তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩৫
নীতি জাহি
হল রুম সাজানোর দায়িত্ব পড়েছে রিক্তার উপর। হল টা বাড়ির ডান পাশে অবস্থিত। বাড়ির নিজস্ব হল রুম। বাড়ির বেশির ভাগ অনুষ্ঠান এখানে হয়। সেই তখন থেকে মুখটা পেঁচার মত করে বসে আছে প্লাস্টিকের চেয়ারে। সে কিছুইতেই বুঝতে পারছেনা ইমরান শরীফের ব্যবসায়িক প্রোগ্রামের জন্য প্লাস্টিকের চেয়ার এনেছে ইভেন্ট এর লোকজন। দেশের বাইরে থাকা হয় বছরের অর্ধেক টা সময় । পি এইচ ডি টা কবে শেষ হবে!শেষ হলেই উদ্ধার। আগে যদি জানতো এত বড় একটা ব্লান্ডার হবে তাহলে কিছুতেই এই দায়িত্ব ইভেন্টের হাতে তুলে দিতোনা। সব তাকে নতুন হাতে সামলাতে হবে। অন্যদিকে প্রোগ্রামের কর্ণধার ইমরান শরীফ হাতে একটা কার্ড ধরিয়ে বললো,যা কেনার এবং যা অতিরিক্ত তা যেন এখান থেকে খরচ করা হয়।বাহ কি সুন্দর অনুরোধ তার, কে বলেছে এত সুন্দর জ্ঞানের বানী অর্চনা করে কে*টে পড়তে। ভাগ্য করে একটা জীবনসঙ্গী পেয়েছে রিক্তা, তার বন্ধুর প্রোগ্রাম নিয়ে কোনো চিন্তাই নেই।ইচ্ছে করছে নয়নকে হাতের সামনে এনে এই চেয়ার গুলোতে বসিয়ে হাত পা বেধে রাখতে। প্রোগ্রামে এসে বন্ধুর মান সম্মান ভ্যানিশ হতে দেবে না তার প্রানপ্রিয় বন্ধু ইমরান। রিক্তা বিরক্ত হয়ে নয়নকে কল দেয়।
‘ কোথায় রাজা মশাই, এই অবস্থায় ফেলে পগার পার?’
নয়ন ড্রিংকস এর বোতল টা এক পাশে রেখে ইমরানের দিকে তাকিয়ে ফোনের উত্তর দিলো,
‘এই যে আমি তো একটু ইমরানের রুমে ফাইল দেখছিলাম’।
এত বড় মিথ্যা শুনে ইমরান চোখ বড় বড় করে নিলো। চোখ রাঙানো দেখে ইশারায় হাত জোর করে বুঝালো এবারই শেষ আর হবে না। ও পাশ থেকে রিক্তার কর্কশ স্বর শোনা যাচ্ছে।মেয়েটা নাজেহাল হয়ে আছে, তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ভুল সে আর্কিটেক্ট। যদিও নয়ন মহাখুশি কারণ বউ বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকে।সে চিল করে একমাত্র মেয়ে নাহিয়াকে নিয়ে। রিক্তা কটমট করে ফোনটা রেখে দিলো। ইমরান গম্ভীর স্বরে বললো,
‘ মিথ্যা বললি কেনো? আর এই হুইস্কি কেনো এনেছিস?’
‘ ওই তুই এমন ভদ্র পোলার মত বিহেভ করোস কেন? তুই জীবনে ম*দ খাস নাই!!!’
এমন সময় মিনহাজ ঢুকলো ইমরানের কামরায়। ইমরান নিজের অজান্তে হুড়মুড়িয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। মিনহাজের দিকে তাকিয়ে বলে,
‘ বিশ্বাস করো ভাই,এই জিনিস আমি নয়নকে আনতে বলিনি। মাত্র রিক্তাকে মিথ্যা বলেছে এর মধ্যে আমার রুমে নিয়ে আসছে এই বোতল।’
মিনহাজ হতবাকের শেষ পর্যায়ে গিয়ে গট গট করে বললো,
‘তুই আমাকে সাফাই কেনো দিচ্ছিস?’
