আমার আলাদিন পর্ব ৫৮
জাবিন ফোরকান
সমনের কাগজটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ইরাম। বুঝে উঠতে সময় নিল মস্তিষ্ক। পিছন থেকে ভেসে এলো সামিয়ার কন্ঠস্বর,
“কি ব্যাপার, ইরাম? কিসের নোটিশ এসেছে?”
ঘোর থেকে বেরিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে পিছনে তাকাল ইরাম। সামিয়ার পাশাপাশি ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে আদিত্যও। তাই বলতে যেয়েও বলতে পারলনা ইরাম। গলা খাঁকারি দিয়ে জানাল,
“তেমন কিছু না, আম্মু। পরে বলব। আগে খেয়ে নাও তোমরা।”
সুগন্ধার দিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকিয়ে ইরাম আবার বলল,
“তুমি বেড়ে দাও ওদেরকে। আমি একটু রুম থেকে আসছি। হঠাৎ মনে পড়ল, একটা জরুরী ফোন করতে হবে।”
এটুকু বলেই ইরাম দ্রুত চলে এলো। সামিয়া ঠিকই ধরতে পারলেন কিছু একটা অবশ্যই হয়েছে। তবে আদিত্যর উপস্থিতিতে বিশেষ কথা বাড়ালেন না তিনিও। পরে জিজ্ঞেস করা যাবে।
নোটিশের কাগজ নিয়ে সোজা বেডরুমে চলে গেল ইরাম। বুকের ভেতরটা তার ধড়ফড় করছে। মুখ চেপে মাথায় হাত দিয়ে রাখল কিছুক্ষণ। এত আতঙ্কিত কেন হচ্ছে? সে জানত এটা আজ নাহয় কাল হওয়ারই ছিল। এর জন্যই তো ইরামের কতশত প্রস্তুতি! ঢোক গিলল ইরাম। ফোন হাতে নিয়ে বিছানায় গিয়ে বসল। সাইবানকে কল করল। যদিও বেশ কিছুক্ষণ আগেই একবার কথা হয়েছে। কিছু সেকেন্ডের মাথায়ই ফোন রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে ভেসে এলো সাইবানের ঘুম জড়ানো কন্ঠস্বর। হাসল সে, আবেশিত আওয়াজ তুলে।
“আমাকে ছাড়া এক সেকেন্ডও থাকতে পারছেন না, তাইনা?”
“আলাদিন শোনো…!”
উৎকণ্ঠা নিয়ে বলতে গিয়েও থেমে গেল ইরাম। হাতের মুঠো শক্ত করে ফেলল। কোলের দিকে তাকাল। কাগজটা দেখল বারকয়েক। ঠিক করছে কি? সাইবানকে যদি এখনি এসব জানিয়ে দেয় তাহলে ছেলেটা কি ঠান্ডা থাকবে? এমনিতেও আছে বিদেশে, এই চিন্তা মাথায় নিয়ে স্বাভাবিক দিনযাপন করতে পারবেনা কোনোদিনই। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে নিজেকে আটকাল ইরাম। আগে পরিবারের সাথে আলাপ করে নিজের বোঝা দরকার। পরে সাইবানকে জানাবে।
“কবে ফিরবে?”
কথা ঘুরিয়ে এবার ভিন্ন প্রশ্ন করল ইরাম। তাতে সাইবানের হাসির কলরল ভেসে এলো। অতঃপর গভীর গলায় সে জানাল,
“আপনি বললে এখনি চলে আসি?”
“না। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসার দরকার নেই।”
“কিন্তু আমার বউ যে আমাকে খুব করে মিস করছে। তাই এক মিনিট কথা না বলে থাকতে পারছেনা।”
“আমি…অ্যাহেম! এমনিতেই ফোন দিয়েছিলাম।”
“সারা দুপুর কথা বলার পরেও?”
“হ্যাঁ! ইচ্ছা হয়েছে দিয়েছি। আমার হাসবেন্ডকে আমি যখন ইচ্ছা ফোন দিয়ে বিরক্ত করব, প্রেমের আলাপ করব, তোমার কি?”
