ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ১৪
শানজানা আলম
পিন পতন নিস্তব্ধ হয়ে গেল পুরো রুম এহসানের কথা শুনে। অথৈ হতভম্ব, ওদের বাবা মা নিশ্চুপ।
ঐশি চিৎকার করে উঠল, দেখেছ, এই তোমাদের এত প্রিয় জামাই, সাধু পুরুষ, অথৈ আমার কাছে কয়টা দিন এসে থাকল, এতে ওর দিকে কুনজর দেওয়া হয়েছে, চরিত্রহীন ছোটলোক!
এহসান রূঢ় হাসি হেসে বলল, আমি চরিত্রহীন হওয়ার মতন কিছু করি নি, একটা প্রস্তাব রেখেছি। সেটাও অথৈকে গোপনে প্রেমের প্রস্তাব বা কু প্রস্তাব দেই নি, আমার এবং ওর বাড়ির সকলের সামনে বিয়ের কথা বলেছি। তোমার আসল চরিত্র এখনো কারো সামনে আনিনি, আশা করি তুমি বাধ্য করবে না।
অথৈ এর বাবা মা আছেন, অথৈ নিজেও সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আমি শুধু প্রস্তাব রেখেছি।
আমার কি চরিত্র তুমি সবার সামনে আনবে?
এহসান বলল, এই যে গয়না চুরির নাটক সাজালে?
ঐশি বলল, হাহ্, আমার গয়না আমি নিয়েছি! কি হাস্যকর কথাবার্তা! তুমি বরং কোনো পুলিশ কেস করলে না, কেন করলে না, নিজের গায়ে লাগবে তাই?
হ্যা নিয়েছ তুমিই, বুয়া নেয় নি যে, সেই প্রমাণ আমার কাছে আছে, তুমি সরিয়েছ! কারন তুমি জানো, ডিভোর্স তুমি দিলে একটা কানা কড়িও তুমি পাবে না, তাই আগেই গয়না সরিয়ে দিয়েছ!
ঐশি বলল, তা আমি এত খারাপ আমার বোনের দিকে নজর দিচ্ছ কেন!
কারন তুমি একটা কুলাঙ্গার মেয়ে ছেলে! -এহসান আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, এহসানের মা ওর বড় ভাইকে ইশারা দিলেন, তিনি বললেন, এহসান, থাম এখন। এভাবে কাদা ছোড়াছুড়ি করার কোনো মানে হয় না। না থাকতে পারলে ছাড়াছাড়ি হবে। আর অথৈ এর বিষয়টা তুই রাগের মাথায় বলেছিস, ওটা বাদ দে, বিয়ে করার হলে ঝামেলা মিটুক, আমরা ব্যবস্থা করব।
এক পরিবারের দুই বোন বিয়ে করা যায় না। আর সেটা ভালোও দেখায় না।
এহসান বলল, না, রাগের মাথায় বলিনি, সিরিয়াসলি বলেছি, আব্বা আম্মা যথেষ্ট ভালো মানুষ, অথৈও এজ এ হিউম্যান বিঙ ভালো মেয়ে, শুধু ঐশিই খারাপ। আমি কেন সাফার করব!
অথৈ এর বাবা এবারে বললেন, দেখো বাবা, তোমার কথা ঠিক আছে, কিন্তু সমাজ বিষয়টা ভালো চোখে দেখবে না। আর এখন যেহেতু তোমার আর ঐশির একটা সমস্যা হচ্ছে, সেটা সমাধান করাই প্রয়োজন!
অথৈ হতভম্ব হয়ে সবার কথা শুনছিল, সে কল্পনাও করেনি, এই পরিস্থিতিতে এহসান এমন কোনো কথা বলবে।
এহসান থামলো না। সে বলল, আমি ডিভোর্সের ব্যবস্থা করছি কালই। ঐশিকে নিয়ে যান। আর অথৈ, তোমাকে আমি সবার সামনে প্রস্তাব দিয়ে রাখলাম, তুমি জানো আমি ঠিক কেমন মানুষ, তাই তোমার মতামত থাকলে আশা করি তুমি জানাবে।
অথৈ বলল, এহসান ভাই, এটা কখনোই হয় না। মতামতের আর কোনো প্রশ্নই আসে না।
-আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি তোমার কথার গুরুত্ব দিলাম, তুমি যখন চাও না, তখন, আর কথা বাড়াব না।
আমি অবশ্য জানতাম, তুমি কখনোই রাজী হবে না। তবু সবার সামনে বলার সুযোগটা হাতছাড়া করলাম না।
আলোচনা শেষ হলো খুবই এলোমেলো ভাবে। এহসান
তার কিছু জিনিসপত্র নিয়ে ভাইয়ের বাসায় চলে গেল।
পরের সপ্তাহে কাজী অফিসে ডিভোর্সের দিন চূড়ান্ত হবে। তারপরে ঐশি এখান থেকে চলে যাবে আর এহসান বাসায় ফিরে আসবে। এ কদিন এহসান ভাইয়ের বাসায়ই থাকবে।
এহসান বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে ঐশিকে মা বাবা অথৈ মিলে ঘিরে ধরল।
কি এসব ঐশি, এত সুন্দর সংসারটা তুমি কেন নষ্ট করছ?
