Home ফিরে গেছে কত আলো ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ১২

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ১২

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ১২
শানজানা আলম

ঐশি বাসায় কিছুটা হন্তদন্ত হয়ে এসে ঢুকলো। এসে দেখল ড্রয়িংরুমে আসেপাশের বাসার অনেকে বসে আছে। এহসান বিল্ডিং কমিটির সেক্রেটারীসহ পাশের ফ্ল্যাটগুলোর সবাইকে জানিয়েছিল।এহসান সিসি ক্যামেরা চেক করছে।
ঐশি বলল, কি কি নিয়েছে? থানায় জানিয়েছ?
এহসান বলল, তোমরা গয়না গুলো কোথায় রাখা?
-আলমারিতেই ছিল, ঐশি দৌড়ে গিয়ে বেডরুমে ঢুকে একটা চিৎকার দিলো, এহসান আমার লকার ভাঙা!
সব কিছু ছুড়ে ছুড়ে খোঁজার চেষ্টা করল। কিছুটা অস্থিরতাও দেখালো। তবে এহসানকে শান্ত দেখালো।
ফ্ল্যাটমালিক এই বিল্ডিংয়ে থাকে না, সে বাড়িওয়ালাকে জানালো চুরির ঘটনা।
ঐশি বলল, এটা বুয়ার কাজ। বুয়াকে ধরলেই সব জানা যাবে।

পাশের ফ্লাটের ভাবী বললেন, জুলেখা প্রায় দশ বছর আমার বাসায় কাজ করে। সব কিছু গোছায়, কখনো টাকা পয়সা নেয় নি, ও কি এত বড় চুরি করবে?
ঐশি বলল, আপনি জানেন না ভাবী, এরা এরকম ভ্যান্দা সেজে থাকে, তারপরই বড় বড় চুরিগুলো করে।
এহসানকে সেক্রেটারি সাহেব বললেন, আপনি থানায় একটা জিডি করে আসুন। এত বড় ঘটনা এখানে আগে কখনো ঘটেনি।
এহসান বলল, ঠিক আছে।
সবাই চলে গেলে এহসান চুপ করে ড্রয়িংরুমে বসে রইল। গয়না চুরির ঘটনা ঐশি বাবা মা কে ফোন করে জানালো, তাদের তাড়াতাড়ি চলে আসতে বলল।
ঐশি এহসানকে বলল, পুলিশে যাবে না? বুয়ার এনআইডি তো আছে, একটা জিডি করে আসো, ওকে জিজ্ঞেস করলেই সব বের হয়ে যাবে।
এহসান বলল, দেখা যাক, কি করা যায়।
মানে? – ঐশি চমকে গেল।

-মানে তোমার গয়নাগুলো চুরি হয়েছে, তুমি তাও এত শান্ত, রিয়াকশন দিচ্ছ না, বা যেটা দিচ্ছ সেটাই আমার পছন্দ হচ্ছে না। আরেকটু কষ্ট পাওয়া উচিৎ না তোমার?
ঐশি বলল, কান্নাকাটি করলে কি গয়না ফেরত আসবে? এটা নিয়েও তুমি ইস্যু তৈরি করছ?
তুমি কি মানুষ?
এহসান বলল, মাঝে মাঝে মানুষ সত্যিই অমানুষ হয়ে যায়।একটা বিষয় খুবই অদ্ভুত লাগছে, চোর শুধু দরজা খুলে তোমার গয়নাগুলোই নিলো, পাশের লকারে আমার চেইন, ঘড়ি রাখা, সেটা নিলো না। বেশ কিছু টাকাও রাখা,সেটাও নেয় নি। আবার শুধু তোমার কাপড়গুলোই ছড়ানো।
সিসিক্যামেরায় দেখলাম বুয়া বের হয়েছে সেই দুপুরে, তারপর আর আসে নি। বের হওয়ার সময় খালি হাতেই বের হয়েছে, তাই তাকে আর পুলিশে টানা হ্যাচড়া না করি। দরজার লক খোলা, মানে তুমি বের হওয়ার পরে কেউ এসেছে, তারপরে যে কজন এসেছে। তারা অন্য ফ্লোরের বাসিন্দা, টিচার। সবাই খালি হাতেই বের হয়েছে।

