Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২
‎আফীফা আফনান

‎উইপোকা যেমন আড়ালে থেকে একটা আস্ত কাঠের গুঁড়িকে কুরে কুরে খেয়ে ভেতরে ঘুণ ধরিয়ে দেয়, ঠিক তেমনি করে অতি চেনা দুটো মানুষ মেহুলের জীবনের সমস্ত ভালোবাসা আর বিশ্বাসকে আজ কেটেকুটে শেষ করে দিয়েছে। তাসের ঘরের মতো এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়েছে তার বারো বছরের সাজানো স্বপ্নগুলো। ওরা ভেবেছিল, এই আচমকা আঘাতে মেহুল হয়তো কাচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে, বুক চাপড়ে কাঁদবে আর কান্নার ফলে মাথা নুইয়ে দেবে।
‎​কিন্তু না, মেহুল ভাঙেনি। সে আর ভাঙবে না, আর না কখনো কারো করুণার কাছে নিজের মাথা নত করবে।

‎করিডোর ঘেঁষা খোলা ব্যালকনিটায় গিয়ে দাঁড়াল মেহুল। সেখান থেকে ধেয়ে আসা হিমেল বাতাসে নিজের ভেজা চুলগুলো উড়ে যাওয়ার মাঝেই সে তার শিরদাঁড়াটা শক্ত করে সোজা করাল। চোখের পানি শুকিয়ে যাওয়া পাথুরে দৃষ্টিটা সে মেলে দিল অন্তহীন আকাশের দিকে। শূন্য সেই আকাশটার দিকে তাকিয়ে মেহুল যেন নীরব এক হিসাব কষছে—বিগত দুটো বছর ধরে তার সাথে হওয়া প্রতিটা প্রতারণার হিসাব, প্রতিটা মিথ্যার হিসাব, আর প্রতিটি মুহূর্তের অপমানের হিসাব।
‎মেঘ যেমন ভারী হতে হতে একসময় বজ্রপাতে রূপ নেয়, মেহুলের ভেতরের স্তব্ধতাও এখন তেমনি এক প্রলয়ের ইশারা দিচ্ছে। সে প্রস্তুত হচ্ছে, এবার হিসাব চুকানোর পালা।

‎বর্তামানে মেহুল তার বাবা ইকবাল সাহেবের রুমে দাঁড়িয়ে ভাবনায় বিভোর, কিন্তু হঠাৎ এক মৃদু কাশির শব্দে মেহুলের ভাবনার সুতোটা ছিঁড়ে গেল। তড়িৎগতিতে পেছনে ফিরে তাকাতেই তার বুকের ভেতরটা যেন এক নিমিষে মোচড় দিয়ে উঠল।
‎কারন পেছনে বসে ছিলো তার বাবা। ​কখন যে তার বাবা, ইকবাল সাহেব, ঘরে এসে বিছানার এক কোণে মাথা নিচু করে বসে পড়েছেন—মেহুল টের পায়নি। পাহাড়ের মতো যে শক্ত মানুষটা আজীবন তার জীবনে আসা সব ঝড়-ঝাপটায় তাকে আড়াল করে রেখেছে, আজ তাকে কেমন যেন জবুথবু, বড্ড অসহায় দেখাচ্ছে। বুক উঁচিয়ে চলা মানুষটা আজ কেমন অদ্ভুতভাবে নুইয়ে পড়েছেন!
‎​এইতো আজ সকালেও মেহুল তার বাবাকে হাস্যোজ্জ্বল মুখে দেখেছিল! একমাত্র মেয়ের বিয়ে বলে কথা—মানুষটার পা যেন মাটিতে পড়ছিল না। খুশিতে সারা বাড়ি মাথায় করে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছিলেন। সবাইকে কাজের তাগিদ দিচ্ছিলেন।
‎​আর এখন? সমস্ত আলো নিভে যাওয়া কোনো শূন্য ঘরের মতো তিনি একদম নিশ্চুপ হয়ে বসে আছেন। মেয়ের ভাঙা কপাল আর নিজের অপূর্ণতা যেন এক লহমায় এই বৃদ্ধ বাবার আজীবনের অহংকার আর শিরদাঁড়াটাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

