তাকদীর পর্ব ১৪
নিরুর কল্পনারাজ্য
প্রভাতের নীলাকাশের উদীয়মান সূর্যের অহমিকাময় রৌদ্রতাপের তোপে পড়ে নিজ দেহের বাড়ন্ত উষ্ণতা বেশ দারুণভাবেই অনুভূত হচ্ছে জুনায়েদের। বহুক্ষণ যাবৎ সূর্যের খাঁড়া উত্তাপের সহিত পাল্লা দিয়ে আমিরার উষ্ণ তনুখানা কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে জুনায়েদ। কিছুপল হাঁটছে তো কিছুপল স্থির হয়ে। আমিরা বড্ড আয়েশে-আরামে জুনায়েদের ইট-পাথরের ন্যায় শক্ত বক্ষে লেপ্টে। টানা বিশমিনিট যাবৎ আমিরার রৌদ্রস্নান শেষে জুনায়েদের এবারে মনে হলো–এখন আমিরার কিছু খাওয়া উচিত। ছোট দেহখানা কেমন জীর্ণ-শীর্ণ হয়ে পড়ে আছে তার পেশিবহুল বাহুতে। ভাবনা এবং কাজের সনে কোনোরূপ হেরফের না করে জুনায়েদ ধীর পদক্ষেপে এগোলো। সদরদরজা পেরিয়ে বসার টেবিলের নেকট্যে পৌঁছালো। আসামাত্রই যা নজরে এলো তা কেবল একজোড়া বৃদ্ধ কপোত-কপোতি; সিঁড়ি বেয়ে ওপরে দোতলার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জুনায়েদ চোখ ঘোরালো।
উত্তপ্ত দেহের কপোল বেয়ে ধারালো-শীতল স্রোত গড়িয়ে পড়ছে নিজ ধারায়। জুনায়েদ খানিকটা সময় নিয়ে আরামদায়ক সোফাগুলোর একটিতে গিয়ে পা ছড়িয়ে বসলো। কোলে তখনও আমিরা। জুনায়েদ সময় নিয়ে শ্বাস গ্রহণ করলো। অতঃপর অধরযুগল গোল করে তা ত্যাগ করলো। কেশদ্বয়ের অবস্থাও করুণ বটে! বেখেয়ালিভাবে কপালের আশেপাশে আঁচড়ে পড়েছে সেসব। সুদর্শন পুরুষটির ঘর্মাক্ত এমন গরন যেকোনো রূপসীর মুক্তোঝরানো হাসির কারণ হতে সক্ষম। জুনায়েদ ডানহাত দ্বারা আমিরাকে জড়িয়ে ধরতে ধরতে বাম হাতের সাহায্যে সামনে আছড়ে থাকা চুলগুলো একযোগে ব্যাকব্রাশ করলো। অথচ সিল্কি চুলের অধিকারী হওয়ার দরুণ সেসব অবাধ্যের ন্যায় কপোলে এসে ফের ঘাটি ঘারলো। তাতে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না দিয়ে বখাটে পুরুষটির নীলচে চোখদুটো ঘুরে এসে আটকালো বুকে লেপ্টে থাকা বাচ্চাটির ওপর। অমনিই সকল বিরক্তি ঠেলে চোখেমুখে তার তারার ঝিলিক দেখা গেলো। বামহাতের তর্জনী এবং মধ্যমার সাহায্যে আমিরার কপালে আদুরে হাত ছোঁয়ালো। জ্বরের মাত্রা কিছুটা কম বোধহয়। থার্মোমিটারে তবু একবার পরীক্ষা করে দেখতে হবে! জুনায়েদ আমিরার ঘন কুন্তলবৃন্দে হাত বোলালো। তার মোটা; গম্ভীর স্বর একেবারে গলে যাওয়া বরফের ন্যায় মোলায়েম হলো। ছোট্ট দেহটিকে শুধালো,
— বার্বিডল, শুনতে পাচ্ছেন? হু? এখন কেমন লাগছে?
অপরপার্শ্ব হতে কোনো উত্তর আসেনা। এবার জুনায়েদ খানিকটা ঝুঁকলো। আদুরে ভরা কন্ঠে ডেকে উঠলো ধরণীর অন্যতম প্রশান্তিদায়ক এক শব্দ,
— আম্মুউউউ!
— হু!
এবারে ছোট করে এক তীক্ষ্ণ বাচ্চা মেয়েলি স্বর ভেসে আসে।
— এখনও কী আগের মতো খারাপ লাগছে?
