Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২৬

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২৬

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২৬
মারিয়াম ফুল

“আমাকে একটা জায়নামাজ দিবেন?”
নিজের কণ্ঠস্বরটা মেহেরের নিজের কানেই অচেনা ঠেকল। ভাঙা, খসখসে আর ভীষণ দুর্বল। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মহিলা শাখার সেই সাধারণ হাজতি ওয়ার্ডে মেহেরকে নিয়ে আসার পর প্রায় ছয়টি ঘণ্টা কেটে গেছে। জেলের নিয়ম অনুযায়ী প্রথম দিনে কাউকেই বিশেষ সুবিধা বা ডিভিশন সেলে দেওয়া হয় না; আদালতের কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে অন্তত একটা দিন সময় লাগে। ফলে আজ মেহেরকে থাকতে হচ্ছে সাধারণ কয়েদি আর হাজতিদের ভিড়ে, এক অস্বাস্থ্যকর ও গাদাগাদি পরিবেশে।
এতক্ষণ সে একভাবে মেঝের এক কোণে হাঁটুতে মুখ গুঁজে পাথরের মতো বসে ছিল। মাগরিবের আজানের শব্দটা যখন জেলের উঁচু দেয়াল গলিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল, তখন মেহেরের অবশ হয়ে যাওয়া ভেতরের আত্মাটা যেন হঠাৎ এক তীব্র ছটফটানিতে জেগে উঠল। তার একটি সেজদার জায়গা চাই। এই নরককুণ্ডে দাঁড়িয়ে তার মালিকের সামনে মাথা নোয়ানোর একটা আশ্রয় চাই।
কক্ষের বাইরে ডিউটিতে থাকা মাঝবয়সী একজন মহিলা কনস্টেবল কয়েক পা এগিয়ে এলেন। মেহেরের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে একটু গম্ভীর গলায় বললেন, “আইচ্ছা, তুমিই হচ্ছো ওই যে সংসদ সদস্য কী যেন নাম… হামজা চৌধুরীর ছেলের বউ না?”

মেহের চারপাশের দেয়ালে প্রথমবার চোখ তুলে তাকালো। এতগুলো ঘণ্টায় সে একবারও এই বন্দিশালার অন্ধকার অবয়বটার দিকে তাকানোর সাহস করেনি। এখন তাকিয়ে দেখল, চারদিকে গাদাগাদি করে শুয়ে-বসে আছে অন্য নারী আসামিরা। পাশে নামমাত্র একটা বাথরুম—যেখানে ঠিকমতো নড়ারও জায়গা নেই। এক নিমেষে মানুষের কত বড় আকাশ ভেঙে এতটুকু খাঁচায় বন্দি হয়ে যায়, মেহের কোনো মৌখিক উত্তর দিল না, শুধু চোখের পাতা জোড়া সামান্য নামিয়ে অত্যন্ত শ্লথ গতিতে মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানাল। এতক্ষণে তার চোখের জল পুরোপুরি শুকিয়ে চোখের কোণে দাগ পড়ে গেছে।
মহিলা কনস্টেবল মেহেরের দিকে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“ও মাইয়া, তুমি খুন কেন করলা? এমন সোনার সংসার ফালাইয়া নাকি কেউ এইরকম কাম করে?”
মেহের তাঁর দিকে অবর্ণনীয় এক শূন্যতা নিয়ে তাকাল। কোনো প্রতিবাদ করল না, কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনও করল না। শুধু অবশ ঠোঁট দুটো নাড়িয়ে আবার বলল,

“জায়নামাজটা দেন না…”
কনস্টেবল একটু থমকে গিয়ে বললেন, “দাঁড়াও দাঁড়াও, দিতাছি।”
কিছুক্ষণ পর মহিলা কনস্টেবল একটি পুরোনো, কিছুটা মলিন জায়নামাজ এনে হাজতি ওয়ার্ডের শিকের ফাঁক দিয়ে এগিয়ে দিলেন। মেহেরের অবিন্যস্ত অবস্থার দিকে তাকিয়ে ও ভেতরের বাথরুমের দিকে ইশারা করে বললেন, “ও মেয়ে, ওইদিকে গিয়ে ওজুটা সেরে আসো। ওইদিকটায় দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে পারো।”
মেহের প্রতিক্রিয়াহীন চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর নীরবে গিয়ে ওজু করে এলো। চামড়ায় ঠাণ্ডা পানির স্পর্শ লাগতেই তার ভেতরের জমে থাকা পাথরটা যেন গলতে শুরু করল। সে মনে মনে ভাবছিল, সে কাঁদবে না।
নিজের সাথে প্রতিজ্ঞা করছিল যে সে আর এক ফোঁটা চোখের জল ফেলবে না। কিন্তু পরক্ষণেই এক তীব্র দর্শন তার মনে আঘাত করল—

