ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ২৮
শানজানা আলম
রুমে ফিরে এহসান চেইঞ্জ করে নিলো। টেম্পারেচার এডজাস্ট করে পর্দা টেনে দিলো। হালকা নীলচে আলোয়ে একটা আরাম আরাম পরিবেশ তৈরি হলো। একটা বালিশ পাশে নিয়ে এহসান কম্ফোর্টার টেনে শুয়ে পড়ল।
ঘুম আসছে না। এহসান সাথে আনা একটা বই কয়েক পেজ পড়ার চেষ্টা করল। কনসেনট্রেশান আসে না। একসময় একেকটা গল্পের বই রাত জেগে পড়া শেষ করে ফেলেছে, সেটা এখন অবিশ্বাস্য মনে হয়।
ইনসাইড রিডার মাইন্ড পুরোপুরি ডেড এখন! শখের বসে দুয়েকটা বই কেনা হয় ঠিকই কিন্তু মন বসে না।
অথৈকে ফোন করতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু ভেতর থেকে কেউ বাঁধা দিচ্ছে। দুয়েকবার ফোন হাতে নিয়ে ফোনটা আবার রেখে দিলো। ঐশির কথা একবারের জন্যও মনে পড়ে না। বরং ঐশি চলে গিয়ে এহসানকে মুক্ত করে দিয়ে গেছে মনে হয়৷
দিনের পর দিন অসহ্য হয়ে উঠছিল ঐশি, আর কেন যেন এহসানকেও সহ্য করতে পারতো না।
আচ্ছা এহসান কি চেষ্টা করে নি ঐশিকে ফেরাতে?
ঐশির সারাক্ষণ শপিং, সাজগোজ নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা, একটুও সংসারে মনোযোগ না থাকা বিষয়গুলোতে এহসান ক্লান্ত হয়ে উঠেছিল।
শেষ কবে ইন্টিমেট হয়েছিল, সেটাও এহসান ভুলে গেছে। অথচ এহসান ঐশির ইচ্ছেকে সম্মান করে এমবিএ ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল। নাসিরের সাথে একটা সম্পর্কে জড়িয়েছে ঐশি, সেটা খুব একটা সহজ সম্পর্ক নয়। ঐশির পেছনে খরচ করা শুরু করেছিল নাসির। কে জানে, হয়তো বেড পার্টনারও হয়েছে, বিবমিষা তৈরি হয় এহসানে, ঘৃণা জমা হয়। ঐশির জন্য কষ্ট কোথাও নেই, প্রতারক চোর একটা মেয়ে। অথৈ ঐশিরই বোন, সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের মেয়ে। এত অমিল দুই বোনের!
এহসান হঠাৎ ভাবল, চারপাশের যে যাই বলুক, সে অথৈকে বিয়ে করার একটা চেষ্টা করবে। প্রয়োজনে অথৈ এর সাথে একটা সম্পর্ক তৈরি করে, তারপরে অথৈকে সে বিয়ে করবে। অথৈ ভালো মেয়ে, এহসান নিশ্চিত অথৈ সংসারী হবে! তবে এহসানকে বিয়ে করতে না চাইলে, এহসান জোর করবে না।
নতুন কোনো সঙ্গীর কথা এহসান ভাবতে ভয় পায়। আবার যদি ভুল হয়, যদি। ঐশির মতন হয়। তাহলে সবাই এহসানকে দোষী মনে করবে।
এহসান অথৈকে টেক্সট করল, ঘুমিয়েছ?
অথৈ রিপ্লাই করল, এখনো না।
ফোন করি?
অথৈ কল ব্যাক করল।
ঘুমান নি এখনো?
ঘুম আসছে না, সারা দুপুর ঘুমিয়েছি। তুমি এখনো জেগে?
হ্যা। এমনিই।
অথৈ, তোমাকে বার বার ফোন করছি, তুমি কি ভাবছ জানি না, কিন্তু…
এহসান থেমে গেল।
কিন্তু কী?
কিন্তু তোমার সাথে কথা বলে শান্তি লাগছে। হয়তো বিরক্ত করছি তোমাকে। আর একটা বিষয়, আমার মনের অবস্থা না সিচুয়েশন তুমি জানো, আমাকে যেভাবে তুমি বুঝবে, সেটা আর কারো কাছে এক্সপেক্ট করতে পারি না।
আর কেউ মানে? – অথৈ জানতে চায়।
আর কেউ মানে অন্য কেউ বা নতুন কেউ!
আপনি কক্স ট্যুর শেষ করে ফিরে এসে অফিস জয়েন করেন, দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে।
হুম! সব ঠিক হবে জানি, খারাপ সময়টা বুকে বিঁধে থাকছে। ইকোনোমিকাল লস, মেন্টাল স্ট্রেস, আমি বোধহয় পাগল হয়ে যাচ্ছি অথৈ!
এহসান ভাই, আপুর সাথে আপনার যা হয়েছে, সবটা শেষ, আমাকে আপনি সেই আগের সম্পর্কে ভাববেন না। শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আমি আপনার পাশে আছি।
শুভাকাঙ্ক্ষী শুধুই?
এহসান ভাই, এর বেশি কিছু ভাবা তো আসলে সম্ভব না, বাস্তবিকও হয় না৷ তাই না?
