Home প্রফেসর জিয়ান কায়সার প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩৫

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩৫

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩৫
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না

গাড়ির চাকা দুটো এসে থামলো এক বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের সামনে। পুরোটা পথ গাড়ির ভেতরের নীরবতা যেন জমে পাথর হয়ে ছিল। দুজনের একজনও একটা শব্দ উচ্চারণ করেনি। রিত্তিকা ভয়ে একদম চুপসে আছে—জিয়ানের এমন হুট করে চরম রেগে যাওয়া রূপটা এর আগে সে দেখেনি।
​গাড়ি থেকে নেমেই জিয়ান একপ্রকার হ্যাঁচকা টানে রিত্তিকার হাত ধরে ভেতরের দিকে হাঁটতে লাগলো। তার হাঁটার গতি এত দ্রুত যে রিত্তিকার প্রায় ছুটে চলতে হচ্ছে।

​“আহ! প্রফেসর সাহেব, লাগছে তো! হাতটা ছাড়ুন!” রিত্তিকা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠে বললো।
​কিন্তু জিয়ান যেন আজ বধির। কোনো কথা তার কানে পৌঁছালো না। নিবিড় গাম্ভীর্য নিয়ে সে সোজা লিফটে উঠে একটি নির্দিষ্ট ফ্লাটের সামনে এসে থামলো। ফ্লাটের দরজায় একপাশে কাঠের ওপর পিতল দিয়ে খোদাই করে নাম লেখা—‘রিশা’।
​পকেট থেকে চাবি বের করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেই জিয়ান এক ঝটকায় দরজা আটকে দিল। এরপর ঘুরে দাঁড়িয়ে একহাতে রিত্তিকার চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরলো। তার চোখে তখন আগুনের স্ফুলিঙ্গ।
__​“তোকে আমি কতবার বারণ করেছি, কোনো ছেলের সাথে কথা বলবি না?” জিয়ানের গলার স্বর নিচু কিন্তু ভয়াবহ রকম কঠোর। “তোকে বলেছিলাম না অন্য কোনো ছেলের সাথে কথা বললে তোর ঠোঁট সেলাই করে দেবো? আমার কথা কি তোর কানে যায় না, রিশা?”
​চোয়ালের হাড় যেন গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে রিত্তিকার। যন্ত্রণায় তার চোখে জল এসে গেল।

__“খুব লাগছে তো! ছাড়ুন আমাকে… প্লিজ ছাড়ুন!” রিত্তিকা জিয়ানের হাত সরানোর আকুল চেষ্টা করে কেঁদে ফেললো।
​জিয়ান আরও কিছুটা চাপ বাড়িয়ে দিল, যেন নিজের ভেতরের প্রবল হিংসা আর অধিকারবোধ সামলাতে পারছে না।
__“লাস্ট বার সতর্ক করছি তোকে! এরপর যদি কোনো ছেলের পাশেও তোকে দেখি, তবে সত্যি জা”নে মেরে ফেলবো!”
​রিত্তিকার চোখের জল টপটপ করে গাল বেয়ে পড়তে দেখে জিয়ানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। মুহূর্তের মধ্যে সে চোয়াল থেকে হাত সরিয়ে নিলো। রাগ আর অপরাধবোধের এক অদ্ভুত মিশ্রণে সে নিজের মাথার চুল দুহাতে খামচে ধরলো। নিজেকে শান্ত করতে না পেরে পাশের শক্ত দেয়ালে সজোরে একটা ঘুষি বসিয়ে দিল!

​’ধাম’ করে বিকট শব্দ হতেই রিত্তিকা ভয়ে দু-পা পিছিয়ে গেল। কাঁপতে থাকা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে জিয়ান যেন নিজের সংযম পুরোপুরি হারিয়ে ফেললো। সে এক পদক্ষেপে এগিয়ে এসে রিত্তিকাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরলো। রিত্তিকার দুটো হাত নিজের একহাতে বন্দি করে দেয়ালের ওপর চেপে রাখলো।
​কোনো প্রকার পূর্বাভাস ছাড়াই, জিয়ান তার নিজের বেপরোয়া ঠোঁট দুটি ডুবিয়ে দিল রিত্তিকার নরম ঠোঁটের মাঝে। তার এই চুম্বনে শান্ত কোনো অনুভূতি ছিল না, ছিল এক প্রবল অধিকারবোধ আর উগ্র মাদকতা। মাঝে মাঝেই সে রিত্তিকার ঠোঁটে হালকা কামড় বসিয়ে দিচ্ছিল।
​রিত্তিকা তার সমস্ত শক্তি দিয়ে জিয়ানের বুকে ধাক্কা দিতে লাগলো, নিজেকে ছাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলো। কিন্তু জিয়ানের সেই বলিষ্ঠ আর চওড়া দেহের সামনে তার চুড়ই-পাখির মতো ছটফটানি কোনো কাজে এলো না।
​বেশ কিছুক্ষণ পর, যখন রিত্তিকার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো, তখন জিয়ান ধীরে ধীরে তাকে ছেড়ে দিল। রিত্তিকা হাঁপাতে লাগলো, বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে।
​জিয়ান তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিল, “মাত্র পাঁচ মিনিটেই এত হাঁপাতে শুরু করেছ?”
​রিত্তিকা কোনোমতে নিজের নিঃশ্বাস সামলে তোতলানো গলায় বললো, “আ… আমি বাড়ি যাবো। দয়া করে আমায় দিয়ে আসুন।”

