তাকদীর পর্ব ১৫
নিরুর কল্পনারাজ্য
— দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় তুমি তোমার প্রথম স্ত্রীর নাম নিচ্ছো, ফারিশ? কী হয়েছে টা-কী তোমার?
তুবার বক্ষস্থল জড়িয়ে শুয়ে থাকা পুরুষ ফারিশ তুবার এমন কথায় নিজের সম্ভিত ফিরে পায় যেনো। সে মাথা তুলে তুবার বিরক্তিতে ছেয়ে যাওয়া মুখখানার পানে তাকায়। গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয় কিছুপল। নাহ! এ রমণী মোটেই সে নয় যাকে সে খুঁজে ফিরছে নিজের ভাবনায়। সে হতাশ হলো। সরে এলো তুবার নিকট হতে। দূরত্ব বাড়ালো দু’জনার মধ্যিখানের। তুবা বিস্মিত হলো। ব্ল্যাঙ্কেট চেপে ধরে রমণী শুধালো,
— কী হয়েছে তোমার?
ফারিশের গায়ে টি-শার্ট নেই। অর্ধনগ্ন দেহ তার। ব্ল্যাঙ্কেট সরিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে যেতে যেতে সে জবাব দিলো বেশ রুক্ষ স্বরেই,
— কিছুনা। সকাল হয়েছে, এক কাপ চা নিয়ে এসো!
তুবা বিরক্ত হলো। হেডবোর্ডে মাথা ঠেকিয়ে উঠে বসলো রমণী। দীর্ঘ একরাত একসাথে কাটানোর পর সাতসকালে এসে নিজের স্বামীর মুখে তার সতীনের নাম কোন নারীই-বা মেনে নিতে পারে? রাগে গজগজ করতে করতে সে ডাক দিলো ফারিশকে,
— ফারিশ, তুমি আবারও আয়রার কথা ভাবছো?
উত্তর দেয়না ফারিশ। সবে পঁচিশ বর্ষীয়া পুরুষ ফারিশ দেখতে শুনতে মন্দ নয়। এম্বার রঙা চোখ এবং দীঘলপল্লব। হলুদাভ দেহের রঙ। মায়াময় চেহারা। ফারিশ বেড সাইড টেবিল হতে সিগারেট বের করতে করতে জবাব দেয়,
— অমন কিছু নয়।
— তাহলে কেমন কিছু বলো আমাকে?
ফারিশের কোনো উত্তর রয় না এই প্রশ্নের। সে চুপ থাকে পরিবর্তে। তুবার রাগ আসমান সমান হয়ে ওঠে। সে ফের গলা উঁচায়,
— কী সমস্যা তোমার ফারিশ? বিয়ের আগে তো এই আমার কাছেই সকল সুখ খুঁজে পেতে। তাহলে এখন এই দেহের মাঝে থেকে ওই মেয়ের নাম আসছে কোথা থেকে?
ফারিশ উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না। বিছানার এককোণে পড়ে থাকা শার্টটি টেনে নিয়ে বেলকনির দিকে এগোয়। এতে তুবার রাগ আরও বাড়ে। রাগের কারণে তুবার চোক্ষুদ্বয় হতে নিরন্তর জল গড়িয়ে পড়ে। এই ফারিশ এতো বদলালো কী করে? সে উচ্চস্বরে ডেকে উঠলো তাকে,
— ফারিশ, ফারিইইশ!