ঐশি বলল, এহসান খুবই মিডলক্লাশ মেন্টালিটির। আমি সামনে একটা ভালো জবে জয়েন করব।
আমি নিজেই নিজেকে মেইনটেইন করতে পারব। কোনো দরকার নেই তো আমার এরকম মধ্যবিত্ত গৃহবধূ হয়ে জীবন কাটাবার!
অথৈ বলল, আপু, এহসান ভাই যথেষ্ট ভালো মানুষ!
ঐশি তাচ্ছিল্য করে বলল, তো ঝুলে পর না তুই, কে নিষেধ করেছে, তোরা কেউ ওকে চিনিস না, আমি সংসার করি, আমি চিনি!
অথৈ চুপ করে গেল। এহসান ভাইয়ের কথা মনে আসলেও লজ্জা লাগছে, মানুষটা খুবই দুর্দশায় আছে, চেহারায় বিষণ্ণতা চলে এসেছে। তার মানে অথৈ বোনের স্বামীকে নিয়ে অন্য কিছু ভাবতে পারে না। ওনার নিশ্চয়ই ভালো কিছুই হবে।
ঐশি বলল, জোকস করলাম, মাইন্ড করিস না, এইসব ঝামেলা মিটে গেলে ধুমধাম করে তোর বিয়েটা দিয়ে দিব। এহসানের মতন স্টুপিড ছেলে তোকে বিরক্ত করতে আসবে না।
অথৈয়ের কথাটা ভালো লাগল না।
গভীর রাতে ঐশিকে নাসির ফোন করল। নাসির গিয়েছে ব্যাংকক। ঐশি জানিয়েছিল একটু ঝামেলা আছে। তাই গভীর রাতেই ফোন করল।
অথৈ ঘুমের ভাব করে শুয়েছিল, ঐশি সন্তর্পনে চেক করল ঘুমাচ্ছে কিনা।
নাসির বলল, বেবিডল, কি করছ? ঝামেলা মিটেছে?
হুম, তুমি কি করছ?
একটা রিভার ক্রুজে আছি, পার্টি চলছে, দেখবে?
ঐশি দেখল সব বিকিনি পরা মেয়েরা নাচছে।
ইশ্, তুমি কি খারাপ!
নাসির বলল, তোমাকে নিয়ে আসব এখানে, এখানে তোমাকে এভাবে দেখতে ইচ্ছে করছে!
যাও, তুমি এত্ত খারাপ!
নাসির বলল, সত্যিই তুমি অনেক এট্রাকটিভ, সেক্সি, তোমাকে তো এভাবে দেখতে ভালো লাগবে!
নেক্সট টাইম, ওকে! ট্যুর হবে, শপিং, নাইট স্টে, পার্টি, একদম শুধু তোমার আর আমার!
ঐশি লজ্জায় লাল নীল হতে লাগল। অথৈয়ের ভীষণ অস্বস্তি লাগল, বিষয়টা তাহলে সত্যি, আপু একটা রিলেশনে জড়িয়েছে, এজন্যই সংসার ভাঙতে চাইছে, কিন্তু কে এই লোক? কোথায় থাকে? কীভাবে জানা যাবে! চোখ খুলে দেখা যাচ্ছে না। অথৈ কিভাবে চেক করবে?
অথৈ উঠে বসল। ঐশি একটু থতমত খেয়ে বলল,
এই রাখছি, অথৈ উঠে পড়েছে, আমার কথায় ওর ঘুম ভেঙে গেল! বাই ই!
কল কেটে ঐশি জিজ্ঞেস করল, ঘুমাস নি?
ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ১৩
এটা কে আপু?
আমার ফ্রেন্ড!
ফ্রেন্ড?
হুম! ও বিশাল বিজনেসম্যান! ব্যাংকক গিয়েছে, সেটাই বলছিল!
বিশাল বিজনেসম্যান তোকে কিভাবে চিনলো?- অথৈ জানতে চাইল।
ঐশি বলল, অথৈ, তুই ছোট, ছোটর মত থাক, বেশি পাকনামি করিস না!
ঘুমা!
অথৈ এর ঘুম এলো না। এহসান ভাই না জানি কত কিছুই সহ্য করেছে! আপুকে সব সময় ছায়ার মত সঙ্গ দিয়ে আসা অথৈ আজ ঐশিকে সাপোর্ট করতে পারছে না! কেমন অদ্ভুত একটা পরিস্থিতি তৈরি হলো!
