ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩৩
রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি
আষাঢ়ের বিকাল। আকাশে পুরু মেঘের রাজত্ব। মাঝে মাঝে ঠান্ডা বাতাস আসছে দেহের রন্ধ্রে। তালুকদার বাড়ির উঠোনের কাঁঠাল গাছটা ভিজে ভিজে গন্ধ ছাড়ছে। ইখতিয়ার সোফায় বসেছে। সামনে স্নিগ্ধা। মাথা নিচু। হাতে সেই প্যাকেটটা শক্ত করে ধরা।
ইখতিয়ার পানির গ্লাসটা এক চুমুকে শেষ করল। তারপর স্নিগ্ধার দিকে তাকাল। চোখে কোনো রাগ নেই। আছে বড় ভাইয়ের মায়া।
”স্নিগ্ধা , আমার দিকে তাকাও।”
স্নিগ্ধা আস্তে করে মুখ তুলল। চোখে পানি। ইখতিয়ার নরম গলায় বলল।
”আমি তোমাকে বকতে আসিনি। আমি এসেছি তোমার বড় ভাই হয়ে দুইটা কথা বলতে। তুমি আমার নিজের বোন না, কিন্তু আমি আর মুগ্ধা আলাদা নই, সেই হিসেবে তুমি আমারো বোন,আমি তোমাকে সেই চোখেই দেখি।”
স্নিগ্ধা ঠোঁট কামড়ে শুনছে।
”ইশতিয়াককে তুমি চেনো।”
ইখতিয়ার বলল। তারপর কিছুক্ষণ থামল। থেমে থেমে বলল,
”ও আমার ছোট ভাই। ওকে আমি কোলে পিঠে মানুষ করেছি। ওর দুষ্টুমি, ওর আবদার, ওর সব দায়িত্ব আমার। ওর মনটা অনেক ভালো। কিন্তু ও এখনো ছোট। একদম বাচ্চা। ওর মাথায় এখনো পড়াশোনার গুরুত্বটা আসেনি। স্বাভাবিক। মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের ম্যাচিউরিটি অনেক দেরীতে হয়। ও ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চের ছেলে। পরীক্ষার আগের রাতে এসে বলে, ভাইয়া দুইটা সাজেশন দাও। আমি ধমক দেই, আবার নিজেই ওকে পড়াই। কারণ ও আমার ভাই। আমার কলিজা”
ইখতিয়ার হালকা হেসে একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
”আর তুমি? তুমি তো আমাদের গর্ব। তুমি টপার। তোমার রেজাল্টের কথা শুনলে বুকটা ভরে যায়। তোমার সামনে অনেক বড় ভবিষ্যৎ পড়ে আছে । তুমি অনেক বড় হবে। নিজের একটা পরিচয় বানাবা। তোমার মা-বাবা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে।”
”এখন এই বয়সে যদি আমরা একটু ভুল করি, তাহলে পরে কষ্ট হবে। শুধু তোমার না, আমারও।” ইখতিয়ার সামনে ঝুঁকল।
“দেখো স্নিগ্ধা, আমি তোমাকে আঘাত করতে চাই না। তবে তুমি ম্যাচিউর মেয়ে, তুমি বললে বোঝবা। কিন্তু ইশতিয়াক এসবের ধার ধারবে না। আমি চাই তুমি ভালো থাকো। তোমরা ভালো থাকো। ৫ বছর পর যখন ইশতিয়াক নিজের পায়ে দাঁড়াবে, আর তুমিও তোমার জায়গায় পৌঁছাবা, তখন যদি দেখো দুইজনের রাস্তা আলাদা হয়ে গেছে, যদি দেখো ইশতিয়াক থেকে তুমি বেটার ডিজার্ভ করো, তখন কষ্ট হবে। আর সেই কষ্টটা আমি সহ্য করতে পারব না। কারণ তুমিও আমার বোন। তোমার চোখের পানি আমি দেখতে পারব না। আমার ভাইটারেও চিনি। সে যে তোমার প্রতি মারাত্মক উইক আমি আমার বিয়ের সময় থেকে জানি”