নয়ন ও বিস্মিত। ইমরান আচমকা চোখ মুখ স্বাভাবিক করে নিজের কাজেই হতভম্ব। জোরেই আওড়ালো,
‘আসলে তো আমি তোমাকে কেনো এসব বলছি।’
রুম জুড়ে অস্থিরতা। কি অস্বাভাবিক পরিবেশ ইমরান শরীফ কিনা হুইস্কির জন্য মিনহাজকে সাফাই দিচ্ছে। অকস্মাৎ এই ভীত,রজনী স্বরূপ, অন্ধকারাবৃত নিরবতা ভেঙ্গে নয়ন অতিমাত্রায় শব্দ করে হেসে বলে উঠলো,
‘ মিনহাজ ভাই তোমার মেয়ের জামাই শ্বশুরকে সাফাই দিচ্ছে। ‘
ইমরানের মনে হচ্ছে দম আটকে যাচ্ছে।এমন অদ্ভুত লজ্জা সে আর পায় নি। পুরো সম্পর্কের গোলকধাঁধায় আটকে আছে। কে যে বন্ধু,কে যে ভাই, শ্বশুর কাকে কি সম্বোধন করে কি বলবে। তাকিয়ে দেখলো মিনহাজই লজ্জা পাচ্ছে। পরক্ষনেই মুচকি হাসি দিয়ে মিনহাজকে লজ্জার হাত থেকে রক্ষা করে বললো,
‘ জানিনা কেন যেন হঠাৎ মনে হলো তুমি আমার হাতে হুইস্কি দেখলে ভাবতে পারাও আমি তোমার মেয়ের যোগ্য নই। কোনো বাবাই চায় না এমন মেয়ের জামাই।তাই হয়তো নিজের অজান্তে মনের ভয় থেকে সাফাই দিয়েছি। তবে আজ আমার মনে একটা প্রশান্তি কাজ করছে। তোমার মেয়ে আমার জীবনে আসার আগেই আমি ছেড়ে দিয়েছি এসব। একটা জিনিস ছাড়তে পারিনা। ওটা তোমার মেয়ের দায়িত্ব। ‘
মিনহাজ কাছে এসে ইমরানকে জড়িয়ে ধরলো।
‘ তুই এভাবে,সেভাবে,যেভাবে খুশি ওর কেয়ার কর,ভালোবাস।আমাকে এসব কৈফিয়ত দিতে হবে না। মোনা আমার চেয়ে ও এখন তোকে নিয়ে বেশি ভাবে।’
ইমরান মিনহাজকে বসার ইশারা দিয়ে নিজেও গিয়ে সোফায় বসলো। উত্তর দিলো,
‘তাই নাকি?’
মিনহাজ মাথা নেড়ে বললো,
‘হুম, তুই যেদিন কক্সবাজার গেলি উত্তেজিত হয়ে ফোন দিয়ে বলে -বাবা উনার শরীর তো ভালো না,একটু ফোন দিয়ে দেখোনা কেমন আছে? হাসি পেলো আমার। তুই ফোন দিস ওর খবর নিতে আর ও দেয় তোর খবর নিতে।’
ইমরান হাসে।সেই হাসিতে কি যেন ছিলো। নয়ন,মিনহাজ তাকিয়ে দেখে সেই হাসি। শত বছরের ঐতিহ্য, প্রতিটি মানুষের অধরা মোনালিসা যেন চিত্রকর্ম থেকে বেরিয়ে তার ঘরেই পদার্পন করেছে। সেই অমূল্যবান রত্ন পেয়ে এই হাসি সর্বোত্র ছড়িয়ে পড়েছে। সেই সুখ তার একান্ত নিজের। কারো সাথে ভাগাভাগি করার মত নয় এই সুখ।
সন্ধ্যা নেমেছে। পাখিরা সব নীড়ে ফিরেছে। গোধূলি যেন ছুয়ে দিয়েছে প্রকৃতিতে। পরিবেশ বেশ ঠান্ডা। ‘ঔশান প্যালেসে’র হলে গেস্ট রা সবাই চলে এসেছে। রিক্তা পুরো ব্যাপারটি খুব সুন্দর করে গুছিয়ে নিয়েছে,সাজিয়ে পরিপাটি করে পুরো হলরুমের গোমড় চেহারা, চমৎকার ঝাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে বাড়ি সরূপ বানিয়ে দিয়েছে।
