তাকদীর পর্ব ১৬
নিরুর কল্পনারাজ্য
চা আনতে বলায় শাশুড়ীর পায়ে গরম চা ফেলে দিয়েছে তুবা। কোনো কারণ এবং কথার পূর্বাভাস বিনা। ফারিশের মা মেহনাজ আক্তার আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন। পায়ে সদ্য কনডাকশন চুলা হতে নামানো চায়ের উষ্ণ তরলের সংস্পর্শে আসতেই তার গগনবিদারী আত্মচিৎকার সম্পূর্ণ ঘর কাঁপালেন জোয়ার্দার পরিবারের। জোয়ার্দার পরিবারে কেবল চার সদস্যের বাস। তন্মধ্যে মেহনাজ আক্তার, ইশতিয়াক জোয়ার্দার এবং ফারিশ জোয়ার্দার। বাকি এক সদস্য অর্থাৎ তুবা কিছু মাস আগে এসেই মালিকানা দখল করেছে জোয়ার্দার ম্যানশনের। ফারিশ বেলকনিতে বসে ছিলো। অথচ মায়ের এমন অকস্মাৎ চিৎকারে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো তার কায়া। কী হয়েছে তা অনুধাবন করার উদ্দেশ্যে মেহনাজ আক্তার নৈকট্যে আসতেই মায়ের ব্যাথাতুর চাহুনি আঘাত হানলো যুবকের মাতৃমমতায় পরিপূর্ণ হৃদয়ে। স্বীয় স্ত্রীর পানে নজর রাখতেই দৃশ্যমান হলো মেয়েটির ক্রোধিত চক্ষুদ্বয়। ফারিশের কপালে ভাঁজ পড়লো; ভ্রুদ্বয় কিঞ্চিৎ কুঞ্চিত করে উদ্বীগ্ন স্বরে শুধালো,
— কী..কী হয়েছে আম্মি?
মেহনাজ খাতুনের পায়ে ফোসকা পড়ে গেলো। তিনি ব্যাথার প্রতাপ সহ্য করতে না পেরে হাঁটু ভেঙে বসে পড়লেন। ইশতিয়াল জোয়ার্দার হতবাকতায় ছুটে এলেন স্ত্রীর নিকট। এসেই চক্ষু ছানাবড়া। ফারিশ দেরি না করে অতিদ্রুত মায়ের নৈকট্যে গিয়ে হাটু মুড়ে বসলো। পায়ের এহেন দূর্দশা দেখে শিউরে উঠলো তার সম্পূর্ণ কায়া। কেঁপে উঠলো অজানা এক ক্ষোভ এবং রাগে। সে সরাসরি মেহনাজ খাতুনকে জিজ্ঞেস করলো,
— কী হয়েছে আম্মি? এটা কীভাবে হলো?
মেহনাজ খাতুন কিছু বলতে পারলেন না। কেবল মাত্র দু’চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে আরম্ভ করলো নোনাজলের ছিটে। ফারুশের তীক্ষ্ণ রাগান্বিত লোচন মুহূর্তেই ঘুরে গেলো তুবার পানে। যার হাতে আপাতত চায়ের কাপ সাথে ডিশ। ফারিশ দাঁতে দাঁত চেপে তুবার উদ্দেশ্যে বললো,
— কী করেছো তুমি?
তুবাও দমবার পাত্রী নয় মোটেই! দ্বিগুণ চেঁচিয়ে সে পাল্টা জবাব দিলো,
— তোমার মা আমাকে হুকুম করেছে। কোন সাহসে করেছে? হ্যাঁ?
চোখদুটো যেনো রাগের তোপে কোটর হতে বেরিয়ে আসবে আসবে ভাব। ফারিশ দ্বিগুণ রেগে গেলো। সটান হয়ে দাঁড়িয়ে হুংকার ছুঁড়লো তার পৌরুষ সত্তা,
— তুবাআআআ!
— গলা নামিয়ে, ফারিশ। আমি তোমার প্রথম স্ত্রী নই যে-কিনা সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করবে।
মুহূর্তেই স্তব্ধ হলো ফারিশ। মেহনাজ আক্তারের চোখের পানি ফোয়ারার ন্যায় বহমান। থামা কোনো জো নেই। ইশতিয়াক জোয়ার্দার গিয়ে ধীরে ধীরে স্বীয় স্ত্রীকে তুলে ধরলেন৷ চোখে-মুখে অন্যরকম এক অন্ধকার। ফারিশ তেঁতে গিয়ে তুবার পানে হিংস্র চাহুনি নিক্ষেপ করলো। তর্জনী উঠিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে তুবার উদ্দেশ্যে পাষণ্ড কোনো পশুর ন্যায় সর্বগ্রাসী হুংকার ছুঁড়লো,
— মাইন্ড ইয়্যুর ল্যাঙ্গুয়েজ তুবা!
তুবা সেসব আমলে নেওয়ার পরিবর্তে উল্টে ফারিশের অহংকার গুড়িয়ে তেজী স্বরে আওড়ালো,
— হোয়াট ল্যাঙ্গুয়েজ? আমি তোমার জন্য চা নিয়ে যাচ্ছিলাম। আর উনি এসে আমাকে বললেন,
‘বউমা, চা নিয়ে এসো এক্ষুণি।’ তাও আবার হুকুম করে। তোমার খেদমত করি সেটা কী কম? যে তোমার বাপ-মা এভাবে হুকুম দেয়?
ফারিশ স্তব্ধ হয়ে গেলো। এই তুবা কী সেই তুবা যাকে কি-না ফারিশ তিনমাস পূর্বে বিয়ে করে এনেছিলো। তিন কবুল পড়ে নিকাহ করেছিলো? প্রথম তিনমাস তো ঠিক ছিলো। তবে এখন কী হলো? ফারিশ আশ্চর্য্যের চরম পর্যায়ে গিয়ে হতবাকতায় শুধালো,
— তুবা, তুমি এতো পরিবর্তন হলে কী করে?