স্নিগ্ধার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সে দ্রুত মুছে ফেলল।
”আমি প্রেমের বিরুদ্ধে না স্নিগ্ধা। আমি তোমাদের বাঁধা ও দিব না”
ইখতিয়ার হাত বাড়িয়ে স্নিগ্ধার মাথায় হাত রাখল। “কিন্তু সব কিছুর একটা সময় আছে। এখন তোমাদের সময়টা পড়াশোনার। এখন তোমাদের স্বপ্ন দেখতে হবে ক্যারিয়ারের। এখন মন দেওয়া-নেওয়ার বয়স না। এখন বই খোলার বয়স। হয়তো তুমি ম্যানেজ করে চলতে পারবে, তবে ইশতিয়াক পিছিয়ে পড়বে। তুমি হয়তো কখনোই চাইবে না ইশতিয়াক পিছিয়ে থাকুক”
ইখতিয়ার থেমে গেল। তারও এসব বিষয়ে কথা বলতে অতিরিক্ত অসস্থি হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে কথা বলা জরুরি। ভাইয়া তার স্নিগ্ধার প্রতি অতিরিক্ত পজেসিভ। সে চাইনা তার ভাই কষ্ট পাক। স্নিগ্ধার ভবিষ্যত উজ্জ্বল। এখন হয়তো আবেগের বশে ইশতিয়াক কে তার পার্ফেক্ট লাগছে, যদি ভবিষ্যতে না লাগে। ইশতিয়াক আবারো জোরে শ্বাস নিলো। বলল,
”ইশতিয়াকের দায়িত্ব আমি নিলাম। ওকে আমি ঠিক লাইনে আনব। তুমি শুধু তোমার পড়াটা ঠিক মতো করো। ঠিক আছে?”
স্নিগ্ধা কাঁপা কাঁপা স্বরে সম্মতি দিলো।
”আর শোনো।”
ইখতিয়ার হাসল। বলল,
”আমি ওয়াদা করছি। যেদিন দেখব তোমরা দুজন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছো, ভালো একটা জায়গায় গেছো। তোমরা তোমাদের যোগ্য জায়গায় পৌঁছেছ সেদিন আমি নিজে গিয়ে আম্মাকে বলব। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব ঠিক করব। এইটা আমার কথা।”
”তাই এখন আপাতত সব বাদ। শুধু পড়া। ভালো রেজাল্ট। তারপর দেখা যাবে। কেমন?”
স্নিগ্ধা মাথা নাড়ল।
”জ্বী ভাইয়া।”
”গুড গার্ল।”
ইখতিয়ার উঠে দাঁড়াল। যাওয়ার আগে আবার বলল,
”আমি আবারও কথা দিচ্ছি, যদি তুমি তোমার সাফল্যে পৌঁছেও ইশতিয়াককে চাও, ইশতিয়াক তোমারই হবে। পুরো পৃথিবী যদি বিপক্ষে থাকে তবুও আমি তোমাদের বিয়ে দিব। তবে সাফল্যটা জরুরি। মনে রেখো।”
বলেই সে হালকা করে হাসল। যেন ভারী কথার মাঝে একটু আলো দিয়ে গেল।
কথা শেষ করে ইখতিয়ার উঠে দাঁড়াল। স্নিগ্ধা তখনও মাথা নিচু করে বসা। ইখতিয়ার একবার ওর মাথায় হাত রাখল। কিছু বলল না।
বাইরে আষাঢ়ের বিকাল। মেঘলা আকাশ। বাতাসে ভিজে মাটির গন্ধ। ইখতিয়ার গেটের কাছে রাখা কালো বাইকের কাছে গেল। হেলমেটটা মাথায় দিয়ে চাবি ঘোরাতেই বাইকটা গর্জে উঠল। একবার হর্ন বাজিয়ে সে বেরিয়ে গেল। বাইকটা আস্তে আস্তে ছোট হয়ে এলো। বাঁকের মুখে গিয়ে মিলিয়ে গেল ধুলোর মধ্যে। পেছনে শুধু রয়ে গেল নীরব উঠোন আর জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা স্নিগ্ধা। হাতে ধরা প্যাকেটটা তখনও শক্ত করে বুকের সাথে লেগে আছে।
বাড়ির ভেতর বিকালের আলোটা ধীরে ধীরে মরে আসছে। জানালার কাঁচ বেয়ে শেষ রোদটুকু দেয়ালে লুটোপুটি খাচ্ছে, ঠিক যেন ক্লান্ত কোনো পাখি। লুকিয়ে পড়ছে আপন নীড়ে।