ওপাশ থেকে নীরবতা। ইরাম ঘাবড়ে গেল। বিচলিত হলো।
“হ্যা…হ্যালো?”
“আপনাকে হাসবেন্ড ডাকতে বারণ করেছি না?”
ইরাম দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ধরল, বলল,
“ডেকে ফেলেছি। এখন কি করবে তুমি?”
“চাঁদ তারা দেখার জন্য রেডি হন।”
“মানে?”
“মানেটা এসে বুঝিয়ে দিচ্ছি।”
“হ্যা.. হ্যালো? হ্যালো? আলাদিন? হ্যালো?”
বিপ বিপ শব্দ করে ফোনটা কেটে গেল। ইরাম বিহ্বল হয়ে বসে রইল। ব্যাপারটা ঠিক কি হলো? বুঝতে পারলনা সে। বোঝার জন্য বিশেষ মাথা ঘামালনা। ভালো হয়েছে ফোন কেটে দিয়েছে। নোটিশটা আবারও পড়তে শুরু করল ইরাম। যেন সে বারবার পড়লেই তাতে লিখিত সব কথা হুট করে বদলে যাবে।
পরদিন।
সন্ধ্যা নেমেছে ধরিত্রীর বুকে। অমাবস্যার আঁধারে চাঁদের দেখা নেই। আকাশটা যেন অশরীরী কালো। মন্থর বাতাসে উৎকণ্ঠার ভার। বেশ অনেকদিন বাদে বাড়ির মানুষগুলোর মন কেমন ছন্নছাড়া। সবার মাঝেই অস্থির চিন্তন। তবে কি সুখের দিন ফুরিয়ে এলো? এই তবে অমোঘ যুদ্ধের সূচনা?
হাসপাতাল থেকে আজ ছুটি নিয়েছেন সামিয়া। বসে আছেন বসার ঘরের সোফায়। তার কোলে ইযান। হাতের একটা রাবারের বলকে দাঁত দিয়ে কামড়ানোর চেষ্টায় আছে। নাতিকে দেখে সবসময়ের মতন উচ্ছ্বাস তিনি অনুভব করতে পারলেন না। ভয় হলো বুকের ভেতর। এই নাতিকে যদি তার কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়? বেশি চিন্তা করতে চাইলেন না। মাথা ঝাড়া দিয়ে জোরপূর্বক মনোযোগ দিয়ে সামনে তাকালেন। বিপরীত দিকের সোফায় বসে আছে সাইবানের বন্ধু নীরব। পরিপাটি পোশাক, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে আদালতের সমনের কাগজটা পড়ছে সে। সামনে রাখা চায়ের কাপ ঠান্ডা হয়ে গেলেও সেদিকে বিশেষ মনোযোগ নেই। সুগন্ধাও দৃশ্যপটে উপস্থিত। ওড়নার প্রান্ত মুখে দিয়ে কামড়ে যাচ্ছে অস্থিরতার কারণে। আর ইরাম? সে একদম বিরস, শান্ত ও পাথুরে চেহারায় থম মেরে বসে আছে তৃতীয় সোফায়। সমস্ত বাড়ির বাতাসটা কেমন যেন ভারী হয়ে আছে।
এমন সময় ধীরপায়ে হলে প্রবেশ করলেন আহমদ। একদম নিরুৎসাহিত দৃষ্টিতে বাড়ির পরিবেশ দেখলেন। গত এক মাস বাড়ি ছিলেন না তিনি। সেটাই ভালো ছিল বোধ হয়। বাড়ির বর্তমান পরিস্থিতি তাকে বিরক্ত করছে। ভ্রু কুঁচকে কর্কশ গলায় তিনি বললেন,
“শেষমেষ কোর্ট কাচারির চক্করেও এই পরিবারকে পড়তে হলো? তাও বাইরের কারো জন্য।”
আহমদের কথায় সকলে মাথা তুলে তাকাল। সামিয়া ভ্রু কুঞ্চিত করে স্বামীর উদ্দেশ্যে বললেন,
“বাইরের কেউ? এখানে তুমি ছাড়া বাইরের কেউ নেই। তুমি রুম থেকে বেরোলেই বা কেন? তোমাকে কেউ অপ্রয়োজনীয় মতামত দিতে ডেকেছে?”
