Home ফিরে গেছে কত আলো ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ২৬

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ২৬

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ২৬
শানজানা আলম

এহসান শাওয়ার নিয়ে কতক্ষণ ফোন স্ক্রল করল। দুটো বই নিয়ে এসেছিল সাথে। আজকাল আর বইয়ের পাতায় চোখ আটকে রাখা যায় না। কনসেনট্রেশান বার বার ফোনের দিকে চলে যায়। লাঞ্চ আওয়ারে রিসিপশন থেকে ফোনে কল এলো, লাঞ্চ রেডি।
এহসান রুম লক করে বের হলো লাঞ্চের জন্য। রেস্টুরেন্টে দুটো টেবিল সাজানো হয়েছে, এহসানের জন্য একপাশে একটা ছোট টেবিল দেওয়া হয়েছে। তবে মেনু সব সেম। ভাত, ডাল, আলু ভর্তা, শুটকি ভর্তা টমেটো ভর্তা, মুরগির মাংস, লইট্টা ফ্রাই।

এহসানকে দেখে রেস্টুরেন্টের ছেলেটা নিয়ে বসালো।
অন্য টেবিলে রুবাইদের ফ্যামিলি বসে পড়েছে।
এহসানকে একা বসতে দেখে রুবাইয়ের খালা আলভিনা বেগম বললেন,
ওনি একা নাকি, আমাদের টেবিলে আসেন, একা একা বসে খেতে ভাল্লাগবে না ।
এহসান হেসে বলল, না আমি ঠিক আছি।
রুবাই বলল, আসুন না এখানে। রায়হান, সরে বস তো।
এহসান না চাইলেও আলভিনা বেগম আন্তরিকতা দেখিয়ে ডাকলেন। মেনু তো সব একই, বসেন আমাদের সাথে।
এহসানের বিব্রত লাগল। রুবাই বুঝতে পেরে এহসানকে সহজ করার জন্য টুকটাক কথা বলতে শুরু করল।
আপনি বীচে গিয়েছিলেন, বীচটা সুন্দর তাই না?
এহসান বলল, হুম।

আলভিনা বেগম বললেন, বাসায় কে কে আছে আপনার, একা আসছেন?
আন্টি তুমি করেই বলেন, আমি নানা চাপে একটু রিলাক্স করতে এসেছি আর কি।
ওহ আচ্ছা। কোথায় চাকরি করো?
এহসান বলল, একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে।
আচ্ছা আচ্ছা।
রুবাই বলল, বের হবেন এখন আর?
এহসান বলল, না, এখন আর না। একটু ঘুমাব।
আচ্ছা।
বাইরে তো রোদ অনেক। আপনারা বিকেলে বের হতে পারেন।
হ্যা, আমরা রোদ কমলে বীচে যাব। যাবেন আবার?
দেখি, ঘুম ভাঙলে যাব।
খাওয়া শেষ করে নিজের বিলে সাইন করে এহসান রুমে ফিরল। বিছানায় গা এলিয়ে দিতে রাজ্যের ঘুম নেমে এলো দু চোখে।

সন্ধ্যায় ঘুম ভাঙলো এহসানের। বিকেল শেষ হয়েছে। পর্দা সরাতে রুমে বসেই সূর্যাস্ত দেখতে পেলো।
দুপুরে খেয়ে একটানা পাঁচ ঘন্টা ঘুমিয়েছে, এত ক্লান্তি কোথায় জমে ছিল।
ফোন হাতে নিয়ে দেখল, অথৈ টেক্সট করে নি একবারো। নো ফোন কলস!
আচ্ছা, থাক তাহলে, একটু গ্যাপ হচ্ছে যখন হোক। অথৈ কে ভালো লাগলেও অনেক বাঁধা অনেক দ্বিধা।ভাবতে ভাবতে ওয়াশরুমে ঢুকল এহসান।
ফ্রেশ হয়ে তৈরি হয়ে নিলো। নিচে লাইভ মিউজিকের আয়োজন চলছে। ওখানে এক কাপ কফি নিয়ে বসে বসে গান শুনবে।
রিসোর্ট নিরিবিলি মনে হচ্ছে।

