Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৮

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৮

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৮
‎আফীফা আফনান

শিকদার এন্টারপ্রাইজের সুবিশাল ভবনে শিকদার জাবেদ ইকালের সুসজ্জিত ব্যক্তিগত কক্ষটি তখন এক চরম ভারাক্রান্ত আর অস্বস্তিকর বাতাসে থমথম করছে।
‎​রুমের অবস্থা করুণ। ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আনিকা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, আর শিরিনা বেগম তাকে শক্ত করে জাপটে ধরে রেখে সান্ত্বনা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, সুমনা বেগম কোনোপ্রকার লজ্জাশরমের তোয়াক্কা না করে সরাসরি জাবেদ ইকবাল সাহেবের পায়ের ওপর পড়ে মেঝেতে উপুড় হয়ে বসে আছেন। ওনার কান্নাকাটি আর আহাজারিতে তখন ঘরের পরিবেশটা যেন ভারী হয়ে উঠেছে।

‎​সুমনা বেগম হাঁপাতে হাঁপাতে জাবেদ সাহেবের পা চেপে ধরে আকুতি জানাচ্ছেন, “ভাই ! আমার আরমানটাকে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করো! এবারকার মতো আমার ছেলেটাকে মাফ করে দাও ভাই! ও বুঝতে পারেনি, ভুল করে ফেলেছে!”
‎​সুমনা ভেজা চোখে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা আনিকার দিকে ইঙ্গিত করে কাতর গলায় আবার বলে উঠলেন, “একবার… একবার অন্তত ওই মেয়েটার কথা ভাবুন ভাই! ওদের সদ্য বিয়ে হয়েছে, নতুন সংসার! আমার ছেলেটা যদি এভাবে হাজতের অন্ধকার কুঠুরিতে পচে মরে, তবে যে মেয়েটার জীবনটাই বরবাদ হয়ে যাবে! ওর মুখের দিকে তাকিয়ে হলেও একবার ক্ষমা করে দিন !”
‎​জাবেদ ইকবাল শিকদার সাহেব সম্পূর্ণ চুপচাপ রিভলভিং চেয়ারে বসে সবটা শুনছিলেন। ওনার চোখের সামনে বসা এই মানুষগুলোর নাটকীয় কান্না আর আহাজারি তিনি কোনোপ্রকার আবেগ ছাড়া প্রত্যক্ষ করছিলেন।
‎​হ্যাঁ, আজ থেকে মাত্র এক সপ্তাহ আগেও যদি এই পরিবারের মানুষগুলোর চোখে একফোঁটা পানি তিনি দেখতেন, তবে বিচলিত হয়ে ওরা যা চাইতো তা-ই এনে হাজির করতেন। কিন্তু আজ ওনার হৃদয়ে বিন্দুমাত্র অনুভূতির ছোঁয়া জাগল না। ওনার চোখ দুটো কেবল বরফের মতো শীতল।

‎​একসময় জাবেদ ইকবাল সাহেব ধীরেসুস্থে নিজের পা-টা সজোরে টান দিয়ে সুমনা বেগমের শক্ত হাত থেকে ছাড়িয়ে নিলেন।
‎​তারপর গম্ভীর ও নিচু গলায় বলে উঠলেন, “আমার পা ছেড়ে কথা বলো সুমনা। আর কেন তোমরা এখানে এসে মায়াকান্না জুড়েছ, আমি জানি। কিন্তু যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার, তা আমি ইতিমধ্যেই নিয়ে ফেলেছি। এই মরা কান্না কেঁদে আর কোনো লাভ হবে না।”
‎​সুমনা বেগম এবার আরও জোরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন, পরম মমতার ভান ধরে বলে উঠলেন, “আপনি আমার বড় ভাই! আপনি ছাড়া এই দুনিয়ায় আমাদের আর কে আছে বলুন? আপনিই যদি এভাবে আমাদের ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, তবে আমরা কার কাছে যাব ভাই?”
‎​সুমনার এই ন্যাক্কারজনক নাটকে জাবেদ সাহেবের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চরম তাচ্ছিল্যের হাসি।
‎​তিনি তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, “ঠিকই বলেছ… আমি তোমার ভাই। কিন্তু সুমনা, তুমি কখনো আমার বোন হয়ে উঠতে পারোনি! না অতীতে পেরেছ, আর না কোনোদিন পারবে। তাই অযথা সময় নষ্ট না করে এখান থেকে চলে যাও।”

‎​সুমনা বেগম এবার বুঝতে পারলেন কেবল কান্নায় কাজ হবে না। তিনি চট করে পেছনে ফিরে আনিকার দিকে এক চতুর ইশারা করলেন। অতঃপর ​ইশারা পাওয়া মাত্রই আনিকা দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো। সে এক লহমায় ইকবাল সাহেবের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে মিনতি মাখানো গলায় বলল, “আঙ্কেল! আপনি তো সবসময় আমাকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবেসেছেন, আমার সব ইচ্ছে পূরণ করেছেন! শেষবারের মতো আপনার কাছে হাত জোড় করে ভিক্ষা চাইছি আঙ্কেল… আরমানকে প্লিজ ক্ষমা করে দিন! আমার জীবনটা এভাবে তছনছ হতে দেবেন না!”
‎​এবার ইকবাল সাহেবের সহ্যের বাঁধ ভেঙে গেল। তিনি অত্যন্ত শান্ত, কিন্তু ফলার মতো ধারালো গলায় বলে উঠলেন—
‎”আমার নিজের মেয়েটার জীবন তছনছ করে, তার সমস্ত স্বপ্ন আর আত্মসম্মান নিজেদের পায়ের নিচে পিষে দিয়ে… আজ তুমি আমার কাছে এসে নিজের জীবনের ভিক্ষা চাইছ আনিকা? এখন আমি যদি বলি, তোমাদের কারণে হারিয়ে যাওয়া আমার মেয়ের সেই হাসি, আনন্দ আর সুন্দর দিনগুলো ফিরিয়ে দাও… পারবে ফিরিয়ে দিতে?”