তুবা মুহূর্ত ব্যয় না করেই উত্তর দিলো,
— যেভবে তুমি পাগল হচ্ছো, তোমার প্রথম বউয়ের কারণে।
মুহূর্তের মধ্যেই বরফের ন্যায় জমে গেলো ফারিশ। সেই স্থানটিতে কেও বোধহয় তাকে আটকে ফেললো। সে নড়তে পারলো না; আর না-তো পারলো কন্ঠনালি ছাপিয়ে কিছু বের করতে। তুবা শব্দ করে চায়ের কাপখানা টেবিলে রাখলো। অতঃপর স্বামীর তোয়াক্কা না করেই নিজেদের কক্ষের পানে চলে গেলো বিরক্ত আদলে। ইশতিয়াক জোয়ার্দার স্বীয় স্ত্রীকে নিয়ে চলে যাওয়ার পথ ধরলেন। মেহনাজ আক্তার ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানো প্রয়াস চালাচ্ছেন। আজ অব্দি কেও তাকে এতোটা অপমান করার সাহস করে ওঠেনি। তিনি যাওয়ার পূর্বে ফারিশের নিকটে গিয়ে থামলেন। ফারিশের আদল কেমন উন্মাদের ন্যায় ঠেকলো তার নিকট। তিনি ছেলের মুখে হাত ছুঁইয়ে ক্রন্দনরত স্বরে আওড়ালেন,
— ঠিক আছি আমি আব্বু, ঠিক আছি!
অতঃপর তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে প্রস্থান গ্রহণ করলেন। ফারিশ নিষ্পল লোচনে চেয়ে রইলো মায়ের যাওয়ার পানে। অসহায়ত্ব; রাগ; ক্ষোভ—সকল কিছুর সংমিশ্রণে তৈরি হওয়া এক অদ্ভুত অনুভূতি ফারিশের চোখের কোণে পানি টেনে আনলো। অক্ষিকোটর ভরে উঠলো বিন্দু বিন্দু পানিকণায়। রক্তবর্ণ ধারণ করে তার ধূসর বর্ণের চক্ষুদ্বয় [চোখের রং পরিবর্তন করা হয়েছে।]। সাথে মুষ্টি বদ্ধ হয় হাত। চোয়াল শক্ত করে সে নির্নিমেষ চেয়ে রয় নিজেদের কক্ষের পানে যা আপতত বন্ধ, ঠিক তার তাকদীরের মতোই। অতঃপর রাগে দীর্ঘ পদক্ষেপ ফেলে বেরিয়ে গেলো জোয়ার্দার ভিলা হতে। এই বাড়ি এমুহূর্তে তার কাছে বিষাক্ত কোনো দ্রব্যের চেয়ে কম মনে হলোনা।
জুনায়েদ আয়রাকে পেছনে ফেলে ধীরলয়ে আমিরাকে নিয়ে পার্কিং এরিয়ার সম্মুখে গিয়ে উপস্থিত হলো। আয়রা আশ্চর্য্যের ন্যায় ওখানেই কিছু্ক্ষণ স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলো। মানে এ কোন রাজ্যের কথা তা তার মাথায় ঢুকলোনা! অবশ্য তার ওখানে অতক্ষণ যাবৎ বরফ হয়ে থাকতে হলোনা। জুনায়েদ নামক পুরুষটিই তাকে ঘাড় ঘুরিয়ে ফের ডাক দিলো,
— ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে?
আয়রার যেনো এতক্ষণে সম্ভিত ফিরলো। মস্তিষ্কের আনাচে-কানাচে উঁকি দিলো তার বাহিরে বের হওয়ার হেতু। রমণী মুহূর্ত ব্যয় না করেই চটজলদি এগিয়ে গেলো সামনের দিকে। সামনে পার্কিং এরিয়ায় আপাতত গুটিকতক কার এবং অনেকগুলো বাইক রাখা। বিএমডব্লিউ, সুজুকিসহ আরও কয়েকধরণের বাইক। পার্কিং এরিয়ার শেষ অব্দি যতদূর চোখ যায় ঠিক ততদূর অব্দি কেবল বাইক। অন্যপাশে কেবল ছ’সাতটি কার হবে এবং মাইক্রো হবে। জুনায়েদকে বড্ড কনফিউজড দেখালো এ’পর্যায়ে। তার চোখ একবার বাইকের দিকে তো আরেকবার কারের দিকে যাচ্ছে। মন-আত্মা সব বলছে—‘যত কঠিন এলার্জিই হোক, বাইক চালিয়েই যা’ অথচ কোথাও না কোথাও সে আটকাচ্ছে; বারংবার থমকে যাচ্ছে তার চিন্তাধারা। কী যে হচ্ছে এসব! এসব ভাবনা চিন্তার মাঝেই স্বীয় রমণী—বখাটে পুরুষের শত শত অহেতুক ভাবনার এক এবং একমাত্র কারণ ‘আয়রা’ এসে হাজির হলো তার পাশে। রমণীর আগমনীর সাথে সাথেই জুনায়েদের কানে ভেসে এলো এক সুমধুর মিষ্টি কন্ঠস্বর,
— কী হলো?
