তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২৩
নীতি জাহি৩
এক মাস পর শাহাদাত সাহেব যখন ফিরলেন তখন থেকেই সংসারের নতুন রূপ দেখলেন। ইমরান বেশির ভাগ সময় অন্যমনষ্ক। ইশতিয়াক তখন মাত্র কলেজে। ইমরানের মা স্বামীর চিন্তায় শয্যাশায়ী। ঠিক তখনই চারদিকে নতুন নিউজ ভাইরাল হলো অভিনেত্রী কাঁকন সেপারেশনে যাচ্ছে সাবেক এমপি পুত্র ইমরানের সাথে। বাঁজ পড়ার মত কানে লাগলো কথাটি। সন্ধ্যায় বাড়িতে সবাই মিটিং এ বসে এটা নিয়ে, কাঁকন স্পষ্ট জানিয়ে দেয় ওর সন্তান প্রয়োজন নেই।এসব দায়িত্বে ও থাকতে চায় না। মুক্তি প্রয়োজন ওর। সেদিন ইমরান কাঁকনের পায়ে ধরেছিলো যেন দুধের বাচ্চাকে ছেড়ে না যায়। এমন একটা মানুষ কারো পায়ে পড়তে পারে এটা বিশ্বাস করতেও খারাপ লাগে। কাঁকন শাহাদাত সাহেবকে দূর্নীতিবাজ সহ আরো অনেক অপমান করে বাড়ি ছেড়ে দেয়। শাহাদাত সাহেব স্ট্রোক করে সেদিন রাতেই গত হয়েছিলেন। মাস ছয়েক পর ইমরানের মা ও ব্রেইন স্ট্রোক করে। ইমরান,ইশতিয়াক আর আইরিন তিন ভাই বোন বাবা মা হারিয়ে নিঃস্ব আর ইশান মা থাকতেও মা হারা। এর মধ্যেই আলাদা হয়ে যায় কাঁকন এবং ইমরান।
মোনা উঠে বসলো।
‘ আচ্ছা চাচী বুয়েটের ঘটনা তো বললে না, উনার আবার কাম ব্যাক করার ঘটনা ও তো জানিনা।’
‘ তোর নয়ন আংকেল সব জানে, বাকি টুকু আমার অজানা। চলে যা খুলে বলবে।’
যেই ভাবা সেই কাজ। সালমা মেখে ভাত খাইয়ে দেয়। এরপর কোনো রকম রেডি হয়ে বের হয়ে যায় নয়নের উদ্দেশ্যে।
টেবিলে বসে পেপার ওয়েট নিয়ে খেলছে মোনা। কাচের পিরামিড আকৃতির পেপার ওয়েট। নয়ন মিটিং এ আছে। তাই নয়নের কেবিনে বসে আছে মোনা। এমন সময় মিটিং শেষ করে কেবিনে ঢুকে একটা মিষ্টি হাসি দিলো নয়ন।
‘ কি ব্যাপার আজ যে শাহজাদীর পদ ধূলি পড়লো এই প্রজার কেবিনে।’
‘আংকেল এভাবে বলো না।’
‘তুই আংকেল বললে আমার হাসি পায়।’
‘ওমা কেনো?’
‘ইমরানের বউ হলে তোকে আমি ভাবী ডাকতাম।’
গোলুমলু গালগুলো ইষৎ রঙিন হলো।নয়ন আংকেল সবসময় মজা নেয়।এ মানুষ টা খুব সাপোর্ট করে মোনাকে। রিক্তা আন্টিও মাঝে মাঝে মজা করে।
‘ আংকেল একটা কাজে এসেছি,তোমার বুয়েটের বন্ধুর ডিভোর্সের পরের কাহিনি শুনাও।’
‘ আমার তো বুয়েটে অনেক বন্ধু,আপনি কোন বন্ধুর কথা বলছেন ভাবী?’