‎​কথাটা শুনে পেছন থেকে শিরিনা বেগম আর থাকতে না পেরে বলে উঠলেন, “ইকবাল ভাই! যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। পুরনো কথা ধরে রেখে কী লাভ বলুন? ওরা বয়সের দোষে ভুল একটা করে ফেলেছে, বড় মানুষ হিসেবে মাফ করে দেন না ওদের!”
‎​ ইকবাল সাহেব এবার চেয়ার ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। ওনার চোখ থেকে যেন আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে—
‎”এটা কোনো বয়সের দোষে করা সামান্য ভুল নয় শিরিনা! এটা ছিল জেনে-বুঝে, ঠাণ্ডা মাথায় করা বিষাক্ত চক্রান্ত!”
‎​অতঃপর তিনি মাটিতে বসে থাকা সুমনা বেগমের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠলেন, “তোর স্বামী যখন দুই দুটো বাচ্চা সহ তোকে রাস্তায় ফেলে ছেড়ে চলে গিয়েছিল, তখন কার কাছে এসে আশ্রয় পেয়েছিলি তুই? এই আমার কাছে! কী দিইনি তোদের? থাকার জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁই দিয়েছি, সমাজে মাথা তুলে চলার স্ট্যাটাস দিয়েছি… এমনকি সবচেয়ে বড় কথা, আমার নিজের ‘শিকদার’ টাইটেলটা পর্যন্ত তোর দুটো ছেলেমেয়ের সাথে জুড়ে দিয়েছি! আর সেই ছেলে কিনা দিনশেষে আমারই পিঠে ছুরি মারল?!”

‎”ক্ষমা করো ভাই! ক্ষমা করো!” ​মেঝেতে বসে সুমনা বেগম আবারো অশ্রুপাত করে শেষবারের মতো আকুতি জানাতে গেলেন। পুরো ঘরে তখন এক দমবন্ধ থমথমে পরিস্থিতি।
‎​ঠিক সেই মুহূর্তেই—
‎টেবিলের ওপর রাখা ইকবাল সাহেবের মোবাইলটি উচ্চ শব্দে বেজে উঠল!
‎​ ইকবাল সাহেব ভারী নিঃশ্বাস ফেলে ফোনটি হাতে নিলেন। স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে ‘মেহু’ নামটা। তিনি সাথে সাথে কলটি রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো মেহুলের সেই বরফশীতল ও শান্ত কণ্ঠস্বর—
‎​”শেষবারের মতো ওই বেইমান আর প্রতারকগুলোর কথা মেনে নাও বাবা… ছেড়ে দাও ওদের।”

‎​মেহুলের এই অপ্রত্যাশিত কথায় ইকবাল সাহেব ভীষণ অবাক হলেন। তিনি বুঝতে পারলেন না, যে মেয়ে এত লড়াই করে আজ আরমানকে হাজতে পুরল, সে কেন হঠাৎ ওকে ছাড়তে বলছে! কিন্তু তিনি এও জানেন—তার মেয়ে মেহুল কখনো কোনো কারণ ছাড়া বা কোনো সুদূরপ্রসারী চাল ছাড়া একটা পা-ও ফেলে না।
‎​অতঃপর ইকবাল সাহেব ফোনটি কান থেকে নামালেন। সুমনা বেগমের দিকে এক চরম বিষাক্ত ও তীক্ষ্ণ নজর রেখে থমথমে গলায় বলে উঠলেন—
‎”এই শেষবার সুমনা! এরপর আর কখনো আমার কাছে কোনোপ্রকার আশা নিয়ে আসবে না। এখন ঘর থেকে বের হয়ে বাইরে অপেক্ষা করো।”

‎​জাবেদ ইকবালের মুখ থেকে এই কথাটা শোনামাত্রই যেন সুমনা আর শিরিনা বেগমের স্তব্ধ মুখে এক নিমেষে বিজয়ের বাঁকা হাসি ফুটে উঠল! ওনারা ভাবলেন, ওনাদের কান্নাকাটির নাটকেই কাজ হয়ে গেছে। তাই ইকবাল সাহেবের কথা মতো তারা আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালো।
‎​ওরা রুম থেকে বের হতেই ইকবাল সাহেব ইন্টারকম তুলে ওনার বিশ্বস্ত ব্যক্তিগত সহকারী লিয়াকত সাহেবকে ভেতরে ডেকে পাঠালেন।
‎​লিয়াকত সাহেব ঘরে প্রবেশ করতেই ইকবাল সাহেব গম্ভীর কণ্ঠে নির্দেশ দিলেন, “লিয়াকত, ওদের পক্ষ থেকে একজন উকিলের ব্যবস্থা করো। এখনই আদালতে কাগজপত্র পাঠিয়ে আরমানের জামিনের ব্যবস্থা করে সবটা মিটমাট করার আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করো।”

