ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪৭
মেহজাবিন নাদিয়া
জেবা হতভম্ব হয়ে আরিশান মৃধার দিকে তাকাল। লোকটার মুখের এক্সপ্রেশন তাকে সব বুঝিয়ে দিল। লোকটা ইচ্ছে করে তার সাথে এমন একটা জঘন্য খেলা খেলেছে! ঠকিয়েছে তাকে!
তীব্র রাগে আর অপমানে জেবার শরীর রি রি করে উঠল। সে সাথে সাথে লইয়ারের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল,
_“এই! আপনাকে লইয়ার কে বানিয়েছে? একটা মেয়ের অগোচরে তার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কাবিননামায় সই করাতে লজ্জা করে না আপনার?”
লইয়ার জেবার কথায় কী বলবেন ভেবে পেলেন না, পড়ে গেলেন মহা বিপাকে! নিজের গলাটা একটু ঝেড়ে নিয়ে আমতা আমতা করে বললেন,
_“দেখুন মিস, আপনাকে আমি নিশ্চয়ই জোর করে কিছু করাইনি? আপনি পেপার না পড়ে সই করেছেন, এটা সম্পূর্ণ আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এখন এই বিষয়টায় আর বাড়াবাড়ি করা উচিত হবে বলে আমার মনে হয় না।”
লইয়ারের মুখে এমন যুক্তি শুনে জেবা আরও রেগে আগুন হয়ে গেল। লোকটার ডেস্কের ওপর হাত দিয়ে সজোরে একটা আছাড় মেরে জানাল,
_“আমি আপনার কোনো ফালতু কথা শুনতে চাচ্ছি না! আই ওয়ান্ট ডিভোর্স! নয়তো এই প্রতারণার বিরুদ্ধে আমি মামলা করব, বলে দিলাম!”
লইয়ার এবার বেশ অসহায় ভঙ্গিতে পাশে বসা আরিশান মৃধার দিকে তাকালেন। তারপর হাত দুটো তুলে শান্ত স্বরে বললেন,
_“জি মহতারমা, আপনি মামলা করতে চাচ্ছেন-ভালো কথা। তবে আপনার হয়তো জানা নেই, দেশের সর্বোচ্চ আইন এখন আপনার স্বয়ং স্বামী নিজেই! তিনি যদি এই বিষয়ে অনুমতির সবুজ সংকেত দেন, তবেই আমরা মামলা নিতে বাধ্য হব। একটু ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত জানাবেন, দয়া করে।”
লইয়ারের কথা শুনে জেবার রাগ এবার চরমসীমায় পৌঁছাল। সে ঝট করে পাশ ফিরে তাকাল আরিশান মৃধার দিকে। কিন্তু লোকটা একদম নিশ্চিন্তে হেলান দিয়ে বসে ফোনে কী যেন করছে, কানে তার এয়ারপডস গুঁজে রাখা! এত বড় একটা কান্ড ঘটিয়ে ফেলার পরও লোকটার এহেন শান্ত আর উদাসীন ভাব কোনোভাবেই সহ্য হলো না জেবার।
রাগে দিশেহারা হয়ে গেল সে। লোকটা তাকে পেয়েছেটা কি? একই সাথে দুই নারীকে নিয়ে সংসার করতে চায়? আনতারা মৃধাকেও ছাড়বে না, আবার তাকেও ফাঁদে ফেলে আটকে রাখবে? আর মুখে বলবে-জেবাকে সে কেবল একটা ‘দায়িত্ব’ মনে করে!
ধিক্কার জানায় জেবা এমন দায়িত্বকে! সে চায় না এমন সংসার। এসব ছলাকলা আর ধোঁকাবাজি থেকে সে চিরকালের জন্য মুক্তি পেতে চায়। নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সে আলাদা থাকবে। জীবনটা না হয় একাকীত্বের হোক, চরম বেদনার হোক-তবুও এই ছলনাময় পুরুষের সাথে নয়!
জেবা আবার ঘুরে দাঁড়াল লইয়ারের দিকে। এদিকে জেবাকে এভাবে অগ্নিমূর্তি ধরে তাকাতে দেখে বেচারা লইয়ার পড়লেন মহা ফ্যাঁসাদে!ভাবলেন,কোন কুক্ষণে যে তিনি এই কেসটা নিতে এসেছিলেন! তাও আবার এমন এক ব্যক্তির কেস, যিনি স্বয়ং দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী! আইনের সর্বোচ্চ স্তরটাই তো ওনার দখলে। ভাবা যায়? এত বড় ক্ষমতাবান মন্ত্রী হয়েও এই একটুকুনি বউকে নিজের কাছে আটকে রাখার জন্য লোকটা কত রকমের নাটক সাজাল!