আহমদ মুচকি হাসলেন। তার হাসিটা এই মুহূর্তে অবিবেচক দেখাল ভীষণ। বিশেষ পাত্তা তিনি দিলেন না। হেঁটে এসে চতুর্থ সোফাটায় শরীর এলিয়ে বসলেন। জানালেন,
“সে তুমি মতামত দেয়ার অধিকার রাখো কিংবা না রাখো, সত্যটা বদলে যাবে না। এই বাড়ির ছেলেমেয়েদের বাবা আমি। সর্বোচ্চ অভিভাবকও আমি। তাই আমার কথা তেঁতো লাগলেও তোমাদের শুনতে হবে।”
“আব্বু, এসব বিষয়ে আমরা পরে…”
“এই মেয়ে। তোমাকে না আমি বলেছি আমাকে আব্বু ডাকবে না? একদম ন্যাকামি পছন্দ করিনা আমি।”
ইরাম কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু শ্বশুরের ধমকে চুপ করে যেতে বাধ্য হলো। আহমদ অবশ্য আজ ছাড় দিলেন না,
“এটাই চাচ্ছিলে তুমি, তাইনা? নিজের ঘাড়ের বিপদ আমাদের পরিবারের উপর ফেলতে। এত স্বার্থপর কেন তুমি? অবশ্য, অ্যাপল ডায নট ফল ফার ফ্রম দ্যা ট্রি।”
আড়চোখে সামিয়ার দিকে তাকালেন আহমদ। তবে তিনি নিজের বক্তব্য জারি রাখার সুযোগ পেলেন না। এর আগেই গলা খাঁকারি দিয়ে সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করে নিল নীরব।
“আপাতত উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। সমন এসেছে। ভালোমত প্রস্তুতি নিয়ে প্রথম দিনের শুনানিতে অংশগ্রহণ করাটাই যুক্তিযুক্ত হবে। বিশেষ ভয় পাওয়ায় প্রয়োজন নেই। ইযান এখনো ছোট। তাই রায়টা মায়ের দিকে আসার সম্ভাবনাটাই বেশি।”
ছেলেটার গোছানো কথাগুলো শুনে খানিক অবাক না হয়ে পারলনা ইরাম। সাইবানের সাথে যতবার দেখেছে, প্রত্যেককে বাউন্ডুলে মনে হয়েছে। অথচ নীরব যে ফ্যামিলি ল এর জুনিয়র অ্যাডভোকেট সেটা জেনে সে যারপরনাই অবাক হয়েছিল। সাইবানের গোটা বন্ধুমহলকে দেখলে মনে হবে পাড়ার দুষ্টু ছেলেদের দল। যাদের জীবনের কোনো পরোয়া নেই, লক্ষ্য নেই, উদ্দেশ্য নেই। বেপরোয়া, আদবহীন এবং জীবনে অতিরিক্ত পরিমাণে উৎফুল্ল। সেখানে অনুরাগ একজন অ্যাসিসটেন্ট প্রফেসর, নীরব জুনিয়র অ্যাডভোকেট আর আফনান নাকি নিজের বাবার কোম্পানির ডিরেক্টিং ম্যানেজার। আজ কাজের সময়ে না দেখলে ইরামের বিশ্বাস করতে কষ্ট হত। এই জেনারেশনটাই হয়ত এমন। যারা জীবনে মুক্ত স্বাধীন বিহঙ্গের মতো চলতে ভালোবাসে, কিন্তু জীবন সম্পর্কে জ্ঞান তাদের কোনো অংশে কম নয়।
“তবে একটা জিনিস সমস্যার কারণ হতে পারে।”
ইরাম বাস্তবতায় ফিরে নীরবের দিকে তাকাল।
“কি?”
“ইযানের বার্থ সার্টিফিকেট। এখানে বাবার নাম সাইবান। এটা কোর্ট ভালোভাবে নেবে না।”
খানিক আতঙ্কিত হলো ইরাম, যদিও তা মুখে ফুটে উঠতে দিলনা। সামিয়াই আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন করলেন,
“এটা নিয়ে কি করা যায়?”