জুনায়েদ চোখ বুজলো। তার সমস্ত অঙ্গে বয়ে গেলো এক শীতল স্রোত। আবহাওয়া যথেষ্ট উষ্ণ হওয়ার সত্ত্বেও তার শীরদাঁড়া কেঁপে উঠলো অজানা এক অনুভূতিতে। শুকনো এক ঢোক বয়ে গেলো কন্ঠনালি হয়ে। ফলস্বরূপ, বলিষ্ঠ; সুদর্শন পুরুষটির পুরুষত্বের নিদর্শন স্বরুপ গন্ডদেশে অবস্থিত এডামস এপেল ওঠা-নামা করলো ভীষণ আকর্ষণীয় ভঙ্গিমায়৷ পুরুষটির কাছে এই স্বর নির্ঘাত কোনো এক মরণব্যাধি বিনা কিছু নয়৷ সে ন্যানো সেকেন্ডের মাঝেই আঁখিদ্বয় মেলে লোচন নিবিষ্ট করলো তার পানেই পিটপিট চোখে চেয়ে থাকা রমণীর পানে। মেয়েটা তার দিকে ওভাবে চেয়ে কেনো? জুনায়েদ তাকাতে পারেনা অতক্ষণ। আজ যেনো আয়রাকে এক অন্যরকম সুন্দর ঠেকছে জুনায়েদের নিকট। যার নিকট হতে জুনায়েদ পালাতে চাইছে তার সামান্য তাকানোতেই বারংবার তার বিনাশ ঘটছে! জুনায়েদ নজর ঘুরিয়ে শান্তস্বরে প্রত্যুত্তর করে তার,
— নাথিং, জাস্ট থিংকিং। হুইচ ওয়ান শ্যুড আই টেইক।
আয়রার কপাল কুঁচকে গেলো। প্রশ্নাত্মক বাণ ছুঁড়ে দিলো পুরুষটির নিকট,
— আপনি এই অবস্থায় বাইক চালানোর চিন্তা করছেন না নিশ্চয়?
জুনায়েদ ঘাড় ঘোরালো। কারুকাজে অঙ্কিত কোনো নিদর্শনের ন্যায় ভ্রু’জোড়ার একটি উঁচালো ভীষণ দক্ষ ভঙ্গিমায়। অতঃপর চোখ দুটো ছোট ছোট করে শুধালো,
— মাইন্ডও রিড করতে পারো তুমি?
আয়রা হতাশ চোখে চেয়ে রইলো জুনায়েদের পানে। এ’পর্যায়ে জুনায়েদের চোখ পড়লো আয়রার নিচে ঝুলে থাকা বোরকার ওপর। যা ইতোমধ্যেই মাটির সঙ্গে বন্ধুত্ব করে নিয়েছে। লম্বা বোরকা! অবশ্যই বাইকে যেতে অসুবিধে হবে আয়রার। স্কুটি নেই তার সংগ্রহে। জুনায়েদ মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো। সে কারেই যাবে৷ যদিও কারের কথা মাথায় আসতেই তার কেমন বমি বমি পেলো। এই কার-টার আবার বখাটে জুনায়েদের জন্য নাকি? দীর্ঘশ্বাস ফেললো! মেয়েটার না বলাতেই পুরুষটি কত কিছু করে ফেলছে; একবার মুখ ফুঁটে চায়লে বুঝি দুনিয়া হাজির করবে তার পায়ের কিনারায়! জুনায়েদ গিয়ে কারের সাইডগুলোতে গেলো। জুনায়েদের পায়ের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটা আয়রার জন্য বেশ দুষ্কর হয়ে পড়ে সর্বদা। যতই হোক। জুনায়েদের উচ্চতদ ছ’ফুট দুই ইঞ্চি। সে তুলনায় আয়রা কেবলই পাঁচ ফুট চার। কারের সাইডে কয়েকটি কার বাকি। অবশিষ্ট গাড়িগুলো ওয়াশ করা হচ্ছে। সে গিয়ে বিএমডব্লিউর লোগো থাকা কারটির সম্মুখে গেলো। কার ড্রাইভার গাড়ির পাশেই দাঁড়ানো ছিলো। ওখানটায় প্রায় দশজন মতো পুরুষ উপস্থিত। জুনায়েদ আয়রার অস্তিত্ব নিজের পাশে অনুভব করতেই নিজের গম্ভীর; রুক্ষ স্বরে কঠিন গলায় আদেশের স্বরুপ বয়াম দিলো,
— এভ্রিওয়ান, কিপ ইয়্যুর আইজ অন দ্যা গ্রাউন্ড। চোখ তুলে তাকানোর স্পর্ধা কেও দেখাবেনা!
সাথে সাথেই সকলের নজর নিবদ্ধ হলো মাটিতে। কেও একবারের জন্যেও মাথা উঁচিয়ে তাকানোর সাহস করলোনা। ড্রাইভারটিও সাথে সাথে মাথা নিচু করে ফেললো। আপাতত সকলেই হতবাকতায় বিভোর। শাহরিয়ার পরিবারের এক এবং একমাত্র উশৃঙ্খল পুরুষ কি-না কারে করে যাবে? এ ও সম্ভব। সেখানে চাকরিরত এক ড্রাইভার যে ছোট বেলা হতেই জুনায়েদকে অক্ষরে অক্ষরে চেনে তার মাথায় যেনো আজ সত্যি সত্যিই আকাশ ভেঙে পড়লো। এ ছেলে কি-না যাবে কারে? অষ্টম শ্রেণিতে থাকাকালীন একবার বাইকের জন্য শিরা কেটে ফেলা ছেলেটা বাইক পাওয়ার পর আর কখনো কারের ধারে কাছে আসেনি। সেখানে এতবছর পর এই ছেলে আর কার? জীবনে যত আশ্চর্যের জিনিস দেখেছে তন্মধ্যে এটিই বোধহয় দারুণ ছিলো। জুনায়েদ কার ডোরের সম্মুখে আসতেই ড্রাইভারটি জুনায়েদের সাইডের দরজাখানা খুলে দিলো। জুনায়েদ আগে না গিয়ে আয়রার পানে তাকালো। আয়রা বুঝলো বোধহয় জুনায়েদের চাহুনি। সনে সনেই সেও চোখ তুলে তাকালো। অমনি চোখাচোখি হলো দু’জনার। দৃষ্টি মিলন হতেই জুনায়েদ আয়রার পানে ইশারা করলো তাকে আগে যেতে। আয়রা দ্বিমত করার পরিবর্তে এগিয়ে গিয়ে ধীরলয়ে উঠে বসলো কারের ডান সাইডে। অতঃপর জুনায়েদ আমিরা হস্তান্তর করলো। তার অন্যতম কারণ, তার এলার্জির প্রকোপ বেড়েছে অল্প। সহ্য করাও মুশকিল! জুনায়েদ আমিরাকে মায়ের কোলে দিয়ে নিজে উঠতেই যাবে পরক্ষণেই সে উপলব্ধি করলো তার প্যান্টপর নিচের অংশ ছোপ ছোপ ভেজা। ভ্রু কুঁচকে গেলো তার। তার সমুদ্রের ন্যায় প্রগাঢ় নীল চক্ষুদ্বয় সম্মুখে পড়তেই এক কর্মচারীকে থরথর করে কাঁপতে দেখা গেলো। হাতে পানির পাইপ। জুনায়েদ বিষয়খানা বুঝে উঠতেই শক্ত হলো তার চোয়াল। ধারালো ভঙ্গিৃায় ফুঁটে উঠলো তা। অসহনীয় তীর্যক রাগী চাহুনির উত্তাপের স্বীকার হলো চল্লিশোর্ধ্ব কর্মচারীটি। চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করলো,
— হোয়াট দ্যা হেল!