‘আংকেল প্লিজ,আমি কয়টা বন্ধুকে চিনি তোমার তুমি জানো না?’
‘ওও তাই তো, আপনার ইমরান সাহেব! আমি তো ভুলেই গিয়েছি। হঠাৎ আজ এটা জানতে মন চাইলো কেনো?’
‘তুমি বলোই না বাকি কথা পরে বলব প্লিজ।’
‘আমরা এখন যে ইমরানকে দেখেছি ইমরান মোটেও এমন ছিলোনা। হাস্যোজ্জ্বল ,মজা মাস্তিতে ভরা একটা ছেলে ছিলো। আংকেল আন্টি চলে যাওয়ার পর আইরিন আপা ইশানকে দেখতে এক বছরের মত বাবার বাড়িতে ছিলো। এরপর ওদের বাড়িটা আংকেল এর লোন এর টাকা শোধ করতে বিক্রি করে দেয়।দুলাভাই অসুস্থ হওয়াতে ইমরান জোর করে আপাকে শ্বশুরবাড়ি পাঠায়। সোহান থাকতো ওদের সাথে। ওর স্কুল ঢাকাতে ছিলো। ইমরান,সোহান এবং ইশতিয়াক একটা বাসা ভাড়া করে উঠে যায়। তখন নতুন একজন লোক রাখে রুবিনা নাম, ইশান এর জন্য। এখনো রুবিনা ইমরানের বাড়িতে আছে। ঘরের সদস্যের মত। ইমরান নিজে তো আছেই ছেলের পেছনে। সারাদিন বাইরে কাজ করে,তখন ও একটা ইলেকট্রনিকস কোম্পানিতে পার্ট টাইম জব করতো। কাজ শেষে ইশানকে খাওয়ানো,দেখাশোনা করা সব করতো। বাচ্চাকে মা ছাড়া রাখা যে কত কষ্ট সেটা ইশানকে না দেখলে বুঝতে পারতাম না। কত রাত ঘুমায় নি ইমরান। বাচ্চাদের জিনিসের দাম বেশি।ইশানের জন্য বেবি ফুড থেকে শুরু করে ডায়াপার পর্যন্ত সব আনতে ওর টাকা ফুরিয়ে যেত। এরপর ছিলো মাথার উপর ছোট ভাইয়ের দায়িত্ব। ইশতিয়াক সবে কলেজে। ইশান বড় হচ্ছে। পার্ট টাইম চাকরির পাশাপাশি টিউশন পড়ানো শুরু করে। ইমরান কখনো অভাব বুঝেনি নিজের বেলায় কিন্তু তার ছেলে এসে অভাব পাবে এই ব্যাপারটা সে মেনেই নিতে পারছিলো না। তাই সাধ্যের মধ্যে সব টুকু করেছে ছেলের জন্য। ইশানটাও না অদ্ভুত বাচ্চা। রুবিনার সাথে সারাদিন খেলতো। একদম জ্বালাতোনা,মনে হয় যেন ও বুঝে ওর বাবা আসলে ওকে আদর করবে।সারাদিন ওকে ভালো বাচ্চা হয়ে থাকতে হবে। দিনশেষে বাসায় ফিরে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ঘুমাতো ইমরান। পড়াশোনা শেষ করা জরুরী। এতদিনে একটা ভালো চাকরিও জোগাড় করে। মাস্টার্স এর জন্য আবার বুয়েটে এডমিশন নেয়। এরপর আংকেলের কেইস রি-ইনভেস্টিগেশন এর জন্য এপ্লাই করে।মাথায় এবার রাজনীতির ভূত শক্ত পোক্ত ভাবে গেড়ে বসেছে ওর। এর মধ্যে ও বুয়েটে ইলেকশন করে দু দু বার। দু বারই হেরে যায়। দমে যায় নি।
কি যেন ভেবে নয়ন বললো,
সবাই জানে ইমরানের পাওয়ার উপর অবধি। বিবাহিত জানার পর ও মেয়েরা ওর পেছনে লাগতো। এতদিনে ইমরানের সব কিছুতে পরিবর্তন। প্রয়োজনে সে গম্ভীর, আবার আনন্দের সময় সে সদা হাস্যোজ্জ্বল। মেয়েদের সাথে খুব একটা কথা না বললেও যাদের সাথে বলতো কিভাবে যেন মেয়েগুলো তার ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে যেত। মেয়েরা ওর জন্য রান্না করে নিয়ে আসতো। ও সেটা খেয়ে হাসি মুখে বলতো,খুব ভালো হয়েছে। এই কমপ্লিমেন্ট পেয়ে খুশিতে গদগদ হয়ে আরো বেশি খাবার নিয়ে আসতো।একবার প্রশ্ন করেছিলাম,