‎​ইকবাল সাহেবের আদেশ পাওয়ামাত্রই লিয়াকত সাহেব বিন্দুমাত্র প্রশ্ন না তুলে দ্রুত কাজে লেগে পড়লেন।
‎​এদিকে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সুমনা বেগমের ঠোঁটের কোণে তখন এক চরম অহংকারী ও চতুর হাসি জ্বলজ্বল করছে। তিনি মনে মনে ভেবে আত্মহারা হচ্ছেন যে, তিনি আবারও সেই ‘বোকা’ জাবেদ ইকবালকে নিজের কান্নাকাটি দিয়ে ম্যানিপুলেট করে নিজের স্বার্থ হাসিল করে নিয়েছেন!
‎​কিন্তু সেই চতুর সুমনা বেগম ঘুণাক্ষরেও টের পাচ্ছেন না—মেহুলের সাজানো যে ভয়ংকর দুর্গতি আর চরম পতনের জাল ওনাদের জন্য সামনে অপেক্ষা করছে, তা থেকে ওনাদের বাঁচানোর ক্ষমতা এই পুরো দুনিয়ায় আর কারো নেই!

‎এদিকে সুমনা বেগম, শিরিনা আর আনিকা যখন কোর্ট-কাচারির দরজায় দরজায় ঘুরে আরমানের জামিনের জন্য পাগলপ্রায় হয়ে ছুটোছুটি করছে, তখন অন্যপ্রান্তে আলো ঝলমলে শিকদার বাড়িতে বইছে একেবারে ভিন্ন হাওয়া! শিকদার জাবেদ ইকবাল সাহেবের আন্তর্জাতিক প্রজেক্ট আর ডিল পাওয়ার খুশিতে জমে উঠেছে জমকালো এক পার্টি।
‎​মেহুল একে ‘ছোটখাটো অনুষ্ঠান’ বললেও মিনারের অভিধানে ‘ছোটখাটো’ বলে কোনো শব্দ নেই! সে কোনো কিছুতেই বিন্দুমাত্র কমতি রাখতে নারাজ। তাইতো মিনার যেন একাই পুরো বাড়ি মাথায় তুলে নিয়েছে।
‎এদিকে ​আয়োজন তখন একদম শেষের দিকে। ডেকোরেশনের কাজ পারফেক্ট করতে মিনার তার একদল কাছের ও বিশ্বস্ত বন্ধুবান্ধবদেরও ডেকে এনেছে। কেউ ফ্লাওয়ার ভেস গুছাচ্ছে, কেউ লাইটিং চেক করছে, আবার কেউ ব্যাকগ্রাউন্ডে সফট মিউজিক সেট করছে। মিনার ওদের সাথে মিলে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে কাজ তদারকি করছে আর হাঁকডাক ছাড়ছে—
‎”এই রনি! মুমিন!ফোকাস লাইটটা বাঁদিকে ঘোরানো কেন? ওটা আঙ্কেলের প্রিয় সিটিং এরিয়ার দিকে দাও! আর শোন, গ্লাসগুলো যেন ক্রিস্টাল ক্লিয়ার থাকে!”

‎​অন্যদিকে, রান্নাঘরে চলছে মিনারা বেগমের রাজকীয় ও এলাহী কারবার!
‎​মেহুল আজ এতদিন পর হেসেছে, ঘরে শান্তি ফিরে এসেছে—এই আনন্দে তিনি নিজ হাতে স্পেশাল সব পদ রান্নায় ব্যস্ত। খাসির রেজালা, চিকেন রোস্ট থেকে শুরু করে জাফরানি ফিরনি—কী নেই সেই তালিকায়!
‎​মিনারা বেগমের সাথে এই বিশাল আয়োজনে পুরোদমে হাত লাগিয়েছে শিকদার বাড়ির পুরোনো ও বিশ্বস্ত হেল্পিং হ্যান্ড—ফরিদা।
‎​ফরিদা একহাতে মশলার পাত্র এগিয়ে দিতে দিতে বলল, “ছোট আম্মা, বিরিয়ানির মাংসের হাঁড়িটা উনুনে কি চাড়াইয়া দিমু? হাঁড়ির মুখটা আটা দিয়া লাগানো শেষ।”
‎​মিনারা বেগম কপালে জমে ওঠা ঘাম হাতার উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে হেসে বললেন, “হ্যাঁ রে ফরিদা, চড়িয়ে দে। আর শোন, ওপাশের পায়েসের দুধটা যেন একদম ঘন হয়ে আসে, মেহুল মা আমার আবার ঘন পায়েস খেতে ভালোবাসে। ভালো করে নেড়ে দে তো।”