কর্মচারীটির অক্লেশের স্বর,
—ক্ষ..ক্ষমা করবেন আমায়। আমি দেখতে পাইনি।
জুনায়েদের একই ক্ষীপ্র চাহুনি এবং হিংস্র হুংকার,
— হোয়াট ননসেন্স! দেখতে পায়নি মানে? ডু ইয়্যু হ্যাভ ইভেন এনি আইডিয়া হাও মাচ দি প্যান্ট কস্টস?
কর্মচারীটির অপমানে; লজ্জায়; ঘৃণায় চোখের কোণে জল জমলো। বাকি কর্মচারীরাও ভীত আদলে দাঁড়িয়ে। অথচ কেও মাথা তুলে তাকানোর সাহস অব্দি করছেনা। কিছু বলাতো দূর। এ যেনো তাদের নিত্যদিনের কাহিনী। জুনায়েদের ধমকানোতে কেঁপে উঠলো আয়রা। এ’কেমন রূপ জুনায়েদর? কর্মচারীটি আবারও ভয়ে ভয়ে বললো,
—স্যরি..স্য..স্যরি স্যার।
— স্যরি মাই ফুট!
জুনায়েদের একই স্বর। মাঝপথে বাধ সাধলো আয়রা। সে খানিকটা অবাক এবং রুষ্ট কন্ঠে ডাকলো জুনায়েদকে,
— শুনুন!
ক্ষণিকের মধ্যেই জুনায়েদের চিরচেনা গম্ভীর আদলের চিরচারিত কপালের ভাঁজ অদৃশ্য হয়ে টানটান হলো মসৃণ কপাল। হিংস্র চাহুনি এবং শক্ত চোয়ালের পরিবর্তে তার দৃষ্টি হলো নমনীয়। সে একবার আয়রার পানে তাকিয়ে শুধালো,
— কী?
আয়রা একই স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
— এসব কী হচ্ছে?
— কোথায় কী হচ্ছে?
জুনায়েদ অবুঝের ন্যায় পাল্টা প্রশ্ন করলো।
— আপনি ওনার সাথে এভাবে কথা বলছেন কেনো?
জুনায়েদ তোয়াক্কা না করার ন্যায় গুরুত্বহীন স্বরে জবাব দিলো,
— আচ্ছা? এখন কী তুমি আমায় শিখিয়ে দিবে কীভাবে মানুষের সাথে আমার কথা বলতে হবে?
আশ্চর্য হয় আয়রা।
— আমি কেনো শিখিয়ে দিতে যাবো? কিন্তু এভাবে তো গুরুজনদের সাথে কথা বলা অনুচিত। স্যরি বলুন।
জুনায়েদের মনে হলো তাকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় এবং হাস্যকর কৌতুক শোনানো হয়েছে। সে তার হাসিটুকু গিলে কেবলই ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো। ফলস্বরূপ পুরিষটির বাম গালের কোণায় ছোট করে এক টোলের সূচনা ঘটলো। সে রসাত্মক অভিব্যাক্তিতে ব্যঙ্গ করে বললো,
— স্যরি আর আমি? পৃথিবী ধ্বংস হবে তবে আমার অহমিকা নয়!
— আল্লাহ রুষ্ট হবেন এতে। অন্তত খোদাতায়ালার জন্য তো ক্ষমা চায়তেই পারেন, তাইনা?
আয়রার বরাবরের ন্যায় ধীর স্বর। জুনায়েদ বক্ষভাঁজে নিজের পেশীবহুল হাতদুটো গুঁজতে গুঁজতে তার প্রশ্নের জবাব দিলো গভীর স্বরে,
— হু? ক্ষমা? দু’দিন ভালোভাবে কী কথা বলে নিয়েছি নিজেকে কী ভেবে নিয়েছো তুমি? এই ঢাকা শহর কাঁপানো যায়নাব জুনায়েদ শাহরিয়ার কি-না স্যরি বলবে? আর ইয়্যু ক্রেইজি? হাহ!
ভীষণ গর্ব এবং জেদ নিয়ে কথাখানা বললেও পরমুহূর্তে আয়রার লোচন ছিলো দর্শনীয়। ক্ষীপ্র সেই চাহুনি। মসৃণ কপালের ভাঁজ। জুনায়েদ তড়াক করেই প্রশ্ন করে বসলো,
— এভাবে চেয়ে আছো কেনো?