ফারিশ নিজের প্রাণপ্রিয়া দ্বিতীয় স্ত্রীর এতোটা আকুল আহ্বানের মোটেই সারা দেয়না। তার ধ্যান-জ্ঞান সর্বটা অন্যকোথাও। যেথায় ওই রমণীর ডাক পৌঁছানোর ক্ষমতা রাখেনা। সে বেলকনিতে বিছিয়ে রাখা এক রোলিং চেয়ারে আয়েসে বসলো। পা দুটো ছড়িয়ে একহাত রোলিং চেয়ারের কপাটে রেখে আরেক হাতে সিগারেট ধরালো। উন্মুক্ত বুক তার; বাটনহীন শার্ট তার সকালের ফিরতি বাতাসে দুলে উঠছে বারংবার। পুরুষটির চোখে স্পষ্ট অনুরক্তি; দ্বিধা। সে একপলক নিজের হাতে রাখা সিগারেটের পানে নজর ঘোরালো। আয়রা তার জীবনে থাকতে কখনো সে এসব ছুঁয়ে দেখেনি। অথবা দেখতে পারেনি। সিগারেটটির পানে তাকিয়ে সে অদ্ভুত তাচ্ছিল্য নিয়ে আওড়ালো,
— তোর যাওয়া কীভাবে পোড়ালো রে জান? যে আমি নেশাদ্রব্য কখনো ছুঁয়ে দেখিনি সে আমি আজ সিগারেটের অনলে পুড়ছি। অন্য নারীর কাছে সুখ খুঁজতে গিয়ে যে আমি তোকে হারিয়ে ফেললাম। অথচ তোর কাছে অসুখের দোহাই দিয়েই তো আমি তার মাঝে সুখ খুঁজতে গিয়েছিলাম। তোকে এতোটা মনে পড়ছে কেনো আজ? মনে পড়ার তো কথা নয়। আফসোস করছি কী আমি? আল্লাহ! এ’কি হাল হচ্ছে আমার। কেনো হচ্ছে!
পরক্ষণেই হামলে ওঠে তার পৌরুষদীপ্ত অহংকার। ইগোহার্ট হয়। তথাকথিত পুরুষদের ন্যায় সে নিজেও মানতে পারেনা নিজের এহেন অপ্রয়োজনীয় পরিবর্তন। এমনটা তো হওয়ার কথা নয়। তবে হবে কেনো? নাহ! সে ওই মেয়েকে মনে করবেনা। সে-তো থাকতেই বলেছিলো। মেয়েটা তার মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। আর..আর অন্য কাওকে বিয়ে করে নিলো। বিয়ে! মানে নিকাহ! ফারিশের কাছে এই শব্দটি একসময় অতি পবিত্রের মনে হলেও আজ এই শব্দটিই তার সকল বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যবে থেকে সে আয়রার বিয়ের কথা শুনেছে তবে থেকেই ফারিশ উত্তাল সমুদ্রে ভাসছে। সে মনাতে পারছেনা বিষয়টি। আয়রা আর তার মাঝের বয়সের পার্থক্য ছিলো কেবল পাঁচ বছর। ভীষণ অল্প বয়সেই দু’জন বাবা-মা হয়েছিলো। সেইদিনগুলো ফারিশের মণিকোঠায় এক অসীম যত্নে বাঁধা কোনো প্রেমের উপাখ্যানের ন্যায় সঞ্চিত রয়েছে। চোখ মেললো ফারিশ। বিড়বিড় করলো কিছু শব্দ,
— নাহ! আমি কিছুতেই এভাবে তোমায় মনে করতি পারিনা। পারিনা আমি। তুমি নিজে থেকেই ছেড়ে গিয়েছিলে আমাকে। আমার মেয়েকে নিয়ে। তাহলে তোমায় মনে পড়বে কেনো? পড়বে না। পড়তে পারেনা। কিছুতেই পারেনা।