​জিয়ান একপা এগিয়ে এসে তার মুখের কাছে ঝুঁকে মৃদু কন্ঠে বললো, “হুশ! এত তাড়াতাড়ি যাওয়ার কী আছে? আর এত লজ্জা পাচ্ছো কেন বলো তো? তোমার বর তোমাকে ছুঁয়েছে, অন্য কেউ তো না।”
​“আমি বাড়ি যাবো!” রিত্তিকা জেদ ধরে বললো।
​জিয়ান চোখ ছোট করে তাকালো, “কেন, এখন সব ঠিক লাগছে তো?”
​“হ্যাঁ, তাই বলছি আমায় দিয়ে—”
​পুরো কথাটা শেষ করার অবকাশটুকুও দিল না জিয়ান। তার আগেই সে পুনরায় রিত্তিকার ঠোঁট আঁকড়ে ধরলো। তবে এবারের স্পর্শ আগের মতো উগ্র বা হিংস্র নয়—এবারে ছিল এক গভীর, মায়াবী আর আকুল তৃষ্ণা।
​ঠিক সেই মুহূর্তেই জিয়ানের পকেটে থাকা ফোনটা বিকট শব্দে বেজে উঠলো।
​শব্দে জিয়ানের ধ্যান ভাঙলো। সে বিরক্তি নিয়ে রিত্তিকাকে ছেড়ে দিল। ছাড়া পেয়েই রিত্তিকা একপ্রকার ছুটে গিয়ে ফ্লাটের বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো, খোলা বাতাসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো সে।
​এদিকে জিয়ান ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটার দিকে তাকিয়ে একদম হতাশ ভঙ্গিতে বিড়বিড় করে উঠলো,

___“ইয়া খোদা! সব ঠাডা কি আমার ওপরই পড়তে হয়? মাত্র দুটো চুমু খেয়েছিলাম, আর ফোন বেজে উঠলো!”
​ফোনটা কান দিয়ে বিরক্তিভরা গলায় বললো,
__“এই, তুই ফোন দেওয়ার আর সময় পাস না আরিফ?”
​ওপাশ থেকে আরিফ অবাক হয়ে বললো,
__“কেন রে ভাই? আমি আবার কী করলাম?”
​জিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
__“দেখছি তোকে আমি বাসরটা পর্যন্ত করতে দেবো না!”
​আরিফ হেসেই ফেললো, “কেন রে ভাই? আমি তোর কোন পাকা ধানে মই দিলাম বল তো?”
​“শালা, যখনই বউয়ের একটু কাছে যাই, ঠিক তখনই তোর ফোন আসে! কপালটাই খারাপ!” জিয়ান গজগজ করতে লাগলো।
​“ওহ আচ্ছা! এই ব্যাপার? হাহা!”
​“এখন বল, ফোন কেন দিয়েছিস?”
​আরিফ রসিকতা করে বললো, “কেন আবার? তোর সাথে একটু প্রেম-আলাপ করতে!”

​জিয়ান চরম বিরক্ত হয়ে বললো, “শালা ! যা নিজের হবু বউয়ের সাথে প্রেমালাপ করগে, আমার মাথা খাস না!” কথাটি বলেই খট করে কলটা কেটে দিল সে।
​ফোনটা পকেটে রেখে জিয়ান বেলকনির দিকে এগিয়ে গেল। বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা রিত্তিকার দিকে নজর পড়তেই তার মুখের বিরক্তি উবে গেল। রিত্তিকা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, লজ্জায় তার ফর্সা মুখটা পুরো লাল টকটকে হয়ে আছে।
​জিয়ান নিঃশব্দে পেছনে গিয়ে রিত্তিকাকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরলো। নিজের মুখটা গুঁজে দিল তার ঘাড়ের খাঁজে। জিয়ানের উষ্ণ শ্বাসের স্পর্শে রিত্তিকার পুরো শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ প্রবাহিত হয়ে গেল, সে শিউরে উঠলো।
​ঘাড়ে মুখ গুঁজেই জিয়ান মৃদু স্বরে বললো, “তুমি এখানে থাকো রিশা, আমি কিছুক্ষণের মধ্যে আসছি।”
​রিত্তিকা ঘুরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কোথায় যাবেন?”
​“খাবার নিয়ে আসতে।”