আয়রা উত্তর দিলোনা। না-তো সেই প্রশ্নের কোনো প্রতিবাধ করলো। সে কেবল নিজের দৃষ্টিনত করলো। এতোক্ষণের ক্ষীপ্র এবং প্রতিবাদী চাহুনিতে ধরা দিলো কেবলই অপমানবোধ। সেই অপমানে তার আদল হয়ে উঠলো মলিন। চক্ষুদ্বয় হলো ভারী। সে আর একবারও পুরুষটির পানে নজর ঘোরালো না। দৃষ্টিনত করে বসে রইলো। সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল রমণীর নেকাবের নিচে ঢাকা রইলেও পুরুষটির অতিরিক্ত কষ্ট হলোনা নেকাবের আড়ালে ঢাকা শান্ত মুখটার অভিব্যক্তি বুঝতে। চোখদুটের চাহুনি সে মুহূর্তেই ঠাহর করে ফেললো সে। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো পুরুষটির বুক চিঁড়ে।
অকস্মাৎ এক গম্ভীর দুটো শব্দে ভীষণ বিস্ময়তায় রমণী চোখ তুলে চায়লো। ছোটো দুটি শব্দ; কেবল দুটিই! অথচ এর অর্থ সে স্থানে উপস্থিত সকলের-ই উপলব্ধি হলো। দুটো শব্দের ভার বোধহয় পৃথিবীর-ই দ্বিগুণ হবে। জুনায়েদের রুক্ষ স্বর ভেদ করে বেরিয়ে আসা দুটো শব্দ,
—আ’ম স্যরি!
হ্যাঁ! জুনায়েদ তার মুখ হতে এই দুটো লাফজ-ই বের করেছিলো কেবল। বখাটে পুরুষ যায়নাব জুনায়েদ শাহরিয়ার যার বুদ্বিজ্ঞান হওয়ার পর কাওকে জীবনে প্রথমবারের মতো স্যরি বলেনি অথবা ক্ষমা চাওয়া শিখেনি, সেই পুরুষ এমন কারও সম্মুখে ঝুঁকেছে যার আদলের মলিনতা তাকে মাথা উঁচু করে থাকতে দেয়নি। সেই পৌরুষ সত্ত্বাটি প্রথমবারের মতো নিজেকে নিচু করে কারও মনের পরোয়া করেছে। ওই দুটি চোখ- যা তাকে ক্ষণে ক্ষণে মাতোয়ারা করে সে ওই দুটি চোখের হেতুতে ক্ষমা চেয়েছে। বিরল এই ঘটনায় আয়রা হতবাক হলো। এতক্ষণ যে অহমিকা দেখাচ্ছিলো? তবে এখন কী হলো যে ক্ষমা চায়লো? আয়রার মনে প্রশ্ন জাগলেও সে নিশ্চুপ রইলো। জুনায়েদ দাঁত খিঁচিয়ে শব্দ দুটি বলেই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা আয়রার পানে তাকালো। কপালে তখনো তার রুষ্ঠতার ভাঁজ। দু’জনের দৃষ্টির মোলাকাত হলো। জুনায়েদ মুহূর্ত ব্যায়-এ আয়রার পাশের সিটটি দখল করে নিলো। আয়রাকে বললো,
— সিটবেল্ট বাধো!
আয়রা কোনো এক ঘোরেই যেনো কথাটি মেনে সিটবেল্ট বাধলো।
অতঃপর রুক্ষ পুরুষটি ড্রাইভারকে বললো কেবল,
— ড্রাইভ ফাস্ট!
ড্রাইভারটি এতোটা চমকে ছিলো যে সে প্রথমে ঠাহর করে উঠতে পারলোনা কথাটি কী তাকে বলা হয়েছিলো কিনা। এ কী শুনে নিলো সে? কেবল কী সে? সেই কর্মচারীটির মনে হলো সে বুঝি অবশেষে পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্যের বস্তুটি উদঘাটন করেই নিলো। হতবাকতায় সে পাশে থাকা অপর কর্মচারীকে শুধালো,
— কী বললেন উনি শুনেছো?
সেও চোখদুটো বড় করে ফিসফিসিয়ে বললেন,
— হ্যাঁ।
— বোধহয় ভুল শুনেছি!
— আমিও তাই ভাবছি।
জুনায়েদের গাড়িখানা বের হওয়ার পরপরই সকলে স্বানন্দে এ বিষয়ে আলোচনা করা আরম্ভ করলো।
— এটা কী করে সম্ভব? এই মাতাল পুরুষ তালে আছে তো? স্যরি? তোমরা বুঝতে পারছো? সে আমায় স্যরি বলেছে, আমায়!
— এটা অসম্ভব! এতো জেদ্দী ছেলে কারও সামনে মাথা নত করেনা। আজ এটা কীভাবে হলো?
কর্মচারীদের মাঝের এই কথোপকথন অব্যাহত রইলো। তা কেবল তাদের মধ্যেই নয়, শাহরিয়ার বাড়ির পার্সোনাল ড্রাইভারের কানেও গেলো। অতঃপর তা এহমাদ শাহরিয়ার অব্দি পৌঁছাতেও খুব একটা সময়ের প্রয়োজন পড়লোনা।
বেশ কিছুক্ষণের মাঝেই তারা এসে উপস্থিত হলো হসপিটালের সম্মুখে। বাহিরের আবহাওয়ার অবস্থা বেশ করুণ! আজকাল বাংলাদেশের আবহাওয়া বড্ড বাজে হয়েছে। এই ঝড় তো আবার এই রোদ। আজও ব্যতিক্রম নয় তার। সম্পূর্ণ আকাশে সাদা মেঘের পরিবর্তে ধূসর-কালো পেজা তুলোর বিচরণে পরিপূর্ণ।যেনো তারা আগাম ঝড়ের পূর্ভাবাস। সূর্য লুকিয়ে রয়েছে সেই মেঘেদের চাদরে। দমকা হাওয়া চারিপাশে। ড্রাইভারটি গাড়ি থামিয়ে প্রথমে জুনায়েদের পার্শ্বের দরজা খুলে দিলো। জুনায়েদ গাড়ি হতে নামার পূর্বে সিটবেল্টের বাধন ছাড়িয়ে আমিরাকে নিয়েই নামলো। বোরকা পরিহিতা রমণীর আমিরাকে নিয়ে নামতে হবে কিনা! ড্রাইভারটি অপরপাশে গিয়ে আয়রার সাইডের ডোর ওপেন করতে গেলে হঠাৎ বাধা পেলো,
— ডোন্ট!