তবে সব দেখে লইয়ারের মনে মনে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেল-পুরুষ মানুষ হয়তো তার শখের নারীর কাছে এমনই হয়। শখের প্রিয়সীকে শক্ত করে ধরে রাখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা হয়তো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও এমন সাধারণ প্রেমিকের মতো দেওয়ানা করে তোলে!ওনার এই মনস্তাত্ত্বিক ভাবনার ছেদ ঘটল জেবার তড়পে ওঠা তীক্ষ্ণ কথায়,
_“আপনি শুনতে পাচ্ছেন মিস্টার? আপনার ওই মহান মন্ত্রীকে বলুন-নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করা বন্ধ করতে! এভাবে জালিয়াতি করে আমার থেকে তালাক দেওয়ার অধিকার উনি কেড়ে নিতে পারেন না!”
লইয়ার এবার সুযোগ বুঝে গেলেন এখানে তার থাকা আর সুবিধার নয়।সেজন্য নিজের পিঠ বাঁচাতে তোয়ালে পেঁচানোর মতো করে বললেন,
_“জি মিস… আসলে আমার খুব জরুরি ওয়াশরুমে যেতে হবে। আপনি দয়া করে স্যারের সাথে এই ব্যাপারে কথা বলে ঝামেলাটা মিটিয়ে নিন। আমার মনে হয়, উনি আমার চেয়েও আইন অনেক ভালো বোঝেন!”
কথাটা বলেই তিনি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না, কোনোমতে কেবিন থেকে চম্পট দিলেন! বাপের জন্মেও তিনি এমন কেস দেখেননি। মন্ত্রী তো বউ আনেননি, আস্ত একটা পারমাণবিক বোমা বিয়ে করে এনেছেন! মনে মনে আরিশান মৃধার জন্য একরাশ করুণা অনুভব করতে করতেই তিনি দ্রুত কেবিন ছাড়লেন।
হসপিটালে গাইনেকোলজিস্টের কেবিনে মুখোমুখি বসে আছে অরি ও সারিম। ডাক্তার রিপোর্ট আনতে বাইরে গেছেন। সারিম মূলত এখানে অরিকে এনেছিল তার সাধারণ অসুস্থতার জন্য একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেখাতে। কিন্তু অরির বমি, হঠাৎ মেজাজ পরিবর্তন ও শারীরিক দুর্বলতার লক্ষণগুলো শুনে অভিজ্ঞ মেডিসিন ডাক্তার সারিমকে কালবিলম্ব না করে সোজা গাইনেকোলজিস্টের অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা করে দেন।
এখানে আসার পর অরির বেশ কিছু রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করানো হয়। সেসব টেস্টের চূড়ান্ত ফলাফলের রিপোর্ট আনতেই গেছেন ডাক্তার। কেবিনে নীরবতা ছেয়ে আছে। অরি প্রচণ্ড নার্ভাস, অন্যদিকে সারিম একদম চুপচাপ। তার গম্ভীর মুখের আড়ালে কী ঝড় বইছে, তা কেবল সেই জানে।
সারিমের এই নীরবতা অরির একদম সহ্য হচ্ছে না। সে একদফা উত্তেজিত ও ব্যাকুল নিজের সম্ভাব্য মা হওয়ার অনুভূতি নিয়ে, অন্যদিকে সারিমের থমথমে ভাব দেখে তাকে নিয়েও বেশ চিন্তিত। অরির মনে সংশয় দানা বাঁধছে-সারিম কি এই মুহূর্তে সন্তান চায় না?
এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর দোটানার মাঝেই লেডি ডাক্তার কেবিনে প্রবেশ করলেন। মহিলার চেহারা বেশ থমথমে, চোখে-মুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ। সারিমের প্রখর নজর থেকে সেই পরিবর্তন বিন্দুমাত্র এড়াল না। আপাতদৃষ্টিতে শান্ত থাকলেও ভেতরে ভেতরে যে সে নিজের অরিকে নিয়ে কতটা উদ্বিগ্ন, তা সারিমের চোখ দুটো দেখলেই বোঝা যায়।
ডাক্তার নিজের চেয়ারে এসে বসলেন। রিপোর্টের ফাইলটি খোলার পর চশমার ওপর দিয়ে অরি ও সারিমের দিকে গভীরভাবে তাকালেন। তারপর মুখে মৃদু এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বললেন,
_“কনগ্রাচুলেশনস, মিস্টার মৃধা! ইউ আর গোয়িং টু বি আ ফাদার।”