নীরব কাগজপত্রের দিকে চেয়ে পরক্ষণে বলল,
“সেটা আমার সিনিয়রের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিকঠাক করতে হবে। আমার মনে হয় আমরা কালই স্যারের সাথে দেখা করতে যেতে পারি। আমি আজ রাতের মধ্যে কেইস ফাইল রেডি করে ফেলব। বায় দ্যা ওয়ে, সাইবান?”
ইরাম মাথা ঝাঁকাল,
“আলাদিন এখনো কিছু জানে না।”
“কি জানিনা আমি?”
কন্ঠটা বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষকে স্তব্ধ করে দিল। ঝট করে মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকাল ইরাম। সদর দরজা খোলাই ছিল। সেই দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছে সাইবান। ঢোলা সাদা টি শার্ট আর জিন্স পরনে। গলায় ঝুলছে হেডফোন। হাতে ইয়া বিশাল লাগেজ আর ঠোঁটে চওড়া হাসি। চকচক করছে চোখ দুটো বাড়ি ফেরার আনন্দে।
“ভাইজান!”
আঁতকে উঠে মুখে হাতচাপা দিল সুগন্ধা। তাতে তীর্যক হাসল সাইবান। তার অপ্রত্যাশিত উপস্থিতিতে সবাই হতবাক।
“কি রে জরিনার আম্মা সকিনা? কালো হয়ে গেছিস।”
মুখ ভেংচাল সুগন্ধা। তৎক্ষণাৎ ভিন্নদিকে তাকাল। সোফা ছেড়ে উঠে এলো ইরাম। তার চোখে মহাবিস্ময়। চোখ পিটপিট করল সে। বলল,
“আলাদিন, তুমি?”
এবার অর্ধাঙ্গিনীর দিকে মনোযোগ দিল সাইবান। লাগেজ রেখে এগিয়ে এলো। দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে বলল,
“বলেছিলাম না? সবকিছু এসে বুঝিয়ে দেব?”
ইরামের চোখজোড়া প্রসারিত হলো। গতকালের ফোনকলের কথা মনে পড়ল। তবে সাইবান সত্যিই ওই ফোনের পর সোজা বাড়ি চলে এসেছে? তার কি মাথা খারাপ? পাগল নাকি ছেলেটা? যা বলে তাই করে, তাই বলে এমন একটা অহেতুক কাজ করতে হবে? সব ছেড়েছুঁড়ে হুট করে কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে আসতে হবে? অন্য সময় হলে হয়ত ইরাম তাকে ধমক দিত। দায়িত্বজ্ঞানহীন হওয়ার কারণে রাগ করত। তবে আজ, ক্রোধের থেকে বেশি স্বস্তি অনুভূত হলো তার। গতকালের সমন আসার পর থেকে যে উৎকণ্ঠায় দিন কেটেছে, সাইবানের মুখ দেখার সাথে সাথে সেই উৎকণ্ঠা কেটে গিয়েছে। নিজের ভাবনায় নিজেই লজ্জা পেল ইরাম। ছেলেটা তার কত বড় ভরসার স্থান হয়ে গিয়েছে ভাবা যায়?
হুট করে ইরাম নিজের কানের কাছে ফিসফিস কন্ঠস্বর শুনল, তার সঙ্গে তপ্ত নিঃশ্বাসের ছোঁয়া,
“চাঁদ তারা দেখার জন্য রেডি?”
ইরাম তীক্ষ্ণ নজরে তাকাল ঝুঁকে থাকা সাইবানের দিকে। বাঁকা হাসল স্বামী তার। পরমুহূর্তেই তার চেহারায় একটা নির্মল ভাব ভর করল। গভীরতর গলায় বলল,
“আপনার কণ্ঠের সামান্য কম্পনও আমার বুকে ছুরি চালায়। আমার কাছ থেকে কষ্ট লুকিয়ে রাখবেন, ভাবলেন কি করে?”
ইরাম উত্তর করতে পারলনা। নিষ্পলক চেয়ে রইল শুধু। সাইবান তবে আগেই ধরতে পেরেছে তার সঙ্গে কিছু একটা হচ্ছে? এই কারণেই এত আয়োজন?
