দাহশয্যা পর্ব ৯৮ (২)
Raiha Zubair Ripti
আজ বিকেলের ফ্লাইটে ইব্রাহিমরা অস্ট্রেলিয়া আসছে। খবরটা পাওয়া মাত্রই সকাল থেকে এজওয়ানের অস্থিরতা শুরু হলো। বাড়িঘর ক্লিন করালো। টেবিল ভর্তি খাবার সাজালো। তারপর মাহিকে তাড়াতাড়ি রেডি হতে বলল। মাহি রেডি হয়ে গাড়িতে উঠতে উঠতে বলল,
“আপনি এত তাড়াহুড়ো করছেন কেন? কোথায় যাবেন?”
“এয়ারপোর্টে যেতে হবে।”
মাহি ফোনে সময় দেখলো। এখন বাজে কেবল ১২ টা।
“ফ্লাইট নামবে বিকেল পাঁচটায়।”
“তাতে কী?”
“এখন তো কেবল বেলা ১২ টা বাজে।”
“জ্যাম হলে তখন? তুমি বুঝবে না। এয়ারপোর্টে আগে পৌঁছানো হচ্ছে বুদ্ধিমানের কাজ।”
“আচ্ছা।”
মাহি গাড়িতে উঠে বসল। কিছুক্ষণ পর এজওয়ান বলল,
“ইহরাম আমাকে দেখলে প্রথমে কী বলবে?”
মাহি মোবাইলে চোখ রেখেই বলল, “কী বলবে?”
“চাচ্চু!”
“হুম।”
“তারপর দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরবে।”
“আপনাকে কে বলল?”
“আমি জানি।”
“ ও কি হাঁটতে জানে? ”
” হু পারে। ”
” আপনি শেষবার ওকে কতদিন আগে দেখেছেন?”
এজওয়ান একটু ভেবে বলল, “অনেকদিন আগে। তখন ও বসা শিখেছে।”
“তাহলে সে আপনাকে চিনবেই বা কেন?”
এজওয়ান সঙ্গে সঙ্গে আহত হলো। “কী বললে?”
মাহি মুখ তুলে তাকাল। “সত্যি কথা বললাম।”
“তরিকুলের বেটি, বাচ্চারা মানুষ ভুলে যায় না।”
“ইহরাম এখনও ছোট।”
“ তারপরও ও আমাকে চিনবে।”
“কীভাবে?”
এজওয়ান বুক ফুলিয়ে বলল, “আমার ব্যক্তিত্ব দেখে।”
“বাচ্চা মানুষ। ব্যক্তিত্ব দেখে মানুষ চিনবে?”
“ওর মধ্যে জিনিয়াস একটা ব্যাপার আছে।”
” মানে? ”
” মানে জেনেটিক্যালি কিছু না থাকলেও আধ্যাত্মিকভাবে আমি ওর চাচা। তাই আমার কিছু বৈশিষ্ট তো ও পাবেই তাই না?”
মাহি হতাশ হলো। এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর পর এজওয়ান গাড়ি থেকে নেমেই চারদিকে তাকাতে লাগল। বারবার ঘড়িতে সময় দেখতে লাগলো। শালার সময় যাচ্ছে না কেনো? মাহি ব্যাগ থেকে একটা পানির বোতল বের করে বলল,
“ উফ আপনি শান্ত থাকুন তো। সঠিক সময়েই তারা আসবে।”
অবশেষে দীর্ঘ তিনঘন্টা বসে থাকার পর ইমিগ্রেশন গেটের ওপাশে পরিচিত কয়েকটা মুখ দেখা গেল। ইব্রাহিম ঊর্মি আর তাদের কোলে ছোট্ট ইহরাম। মাহির চোখ মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“ওই যে!”
এজওয়ানও তাকাল। তারপর কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ নিজের চুল ঠিক করতে শুরু করল।
মাহি ভ্রু কুঁচকে বলল, “আপনি চুল ঠিক করছেন কেন?”