‘ জঘন্য খানা গুলোর এরম রিভিউ দেস কেন?আবার খাস ও।’
ওর উত্তর ছিলো,
‘এখনই খারাপ বললে দমে যাবে, আমি খেয়ে ভবিষ্যৎ জামাই গুলার উপকার করে দিচ্ছি।প্রতিদিন করতে করতে শিখে যাবে।’
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ওকে দেখি। বাপরে কোন লেভেলের জনসেবা। পরক্ষনে জিজ্ঞেস করলাম,
‘তুই ফ্লার্ট করছিস ওদের সাথে?’
ইমরান হাসে আর মাথা নেড়ে বলে,
‘উহু এটা প্রয়োজন। ওরা ইশান থাকার সত্ত্বে ও আমাকে চায়। একজন দুজন তো নয়,প্রায় অনেক মেয়েই কাজটা করে। তাই সবার প্রশংসা করি যেন কেউ নিজেকে স্পেশাল না ভাবে। কি দরকার নিজের জনপ্রিয়তা নষ্ট করার।পরে কাজে লাগবে।’
শুধু মেয়েরা ওর জন্য ব্যকুল ছিলো তা নয়। জুনিয়র ছেলে গুলাও ইমরান ভাইয়ের সান্নিধ্যে কাজ করতে পেরে বেশ আনন্দিত থাকতো।পরে বুঝতে পারলাম এটাই ইমরান। কিছু পেতে হলে কষ্ট করতে হয়।
বুয়েটে তৃতীয় বার নির্বাচনে ও জিতে যায়। লাইফের টার্ন ওভার শুরু তখন থেকে।
বই পড়তে পছন্দ করতো। মাঝে মাঝে ইশানকে নিয়ে লাইব্রেরিতে যেত,বুয়েটে যেত। ইশান দুই বছর থেকে বাবার সাথে বুয়েটে যায়। ছেলের প্রতি এত কেয়ারিং দেখে টিচারদের ও ওর প্রতি সফট কর্ণার ছিলো। কয়েকবার নির্বাচনে বুয়েটের ভিপি হয়। জয়েন করতে অফার করে বুয়েটে শিক্ষক হিসেবে। কিন্তু নাকোচ করে দিয়েছিলো। ও ভিপি থাকা অবস্থায় বুয়েটের অনেক কিছুই চেঞ্জ করেছিলো। এখনের বুয়েট আর আগের বুয়েট অনেক ফারাক। আগে বুয়েটে ঝামেলা কম ছিলো। একটাই বড় ঝামেলা হয়েছিলো প্রকাশকে নিয়ে।তাতো জানোই। এই ছিলো বুয়েট স্টোরি।
যেটা গুরুত্বপূর্ণ এবার সেটা বলি, শুনো মামনি এবার যা বলব তা আমি,তোমার বাবা ছাড়া আর কেউ জানে না।আমার মনে হয় তোমাকে জানানো প্রয়োজন। রি- ইনভেস্টিগেশন কেইস টা নন এপ্রুভড হয়ে ফিরে আসে। যেহেতু ইমরান পলিটিক্যাল ব্যাক গ্রাউন্ড থেকে এসেছে সে অনেক ইনফরমেশনই জানতো। ওই বয়সে সব চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং কাজ শুরু করে ও। পাওয়ার হচ্ছে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।ওর সব ডিল হয় বর্ডার টু বর্ডার। বেশির ভাগ মিটিং পি এম টু হোম মিনিষ্টার নিজে ডিল করে। ‘
‘ মানে কি? কিসের এমন বিজনেস যে পি এম পর্যন্ত ডিল করে? আপনাদের না বায়িং হাউজ,গার্মেন্টস??’