ফারিশ হলো সেই মানুষদের ন্যায় যারা কি-না নিজেদের দোষ ঢাকতে চায় অন্যের মাধ্যমে। পৃথিবীতে অনেক মানুষ রয়েছে যারা নিজেদের ভুল মেনে নিতে পারেনা। তারা নিজেদের ভুল ঢাকার জন্য সকল কিছুকেই পুঁজি বানায়। ঠিক তেমনি, ফারিশ যখন তুবার সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত ছিলো তখন সে নিজেকে বুঝিয়েছিলো ‘আয়রার কাছে সে অসুখী।’ এরপর যখন তুবাকে বিয়ে করে এনেছিলো তখন সে বলেছিলো ‘ইসলামে চার বিয়ের অনুমতি রয়েছে এবং সে একধরণের ভালো কাজ করেছে। তুবাকে পতিতালয় হতে মুক্ত করেছে।’ অথচ সে নিজের দোষ এবং ভুলটুকু ভাবেনি অথবা ভাবতে চায়নি। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই কখনো নিজের দোষ স্বীকার করেনা; নিজেকে শুদ্ধ দাবী করেই আল্লাহর দরবারে গিয়ে হাজির হয়। কেবল আত্ম-অনুশোচনার ভয়ে তারা সত্য স্বীকারেও দ্বিধাবোধ করে। আর ফারিশের মনে আপাতত সেই অনুশোচনার উদয় ঘটছে যার মুখোমুখি ফারিশ কখনো হতে চায়নি। কখনো নয়।
এলার্জির কারণে জুনায়েদের সারা শরীর ভরে উঠেছে রেশে। মুখে; হাতে; দেহের সর্বস্থানে লাল লাল ছোপ ছোপ দাগের ন্যায় ভেসে উঠেছে সেসব। আয়রা গিয়ে দ্রুত জুনায়েদের বুক হতে আমিরাকে উঠিয়ে নিলো। রুহানি সৈয়দ অতি শীঘ্রই জুনায়েদকে ডক্টরের কাছে যাওয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছেন,
— আব্বু, দ্রুত তৈরি হয়ে ডক্টরের কাছে যাও। এখন না গেলে এই রেশ যদি বেড়ে যায়?
জুনায়েদ ভ্রু কুঁচকে হা হয়ে চায়লো আয়রার পানে। কেমন নির্বোধের ন্যায় শুধালো ধীমি স্বরে,
— নিয়ে নিলে?
আয়রার ভীত আদল কুঁচকে গেলো জুনায়েদের এমন প্রশ্নে। পুরুষটির গায়ের রেশের অসংখ্য ছাপ অথচ এই পুরুষ আমিরাকে কেনো নিয়ে নিলো সেই ভাবনায় মাতোয়ারা? সে প্রশ্নের উত্তর স্বাভাবিক স্বরেই দিলো,
— আপনার গায়ে তো রেশ হয়ে যাচ্ছে, আমিরাকে নিতে পারবেন? এখন দ্রুত উঠুন। এতো কথা বলবেন না দয়া করে এখন।
জুনায়েদ নিরূশ হলো। একবার রুহানি সৈয়দের পানে নজর রেখে পরবর্তীতে সে সত্যিই বাধ্য পুরুষের ন্যায় উঠে নিজের রুমের দিকে গেলো। আয়রাও তার পিছু পিছু ধীর পদক্ষেপে এগোলো। রুহানি সৈয়দ অস্থির চিত্তে চেয়ে রইলেন তাদের যাওয়ার পানে।
জুনায়েদ কক্ষে গিয়ে কাবার্ড হতে শার্ট আর একটা ব্যাগি জিন্স নিয়ে ওয়াশরুমের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। যে পোশাকদ্বয় তার ব্যক্তিত্বের নিদারুণ এক বৈশিষ্ট্য। অপরপার্শ্বে আয়রা গিয়ে অতিদ্রুত মেয়েকে একটা ফ্রগ পড়ালো। মাথার ঘনকালো চুলগুলোকে একগুচ্ছ করে বেঁধে দিলো এক গোলাপি রঙা হেয়ারব্যান্ডের সহিত। এইমুহূর্তে ছোট্ট সত্ত্বা–আমিরার বসে থাকাটাও যেনো দায় হয়ে উঠেছে। সারা শরীর অবশ হয়ে ওঠার দরুণ আয়রা তাকে বসালেও মেয়েটা টুক করে ফের বিছানায় পড়ে গেলো। সনে সনেই জুড়ে দিলো মিহি স্বরে কান্না। আয়রা খানিকটা দিশেহারা হলো। আমিরাকে সামলানো খানিকটা দায় হয়ে উঠছে। রমণী নিজের অংশকে মোলায়েম হাতে কোলে মাঝে আগলে নিতেই যাবে তবে তার পূর্বক্ষণেই শুনতে পেলো হতভম্ব স্বর,
— কী..কী হয়েছে? কাঁদছে কেনো?