“বাচ্চার সামনে প্রথম ইমপ্রেশন। পরিপাটি হয়ে যেতে হয়। ”
“ও আপনাকে চিনবে না।”
“তুমি চুপ করো।”
তারপর দৌড়ে ছুটে গেলো। ভাইয়ের সাথে কোলাকুলি করলো। ইহরাম তখন মায়ের বুকে লেপ্টে আছে। অপরিচিত জায়গা। অপরিচিত পরিবেশ। তারমাঝে আবার অপরিচিত মানুষজনও। তাই ঘাবড়ে চুপসে গেছে। এজওয়ান ইহরামের মাথার ক্যাপ টা খুলে নিলো। ইহরাম তাকালো না। দৃষ্টি নত। এজওয়ান পূনরায় আবার ক্যাপটা পড়িয়ে দিয়ে বলল,
” হাই হ্যান্ডসাম। হাউ আর ইউ? ”
ইহরাম তাকালো। কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। তারপর আবার মায়ের গলায় মুখ গুঁজে দিলো। আহত হলো এজওয়ান। ব্যাটা তুই তোর চাচা কে চিনিস না! লজ্জার বিষয়। মাহি এগিয়ে এলো। ঊর্মির সাথে কথা বললো। তারপর গাড়িতে উঠে চলে গেলো এজওয়ানের বাড়ির দিকে। বাড়িতে আসতে আসতে অবশ্য ইহরাম ঘুমিয়ে গিয়েছে। তাকে ইব্রাহিম দের রুমে শুইয়ে দিয়ে তারা খাবার খেতে বসলো। খাবার খেতে খেতে সোলেমান আর মেহরিনের কথা উঠলো। তাদের বৈবাহিক জীবন হয়তো আর কখনো ঠিক হবার নয়। এজওয়ান চুপ চাপ শুনলো। তারপর খাবার খাওয়ায় মনোযোগ দিলো।
খাবার খেতে খেতে ইহরাম উঠে পরলো। রুম ফাঁকা দেখে কেঁদে ফেলেছে। মাহির খাওয়া শেষ বলে সে উঠে চলে গেলো। রুমে এসে বিছানা থেকে ছোট্ট ইহরাম কে কোলে তুলে নিজের রুমে চলে আসলো। অপরিচিত এক নারীর কোলে উঠে ইহরাম হকচকিয়ে চুপসে গেছে। মাহি তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল,
” হেই কিউটি সোনা। তাকাও আমার দিকে। দেখো চাচি কে। চাচি লাভস ইউ সোনা। ”
ইহরাম তাকালো। বা হাত এগিয়ে দিয়ে মাহির গালে হাত ছোঁয়ালো। তারপর মুখ এগিয়ে নিয়ে গাল খেতে লাগলো। মাহি বুঝলো ক্ষুধা লেগেছে। সেজন্য ইহরাম কে খাটে শুইয়ে রেখে ফিটার আনতে গেলো।
মাহি চলে যাওয়ার পর পর এজওয়ান আসে রুমে। ইহরাম কে একা দেখে এগিয়ে যায়। ইহরামের দু পাশে হাত রেখে ঝুঁকে ইহরামের দিকে তাকায়। ইহরাম হাত পা নাড়িয়ে খেলা করছে। এক পা গিয়ে ঠেকে গেছে এজওয়ানের মুখের উপর। এজওয়ান পা সরিয়ে দিয়ে বলল,
” তুলে একটা আছাড় দিব পোঁটলা। সাহস তো কম না আমার মুখে পা রাখিস। ”
ইহরাম কি বুঝলো জানি না। তবে ছেলেটা মুখ ঘুরিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো। এজওয়ান ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
” নাটকবাজ। নাটক তো ভালোই শিখছো। তোরে কি আমি মারছি? তাহলে তুই ফুঁপিয়ে উঠলি কেন? ”
” কি হয়েছে? ” ফিটার হাতে নিয়ে রুমে প্রবেশ করে এজওয়ান কে দেখে কথাটা বললো মাহি। এজওয়ান উঠে এসে বলল,
” কি হবে? ওরে বললাম নাটক কম করো প্রিয়। তুমি যে অভিনয় করো সেটা তোমার ব্যাবহারেই বোঝা যায় প্রিয়। সেজন্য মুখ ফুলিয়ে আছে। ”
মাহি এগিয়ে এলো। ইহরাম কে কোলে নিয়ে ফিটার খাওয়াতে লাগলো। এজওয়ান ফটাফট পকেট থেকে ফোনটা বের করে একটা ছবি তুলে রাখলো। তারপর মাহির গা ঘেঁষে বলল,
” একদম পরিপূর্ণ নারী নারী লাগছে তোমায় তরিকুলের বেটি। ”
মাহি বুঝলো না। সেজন্য বলল, ” মানে? ”
