কথা শুনে রিদি তৎক্ষণাৎ বুঝে গেল যে, সে যে গোপনে প্রশ্নপত্র দেখার ব্যাপারটা জেনে গেছে, তা আর সৌহার্দ্যের কাছ থেকে লুকানো যায়নি—
পরাজিত গলায় মুখ ফুলিয়ে, একদম থমথমে কণ্ঠে রিদি পাল্টা জবাব দিল, “আমি কি নিজের ইচ্ছায় ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম নাকি? আপনার আব্বুই তো জেদ ধরে ভর্তি করালেন! আমার শখ ছিল আমি সিআইডি অফি…”

তার কথা পুরোপুরি শেষ হতে না দিয়েই সৌহার্দ্য এমন একটা পিনপতন করা রাগী দৃষ্টি রিদির ওপর নিক্ষেপ করল যে রিদির গলার বাকি কথা গলাতেই আটকে গেল। জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে সৌহার্দ্য বলে উঠল, “ইউ স্টুপিড! তুমি যদি সিআইডি হতে, তবে দেশের সব সন্ত্রাসী কোনো ভয় না পেয়ে নিশ্চিন্তে ঘরে বসে আরামসে লুডু খেলত! তোমার যে বুদ্ধির বাহার, তাতে তোমাকে দিয়ে তদন্ত তো দূরের কথা, কোনো মামলার ফাইলও ছুঁতে দেওয়া নিরাপদ না!”
রিদি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সৌহার্দ্যের দিকে তাকাতেই সৌহার্দ্য তার চেয়েও তিনগুণ রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে গম্ভীর ও ভারী কণ্ঠে বলে উঠল,
“এই মেয়ে, তোমার কাছে ডাক্তারি কি ছেলেখেলা মনে হয়? তুমি জানো, একজন ডাক্তারের ওপর কতগুলো মানুষের জীবন-মরণ…”
কথাটা বলতে গিয়েও রিদির চোখের কোণে জমে থাকা কান্না দেখে সে হঠাৎ থেমে গেল। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল সৌহার্দ্যের। পরমুহূর্তে নিজের সব রাগ কোথায় যেন হারিয়ে ফেলে সে রিদির কোমরটা জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের বুকের আরও কাছে টেনে নিল। তারপর নিজ হাতে পরম যত্নে রিদির চোখের পানি মুছে দিল।

কিন্তু পরক্ষণেই কী মনে হতেই দুষ্টু হাসিতে তার চোখ দুটো চকচক করে উঠল। রিদির কানের কাছে মুখ নিয়ে এক নেশাক্ত কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“দুপুরে কী যেন গানে নাচা হচ্ছিল, ম্যাডাম? ‘আমের বাগান’ না কি যেন, ওটা আমার মোটেও ভালো লাগেনি!”
কথাটা শেষ করেই সে রিদিকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে তার নরম গালে এক গভীর, উষ্ণ চুমু এঁকে দিল। তারপর আরও একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে আবদার জানাল,
“তোমাকে দুটো রসগোল্লা দেওয়ার খুশিতে আমাকে আশিক বানাইয়া গানে একটা হট ডান্স দেখাও জান, প্লিজ!”
সৌহার্দ্যের মুখে এই কথাগুলো শুনে রিদির পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল! সে যে দুপুরে ঘরে একা একা দরজা বন্ধ করে নেচেছিল, তা সৌহার্দ্য কীভাবে জানল? তাদের রুমে সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে—এই ভয়ঙ্কর সত্যটা জানার পর থেকেই তো রিদি যত আকাজ আছে সব নিজের রুমে গিয়ে করে।
ভয়ে, লজ্জায় আর অস্বস্তিতে রিদির বুকটা কেঁপে উঠল। হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তে সে ভয়ে ভয়ে চমকে তাকাল সৌহার্দ্যের দিকে।
রিদির এমন ভীত ও চমকে ওঠা দৃষ্টি দেখে সৌহার্দ্য একটু ঝুঁকে রিদির টি-শার্ট কিছুটা সরিয়ে ঘাড়ে নিজের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির সাহায্যে মুখ ঘষতে ঘষতে বলল,