অতঃপর জুনায়েদ নিজেই গিয়ে আয়রার সাইডের ডোর ওপেন করলো। ড্রাইভারটির আজ বুঝি চমকানোর দিন। এতোটা ভদ্র কবে থেকে হলো এই ছেলে? নির্ঘাত জ্বিনের আছড়! তা যদি না হয় তবে…তবে তা ওই মেয়েটার আছড়-ই হবে। জুনায়েদ আয়রার সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ালো। কেননা আয়রার পাশটি ছিলো ডান এবং সেদিকটায় গাড়ির চলাচল ছিলো ক্ষীপ্র। হসপিটালের সামনেই গাড়ি থামেনি অবশ্য। রাস্তার একপাশেই থেমেছিলো। তবু জুনায়েদের মস্তিষ্কে না জানি কোথা হতে আয়রার জন্য এতোটা যত্ন চলে এলো! সে নিজের অজান্তেই প্রতিমুহূর্তে মেয়েটির কথা ভেবে বসে যখন সে নিজেই প্রতিবার প্রতিজ্ঞায় লিপ্ত হয় যে সে কখনো আর ওই রমণীটির পরোয়া করবেনা। অথচ প্ররতিবারই ঘুরেফিরে মস্তিষ্কের চাকা সেই আয়রা নামক মেয়েটির বিন্দুতেই পতিত হয়। আয়রা বহুক্ষণ যাবৎ সিটবেল্ট খোলার চেষ্টা করছে। কী জানি কী হলো! খুলছেইনা। আয়রা নামছেনা দেখে জুনায়েদ তার চিরচারিত গম্ভীর সুর এবং নিজের দেওয়া ডাকনামে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় ডাকলো,
— হিজাবিনী!
সিটবেল্ট খুলতে থাকা আয়রার উত্তর ভেসে এলো তৎক্ষনাৎ,
— হু!
আকাশের পানে নজর ঠেকিয়ে জুনায়েদ প্রত্যুত্তর করলো স্বগোতক্তিতে,
— বেরিয়ে এসো দ্রুত, সম্ভবত বৃষ্টি নামবে।
আয়রার কুঁচকানো ভদ্রুদ্বয়ে চিন্তার ভাঁজ,
— আরে, সিটবেল্টটা খুলছেনা।
ভ্রু কুঁচকে গেলো জুনায়েদের,
— খুলছে না?
আয়রা বহুকষ্টে সক্ষম হলো এবারে। ভীষণ উৎফুল্লতায় বললো,
— হ্যাঁ, পেরেছি।
পরপরই দ্রুততায় সে নিচে নামতে উদ্ব্যত হলো। অমনি ঘটে গেলো এক দূর্ঘটনা। তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে পদতল আপনাআপনই নিজেদের মাঝে সংঘর্ষণ ঘটিয়ে আয়রাকে ফেলে দিলো বিপদের মুখে। আয়রা ন্যানোসেকেন্ডের মাঝে মুখ থুবড়ে পড়তে আরম্ভ করলো পিচঢালা রাস্তায়। এই বুঝি প্রাণ যায় যায় অবস্থা। সে ক্ষীণ স্বরে ভয়ে পেয়ে আর্তনাদ করে উঠলো,
— আহ!
আয়রা খিঁচে বুজে ফেললো নিজের চোখদুটো। এক্ষুণিই বোধহয় পড়ে গেলো। তবে তাকে ভুল প্রমাণিত করে একজোড়া বলিষ্ঠ হাত তাকে জড়িয়ে নিলো স্বীয় বাহুবন্ধনে। আবদ্ধ করলো নিজের হাতের পুরুষ্ঠ অঞ্জলিতে। অভিব্যক্তির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন পরিলক্ষিত হলোনা। যেনো এহেন কাণ্ড অনুধাবন সে পূর্ব হতেই করে বসে ছিলো। অভিব্যক্তি সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রেখে পুরুষটির গভীর স্বর চিঁড়ে বেরিয়ে গুটিকতক শব্দ,
— চিন্তা নেই মেয়ে; যতবারই পড়বে–এই বখাটের শক্তপোক্ত বুকে এসেই আছড়ে পড়বে। হোক বিপদ অথবা কোনো দূর্ঘটনা, এই উন্মাদ পুরুষের বক্ষস্থলই তোমার সর্বশেষ ঠিকানা!
জুনায়েদের এমন গম্ভীর স্বরে চোখদুটো মেললো রমণী। চোখের মাঝে লেপ্টে থাকা ভয়টুকু মুহূর্তেই কেটে গেলো। আশপাশ তাকিয়ে সে খানিকটা লজ্জিতও হলো। আশপাশের সবাই কেমন করে তাকিয়ে। সে সরে এলো খানিকটা। নিজেকে সামলে আমতা আমতা স্বরে জবাব দিলো,
— ধ..ধন্যবাদ!
জুনায়েদ হাসলো অল্প। একদমই ক্ষীণ তা। ঠোঁটের কোণদুটো কেবল নিচু হলো। ফের তার অভিব্যক্তি পূর্বের ন্যায় করে সে জবাবখানা পেশ করলো,
— ইটস ওকে, নাও কামন!