প্রত্যুত্তরে আমিরা আলতোভাবে দু’পাশ মাথা নাড়ে। অর্থাৎ না। জুনায়েদ খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়। তবু অবশ্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে একবার আমিরাকে। এটাই তার সিদ্ধান্ত।
জুনায়েদকে ভেতরে আসতে দেখে আয়রা সরাসরি টেবিলে উপস্থিত থাকা কয়েকটি নাস্তার মধ্য হতে দু’টি পাউরুটি হাতে তুলে নিলো। তাতে জ্যাম লাগিয়ে তা অতি সুন্দর ভাবেই সাজিয়ে রাখলো কাঁচের প্লেটে। পাশে অমলেট রাখলো। সাথে আমের জুস। আমিরার জন্য সে আপাতত সুজি তৈরি করবে। তাই আমিরাকে পরে খওয়ানোর চিন্তাধারা থাকলেও জুনায়েদকে সোফায় গিয়ে বসতে দেখে আয়রা আমিরা এবং তাকে একসাথে খেতে দিবে বলে ঠিক করলো। যেই ভাবা সেই কাজ। সে কিচেনের উদ্দেশ্যে ডাইনিং এরিয়া হতে প্রস্থান গ্রহণ করলো। সুজি বানাতে অবশ্য বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়না। দশমিনিট বড়োজোর। ততক্ষণ জুনায়েদ বসুক।
সে সুজিগুলো গরম পানিতে ছেড়ে চিনি ছিটিয়ে বসিয়ে রাখলো ঢাকনা সমেত।
অপরদিকে জুনায়েদের পেটের মাঝে ছুঁচো ইদুর সব একত্রে কাবাডি খেলছে। তার ধূর্ত চোখদুটো সহসাই দেয়ালঘড়ির পানে গেলো। ইতোমধ্যেই প্রায় সারে আটটা। জুনায়েদ ভীষণ স্বাস্থ্য সচেতন পুরুষ। জিম; ফিটনেস ধরে রাখা তার নিত্যআবশ্যকীয় কার্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। স্বভাবসুলভ আমিরাকে কোলে নিয়েই সে এগোলো ডাইনিংয়ের দিকে। বড় বড় কেবল কয়েক কদমেই সে তার লক্ষ্যের দ্বারে এসে থামলো। হরেক রকমের নাস্তা। তন্মধ্যে তার চোখদুটো গেলো সাজিয়ে রাখা কাঁচের প্লেইটটির পাবে। অমলেট; জ্যাম পাউরুটি সাজিয়ে রাখা। অমনি ভ্রু দুখান কুঁচকে উঠলো তার। চোয়াল হয়ে উঠলো দ্বিগুণ ধারালো। দাঁতে দাঁত পিষে সে গজগজিয়ে উঠলো হঠাৎ,
— মম! মঅঅম।
জুনায়েদের এমন চিৎকারে আমিরার নাজুক দেহ হঠাৎ ভীত হলো। কেঁপে উঠলো মুহূর্তেই। জুনায়েদের গর্জনে সেথায় অবিলম্বে উপস্থিত হলো আয়রা। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছে। তার চেহারায় স্পষ্ট উৎকন্ঠার ছাপ। হাতে কুন্তি। মাথার কাপড় সরে গিয়ে এলোমেলো বেণুনি গাথা চুল। কপালে বিন্দু বিন্দু মুক্তঝরা ঘামের উৎস। এযেনো সত্যিকারের গৃহিণী উদিত হয়েছে জুনায়েদের সম্মুখে। জুনায়েদের গম্ভীর আদল এবং কঠোর চাহুনি অকস্মাৎ থমকে গেলো রমণীটির কপালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কেশদ্বয়ের মাঝে। বিন্দু ঘাম সেথায়। জুনায়েদের মনে আচানক এক নিষিদ্ধ চাহনার উৎপত্তি হলো। তার ইচ্ছে হলো–মেয়েটাকে একটিবার ছুঁয়ে দিতে; যতনে মুছিয়ে দিতে সেই লবণাক্ত কণাগুলো। তার ভাবনার ইতি ঘটলো আয়রার চিন্তিত স্বরের মাধ্যমে,
— কী..কী হয়েছে? হঠাৎ আম্মুকে ডাকছেন কেনো?