“তুমি যেটা ভাবছ সেটাই, হার্ট!”
রিদি আমতা আমতা করে তোতলিয়ে বলল,
“ক- কবে থেকে!”
সৌহার্দ্য যেন আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠল। রিদির সাথে দূরত্বটুকু পুরোপুরি ঘুচিয়ে সে আরও বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল। রিদির টি-শার্ট খোলার চেষ্টায় হাত চালাতে চালাতে নিজের চোখের সমস্ত নেশা ঢেলে দিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল—
“যবে থেকে জানতে পেরেছি তুমি আমার বউ!”
সৌহার্দ্যের এই কথাটি রিদির কানে যেন আছড়ে পড়ল কোনো দূরন্ত বজ্রপাতের মতো! হায় আল্লাহ! এই এক ছাদের নিচে, ওই রুমটার ভেতরে বসে সে মনে কত কি-ই না ভেবেছে, কতশত পাগলামি করেছে! এই ভেবেই মেয়েটার শ্যাম বর্ণ গালদুটো লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে উঠল। চরম লজ্জা আর আড়ষ্টতা লুকিয়ে সে রাগী চোখে সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল—

“লুচ্চা পুরুষ, তখন তো এমনভাবে থাকতেন যেন ভাজা মাছ উল্টে খেতে পারতেন না? ছিঃ অ…”
কথাটা গলায় আটকে রেখেই পুরোপুরি শেষ করতে পারল না রিদি। তার আগেই সৌহার্দ্য ক্ষিপ্র গতিতে রিদির নরম ঠোঁট দুটো নিজের দখলে নিয়ে নিল, চিরতরে বন্ধ করে দিল তার সমস্ত তিরস্কার। নিজের শক্তপোক্ত হাতের নিবিড় ছোঁয়া আর তীব্র ভালোবাসায় মেয়েটাকে একেবারে সিক্ত করে তুলে সে যখন আরও একটু গভীরে হারিয়ে যেতে চাইল, ঠিক তখনই নিস্তব্ধতা ভেঙে দরজায় সশব্দে বাড়ি পড়ল!
বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে রিদিকে আলতো হাতে সরিয়ে দিয়ে সৌহার্দ্য রাগে গজগজ করতে সোফায় গিয়ে ধপ করে বসে পড়ল। রাগে তার সারা শরীর যেন জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে—যখনই সে নিজের বউটাকে কাছে পেতে চায়, তখনই যেন ঠিক কালবৈশাখী ঝড় এসে যায়!
রিদি কাঁপতে কাঁপতে নিজের অগোছালো পোশাকটা কোনোমতে ঠিক করে দরজাটা খুলতেই দেখল, আমেনা খালা দাঁড়িয়ে আছেন সামনে। রিদির আপাদমস্তক ফ্যাকাশে আর ওলোটপালট চেহারা দেখে তিনি সরল ও নরম গলায় বলে উঠলেন—

“তোমার ঠোঁটে কাটছে কিভাবে, ছোট আম্মা?”
রিদির থতমত খেয়ে আমতা আমতা করা মুখভঙ্গি দেখে খালার বুঝতে আর এতটুকু বাকি রইল না ভেতরে আসলে কী ঘটে গেছে! লজ্জায় আর আবেশে নিজের গাল লাল করে তিনি দ্রুত সেখান থেকে পা বাড়াতে বাড়াতে বলে গেলেন—
“বড় ভাবি খাওয়ার জন্য ডাকতে পাঠাল! তাড়াতাড়ি এসো!”
সেদিনের পর কেটেছে মাঝ থেকে দুটি দিন। এই দুই দিন ধরে রিদি যেন সৌহার্দ্যের ছায়াসঙ্গী হয়ে আছে—ওর আগে-পিছে ঘুরে একটাই আবদার, মাত্র দুদিনের জন্য সে বাপের বাড়ি (সিকদার বাড়ি) যেতে চায়। কিন্তু সৌহার্দ্য কিছুতেই রাজি নয়। তার সাফ কথা, বউকে ছেড়ে তার এক মুহূর্তও থাকা সম্ভব নয়। এই নিয়ে রিদিকে সে কয়েকবার ধমকও দিয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে এই মেয়ের সিকদার বাড়ি যাওয়ার জন্য এমন মরিয়া হয়ে ওঠার কারণ কী, সেটাই সৌহার্দ্যের মাথায় আসছে না।

