প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮৯ (২)
সাইয়্যারা খান
স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ তৌসিফ। তার দুনিয়া যেন থমকে গিয়েছে। বুকের মধ্যে পৌষের চিকন দেহটা একদম লেপ্টে আছে। দুই হাতে সে তৌসিফকে জড়িয়ে আছে। তৌসিফ ভুলে গেলো তারও যে জড়িয়ে ধরতে হবে। বেমালুম ভুলে গেলো তারও যে খুশি হতে হবে। তৌসিফ ভুলে গেলো সেসব যা যা তার করা প্রয়োজন এই মূহুর্তে। পৌষের ধাক্কায় তার হুঁশ ফিরলো যেন জাগ্রত হলো তার ঘুমন্ত মস্তিষ্ক। দুই হাতে ঝাপ্টে ধরলো পৌষকে। দিকবিদিকশুন্য প্রায় তৌসিফ বুঝে উঠতে পারলো না কি করবে। সে শুধু জড়িয়ে ধরে রাখলো। মুখ গুঁজলো কাঁধের ভাজে। ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইলো দু’জন। পৌষের খুশি যেন বাঁধ মানছে না। খুশির চোটে তার ঠোঁট থেকে হাসিটা নড়ছেই না। দারুণভাবে তৌসিফকে চমকে দিয়েছে সে।
“তোমলা তি তরছো?”
ইনি, মিনি আপাকে না দেখেই এখানে এসেছে। তৌসিফ একটু স্বাভাবিক হতে চাইলো কিন্তু পারলো না। আবারও শোনা গেলো,
“দুতাবাই আপাকে আদর তরছো?”
পৌষ এবার নিজেকে ছাড়ালো। দুই বোনের দিকে তাকিয়ে বললো,
“তোদের ত ত যে কেন ছুটছে না! এই বয়সে ত ত, ইশ মানইজ্জত রইলো না।”
দুই বোন হাসছে। তৌসিফ পৌষের কনুই চেপে ধরলো। ইনি, মিনির দিকে তাকিয়ে খুব ধীরে বললো,
“আমি তোমার আপাকে নিয়ে আসছি। পুতুল দেখেছো?”
দু’জন মাথা নাড়লো৷ পুতুল তো দেখেনি। তৌসিফ আরো ধীরে বললো,
“জৈষ্ঠ্যকে বলো। ওর কাছে আছে।”
চিচি শব্দ হলো পাখির মতো। দুটো পাখি যেন ডানা মেলে উড়ে গেলো বাইরে। তৌসিফ পৌষের দিকে তাকালো। চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে, মুখটা ফ্যাকাসে। কণ্ঠে তেজ একদমই নিভু নিভু। বলার মতো শব্দ সে পাচ্ছে না। পৌষ তৌসিফের ফ্যাকাসে ঠোঁটে চুমু খেলো। দুই হাতে গাল দুটো ধরে পায়ের আঙুলে দাঁড়িয়ে কপাল ছুঁয়ে দিলো নরম ওষ্ঠে। দুজনের কপালে কপাল ঠেকলো, রইলো কিছুটাসময়। তৌসিফ বাকরুদ্ধতা কাটালো। পৌষের চোখে চোখ রেখে বললো,
“আমার খুব নার্ভাস লাগছে পৌষরাত।”
“কেন?”
“বাবু চলে এলো।”
“হুঁ।”
“বিশ্বাস হচ্ছে না।”
“কেন হচ্ছে না?
“সেটাও বুঝতে পারছি না।”
পৌষ ঠেসে দুটো চুমু খেলো তৌসিফের গালে। গলায় ঝুলে পড়লো আবারও। বললো,
“গতমাস থেকে শরীর খারাপ করছিলো৷ গতকাল থেকে বমি। কখন যে দুষ্টটা চলে এসেছে।”
“আমাকে বলো নি কেন?”
তৌসিফ ওকে নিয়ে বসলো। একটা হাত পৌষের পেটে ঠেকিয়ে পরপর উঠলো। পৌষের সারা মুখে চুম্বন করলো৷ পৌষ সিক্ত হলো তৌসিফের আদরে। তৌসিফ খুব উত্তেজিত এখন। সে তার অনুভূতি প্রকাশে বরাবরই ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। আদুরে বিড়াল ছানার মতো গায়ে গা লাগিয়ে বসে রইলো দু’জন। তৌসিফ পেটটা একটু দেখতে চাইছে তবে মুখে বলতে পারছে না। মনে হচ্ছে একটু কথা বললেই কেঁদে ফেলবে ও। পৌষ উঠতে চাইলো। বললো,
“সবাইকে বলে আসি।”
তৌসিফ তারাহুরো করে ধরে আটকালো। চোখ দুটো একবার বুজে পুণরায় খুললো। সন্দিহান কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“তুমি টেস্ট কিট কোথায় পেলে? কবে কিনেছো? আমাকে যে বললে না?”
পৌষের দৃষ্টিতে সন্দেহ আরেকধাপ এগিয়ে।
“আমি কখন বললাম যে কিট কিনেছি?”