‎বাবার এই রূপ মেহুলের বুকের ভেতরটা ওলটপালট করে দিল। মায়ের মৃত্যুর পর যে মানুষটা মায়ের স্নেহ আর বাবার শাসন—দুটো উজাড় করে দিয়ে তাকে বুকে আগলে রেখেছে, আজন্ম তাকে বুক চিতিয়ে বাঁচতে শিখিয়েছে, তাকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে মেহুল আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না।
‎​সে ধীরপায়ে ব্যালকনি থেকে ঘরের ভেতরে এগিয়ে এল। বাবার ঠিক সামনে এসে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসল।
“বাবা!”
‎​মেহুলের ডাক ও স্পর্শ পেয়ে ইকবাল সাহেব ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকালো। সাথে সাথেই সেই মুখটার দিকে তাকিয়ে যেন মেহুলের বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল। যে বাবার চোখের দিকে তাকালে একসময় সাহসে বুক ভরে উঠত, আজ সেই চোখে কেবলই এক পরাজিত, ব্যর্থ বাবার সীমাহীন শূন্যতা। চোখের কোণগুলো লাল হয়ে আছে, মুখের চামড়াগুলো যেন এক লহমায় আরও কুঁচকে গেছে।
‎​বাবাকে এভাবে দেখে মেহুলের নিজের চোখ দুটোও নোনা জলে ভরে উঠতে চাইল, কিন্তু সে দাঁতে দাঁত চেপে চোখের পানিকে ভেতরেই অবরুদ্ধ করে দিল। চোখের এক ফোঁটা পানিও সে গাল বেয়ে নামতে দিল না। উল্টো ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান কিন্তু দৃঢ় হাসি ফুটিয়ে আলতো করে বলল, “কী হয়েছে, বাবা?”
‎​ইকবাল সাহেব কিছু সময় নিথর হয়ে রইলেন। তারপর বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “আরমান বিয়ে করতে রাজি নয় রে, মা। ও এই বিয়েতে বারণ করে দিয়েছে। ও নাকি এই বিয়েটা করতে পকরবে না।”

‎​বলেই ইকবাল সাহেব দুই হাতে নিজের মুখ ঢাকলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে আসছিল, “ছেলেটা এভাবে আমাদের ঠকাল? বাইরে এত এত মানুষ, কত আত্মীয়স্বজন! আমার ব্যবসায়িক অংশীদারেরা সবাই জানে আজ আমার মেয়ের বিয়ে। আর সে এখন শেষ মুহূর্তে এসে বলছে বিয়ে করবে না!তোর কি হবে? সবাইকে আমি এখন কী জবাব দেবো? সমাজকে মুখ দেখাব কী করে? ”
‎​একটু থেমে, মাথা নিচু করেই ইকবাল সাহেব ভাঙা গলায় যোগ করলেন, “ও বলল… ও নাকি অন্য কোনো মেয়েকে পছন্দ করে…”
‎​এতক্ষণ পাথর হয়ে সব শুনলেও মেহুল এবার শান্ত কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল, “অন্য কাউকে নয় বাবা, ও আনিকাকে পছন্দ করে। তুমি বলতে ইতস্তত করছ কেন?”
‎​বাবার মুখের ঢাকা হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে মেহুল বলল, “এই দেখো আব্বু, তোমার মেয়ে একদম শক্ত আছে। আমার একটুও কষ্ট হচ্ছে না, বাবা।”
‎​ইকবাল সাহেব মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে অপরাধবোধের তপ্ত নোনা জল। তিনি ডুকরে উঠে বললেন, “সরি মা! আমি পারলাম না তোকে সুখী করতে। তোর মাকে দেওয়া শেষ কথাটাও আমি রাখতে পারলাম না। বাবা হিসেবে আমি আজ বড্ড ব্যর্থ রে, মেহু!”
‎​মেহুল তার বাবার কাঁপতে থাকা হাতের মুঠোটা নিজের দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরল। গভীর ভালোবাসায় বলল, “আমি একদম ঠিক আছি বাবা, এই যে দেখো আমি হাসছি। আর কে বলেছে তুমি ব্যর্থ? তুমি এই পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বাবা!”