‎কাজ করতে করতেই ​ফরিদা একগাল হেসে বলল, “আজকে আম্মা বাড়িটার চেহারা দেখিয়া পরাণটা জুড়াইয়া গেল। মেহুল আম্মার মুখে হাসি দেখলে খুব ভালা লাগে!”
‎​বাইরে তখন ঝংকৃত হচ্ছে চমৎকার মিউজিকের সুর, ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ছে শাহী খাবারের মিষ্টি সুবাস, আর মিনারের বন্ধুদের উচ্চকণ্ঠের হাসি-ঠাট্টা। সুমনা বেগমের ফেলে যাওয়া বিষাদময় থমথমে কুঠুরিগুলোকে ধুয়েমুছে সাফ করে শিকদার বাড়িতে তখন এক নতুন আনন্দ আর রাজকীয় আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে!
‎​তবে এই উদ্দাম উৎসব আর আলো ঝলমলে সন্ধ্যার আড়ালেই যে আরমানের চূড়ান্ত পতন আর নিঃশ্বেস হয়ে যাওয়ার কালবৈশাখী ঝড়টি নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে, তা কিন্তু এখনো মেহুল আর মিনার ছাড়া আর কেউ জানতেই পারছে না!
‎এদিকে মিনার যখন নিজের বন্ধুদের নিয়ে ডেকোরেশনের কাজে পুরোপুরি মগ্ন, ঠিক তখনই হাতে ইতালিয়ান বিলাসবহুল ব্র্যান্ড ‘গুচ্চি’র একটি অত্যন্ত দামি ও রাজকীয় শার্ট নিয়ে দোতলা থেকে ধীর পায়ে নেমে আসে মেহুল। শার্টটির সিল্কেন ফেব্রিক আর গোল্ডেন বোতাম দেখলেই বোঝা যায়—এটি অত্যন্ত এক্সক্লুসিভ ও মূল্যবান এক পোশাক।

‎​নিচে এসেই মেহুল মিনারকে কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে, ঝটকা মেরে ওর হাত ধরে টানতে টানতে ড্রয়িংরুমের ভিড় ঠেলে একদম বাইরের ফাঁকা বারান্দায় নিয়ে যায়।
‎​মেহুলের হুট করে এমন অদ্ভুত কাণ্ডে মিনার প্রথমে চরম অবাক হয়ে ওর দিকে তাকায়। মেহুল তখন একমুহূর্ত দেরি না করে নিজের হাতের সেই দামি গুচ্চির শার্টটি মিনারের ঠিক চোখের সামনে তুলে ধরে
‎তখনি মিনার জিজ্ঞেস করে—
‎​”এটা কার শার্ট ? নো সিস্টার… অন্তত আমায় বলিস না যে আজকের এই পার্টিতে এটা তুই আমার জন্য এনেছিস! তুই আমাকে এতো ভালোবাসিস সিস্টার?” শেষের কথা গুলোতে তজর স্বভাবসুলভ দুষ্টামি ফুটে উঠছিলো।

‎”না আমি এটা তোর জন্য আনি নি।” মেহুল বলে উঠলো।
‎​”তাহলে এটা তোর কাছে কেন ? আর আমার সামনে আনলিই বা কেন?”—মিনার ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল।
‎​তখনই মেহুলের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক রহস্যময় বাঁকা হাসি। সে মিনারের জামার কলার চেপে ধরে কানটা একহাতে টেনে নিজের মুখের কাছে নিয়ে এলো। তারপর মিনারের কানে কানে খুব ফিসফিস করে গুচ্চির শার্টটিকে ঘিরে রাখা আসল গোপন পরিকল্পনাটা বলল…!
‎​মেহুলের কথা শেষ হতে না হতেই মিনারের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল! সে আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে উচ্চস্বরে বিকট এক হাসিতে ফেটে পড়ল! হাসতে হাসতে তার পেটে খিল ধরার উপক্রম, একদম পেট চেপে ধরে হাসতে লাগল সে।
‎​মিনারের এই অনিয়ন্ত্রিত পাগলের মতো হাসি দেখে মেহুল নিজের দুই ভ্রু কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে বলে উঠল, “নাটক বন্ধ করে হাসিটা থামা মিনার! তোকে যা করতে বলছি, চুপিচুপি গিয়ে তাড়াতাড়ি কাজটা কর! এরপরেই তো দেখতে পাবি আসল খেলা আর আসল মজাটা কোথায় গিয়ে জমে!”

‎​মেহুলের চোখ ধাঁধানো আইডিয়া আর চক্রান্তের গভীরতা বুঝতে পেরে মিনারের হাসি থামতেই চাইল না। সে মেহুলের হাত থেকে গুচ্চির দামি শার্টটি একপ্রকার ছিনিয়ে নিয়ে হাসতে হাসতেই স্যালুট ঠোকার ভঙ্গিতে বলল, “একদম অল রাইট, বস! কাজ হয়ে যাবে!”
‎অতঃপর ​মিনার মূল্যবান শার্টটি সতর্কতার সাথে হাতে নিয়ে একগাল হেসে বাড়ির পেছনের গার্ডেনের দিকে চলে গেল। আর মেহুল নিজের ঠোঁটের সেই বিজয়ের মিষ্টি হাসিটা সামলে নিয়ে পার্টির বাকি কাজগুলোর তদারকি করতে আবার ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল।

‎আদালতের সব আইনি প্রক্রিয়া চুকিয়ে যখন অবশেষে থানার হাজত থেকে আরমানকে বের করে আনা হলো, ততক্ষণে রাতের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়েছে।
‎​থানার গেটের সামনে কড়া লাইটের আলোয় আরমানকে দেখে চেনা দায়! মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তার চেহারাটা একবারে ধসে গেছে। সেই দাম্ভিকতা, নিখুঁতভাবে আছড়ানো চুল কিংবা রাজকীয় ভাবসাব—কিচ্ছু আর অবশিষ্ট নেই। চোখ-মুখ শুকিয়ে কাঠ, চোয়াল বসে গেছে, আর চোখের নিচে ফুটে উঠেছে হালকা কালি। শরীরে লেগে আছে হাজতের সেই স্যাঁতসেঁতে নোংরা গন্ধ। পা দুটো যেন আর মাটির ওপর টিকছিল না, থরথর করে কাঁপছিল।