জুনায়েদ আয়রাকে আগে রেখে সে পিছু পিছু এগোলো। আয়রা অবশ্য চেনে না এখানটা। সেকারণে বেশিদূর যেতে পারলোনা সে। থেমে গেলো মাঝেই। পেছনে তাকিয়ে দেখলো জুনায়েদ তার পেছনেই। অতঃপর আবারও সামনে হাঁটা আরম্ভ করলো। জুনায়েদ এবারে আয়রার পিছু পিছু না গিয়ে সাথে সাথে হাঁটা আরম্ভ করলো। মুহূর্ত পেরোতেই সে খেয়াল করলো আয়রার হাঁটার বেগ তার তুলনায় প্রচণ্ড দূর্বল। মেয়েটার কষ্টই হচ্ছে হাঁটতে। ততক্ষণে তারা হসপিটালের দোরগোড়ায়। আয়রার বোরকা প্রায় পা লেগে লেগে চলছে। যেকোনো সময় তার পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। তীর্যক চোখ দুটো তা দেখতে পেয়েই হাঁটার গতি ম্লান হলো তার। ধীর পায়ে হাঁটতে আরম্ভ করলো। আয়রার সাথে তালে তাল মিলিয়ে। আয়রা যেনো এতক্ষণে স্বস্তি পেলো। জুনায়েদ রিসিপশনে গেলোনা। এর আগেও তার এলার্জি হয়েছিলো। সেহেতু, সে অত্যন্ত ভালো করেই ডক্টরকে চেনে। অবশ্য, সেই ডক্টর জুনায়েদের বড্ড কাছেরও বলা যায়। রুহানি সৈয়দের ভাই সে। অর্থাৎ জুনায়েদের মামা। বয়সের পার্থক্য কেবল চারবছরের। অর্থাৎ জুনায়েদের সেই ডক্টর মামা তায়েব সৈয়দের বয়স কেবল চৌত্রিশ বছর। সেই হিসেবে বেশ ভালোই খাতির দুজনের।জুনায়েদ এবং আয়রা লিফ্ট ব্যবহার করে তৃতীয় তলায় উঠলো।
সৌভাগ্যবশত সেসময় লিফ্ট ফাঁকাই ছিলো। জুনায়েদের চুলকানি বেশ ভালোই বাড়ছে। জুনায়েদ সরাসরি তৃতীয় তলায় উঠে নিজের যান্ত্রিক ফোনটাকে বের করে কল করলো তাকে। আয়রা আশপাশটা নিগূঢ় দৃষ্টে পর্যবেক্ষণ করছে। জুনায়েদ একটু ছিটকে গিয়ে কানে কল তুললো। এই ভঙ্গিমায়ও পুরুষটিকে অমায়িক পার্ফেক্ট দেখাচ্ছে। হাতের রূপোলি ব্রেসলেট, সিলভারের অঙ্গুরি। সাথে ফর্সা ত্বকের নীলরঙা রগ। তখনই ঘটলো এক বিপত্তি। হুড়মুড়িয়ে কোথা থেকে যেনো ক’জন মেয়ে চলে এলো কলে কথা বলতে থাকা জুনায়েদের আশেপাশে। মুহূর্তেই ঘিরে ধরলো তাকে। আয়রা চমকে গিয়ে তাকালো। জুনায়েদ নিজেও হতবাক! তার কথা বলা অতটুকুতেই থমকে গেলো। সে হতবাক হয়ে সম্মুখে তাকাতেই প্রায় দশজনের মতো রমণী তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে তা দেখতে পেলো। জুনায়েদের কোলে তখনও ছোট্ট আমিরা। ঘুমিয়ে। গায়ে তার সোয়েটার জড়ানো। ঠান্ডা লেগে যাবে বলে আয়রাই তাকে পড়িয়েছে। আয়রার দৃষ্টি আপাতত সেদিক পানেই। হুট করেই এতোগুলো মেয়ে…এতোটা ভিড়! হচ্ছে টা কী? আয়রার বুঝে এলোনা কিছুই। জুনায়েদ পরমুহূর্তেই মেয়েগুলো উৎফুল্ল উচ্ছ্বাসে বুঝতে পারলো ব্যাপারটা। যারা বলছে,
— হাই, আপনি বাইকার জুনায়েদ না? আমি আপনাকে ইন্সটায় ফলো করি!
আরেকজন বললো,
— অঅঅ, আপনি রিয়্যাল লাইফে আরও অনেক অনেক হ্যান্ডসাম।
— আর আপনার নীল চোখদুটো। প্লিজ, একটা সেলফি তুলি?
জুনায়েদের মেজাজটা মুহূর্তেই খারাপ হলো। সহসাই তার দৃষ্টি ঘুরে গেলো একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীটির পানে। যে আপাতত ভ্রু কুঁচকে তার দিকেই তাকিয়ে। সেখানটার শোরগোল এবং চেঁচামেচিতে আমিরা হঠাৎ করেই ডুকরে উঠলো। ব্যস! জুনায়েদের বিগড়ে যাওয়া মেজাজ সেখানেই নিজের সকল সীমা অতিক্রম করলো। নিজের অভিব্যক্তি গাম্ভীর্যতার আড়ালে লুকিয়ে কঠোর আদলে সে গর্জে উঠলো ক্ষেপা সিংহের ন্যায়,
— জাস্ট শাট আপ!
হুট করে নিজেদের আইডল এবং ক্রাশ বয়ের নিকট হতে এমন হুংকার মোটেই আশা করেনি কেও। সকলেই এই ধমকে চুপসে গেলো। চোখদুটো বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো ওদিকটায়। একটা বাচ্চা! তারা নিজেদের মাঝেই ফিসফিসিয়ে বলা আরম্ভ করলো,
— এটা কে? তবে কী জুনায়েদ শাহরিয়ার বিবাহিত?
