Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩
মারিয়াম ফুল

বিকেলের মিঠে রোদ চৌধুরী নিবাসের বিশাল ব্যালকনিতে এসে পড়েছে। হামজা চৌধুরী রকিং চেয়ার এ বসে পত্রিকা পড়ছিলেন, এমন সময় রুদ্রকে সেখানে আসতে দেখে চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে আনলেন। রুদ্রর পরনে ক্যাজুয়াল টি-শার্ট আর ট্রাউজার, হাতে কফির মগ।চোখেমুখে এক ধরনের অদ্ভুত প্রশান্তি, যেন সে কোনো মহাযুদ্ধ জয় করে এসেছে।
হামজা চৌধুরী গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,

“কী মিস্টার ক্যাপ্টেন? ১০ দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে তো খুব নিশ্চিন্তে কফি খাচ্ছো। ভাবছো ১০ দিনে কি আর মেয়ে পাওয়া যাবে? তোমার এই ‘ইন্টেলিজেন্ট প্ল্যান’ আমি ধরে ফেলেছি। তুমি আসলে বিয়ের পিঁড়ি নয়, রানওয়ে দিয়ে পালানোর রাস্তা খুঁজছো, কিছু কি ভুল বললাম? আমি ধরে ফেলেছি, তাই না?।”
রুদ্র এক চুমুক কফিতে তৃপ্তি নিয়ে হাসল। চেয়ার টেনে বাবার উল্টো দিকে বসে পা নাচাতে নাচাতে বলল,
“বাবা, তুমি তো তুখোড় রাজনীতিবিদ। মানুষের পালস বোঝেন। অথচ নিজের ছেলের পালস ধরতে গিয়েই ভুল করছেন। আমি কি পালানোর পাত্র? আমি তো স্রেফ গেমটা একটু ‘ফাস্ট ফরোয়ার্ড’ করলাম। এখন বলটা আপনাদের কোর্টে। ” রুদ্র নিজস্ব ভঙ্গিতে ভ্রু নাচালো।
হামজা চৌধুরী পত্রিকাটা ভাজ করে পাশে রাখলেন। ছেলের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বললেন,
“বল আমাদের কোর্টে ঠিকই, কিন্তু গোলটা যাতে নিজের পোস্টে না হয়ে যায় সেটা খেয়াল রেখো। তুমি যে খামখেয়ালি, দেখা যাবে বিয়ের দিন সকালে তুমি বললে—
‘সরি, আবহাওয়া খারাপ, ফ্লাইট টেক-অফ করবে না’। তখন এই এমপির ইজ্জত নিয়ে আমি কোথায় মুখ লুকাবো?”
রুদ্র হেসে ফেলল।

“বাবা, ফ্লাইট ডিলে হতে পারে, কিন্তু ক্যান্সেল হয় না। আর আপনি তো ভোট চাওয়ার সময় কত প্রতিশ্রুতি দেন, একটাও কি ১০০% পূরণ হয়? আমি তো অন্তত একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি বিয়ে করব। এখন সেই ‘ভিকটিম’ বা ক্যান্ডিডেট যদি আপনারা খুঁজে না পান, তবে তো সেটা আপনাদের অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ব্যর্থতা!”
হামজা চৌধুরী ছেলের চোখে তাকিয়ে এক মুহূর্ত স্থির হলেন। রুদ্রর এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস তাঁকে ভাবিয়ে তুলল।রুদ্র ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। তার মুখে হাসি ছিল, কিন্তু সেই হাসির ভেতরে যেন লুকিয়ে ছিল অদ্ভুত এক নীরবতা। এমন নীরবতা, যা মানুষকে আরও রহস্যময় করে তোলে।
নিজের রুমের দিকে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তার চোখ পড়ল হাতের ব্যান্ডেজটার দিকে। সেই বিমানের মেয়েটার কথা মনে পড়ে গেল। অ্যারোফোবিয়ায় ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মেয়েটা নখ দিয়ে তার হাতটা ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিল। অথচ কিছুক্ষণ পরেই নিজের ব্যাগ থেকে ব্যান্ডেজ বের করে খুব যত্ন করে বেঁধেও দিয়েছিল।
রুদ্র কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে রইল সেই ব্যান্ডেজটার দিকে।তারপর খুব ধীরে ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত, রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
সে বিড়বিড় করে বলল,