শব্দের উৎসের উদ্দেশ্যে ঘার ঘোরাতেই বুশ বর্ষীয়া তরুণী আয়রার চোখ কপালে ওঠার অবস্থা। তার সম্মুখে বর্তমানে এমন এক পুরুষের অবয়ব দাঁড়িয়ে যার সম্পূর্ণ দেহের উপরাংশ উন্মুক্ত। পেশিবহুল বাহু এবং বলিষ্ঠ দেহের বক্ষের নিচ অংশে ছ’খানা ভাঁজ। টুপটুপানি জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে সেখানাটায়। টাওয়ালে পেঁচানো বাকি অংশ। আয়রা আচমকা এমন কিছুর আশায় মোটেও ছিলোনা। জুনায়েদের আদলে উদ্বীগ্নতা স্পষ্টতর। অথচ আয়রার চোখে-মুখে অন্যকিছু। তার মসৃণ; ফর্সা কপালে ভাঁজ পড়লো বিশাল। সাথে সাথে পাশ ফিরে গেলো তার পা দুটো। পিঠপিছু দাঁড়িয়ে থাকা জুনায়েদ তখনও বুঝে উঠতে পারলো কী হলো হঠাৎ। সে একই স্বরে শুধালো,
— কাঁদছে কেনো?
আয়রা কপাল চাপড়ালো নিজের। কাণ্ডজ্ঞান কোথায় থাকে এই বখাটে পুরুষের? সে খানিকটা তোতলালো শব্দ বের করতে গিয়ে। বহুকষ্টে বললো,
— ক..কী করছেন এসব?
জুনায়েদের ভ্রু দু’খান কুঁচকে গেলো। শুধালো গভীর স্বরে,
— কী করছি মানে?
আয়রা হতাশ হলো। খানিকটা বিরক্তি ঝেরেই জবাব দিলো,
— এভাবে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলেন কেনো?
জুনায়েদ নিজের আকর্ষণীয় শরীরের আগা হতে গোড়া অব্দি নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করে অবুঝ কন্ঠে গম্ভীরতা ঢেলে শুধালো,
— কীভাবে?
আয়রা এ’পর্যায়ে রেগে গেলো অল্প। একে তো গায়ে একটা সুতোও নেই তার ওপর এমন খাম খেয়ালি উত্তর? সে নিজেকে সংবরণ করে জবাব দিলো,
— কীভাবে মানে? এভাবে উন্মুক্ত হয়ে এসেছেন আমার সামনে আবার প্রশ্ন করছেন!
আয়রার কথাখানা এবারে জুনায়েদের মাথায় ঢুকলো। সে নিজের সৌন্দর্যের ওপর গর্ব করে বলে উঠলো,
— সো হোয়াট? আই নৌ আ’ম এট্রাক্টিভ।
— গায়ে কিছু পড়ে আসুন।
জুনায়েদ এগোনোর চেষ্টা করে ক্রন্দনরত আমিরাকে কোলে তোলার উদ্দেশ্যে। অথচ আয়রা তা বুঝতে পেরেই আঁতকে উঠলো।
— আপনি যদি কাছে আসার চেষ্টা করে থাকেন তবে দূরে থাকুন। দ্রুত চেইঞ্জ করে আসুন। যাআআআন।
আয়রার এতো পীড়াপীড়িতে জুনায়েদ অতিষ্ঠ হয়। একেই-তো মেয়েটা কাঁদছে তার ওপর এই রমণী কি-না তার শরীর নিয়ে পড়ে আছে। সে বোঝানোর চেষ্টা করে,
— ইয়ার, সি। ও কাঁদছে…
— আমি সামলে নিবো। আপনি দয়া করে কাপড়টুকু পড়ে আসুন।
জুনায়েদ বিরক্ত হলো। কপাল কুঁচকে গেলো আপনাআপনিই। না পেরে সে বিরক্ত এবং ক্ষীপ্ত হয়ে আগালো ওয়াশরুমের দিকে। রুক্ষ স্বরে বললো,
— নাও ইয়্যু ক্যান টার্ন; আ’ম গোয়িং।
জুনায়েদ যেতেই আয়রা দম ফেললো এক বিশাল যেনো কোনো সুনামি হতে সে রক্ষা পেয়েছে। ঘাড় ঘুরিয়ে সে তাকালো এবারে। না! নেই কোথাও। আয়রা এবারে অতি দ্রুত গিয়ে মেয়েকে কোলে নিলো। পিঠে আলতো হস্তে চাপড় দিতে দিতে মাতমসুলভ নির্মল কন্ঠে বললো,
— এইতো আম্মুজান, কাঁদেনা।ওওও!