একজন সৃষ্টি যখন তার একমাত্র নিরাপদতম আশ্রয়, তার সর্বশক্তিমান পরম মালিকের সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন কি অশ্রুহীন থাকা আদৌ সম্ভব? যে বান্দা পৃথিবীর সব দরজায় প্রত্যাখ্যাত হয়ে শেষ আশ্রয়দাতার কাছে এসে পনাহ চায়, তার চোখ কি শুষ্ক থাকতে পারে? পারে না।
মানুষ আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ডাকে তখনই, যখন পৃথিবীর সব দরজা তার সামনে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। সুখে মানুষ নিজের শক্তিতে বিশ্বাস করে, আর দুঃখে বুঝতে শেখে সে আসলে কতটা অসহায়। বিপদ মানুষকে বদলায় না, বরং তার ভিতরের আসল সত্যিটা প্রকাশ করে দেয়। কে অহংকারে ডুবে থাকবে, আর কে সমস্ত অহংকার চূর্ণ করে আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে—বিপদ শুধু সেই পথটা দেখিয়ে দেয়।
মেহের জায়নামাজটা বিছিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। নিয়ত বাঁধার সাথে সাথেই তার চারপাশের জেলের দেয়াল, লোহার শিক, কয়েদিদের ভিড়—সব যেন এক নিমিষে বিলীন হয়ে গেল। সে এখন আর কোনো খুনের মামলার আসামি নয়, সে এখন কেবলই এক বিভ্রান্ত, ক্ষতবিক্ষত আর অসহায় সৃষ্টি।

নামাজ শেষে মেহের যখন সেজদায় মাথা লুটিয়ে দিল, তখন তার ভেতরের বাঁধভাঙা কান্নার তোলপাড় আর আটকে রাখা গেল না। মানুষের সেজদা সবচেয়ে দীর্ঘ হয় তখন, যখন তার বুকের ভেতরকার ভাঙাচোরা শব্দগুলো কাউকে শোনানোর মতো পৃথিবীতে আর কেউ থাকে না। মানুষের তৈরি ভাষা যখন ফুরিয়ে যায়, তখন সেজদার কান্না আর হৃদয়ের কম্পন সরাসরি আসমানের দিকে কথা বলতে শুরু করে। কিছু দোয়া হয়তো ঠোঁট দিয়ে বের হয় না, শুধু ভাঙা হৃদয় থেকে সরাসরি আরশে পৌঁছে যায়।
মেহের সেজদায় কপাল ঠেকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছিল। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে লাগল—

“ইয়া আল্লাহ!
কীভাবে দোয়া করলে তুমি শুনবে আল্লাহ?কীভাবে হাত পাতলে আমার এই ভাঙা বুকের গোঙানি তোমার আরশ পর্যন্ত পৌঁছাবে?
ইয়া আল্লাহ… কীভাবে ডাকলে তুমি আমাকে এই অন্ধকার চক্রান্তের মহাসমুদ্র থেকে টেনে বের করবে? আল্লাহ, আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে… মনে হচ্ছে কেউ আমার বুকের ওপর এক বিশাল ভারী পাথর রেখে দিয়েছে…..