“আ…বা!”
পিতার আগমনে বাড়ির উচ্ছ্বসিত সদস্য ইযান তখনি সামিয়ার কোল থেকে দুহাত বাড়িয়ে লাফিয়ে উঠল রীতিমত। সাইবান চোখ পিটপিট করে তাকাল ছেলের দিকে। সরাসরি ইযানকে ধরলনা সে। প্রথমে কিচেনের সিংক থেকে হাত ধুয়ে এলো। এরপর সামিয়ার কোল থেকে ছেলেকে নিজের কোলে নিল। ইযান সঙ্গে সঙ্গে সাইবানের কাঁধ জড়িয়ে ধরল,
“বা…! উই…গু বা!”
“কিরে পোটলা? বাপকে মিস করেছিস, না?”
“আই!”
“ব্যাপার না, এইযে বাবা চলে এসেছে। এখন আবার শুরু করিস, তোর হাগুমুতু দিয়ে আমার জামাকাপড় ভরিয়ে দিস। টয়লেট পছন্দ না, তুই হাগবি তো আমার বুকের উপরেই এটা জানা কথা।”
মজার ছলে বললেও ছেলেকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রাখল সাইবান। বহুদিন বাদে তার বুকে কেমন শান্তি শান্তি লাগছে। এই কয়েকদিনে মনে হয়েছিল তার জীবন থেকে কিছু নাই হয়ে গিয়েছে। ইযানকে বুকে চেপে সে এবার একে একে বাকিদের দিকে তাকাল। সামিয়া, আহমদ এমনকি সবসময় দাঁত কেলিয়ে বেড়ানো নীরবও কেমন চুপচাপ হয়ে আছে। কন্ঠ দৃঢ় হয়ে এলো তার,
“কেউ আমাকে বলবে, সবার মুখ এমন বাংলার পাঁচের মতন কেন হয়েছে? জরিনার আম্মা সকিনা খাবারে মরিচ বেশি দিয়ে দিয়েছে নাকি?”
“আপনি খালি আমারেই পান?”
সুগন্ধা খেঁকিয়ে উঠল, পরক্ষণেই জানাল,
“পারেন তো শুধু আমার লগেই। এইদিকে আপনার চেরাগ নিয়া টানাটানি পইড়া গেছে।”
সাইবানকে খুব বেশি অবাক দেখালনা। যেন সে জানত এমন কিছু হবে। আহমদ উদাসী গলায় বললেন,
“এই বাড়ি আর বাড়ি নেই। যাত্রাপালার মঞ্চ হয়ে গিয়েছে। দুইদিন পরপর নতুন নতুন নাটক শুরু হয়।”
“তোমার মন্তব্য আপাতত জরুরী নয়, ড্যাড।”
সাইবান ঠান্ডা গলায় বলল। পিতার দিকে বিশেষ মনোযোগ না দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল ইরামের মুখোমুখি। জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে?”
ইরাম কিছুক্ষণ ইতস্তত করল। অতঃপর সবকিছু ঝেড়ে জানাল,
“অরণ্য এসেছিল।”
“অ্যান্ড?”
সাইবান এতটা শান্তভাবে উচ্চারণ করল যে তাতে ভয়ই অনুভূত হলো বেশি। উৎফুল্ল থাকাটা সাইবানের সহজ সত্তা। সে যতক্ষণ হাসছে, মজা করছে, বেপরোয়া মুডে আছে ততক্ষণই ঠিকঠাক। সে যখনি শান্ত হয়ে যায়, তখনি দানা বাঁধতে শুরু করে ঝড়। ইরাম তার মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল। কিন্তু সাইবানের চেহারায় বিশেষ কিছু বোঝা গেলনা। তার কন্ঠস্বর গভীরতর হলো,
“এরপর কি জিজ্ঞেস করেছি।”
একটি ঢোক গিলল ইরাম। জানাল,
“কোর্ট থেকে নোটিশ এসেছে। ইযানের কাস্টাডি নিয়ে মামলা করেছে অরণ্য।”
পিনপতন নীরবতা ভর করল সমস্ত বাড়িজুড়ে। সাইবানের লাগেজ অধরা পরে রইল রুমের এক কোণায়। তার হেডফোন ঝুলতে লাগল গলায় যেমন ছিল তেমন করেই। প্রত্যেকে বুঝি নিঃশ্বাস আটকে ফেলল। নীরবকে দেখেই সাইবান যা বোঝার বুঝে ফেলেছে। ইরাম কেবল নিশ্চিত করল। নীরব সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বন্ধুকে বোঝাতে চাইল,
“বেশি প্যারা নিস না। তেমন সিরিয়াস কিছু এখনো হয়নি। আমরা দ্রুত প্রস্তুতি নিয়ে আদালতে ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পারলেই হবে।”
“কোন অধিকারে কাস্টাডি চায় জঙ্গলটা?”