আমিরা ডুকরে উঠে থেমে গেলো। স্তব্ধ হলো তার ফুঁপানো। আয়রা এবার লাগেজ খুলে বহুকষ্টে এক বোরকা বের করে আনলো। ডাস্ট পিংক যার রং। আয়রা সাধারণত ঝকমকালো বোরকা পছন্দ করেনা। তার কারণ—অতিরিক্ত উজ্জ্বল রঙা এবং ঝমকালো বোরকা পরপুরুষকে নিজের দিকে আকর্ষিত করে। সেই অনুযায়ী সর্বদা আয়রার বোরকাগুলো হয় ভীষণ হালকা রঙের। আয়রা এখনো অব্দি নিজের কাপড়গুলো জুনায়েদের কাবার্ডে সেট করেনি। অথবা..করতে পারেনি। রেগে গিয়ে যদি ফেলে দেয়! সে ভয়ে। আপাতত এই ডাস্ট পিংক রঙের বোরকা বের করে আনলো সে পড়ার উদ্দেশ্যে। আমিরাকেও অবশ্য বোরকা পড়ায় সে। কিন্তু আজ যেহেতু তার জ্বর তাই আর পড়ায়নি। তার বড় একটা কারণ হলো–মানুষের নজর। সকলের নজর তো আর এক নয়। এই ভয়ে সে মেয়েকে সর্বদা আড়ালে রেখেই চলে। আয়রার এসব ভাবনা-চিন্তার মধ্যিখানেই বেরোলো জুনায়েদ। ডার্ক রেড রঙা এক টিশার্ট গায়ে। অতিরক্ত ফর্সা গায়ে এ রঙ যেনো চেরি ফলের মতোই আকর্ষণীয় ঠেকছে। আয়রার পানে এগিয়ে আসতে আসতে সে হাত এগিয়ে দিলো। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো,
— চেইঞ্জ করে এসেছি। এবার অন্তত দাও।
আমিরার প্রতি এই পুরুষের এতো টান এবং মায়ায় অবাক নাহয়ে পারেনা আয়রা। আপ্লুত হয়ে ওঠে তার সারা হৃদয় যখন জুনায়েদ বাস্তবিক-ই আমিরাকে আগলে নেয়। সে তো ভেবেছিলো সৎ মেয়ে বলে হয়তো দূরছাই করবে। যেখানে বিয়ের আসরেই জুনায়েদ তাকে রেখে চলে গিয়েছিলো সেখানে আমিরাকে আপন করা বহুদূরের কথা। আয়রা ধীরলয়ে মেয়েকে জুনায়েদোর হাতে গচ্ছিয়ে দেয়। জুনায়েদ ভীষণ আদুরে ভঙ্গিমায় আগলে নেয় তাকে। দূর্বলতায় জুনায়েদের ঘাড়ে মাথা ঠেকায় আমিরা। জুনায়েদ ছোট সত্ত্বাটির এহেন নির্জীবতায় অসঙ্গত হয়ে আমিরার গালে ঘাড় ঘুরিয়ে শব্দ করে চুমু খায়। বিড়বিড় করে,
— এই তো, আর কিছুক্ষণ। তার মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাবো।