“তাহলে?”
“কি তাহলে? বাপ হওয়ার খুশিতে কি সার্কিট আউট হয়ে গেলো?”
তৌসিফ থতমত খেলো তবে নিজেকে সামলে নিলো। আহাম আহাম শব্দ করে গলা পরিষ্কার করে জিজ্ঞেস করলো,
“টেস্ট করলে কিভাবে?”
“ওমা! টেস্ট কেন করব?”
তৌসিফের চোয়াল ঝুলে পড়লো এহেন কথায়। সাথে সাথে প্রশ্ন করলো,
“তাহলে বুঝলে কিভাবে তুমি প্রেগন্যান্ট?”
“এটা বুঝতে কিট লাগবে কেন? আমি কি অবুঝ?”
তৌসিফ ঝট করে দাঁড়িয়ে গেলো। এদিক ওদিক পায়চারি করতে করতে বললো,
“আমি কত খুশি হয়ে গেলাম আর তুমি কি না টেস্টই করো নি। এভাবে বুঝা যায় নাকি? দেখি শুয়ে পড়ো তো। দরজাটা আটকে দেখি। পেটটা দেখলে যদি কিছু বুঝা যায়? তার আগে আমি কিট নিয়ে আসি। তুমি বসো তাহলে এখানে।”
তৌসিফ এতকথা বলার মানুষ না৷ নিতান্তই সে খুব নার্ভাস হয়ে আছে। পৌষ ওর ডান হাতটা ধরলো। হাত ধরে বসালো নিজের কাছে। দুই চোখে আঙুল বুলিয়ে দিতেই তৌসিফ চোখ বুজলো। পৌষ আস্তেধীরে বলতে লাগলো,
“শান্ত হন। এমন কিছু হয় নি। আমার ডেট মিস গিয়েছে গতমাসে। আর সামান্য মাথা ঘুরা, পেট ব্যথা, বমি এগুলো হয়েই আসছে। প্রথমে আমি আয়রন ডিফেসিয়েন্সি ভাবলেও আজকে শিওর হলাম। ভাবী আমাকে দেখে নিজেও সন্দেহ করেছে। আর সবচাইতে বড় করা, আমি নিজের মধ্যে পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। আমার মন বলছে আমি আপনার অস্তিত্ব ধারণ করছি। আপনার ইচ্ছে পূরণ করা আমার জীবনের সবচাইতে বড় ইচ্ছে তৌসিফ। সেই ইচ্ছে পূরণ হবে আর আমি টের পাব না? এটা কি সম্ভব?”
তৌসিফ এক টানে ওকে বুকে নিলো। মাথায় থুতনি ঠেকালো। বললো,
“তোমার অনুভূতি সত্য এবং আমার অনুভূতিও৷ আই ক্যান ফিল হানি।”
“রাতে কিট আনবেন।”
“আনব। কাল ডক্টরের কাছে যাব।”
“আচ্ছা।”
“আপাতত কাউকে কিছু বলো না।”
“কেন? সবাই খুশি হবে।”
“নজর লাগলে?”
পৌষ চুপ রইলো। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিলো তৌসিফের গালটা। তৌসিফ কেন জানি শান্ত হয়ে আছে। তার ভেতরে অদ্ভুত অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
“লায়লা, মজনু এতক্ষণ কি প্রেম করলে?”
তুহিনের কথায় তৌসিফ চোখ গরম করলো। তুহিন চোখ ঘুরালো। আবারও বললো,
“কই? তোমার বউ আসে না কেন?”
“অসুস্থ। বমি করছিলো মাত্রই।”
কথাটা শুনা মাত্রই তুহিনকে খুব চিন্তিত দেখালো। চোখ মুখের দুষ্টামি ভাবখানা উড়ে গেলো চট করে। সেথায় ভর করলো দুঃশ্চিন্তার ছাপ। বসে আর থাকতে পারলো না তুহিন। উঠে দাঁড়ালো সে। তৌসিফের দিকে তাকিয়ে বললো,
“আমি দেখতে গেলাম।”
“পৌষরাতই আসছে।”
বলতে বলতেই পৌষ পিহাকে নিয়ে বেরিয়ে এলো। তুহিন ওকে দেখেই রাগী স্বরে বললো,
“শরীর স্বাস্থ্য ভালো না আবার ট্যাং ট্যাং করে হাঁটাহাঁটি করা হচ্ছে। কি দরকার?”
“চা খাবেন আপনি নাকি কফি দিব?”