” জাস্ট ইমাজিন করো। তুমি আমি আর আমাদের অংশ। আমাদের দিন গুলো এভাবে সুখে শান্তিতে কাটছে। তুমি তাকে সামলাচ্ছ। আর আমি অফিস থেকে তোমাদের সামলাচ্ছি। কি সুন্দর তাই না? জীবনের আসল মিনিং তো এটাই,আমি তুমি থেকে আমরা। ”
ইহরামের খাওয়া শেষ। এজওয়ান পাশ থেকে ইহরামের জন্য আনা খেলার জিনিস গুলো এগিয়ে দিলো। বাচ্চাটা কোল থেকে নেমে মাহির হাঁটুর কাছে দাঁড়িয়ে খেলা করতে লাগলো।
ঊর্মি একবার আসলো। ইহরাম কে খেলতে দেখে আর নিলো না। রুমে চলে গেল। মাহি ল্যাপটপ টা নিয়ে কাজ করতে লাগলো বিছানায় বসে। এজওয়ান ইহরামের সামনে সোফায় বসা। হুট করে ঠাস করে একটা শব্দ হলো। মাহি সাথে সাথে তাকালো। এজওয়ান মাহির তাকানো দেখে হকচকিয়ে গেলো। মাহি কি ভাবছে পাদটা এজওয়ান দিছে? সেজন্য সে তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো,
” আমার দিকে তাকাচ্ছ কেনো? আমি দেই নি পাদ। পোটলায় দিছে। বিশ্বাস না হলে ওর পাছার কাছে মুখ নিয়ে দেখো। গন্ধ পাবে। ”
মাহি চোখ সরিয়ে নিলো। মুখ ফিরিয়ে ঠোঁট চেপে হেঁসে কাজে মনোযোগ দিলো। এজওয়ান দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সোফায় গা এলিয়ে দিতেই ইহরাম ইহরামকে কষাদের মতো মুখ কুঁচকে, চোখ-মুখ শক্ত করে, ঠোঁট গোল করে উঁ উঁ শব্দ করতে দেখে আঁতকে তাড়াতাড়ি শোয়া থেকে উঠে বসে বলল,
” কাম সারছে। ”
মাহি সাথে সাথে তাকালো। এজওয়ান ইহরামের বগলের নিচে ধরে উঁচু করে দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। মাহি কি হলো এটা দেখার জন্য রুম থেকে বের হয়ে দেখে এজওয়ান ইহরাম কে ঊর্মির হাতে দিয়ে বলতেছে,
” ছি কি গন্ধ। আপনার ছেলে হাগু করে দিছে। তাড়াতাড়ি পরিষ্কার করান। বেয়াদ হাগু পেয়েছে বলবি না? না বলেই সরাসরি ঢেলে দিলি। ”
ঊর্মি ছেলেকে পরিষ্কার করাতে নিয়ে গেলো। এজওয়ান ওয়াক ওয়াক করতে করতে ওয়াশরুমে গিয়ে হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধুয়ে আসলো। মনে হলো যেন সে গু ধরে এসেছে। সোফায় গা এলিয়ে দিতেই মাহি বলল,
” সামান্য গন্ধ তেই আপনার এই অবস্থা যখন নিজের ছেলেপেলে হবক তখন তো তারা আপনার কোলে হাগু মুতু বমি সব করবে। ”
এজওয়ান চোখ বন্ধ করেই বলল, ” করলে করবে। কারন ওরা আমার অংশ। হাগু মুতু বমি ব্যতিত আরে কিছু থাকলে করবে। আমি পাল্টে আসবো। তুমি ধুয়ে দিবে। ”
” কি ঠেকা আমার। আপনি ধুবেন। আমি কিচ্ছু করতে পারবো না। ”
” না পারলা। লোক রাখবো। শোনো আমি এখন একটু বের হবো। আসতে দেরি হবে। খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। ”
” কোথায় যাবেন? ”
” ল্যাবে যাব একটু। কাজ আছে। ”
এজওয়ান চলে গেলো। মাহি তার কাজে মনোযোগ দিলো। এজওয়ান বাড়ি থেকে বের হয়ে সত্যি সত্যি ল্যাবে এসেছে।
ল্যাব ঘরটা অন্ধকার। শুধু মাথার ওপর ঝুলে থাকা একটি ম্লান বাতি মাঝেমধ্যে দুলে উঠছে। তার আলোয় মেঝেতে পড়ে থাকা মানুষের ছায়াটাও বারবার লম্বা হয়ে দেয়ালে উঠছে, আবার গুটিয়ে যাচ্ছে। লোকটা চেয়ারে বসে আছে। মাথা নিচু। দুই হাত বাঁধা। সামনে দাঁড়িয়ে এজওয়ান। মসৃণ গলায় বলল,
“শেষবার জিজ্ঞেস করছি। বল মনস্টার কোথায়?”