পুরুষটির গায়ে রেশের যেনো কোনো অস্তিত্বই নেই। নিজের চিন্তা ভুলে সে মেতে উঠেছে আমিরার চিন্তায়। নিজের এই অসুখে নিতান্ত তুচ্ছ কিছুই ভাবছে সে। অবশ্য ঘাড়ে, গলায় ভীষণ চুলকোচ্ছে। তবে সেসব দাঁতে দাঁত খিঁচিয়ে সহ্য করছে সে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আয়রা সম্কূর্ণ তৈরি হয়ে এলো। হিজাব; বোরকা এবং নেকাব। চোখদুটো ছাড়া বাকিসবই তার অদৃশ্য। জুনায়েদ থমকালো। চমকালো। হৃদপিন্ডের ধুকপুকানি ন্যানোসেকেন্ডের জন্য বন্ধও হলো। যখন আবার শুরু হলো তখন আগের চেয়ে দ্বিগুণ তা। যেনো কোনো এক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে এই হৃদয়। অশ্বের চেয়ে বহুগুণে দ্রুত তার গতি। আয়রা এসেই তাড়াহুড়ো করলো। বললো,
— চলুন।
জুনায়েদ সম্ভিত ফিরে পেলো। চোখ ঘুরিয়ে এদিক-সেদিক চায়লো। আয়রা কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা হাতে নিতে নিতে দরজার পানে এগোলো। আচানক জুনায়েদের কন্ঠে অবশ্য থামতে হলো তাকে।
— এ..এক সেকেন্ড, আমি একটু আসছি। তুনি আমিরাকে নিয়ে পার্কিংয়ে গিয়ে দাঁড়াও।
আয়রা কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই আয়রার হাতে আমিরাকে তুলে দিলো জুনায়েদ। বললো,
— গো এহেড, আসছি আমি।
আয়রা বাধ্য হয়ে বেরিয়ে এলো। মাথায় কিছু ঢুকলোনা তার। অবুঝ হয়ে চলে এলো সিঁড়ি বেয়ে। নিচে নামতেই রুহানি সৈয়দের দেখা পেলো সে। রুহানি সৈয়দকে দেখেই আয়রার মাথা নত হয়ে গেলো। তিনি সমানে পায়চারি করছেন। করার তো কথাই। একমাত্র ছেলে!
ইতোমধ্যে, এহমাদ শাহরিয়ারও এসে বসেছেন সোফায়। তিনি স্ত্রীর এমব অধৈর্য সত্ত্বার খানিকটা বিনাশ ঘটাতে বললেন,
— এতো চিন্তা কেনো করছো? জুনায়েদের এমন তো আগেও হয়েছে। সমস্যা নেই। ঠিক হয়ে যাবে।
আয়রা এসে সম্মুখে দাঁড়ালো রুহানি সৈয়দের। আয়রার আগমনে থামলেন তিনি। আয়রাকে দেখে এগিয়ে এসে শুধালেন,
— জুনায়েদ কোথায়?
আয়রার আমতা আমতা স্বর,
— আসছেন তিনি। আমাকে..মার্জনা করবেন আম্মু। আসলে আমি জানতাম না যে তার এলার্জি আছে জ্যামে….
— তুমি জানবে কী করে আম্মু? এসব তো ওর জানার কথা। তবুও আমার ছেলেটা কী করে এমন বোকার মতো কাজ করে বসলো আল্লাহ মালুম। এখন আবার আসছে না কেনো!
— জানিনা, বললো পার্কিং এরিয়াতে যেতে। উনি আসছেন।
— এমন বলেছে?
— জ্বী!
— বাড়িতে এলার্জির ওষুধ নেই। নয়তো এতো হয়রানি হতে হতোনা তোমায়।
— তেমন কিছুই নয় আম্মু। এমনিতেও তো আমিরাকে নিয়ে যেতেই হতো।
— তাও ঠিক। আচ্ছা, তাহলে তুমি গিয়ে দাঁড়াও। ও দ্রুতই যাবে।
— জ্বী আম্মা, ফি আমানিল্লাহ!