আমি তো তোমাকে তখনই পেয়েছিলাম, যখন আমার নিজের রক্তের মানুষ—আমাকে এক মুহূর্তে পর করে দিয়েছিল। আল্লাহ, আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে আমি অনেক সহ্য করেছি ,তুমিই তো বলেছ যে অতীতের চেয়ে ভবিষ্যৎ উত্তম হবে ! তাহলে আমার জীবনটা কেন এতটা অগোছালো, এতটা কলঙ্কিত হয়ে গেল আল্লাহ?
ইয়া আল্লাহ… আমার নিষ্পাপ বাচ্চাটা… ও এই পৃথিবীতে আসার আগেই মায়ের সাথে সাথে এই অন্ধকার নরকের কষ্ট পাচ্ছে। ইয়া আল্লাহ, আমি তো একজন সাধারণ মানুষ, একজন সামান্য মা, হয়েও ওর এই কষ্ট সহ্য করতে পারছি না। তুমি তো তোমার বান্দাকে মায়ের চেয়েও সত্তর গুণ বেশি ভালোবাসো….তাহলে তুমি কীভাবে এই মায়ের খালি হাত ফিরিয়ে দেবে আল্লাহ?
ইয়া আল্লাহ, এই পৃথিবীতে আজ আমার আপন বলতে কেউ নেই, কেউ আমার কথা বিশ্বাস করছে না। আমাকে ফিরিয়ে দিও না আল্লাহ…
আমাকে ফিরিয়ে দিও না আল্লাহ… আমি যে অপরাধ করিনি, তার শাস্তি শুধু আমি একা পাচ্ছি না, আমার গর্ভের সন্তানটাও পাচ্ছে! ইয়া রহমান, ইয়া রাহীম… মালিক, তুমি এই নিষ্পাপ বাচ্চার উসিলায় আমার দোয়া কবুল করো…”

আমার বাচ্চাটা তো কিছুই জানে না আল্লাহ ও তো এখনো এই পৃথিবীর আলো দেখেনি। আমি মা হয়ে তার জন্য কিছুই করতে পারছি না, শুধু অক্ষমের মতো কাঁদতে পারছি। আমি একদম খালি হাতে তোমার দরজায় দাঁড়ালাম আল্লাহ।
আমার বলতে আর কেউ নেই আল্লাহ, তুমিই আমার শেষ সীমানা। আমার এই ক্ষতবিক্ষত বুক, পৃথিবীর দেওয়া তীব্র অপমান আর আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ….সব আজ তোমার দরবারে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হলাম। আমাকে বিমুখ কোরো না।
এই ঘোর অন্ধকার থেকে আমাকে এমনভাবে টেনে তোলো, যেন আলোর স্পর্শে এসে আমি ভুলেই যাই কতটা গভীরে তলিয়ে গিয়েছিলাম। এই মহাশূন্যতার মাঝেও তোমার দিকে হাত তোলা আমি থামাব না… আমার শেষ আশাটুকু যদি কেবল তুমি হও, তবে আমি অপরাজিত।”
মেহেরের কান্নার বেগ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে সে আর সোজা হয়ে বসতে পারছিল না। মানুষের তৈরি ভাষা যখন ফুরিয়ে যায়, তখন সেজদার হাহাকার সরাসরি আরশে পৌঁছে যায়। মেহের আজ সেই পানাহটুকুই খুঁজে নিল।

মহিলা কনস্টেবল বেশ কিছুক্ষণ ধরে শিকের বাইরে দাঁড়িয়ে মেহেরের এই বুকভাঙা আকুতি দেখছিলেন। জেলের এই কঠিন পরিবেশে ডিউটি করতে করতে তাঁর মনটাও একসময় পাথরের মতো শক্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আজ এই মেয়েটার সেজদার আকুলতা দেখে তাঁর ভেতরের সেই পাথুরে মনটা কেমন যেন মোমের মতো গলে গেল।
তিনি এদিক-ওদিক তাকিয়ে চারপাশে চোখ বুলিয়ে গলা খাকারি দিলেন। মেহের সেজদা থেকে উঠে চোখ মুছতে মুছতে জায়নামাজে বসে পড়ল। কনস্টেবল এবার আগের তুলনায় স্নেহশীল গলায় শিকের ওপার থেকে ফিসফিস করে বললেন,

“ও বাচ্চা…ও আম্মা… এইরকম করে কাঁদে না। মুশকিল অবস্থায় পইড়া মানুষে নিজের হাল ছাড়ে না। শক্ত বিপদে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখলে সব পথ খুলে যায়। আল্লাহই সবার খবর রাখেন, উনিই সব জানেন।”
কনস্টেবল একটু সময় নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর আবার বলতে লাগলেন,
“তোর মতন আমারও একটা মাইয়া আছিল রে সোনা… ও এখন আর এই দুনিয়ায় নাই। তোরে প্রথম যখন এই হাজতে ঢুকাইছে, তোরে দেইখাই আমার নিজের মরা মাইয়াটার কথা মনে পইড়া গেছে। এইজন্যই তোরে ‘তুমি’ থিকা একবারে ‘তুই’ কইরা বইলা ফেলছি, কিছু মনে করিস না মা।”
মেহেরের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মলিন কৃতজ্ঞতার হাসি ফুটে উঠল। মানুষের চরম একাকীত্বের সময়ে আল্লাহ এভাবেই কোনো না কোনো অচেনা মানুষকে সান্ত্বনা দিতে পাঠান হয়তো,মেহের মনে মনে ভাবলো ।
কনস্টেবল মেহেরের আরও কাছে এসে বললেন,