মুগ্ধা নিজের ঘরে টেবিলে বই খুলে বসেছে। সামনে খাতা। কলমটা হাতে, কিন্তু কালি শুকিয়ে যাচ্ছে যেন।
আর মন? মনটা এক সেকেন্ডও বইয়ে বসছে না।
অক্ষরগুলো পাতার উপর কিলবিল করছে পিঁপড়ার মতো। সূত্রগুলো মাথার ভেতর তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে সুতোর জটের মতো। সে একবার চোখ বন্ধ করল। আবার খুলল। তবু মন বসছে না।
বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠছে।
মুগ্ধা জোর করে বইয়ের দিকে তাকাল। কিন্তু চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। মনটা পাখির মতো খাঁচা ভেঙে বারবার শেখবাড়ির প্রতি কোনা উড়ে যাচ্ছে। পড়াশোনা বাদ দিয়ে ডানা ঝাপটাতে ইচ্ছে করছে।
বইটা বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল মুগ্ধা। পড়া হচ্ছে না। হচ্ছে শুধু স্মৃতি। আর বুকের ভেতর একরাশ অস্থির, মিষ্টি অশান্তি।
মুগ্ধা বইটা আবার খুলল। টেবিল ল্যাম্পের নরম আলো পাতার উপর পড়েছে, কিন্তু অক্ষরগুলো যেন ইচ্ছে করেই তার সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে। সে মুখ গম্ভীর করে কলমটা ঠুকঠুক করতে লাগল।
হঠাৎ ভাইব্রেশন শব্দে মোবাইলটা কেঁপে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল— হতচ্ছাড়া কলিং।
মুগ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আজ সকালেই ইশতিয়াকের নাম চেন্জ করেছে সে। কল ধরতেই ওপাশ থেকে নাটকীয় দীর্ঘশ্বাস।
”হ্যালো, শেখবাড়ির সবচেয়ে বড় বউ! বেঁচে আছেন?”
মুগ্ধা ভ্রু কুঁচকে বলল,
”তুই পাশের রুমে। এতটুকু রাস্তা হাঁটতে কষ্ট হয়?”
ওপাশে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এলো।
”কষ্ট হয়। পরীক্ষার আগে শক্তি সঞ্চয় করছি। পরীক্ষা নামক অলিম্পিকে নামব না!”
মুগ্ধা হেসে ফেলল।
”নাটক কম কর পিও। কী মরতে কল দিছোস? কী চাই?”
”উহু মুরুব্বি, একটা জরুরি প্রশ্ন আছে।”
”বল।”
হি তুলল মুগ্ধা। ইশতিয়াকের সাথে জরুরি শব্দটা বেমানান। এখুনি কোন আজগুবি গল্প বলবে। আর মুগ্ধার রাগ বাড়বে।
”বই খুললে ঘুম আসে কেন?”
মুগ্ধা এমন কিছুই আন্দাজ করেছিল। মনে চাইল ছেলেটারে দেয়ালে ঠুকে দিতে। তা কি আর হওয়ার? স চোখ উল্টে বলল,
”কারণ তোর আর বইয়ের মধ্যে জন্মগত শত্রুতা আছে।”
”এই জন্যই তোকে ফোন দিলাম। শত্রুতা মিটিয়ে দে না ভাই।”
আকুতি ভরা স্বর ভেসে এলো ইশতিয়াকের। মুগ্ধা জোরে শ্বাস নিয়ে বলল,
”আমারে কী জাতিসংঘ মনে হচ্ছে? ”
”না। তুই তো ‘পড়াশোনা বিষয়ক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। তুই শান্তিতে নোবেল পাওয়া ইউনুস দাদু”
মুগ্ধা হো হো করে হেসে উঠল। ঠিক তখনই ওপাশ থেকে একটা হাই তোলার শব্দ। মুগ্ধা চোখ কুঁচকে নিলো। সন্দেহ করে বলল,
”এই যে! পড়ার বদলে ঘুমাচ্ছিস?”