‎​থানার বারান্দায় পা রাখতেই সুমনা বেগম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। ছুটে গিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। কিন্তু পরক্ষণেই ওনার ভেতরের হিংসা আর ক্ষোভ আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল! তিনি পাগলের মতো মেহুলকে উদ্দেশ্যে করে অভিশাপ আর বিষোদ্গার ঢালতে লাগলেন—
‎​”ওই ডাইনির বাচ্চা! ওই কালসাপ মেহুল ইচ্ছা করে আমার সহজ-সরল ছেলেটাকে এভাবে শেষ করতে চেয়েছিল! ওর কোনোদিন ভালো হবে না… আল্লাহ ওকে কোনোদিন মাফ করবে না! এত বড় অন্যায় করার জন্য ওকে চরম মাসুল গুনতে হবে! আমি ওকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দেব!”

‎​সুমনা বেগমের সেই অন্ধ আক্রোশ আর চিৎকার থানার শান্ত পরিবেশটাকে আরও বিষাক্ত করে তুলছিল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ অফিসাররাও বিরক্ত চোখে ওনার দিকে তাকাচ্ছিলেন।
‎তখনি ​পরিস্থিতি সামাল দিতে আনিকা আরমানের একদম কাছে এলো। আরমানের নিস্তেজ, শূন্য চোখের দিকে তাকিয়ে ওর হাতটা শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তারপর ভেঙে পড়া গলায় সান্ত্বনা দিয়ে বলল—
‎​”আরমান… প্লিজ নিজেকে সামলাও। আগে চলো এখান থেকে বের হই। বাসায় চলো তুমি… বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম নাও। সব ঠিক হয়ে যাবে, বিশ্বাস করো… সব আবার আগের মতো ঠিক হয়ে যাবে।”

‎​আনিকার কথায় আরমান ধীরে ধীরে মাথাটা একটু নাড়ল, কিন্তু তার শূন্য দৃষ্টিতে কোনো আশা ছিলো না। মনের ভেতর কেবল একটা কথাই বাজছিল—শিকদার বাড়িতে আজ সত্যি কি সব আগের মতো থাকবে, নাকি নতুন কোনো নরক ওনার জন্য অপেক্ষা করছে?

একদিকে আরমানরা যখন গাড়ি যোগে বাড়ির পথে এগোচ্ছে, ঠিক তখন ‎শিকদার বাড়িতে মেহুলের বিজয় আর বড় ডিল পাওয়ার সেলিব্রেশন তুঙ্গে! পুরো ড্রয়িংরুমটা বর্ণিল আলো আর মিউজিকের তালে ঝলমল করছে। বাড়ির প্রায় সবাই উপস্থিত।
‎​আজ মেহুলের পরনে কালো রঙের একটি আভিজাত্যপূর্ণ শাড়ি। আর এই গাঢ় কালো রঙ আর শাড়ির নিখুঁত ভাঁজ যেন মেহুলের উজ্জ্বল শরীরকে আজ আরো অনবদ্য ও অনিন্দ্যসুন্দরী করে তুলেছে, এক কথায় মেহুলকে আজ স্বর্গীয় অপ্সরী লাগছে! মিনারা বেগমই আজ নিজের হাতে পরম মমতায় মেহুলকে সাজিয়ে দিয়েছেন।

‎এদিকে ​ঘণ্টাখানেক আগে কাজ শেষ করে অফিস থেকে বাড়ি ফিরেছিলেন ইকবাল সাহেব। বাড়ি ফিরে তিনি ঘরে পা দিয়েই পুরো আয়োজন আর পরিবেশ দেখে ভীষণ অবাক হন ও পরে তৃপ্ত হয়ে যান। এদিকে পার্টিতে সবাই আনন্দ করলেও সবচাইতে বেশি এনজয় করছে মিনার! সে গানের তালে তালে শরীর দুলিয়ে, নানা ভঙ্গিমায় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের সাথে নাচছে। মিনারের এই মজার নাচনকোঁদন দেখে মেহুল, মিনারা বেগম, ইকবাল সাহেব—এমনকি বাড়ির কাজের মহিলা ফরিদা পর্যন্ত হাসাহাসি করে ভীষণ মজা পাচ্ছে। কিন্তু এতে মিনারের কিছুই যায়-আসে না, সে আজ মেহুলের জয়ে আর সাফল্যে বেজায় খুশি!

‎​ঠিক এই আনন্দ আর নাচের মাঝেই ঘরের প্রধান দরজা দিয়ে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করল শ্রাবণী। শ্রাবণীকে দেখা মাত্রই মেহুল মিষ্টি হেসে এগিয়ে গেল। শ্রাবণী আবেগপ্লুত হয়ে মেহুলকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
‎​এরপর শ্রাবণীকে সাথে নিয়ে মেহুল ইকবাল আর মিনারা বেগমের কাছে গেল। মেহুল তজর মনির সাথে শ্রাবণীর পরিচয় করিয়ে দিল এবং কম্পানির নতুন প্রজেক্টে শ্রাবণীর অসাধারণ কাজের ভূয়সী প্রশংসা করল।

‎​তখনই শ্রাবণী চোখের কোণে জল নিয়ে মেহুলের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি না থাকলে আজ এটা কোনোদিনও সম্ভব হতো না মেহুল! তুমি সত্যিই আমার জীবনের জন্য কোনো ফেরেশতার চেয়ে কম কিছু নও… যেখানে দুটো ছোট বাচ্চা নিয়ে আমি নিজের জীবন নিয়ে সব আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম, সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার সব রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল… সেখানে তুমি আমাকে আবার নতুন করে বাঁচার সাহস জুগিয়েছ! আমার এই বিধ্বস্ত চেহারা আর ধ্বংস হয়ে যাওয়া অতীত জেনেও তুমি যে আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছিলে, তার জন্য ধন্যবাদ মেহুল… অনেক ধন্যবাদ!”