‘বাকি যেসব বিজনেস আছে ওগুলা ওর শখের বশে করা।বিকাশের কি হয়েছিলো জানো?
‘কোথায় বিকাশ?’
‘পাবনাতে, মেন্টাল এসাইলামে।’
সেদিন চাইলেই বিকাশকে গুলি করতে পারতো। কিন্তু সে চায়নি তার ওই রূপ তুমি দেখো। ওর কাছে সবসময় লাইসেন্স করা গান থাকে। সরকার থেকে প্রটোকল থাকে। ওর যে দুইটা বডিগার্ড আছে ওরা গভর্নমেন্ট অফিসার। ইমরান নিজেও ওয়েল ট্রেইনড শ্যুটার। বুঝতে পারছো কি নিয়ে ওর ব্যবসা!!! A K 47, M 1 GARAND, M-G 42 হলো ওর বিজনেস প্রোডাক্ট। সময় লেগেছিলো অবস্থা চেঞ্জ করতে কিন্তু ও আজ সফল। আংকেল এর কেইস রি-ওপেন হয়েছিলো। আংকেল নির্দোষ ছিলো। বাবার সম্মান ফিরিয়ে এনেছিলো ইমরান। ওকে তো যারা জানে তারা কিং ডাকে। জানো কাঁকন এর প্রেজেন্ট হাসবেন্ড কে?
‘কে?’
‘আংকেল এর অপজিশন পার্টির ছেলে জারিফ। বয়স বেশি না। কাঁকনের সমবয়সী। কাঁকন কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলো।শুনেছি এখন নাকি সেপারেশনে আছে।কয়েকদিনের মধ্যে ডিভোর্স হবে।আবার সে চাচ্ছে ইমরানের কাছে ফিরতে। মোনা যদি পারো ইমরানের সাথে যোগাযোগ করো। ইশানের দিকে তাকিয়ে যদি কাঁকনকে মেনে নেয় তাহলে ইমরানের জীবনটা শেষ হয়ে যাবে। বুয়েটের এত মেয়ে ওর জন্য পাগল ছিলো।এই কাঁকন কাঁকন করে কত মেয়েকে কষ্ট দিয়েছে। বিয়ে করার বয়সে ছেলে পেলেছে।নিজের জীবনে একাকিত্বকে সঙ্গী করেছে।আমি ভাবতেই পারিনি ইমরান আবার কাউকে ভালোবাসবে। তুমি কতটা ভাগ্যবতী তুমি জানোই না। মায়া মানে তোমার ফুফি ও কম পাগলামি করে নি। তোমাকে ভালোবাসলো তুমি অবিশ্বাস করে দূরে ঠেলে দিলে। এই অভিমান ভাঙাও মোনা।আমি সবসময় পাশে আছি। মিনহাজ ভাইকে আমি বুঝাবো।’
‘ বাবা রাজি হবে না’
‘ইমরানকে কতটা চাও?’
‘আংকেল, বাবার পর যদি কাউকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি সেটা ইমরান সাহেব। প্রতিটি মোনাজাতে উনাকে চাই। জানো, আমার প্রতিদিন ইশানের সাথে কথা হয়।’
‘গ্রেট।ওকে দেশে আনানোর ব্যবস্থা করো’।
‘আমি কিভাবে?’