সবার সাথে কোলাকুলি করছে ইমরান মিনহাজ এবং নয়ন। বিজনেস পার্টনার,কলিগ,ইনভেস্টর, বোর্ড অফ ট্রাস্টি,কোম্পানির এমপ্লয়ি সবাই এসেছে পরিবার-পরিজন নিয়ে। এত বড় পার্টি ইমরান এর আগে কখনো আয়োজন করেনি।আজ ওদের কোম্পানির বারো বছর পদার্পনের দিন। সেই আনন্দ সবার সাথে ভাগাভাগি করতে এর সাথে জড়িত নতুন পুরাতন এমপ্লয়ি সবাই আজ আমন্ত্রিত। দরজার দিকে চোখ পড়তেই ইমরান দেখতে পেলো কাঁকন এসেছে। কয়েক বছর আগে একটা ভুলের শেষ হবে আজ। ইমরানের একটা ডিল এর ক্লায়েন্ট হিসেবে ব্যবসায় ভুলবশত কাঁকনকে পার্টনার করে নিয়েছিলো। কালো জামদানীতে দেখতে বেশ শালীন মনে হচ্ছে। কি মনে করে আজ শালীন পোশাকে এসেছে!! ফুল স্লিভ ব্লাউজ পরেছে। গলায় সিম্পল সেট। চুল সেট করে বেণী করা। হয়তো নতুন ভাবে ইমরানকে আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টা। কাঁকন ইমরানের দিকে এগিয়ে আসছে। ইমরান হালকা সাইড করে মিনহাজের দিকে এগিয়ে এলো। মামুন সাহেব,হাসিনা বেগম,মায়া,মনসুর এবং সালমা এখানে দাঁড়িয়ে আছে। হাসিনা বেগম মুখে হাসি নিয়ে বললো,
‘ কেমন আছো নাত জামাই?’
ইমরান মুচকি হাসছে।
‘ ভালো আন্টি,আপনার শরীর কেমন?’
‘দাদী কইবা। বুঝবার পারছো?’
‘আমার মুখে দাদী শুনতে ভালো লাগবে?’
হাসিনা বেগম হেসে বললেন, ‘ম্যানেজ কইরা নিমু। তা আমার নাতিন টা কই?’
‘সামান্তা আর তুশি গিয়েছে ভেতরে নিয়ে আসছে বোধ হয়?’
মায়ার দিকে তাকিয়ে ইমরান মৃদু হাসি দিয়ে বললো,
‘অনেক ধন্যবাদ মায়া আজকে আসার জন্য। সত্যি আমি খুব খুশি হয়েছি। মোনালিসা ও অনেক খুশি হবে তোমাকে দেখলে।’
মায়া ক্ষীন হাসলো।এই হাসির মধ্যে সত্যি মায়া মেশানো। আজ প্রতিশোধের আগুন নেই। মেয়েটা কেমন শান্ত আজ।
সাদা জামদানীতে হাল্কা গোল্ডেন এবং মেজেন্ডা কাজ। কনুই পর্যন্ত সাদা কারচুপী কাজের ব্লাউজ। গলায় ভারী জড়োয়া সেট কুন্দন এর। চুলে খুব গুছানো খোঁপা সাথে মোড়ানো বেলী ফুলের গাজরা। কানে দুটো কুন্দনের স্টাড। মুখে হালকা মেক আপ আর ঠোঁটে মেজেন্ডা লিপস্টিক। এই প্রথম এত গাঢ় লিপস্টিক লাগিয়েছে মোনা। শ্যামাকন্যার এই সাজ যেন ঝলসানো। তুশি,নওশীন,সুরাইয়া এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো।সামান্তা হাঁ করে চেয়ে আছে। এক মিনিট পর বলেই ফেললো,
‘ বড় মামী মাশাল্লাহ। আল্লাহ ব*দ*ন*জ*র থেকে তোমাকে রক্ষা করুক।’
‘আমার তো ভাবতেই গর্ব হচ্ছে আমার একজন পরীর মত চাচী শ্বাশুড়ি আছে।’ খুশিতে নওশীন জড়িয়ে ধরে বলল।
মোনা লজ্জা পেয়েছে। গাল দুটোতে হালকা ব্লাশন দিয়েছে।লজ্জা পেয়ে আরো গোলাপি লাগছে। তুশি আকসাৎ বললো,
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩৪
‘সামান্তা ভাইজানকে কখনো কারো দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকাতে দেখেছো?’
‘না ছোট মামী।’
‘আজ দেখবে।’
ওরা আর দেরী না করে মোনাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। চারদিকে কাঁচা ফুলের ঘ্রাণ। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে গন্ধ গুলো সব সাদা ফুলের। কখনো নাকে রজনীগন্ধার ঘ্রাণ, কখনোবা বেলী,দোলনচাঁপা, গন্ধরাজ।হালকা গোলাপের একটা ঘ্রান ও লাগছে। হলের সামনে চলে এসেছে ওরা।