‎​মেহুল আলতো করে শ্রাবণীর হাত চেপে ধরে হেসে বলল, “ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই শ্রাবণী… তুমি সত্যিই ভীষণ যোগ্য! তোমার ভাগ্যে আর যোগ্যতায় এটা ছিল বলেই তুমি আজ এখানে দাঁড়াতে পেরেছ। আর শোনো… তুমি সত্যি খুব সুন্দর, ভীষণ সুন্দর! তাই কে কী বলল না বলল, তা নিয়ে একদম কান দেবে না। নিজের মতো করে, নিজের মাথা উঁচু করে বাঁচবে… বুঝলে?”

‎​মেহুল যখন শ্রাবণীর সাথে এসব কথা বলছিল, তখনই মিনার হঠাৎ পেছন থেকে এসে মেহুলের হাত ধরে এক ঝটকায় তাকে নাচের মাঝখানে টেনে নিয়ে গেল!
‎​হঠাৎ এমন কাণ্ডে মেহুল প্রথমে এক মুহূর্ত নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু পরক্ষণেই ওর ভেতরের সব বাধা ভেঙে গেল! সে নিজের শাড়ির আঁচলটা আলতো করে কোমরে গুঁজে নিল, তারপর মিনারের সাথে তাল মিলিয়ে পা মেলাতে শুরু করল।

‎​বহু বহু বছর পর আজ আবার মেহুল মন খুলে নাচছে! ছোটবেলা থেকে নাচ তার ভীষণ পছন্দের ছিল, নিজের মায়ের কাছ থেকে শেখা নাচ। কিন্তু একসময় সুমনা বেগম মেহুলের এই নাচ একদম পছন্দ করতেন না। আরমানকে পাওয়ার লোভে সুমনা বেগম মেহুলকে স্পষ্ট বলে দিয়েছিলেন—যদি আরমানকে বিয়ে করতে হয়, তবে এই ‘নাচ-গান’ পুরোপুরি ছাড়তে হবে। আরমানের প্রতি অন্ধ ভালোবাসায় সেদিন সুমনার সেই অন্যায্য শর্ত মেনে নিয়ে মেহুল নাচ ছেড়ে দিয়েছিল। আর আজ এত বছর পর সুমনার দেওয়া সেই মানসিক বন্দিদশার চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটল!

‎​মেহুল আর মিনার যখন নিজেদের নাচে পুরো পরিবেশ রাঙিয়ে তুলছিল, ঠিক তখনই শিকদার বাড়ির গেটের সামনে এসে থামল আরমানদের গাড়ি।
‎​কোর্ট আর থানা থেকে ফিরে বাড়ির ভেতর থেকে উচ্চশব্দে আনন্দের গান ভেসে আসতে শুনে আনিকা পচা নেকামো সুরে বলে উঠল, “আমাদের জীবনটা ছারখার করে দিয়ে ওরা এখন এখানে উল্লাসে মেতেছে! কী নিষ্ঠুর!”

‎​শিরিনা বেগমও নাক-মুখ কুঁচকে মেহুলদের উদ্দেশ্যে গালিগালাজ করে উঠলেন। আর সুমনা বেগম বিষাক্ত চোখে গজগজ করতে লাগলেন। অন্যদিকে আরমান গাড়িতে বসে চুপচাপ সবটা শুনছিল, কিন্তু হঠাৎই বাড়ির পেছনের গার্ডেনের দিকে ওর নজর পড়তেই সে একদম স্তব্ধ হয়ে গেল!
‎​আরমান দেখল—বাড়ির লনে তাদের পোষা কুকুরটি বসে আছে, কিন্তু অবাক ও গা শিউরে ওঠার বিষয় হলো, কুকুরটির গায়ে আরমানের সবচাইতে পছন্দের, বিলাসবহুল ইতালিয়ান ব্র্যান্ড ‘গুচ্চি’ র সেই অতি-দামি শার্টটি যা ঘন্টাখানেক আগেও মেহুলের হাতে ছিলো সেটি মাঝখান থেকে কেটে কুকুরকে পরিয়ে রাখা হয়েছে!

‎​নিজের এত সাধের, লাখ টাকার গুচ্চি শার্টটি কুকুরের গায়ে ঝুলতে দেখে আরমানের ভেতরের সুপ্ত শয়তান আর অহংকার যেন এক লহমায় জ্বলে উঠল! ওর রগ ফুলে উঠল, চোখ লাল হয়ে গেল। চরম রাগে-ক্ষোভে সে যেন পাগলপ্রায় হয়ে গেল—যেন এই মুহূর্তে সামনে যাকে পাবে, তাকেই খুন করে ফেলবে!