জুনায়েদের যেনো ঘোর কাটলো। সে চোখ সরালো। এদিক ওদিক ঘুরিয়ে বড় করে এক শ্বাস টানলো। কী হচ্ছে তার! সে ঠিক-ই বলে। মেয়েটা..মেয়েটা নির্ঘাত তাকে কোনো জাদুই করেছে। তার গম্ভীর স্বর পরিবর্তিত হলো জলস্রোতের ন্যায় শীতল এবং মোলায়েম কন্ঠে,
— এই নাস্তাগুলো কে সাজিয়েছে এভাবে?
— আমি। কিছু কী ভুল হয়েছে? ভুল হলে আমি সরিয়ে ফেলছি এ….
আয়রা তড়িতে প্রত্যুত্তর করলো যা-তে জুনায়েদ রেগে না যায়। জুনায়েদকে সে প্রথমবারের মতো এতোটা রাগান্বিত দেখছে। অথচ মাঝপথে জুনায়েদ তাকে থামিয়ে দেয়। বলে,
— নো নিড। এটাই খাবো।
— হু?
আয়রা যেনো বুঝতে না পেরে ফের শুধালো। জুনায়েদ এবারে খানিকটা টিজ করা আরম্ভ করলো আয়রাকে। রসাত্মক ভঙ্গিতে বললো,
— তোমার নাম আয়রা কে রেখেছে?
— হয়তো-বা আব্বু।
আয়রার সরল প্রত্যুত্তর। জবাবে জুনায়েদের ঠোঁটের কোণের হাসি চওড়া হয়। বলে,
— কেনো রেখেছে জানো?
আয়রা ভ্রু দুটি কুঁচকে তাকালো বখাটে পুরুষটির পানে। নজরে নজর নিবিষ্ট রেখে দু’পাশ মাথা নেড়ে নিজের উত্তর জানালো। অর্থাৎ না। জুনায়েদ এবার সহজভাবেই একধাপ সম্মুখে এগুলো। ডাইনিয়ের ওপাশে আয়রা। ব্যঙ্গ করে জবাব দিলো,
— কজ আয়রা মিনস বয়রা।
আয়রা কিছু বুঝলোনা। জুনায়েদ আমিরাকে নিয়ে চেয়ার টেনে বসতে বসতে আয়রার অগোচরে ঠোঁট টিপে হাসলো। আয়রা না বুঝে নিজে নিজেই বিড়বিড় করলো আরেকবার শব্দগুলো,
— আয়রা…মিনস বয়রা?
অতঃপর কিছুমুহূূর্ত অতিবাহিত হতেই সে উদঘাটন করে ফেললো এমন কথার কারণ। প্রথমবার যে-বার কথা হলো, সেবারেও জুনায়েদ এক-ই শব্দ ব্যবহার করেছিলো আয়রার ক্ষেত্রে। সে এবার একপলক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জুনায়েদের পানে। তা অবশ্য বিরক্তির চাহুনি। সে কিছুটা অসন্তোষ হয়েই বলে ফেলে,
— আমি বয়রা নই। ব্যাস, আমি কেবল শুনতে পাইনি। আয়রা ডাজন্ট মিনস বয়রা।
— আচ্ছা? তা বয়রা না হলে কথা সহজে শুনতে পাওনা কেনো?
জুনায়েদের কটাক্ষ এবারে আয়রার চমকের শিহরণের মাত্রা বাড়ালো। চমকিত লোচনে সে জবাব দিলো,
— আমি? আমি তো সব কথার-ই জবাব দিয়েছি আপনার। এমনটা মাঝেমধ্যেই হতে পারে।
— হু, একদম ঠিক। হতেই পারে, ফাহমিদা শেখ বয়রা। ওহ স্যরি স্যরি, আয়রা।
আয়রা কপাল কুঁচকে চেয়ে রইলো জুনায়েদের পানে। জুনায়েদ ভুল করেও আয়রার পানে দৃষ্টি ঘোরালোনা। নির্ঘাত সে হেসে কুটিকুটি হবে। তখন তার গম্ভীর ব্যক্তিত্বের কী হবে? সে অবাক হয়। বহুদিন তার এমন হাসি পায়না। সে এবার গলা খাঁকারি দিয়ে শুধায়,
— আমিরার খাবার কোথায়?