মেহুলের কথাতে ‎​ইকবাল সাহেব এবার ফ্যালফ্যাল করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর মেয়েটা আসলেই হাসছে। কিন্তু একজন বাবার চোখকে কি আর এভাবে ফাঁকি দেওয়া যায়? তিনি তো জানেন, এই হাসির আড়ালে তাঁর মেয়ের বুকটা কেমন করে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। অথচ আজ বাবা হয়েও তিনি কতটা নিরুপায়!
‎​বাবাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেহুল হাতের বাঁধনটা আরেকটু শক্ত করে নিল। এক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল, “বাবা, আমি যদি আজ তোমার কাছে কিছু চাই, তুমি আমায় দেবে?”
‎​মেয়ের এমন কথায় ইকবাল সাহেবের বুকের ভেতরের পিতৃত্বটা যেন আবার জেগে উঠল। তিনি ভেজা চোখেই পরম আদরে বললেন, “অবশ্যই দেবো মা। আমার মা জননী চাইবে আর তার বাবা দেবে না, তা কি কখনো হয়? কী চাস তুই, বল আমায়?” আরমানকে আমি কি শাস্তি দেব। কি করলে তুই খুশি থাকবি বল মা।”
‎​মেহুলের চোখের মণি দুটো এবার তীক্ষ্ণ ও স্থির হয়ে উঠল। সে গম্ভীর গলায় বলল, “তেমন কিছুই না বাবা শুধু আজ এই বাড়িতে যা হবে, যেভাবে হবে—সব হতে দাও। আজ এই বাড়িতে বিয়ে হবে ঠিকই, তবে কনে আমি নই; বিয়েটা হবে আনিকা আর আরমান ভাইয়ের। ওরা ঠিক যেমনটা চেয়েছে, সবকিছু ঠিক তেমনভাবেই হবে। তুমি এতে একটুও দ্বিমত করবে না, আমাকে কথা দাও বাবা।”
‎​মেয়ের মুখে এমন অভাবনীয় কথা শুনে ইকবাল সাহেব চমকে উঠলেন। তিনি প্রবল দ্বিমত করতে চাইলেন, “কী বলছিস এসব মেহুল? আরমান তোকে এভাবে অপমান করার পর আমি নিজে দাঁড়িয়ে ওদের বিয়ে দেবো? না, এ হতে পারে না!”

‎​মেহুল এবার বাবার চোখে চোখ রেখে পরম শান্ত কিন্তু অটল স্বরে বলল, “তুমি আমাকে বিশ্বাস করো তো, বাবা? ভরসা রাখো আমার ওপর?”
‎​ইকবাল সাহেব মেয়ের চোখের সেই অটল বিশ্বাস দেখে মুহূর্তেই দুর্বল হয়ে গেলেন। ফিসফিস করে বললেন, “নিজের জানের চেয়েও বেশি করি, মা।”
‎​”তাহলে আমার এই কথাটা মেনে নাও, বাবা। বাকিটা আমার ওপর ছেড়ে দাও।”
অতঃপর ‎​ইকবাল সাহেব মেয়ের সেই শান্ত জেদের কাছে আর টিকতে পারলেন না। তিনি স্তব্ধ হয়ে শুধু মাথা নাড়লেন, রাজি হলেন।
ইকবাল সাহেবের সম্মতি পেতেই ‎​মেহুল বাবার হাতের ওপর আলতো করে চাপ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
এদিকে ‎​ইকবাল সাহেব নিঃশ্চুপ হয়ে শুধু মেয়ের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর মনে হলো, তাঁর চেনা মেহুল নামের নরম মেয়েটি যেন আজ এক লহমায় বদলে গেলো। যেন এক অন্য মানুষে রূপান্তরিত হয়ে ঘর থেকে বিদায় নিল।