নীরবতা। লোকটা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। বলল,
“আমাকে মেরে ফেললেও আমি বলব না।”
এজওয়ানের চোখে কোনো পরিবর্তন হলো না। সামান্য ঝুঁকে তার চোখের সমান্তরালে মুখ আনল।
” তোর বাপ লাগে মনস্টার? তুই আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকা করতে পারিস অথচ তার খবর খবর দিতে পারবি না। বল তুই মনস্টারের জন্য কতদূর পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত? নিজের জীবনটা দিতে রাজি আছিস? বল? যদি তাই হয় তাহলে চল তোর জীবনটাই নেই। যেহেতু তুই বলবিই না। তাহলে বেঁচে থেকে তোর কি লাভ? মরে যা। তুই মরলে শান্তি পাবো। ”
কথাটা বলেই এজওয়ান হাতে গ্লাভস পরে পকেট থেকে ছুরি টা বের করে ড্যানিয়েলের কিছু বুঝার আগেই খপ করে তার পুরুষাঙ্গটা চেপে ধরে এক টানে কেটে নিয়ে আসলো। ড্যানিয়েল ব্যথায় চিৎকার করে উঠলো। টপটপ করে র’ক্তে ভেসে যাচ্ছে নিচটা। সে বললো বলছি বলছি,
এজওয়ান স্বাভাবিক ভাবে বললো, ” বল। ”
” ওর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারি নি। একটা পুরোনো সার্ভার আছে… ওখান থেকে নির্দেশ আসে।”
“কোথায়?”
“লোকেশনটা আমি পুরো জানি না।”
এজওয়ানের চোখ ঠান্ডা হয়ে গেল।
“যেটুকু জানিস বল।”
লোকটা চোখ বন্ধ করল। “সিডনির বাইরে… একটা পুরোনো শিল্পাঞ্চল।”
“নাম?”
“Blackridge.”
এজওয়ানের মাথায় সঙ্গে সঙ্গে জায়গাটার মানচিত্র ভেসে উঠল।
“আর?”
লোকটা থেমে গেল। “ওখানে একটা পুরোনো সাবস্টেশন আছে। বাইরে থেকে বন্ধ। কিন্তু নিচে একটা জায়গা আছে।”
“মনস্টার সেখানে?”
” তুমি যদি ওখানে যাও। আর গিয়ে না পাও তাহলে ধরে নিও, ও তোমার আসার খবর আগেই পেয়ে গেছে।”
কয়েক ঘণ্টা পর। টেবিলের ওপর একটি কালো পার্সেল সযত্নে প্যাক করলো এজওয়ান। বাইরে প্রেরকের জায়গায় এজওয়ানের নাম আর প্রাপকের জায়গায় লেখা,FOR THE MONSTER.