নয়ন কিছু একটা ভেবে বলে।ওকে এই দায়িত্ব আমার।
‘আংকেল তোমার এই বন্ধুকে ভয় লাগছে।এত ইনফ্লুয়েনশিয়াল একজন মানুষ আমাকে কি আর ভালোবাসবে!!এর মধ্যে আমি কত বড় আঘাত করেছি। গত দু বছরে আমার মুখদর্শন করার আগ্রহ তার মধ্যে প্রকাশ পায়নি।সে কি বুঝে না আমার কত কষ্ট হয়। তুমি একটু বলে দিও।’
মেয়েটা চোখের সামনে বড় হয়ে গেলো। নয়ন মাথায় হাত দিয়ে বললো,
‘বাসায় চলেন ভাবী,আমি সব দেখছি।’
‘আবার…’
নয়ন হো হো করে হেসে উঠলো। বাসায় নামিয়ে দিলো মোনাকে। এবারের দায়িত্বটা অনেক বড়। বন্ধুর জীবন সাজানোর দায়িত্ব। এবার যে করেই হোক মোনাকে ইমরানের জীবনে প্রবেশ করিয়েই ছাড়বে ও। এট এনি কস্ট।
মোনা বাবার মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে৷ গতকাল রাত থেকে জ্বর মিনহাজের। জ্বরের ঘোরে আবোল তাবোল বকছে। বাড়ির সবাই অনেক চিন্তিত। বাবার এই অবস্থায় মোনা ও কুঁকড়ে গিয়েছে। পিতা মাতা হীন সন্তান এই নশ্বর দুনিয়াতে বোঝা সমতুল্য। ডাক্তার এসে দেখে গিয়েছে। নয়ন একবার এসেছিলো সন্ধ্যায়। রাত একটা পঞ্চাশ হতে হতে জ্বর ১০৫ ডিগ্রি। মোনা নয়নকে জানাতেই নয়ন যত দ্রুত সম্ভব আসে। ডাক্তার বলেছে হাসপাতালে এডমিট করতে নতুবা যেভাবেই হোক জ্বর নামাতে। জ্বরের উত্তাপে যেকোনো মুহুর্তে দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। সাধারণত এই জ্বরে শরীরের অন্য অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে,এছাড়া খিচুনী ও উঠতে পারে। মোনা নয়ন এবং মনসুর তিনজন মিলে মিনহাজকে গোসল করিয়ে দেয়। ভোরের দিকে জ্বর ১০১ এ নেমে আসে। পুরো রাত ধকল গিয়েছে। মনে হচ্ছিলো হাসপাতালে জ্বর না কমিয়ে নিতে গেলেও বিপদ হবে,রাস্তায় যে কোনো দূর্ঘটনা ঘটতে পারতো। সকালে ডাক্তার এসেছে এবং স্যালাইন লাগিয়ে দিয়ে গিয়েছিলো, শেষ হলে তরল খাবার খাওয়াতে বলা হয়েছে। খাবার মুখে তুলতে কষ্ট হচ্ছে। মোনা বাবাকে সুপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। এখন ঘড়িতে সাড়ে এগারোটা বাজে।
‘বাবা একটু চেষ্টা করো। না খেলে তো তুমি আরো অসুস্থ হবে।’
মিনহাজ মেয়ের মুখে যত্ন নিয়ে এত কথা দু বছর পর শুনছে। মেয়েটাকে ও ভেতরে ভেতরেই শেষ করে দিয়েছে। মেয়ের দিকে তাকালে ওর মাইশার কথা মনে পড়ে। কথা দিয়েছিলো মেয়েকে ভালো রাখবে। কিন্তু এমন একটা পরিস্থিতি হলো সে চাইলেও মেয়েকে ভালো রাখতে পারছে না। ওপারে মাফ করবে মাইশা মিনহাজকে!