‎নিচে তখন আকদের জমকালো আয়োজন চলছে। মেহুলের কথামতো ইকবাল সাহেব নিজের মেয়ের বিয়ের আসরেই আরমান ও আনিকার বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। আয়োজনটি অত্যন্ত ঘরোয়া হওয়াতে শুধু অতি ঘনিষ্ঠ ও কাছের মানুষদেরই দাওয়াত করা হয়েছিল। তাই স্বল্প মানুষের উপস্থিতিতেও পুরো বাড়ি এখন শোরগোলে মুখর।
‎​কিন্তু এই উৎসবমুখর শোরগোলের মাঝেও ইকবাল সাহেব যেন একাকী, নিঃসঙ্গ এক দ্বীপের মতো বসে আছেন। একটা কৃত্রিম হাসি জোর করে ঠোঁটে ঝুলিয়ে রেখেছেন তিনি। কারণ, মেয়েকে ওয়াদা করেছেন—যাই হয়ে যাক না কেন, আজ তিনি চুপচাপ সবটা দেখবেন, কোনো দ্বিমত করবেন না।
এদিকে ইকবাল সাহেবের পাশাপাশি মিনারা বেগমের মুখটাও বিষণ্ণতায় কালো হয়ে আছে। মেহুলের প্রতি হওয়া এই চরম অন্যায়টা তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না, কারন তার বোন মোহনা যখন মৃত্যু শয্যায় তখন মেহুলকে তার হাতে আমানত হিসেবে তুলে দিয়েছিলো। বলেছিলো নিজের মেয়ে মনে করে তাকে আগলে রাখতে। তাইতো বোনের কথা সে যথারিতি পালন করেছে। মেহুলকে বোনের মেয়ে কম নিজের মেয়ে বেশি ভেবেছে।বুকে আগলে নিয়ে মানুষ করেছে। তাই আজ যখন মেহুলের সাথে এমন অন্যায় হচ্ছে তখন তার বুকের ভেতরটা ক্ষোভে আর রাগে ফেটে পড়ছে।

‎​একদিকে যখন এক বুক ভাঙা বিরহ আর নীরবতা, ঠিক অন্যদিকে তখন খুশির ফোয়ারা বইছে। আরমানের মা, সুমনা বেগমের মুখ থেকে যেন হাসি সরছেই না। পাশেই দাঁড়িয়ে আরমানের ছোট বোন কেয়া। অন্যদিকে আনিকার মা—তিনিও অত্যন্ত গদগদ মুখে অতিথিদের আপ্যায়ন করছেন। তাদের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, এই আকস্মিক পালাবদল যেন তাদের আগে থেকেই জানা ছিল, সবকিছু যেন তাদের ছক মেনেই ঘটছে। শুধু হুইলচেয়ারে চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে আছেন মেহুলের মামা ও আনিকার বাবা, আজমল সাহেব। তাঁর এই নীরবতা যেন এক অপরাধবোধের প্রতীক।
‎​পুরো হলরুম জুড়ে যখন কোলাহল—সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে বর-বউ কখন নিচে নামবে। ঠিক তখনই আরমান ও আনিকা রাজকীয় ভঙ্গিতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো।
‎​আরমানের পাশে লাল বেনারসি পরিহিতা বধূবেশে আনিকাকে দেখেই পুরো রুম জুড়ে যেন হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া বয়ে গেল। অতিথিদের মাঝে শুরু হলো কানাঘুষা আর গুঞ্জন। একেকজন একেক রকম মন্তব্য করতে শুরু করেছে। তবে সেসবকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সুমনা বেগম হাসি মুখে আরমান ও আনিকাকে এনে সোফায় বসালো। আরমান আর আনিকা—দুজনের ঠোঁটের কোণে তখন তৃপ্তির হাসি ছড়ানো। এদিকে বর-বউ আসতেই কাজী সাহেবও তাঁর খাতা খুলে বিয়ের কাগজপত্রের প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন।