শেষে একটা চিরকুট যোগ করলো। তাতে লেখা,
” এবার তোর টা কাটার পালা। বালছাল পরিষ্কার করে রেডি থাকিস শালাহ্। ”
বাতাসি এসেছে। তেহরান দের বাড়িতে থেকে এসএসসি পরীক্ষাটা দিয়েছে তারপর একটা চাকরি খুঁজেছে। মেহরিন নেই,মোতালেব ভুঁইয়া নেই। এবার তো নিজের জন্য নিজেকেই কিছু করতে হবে। এই পৃথিবীতে কেউই ক্ষনস্থায়ী না। কেউ আজীবন তোমার দায়িত্ব নিবে না। তোমার দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে। একটা হোটেলে কাজ পেয়েছে বাতাসি। তিন বেলা এসে থালাবাসন মাজতে হবে ও তরিতরকারি কেটে ধুয়ে দিতে হবে। এর বিনিময়ে তিনবেলা খাবার দিবে। আর মাসে দুই হাজার টাকা দিবে। বাতাসি তাতেই রাজি হলো। একটা মেসে উঠলো। সেখানে পাঁচজন মিলে এক রুমে থাকায় জনপ্রতি এক হাজার করে ভাগে পরে। বাতাসি সেখানে থাকে। খাওয়ার চিন্তা নেই,থাকার চিন্তাও নেই এখন। তবে পড়াশোনা করতে পারছে। সব কিছু ম্যানেজ হলেও পড়াশোনা টা আর কন্টিনিউ করা যায় না। সেজন্য বাতাসি ভেবেছে,এসএসসি তো দিলোই। কোনো এক সরকারি কলেজে ভর্তি হয়ে থাকবে। শুধু পরীক্ষার সময় পরীক্ষা দিবে। কিন্তু ঢাকায় কোথায় সরকারি কলেজ? সব তো বড়লোকদের প্রাইভেট কলেজ। অনেক টাকার ব্যাপার। সেখানে বাতাসি ইনকামই তো করে মাত্র ২ হাজার টাকা। সেখানে রুম ভাড়া আছে এক হাজার। বাতাসি হোটেলে কাজ করার পাশাপাশি এবার বাসাবাড়িতে কাজ করার চিন্তাভাবনা করলো। কয়েকদিন খোঁজার পর পেয়েও গেলো একটা বাসায়। হোটেলে যাওয়ার আগে এখানে এসে রান্না বান্না করবে এবং ঘর দোয়ার ঝাড় দেওয়া ক্লিন করা এসব করবে। সাথে রাতেও রান্না করে দিবে। বিনিময়ে ৩ হাজার টাকা পাবে। বাতাসি তাতেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল। সেই সাথে উপলব্ধি করলো এই ঢাকা শহর সবার জন্য না। আস্তে আস্তে বাতাসি পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যেতে লাগলো।
ইয়াসিনের সাথে মাঝে একবার দেখা হয়েছিল। তখন সে তানভীর দের বাসায় ছিলো। ডেকে জিজ্ঞেস করেছিল,
” কি অবস্থা? দিনকাল কেমন যাচ্ছে? ”
বাতাসি কেবল বলেছিল, ” ভাগ্য যেমনটা রেখেছে। তেমনটাই আছি। আপনি নিশ্চয়ই ভালো আছেন? ”
কথাটা শুনে ইয়াসিন কেবল হেঁসেছিল। তারপর হাসি মুখেই বলেছিল, ” বাদ দাও আমার কথা। পড়াশোনার কি অবস্থা? এক্সাম ভালো হচ্ছে? ”
তখন বাতাসির এসএসসি এক্সাম চলছিল। ভালোই হয়েছে এক্সাম। সেজন্য বলল, ” হচ্ছে ভালো। ”
” হু ভালো করে পড়াশোনা করে। অনেক বড় হও। অনেক দূর এগিয়ে যাও। দোয়া করি। ”