”না না। আমি বইয়ের সঙ্গে আবেগের আদান-প্রদান করছি।”
”মানে?”
”আমি তাকিয়ে থাকি, বইও আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। কেউ কাউকে বিরক্ত করি না।”
মুগ্ধা কপালে হাত ঠেকাল।
”তুই একটা বিরাট অপদার্থ।”
”ধন্যবাদ। এই সার্টিফিকেটের জন্যই তো বেঁচে আছি।”
দুজনের কথোপকথন যেন বর্ষার ছাদের টুপটাপ শব্দের মতো—একটার পর একটা পড়েই চলেছে।
মুগ্ধা এবার গম্ভীর হওয়ার ভান করল।
”শোন, আর একদিনও নষ্ট করলে পরীক্ষায় শূন্য পাবি।”
”অসম্ভব।”
তড়িৎ জবাব এলো ইশতিয়াকের।
”কেন?”
”শূন্য পাওয়ার জন্যও তো কিছু লিখতে হয়! সেটা লেখার জন্য তো পড়তে হবে, আমি পড়ব না”
মুগ্ধার হাসির শব্দ পুরো ঘর ভরে দিল।
”আল্লাহ! তোর মতো নমুনা আমি জীবনে দেখি নাই ভাই। তুই অন পিস”
ইশতিয়াক গলা খাঁকারি দিল।
”এই নমুনাই একদিন ইতিহাস হবে।”
”একদম!”
দুজন আবার হেসে উঠল। হঠাৎ ইশতিয়াক ফিসফিস করে বলল,
”ভাবি…”
”হুম?”
”একটা কথা বলি?”
”বল।”
”তুই না থাকলে পড়তে একদম ভালো লাগে না রে।”
মুগ্ধা অবাক হয়ে গেল। পরক্ষণেই ছেলেটা বলে উঠল,
”কারণ তোকে খোঁচা না দিলে আমার পড়া মুখস্থ হয় না রে!”
”হারা’মজাদা একটা!”
বলেই বালিশটা তুলে পাশের দেয়ালে ছুড়ে মারল মুগ্ধা। চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে বলল
”বা’ল ফোন রাখ, নয়তো তোর ভাইয়ার কাছে নালিশ দিব”
”ভাইয়া বিশ্বাস করবে না ”
”অবশ্যই করবে ”
ইশতিয়াক বিছানায় শুয়ে পড়ল। এক হাতে ফোন কানে ধরল। অন্য হাত দিয়ে চোখ আড়াল করল। বলল,
”হ তা তো করবে ,ভাইয়ারে এখন তুই জাদুটোনা করেছিস, ভাইয়া কি আর বউ রেখে আমার কথা ভাববে? বিয়ের পর সবাই পাল্টে যায়, ভাইয়া ও গেছে, ভাইয়ের থেকে বউ আপন, হায়! হায়রে দুনিয়া!”
কষ্ট পাওয়ার ভঙিতে বলল ইশতিয়াক। মুগ্ধা সবটা চুপচাপ শুনল। তারপর সেও আরাম করে বসল।
হালকা ব্যাঙ্গার্থ হেসে বলল,
”কি বলেন তো দেবরজি, আমার ফোনে না অটোমেটিক কল রেকর্ড চালু আছে, আপনার ভাইয়া আসলে আপনার এই দুঃখের কথা শোনাই? কি বলেন?”