ডাক্তারের মুখের কথাটি শোনামাত্র অরি যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না! আনন্দে তার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল, বাকহারা হয়ে গেল সারিম। অরির ভেতরের খুশির জোয়ার বাঁধ মানছিল না; অজান্তেই তার একটি হাত তলপেটে চলে গেল। সারিম অরির হাতের সেই স্পর্শ খেয়াল করল, তবে তার মুখাবয়ব আগের মতোই অপরিবর্তিত রইল।
ডাক্তার ফাইলপত্রের পাতা উল্টাতে উল্টাতে আবার বলতে শুরু করলেন,
_“মেডিকেল বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এখনই একশো ভাগ নিশ্চিত বলা না গেলেও, আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আর এই বায়োকেমিক্যাল রিপোর্টগুলো অন্য কথা বলছে। মিস্টার মৃধা, আপনি সম্ভবত একাধিক সন্তানের বাবা হতে চলেছেন! আই মিন, প্রেগন্যান্সি এখন মাত্র চার সপ্তাহের। গর্ভস্থ শিশুর ‘হার্টবিট’ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ পরিষ্কার বলা যাচ্ছে না, তবে ওনার এইচসিজি হরমোনের মাত্রা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।”
ডাক্তার একটু থেমে অরি ও সারিমকে সহজভাবে বোঝানোর জন্য বললেন,
_“সাধারণ একক প্রেগন্যান্সির ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার এই একদম শুরুর দিকে এইচসিজি হরমোনের মাত্রা প্রতি ৪৮ ঘণ্টায় কিছুটা বৃদ্ধি পায়, যা স্বাভাবিক সীমার মধ্যে থাকে। কিন্তু ওনার ক্ষেত্রে এই মান অস্বাভাবিক হারে দ্বিগুণ-তিনগুণ গতিতে বাড়ছে। সাধারণত এমন উচ্চমাত্রার এইচসিজি বৃদ্ধির একমাত্র কারণ হলো ‘মাল্টিপল গেস্টেশন’ বা জরায়ুতে একের অধিক ভ্রূণের উপস্থিতি। যেহেতু এটি ওনার প্রথম প্রেগন্যান্সি এবং শরীর এখনও বেশ নরম, তাই কিছুটা স্বাস্থ্যঝাঁকি ‘হাই-রিস্ক প্রেগন্যান্সি’ হিসেবে এটিকে বিবেচনা করতে হবে।”
অরির শারীরিক ঝুঁকির কথা শোনামাত্র সারিমের ভেতরের চিন্তারা মাথা ফেটে বেরিয়ে পড়ল! রক্তচাপ বেড়ে গিয়ে অরির ভাবনায় অস্থির হয়ে উঠল সে। ব্যাকুল অথচ কঠোর চিত্তে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
_“ঝুঁকি মানে? হোয়াট ডু ইউ মিন বাই রিস্ক? শুনুন ডাক্তার, আমি আমার ওয়াইফকে নিয়ে কোনো প্রকার জীবনের ঝুঁকি অথবা শারীরিক জটিলতায় যেতে চাচ্ছি না! প্লিজ, সলভ দিস প্রবলেম উইথ অ্যান অল্টারনেটিভ সলিউশন! নয়তো আমার কোনো বাচ্চারই দরকার নেই!”
সারিমের এমন কঠোর সিদ্ধান্তমূলক কথা শুনে আঁতকে উঠল অরি! লোকটা নিজের সন্তানদেরই চায় না?অরি বাধা দিয়ে বলল,
_“সারিম! আপনি এমনটা বলবেন না,! আমার আর আমাদের বাচ্চাদের কিছুই হবে না। প্লিজ সারিম, থিঙ্ক অ্যাবাউট মি ওয়ান্স! ওরা তো আপনারও সন্তান, বাবা হয়ে নিজের রক্তকে এভাবে অস্বীকার করবেন না, প্লিজ!”
সারিম অরির আকুল মিনতি শুনেও যেন শুনল না। তার কঠিন চোখের দৃষ্টি কেবল অরির ওপরই নিবদ্ধ। সারিমের কাছে সবার আগে তার চন্দ্রিমার জীবন ও নিরাপত্তা, তার পরে বাকি সব। সে নিজের আবেগে অন্ধ হয়ে বাচ্চার মোহে পড়ে স্বার্থপরের মতো অরিকে কোনো বিপদের মুখে ফেলে দিতে পারবে না। অরি এখনও অনেক ছোট, এত বড় শারীরিক চাপ সহ্য করার মতো পরিপক্কতা তার হয়নি। তাই বাস্তবতার খাতিরে যা কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়, সারিম একা হাতেই নেবে।
সারিম অরির কথাকে পাত্তা না দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করল,
_“হাউ মেনি ডু ইউ থিংক ইট কুড বি? আই মিন, টেল মি ফ্রম ইউর এক্সপেরিয়েন্স, কতগুলো হতে পারে?”
ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভাবলেন। টেস্টের বায়োকেমিক্যাল রিপোর্ট এবং আল্ট্রাসাউন্ডের প্রাথমিক স্ন্যাপগুলো পুনরায় খতিয়ে দেখে চিন্তিত স্বরে বললেন,
_“আমি ভুলও হতে পারি মিস্টার মৃধা, তবে আমার এত বছরের অভিজ্ঞতা বলছে-আপনি হয়তো তিনটি অথবা চারটি যমজ সন্তানের বাবা হতে চলেছেন! রিপোর্টে হরমোনাল গ্রোথ এবং স্যাক-এর সংখ্যা দেখে সেটাই ইঙ্গিত করছে। তবে চিন্তার কিছু নেই, আগামী সপ্তাহে আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে ভ্রূণের ধুকপুকানি দৃশ্যমান হলেই বিষয়টি পুরোপুরি কনফার্ম হওয়া যাবে।”
কথাটা শুনে সারিম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কেবিনে থমথমে নীরবতা নেমে এলো। সারিমের ভেতরের মৌনতা লক্ষ্য করে ডাক্তার অত্যন্ত সদয় কণ্ঠে বুঝিয়ে বললেন,
_“দেখুন মিস্টার মৃধা, মাল্টিপল প্রেগন্যান্সি হওয়া মানেই কিন্তু মা বা বাচ্চার জীবন সংকটাপন্ন-এমনটা ভাবা ভুল। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেক দূর এগিয়ে গেছে। হ্যাঁ, গর্ভধারণের এই যাত্রাপথে কিছু শারীরিক জটিলতা বা রিস্ক আসবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু স্বামী হিসেবে আপনার উচিত এই সংবেদনশীল সময়ে ওনার পাশে থেকে মনোবল বাড়ানো, ভয় দেখানো নয়।”
একটু থেমে ডাক্তার অরির দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে যোগ করলেন,
_“সর্বোপরি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন, উনি নিশ্চয়ই নিখুঁত পরিকল্পনা করেই এই নিয়ামত দান করেছেন। আমি ওনার জন্য একটি স্পেশাল হাই-প্রোটিন নিউট্রিশনাল ডায়েট চার্ট তৈরি করে দিচ্ছি। ওনাকে পুরোপুরি ভিটামিন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক নিয়ম মেনে মনিটরিংয়ে রাখলে আশা করি বড় কোনো সমস্যা হবে না। এই ধরনের ‘মাল্টিপল প্রেগন্যান্সি’ কেসে সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই, সঠিক গাইডলাইনে থাকলে মা ও সন্তান-সবাই সুস্থভাবেই এই দুনিয়ায় আসবে।”
ডাক্তার সারিমকে এরপর আরো কিছু জ্ঞান দিলেন। বুঝালেন অরির এখন সারিমকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তাই সারিম যেন অরিকে না ভেঙে সাহস জোগায়। এরপর ডাক্তার কিছু মেডিসিন এবং একটা ডায়েট চার্ট বানিয়ে দেয়। আগামী সপ্তাহে আবার অরিকে এনে চেকাপ করানোর কথা বলে যায়।
_”ধ্যাং ইউ ডাক্তার। ”
_”ইটস ওয়েলকাম। ”
এরপর সারিম অরিকে নিয়ে ডাক্তার এর কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে আসে। বাহিরে এসে অরিকে নিয়ে গাড়িতে বসায়।নিজেও ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ে। এরপর গাড়ি স্টার্ট দেয়। অরি গাড়িতে বসে বসে নিজের অনাগত সন্তানদের কথা চিন্তা করছে। কি সুন্দর একটা অনুভূতি।সেই ছোট্ট অরিটি এখন নিজেও মা হতে যাচ্ছে। তাকেও ছোট ছোট বাচ্চারা মা বলে ডাকবে।মনে মনে অরি বাচ্চাদের কি নাম রাখা যায় সেটাও ভেবে নিচ্ছে।
এদিকে অরির পুরো ব্যাতিক্রম সারিম। পুরোটা মনোযোগ তার কেবল ড্রাইভিংএ। কোনো কথা বলছে না আজ সে অরির সাথে। অন্যকোনো সময় হলে এতক্ষনে একশটা কথার ফুলঝুরি এনে জ্বালিয়ে মারতো অরিকে। অথচ সেই ছেলেটাই আজ একদম নিশ্চুপ।অরি অবশ্য ব্যাপারটা লক্ষ করলো। মনটা বিষন্ন হলো তার। সারিম তাকে নিয়ে ভীষণ চিন্তিত এটা বুঝে অরি। কিন্তু তাই বলে লোকটা, নিজের বাচ্চা হওয়ার অনুভূতিটা প্রকাশ করবেনা। এটা কেমন কথা হলো।
এরি মধ্যে গাড়ি এসে থামলো মৃধা নিবাসের ভিতর।সারিম গাড়ির দরজা খুলে অরিকে নিয়ে বের হলো।অরি একা একাই চলে যেতে নিচ্ছিলো। তা দেখে সারিম ওকে একহাতে খপ করে আটকে দেয়। অরি ভ্রু উচিয়ে তাকায় সারিমের দিকে। সারিম অরির দৃষ্টি বুঝে বলল।
_”এখন থেকে তুমি আর একা একা হাটবেনা। ”
সারিমের কথা শুনে অরি আকাশ থেকে পড়লো যেনো। লোকটা কি বলল এক্ষুনি! অরি কেন একা একা হাটতে পারবেনা।
_” আজব তো আপনার কি সমস্যা বলুন। কখনো বাচ্চা চাচ্ছেন না। আবার কখনো বলছেন আমি একা একা হাটবো না। আসলে আপনি চাচ্ছেন টা কি?