‎একসময়​ আরমান উন্মাদীদের মতো গজগজ করতে করতে হনহন করে ঘরের ভেতর প্রবেশ করল।
‎​ভেতরে ঢুকতেই ওর চোখে পড়ল—মেহুল শাড়ি পরে মিনারের সাথে পরম আনন্দে নাচছে! আরমান আর কোনো কিছু বিচার-বিবেচনা না করে, সোজা মেহুলের দিকে ধেয়ে গেল। সে মেহুলের হাত ধরে এক তীব্র হেঁচকা টান মেরে তাকে থামিয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে কিছু বলতে গেল—
‎​কিন্তু কিছু বলার আগেই—
‎মেহুল একচুলও বিচলিত না হয়ে, নিজের পুরো শক্তি দিয়ে সপাটে আরেকটা চড় বসিয়ে দিল আরমানের গালে!

‎​’ঠাস’ করে চড়ের শব্দে পুরো ঘরের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক যেন এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল! আরমান নিজের গাল চেপে ধরে অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল—
‎”তুই… তুই আবার আমাকে মারলি?! তোর এত বড় সাহস কীভাবে হয় মেহুল?!”
‎​মেহুল তার বরফশীতল চাহনি আরমানের চোখে নিবদ্ধ করে অত্যন্ত ধীর ও স্পষ্ট গলায় বলল—
‎”সাহসের তো কেবল ট্রেইলার দেখলে আরমান… আসল সিনেমা তো এখনো অনেক বাকি! কোন সাহসে তুমি আমার শরিরে হাত দিয়েছ? এতো সাহস আসে কোথা থেকে?”
‎​ঠিক তখনই সুমনা বেগম দৌড়ে এসে জাবেদ ইকবাল সাহেবের দিকে বিষাক্ত চোখে তাকিয়ে গর্জে উঠলেন—
‎”ভাই! তোমার এই বেয়াদব মেয়েকে সাবধান করো! ও যদি বেশি বাড়াবাড়ি করে, তবে কিন্তু…”

‎​”তবে কিন্তু কী ফুপি?!”—মেহুল সুমনা বেগমের কথা মাঝপথেই কেটে দিয়ে তীব্র তাচ্ছিল্যে বলে উঠল—
‎”কী করবে তুমি?! তুমি কিছুই করতে পারবে না! যা করার, তা এবার আমি করব! কী ভেবেছ তুমি? আমার বাবাকে মায়াকান্না দিয়ে পটিয়ে তোমার এই অসভ্য, চোর ছেলের জামিন করিয়ে এনেছ? উহু! ভুল ভাবছ ফুপি! আমি চেয়েছি বলেই ও আজ জেলের বাইরে পা রাখতে পেরেছে!”
‎​সুমনা বেগম চোখ গোল গোল করে তোতলাতে লাগলেন, “কী… তুই চেয়েছিস মানে?!”
‎​মেহুল বাঁকা হেসে বলল, “হাঁ, আমি চেয়েছি! কারণ ও যদি জেলে বন্দি থাকত, তবে সরকারের অন্ন ধ্বংস করা ছাড়া ওর আর কোনো কষ্ট হতো না! আর আপনিও ওর জেলে যাওয়ার উসিলায় এই বাড়িতে আবার শেকড় গেড়ে বসার সুযোগ পেয়ে যেতেন! আমি তো এত সহজে তোমাদের এত শান্তিতে থাকতে দিতে পারি না ফুপি!”

‎​সুমনা বেগম দাঁতে দাঁত চেপে চিৎকার করে উঠলেন, “কী করবি তুই আমাদের?! আর কী করা বাকি রেখেছিস তুই?!”
‎​মেহুল ঠোঁটের কোণে এক রক্তহিম করা বিষাক্ত হাসি ফুটিয়ে বলল—
‎”করা তো মাত্র শুরু করলাম ফুপি! এতদিন তোমরা ভেবেছ আমি বোকা, অবলা! কিন্তু এবার শোনো—আমি তোমাদের হাতে মেরে রক্ত ফেলব না, আমি তোমাদের ভাতে মারব! এতদিন শিকদার বাড়ির ফ্রিতে অনেক খেয়েছ, বিলাসী জীবন কাটিয়েছ… একদানা ভাত মুখে তুলতে ঠিক কতোটা কষ্ট পেতে হয় তাই বোঝাবো তোমাদের। এবার সুদে-আসলে সেই সব হিসেব চুকানোর পালা! ”

‎অতঃপর মেহুল দুটো জোরালো হাততালি দিল। আর সাথে সাথেই মিনার এবং ফরিদা তিনটা বড় বড় ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে সেখানে হাজির হলো। মিনার ব্যাগগুলো এনে সজোরে আরমানের ঠিক পায়ের সামনে ছুঁড়ে রাখল।
‎​ঠিক তখনই মেহুলের তীরের মতো ধারালো ও বরফশীতল স্বর ভেসে উঠল, “বেরিয়ে যান আমার বাড়ি থেকে!”
‎​মেহুলের এই স্পষ্ট কথায় সুমনা, আনিকা আর আরমান যেন চরম এক ধাক্কা খেল! সুমনা বেগম বিস্ময়ে আর অপমানে তোতলাতে তোতলাতে বললেন, “কী… কী বলছিস তুই এসব মেহুল?!”
‎​মেহুল একচুলও না নড়ে একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “ঠিকই বলেছি! বেরিয়ে যান আমার বাড়ি থেকে… এখনই, এই মুহূর্তে!”
‎​সুমনা বেগম দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে পড়ে চিৎকার করে উঠলেন, “আমরা চলে যাব মানে?! গিয়ে কোথায় উঠব আমরা?!”
‎​তিনি আশা নিয়ে জাবেদ ইকবাল সাহেবের দিকে তাকিয়ে আকুতি মাখানো গলায় বললেন, “ভাই! শুনছ তোমার মেয়ে আজ আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছে? তুমি কিচ্ছু বলবে না?!”