‎​ইকবাল সাহেব অপলক দৃষ্টিতে শুধু তাকিয়ে দেখলেন অতিপরিচিত ওই বেইমানগুলোর দিকে। বুকটা তাঁর ভেঙে যাচ্ছে এই ভেবে যে—কীভাবে তাঁর সরল মেয়েটাকে এভাবে ছুড়ে ফেলে দিয়ে তারা এমন অট্টহাসি হাসছে!
‎​ঠিক তখনই কয়েকজন প্রতিবেশী মহিলার ফিসফিসানি ভেসে এলো ইকবাল সাহেবের কানে। একটু দূরেই কেউ একজন একটু ঝুঁকে পাশে থাকা আরেকজনকে বলছে, “আচ্ছা, আজ তো এই বাড়ির মেয়ে মেহুল আর আরমানের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল না? তাহলে মেহুলের জায়গায় ওর মামাতো বোন আনিকা কী করছে? আর মেহুলই বা কোথায়?”
‎​পাশ থেকে আরেকজন মুখ বেঁকিয়ে রসিয়ে রসিয়ে উত্তর দিল, “আরে, শুনলাম ছেলেই নাকি বিয়ে করতে বারণ করে দিয়েছে! আর করবে নাই বা কেন? মেয়েটার তো নাকি কোনোদিনও বাচ্চা হবে না! জেনেশুনে এমন বন্ধ্যা মেয়েকে কোন ছেলে বিয়ে করবে, বলো?”

‎​আরেকজন একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলার ভান করে আফসোসের সুরে যোগ করল, “এত টাকা-পয়সা থেকে কী লাভ, যদি কপালেই এমন খুঁত থাকে! ইকবাল ভাইকে তো এখন সারা জীবন এই মেয়েকে মাথার বোঝা বানিয়ে বয়ে বেড়াতে হবে। এমন বন্ধ্যা মেয়েকে আর কেই-বা বিয়ে করবে!বিয়ে দিলেও কোন ল্যাংড়া, লুলা বা কানার সাথেই দিতে হবে।” বলেই তারা হেসে উঠলো।
মহিলাগুলো যখন কথাগুলো বলে তাদের মনে শান্তি পাচ্ছিলো ঠিক উল্টোদিকে ওই কথাগুলোই তপ্ত শূলের মতো ইকবাল সাহেবের বুকটা ক্ষতবিক্ষত করে দিল। নিজের কন্যার এই প্রকাশ্য অপমান সহ্য করার মতো ক্ষমতা কোনো বাবার থাকে না। এদিকে তাঁর ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মিনারা বেগমও কথাগুলো স্পষ্ট শুনেছেন। আকস্মিক এমন কথাতে যে তাঁর রক্ত মাথায় চড়ে গেল। ওই নোংরা মানসিকতার মহিলাগুলোকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি যেই না পা বাড়াতে চাইলেন, ঠিক তখনই তাঁর চোখ গেল সিঁড়ির দিকে।
‎​সেখানে সাদা রঙের একটা ছিমছাম থ্রি-পিস পরে দাঁড়িয়ে আছে মেহুল।
‎​সাদার শুভ্রতায় মেহুলকে আজ বড্ড শান্ত অথচ অপ্রতিরোধ্য লাগছে। সে চোখের ইশারায় মিনারা বেগমকে স্পষ্ট নিষেধ করল—সব কথা এড়িয়ে চুপচাপ থাকতে বলল। মেহুলের চোখের সেই অটল চাহনি অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা মিনারা বেগমের হলো না। তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। কিছু বলতে না পেরে শুধু একবার নিজের দুলাভাই ইকবাল সাহেবের দিকে তাকালেন।
‎​আর ইকবাল সাহেবের বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো এক দীর্ঘ, তপ্ত নিঃশ্বাস—যা এই অপমানের আগুনে জল ঢালার বদলে হয়তো এক নতুন ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছিল।