নিচে নামতেই ম্যানেজার ছেলেটা বলল, স্যার কি খাবেন বলেন।
কি পাওয়া যাবে এখন?- এহসান জানতে চাইল।
নুডুলস আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই করিয়েছে ম্যাডামরা। আপনাকে ওটাই দিব?
আচ্ছা দিন।
এহসান বসে অথৈকে ফোন করেই ফেলল।
অথৈ স্বাভাবিক ভাবে জানতে চাইল, ঘুম হয়েছে? ঘুমাবেন এজন্য নক করিনি।
হুম, টানা পাঁচ ঘন্টা ঘুমালাম, এত ডিপ স্লিপ!
বিকেলে বের হতে পারেন নি?
নাহ, মাত্রই নেমেছি।
খাবারটা দিয়ে গেল এহসানের সামনে। এহসান বলল, লাইভ মিউজিক শুনতে চাও? তাহলে অডিও অন রেখে দাও।
অথৈ বলল, দরকার নেই, আপনি এনজয় করুন, সারাক্ষণ ফোনে লেগে থাকলে সময়টা তো উপভোগ করতে পারবেন না৷

এহসান বলল, আচ্ছা রাখছি তাহলে।
ফোন রেখে এহসান স্ন্যাকস নিলো।
গেট থেকে রুবাইদের সবাই ঢুকছে, ভেজা। বীচে নেমেছিল। ওরা ফ্রেশ হয়ে আসবে, তারপরে মিউজিক শুরু হবে। এহসান কিছুক্ষণ একা হাটাহাটি করল। রিসোর্ট থেকে একা বাইরে থাকতে নিষেধ করেছে, মাঝে মাঝেই অপহরন করে নিয়ে যায় দুবৃত্তরা।
রিসোর্টের ভেতরে সেফ। রাস্তার উপর কেউ সেফটি দিতে আসে না। পেছে পাহাড় দেখা যাচ্ছে, এই পাহাড়ি জঙ্গলে কত কত রহস্য লুকিয়ে আছে না জানি।
হ্যালো, নাস্তা করেছেন?
রুবাই এসেছে, এহসান পেছন ফিরল।
হ্যা।
আপনাকে খুজেছিলাম তবে ম্যানেজার বলল ঘুমাচ্ছেন।
এহসান হাসল।

লাইভ মিউজিক শুরহ হয়েছে। একটার পর একটা পুরনো দিনের গান, হিন্দী গান সাউন্ডবক্স চালিয়ে গাওয়ার চেষ্টা করছে ভদ্রলোক।
রুবাই বলল, ভালো লাগছে, বলুন?
হ্যা।
আপনি কি সব সময় হু হা করেন?
না মানে কি বলব, তাই সংক্ষেপে সারি।
ওহ আচ্ছা৷ কোনো কথা নেই।
এহসান হাসল আবারো।
রুবাই বলল, আপনাকে দেখে বিষণ্ণ মনে হচ্ছে, কিছু চাপা কষ্ট, আবার একা এসেছেন, বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করছি।
চেহারায় বিষণ্ণ ভাব চলে এসেছে নাকি?
নাহ তেমন না, কিন্তু আপনাকে দেখে যেমন চটপটে মনে হয় আচরন তেমন নয়।
রুবাই আপনি খুব ইন্টেলিজেন্ট।
তবে এহসান নিজের বিষয়ে কিছু বলল না।
থ্যাংকস।

রুবাই বেশিক্ষণ থাকতে পারল না, সবাই চলে এসেছে, গান শুরু হলো।
কয়েকটা গান হওয়ার পরে সিংগার এহসানকে কাছে ডাকল, ভাইয়া চলবে নাকি?
এহসান এগিয়ে গিয়ে সামনে বসল।
এহসান ভাবল, শেষ কবে বন্ধুদের সাথে গলা ছেড়ে বেসুরো গলায় গান ধরেছিল মনে নেই। এখানে তেমন কেউ নেই, ইম্প্রেস করার বিষয় নেই, নিজেকে প্রমাণ করারও কিছু নেই। রুবাই এগিয়ে এসে সামনে বসল।
এহসান ফোন থেকে লিরিকস বের করে সামনে গিয়ে বসল। গলায় সুর নেই। তবে সিংগার বলল, একসাথে ধরি চলেন, এহসানের সাথে একসাথে গান শুরু করল।-