সারিম অরির করা কথার পিঠে জবাব দিলো।
_”আমি শুধু চাচ্ছি তুমি আমার কথা মেনে চলো। একা চলার পথে তোমার দুর্ঘটনা, ঘটার সম্ভবনা বেশি। আমি তোমাকে নিয়ে নূন্যতম রিক্স নিতে ইচ্ছুক নই।”
_”আপনি একটু বেশিই চিন্তা করছেন সারিম!এমন কিছুই হবে না আল্লাহ ভরসা। তাছাড়া আপনি তো আছেনি। ”
সারিম কিছু বলল না অরির কথায়। চুপচাপ অরির হাত ধরে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো। ভিতরে ঢুকতেই ড্রয়িং রুমে আনতারা মৃধার সাথে ফুলকে দেখা গেলো। দুজনে বসে বসে কিছু নিয়ে গল্প করছিলো। ওনাদের চোখ এবার অরি ও সারিমের দিকে গেলো।সারিম আর অরিকে এই অসময়ে বাহির থেকে ফিরতে দেখে প্রশ্ন করেন আনতারা মৃধা।
_”এই অসময়ে কোথায় গিয়েছিলে?
সারিম মায়ের করা প্রশ্নে বিরক্ত হলো। এমনিতেই তার মন মেজাজ ভালো না। এরমধ্যে আবার প্রশ্ন করাটা তার সহ্য হলোনা। পাশে বসা ফুল একদৃষ্টে দেখে চলছে অরি আর সারিমকে। অরির সাথে দিন দিন সারিমের এতো কেয়ার সহ্য হচ্ছে না তার।কোথায় ভাবলো এদের বিচ্ছেদ ঘটাবে।কিন্তু এখানে এসে সে যা দেখলো তাতে মনে হলো এভাবে চলতে থাকলে অরি আর সারিমকে সে কোনোভাবেই আলাদা করতে পারবেনা। যেভাবেই হোক অরিকে সারিমের জীবন থেকে দ্রুত সরাতে হবে।
আনতারা মৃধা তখনো ছেলের দিকে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে চেয়ে আছে।সারিম এখন কি বলবে ভেবে পেলো না।অরির প্রেগন্যান্সির ব্যাপারটা সে গোপন রাখবে বলে ঠিক করলো।নাহলে এতে আবার অরির নিরাপত্তা নিয়ে চরম সংকট দেখা দিবে। মায়ের স্বভাব তার ভালোই চেনা। মহিলা অরিকে সহ্য করতে পারেনা তা জানে সারিম। কখন আবার কোন ক্ষতি করে বসে তার ঠিক নেই।সেজন্য মিথ্যা বলল।
_” জরুরি কাজ ছিলো তাই গিয়েছি। ”
_”বউকে নিয়ে তোমার এতো কিসের জরুরি কাজ থাকে শুনি।”ব্যাস!আনতারা মৃধার এই কথাতেই সারিম চটে যেতে বাধ্য হলো।বলল।
_”আমার বউ আমি কোথায় যাবো না যাবো।সেটা নিতান্তই আমার আর তার ব্যাক্তিগত ব্যাপার। তুমি এর মধ্যে নাক কেন গলাচ্ছো।”
ছেলের এহেন কথা শুনে রেগে গেলেন আনতারা মৃধা।বউয়ের জন্য মায়ের সাথে এমন ব্যাবহার,মোটেও সহ্য হলো না তার। রেগে বলল।
_”সারিম তুমি কিন্তু ভুলে যাচ্ছো,আমি তোমার মা হই। একটা বাহিরের মেয়ের জন্য তুমি মায়ের সাথে এমন ব্যাবহার করতে পারো না।”
অরিকে বাহিরের মেয়ে বলাতে রাগ উঠলো সারিমের।কথার উল্টো পিঠে আনতারা মৃধার উদ্দেশ্যে বলল।
_”তাহলে তুমিও কিন্তু ভুলে যাচ্ছো অরি আমার বউ হয়। কোনো বাহিরের মেয়ে নয় ও। আমার আর ওর মধ্যকার ব্যাপারে আমি তোমার হস্তক্ষেপ মেনে নিবো না একদম।তাছাড়া এতো যে মা দাবি করছো। মা হওয়ার কোনো যোগ্যতা আছে তোমার মধ্যে। আমার চোখে তুমি শুধু একটা লোভী দুশ্চরিত্রহীন মহিলা ছাড়া আর কিছুই নও। ”
আনতারা মৃধা ছেলেরা এহেন ভারি কথাগুলো মেনে নিতে পারলেন না। তিনি এগিয়ে এলেন সারিমকে থাপ্পর দেওয়ার উদ্দেশ্যে।আচমকা একটা হাত এসে তার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।অরি অবাক চোখে তাকালো সেদিকে। দেখা গেলো জেবা দাড়িয়ে আছে সেখানে। আর আনতারা মৃধার হাতটা সেই ধরে রেখেছে।আনতারা মৃধা এখানে জেবাকে দেখে ফুসে উঠলেন।তিনি জেবার হাত থেকে নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলে উঠে।
_”অসভ্য মেয়ে আমার হাত ছাড়।”
জেবা সাথে সাথেই ওনার হাত ছেড়ে দিলো। পরমূহর্তে সবাইকে অবাক করে দিয়ে আনতারা মৃধা জেবার গালে চর মারলেন। চরের তীব্রতা এতটাই প্রখর ছিলো যে জেবা কিছু ইঞ্চি দুরুত্বে পিছিয়ে গেলো।এমন সময় বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলেন আরিশান মৃধা।ফোনে কারো সাথে কথা বলছিলেন ওনি। জেবা ওনাকে দেখা মাএই হঠাৎ করে কান্না করে দেয়।আরিশান মৃধা জেবার কান্না দেখে দ্রুত কল কেটে ছুটে আসেন তার দিকে। উদ্বেগ স্বরে জিজ্ঞাসা করেন।
_”আর ইউ ওকে। কাদছো কেন?”