সাইবান হুট করে খেঁকিয়ে উঠল। তার কন্ঠস্বরটা অস্বাভাবিক শোনাল। কর্কশ, ভারিক্কী এবং অশুভ। সতর্ক সংকেত পেয়ে গেল ইরাম। দানা বাঁধা ঝড় এবার ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। কোল থেকে ইযানকে নামিয়ে সামিয়ার কাছে ফিরিয়ে দিল সাইবান। গলা থেকে হেডফোন খুলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“আমার অবর্তমানে আমার বাড়িতে এসে আমার স্ত্রীকে থ্রেট দিয়ে যাবে, আমার সন্তানকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করবে, আর ভেবেছে আমি চুপ থাকব? জঙ্গলটা আমায় ভয় পায়, তাই আমার সামনে আসতে পারেনা। আজ ওই নিমকহারামকে আমি দেখে নেব! ঘুচিয়ে দেব মামলা করার সাধ!”
হনহন করে সদর দরজার দিকে হাঁটা দিল সাইবান। ঝড়ের গতিতে। উন্মুক্ত হওয়া এক দানব, ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে। নীরব আর সুগন্ধা একযোগে পিছনে ছুটল সাইবানের।
“সাইবান। আমার কথাটা শোন। খবরদার পাগলামি করিস না!”
“আরে ভাইজান, মাথা খারাপ কইরা কেইস খারাপ কইরা ফালাইবেন! থামেন!”
কিন্তু কে শোনে কার কথা? বেরিয়ে গেল সাইবান বাইরে। ছেলের কর্মকান্ডে হতাশ সামিয়া নিজের কপাল ঘষলেন, ফেললেন দীর্ঘশ্বাস। ইশারা করলেন ইরামের দিকে। তিনি জানেন, তার ছেলেকে নিয়ন্ত্রণ করা একমাত্র ইরামের পক্ষেই সম্ভব। ইরাম অবশ্য সামিয়ার আদেশের জন্য বসে ছিলনা। দৌঁড়ে গেল সে সাইবানের পিছু পিছু। গেটের সামনে ইতোমধ্যে ঝামেলা পাকিয়ে গিয়েছে। নীরব আর সুগন্ধা একসাথে চেষ্টা করার পরেও লাভ হচ্ছে। সাইবানকে আটকানো যাচ্ছেনা। এমন সময়ে সামনে গিয়ে দাঁড়াল ইরাম। দুই দিকে দুহাত ছড়িয়ে স্বামীর পথরোধ করে বলল,
“থামো বলছি!”
“আমার সামনে থেকে সরুন ইরাম। আজকে ওর একদিন কি আমার একদিন! একটা উচিত শিক্ষা না দিয়ে আমি ছাড়ছিনা। আমার কলিজায় হাত দিতে চাইছে জানোয়ারটা!”
“হ্যাঁ তুমি গিয়ে শিক্ষা দাও আর আদালতে সেই শিক্ষার হাল দেখিয়ে ফায়দা লুটুক মানুষ, সেটাই চাও তুমি চাইনা?”