রাত প্রায় এগারোটা। কিছুক্ষণ পরেই সৌহার্দ্যকে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বের হতে হবে, কারণ আজ একটি জরুরি অপারেশন (ওটি) আছে। ল্যাপটপে সেই কেসটা নিয়েই ও মন দিয়ে স্টাডি করছিল। ঠিক তখনই রিদি একদম সৌহার্দ্যের শরীর ঘেঁষে বসে পড়ে ওর গালে টুপটাপ করে কয়েকটা চুমু খেয়ে বসে।
বউয়ের মতলবটা সৌহার্দ্যের বুঝতে বাকি রইল না, তাই সেদিকে সে বিশেষ পাত্তা দিল না। বরং বিরক্তি নিয়ে ধমকের সুরে বলে উঠল,
— “সরো তো! কাজ করছি দেখছ না? এমন ঘেঁষাঘেঁষি করছ কেন?”
রিদি মুখ ফুলিয়ে মিনতির সুরে বলল,
— “প্লিজ, যেতে দেন না! মাত্র তো দুদিনের জন্য যাবো, কথা দিচ্ছি এক সেকেন্ডও বেশি থাকব না!”
সৌহার্দ্য সন্দেহভরা দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— “হঠাৎ ওখানে যাওয়ার জন্য তোমার এত উতলা হওয়ার কারণ কী?”
প্রশ্নটা শুনে রিদি এক মুহূর্তে থমকে গেল। তবে নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে বিরক্তির ভাব দেখিয়ে বলল,
— “আশ্চর্য! আমার বাবার পেটের একটা ভাই আছে, তাকে একটু দেখতে ইচ্ছে করে না আমার?”
বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে সৌহার্দ্য বলল,

— “স্টুপিড! বাবার পেটের ভাই হয় কোনো দিন, শুনেছ? এমন আজগুবি কথা কোথায় পাও তুমি?”
রিদি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই সৌহার্দ্য এক বিরাট ধমক দিয়ে গর্জে উঠল,
— “জাস্ট শাট আপ, রিদিতা! একটা কথা বারবার শুনতে ভাল্লাগে না আমার। যাবে না বলছি মানে যাবে না!”
সৌহার্দ্যের এমন অনমনীয় আচরণ আর বারবার ধমক দেওয়ায় রিদি ভীষণ বিরক্ত হলো। সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে রাগে নিজের মোবাইলটা বের করে হুজুরের একটা ওয়াজ ফুল ভলিউমে বাজিয়ে দিল—
“যে পুরুষরা ঘরের বউয়ের সাথে ছ্যাঁচড়ার মতো আচরণ করে, তারা কখনো ভদ্রলোক হতে পারে না! বউ হচ্ছে ঘরের বাতি, তাদের সাথে ভালো আচরণ করলে আল্লাহ খুশি হয়ে বেহেশতের দরজা খুলে দেবে তাদের জন্য…”
সৌহার্দ্য কোনো কথা না বলে বেশ মনোযোগ দিয়েই বউয়ের বাজানো ওয়াজটা শুনল। তারপর ঠোঁটে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে, ঠোঁট কামড়ে রিদির দিকে কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে রইল। এরপর দুষ্টু একটা চোখের ইশারা করে হালকা হাসিমুখে বলে উঠল—
— “একটা কাজ করলে কেমন হয়, সুইটহার্ট? ঘরের প্রতিটা কোণায় কোণায় বাতি লাগিয়ে দিই? তুমি চাইলে ঘরের বাইরেও লাগিয়ে দিতে পারি! কী বলো?”
সৌহার্দ্যের এই রসিকতা আর বাঁকা কথা শুনে রিদি যেন রাগে একেবারে আগুন হয়ে গেল! চোখ দুটো বড় বড় করে সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে তেড়ে সে বলে উঠল—
— “লাগিয়ে দেখুন না! লুচ্চা লোক কোথাকার! একদম বাতি জ্বালানোর মেশিন কেটে দেবো!”
বউয়ের এমন অপ্রত্যাশিত আর ঝাঁঝালো কথা শুনে সৌহার্দ্য নিজেকে আর সামলে নিতে পারল না; খুকখুক করে কেশে উঠল। তবে পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে কড়া গলায় রিদিকে ধমক দিয়ে বসল—
— “স্টুপিড! তোমার ভাষার এত অবনতি কবে থেকে হলো? কানের নিচে একটা থাপ্পড় দেবো, বেয়াদব কোথাকার!”