“চা খাব। তোমার হাতের চা দারুণ।”
বুয়াকে পানি বসাতে বলে পৌষ হেমন্তের দিকে বসলো। তার পেট ভরতি জমা পড়েছে অসংখ্য কথাবার্তা। চায়ের সাথে কথাগুলো বলবে পৌষ৷ হেমন্ত মনোযোগ দিয়ে বোনের কথা শুনছে। সেই ফাঁকেই তৌসিফ বেরিয়ে গেলো। রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করা অসম্ভব তার নিকট। তার বউ প্রেগন্যান্ট এটা তাকে সঠিক জানতেই হবে যদিও তার মন জানে এটা সত্যি। অবশ্যই সত্যি। তার পৌষরাত তার সন্তানের মা হবে। তৌসিফের সংসার বড় হবে। সেই সংসারে কিচিরমিচির শব্দ শোনা যাবে। তার পৌষরাত দারুণ একজন মা হবে। তার হাতে ইনি, মিনিই তো কত সুন্দর বড় হয়েছে। যেই হাত চাচাতো বোনদের এত সুন্দর পেলেছে সেই হাত না জানি কত সুন্দর ভাবে পালবে নিজ সন্তানকে।
আধ সিঁড়ি নেমে তৌসিফ থেমে গেলো। এভাবে কোনদিন ডিসপেনসারিতে যায় নি সে। এখন যেয়েই বা কি করবে? বলবে, একটা কিট দিন? তখন দোকানদার অদ্ভুত ভাবে তাকাবে না? তৌসিফ সেখানে তার তাকানো দেখেই তো লজ্জা পাবে। সু-কাজটা তো সেই করেছে। গা ঝাড়া দিয়ে দৌড়ে ফ্ল্যাটে ফেরত এলো তৌসিফ। সে পারবে না যেতে। তার তো এখনই পেট মুচড়ে উঠছে। তৌসিফ টনিকে ফোন লাগালো। রিসিভ হতেই কেটে দিলো। আচমকাই ভীষণ লাজুক হয়েছে তৌসিফ। ম্যাসেজে গটগট করে লিখেছে তার কিট লাগবে। প্রেগন্যান্সি কিট। তৌসিফ ঢুকতেই দেখলো চা তৈরী। সে বসামাত্রই পৌষ কফি এনে দিলো। তৌসিফ ওর হাত ধরে বসালো। বললো,
“শরীর ভালো না। এত লাফালাফি করো না।”
“কি হয়েছে আমার?”
চোখে শাসালো তৌফিক তবে পৌষ শুনলো না। আজ তার ছয়টা পাখা গজিয়েছে। ছয় পাখা নিয়ে দাপিয়ে আকাশে উড়ছে তার পৌষরাত।
হেমন্ত বোনের মাথায় অজান্তেই হাত রাখলো। ঠোঁটে হাসি নিয়ে বললো,
“কোনদিন যদি তোর ঝুলিতে খুশির কমতি পড়ে আল্লাহ যেন তা আমার ঝুলি থেকে নিয়ে পূরণ করে দেন।”
“আমি তো অনেক খুশি থাকি হেমু ভাই।”
“আমি চাই তুই আরো খুশি থাক৷ আজ তোর চেহারায় কেমন নূর ঝলকাচ্ছে পৌষ। তুই সবসময় ভালো থাক। ভাইয়ের দোয়া সবচাইতে বেশি তোর জন্য।”
“শ্রেয়াণের থেকেও বেশি?”
হেমন্ত ভাবলো না একপল। প্রতিত্তোর করলো ততক্ষণে,
“অবশ্যই। সবারই প্রথম সন্তান বেশি আদরের থাকে। তুই তো আমার বাচ্চা। তুই আমার বাচ্চা হলে আমি কোনদিন আরকিছুই চাইতাম না।”
“তুমি এত মন খারাপ কেন করো? আমি খুব সুখে আছি হেমু ভাই। এই দেখো, এই পুরো সংসার তোমার পৌষের। ঐ যে ঐ তৌসিফটাও পৌষের। রান্নাঘর পৌষের, সেখানে থাকা খাবারও পৌষের। তুমি জানো, আমি রাতে খেতে পারি এখন। উনি জোর করে তোমার মতো। আমি ভালো-মন্দ তিন, চার বেলাই খেতে পারি হেমু ভাই। শুধু সকালে বেশি দুধ দিয়ে চা খেতে পারি না। কেন জানি আমার হাতে বেশি দুধ উঠেই না।”
চৈত্র বোনের হাত চেপে ধরলো। পৌষ ধমক দিলো সাথে সাথে,
“চোখে পানি কেন?”
“আমি যখন টাকা কামাবো তখন তোমাকে প্রতিমাসে দুধ কিনে দিব আপা।”
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮৯
পৌষ থমকে গেলো। দুই বছর পর বাক্যটা শুনলো ও। চৈত্র আগে এই কথাটাই বলতো। যখনই বড় বা সেঝ চাচি বকতো তখনই বলতো। আজ এতদিন পর শুনে পৌষের বুকটা ছলকে উঠে। শ্রেয়া দেখলো তৌসিফের কোলে থাকা শ্রেয়ান খুব আনন্দে হাত-পা নাড়ছে। এই প্রথম শ্রেয়ার মনে হলো সে খুব ভাগ্যবতী নাহয় তার কপালে এত সুন্দর হেমন্ত আর এই পরিবারের সদস্যরা জুটলো না।