“শোন মা… একটা কথা বলি। কালকে কিন্তু ‘আরাফার দিন’। এই দিনে রব্বুল আলামিন কারো দোয়া ফিরাইয়া দেয় না। তুই কাল সারাদিন মন থিকা শুধু দোয়া করিস। দেখবি, তুই তোর বাচ্চাসহ সহিসালামতে এই জেলের তকদির থিকা খালাস পাইয়া বের হইয়া যাবি। এই দুনিয়ায় দোয়ার ওপর আর কোনো বড় ওষুধ নাই মা। যার কেউ নাই, তার আল্লাহ আছে।
পৃথিবীর অমানবিকতা মানুষকে শক্ত হতে শেখায়, আর কষ্ট তাকে বুঝিয়ে দেয় ঠিক কার সামনে মাথা নত করতে হয়।”
মেহের বিড়বিড় করে বলল…
“আরাফার দিন “?

জেলে কেটে গেছে আরও একটা দীর্ঘ, যন্ত্রণাদায়ক রাত। সকাল ১০টা বাজতেই ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে মেহেরকে হাজির করার তোড়জোড় শুরু হলো। আজ রিনি শেখ হত্যাকাণ্ডের মূল মামলার চূড়ান্ত শুনানি নয়, কারণ ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট ও ফরেনসিক এভিডেন্স আসতে এখনো পুরো দুই সপ্তাহ বাকি। আজকের আদালতের প্রধান উদ্দেশ্য—
অন্তঃসত্ত্বা মেহেরের শারীরিক অবস্থা ও সামাজিক মর্যাদা বিবেচনা করে তাকে কারাগারে ‘প্রথম শ্রেণীর বন্দী’ বা ডিভিশন দেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।

অন্যদিকে সায়েদ ইমরান এবং হামজা চৌধুরী দুই পরিবারের দুই অভিভাবকই জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করছেন কীভাবে টাকা কিংবা ক্ষমতার জোরে হলেও এই আজন্মের পারিবারিক কলঙ্ক ঢাকা দেওয়া যায়। হামজা চৌধুরী তাঁর ৩৪ বছরের দীর্ঘ, নিষ্কলঙ্ক রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে কোনোদিন অন্যায় পথ বা ভুল পথে পা বাড়াননি, কোনোদিন ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি। অথচ আজ নিজের একমাত্র পুত্রবধূর এই ভাগ্য বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বড় অসহায়, বড় অপারগ। স্রেফ মেহেরকে একটুখানি শারীরিক স্বস্তি দিতে আজ তিনি নিজের আজীবনের নীতি বিসর্জন দিতেও দ্বিধা করছেন না।
জেলের ভেতরে হাজতি ওয়ার্ডের তালা খোলার শব্দ হলো। গত রাতের সেই চেনা মহিলা কনস্টেবল এগিয়ে এসে মেহেরের কাঁধে হাত রাখলেন, “ও মা, ওঠো। তোমারে আদালতে নিয়া যাওয়ার জন্য গাড়ি চইলা আইছে।”

মেহেরকে যখন জেলের গেট পেরিয়ে পুলিশের প্রিজন ভ্যানে তোলা হলো, তখন বাইরে পুলিশ লাউডস্পিকারে বারবার মাইকিং করে জনতাকে সতর্ক করছে—
“আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখুন! কেউ আদালত প্রাঙ্গণে ভিড় করবেন না। ক্রাইম সিনের আসামিকে প্রিজন ভ্যানের সামনে থেকে সরুন!”
প্রিজন ভ্যানের লোহার ভারী দরজাটা যখন একটা বিকট শব্দে খুলে গেল, মেহের তীব্র এক আতঙ্কে চমকে উঠল। ভ্যানের ভেতরের অন্ধকার আর ভ্যাপসা গন্ধটা থেকে বের হতেই বাইরের তীব্র আলো আর বাতাসের ঝাপটা তার চোখেমুখে লাগল। কিন্তু সেই বাতাসটুকুও সে বুক ভরে নিতে পারল না। আদালত প্রাঙ্গণে পুলিশের কড়া নিরাপত্তা সত্ত্বেও যেটুকু ভিড় জমেছে, তাদের চিৎকার আর হট্টগোলে মেহেরের দম আটকে আসতে চাইল। শত শত কৌতূহলী চোখ তার দিকে বিঁধে আছে। মেহের অবশ হাতে মাথার ওড়নাটা টেনে তার মুখ আড়াল করার চেষ্টা করছিল।