ইরামের ধমকে থমকাল সাইবান। প্রথমবারের মতন ভ্রু কুঁচকে কিছুটা স্বাভাবিক দৃষ্টিতে তাকাল। ফুঁসছে সে রাগে রীতিমত। ইরাম কাছে এগোল। স্বামীর দুবাহুতে হাত রেখে বোঝাল,
“ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড আলাদিন। আমি জানি তুমি কি অনুভব করছ। বিশ্বাস করো, আমারও ইচ্ছা হয়েছিল ওই মুহূর্তে কিছু একটা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেই। এখনো ইচ্ছা হচ্ছে। আমার থেকে আমার সন্তানকে কেড়ে নেয়ার ফন্দি আঁটা হচ্ছে। কিন্তু আমি এখনো শান্ত আছি। কেন জানো? কারণ এটা আদালত, এখানে গায়ের জোর খাটে না।”
সাইবান নিজের ক্রোধের ঘোর থেকে বেরোল। শক্ত একটি ঢোক গিলে ফ্যালফ্যাল করে অর্ধাঙ্গিনীর দিকে চেয়ে রইল। নীরব পাশ থেকে জানাল,
“ভাবী একদম ঠিক বলছে। যেকোন কিছুকে ইস্যু বানিয়ে তোর বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে ওরা। তাই এখন চলাফেরা করতে হবে খুব সাবধানে। তুই আজকে গিয়ে উল্টাপাল্টা কিছু বল, রাগ প্রকাশ কর। ব্যাস, কালকেই সেটা হয়ে যাবে তোর বিরুদ্ধে প্রমাণ।”
বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে নীরব দ্বিতীয় দফায় বলল,
“তোকে এখন ভাবীর ঢাল হতে হবে। দেখাতে হবে যে তুই ওনার কত দায়িত্ববান স্বামী আর ইযানের কত ভালো একজন বাবা হতে পেরেছিস। ওদের সাথে একটা সুন্দর পরিবার গড়তে পেরেছিস। শুধুমাত্র তাহলেই এই কেইস জিতে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কোর্ট যদি তোকে বাচ্চার দায়িত্ব নিতে অপারগ মনে করে তাহলে সমস্যা হয়ে যাবে। বোঝার চেষ্টা কর। ভাবী আর ইযানের জন্য হলেও, উগ্র কিছু আপাতত করিস না।”
ইরাম দুহাত বাড়িয়ে সাইবানের হাতজোড়া চেপে ধরল। নরম কন্ঠে আর্জি জানাল,
“প্লীজ আলাদিন। এতদিন বাদে আমি একটুখানি সুখের দেখা পেয়েছি। আমার কুচুপুকে আমি হারাতে চাইনা। এটাও চাইনা যে ওর জীবনে ওই লোকটার ছায়া পড়ুক। যেই ছায়ার থেকে পালাতে নিজেকে নতুন সম্পর্কে জড়িয়েছি, সেই ছায়া আমার সন্তানের জীবনকে এখন নষ্ট করতে চাইছে। প্লীজ, এই একবার একটু বোঝদার হয়ে আমার সঙ্গ দাও? আমি যে তোমাকে ছাড়া ভীষণ একা।”
ইরামের শেষ কথাটা বুঝি বুকে গিয়ে লাগল সাইবানের। পারলনা সে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুহাত বাড়িয়ে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরল ইরামকে। টেনে নিল অর্ধাঙ্গিনীকে, নিজের বুকের ভেতর। ঘাড়ে হাত রেখে গলায় জোর দিয়ে সে বলল,
আমার আলাদিন পর্ব ৫৭
“আপনি একা নন, আর কোনোদিন একা হবেন না। আমি আছি আপনার সাথে। আমি কথা দিচ্ছি, আমাদের ছেলের কিচ্ছু হবেনা। কেউ কোনোদিন আমাদের কাছ থেকে ওকে কেড়ে নিতে পারবেনা। যে কেড়ে নিতে চাইবে, তাকে আমি নরক অব্দি তাড়া করে বেড়াব, কথা দিলাম।”
ইরাম শক্তভাবে জড়িয়ে ধরল সাইবানকে। স্বামীর কথাগুলো তার অন্তর ছুঁয়ে গেল। নতুন ভরসা দানা বাঁধল বুকে। হয়ত সম্ভব।
আলাদিন যদি সাথে থাকে, তবে ইরামের জিতে যাওয়া সম্ভব।