তুমি কি সব বুঝবে, তাহলে পুলিশে জয়েন করতে! – ঐশি তাচ্ছিল্য করে বলল।
এহসান বলল, হয়তো পুলিশে চাকরি হয় নি, কিন্তু কিছু পড়াশোনা তো করেছি, আমার মনে হয় পুলিশে যাওয়ার চাইতে না যাওয়াই ভালো হবে। তাহলে ঘরে টান পড়বে।
মানে, তুমি কি বলতে চাও, আমার গয়না আমি নিয়েছি?
আমি তেমন কিছু বলি নি ঐশি।
বাদ দাও। তোমার বাবা মা চলে আসবেন, একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হয় তুমি নিজেকে বদলে সংসারে মন দেবে নয়তো একসাথে থাকা সম্ভব নয়।
ঐশি বলল, সরি এহসান, এটা সম্ভব না।

অথৈ এর বিয়ের কথাটা কিছুদূর এগিয়েছে। এই সময়ে ঐশির সংসারে ঝড়, তাই ওদের বাবা কিছুদিন সময় চেয়ে নিলেন। ওনারা ঢাকা আসবেন, এহসানের সাথে মিটমাট করে দিয়ে যাবেন দুই তিন দিন পরে।
পরদিন নাসির ঐশিকে ফোন করল। সুবহানা বলেছে, ঐশির কিছু সমস্যা চলছে।
ঐশি, কি হয়েছে, আমাকে বলো?
ঐশি বলল, না, আমার সমস্যার কথা বলতে ইচ্ছে করে না।
নাসির বলল, কিন্তু আমার তোমাকে অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করে।
তো বলো না!
বলার জন্য একটা স্পেস দরকার, তুমি এত ডিস্টার্বড, বলার মতো সুযোগ হলে নিশ্চয়ই বলব।
আচ্ছা, আমি সম্ভবত সেপারেশনে যাচ্ছি।
নাসির বলল, তোমার ভালো মনে হলে সেটাই করো।
ঐশি বলল, একা একা এত কিছু কিভাবে সামলে নিব জানি না।
নাসির বলল, তুমি একা না ঐশি, আমি তো আছি, তোমার বন্ধুরাও আছে।
হ্যা, কিন্তু তারপরেও আমার ভীষণ ভয় লাগছে!
আচ্ছা, ভয় পেও না। দেখা করবে আজ?
কখন?
সন্ধ্যায়?
আচ্ছা।
শোনো, আজ বাইরে কোথাও নয়, তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব।
কোথায়?
চলোই না, ভালো লাগবে।

সন্ধ্যায় নাসির ঐশিকে নিতে এলো। ধানমন্ডির দিকে একটা এপার্টমেন্টে এসে নাসিরের গাড়ি থামলো।
এটা কার বাসা?- ঐশি জিজ্ঞেস করল।
চলো দেখতে পারবে। নাকি ভয় পাচ্ছ?
ঐশি হেসে বলল, ভয় কেন পাব!
চলো তাহলে।
সিক্সথ ফ্লোরে একটা ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে নাসির চাবি দিলো, ওপেন দ্যা ডোর!
আমি?? – ঐশি অবাক হলো।
হ্যা, ওপেন করো লক!
লক ওপেন করার সাথে সাথে চারপাশে লাল রঙের বেলুন ছড়িয়ে পড়ল, ঐশি বিস্মিত হয়ে গেল। নাসির দরজা আটকে দিলো, ঐশির সামনে একটা হার্ট শেপে লেখা, ঐশি, লাভ ইউ!
ঐশির বিস্ময়ে আপ্লুত হয়ে গেল!
নাসির একটা ডায়মন্ডের রিং বের করে ঐশিকে পরিয়ে দিয়ে বলল, লাভ ইউ ঐশি!
অনেক বাঁধা আছে জানি, আমার সংসার আছে, তবুও তোমাকে ভালোবাসি, এটা জানানো প্রয়োজন মনে করে জানিয়ে দিলাম। রিঙটা নেবে?