ধমক খেয়েও রিদির জেদ এক বিন্দুও কমল না। সে উল্টো আরও তেজি হয়ে সৌহার্দ্যের সামনে থেকে ল্যাপটপটা এক টানে সরিয়ে ফেলল। তারপর সৌহার্দ্যের একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কিছু একটা বলল।
কিন্তু রিদির সেই কথায় সৌহার্দ্য একটুও দমল না; বরং আরও বেশি উদাসীন ও ভাবলেশহীন ভঙ্গি করে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল—
— “আমাকে এসব লোভ দেখিয়ে কোনো লাভ নেই! আমার যখন যেটা প্রয়োজন, আমি নিজেই আদায় করে নিতে পারি। এখন এভাবে বানরের মতো ঝোলাঝুলি না করে আমাকে ছাড়ো! আমার ইম্পরট্যান্ট কাজ আছে, একটু পরেই হাসপাতালের জন্য বের হতে হবে আমাকে!”
সৌহার্দ্যকে কোনোভাবেই আর বাগে আনতে না পেরে রিদির মুখটা একদম মলিন হয়ে গেল। সমস্ত জেদ নিমিষে কর্পূরের মতো উবে গিয়ে তার চোখে ভেসে উঠল এক অসহায় করুণ আকুতি। আর পেরে না উঠে সে যখন মায়াবী চোখে শেষবারের মতো তাকিয়ে ধীর পায়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে গেল—ঠিক তখনই সৌহার্দ্যের বুক চিরে বেরিয়ে এল একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস। বউয়ের ওই করুণ মুখটা সে সহ্য করতে পারল না। নরম গলায় সে বলেই ফেলল—
— “ওকে, বাট ওয়ান ডে!”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪৮

সৌহার্দ্যর মুখে থেকে কাঙ্ক্ষিত অনুমতিটুকু পেতেই রিদির বিষণ্ন মুখটা পলকে আনন্দে ঝলমল করে উঠল! খুশিতে তার দু’চোখ চিকচিক করে উঠল। এক মুহূর্তের জন্যও আর সেখানে দাঁড়াল না সে; বিজয়িনীর মতো হাসিমুখে ঘর থেকে বের হতে গিয়েই হঠাৎ কী মনে করে থমকে দাঁড়াল। তারপর বিদ্যুৎগতিতে পেছনে ফিরে সৌহার্দ্যের কাছে এসে ওর গালে টুপ করে একটা চুমু এঁকে দিয়েই এক দৌড়ে ঘর থেকে উধাও হয়ে গেল!
রিদির এমন হঠাৎ চপলতা আর কাণ্ডকারখানা দেখে সৌহার্দ্য বিরক্তিতে চোখ দুটো কুঁচকে ফেলল। শূন্য দরজার দিকে তাকিয়ে মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে সে বলে উঠল—
— “ধান্দাবাজ, স্টুপিড একটা মহিলা জুটেছে আমার কপালে!”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here