তুমি ডাকিও ডাকিও
আমারে পড়লে মনে
নীড়ালে ডাকিও
তুমি কাঁদিও কাঁদিও
চোখে যদি আসে গো জল
নীরবে কাঁদিও
তুমি গাহিও গাহিও
আমার লাগি মন কাদিলে
বিরহের গান গাইয়ো
তাতে যদি মন না ভরে
আমারে ডাকিও
কোন এক জোছনা রাতে
ব্যাথা নিয়ে তোমার বুকে
আমারে ডাইকা তোমার
মনের কথা কইয়ো
ওরে ও সাধের পাখি
শোন তোমারে ডাকি
ওরে ও সাধের পাখি
শোন তোমারেই ডাকি
আমারে দূরে রাইখোনা ও পাখিরে…..

গানের শেষে এহসান এসে বসল। রুবাই ভিডিও করেছে, এহসানকে দেখালো।
আপনার গানের গলা তো সুন্দর। গান করতেন আগে?
নাহ, এমনি বন্ধুরা একসাথে থাকলে আর কি!
তাও দরাজ গলা। ভালো লাগছিল।
এহসান বলল, থ্যাংকস।
আপনার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরটা দিন, আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি। -রুবাই নম্বরটা চাইলো।
এহসান নম্বর দিলো।
তারপরে, একা একা এসেছেন, কিন্তু কেন? ফ্যামিলির সবাই কোথায়?
এহসান বলল, ফ্যামিলি বলতে মা ভাইয়ের কাছে, বন্ধু বান্ধব সবাই বিজি। তাই একা এসেছি।
আচ্ছা। আপনি একা দেখে বার বার কথা বলতে আসছি, বিরক্ত হচ্ছেন না তো?
এহসান বলল, এখনো বিরক্ত করেন নি। বিরক্ত হলে নিশ্চয়ই বলব।
রুবাইকে আবারো ডাকছে, রুবাই বলল, ডিনারের পরে গল্প করব। আসলে আমি ওদের নিয়ে এসেছি, তাই দায়িত্ব আমারই বেশি।
এহসান হেসে বলল, ঠিক আছে।

রুবাই মেয়েটা তার প্রতি আকর্ষণ বোধ করছে, এটা এহসান বুঝতে পারছে। কৌতূহল, কথা বলার আগ্রহ, মুগ্ধতা এগুলো না বোঝার কিছু নেই, বয়স কম মেয়েটার, বাইশ তেইশ হতে পারে। বেশ রেসপন্সিবল।
একটু কথা বলা যেতেই পারে। এর বেশি তো কিছু নয়।
অথৈ কে ইগনোর করার একটা উপায় হতে পারে এটা।
সহসা এহসানের মনে হলো, মনটা যখন ভেঙেচুরে বিপর্যস্ত, তখন অথৈয়ের জন্যই কিছুটা সামলে নেওয়া গিয়েছিল। আর এখন নতুন একটা অপশন সামনে আসতেই, এহসান অথৈ কে ইগনোর করার কথা ভাবছে, হতেই পারে, অথৈ ও তার জন্য কিছু অন্যরকম অনুভব করতে পারে, করতে পারে না করছেই। অনুভূতি বোঝা যায়। তবে অথৈ এর সাথে তার সম্পর্ক এগুনোর পথে শত শত বাঁধা। ওর বাবা মা, ঐশি কেউই অথৈ কে সামনে আসতে দেবে না। তার চাইতে একটু একটু করে দূরত্ব তৈরি করা ভালো। সময় পেরিয়ে গেলে নির্ভরতা আরো বাড়বে। অনেক যুক্তি তর্ক নিয়ে ভেবে এহসান যখন একটা সিদ্ধান্তে পৌছেছে৷ তখন আবার আবার নতুন গান শুরু হয়েছে।

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ২৫

“আমার মনও না চায়, এ ঘর বাধি ও কিশোরী, চলো না হই উদাসী!”
এহসান চিন্তা ভাবনা থেকে সরে এসে অথৈ কে আবারও ভিডিও কল করে বলল, ফোন অন থাকুক, গান শোনো।
অথৈ বলল, ঠিক আছে।

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ২৭