হুম! কোথাও একটা দেয়াল আমার আর তোমার মাঝখানে আছে। ঠিক আছে অথৈ, আমি তোমাকে বিব্রত করব না। তবে তোমার এইটুকু পাশে থাকাই আমাকে খুব সাপোর্ট দিচ্ছে। থ্যাংকস এ লট!
ভারী কথা কিংবা হালকা কথায় রাত বাড়ে। অথৈ ফোন রাখার তাড়া দেখায় না, এহসানও ফোন ছাড়ে না।
দুটো লাগেজ ভরা ঐশির জিনিসপত্র। সুবহানা কিছুটা
জেলাস ফিল করে। বোকা মেয়েটাকে এত কিছু কিনে দিয়েছে নাসির! ঐশিকে নাসিরের দিকে এগিয়ে দিয়েছে সুবহানা, ঐশি সেটা মনে রাখলে হয়! এখনি এত কিছু দিয়েছে, পরে হয়তো আরো দিবে।
ঐশি সুবহানার জন্য কিছু গিফট এনেছে, সেটা সুবহানার চোখ ভরে না। ব্যাংকক যাওয়ার আগে ঐশি টাকা দিয়ে গিয়েছিল, এখন আবার টাকা চাইলে ভাববে সুবহানা শুধু টাকাই চাইছে।
তার চাইতে একটা প্ল্যান করে ওর থেকে বেশ কিছু টাকা হাতিয়ে নিতে হবে।
হ্যা রে, নাসির ভাই তোকে টাকা পয়সা কিছু দেয় নি?
না তো!
শোন, প্রোটেকশন নিয়েছিলি?
সুবহানার কথায় বিব্রতবোধ করে ঐশি।
ঢং করিস না ঐশি, ব্যাংককে নিশ্চয়ই দুজন লুডু খেলে সময় পার করিস নি!
ঐশি সংক্ষেপে বলল, হুম।
সুবহানা বলল, তোকে একটা কথা বলি, নাসিরকে দেখ ফাঁসাতে পারিস কিনা।
মানে- ঐশি সুবহানার দিকে তাকালো।
তোর সাথে ব্যাংকক ট্রিপ দিয়ে এলো, চেষ্টা করবি তোর কাছে যেন আসে, একবার প্রেগন্যান্ট হতে পারলে, টাকা পয়সা হাতিয়ে নিতে পারবি! লাইফ একদম সেট!ওনার তো বউ ছেলে আছে, সংসার ফেলে তোর কাছে কয়দিন আসবে, দুদিন পরে যদি তোকে ছেড়ে দেয়, কি করবি তখন?
সুবহানার কথা এতদিন ভালো লাগলেও এখন আর ভালো লাগে না ঐশির। এমনিতেই নাসির বলেছে, বনানীতে একটা ফ্ল্যাট দেখতে। ঐশি ওখানে থাকবে, ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে মাঝে মাঝে সময় কাটাতে যাবে।
সুবহানা বলল, তোকে ধানমন্ডির ফ্ল্যাটটা দিবে ভাবছিলাম, ওখানে তোকে রাখবে না। ভাড়া নিলে সেই ভাড়া তুই কিভাবে টানবি নাসির না থাকলে!
ঐশি একটু চিন্তায় পড়ে যায়। সুবহানার কথা কিন্তু ফেলে দিতেও পারে না। এত লাক্সারি, শপিং, ট্যুরের৷ সব আনন্দ ফিকে হতে শুরু করে তবে ঐশি এত সহজে ছেড়ে দেবে না নাসিরকে, যে করেই হোক, নাসিরকে আটকে রাখতে হবে।
বাসায় ফিরেছে নাসির। নিজের ঘরে টাই আলগা করছিল, আভা এসে ঘরে ঢুকলো।
কেমন হলো তোমার ট্যুর।
নাসির তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলো। উত্তর দিলো না।
এবার কাকে নিয়ে গিয়েছিলে?
নাসির বলল, এজন্য আমি ঘরে আসতে চাই না।
আসো কেন, যার সাথে তিনদিন লাক্সারি ভিলায় সময় কাটালে তার কাছেই যাও।
নাসির বলল, প্রয়োজন মনে করলে যাব। এই বিষয়ে তুমি কোনো কথা বলবে না।
আভা বলল, নাসির, আমি তোমার স্ত্রী।
সো হোয়াট, আমার বাড়িতে আছ, আমার ছেলের মা তার দেখাশোনা করো। টাকা চাইলেই পাচ্ছ!
আভা হঠাৎ নাসিরকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল, নাসির প্লিজ, কাম ব্যাক! সব ভুলে যাব!
নাসির ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, আমি তো কোথাও যাই নি, কাম ব্যাক করব কিভাবে!
আভা বলল, সেটা তুমি খুব ভালো করে জানো!
ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ২৭
নাসির ঘর থেকে বের হয়ে গিয়ে আবার ফিরে এলো।
আভা, নেক্সট উইকে অস্ট্রেলিয়া যাব। এরেঞ্জ করো।
তুমি আর আমি।
আভা ছুটে গিয়ে নাসিরকে আলিঙ্গন করল।