ঐশি হাত বাড়িয়ে দিলো। নাসির ওকে রিঙ পরিয়েহাত টেনে কাছে নিলো। ঐশির চিবুক তুলে ওর কপালে নাকে চুমু খেলো। ঐশির প্রশ্রয়ে ওর ঠোঁট শুষে নিলো অবিরত। ঐশি নাসিরের সাথে আলিঙ্গনাবদ্ধ হলো।
বেশ কিছুক্ষন পরেঘোর কাটল ঐশির, এত কিছু কিভাবে হয়ে গেল, বুঝতে পারছে না। নাসির ঐশিকে আলিঙ্গন করে বলল, এই ফ্ল্যাট তোমার। সেপারেশনের পরে তুমি এখানে এসে উঠবে। তোমার সব দায়িত্ব আমার! তুমি তোমার মত থাকবে, লাইফটা এনজয় করবে।
ঐশি নাসিরের কাঁধে মাথা রাখল। সে তো এটাই চেয়েছে সব সময়, এহসান শুধু তাকে সংসারে আটকে রাখতে চেয়েছে। এহসানের প্রতি তার ভালোবাসা তাই আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে গিয়েছে।
কলিংবেল বাজল তখনি, নাসির ঐশিকে ছেড়ে দরজা খুলে দিলে। সুবহানা এসেছে, আরো দুটো ফ্রেন্ড।
সুবহানা হেসে বলল, কি খবর, খুশি তো?
ঐশি বলল, তুই সব জানতি?
কেন জানব না, তুই তো বলতে পারছিস না, আমি তে জানি, তোমরা দুজনেই দুজনকে পছন্দ করো, সো আমি নাসির ভাইকে বললাম, আর তারপরই প্ল্যানিং!

ওকে না সব?
ঐশি সুবহানাকে জড়িয়ে ধরল।
তারপর ওখানেই ডিনার করে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। আজ সুবহানা নেমে ঐশিকে বিদায় দিলো। এহসান দেখল রাত করে ফিরছে ঐশি।
আজ কোথায় ছিলে?
ঐশি বলল, সেটা তোমাকে বলতে হবে?
কেন বলবে না?
এহসান আমি টায়ার্ড, প্লিজ, রেস্ট নিতে দাও।
ঐশি দিনের পর দিন তুমি আমাকে মানসিক টর্চার করছ, বিপর্যস্ত করে ফেলসো আমাকে। অথচ তোমার জন্য আমি কি করিনি?
কি করেছ এহসান, এমবিএ এর খরচটা দিয়েছ। ব্যস!
এতেই কি সব দায়িত্ব শেষ!
কি দায়িত্বের কথা বলছো তুমি?

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ১১

সেটা তুমি বুঝবে না, মিডল ক্লাস মেন্টালিটি!
তা তুমি কোন হাই ক্লাশ থেকে এসেছ? থাকতে তো সেই
গ্রামে, শহরে এসে চোখ খুলেছে!
গ্রাম! গ্রাম মানে জানো তুমি, মন মানসিকতা আধুনিক
হতে শহর গ্রাম লাগে না। সংসার মানে তুমি বোঝো খালি রান্না করা আর বাচ্চা পয়দা করা!
এহসান বুঝে ফেলল, ঐশির সাথে তার আর থাকা হবে না। এখন শুধু পারিবারিক মিটিংয়ের পরে আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত হবে।

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ১৩