জুনায়েদের প্রসঙ্গ বদলানোতে আয়রাও তার কপালের আকাঁ-বাঁকা রেখা অদৃশ্য করে সরলরেখায় রূপান্তর করলো। সে আমিরার পানে চেয়ে জবাবে বললো,
— ওর জন্য সুজি বানাচ্ছি। আমিরার জ্বর হলে কিছু খেতে চায়না। আপনি ওকে আমার কোলে দিন। সুজি প্রায় হয়ে এসেছে। আমি খাইয়ে দিবো।
জুনায়েদ আপত্তি জানায়,
— উঁহু, নিয়ে এসো ওর সুজি। একসাথে খাবো। আমি খাইয়ে দিচ্ছি। তাছাড়া ও আমার কোলে বেশ আরামেই আছে মেইবি।
— আপনি পারবেন না। জ্বরের সময় একদম-ই খেতে চায়না মেয়েটা।
— এমনটা হলে আমার উচিত একবার চেষ্টা করা। আমিরাকে আমার কাছে বেশ কন্ফোর্ট্যাবল-ই দেখাচ্ছে।
— এটা কঠিন হবে। ছেড়ে দিন আপনি। আপনার উচিত নাস্তা সারা প্রথমে।
— নিয়ে এসো তুমি। দেখা যাক কী হয়। কাঁদলে নাহয় তোমাকে দিয়ে দিবো।
— আচ্ছা।
আয়রা সরে গিয়ে কিচেনে গেলো। সুজিগুলো বাটিতে ঢেলে চামচ নিয়ে এলো। জুনায়েদের সম্মুখে রেখে সে দাঁড়িয়ে রইলো। জুনায়েদ অবশ্য প্রথমবারে একটু হিমশিম খেলো। আমিরাকে বুক ৎেকে তুলতে বহু কষ্ট হয়েছে। সে আমিরাকে কোলে বসিয়ে এবার এক চামচ মুখে তুলে ধরলো। আমিরা সাথে সাথেই মুখ ঘুরিয়ে নিলো। জুনায়েদ তা দেখে বললো,
— প্রিন্সেস, হা করোও। আআআ!
কে শোনে কার কথা। আমিরা সমানে মুখ ঘুরিয়ে যাচ্ছে। জুনায়েদ বাম পার্শ্বে চামচ নিয়ে গেলে তো আমিরা ডান পাশে মুখ করে রেখেছে। জুনায়েদ তাকে মোলায়েম কন্ঠে বোঝাচ্ছে,
— একটুখানি, একটুখানি খাও বার্বিডল।
আমিরা সমানে নাকচ করছে দূর্বল স্বরে,
— না, ইন্না! থাবো না।
জুনায়েদের চেহারা এ’পর্যায়ে দেখার মতো হলো। অসহায় হয়ে শুধালো,
— খেতে ইচ্ছে করছেনা?
— ইত্তুও না।
আমিরার এমন কথায় জুনায়েদ এবার আয়রার পানে তাকালো। আয়রা মুখ টিপে দাঁড়িয়ে। মেয়েটা কী হাসছে? সে সোজাসাপটা শুধালো,
— তুমি কী আমাকে নিয়ে হাসছো?
— আপনাকে আগেই বলেছিলাম এটা সহজ হবেনা।
জুনায়েদ আয়রার এসব কথা ফেলে দিয়ে আবারও চামচ ঘোরালো আমিরার দিকে। এবারে সে নরম কন্ঠে বিষাদ নিয়ে বলল,
—এইতো, বার্বিডল। খেয়ে নাও লক্ষী আম্মু। আঙ্কেলের তোমাকে এভাবে দেখতে খুব কষ্ট হচ্ছে। তুমি না খেলে যে আমার গলা দিয়েও খাবার নামবেনা, প্রিন্সেস। একটু খেয়ে নাওনা মামণি, প্লিজ!
এবং সত্য সত্য আমিরা সবটুকু খেয়ে ফেললো লক্ষী বাচ্চাটির ন্যায়। আয়রা আরেক দফা চমকায়। দুজনের মিলমিশ বুঝি এতোটাই? জুনায়েদের মুখে বিজয়ীর হাসি ফুঁটে। সে স্বউৎসাহে বলে,
— সি, ইট ওয়াজ এজ ইজি এজ ইট।
পরিবর্তে আয়রা স্বল্প হাসলো। শুধালো,
— জ্বর কতটুকু?