জেবার কান্না করতে করতেই হাতের ইশারায় আনতারা মৃধাকে দেখিয়ে বলল।
_”আপনি বলেছেন এখানে আমি সুরক্ষিত থাকবো। অথচ আপনার বউ আসতে না আসতেই আমাকে মেরেছে। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে,আমি কতটা সুরক্ষিত এখানে।থাকতে চাচ্ছি না আর। আপনি আপনার দ্বায়িত্ব পালনে ব্যার্থ হয়েছেন। এবার আমাকে বাড়ি দিয়ে আসুন এক্ষুনি।”
আরিশান মৃধা রেগে তাকালেন আনতারা মৃধার দিকে।চোখ তার লাল বর্ণ ধারন করেছে। বুঝাই যাচ্ছে ভিষন ক্ষেপেছেন তিনি। আনতারা মৃধার নিকট এমনটা হয়তো আশা রাখেনি।তবে কারো একজনের হয়তো সেইটুকু রাগ পছন্দ হলোনা। আগুনে ঘি ঢালার জন্য পাশ থেকে সারিম বলল।
_”সব দোষ আমার। এখানে কারোই কোনো দোষ নেই।আসলে মা আমাকে মারতে এসেছিলো তবে জেবা ওনাকে বাধা দেওয়ায়।ওনি আমার রাগ জেবাকে দেখিয়ে মাএ চার পাঁচটা থাপ্পর মেরেছে। এই আরকি যাহ।”
ব্যাস এতোক্ষন তো ভেবেছিলেন অল্প মেরেছে। কিন্তু সারিমের মুখে চার পাঁচটা থাপ্পরের কথা শুনে রিতীমতো খুনে রাগ উঠলো আরিশান মৃধার।আনতারা মৃধার এতো বাড়াবাড়ি এখন আর সহ্য হলো না তার। ওনার জীবনটাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে প্রতিবারি এই নারী কোনো না কোনো ভাবে। এবার সেটা ওনি আর হতে দিবেনা।যার জন্য আগে থেকেই সকল ব্যবস্থা ওনি রেডি করে রেখেছেন।
এদিকে সারিমের বানোয়াট মিথ্যা শুনে আশ্চর্য বনে গেলেন আনতারা মৃধা।ওনি কখন আবার জেবাকে এতগুলো থাপ্পর দিলেন। ছেলে তাকে তার বাবার সামনে ইচ্ছে করে দোষী সাবস্ত করতে চাচ্ছে।তা ভালোই বুঝে গেলেন তিনি।বললেন।
_”সারিম তুমি আমার নামে এতো মিথ্যে কিভাবে বানাতে পারো। আমি জেবাকে এতোগুলো থাপ্পর কখন দিলাম। ফুল এখানে ছিলো সে সাক্ষী। আরিশান তুমি ফুলকে জিজ্ঞাসা করো একবার।ও তোমাকে সব সত্যিই বলবে। ”
সারিম ফুলের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙালো। ফুল সারিমের চোখে চোখ পড়তেই সেই দৃষ্টে ভয় পেয়ে গেলো। আরিশান মৃধা ফুলের দিকে তাকালেন। সারিম তখনো ফুলের দিকে চোখ রাঙিয়েই ছিলো। ফুল সারিমের ভয়ে কিছুই বলতে পারলো না। ফুলকে চুপ দেখে আরিশান মৃধা আনতারা মৃধার প্রতি আরেকটু ক্ষিপ্ত হলো।মহিলা পদে পদে কিভাবে মিথ্যা বলছে। তা বুঝলেন ওনি।রাগি স্বরে বললেন।
_”আর কতো মিথ্যা বলবে তুমি আনতারা। মিথ্যার একটা লিমিট আছে। যা তুমি সেই কবেই পাড় করে এসেছো। তোমাকে সহ্য করা আমার পক্ষে অসম্ভব প্রায়। আমি আর এতো ঝামেলা নিতে পারছিনা। এতোদিন তোমাকে শুধুই সন্তানের মা হিসেবে আশ্রয় দিয়েছিলাম। কিন্তু তোমার আচরনে তুমি সেটাও হারিয়েছো। ”
আনতারা মৃধা অবাক কন্ঠে প্রশ্ন করলেন।
_”মানে?