বাতাসির চোখ দুটো তখন ছলছল করলো জলে। একটুও কি অনুশোচনা নেই লোকটার মাঝে? বাতাসির রাগ হয় তাকে দেখলে। কিন্তু বাতাসি যে সব সময় রাগ প্রকাশ করতে পারে না। ছোট থেকে অবহেলায় অভ্যস্ত যে। তার ফাহাদ ভাইয়ের খুনের পেছনে ইয়াসিনের প্রত্যক্ষ ভাবে হাত না থাকলেও যখন জেনেছে এটা তার ভাইজানের পরিবার করেছে তখন তো কোনো কিছু করলো না। না তাদের কাছে বাতাসির হয়ে বাতাসির জীবন,বাতাসির একমাত্র ভাই, একমাত্র ভরসার জায়গা কেঁড়ে নেওয়ার জন্য জবাব চাইলো,না চাইলো বিচার। বিচার কারা পেলো? পেলো তারা যাদের কেবল ব্যবহার করা হয়েছিল। হুকুম দাতারা তো দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঠিক এই খানেই বাতাসির ইয়াসিনের প্রতি তীব্র এক রাগ ঘৃণা। ফাহাদের জায়গায় তার মা হলে কি ইয়াসিন এখনো তাদের হয়ে কাজ করতো? করতো না। করে কারন ওটা বাতাসির ভাই ছিলো।
বাতাসি তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল, ” আসি তবে। ভালো থাকবেন। ”
ইয়াসিন বললো না কিছু। ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। বাতাসি চলে যাওয়ার জন্য পিছু ঘুরলে ইয়াসিন ডেকে বলল,
” বাতাসি।”
বাতাসি দাঁড়িয়ে যায়। ইয়াসিন হাসফাস করতে করতে জানতে চায়, ” তোমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি ও বাড়িতে? খাওয়া দাওয়াত, ঘুমানোর? সমস্যা হলে আমাকে বলো। না হয় বাড়িতে চলো? আমি তো থাকি না বাসায়। ফাঁকাই থাকে সারাদিন। ”
বাতসি পিছু ফিরে। একবার তার মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে বলে, ” কোন অধিকারে আপনার বাসায় যাব? কে হন আপনি আমার? কি সম্পর্ক আমাদের? মানেন আমাকে স্ত্রী হিসেবে? মানেন না। ছুরির আঘাত সয়ে যায় কিন্তু কথার আঘাত কখনো যায় না। আপনার তুচ্ছতাচ্ছিল্য পাওয়ার থেকে অন্যের বাড়িতে আশ্রিতার মতো থাকে একটু ভালো। ”
ইয়াসিন তাকালো মুখ তুলে। ” করবো না তুচ্ছতাচ্ছিল্য। ”
” কেনো করবেন না? মনুষ্যত্ব জেগেছে নাকি? ”
” জানি না। বোধহয় এই শব্দ টা আমার জীবনে নেই। ”
” তাহলে আলহামদুলিল্লাহ, আসছি। ভালো থাকুন। ডিভোর্স পেপার টা কবে পাঠাবেন? ”
ডিভোর্স শব্দটা শুনে ইয়াসিন প্রথমে থমকে গেলেও পরক্ষণে বলল, ” তুমি কবে চাও? উকিলের সাথে আর কথা বলা হয় নি। ”
” যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়া উচিৎ। আপনার জীবনের কতগুলো বছর আমার জন্য নষ্ট হওয়ায় দুঃখিত। এবার নিজের মতো করে বাঁচুন। সবারই বেঁচে থাকার পূর্ন স্বাধীনতা আছে। আপনি আমিও তার ব্যতিক্রম নই। আসছি। ”
তারপর আর বাতাসি সেখানে থাকে নি। তারপর তার এসএসসি রেজাল্ট দিলো। সে ৪.৯৭ পেলো। সেদিন রেজাল্টের কাগজ টা বুকে জড়িয়ে ধরে কি কান্না টাই না করলো মেসে। ইয়াসিন সেদিন এসেছিল। শুভেচ্ছার সাথে সাথে জানালো। সে উকিলের সাথে কথা বলেছে। আগামী মাসের ভেতরই হয়তো তাদের ডিভোর্স টা হয়ে যাবে। সব শুনে বাতাসি মুখে আলহামদুলিল্লাহ বললেও তার বুকে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল তা বোধহয় ইয়াসিন বুঝে নি সেদিন। বুঝলে হয়তো ঘটনা অন্য কিছু ঘটতো।