— ফি আমানিল্লাহ।
আয়রা বেরিয়ে গেলো।
তার কিছুক্ষণের মাঝেই জুনায়েদের আগমন ঘটলো। পুরুষটির পরনে গোলাপি রঙা এক শার্ট সাথে অফ হোয়াইট রঙা ফর্মাল প্যান্ট। রুহানি সৈয়দ ছেলেকে দেখে হতভম্ব হয়ে পড়লেন। এহমাদ শাহরিয়ার তো দাঁড়িয়েই পড়লেন। একে অপরের দিকে অতীব বিস্ময় নিয়ে চেয়ে রইলেন। জুনায়েদ হাতের আস্তিন গোটাতে গোটাতে ভীষণ তাড়াহুড়োয় নামছিলো সিঁড়ি বেয়ে। নিচে নামতেই মায়ের বাঁধায় থমকালো সে,
— জুনায়েদ, আব্বু! রেশের কারণে মাথা টাথাও কী খারাপ হলো আব্বু?
জুনায়েদের ভ্রুদুটো কুঁচকালো। বললো,
— কীসব বলছো মম?
— তুমি কী কালার শার্ট পড়লে আব্বু?
জুনায়েদ একবার নিজের পরনের শার্টের পানে তাকালো। বুঝে গেলো মায়ের এতো আশ্চর্যনীতার কারণ। বাবার পানে তাকাতেই আবারও সেই একই
চিত্র দেখে জুনায়েদের গম্ভীর আদল লাল হতে আরম্ভ করলো। গোলাপি রঙ জুনায়েদ নামক পুরুষের কোনো কালেই পছন্দ নয়। এই শার্টখানা রুহানি সৈয়দ নিজ হাতেই ছেলের জন্য কিনে এনেছিলেন। অথচ জুনায়েদ অবহেলায় তা ফেলে রেখেছিলো। গোলাপি রঙ কোনো কালেই পছন্দ না হওয়া জুনায়েদ কি-না বউয়ের সাথে বোরকার সাথে মিলিয়ে গোলাপি রঙ পরিধান করেছে? এ-যে গত পঁচিশ বছরেও না ঘটা এক কান্ড। পাঁচ বছর বয়সে বোধ হওয়ার পর থেকেই যেখানে জুনায়েদ এতোটা জেদী সেখানে তার এই জেদ এসে নত হলো বউয়ের সামান্য বোরকা পরিধানে? বাহ!
জুনায়েদ এ’পর্যায়ে মাকে এড়িয়ে ছাড়িয়ে যেতে যেতে গম্ভীর স্বরে বললো,
— দেরি হয়ে যাচ্ছে।
জুনায়েদ বেরিয়ে গেলো। ঘাড়-হাত-পা বর্তমানে অসম্ভব হারে চুলকাচচ্ছে তার।নির্ঘাত বেড়েছে এলার্জি। জুনায়েদের এহেন কান্ড দেখে রুহানি সৈয়দ এবং এহমাদ শাহরিয়ার না হেসে পারলেন না। একে অপরের পানে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসলেন।
জুনায়েদ বেরিয়ে আয়রা এবং আমিরার কাছে গেলো। আয়রার নৈকট্যে গিয়ে পৌঁছাতেই আয়রা জুনায়েদের আগমনী আভাস পেয়ে পাশ ফিরতেই হতভম্ব হয়ে গেলো। পোশাক পাল্টে গোলাপি রঙা শার্ট? এই শার্ট কেনো পড়লো আবার? সে ভ্রু কুৃচকে শুধালো,
তাকদীর পর্ব ১৪
— পোশাক পরিবর্তন করলেন কেনো আবার?
জুনায়েদ আমিরাকে কোলে তুলে নিয়ে আয়রার প্রশ্নের জবাব দিতে কোনো এক তাল-বাহানা খুঁজলো। অতঃপর আমিরার মাথায় গোলাপি হেয়ারব্যান্ড দেখে সম্মুখে এগোতে এগোতে গলা খাঁকারি দিয়ে এক হাস্যকর যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করলো,
— আমিরার হেয়ারব্যান্ডের সাথে ম্যাচ করতে।
আয়রা হতভম্ভ হয়ে চেয়ে রইলো তার যাওয়ার পানে।