— হুম, কিছুটা কমেছে হয়তো।
জুনায়েদ জ্যাম মিশ্রিত পাউরুটির পানে চায়তে চায়তে তাকে জবাব দিলো। জ্যামে তার এলার্জি। রেশ উঠে যায় মুখে দিলেই। একারণেই তখন সে জ্যাম দেখে রেগে গিয়েছিলো। তবে এইমুহূর্তে, কেনো যেনো ওই জ্যাম-পাউরুটি তাকে অদৃশ্য পরিমাণে আকর্ষণ করছে। সে কোনোরূপ ভাবলোনা। আমিরাকে খাইয়ে পরিষ্কার করালো। অতঃপর জ্যাম পাউরুটিতে এক কামড় বসালো। মুহূর্তেই সম্পূর্ণটুকু শেষ করে ফেললো সে। জুনায়েদের মনে হলো—এ যেনো পৃথিবীর সবচে অসাধারণ খাবার। সে জুসে হাত দিতেই যাবে তখুনি তার পকেটে থাকা যন্ত্রটি বিপবিপ শব্দে বেজে উঠলো। জুনায়েদ বিরক্ত হলো। একচেটিয়া বিরক্ত হয়ে বলেও ফেললো,
— খাওয়ার সময় কোন শালায় আবার ডিস্টার্ব করে।
ফোন বের করে চোখের সম্মুখে ধরতেই সেখানে নাম ভেসে ওঠে রাফির। সে অবিলম্বে ফোন তুলে। আবারও সেই কঠোর উপমার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় তার নরম সত্ত্বা,
— হ্যালো!
ওপাশ থেকে রাফির উত্তেজিত স্বর,
— হ্যাঁ, হ্যালো! জুনায়েদ। কোথাও তুই? আজ আমাদের রেইসের কথা ছিলো। ভুলে গেলি?
রেইস? ওহ হ্যাঁ! সে নিজেই তো অর্গানাইজ করেছিলো এই রেইস। ইশ! এভাবে ভুলে গেলো। কিছুপল থমকে রইলো সে। তবে এখন এসবে মোটেই মাথা নেই তার। সে নিজের কোল জুড়ে থাকা মেয়েটার দিকে তাকালো। আমিরার মুখের দিকে তাকিয়ে জুনায়েদ জবাব দিলো গম্ভীর হয়ে,
— লিভ ইট টু আয়ান। হি ইজ গনা ম্যানেজ ইট। আমি আসতে পারবোনা।
কথাটুকু বলতে দেরি অথচ ফোনটা কাটতে দেরি হলোনা তার। অপরদিকে রাফি হতভম্ভ। ছোটবেলা হতে দেখে এসেছে, জুনায়েদ কী পরিমাণ বাইকফ্রিক একটা ছেলে। বাইকের জন্য অষ্টম শ্রেণি থাকাকালীন বাইকের জন্য বায়না ধরেছিলো বিধায় আঙ্কেল-আন্টি যখন দেয়নি তখন জুনায়েদ সোজা সুইসাইড করতে গিয়েছিলো। আজ অব্দি একটা রেইসে সে হারেনি; বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে আর সে অংশগ্রহণ করেনি এমনও হয়নি। এতো এতো টাকা থাকার পরও কখনো সে কার ড্রাইভ করেনা ড্রাইভিং জানলেও। না জানি কত ধরণের বাইক কালেকশন তার গ্যারেজে পড়ে আছে। আর সেই ছেলে রেইস করবেনা? রাফি হতবাক হয়ে বাকিদের দিকে তাকালো। অরিন হাস্যোজ্জ্বল মুখে শুধালো,
— আসতে কতক্ষণ লাগবে ওর?
রাফি দু’পাশে মাথা নেরে বলে,
— ও আসবেনা!
সকলে একযোগে বলে ওঠে,
— হোয়াট?
হৃদ, রুদ্র, অরিন, আয়ান সকলের চোখ গোলগোল হয়ে গেলো। রুদ্র গম্ভীর হয়ে কেবল বললো,
— ছেলেটা পাল্টেছে। ওই মেয়েটা আসার পর ও কেমন যেনো হয়ে গিয়েছে!
আয়ান ও কিছুটা ভাবুক হলো।
— ট্রু, হি লিটার্যালি চেইঞ্জড আ লট। যে কারও কথা কোনোদিন শোনেনা; ঢাকার প্রায় সব পাতিনেতার ছেলেপুলেরা অব্দি ভয় পায় ওর ত্যাড়ামো আর রাগকে সেখানে এই ছেলেকে কীভাবে এমন একটা মেয়ে আটকে রাখতে পারে? ও তো বাসায় থাকার মতো ছেলে নয়। ব্যাপারটা বোধহয় গভীর অনেকটা!