বাতাসি দীর্ঘ এক শ্বাস ফেললো। জীবনের আঘাত আর অভাব দুটোই পেয়েছে। পায়নি শুধু সে যা চেয়েছে তা। হাতের ভেতর স্কুলের মার্কসিট সহ আরো যাবতীয় কাগজ। সেগুলো সে পুড়িয়ে ফেললো মুহুর্তের মাঝে। কাগজ গুলো জ্বলতে শুরু করলো। সেগুলোর দিকে তাকিয়ে বাতাসি ধরা গলায় বলল,
” সৌর্ন্দযের ক্ষতিপূরণ হিসাবে আল্লাহ আমাকে ভালো একটা মেধা দিয়েছিল। কিন্তু আমি তা ধরে রাখতে পারলাম না। It’s my biggest loss। ক্ষমা করে দিও ভাই। বেঁচে থাকার লড়াই আর পড়াশোনা করে পরিচিতি গড়ার লড়াই দুটোই যে এই পৃথিবীতে এক এতিমের জন্য কষ্টসাধ্য। একটা কে আকড়ে ধরতে হলে অপরকে ছেড়ে দিতেই হয়। আমি না হয় জীবন কে আঁকড়ে ধরলাম। ”
মেসের এক মেয়ে পোড়া গন্ধ পেয়ে এগিয়ে আসলো। জিজ্ঞেস করলো, ” কি পোড়াচ্ছ? ”
বাতাসি নৈশব্দে বলল, ” শিক্ষা জীবনের সমাপ্তি ঘটালাম। ”
দীর্ঘ এক শ্বাস ফেললো। ” তোমার দুঃখে খুব দুঃখ লাগে আমার বাতাসি। অল্প বয়সে অনেক কিছু দেখে ফেলছো। ”
” একদিন এসে দেখবেন আমার কোনো দুঃখ নাই, সাথে আমি ও নাই। ”
” এভাবে বলে না মেয়ে। সব ঠিক হয়ে যাবে একদিন। ঐ ছেলের জন্য কষ্ট পেও না। ”
” নাহ্ তার জন্য কষ্ট হয় না। তার দোষ দিয়ে কি লাভ। দোষ তো আমার কপালের। ”
” ভালোবাসো না তাকে? ”
” নাহ্ বাসি না ভালো। কালো মেয়েদের অধিকার নেই কাউকে ভালোবাসার। ”
কথাটা মুখে খুব ঠান্ডা স্বরে বললেও। সেই স্বরে একধরনের বিষন্নতা,একধরনে হতাশা কষ্ট ছিলো লুকিয়ে। বাতাসি কি সত্যি ভালোবাসে না ইয়াসিন কে? তাহলে তার এত কষ্ট হচ্ছে কেনো? অন্যের জন্য নিজের রুহুকে কষ্ট দেওয়ার নামই হয়তো ভালোবাসা।
নিজ বাড়ির বারান্দায় বসে আছে ইয়াসিন। আজকাল কেমন যেন একটা বিষন্ন হয় থাকে তার মন টা। কেনে হয় তার উৎস টা সে খুঁজে বের করতে পারে না। তার না আজকাল কেমন যেন মায়া হয় বাতাসির জন্য। অভাগী বলে? কি জানি উত্তর মেলে না। মস্তিষ্ক ফেটে যায়। উকিলের সাথে সেদিন কথা হলো। খুব শীগ্রই বুঝি তাদের ডিভোর্স হয়ে যাবে? বাতাসি সত্যি তবে বিচ্ছেদ চায়? হু চায়। না চাইলে তো বলতো ডিভোর্স দিয়েন না।
আচ্ছা যদি বাতাসি সত্যি সত্যি বলতো তাহলে কি ইয়াসিন দিত না ডিভোর্স তাকে? কি জানি। সে তো ভালোবাসে না বাতাসি কে। নিজের সাথে তথাকথিত এই সম্পর্কে বেঁধে রেখে কি করতো?
ভালো লাগছে না। সেজন্য একটা সিগারেট ধরালো। তারপর চোখ বুজে ফেললো। চোখ বুজতেই বাতাসির মলিন কালো চেহারা ভেসে উঠলো। পাশ থেকে গিটার টা টেনে আনলো সে। মেয়েটা মস্তিষ্ক অব্দি চলে গেছে! তাকে মস্তিষ্ক থেকে বের করে দেওয়া জন্য গিটারে টুংটাং শব্দ করলো। তারপর হুট করেই মনের অজান্তেই গেয়ে উঠলো…
দাহশয্যা পর্ব ৯৮
~ চুল কালো আঁখি কালো কাজল কালো আরো
কাজলের চেয়ে কালোকি বলতে কি কেউ পারো
আমি যারে বাসি ভালো,
কাজলের চেয়েও কালো
হয়না যে তার তুলনা।
এতো যে নিঠুর বন্ধু জানা ছিলো না গো
এতো যে নিঠুর বন্ধু জানা ছিলো না।
দিলোনা দিলোনা, নিলো মন দিলোনা।
এতো যে নিঠুর বন্ধু জানা ছিলো না গো।