তার ফ্যানদের জন্য সে একজন ভিলেইন। যে বখাটে; ঘাড়ত্যাড়া। সর্বদা মেজাজী; রুড। যাকে আটকাতে পারেনা কোনো আইন; যে নিজের মর্জির মালিক। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো–জুনায়েদ অতিরিক্ত সুদর্শন।কারও স্বপ্নের পুরুষ তো কেও আবার নাক ছিটকায় তাকে দেখেই। তবে তারা অবাক। তাদের ক্রাশবয় জুনায়েদ কী বিবাহিত? মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়ে তাদের।
বখাটে পুরুষের কী আর সেদিকটায় খেয়াল রয়েছে? সে তো ব্যস্ত আমিরাকে কোলে নিয়ে সেই ভিড় ঠেলে বের হওয়ার উদ্দেশ্যে। সেই জায়গায় অনেক মানুষ এবং শোরগোলের কারণে আমিরা অনবরত কেঁদে চলেছে।শান্ত করতে পারছেনা জুনায়েদও। জুনায়েদ বিরক্ত হয়। অথচ মেয়েগুলোর দিকে দ্বিতীয়বার ফিরে তাকায়না। কেবল তাদের উদ্দেশ্যে শীতল স্বরে বলে,
— ডোন্ট রেকর্ড হার। আ’ম ওয়ার্নিং!
বেরিয়ে যায় সে সেই ভিড় ঠেলে। আমিরার বাচ্চা কন্ঠের ক্রন্দনরত মিহি স্বর,
— আম্মু, আম্মুউ!
জুনায়েদ বুঝলোনা প্রথমদিকে, শুধালো নরম সুরে,
— কী হয়েছে প্রিন্সেস? হু? বেশি খারাপ লাগছে?
— আম্মুউ তাছে যাবু।
জুনায়েদ বোধহয় এবারে বুঝতে পারলো পুরোটা। সে দ্রুততায় স্ত্রীর পানে এগিয়ে গেলো। অস্থির চিত্তে বললো,
— এইইই, দেখোতো। মেয়েটা কাঁদছে!
ঘটনার আকস্মিকতায় আয়রা কেবল জুনায়েদের পানে চায়তে চায়তেই আমিরাকে বুকে জড়িয়ে নিলো। পিঠে চাপড় মারতে মারতে মেয়ের পানে একবার তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বললো,
— এইতো আম্মু, আম্মুজান আছে এখানেই। কাঁদেনা আমার পরাণ!
জুনায়েদ অস্থির হয়ে তাকিয়ে। আমিরার কান্না ততক্ষণে থেমেছে। আয়রা আরও একবার জুনায়েদের পানে নজর রাখলো। জুনায়েদ তখন আমিরাকে দেখছিলো। আয়রার দৃষ্টি অনুধাবন করতে পেরেই সেও তাকালো। আয়রার কপালে আপাতত খানিকটা ভাঁজ। মনে মাঝে অনেকগুলো প্রশ্ন। বখাটে পুরুষটি বুঝি সবটুকু পড়েই নিলো। তাইতো তার পানে নজর রেখেই বলে বসলো,
— ডোন্ট ওয়ারি, ইয়্যুর হাজবেন্ড ইজ জাস্ট আ লিটল বিট ফেইমাস!
ইশ! কী বলে ফেললো জুনায়েদ। বুঝতে পেরেই নিজের লাল টুলটুকে নিম্নের ওষ্ঠ কাঁমড়ে ধরলো সে। সহসাই নিজেকে শুধরে ফের বললো বাক্যটি,
— আই মিন, আই আম জাস্ট আ লিটল বিট ফেইমাস। ইয়্যু নৌ, এজ আ’ম হ্যান্ডসাম!
আয়রা তখনো তার পানে বিস্ময়ে তাকিয়ে। যেনো সে এমুহূর্তে উপলব্ধি করতে পারলো এই বখাটে পুরুষ ঠিক কতটা রাগী সকলের ওপর। যে-কিনা নিজের ফ্যানদের সাথেও নমনীয় হয়না তাকে কোন ক্যাটাগরিতে ফেলা যায় জানা নেই আয়রার। অথচ এই একই পুরুষ আয়রা এবং আমিরার সামনেই কত শান্ত। আয়রা নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে নেকাবের আড়ালেই আচমকা হেসে ফেললো। সম্পূর্ণ নিজের অজান্তেই। সে যে কেনো হাসলো সে নিজেও জানেনা। তবে তার কেবল এই বিষয়টুকুতে হাসি পেলো। জুনায়েদ তা বুঝতে পারলো। আয়রার চোখদুটো কুঁচকে গেলো হাসির তোড়ে। জুনায়েদ হতবাক হলো। বললো,
— তুমি হাসলে?
মুহূর্তেই আয়রা শান্ত হয়ে গেলো। মাথা নাড়িয়ে বললো,
— বর্তমানে আপাতত আমাদের ডক্টরের কাছে যাওয়া উচিত। দ্রুত ব্যবস্থা করুন তার!
জুনায়েদের মুখখানা কালো হয়ে এলো। কতবড় মূল্যবান এক জিনিস মিস করলো সে। ধূর! বিড়বিড় করলো কেবল,
— যথাআজ্ঞা, বেগমজান!
শুনতে পেলোনা অবশ্য তা আয়রা। আবারও জুনায়েদ অবাক হলো। কীসব বলছে সে! ওহ গড। সে কী পাগল হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে? নাকি পাগল করে তুলছে এই মেয়েটা তাকে? সে বিড়বিড় করলো নিজেই,
তাকদীর পর্ব ১৫
— ওহ গড! ইয়্যু ব্লা*ডি বা*স্টার্ড, হোয়াট হেপেন্ড টু ইয়্যু? এই মেয়েটা কী সত্যিই জাদু জানে? এসব কী হচ্ছে আমার সাথে!
নিজের চুল নিজেরই ছেঁড়ার ইচ্ছে জাগলো বখাটে পুরুষের।