একসময় ‎মেহুল ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। তার শান্ত চোখ জোড়া পুরো হলরুমের ওপর একবার বুলিয়ে নিল। বড্ড চেনা এই মুখগুলোকে আজ কেমন যেন অচেনা লাগছে তার।
‎​দৃশ্যপটটা বড় অদ্ভুত! একদিকে তার বাবা, মিনারা মনি আর হুইলচেয়ারে বসা মামার নুয়ে পড়া, অপরাধবোধে জর্জরিত মুখ। আর ঠিক তার বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে সুমনা ফুফু, মামী আর দুই চরম প্রতারক—আরমান ও আনিকার প্রাণবন্ত, হাস্যোজ্জ্বল অবয়ব। নিজেদের বন্ধুদের সাথে কেমন হেসে হেসে কথা বলছে দুজনে।

‎​মেহুলের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষাক্ত হাসি ফুটে উঠল। সে বুঝল, এই নাটকের দর্শক শুধু সে একাই ছিল; বাকিরা সবাই এর কুশীলব। একদিন আগেও যে ফুফু মেহুলকে চোখে হারাতো পারতোনা বুকের ভেতরে গুজে নিতে, অন্যদিকে আনিকাকে দেখতে পারত না,সে আজ আনিকাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছে। অন্যদিকে মামী তার চোখে মুখেও উপচে পড়া খুশি।
অন্যদিকে যে আনিকা আর আরমান মিলে মেহুলের বারো বছরের সাজানো জীবনটা যে এভাবে ছারখার করে দিল, অথচ তাদের চোখেমুখে সামান্যতম আফসোসের রেখাটুকুও নেই! মেহুল নিঃশব্দে হাসল। সে এতকাল যাদের নিজের ভেবে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে গেছে, তারাই আজ তার পিঠে সবচেয়ে বড় ছুরিটা বসিয়েছে।
অতঃপর ‎​মেহুল আর কারো দিকে না তাকিয়ে সোজা গিয়ে দাঁড়াল খাবারের টেবিলের সামনে। মেহমানদের জন্য সাজিয়ে রাখা হরেক রকমের খাবারে বাটি গুলোর দিকে তাকিয়ে ঢাকনা খুলে ও তাদের সুগন্ধি নিয়ে পাশ থেকেই একটি ছোট বাটি ও চামুচ তুলে নিলো।

‎এদিকে মিনারা বেগম মেহুলকে ডাইনিং এর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে গেলেন। অতঃপর মিনারা বেগম মেহুলের একদম কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ব্যথিত চোখে কিছু একটা বলতে চাইলেন, কিন্তু তাকে আগেই ওনাকে থামিয়ে দিয়ে সাজানো মিষ্টির থালাটার দিকে আঙুল তাক করে মেহুল খুব শান্ত ও স্বাভাবিক গলায় বলে উঠলো, “আমার না খুব মিষ্টি খাওয়ার ক্রেভিং হচ্ছে মনি। আমাকে কয়েকটা মিষ্টি তুলে দাও তো! আমার প্রিয় কালো জামটাও অবশ্যই দিবে বুঝলে মনি।”