ইশতিয়াক তরফর করে উঠে বসল। চোখ তার ছানাবড়া। এ মেয়েরে তার বিশ্বাস নেই।
”আস্তাগফিল্লাহ, নাউজুবিল্লাহ, মাফ করেন ভাবিজান ”
ফোন রেখে দিলো ইশতিয়াক। মুগ্ধা থতমত খেল।
মুগ্ধা কিছুক্ষণ মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মাথা নেড়ে নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
”আল্লাহ… হতচ্ছাড়া একটা ”
রাত তখন প্রায় দশটা পেরিয়েছে।
সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে শেখবাড়িটা যেন ধীরে ধীরে নীরবতার চাদর গায়ে জড়িয়ে নিয়েছে। উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো আমগাছটা আষাঢ়ের বাতাসে দুলছে। পাতার সঙ্গে পাতার মৃদু ঘর্ষণে এমন এক শব্দ উঠছে, যেন প্রকৃতি নিজেই রাতকে ঘুমপাড়ানি গান শোনাচ্ছে। দিনের সমস্ত কোলাহল যেন রাতের অন্ধকারে গলে গিয়ে একরাশ প্রশান্তি হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
কালো বাইকটার ইঞ্জিনের গম্ভীর গর্জন নিস্তব্ধ রাতটাকে আলতো করে ছুঁয়ে গেল।
শব্দটা মুগ্ধার কানে পৌঁছাতেই বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে নড়ে উঠল। যেন বহু প্রতীক্ষিত কোনো পাখি আপন নীড়ে ফিরে এসেছে। বইয়ের পাতায় চোখ থাকলেও মন অনেক আগেই জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। কলমটা নিঃশব্দে খাতার উপর গড়িয়ে পড়ল।
জানালার ফাঁক দিয়ে তাকাতেই দেখা গেল, গেট খুলে ভেতরে ঢুকছে ইখতিয়ার। সারাদিনের কাজের ক্লান্তি কাঁধে ঝুলে আছে, তবুও হাঁটার ভঙ্গিতে সেই পরিচিত স্থিরতা। শার্টে দিনের ধুলোর ছাপ, কপালে ঘামের শুকিয়ে যাওয়া রেখা, তবু মুখে একটুকরো শান্ত হাসি—যেন দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অবশেষে নিজের আশ্রয়ে ফিরেছে।
মুগ্ধার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসি কারও দেখানোর জন্য নয়; নিজের অজান্তেই হৃদয়ের ভেতর থেকে উঠে আসা এক টুকরো আলো।
ইখতিয়ার ভেতরে এলো। তার চোখ যেন একবার সিঁড়ির দিকে খুঁজে নিল কাউকে। সিঁড়ির বাঁকে দাঁড়িয়ে ছিল মুগ্ধা। মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখে চোখ পড়ল। কোনো শব্দ হলো না। না কোন ইশারা।
তবু সেই নীরবতায় দিনের সমস্ত অপেক্ষা যেন গলে গেল। মুগ্ধা দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল। মনে হলো, বুকের ভেতর জমে থাকা লাজুক অনুভূতিগুলো একসঙ্গে ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে।
রাতের খাবার শেষ হতে হতে বাড়ির আলোও যেন ধীরে ধীরে নিভে এল। একে একে সবাই নিজেদের ঘরে চলে গেল। করিডোরে আর কোনো শব্দ নেই। শুধু দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দটা নিস্তব্ধতার বুক চিরে সময়ের হিসাব কষছে। ঘরে ঢুকতেই জানালার পাশে রাখা সাদা পর্দাটা বাতাসে দুলে উঠল। বাইরে আকাশে মেঘের আড়াল ভেঙে আধখানা চাঁদ উঁকি দিয়েছে। সেই আলো এসে বিছানার সাদা চাদরের উপর রূপালি রেখা এঁকে দিল।
মুগ্ধা টেবিলের বইগুলো গুছিয়ে রাখল। কলমটা বন্ধ করে খাতার উপর রেখে ধীরে ধীরে আলোটা একটু ম্লান করল। ঘরের আবহ মুহূর্তেই বদলে গেল। উজ্জ্বলতা সরে গিয়ে চারদিকে নেমে এল কোমল এক শান্তি। এতক্ষনে কাছে পেল সে তার প্রিয় মানুষটিকে।