_”মানেটা খুবি সহজ। “বলেই তিনি দরজার দিকে তাকালেন। ভিতরেই প্রবেশ করলো ওনার সেই সহকারী অ্যাসিস্ট্যান্ট আরিফ।সকলে তার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকালো। আরিফ এসে পাশে দাড়াল আরিশান মৃধার। হাতে থাকা ফাইল থেকে বের করে দিলো। সেই খাম,যেটা লইয়ার থেকে প্রথমে সাইন করেছিলেন।আরিফের কাছ থেকে খামটা নিয়ে নিলো আরিশান মৃধা।এরপর সেটা এগিয়ে দিলো আনতারা মৃধা দিকে। আনতারা মৃধা খামটা হাতে নিলেন।আরিশান মৃধাকে জিজ্ঞেস করলেন।
_”এটা তুমি আমাকে কিসের খাম দিচ্ছো।”
_”খুলে দেখো আগে।”
আনতারা মৃধা আস্তে আস্তে খুললেন খামটা। এরপর সেখানে থাকা কাগটা খুলে মেলে ধরতেই দু চোখ তার বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেলো। মেনে নিতে পারলোনা তিনি এটা। আরিশান মৃধা ওনাকে ডিভোর্স লেটার দিয়েছে। আবার তাতে আগে থেকেই সই করা আছে ওনার।কিভাবে সম্ভব? ওনার জানা মতে আজ জেবার সাথে আরিশান মৃধার ডিভোর্স হওয়ার কথা ছিলো। তাহলে এখন এসব ওনি কি দেখছেন। প্রশ্ন খেলে গেলো ওনার মাথায়।
_”আরিশান তুমি মজা করছো আমার সাথে তাই না। ঐ মেয়েটার জন্য তুমি আমার সাথে এমনটা করতে পারোনা।একটু তো লজ্জা রাখো সে তোমার মেয়ের বয়সী। আমার তোমার কত বছরের সংসার এটা।একবার ভেবে দেখো। ”
আরিশান মৃধা সোজাসাপ্টা জবাব দিলেন।
_”ভাবাভাবির দিন অনেক আগেই শেষ হয়েগেছে। তোমার আর আমার পথ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটা মেনে নিলে খুব খুশি হবো।আর রইলো কথা বয়সের,সেটা জেবা না চাইলেও আমার সাথে থাকতে হবে। আমি বাধ্য করতাম ওকে। আর লজ্জা!সেই জিনিসটা আবার আমার মধ্যে একদমি নেই। সো ভাবো কম আর সাইন করো দ্রুত।যতো টাকা দরকার আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট থেকে চেয়ে নিয়ে বিদায় হও।”
বলেই আরিশান মৃধা সেখানে আর দাড়ালেন না। হনহন করে সিড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলেন। ওনাকে যেতে দেখে পিছন থেকে আনতারা মৃধা ঢেকে উঠে বলেন।
_”আরিশান তুমি যা করছো আমার সাথে,এর ফল কিন্তু মোটেও ভালো হবে না বলে দিলাম।সারিমের কথাটাও একটু চিন্তা করে দেখো। ও আমাদের দুজনের সন্তান। তুমি এসব করে শুধু শুধু নিজের প্রতি ওর মনে খারাপ ধারনা প্রভাবিত করছো।”
আরিশান মৃধা শুনেও না শুনার ভান ধরে চলে গেলেন। যেন মনে হলো এই মাএই ওনি কোনো জোক্স শুনলেন।তাও আবার সারিমকে নিয়ে।যে কিনা জোর করে বাবার দ্বিতীয় বিয়ে করিয়েছিল।
আরিশান মৃধা উপরে চলে যাওয়ার সাথে সাথেই ড্রয়িংরুমের বাতাস ভারী হয়ে গেলো।আনতারা মৃধা হাতের ডিভোর্স পেপারটা দুমড়ে-মুচড়ে ফ্লোরে ছুড়ে মারলেন। চোখ দুটো আগুনের মতো লাল
_”মিথ্যা ! সব মিথ্যা!” তিনি চিৎকার করে উঠলেন।
তারপর বিদ্যুতের গতিতে ঘুরে জেবার দিকে তেড়ে গেলেন।
_”তোর জন্যই সব। তুই এই বাড়িতে পা রাখার পর থেকেই আমার সংসারটা জাহান্নাম হয়ে গেছে। মেয়ের বয়সী মেয়ে… ছি!”
বলেই আনতারা মৃধা জেবার চুল খামচে ধরতে গেলেন।
জেবা ভয়ে পিছিয়ে গেলো। _”আরে আপনি আমার দিকে তেড়ে আসছেন কেন। আজব!যখন আমি কিছুই করিনি!”
_”করিসনি? তুই কিছু করিসনি?”
আনতারা মৃধা হিসহিস করে বললেন
_”তুই আমার স্বামী কেড়ে নিয়েছিস। আমার ছেলের মাথা খেয়েছিস। এখন আবার সাধু সাজতেছিস?”