এমন চরম পরিস্থিতে মেহুলের মুখে ‎হঠাৎ এমন কথাতে মিনারা বেগম বেশ অবাক হয়ে মেহুলকে শুধালেন, “তুই এগুলো মানে, মিষ্টি খাবি মেহু?”
‎মহুল হেসে জবাব দিলো, “কেন নয়! আফটার অল, আজ তো খুশির দিন। বাড়িতে বিয়ে বলে কথা এত আয়োজন করে রান্না হলো, এতো মিষ্টি বানানো হলো। একটু খেয়ে দেখি বাবুর্চিরা কেমন রাঁধলো!”
‎​মেহুলের এই চরম অপ্রত্যাশিত ও স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরে পুরো হলরুম জুড়ে আচমকা এক থমথমে নীরবতা নেমে এলো। যেন চলন্ত কোনো সিনেমার রিল হঠাৎ মাঝপথে আটকে গেছে!
‎​আরমান আর আনিকা চমকে উঠে একে অপরের দিকে তাকাল। আরমান ভাবতেই পারেনি যে মেহুল এই অপমানের পর ঘর থেকে বের হওয়ার সাহস দেখাবে, আর আসরে আসলেও এভাবে সবার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে! সে তো ভেবেছিলো মেহুল হয়তো দরজা আটকে কেঁদে কুঁটে একাকার করবে। কিন্তু এতো সব উল্টো হঠাৎই মেহুলকে এতটা নির্বিকার আর স্বাভাবিক দেখে আরমান ভেতরে ভেতরে কিছুটা নড়েচড়ে বসল।
‎​ঠিক তখনই নীরবতা ভেঙে সোফায় বসা এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় বাঁকা হেসে টিপ্পনী কেটে উঠলেন, “বলি ও মেহুল! আজ তো তোর আর আরমানের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। সেখানে ওর বিয়ে হচ্ছে তোরই মামাতো বোনের সাথে। আর তুই এখন কিনা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের বিয়ের পোলাও-রোস্ট, মিষ্টি খাবি? তোর কি একটুও গায়ে লাগছে না রে?”

পেছন থেকে কজরো কন্ঠ শুনে মেহুল তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো অতঃপর ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটিয়ে ‎​মেহুল এবার একটু হাসল। অতি শান্ত, কিন্তু বিষাক্ত সাপের ছোবলের মতো ধারালো সেই হাসি।
‎​সে এবার সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে, স্পষ্ট ও গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “আপনার বোধহয় কোথাও একটু ভুল হচ্ছে, আন্টি। এটা ওদের বিয়ের খাবার নয়, খাবারটা আমার বিয়ে উপলক্ষেই রান্না করা হয়েছিল। আর আমার যতটুকু জানা—এই বাড়িটা আমার বাবার, আর আজকের এই বিয়ের প্রতিটি পয়সার খরচও আমার বাবার পকেট থেকে হচ্ছে। সুতরাং, আমি কী খাব, না খাব, কোথায় যাব—তা একান্তই আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার! এখানে বাহিরের কারো কোন কথা বলার অধিকার নেই আর না আমি শুনতে ইচ্ছুক।”
‎​এক মুহূর্ত থামল মেহুল। তার চোখের মণি দুটো এবার তীরের মতো গিয়ে বিঁধল সোফায় বসা আরমানের ওপর। কণ্ঠস্বরে এক ফোঁটা কাঁপন না রেখে মেহুল যোগ করল:

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১

‎​”আর গায়ে লাগার কথা বলছেন? এখানে আমার খারাপ লাগবে কেন? আমি তো কারো বিশ্বাস ভাঙিনি, কারো সাথে প্রতারণা করিনি। অন্যায় যারা করেছে, খারাপ লাগা আর লোকলজ্জার ভয়টা তাদের পাওয়া উচিত… আমার নয়!”
‎​মেহুলের শেষ কথাগুলো তীরের মতো গিয়ে সোজা আরমান আর আনিকার বুকে বিঁধল। পুরো হলরুমে তখন সুঁই পতন নীরবতা। মেহুল কেবল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করতে লাগল তার প্রথম তীরের আঘাতটা বেইমানদের গায়ে কেমন লেগেছে।

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৩