‘ আমার খেয়াল কে রাখে? গত দু বছর কিভাবে আছি কেউ একবার জিজ্ঞেস করেছে?’
বাবার কন্ঠে স্পষ্ট অভিমান।মোনা ফিচলে হাসলো।ভাবছে বাবা মেয়ের দূরত্ব অনেক বেড়েছে।এবার ওটা শেষ করতে হবে। মিশন না হয় ওখান থেকেই শুরু হোক।
‘ বাবা, মেয়েরা বাবাদের খেয়াল সবসময় রাখে শুধু দেখার ভুল এই যা। তুমি খেয়ে নাও। কথা বাড়াবেনা।’
‘আমাকে মাফ করে দে মা, পরিস্থিতি টাই এমন। মায়াকে দেখেছিস।কেমন পাগলামী করে। ও তোকে আঘাত করে আমি দেখেও চুপ থাকি।’
‘বাদ দাও না বাবা’
মিনহাজের কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। এবার যদি মরে যায় মেয়েটার কি হবে। কে দেখে রাখবে। ওর তো এই দুনিয়াতে কেউ নেই।যারা আছে তারাই বা কদিন আগলে রাখবে।মায়ার ব্যবহার খুব একটা সুবিধার নয়। গতমাসে রাতে যেভাবে মোনার গলা চেপে ধরেছিলো, মনে হয়েছিলো সেদিনই মেয়েটার অন্তিমদশা করে ছাড়বে। ছোট বোন বলে কিছুই বলতে পারেনা।
‘শুনেন উকিল আমার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডিভোর্স চাই।’
‘ম্যাডাম বললেই তো হয় না।এর মধ্যে আপনার হাসবেন্ড একজন এম পি পুত্র। তার বিরুদ্ধে আপনি যে অভিযোগ এনেছেন তা তো সত্যি নয়,এছাড়া সত্যি হলেও এটা প্রমান করা যাবে না।’
‘আমি আমার আগের স্বামী সন্তানের কাছে ফিরতে চাই।যা লাগে দিব আপনাকে। আপনি আপনার কাজটা ঠিক ভাবে করুন।’
কাঁকন ধমক দিয়ে বেরিয়ে গেলো উকিলের চেম্বার থেকে। এসব দুদিনের নায়িকার কত ঢং যে দেখেছে সে। এই মহিলা সাবেক এবং বর্তমান এমপি পুত্রদেরই কেন ধরে বুঝিনা। নেহাৎ ইমরান সাহেব ভদ্র লোক।নাহয় এই মহিলা একদিন ও সংসার করতে পারতোনা। কদর বুঝলোনা। এখন আসছে আবার উনার কাছে ফিরতে,বেহায়া মহিলা।
কাঁকন গাড়িতে উঠেই ইমরানের ফোনে কল করলো। সে জানে ইমরান তাকে বরাবরের মত ব্লক লিস্টে রেখেছে। সে ও বা কম কি,বার বার চেষ্টা করবে। একবার ইমরান দেশে আসলেই কাজে নেমে পড়বে। এত ভালোবাসে সে কাঁকনকে কিছুতেই রাগ করতে পারবেনা। কাকন এর এখন নিজের উপর রাগ হচ্ছে।সে কি করে ইমরানকে ছেড়ে ওই জারিফকে বিয়ে করলো। যার মধ্যে চেহারা ছাড়া আর কোনো কোয়ালিটি নেই। মদ খেয়ে মা/তা/ল হয়ে রাতে মেয়ে নিয়ে আসে। প্রেম করে হাজার টার সাথে। এভাবেই তো ফাঁসিয়ে ছিলো কাঁকনকে।
মোনা আর সালমা বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছে। মায়া পাশের চেয়ার টা টেনে খেতে বসেছে। মায়ার ছেলেকে খাওয়াচ্ছে নিজেও খাচ্ছে। ছেলেটাও হয়েছে মায়ের মত সুন্দর।দেখলেই আদর লাগে। মোনাকে একদম কোলে নিতে দেয় না মায়া। মাঝে মাঝে মোনার খুব কান্না পায় ফুফুর এই ব্যবহারে। দুপুরে খাবার শেষে আবার বাবার কাছে আসে। মিনহাজ সবাইকে ডেকে পাঠালেন তার রুমে যেতে। সবাই এখন তার রুমে।
‘ মনসুর…’
‘জ্বি ভাইয়া।’
‘আমি কদিন বাঁচবো জানিনা। শরীরটা ভালো ঠেকছে না। আমি না থাকলে আমার মেয়েটাকে নিজের মত করে দেখে রাখবি ভাই?’