সারিম সেকেন্ড দেরি করলো না। মা আর জেবার মাঝখানে এসে দাঁড়ালো।দুজনের মধ্যকার ঝগড়া থামাল। এরপর পাশে থাকা ফুলের উদ্দেশ্য বলল।
_”ফুলমতি এই মহিলাকে এক্ষুনি রুমে নিয়ে যা। বিকেলে পাবনা থেকে লোক আসবে ওনাকে নিতে। ততক্ষন তোর হেফাজতে রাখবি ওনাকে। ”
ছেলের মুখে এমন কথা শুনে বাকহারা আনতারা মৃধা। এই দিন দেখবে তা আশা করেনি কখনো। শেষমেষ ছেলে ওনাকে দূর করে পাবনা পাঠাতে চাচ্ছে। ভাবতেই তো কেমন লাগে ব্যাপার টা। এটা ওনি কেমন সন্তান জন্ম দিলেন? ভাবলেন আনতারা মৃধা। হয়তো ওনার করা পাপ, ওনাকে এমন একটা ছেলে দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত দিচ্ছে। নয়তো আর কিই বা হবে।ফুল এসে আনতারা মৃধার পাশে দাড়ালো বলল।
_”মামি রুমে চলুন। ”
আনতারা মৃধা গেলন না। দাড়িয়েই রইলেন। ওনাকে দাড়াতে দেখে জেবা আর সারিম দুজনেই বিরক্ত। বিষয়টা আনতারা মৃধার চোখ এড়ালো না।ছেলে এখন ওনার হাতের ধরা ছোঁয়ার বাহিরে। এই মূহর্তে মাথা গরম করবেন না বলে ঠিক করলেন। মনে মনে নতুন কোনো ফন্দি আটছেন তা ভালোই আন্দাজ করা গেলো। চুপচাপ ফুলের সঙ্গে সেখান থেকে চলে আসে। ফুল ওনাকে গেস্টরুমে নিয়ে যায়।
এতক্ষন যাবত এসকল মেলোড্রামা দেখছিলো অরি। বেচারি একদম নিশ্চুপ হয়ে দাড়িয়ে আছে। মনে হলো মাএই জি-বাংলা সিরিয়াল দেখলো।পারিবারিক ঝামেলায় অরি একদম নেই বললেই চলে। সে এসব ঝামেলা থেকে না জরিয়ে, দূরে থাকাকে শ্রেয় মনে করে। তবে জেবার ফিরে আসাতে মেয়েটা ভিষশন খুশি হলো। জেবা অরিকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে তার দিকে এগিয়ে গেলো। শক্ত করে জরিয়ে ধরলো বান্ধবীকে। একমাস তাদের সামনাসামনি দেখা হয়নি, দুজন দুজনকে প্রচুর মিস করেছে।অরিও সমানভাবে জরিয়ে ধরলো জেবাকে।দুজনে এতো জরাজরি দেখে একদম সহ্য হলোনা সারিমের। মেয়েদের এতো আলগা পিরিত তার সহ্য হয় না। কই তারো তো ফ্রেন্ড আছে। সারিম তো ওদের ছুতে দেওয়া দূর। পারলে ঘেষঁতে আসলে লাথি বসিয়ে দেয়।
জেবা অরিকে ছাড়তেই সারিম বলে উঠে।
_”চলে এলে দেখি। ”
সারিমের কথাটা কর্ণগোচর হতেই জেবা তার দিকে ফিরে তাকাঁলো। বেহুদা হেসে বলল।
_”সবিই আপনার কৃপায় সারিম বাবা। ”
জেবার কথাশুনে অরি ফিক করে হেসে দিলো। সারিম মুখ ভেঙ্গালো। মেয়েটা তাকে বাঙালি মায়েদের মতো বাবা বলল।জেবা কোনো ভাবে মায়ের সম্মানটা পেতে চাচ্ছে কিনা,ভাবল সারিম। আশ্চর্য। সে এই মেয়ের থেকে বয়সে কতো বড়।
_”তুমি কিন্তু এখন পটরপটর কথাবার্তা বলো জেবা। আমি তোমার বয়সে বড় হই।”
_”তো কি হয়েছে!বয়স একটা সংখ্যা মাএ। মায়ের চোখে সব সন্তানই সমান।আপনিও ঠিক তেমন আমার কাছে।একদম দুষ্ট ছেলে মায়ের মতো।মা আপনাকে নিয়ে প্রচুর গর্বিত। আপনি মাকে যা গিফ্ট দিলেন না কি বলবো।সেজন্য আমিও আপনার জন্য গিফ্ট এনেছি বাবা।গিফ্ট টা দেওয়ার পর আপনি খুশিতে একদম কেঁদে দিবেন। অবশ্য এর পুরো ক্রেডিট আপনারি।”
ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪৬
সারিম জেবার কথাশুনে বাকরুদ্ধ।বেচারা হাসবে নাকি কাদঁবে বুঝলো না।মেয়েটা দুষ্টু হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। এটা নিশ্চই সারিমের সাইডএফেক্ট। আহা মজা এসে গেলো। এখন তার বাপ এই হাফম্যান্টাল মেয়েকে সামলাক।
_”জ্বি আম্মা আপনি যদি গিফ্টটা কি একটু খুলে বলতেন।আমি খুশিতে কাদঁতে চাচ্ছিলাম আরকি।”