“Stupid girl… তুমি কি ভেবেছ, এই ছোট্ট ব্যান্ডেজ দিয়ে আমার ক্ষত সারানো যাবে?”
একটু থেমে সে হালকা করে মাথা নাড়ল।
“তুমি তো জানোই না… আমি নিজেই একটা ক্ষতবিক্ষত মানুষ। এমন এক ক্ষত, যার ব্যথা কেউ দেখে না, আর যার কোনো ব্যান্ডেজও নেই।”
রুদ্রের সাথে কথা বলার পর থেকে হামজা চৌধুরী ড্রয়িং রুমে সোফায় গা এলিয়ে দিয়েও শান্তি পাচ্ছেন না। তিনি তার স্ত্রী রেহানা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন,

“ তুমি বেশি ভাবছোরেহানা, তুমি তোমার ছেলেকে নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী।। যে ছেলে পাঁচ বছর ধরে বিয়ের নাম শুনলে ধারেকাছে ঘেঁষত না, সে হঠাৎ দশ দিনের শর্ত দিয়ে রাজি হয়ে গেল? আমার চেয়ে রুদ্রকে কেউ ভালো চেনে না। ও ওর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ব্যবহার করছে। ও জানে, দশ দিনে হুট করে কোনো মেয়ে খুঁজে পাওয়া সম্ভব না। ও আমাদের চোখে ধুলো দিয়ে একটা ‘সেফ এক্সিট’ খুঁজছে। বিয়ে-টিয়ে কিচ্ছু করবে না, শেষে বলবে ‘তোমরাই তো মেয়ে জোগাড় করতে পারলে না ”
রেহানা চৌধুরী স্বামীর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, “ও যদি সত্যিই ফাঁকি দিতে চাইত, তবে সরাসরি না করে দিত। ও হয়তো এবার সিরিয়াস।”

— “আমার চোদ্দো গুষ্টির পিণ্ডি চটকালেও তোমার ওই গুণধর ছেলের মতো আর একটা পিস্ খুঁজে পাওয়া যাবে না। দিব্যি নাকে দড়ি দিয়ে নাচিয়ে ছাড়বে আমাকে।রুদ্রর খামখেয়ালিপনা বরাবরের। ও সবকিছুকে ফ্যান্টাসি মনে করে। এই যে কালকে প্লেনে যা করল, সেটাও ওর কাছে একটা অ্যাডভেঞ্চার মাত্র। ও কোনো নিয়ম বা বাঁধাধরা জীবনে বিশ্বাসী নয়।”

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২

একতলায় যখন এই আলোচনা চলছে, দোতলায় দাদির ঘরে তখন ডক্টর ইমতিয়াজ সাথে কথা চলছে। ডক্টর ইনতিয়াজ আহমেদ শুধু একজন চিকিৎসক নন, চৌধুরী পরিবারের যেকোনো বিপদে-আপদে তিনি বড় ভাই বা অভিভাবকের মতো পাশে থাকেন। সুলতানা চৌধুরীর বিয়ের তাড়ানি শুনে ডক্টর মোস্তফা ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ নীরব থেকে গম্ভীর স্বরে বললেন,সায়েদ ইমরানের ছোট মেয়ে—মেহের।
কিন্তু খালাম্মা, মেয়েটা তো রুদ্রর ঠিক উল্টো মেরুর! ভীষণ চঞ্চল । আপনি কি ওকে চিনতে পারছেন? ওই যে আমার মেজো মেয়ে আহিয়ার বিয়েতে যে মেয়েটা পুরো বাড়ি মাতিয়ে রেখেছিল?”

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here