ইখতিয়ারও দিনের শেষ কাজগুলো সেরে জানালার পাশে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে বৃষ্টিভেজা বাতাস এসে মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছিল। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে বিছানার দিকে এগিয়ে এল।
এই ঘরটায় কোনো আড়ম্বর নেই। তবু অদ্ভুত এক উষ্ণতা আছে। দুজন মানুষ যখন একই ছাদের নিচে দিনশেষের ক্লান্তি নামিয়ে রাখে, তখন সেই সাধারণ ঘরও যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে।
মুগ্ধা বিছানার একপাশে চুপচাপ শুয়ে পড়ল। মাথার নিচে বালিশ, বুক পর্যন্ত টেনে নিল পাতলা চাদর। মুখটা সামান্য অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখলেও চোখের কোণে লাজুক এক হাসি লুকিয়ে রইল।
ইখতিয়ারও পাশে শুয়ে পড়ল।
কথা খুব বেশি হলো না। উহু! হলোই না একপ্রকার।
দিনভর যারা একে অপরের কথা ভাবতে ভাবতে সময় পার করে, তাদের সব অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার দরকার হয় না। অনেক সময় নীরবতাই সবচেয়ে বড় আলাপ হয়ে ওঠে।
ইখতিয়ার মুগ্ধা টেনে নিজের বক্ষদেশে আনল। জড়িয়ে ধরল পরম আবেশে। মুগ্ধার চোখ বন্ধ করে নিলো। এতক্ষনে শান্তি শান্তি লাগছে। পাড়ি জমাল ঘুমের দেশে।
জানালার বাইরে হালকা বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছে। টিনের চালে টুপটাপ শব্দ পড়ছে। সেই শব্দে যেন রাত ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে উঠছে। বাতাসে ভেসে আসছে শিউলি আর ভেজা মাটির মিশ্র গন্ধ। দূরের কোনো গাছ থেকে রাতজাগা পাখির ক্ষীণ ডাক ভেসে এলো, আবার মিলিয়েও গেল।
ইশতিয়াক বসে আছে ব্যালকনিতে। হাতের মুঠোয় ফোন। সে কতবার কল দিল স্নিগ্ধাকে ধরলোই না মেয়েটা। হয়তো পড়ছে! তাই বলে ফোন ধরবে না? দুটো বাজতে চলল। ইশতিয়াক ফোন সামনে এনে সময় দেখল। একটা বায়ান্ন। অনলাইনে দেখাচ্ছে স্নিগ্ধাকে। তবে ফোন ধরছে না যে।
ইশতিয়াকের আকাশকুসুম ভাবনার মাঝে ফোন বেজে উঠল তার। ইশতিয়াক তড়িঘড়ি করে ধরল। স্নিগ্ধা ফোন দিয়েছে। ফোন ধরা মাত্রই একপ্রকার চেঁচিয়ে উঠলো সবসময়ের হাসিখুশি ইশতিয়াক।
”কী ব্যাপার? এতবার কল দিচ্ছি ফোন ধরা যায় না? একটা ম্যাসেজ তো দিতে পারতা যে পড়তেছো। টেনশন হয়না আমার? এতক্ষন জেগে বসে আছি একটু কথা বলার জন্য”
থামল ইশতিয়াক। স্নিগ্ধা কিছু বলছে না। ঠোঁট কামড়ে ধরে আছে। শুধু নিঃশ্বাসের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। স্নিগ্ধার কোন প্রতিক্রিয়া না পেয়ে ইশতিয়াকের মেজাজ গরম হলো। আবার বাজখাঁই করে বলল,
”কি হলো? বোবা হয়ে গেছো? মানুষ মনে হচ্ছে না আমায়? না আমারে আর পছন্দ হচ্ছে না?”
মেয়েটা আর পারল না। ফুঁপিয়ে উঠল। স্নিগ্ধার কান্না স্বর পেতেই নরম হলো ইশতিয়াক। তবে ধরা দিলো না। উল্টো বলল,
ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩২
”সবসময় কাঁদলে রেহাই পাবা না, আমি আর গলব না”
স্নিগ্ধা ওসব কিছু শুনল না। সে ঠোঁট কামড়ে কান্না ঠেকাল। কানে ফোন চাপল।
ফিসফিস করে কান্নামিশ্রিত স্বরে বলল,
”আই লাভ ইউ ইশতিয়াক ভাইয়া, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি, অনেকক”