‎​জাবেদ ইকবাল সাহেব সুমনা বেগমের দিকে একবারও না তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তিনি নিজের রুমের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে একদম বরফশীতল কণ্ঠে বলে উঠলেন, “আমি আগেই বলেছি সুমনা, তোদের শেষবারের মতো সাহায্য করার কোটা আমার শেষ হয়ে গেছে। তাই আমার মেয়ে যা বলছে তা-ই করো… এই মুহূর্তেই চলে যাও এখান থেকে!”

‎​জাবেদ সাহেবের এমন কঠিন রূপ দেখে শিরিনা বেগম এগিয়ে এসে তীব্র প্রতিবাদ করতে চাইলেন। কিন্তু তিনি কিছু বলার আগেই মেহুল তার দিকে ফিরে ফলার মতো ধারালো গলায় বলে উঠল, “মামি! আমার মামা যদি এই মুহূর্তে অসুস্থ না হতেন, তবে ওদের সাথে তোমাকেও আজ ঠিক একইভাবে গা-ধাক্কা দিয়ে এই বাড়ি থেকে বের করে দিতাম! শুধু আমার মামার চেহারার দিকে তাকিয়ে তোমাকে এখনো কিছু বলছি না। নিজের ভালো চাইলে একদম চুপ থাকো! নিজের ও আনিকার স্বার্থের জন্য অন্তত নিজের আরেকটা মেয়ের জীবন নষ্ট করো না। কারণ তুমি খুব ভালো করেই জানো, এই বাড়ি থেকে বের করে দিলে সমাজের বুকে তোমার কোনো অস্তিত্ব কেউ আর খুঁজে পাবে না!”

‎​মেহুলের এই ভয়ংকর হুমকিতে শিরিনা বেগমের মুখ একলহমায় শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। তিনি ভয়ে আর একটা শব্দও উচ্চারণ করার সাহস পেলেন না, একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন।
‎​এদিকে আর কোনো আশা নেই দেখে একসময় সুমনা বেগম অপমানে গা জ্বলে উঠে ব্যাগগুলো তুলে নিয়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলেন। ঠিক তখনই আনিকা নেকামো ছেড়ে চিৎকার করে বলে উঠল, “দাঁড়াও মা! এভাবে চলে যেতে বললেই চলে যাব নাকি? ব্যাগে আমাদের জামাকাপড়, মূল্যবান সব জিনিসপত্র ঠিক আছে কি না দেখব না?!”

‎​আনিকা তড়িঘড়ি করে মেঝের ওপর ব্যাগ খুলে জিনিসপত্র চেক করতে গেল। কিন্তু ব্যাগের ভেতর হাতড়াতেই ওনার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! সে আর্তনাদ করে উঠে বলল, “আমার সব গহনা কোথায়?! আমার সোনা-দানার গহনার বাক্সগুলো কোথায় গেল?!”

‎তখনই ​মেহুল ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে শান্ত গলায় বলল, “তোর ওই চকচকে গহনাগুলোর সবটাই তো আমার ছিলো, আমার বাবার টাকায় কেনা ছিল আনিকা! আর সুমনা ফুপি আপনার বেশিরভাগ গহনাই ছিল আমার প্রয়াত মায়ের দেওয়া! যার থেকে বেশিরভাগই আপনি চেয়ে নিয়েছিলেন তাই যা যা আমার, তা আমি নিজের কাছেই রেখে দিয়েছি। এক রতি সোনাও বেইমানদের সাথে যাবে না!”

‎তখনই মেহুল সুমনাকে উদ্দেশ্য করে আবারও বলে উঠলো, “আর হে শুনুন, আপনার মেয়ে কেয়া স্কুল প্রোগ্রামের বাহিরে, তাই দয়া করে ওকে ফোন করে বলে দিবেন যাতে এই বাড়িতে না আসে কারণ আপনাদের কারো ছায়াও আমি আর এ বাড়িতে পড়ুক তা চাইনা।”

‎অতঃপর মেহুল তাদের আর কোনো কথা বলার বা হাতজোড় করার সুযোগটুকুও দিলো না। চরম অপমান আর নিঃস্ব হয়ে সুমনা, আনিকা আর আরমান ব্যাগ কটা নিয়ে ধীর পায়ে শিকদার বাড়ির প্রধান দরজা পার হয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল।

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৭

তারা অপমানের চরম জ্বালায় মাত্র পেছনের দিকে ঘুরে বাড়ির দিকে শেষবারের মতো তাকাল, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই—মেহুল এগিয়ে এসে ঠাস করে তাদের মুখের ওপর শিকদার বাড়ির ভারী কাঠের বিশাল দরজাটি সজোরে বন্ধ করে দিল!
‎​ঘরের ভেতরের আলো আর আনন্দের উৎসব বন্দি হয়ে রইল ভেতরে, আর ওপাশে ঘুটঘুট অন্ধকার রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইল নিঃস্ব, পরাজিত আরমানের পরিবার। যেন ভাগ্য তাদের এক চরম দুর্যোগের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৯