মনসুর তড়িঘড়ি করে ভাইয়ের পাশে গিয়ে বসলো।হাত চেপে বললো,
‘কি বলো এসব।কিছু হবে না তোমার। আর মোনা মায়ের জন্য আমরা সবাই আছি।’
‘মায়া’রে তোর জন্য ভয় লাগে আমার। তুই আমার মেয়েটাকে মেরেই ফেলবি।’
কলিংবেল বেজে উঠলো হঠাৎ। সালমা দেখছি বলে দরজা খুলতে গেলো। দরজা খুলেই চরম বিস্ময়ে সামনের তিনটা মানুষকে দেখছে। এ যেন আকাশের চাঁদ। সালাম আদান প্রদান করে মানুষ গুলো সোজা মিনহাজের রুমে আসলো।
‘আন্টি..’
মোনা পেছন দিকে ফিরতেই ইশান এসে জড়িয়ে ধরলো মোনাকে। আকস্মিক ঘটনায় বাসার সবাই হতবাক। পেছনে নয়ন এবং ইমরান দাঁড়িয়ে আছে। ইমরান এগিয়ে আসলে মনসুর উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে।হ্যান্ডশেক করে দুজন। মিনহাজের পাশে বসে ইমরান। ইশান এসে মিনহাজকে জড়িয়ে ধরে।
‘ আরেহ ইয়াংম্যান আস্তে,এত জোর নেই তো শরীরে। ‘
‘মিনহাজ আংকেল ইউ আর স্টিল ড্যাম হ্যান্ডসাম ম্যান।’
মিনহাজ হো হো করে হেসে দিলো। পুরো ইমরানের কপি।কত্ত বড় সুদর্শন ছেলে হয়েছে। লম্বা, চওড়া শুধু রংটা একটু উজ্জ্বল ইমরানের চেয়ে। বাবার মতোই সিল্কি চুল। গালে টোল পড়ে।
‘বাহ,আমার মেয়ে আন্টি,আমি আংকেল? ব্যাপারটা ভাল্লাগছে।’
‘চুপ করো তুমি,দিলা না তো মেয়েটা আমাকে।মা বানিয়ে রাজ মাতার আসনে বসাতাম।’
সবাই হতবিহবল হয়ে শুনছে ইশানের কথা।মোনা নয়নের দিকে তাকিয়ে দেখে নয়ন মুচকি মুচকি হাসছে। বুঝতে পেরেছে ইমরানকে দেশে আনার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলো নয়ন।কার্যসিদ্ধি করে জয়ের হাসি দিচ্ছে। মিনহাজের মুখ বন্ধ।
ইমরান তখনই তার বজ্র বলিষ্ঠ কন্ঠে ছেলেকে ধমকে বললো,
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২২
‘ইশান ডোন্ট মেক এনি ফান।স্টপ’
‘স্যরি পাপা।’
ইমরান মিনহাজের দিকে তাকিয়ে বলে,
‘কেমন আছো এখন?’
ইমরানের আওয়াজ শুনে আবেগ ধরে রাখতে পারেনি মিনহাজ।দু চোখের অশ্রু আড়াল করলো। পুণর্মিলন হলো আবার।রোগ থেকে যদি ভালো কিছু হয় রোগই ভালো।