বন্ধুদের এসব কথায় অপরপাশে অরিনে ফর্সা আদল সম্পূর্ণ লাল আভায় ঢাকা পড়ে গেলো। রাগত্ব কারণে পুরে শরীর কাঁপতে আরম্ভ করলো। চোখের মাঝে সীমাহীন ক্রোধের ছায়া।
জুনায়েদ ফোন কেটে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার ফোনখানা টেবিলে রেখে জুসে অধর ছোঁয়ায়। আয়রার উদ্দেশ্যে বলে,
— সিট!
— হু?
জুনায়েদ অকস্মাৎ ফিক করে হেসে ফেললো। ব্যঙ্গ করে বললো,
— আবার হু? ফাহমিদা শেখ বয়রা, প্লিজ টেইক আ সিট।
আয়রার ইচ্ছে হলো কপাল চাপড়াতে। জুনায়েদের হুটহাট কথাগুলো তাকে এতোটা অবাক করে যে সে বুঝে উঠতেই পারেনা কথাগুলো কী তাকে বলা হচ্ছে কি-না। সে বিনাবাক্যে সামনে বসে পড়ে। জুনায়েদ একটি গ্লাসে জুস ঢেলে এগিয়ে দেয় তা আয়রার দিকে এবং ব্রেডে জ্যাম লাগিয়ে দিতে দিতে তীক্ষ্ণ কন্ঠে আদেশ দেয়,
— ফিনিশ ইট। তোমার খাওয়া হলে হসপিটালে যাবো। আমিরাকে ডক্টর দেখানো প্রয়োজন।
অতঃপর পাউরুটিটি সে আগিয়ে দেয় আয়রার প্লেইটে। আয়রা চমকে ওঠে। আজ তার বুঝি চমকানোর দিন? সে তো স্বপ্নেই ভাবেনি যে জুনায়েদ কখনো তার সাথে এতো ভালো করে কথা বলবে। তারওপর…তারওপর–কেও তো কখনো তাকে পাশাপাশি বসে খাওয়ায়নি। না-তো ফারিশ কখনো তাকে সাথে নিয়ে খেয়েছিলো। সর্বদা পরিবারের সকল পুরুষের খাওয়ায় পর সে এবং বাকি রমণীরা খেয়েছে। এসব ভাবনার মাঝেই তার চোখ গেলো গলা চুলকোতে থাকা জুনায়েদের দিকে। সে যেনো ভূত দেখার মতো বিস্মিত হলো। চোখদুটো বড় বড় হয়ে গেলো। ভীত কন্ঠে শুধালো,
— কী হয়েছে এসব আপনার? এগুলো…গালে, ঘারে লাল লাল ছোপ ছোপ দাগ কেনো?
জুনায়েদ ঘাড় চুলকোতে আুলকোতে জবাব দিলো,
— নাথিং সিরিয়াস…..
ততক্ষণে রুহানি সৈয়দ কী যেনো কাজে নিচে নেমেছিলেন। জুনায়েদ-আয়রাকে একত্রে দেখে তিনি তার কাজ সেরে চলে যেতেই নিচ্ছিলেন তবে জুনায়েদের ফর্সা গায়ের রং লালে পরিণত হওয়ায় তিনি থমকে গেলেন। দ্রুত এদিকটা এসে শুধালেন,
— কী হয়েছে? এভাবে রেশ হয়ে গেলো কী করে?
জুনায়েদ উত্তর দেয়না। রুহানি সৈয়দ চিন্তিত হয়ে বললেন,
— আয়রা, তুমি কী জানো কিছু?
আয়রা নিজেও চিন্তিত। ইতেমধ্যেই সে দাঁড়িয়ে উঠেছে। জবাবে বললো,
তাকদীর পর্ব ১৩
— জানিনা, আম্মি। উনি তো কেবল জ্যাম-পাউরুটি খেলেন…
— জ্যাম-পাউরুটি? হায় আল্লাহ! জুনায়েদের তো জ্যামে এলার্জি। ও বলেনি তোমায়? মাঝে মাঝে এই এলার্জি ভীষণ বাজে রূপ নেয়। জুনায়েদ, কী করে খেতে পারলে তুমি জ্যাম? তুমি তো জানতেই!
মাতৃমন উৎকন্ঠায় ভরপুর। আদরের ছেলের এ’অবস্থায় যেনো তিনি হতবাক। অপরদিকে আয়রার মাথায় যেনো ঘূর্ণিঝড় আক্রমণ করেছে। জুনায়েদের জ্যামে এলার্জি? তাহলে সেটা সে আগে বললোনা কেনো? সে তো জানতোই। তাহলে কেনোই-বা জানার সত্ত্বেও খেলো?