আরেকজন মহিলা কনস্টেবল তার কনুইয়ে শক্ত করে ধরে এজলাসের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় মেহেরের মনে হচ্ছিল তার পায়ের তলার মাটি দুলছে। জেলের ভেতর থেকে শুরু হওয়া পেটের ভেতরের সেই হালকা মোচড়ানিটা এখন আরও স্পষ্ট হয়েছে। অচেতন এক অভ্যাসে সে তার কাঁপতে থাকা বাঁ হাতটা আলতো করে পেটের ওপর রাখল। সে শুধু একজন আসামির তকমা গায়ে লাগায়নি, সে একটা ভাঙা, বিধ্বস্ত গর্ভবতী শরীর নিয়েও এই নির্মমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
আদালতের এজলাসের কাঠের দরজাটা ঠেলে যখন তাকে ভেতরে ঢোকানো হলো, ভেতরের গুমোট আবহাওয়া আর মাথার ওপর ঘুরতে থাকা পুরোনো ফ্যানের একটানা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দটা মেহেরের কানের ভেতর একটা অদ্ভুত অস্বস্তি তৈরি করল। কাঠগড়ার ভেতরে ঢুকতেই তার হাঁটু দুটো ভেঙে আসতে চাইল। সে তড়িঘড়ি করে কাঠগড়ার লোহার রডগুলো দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরল। লোহার সেই তীব্র শীতল স্পর্শ তার হাতের তালু বেয়ে পুরো শরীরে এক ধরনের কাঁপুনি ধরিয়ে দিল। মেহেরের ঠোঁট দুটো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, লালা গিলতেও কষ্ট হচ্ছিল তার।

এজলাসের ভেতর কোভিডের কারণে মানুষের ভিড় কম হলেও কাগজের খসখস শব্দ আর আইনজীবীদের ফিসফিসানি পরিবেশটাকে আরও ভারী করে তুলেছিল। মেহের চোখ তুলে চারপাশটা একবার দেখার চেষ্টা করল। এক পলক তাকিয়েই সে দেখল, বেঞ্চের একপাশে বসে আছেন সায়েদ ইমরান আর সায়েদ কামিনী। নিজের জন্মদাতা বাবা মাকে দেখা মাত্রই মেহেরের বুকের ভেতর একটা তীব্র ঘৃণা আর বিতৃষ্ণা মোচড় দিয়ে উঠল। যে বাবা তাকে কোনোদিন আগলে রাখেনি, আজ এই প্রকাশ্য অপমানের মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি মেহেরের ক্ষতবিক্ষত মনে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দিল। সে তক্ষুনি চোখ সরিয়ে নিল।
তার চোখ গিয়ে পড়ল অন্য পাশের বেঞ্চে বসা হামজা চৌধুরী আর রেহানা চৌধুরীর ওপর। হামজা চৌধুরী অসহায় চোখে মেহেরের তাকিয়ে আছেন, আর রেহানা চৌধুরীর চোখ দিয়ে অবিরাম জল ঝরছে। তাঁদের দিকে তাকাতেই মেহেরের চোখের কোণটা আবার ভিজে উঠল। এই মানুষগুলো তো তাকে নিজের মেয়ের চেয়েও বেশি ভালোবাসায় আগলে রেখেছিল। আজ তাদের এই মাথা নিচু করে বসে থাকার কারণ মেহের নিজে!

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২৫

তাঁদের প্রতি লজ্জা আর গভীর কৃতজ্ঞতায় মেহেরের মাথাটা আপনাআপনি আরও নিচু হয়ে গেল।
কিন্তু এই চেনা মুখগুলোর ভিড়ে মেহেরের চোখ দুটো অবাধ্য হয়ে কাকে যেন খুঁজছিল। সে এজলাসের প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে চারপাশের প্রতিটি কোনায় চোখ বুলাল। না, কোথাও রুদ্র নেই। ক্যাপ্টেন সাহেব আসেননি।
মেহেরের ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২৭