​“কিন্তু কেন? আমায় বরং বাসায় দিয়ে আসুন…”
​জিয়ান হালকা হেসে তার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো, “উঁহু! আজ আমরা এখানেই থাকবো।”
​রিত্তিকা চিন্তিত গলায় বললো, “কিন্তু বাসায় তো কেউ জানে না!
​“গতকালই তো গেলাম, আর আজ ভার্সিটি থেকে সোজা আপনার সাথে চলে আসলাম বাবা-মাকে কিছু না জানিয়ে! তারা এখন কী ভাববেন বলুন তো?” রিত্তিকার কণ্ঠে অভিমান।
​জিয়ান দুষ্টুমির হাসি হেসে বললো, “ভাববে তোমার হাসবেন্ড তোমাকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারছে না! ব্যাস, আর কোনো কথা নয়। তুমি চুপচাপ থাকো, আমি যাবো আর চট করে চলে আসবো।”
​রিত্তিকার কপালে পরম ভালোবাসায় আরেকটা চুমু এঁকে দিয়ে জিয়ান ফ্লাট থেকে বেরিয়ে গেল।

​অন্যদিকে—
​আহনাফ নিজের বাড়িতে আসার পর থেকেই এক তাণ্ডব শুরু করেছে। ঘরের দরজাজানলা বন্ধ করে পাগলের মতো সমস্ত জিনিসপত্র ভাঙচুর করছে সে। পুরো ঘরে কাঁচের টুকরো, বই-খাতা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।
​বাড়িতে সে এখন একেবারেই একা। যখন তার বয়স মাত্র দুই বছর, তখনই তার বাবা মারা যান। তাই বাবার ভালোবাসা কী জিনিস, তা সে কোনোদিন জানেনি। তার মা রুবিনা খাতুনই কত কষ্টে তাকে লালন-পালন করে এত বড় করেছেন।
​নিজের রুমের ফুলদানি, টেবিল ল্যাম্প উল্টে ফেলে দিয়ে আহনাফ ঘরের কোণায় মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। তার দু-চোখ বেয়ে অবিরত নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে।
​একসময় ছোট বাচ্চাদের মতো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সে বলল,
__”কেন আমার হয়ে থাকলি না বার্বি। ফিরে এসে তো তোকে নিজের করে পেতে চেয়েছিলাম। আমার সবটুকু দিয়ে ভালোবেসেও তোকে পেলাম না।আজ তুই অন্য কারোর ঘরের রানী আর আমি শূন্য ঘরের একলা পথিক..! ”

সে চিৎকার করে উঠলো, “ইয়া খোদা! তোমার কাছে তো আমি শুধুই আমার বার্বিকেই চেয়েছিলাম! এর থেকে তো বেশি কিছু চাইনি… তাহলে কেন দিলে না বলো? কেন দিলে না? আমি যে আর পারছি না ওকে ছাড়া বাঁচতে! যখনই বার্বিকে ওর ওই হাসবেন্ডের সাথে হাসি-মুখে দেখি, তখন যে আমার বুকটা ভেতর থেকে একদম ফেটে চৌচির হয়ে যায়!”
​বাড়িতে ঢুকেই ছেলের ঘর থেকে জিনিসপত্র ভাঙার বিকট শব্দ পেয়ে রুবিনা খাতুন পা চালিয়ে উপরে ছুটে এলেন। ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে ছেলের এই করুন অবস্থা দেখে তার বুকটা কেঁপে উঠলো। আহনাফ মেঝেতে বসে এলোমেলোভাবে কাঁদছে। রুবিনা খাতুন দ্রুত এগিয়ে এসে ছেলের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন।
__​“বাপ আমার! এভাবে কান্নাকাটি করছিস কেন? কী হয়েছে তোর? আমাকে বল!” রুবিনা খাতুন ব্যাকুল হয়ে উঠলেন।

​মাকে সামনে পেয়ে আহনাফ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরে তাঁর কোলে মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো, “মা! ও কেন আমার হলো না মা? কেন আমার তকদিরে আল্লাহ ওকে লিখলো না?”
​কাঁচের টুকরো ছড়ানো ঘরের মাঝে ছেলের এই কান্না দেখে রুবিনা খাতুনের মনটা হাহাকার করে উঠলো। তিনি ছেলের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করলেন, “কাকে লিখলো না বাপ? তুই কার কথা বলছিস? আমাকে পরিষ্কার করে বল না!”
​ছোট বাচ্চাদের মতো ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আহনাফ মায়ের কোলে মাথা রেখে আকুতি জানিয়ে বললো,
__ “ও মা… তুমি আমাকে আমার বার্বিকে এনে দাও না মা! প্লিজ এনে দাও! আমি যে ওকে আমার নিজের জীবনের চেয়েও অনেক বেশি ভালোবাসি মা… জানো আম্মু, যখন বার্বিকে ওর হাসবেন্ডের সাথে দেখি, তখন আমার বুকের ভেতরটা যেন জ্যান্ত পুড়ে ছাই হয়ে যায়! খুব কষ্ট হয় মা, খুব কষ্ট হয়…”

​রুবিনা খাতুন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার ছেলে যে ছোটবেলা থেকেই রিত্তিকাকে ভালোবেসে ‘বার্বি’ বলে ডাকে, তা তিনি ভালো করেই জানেন। কিন্তু এখন রিত্তিকা অন্য একজনের বিবাহিতা স্ত্রী!
​তিনি আকুল হয়ে বললেন, “বাপরে… তুই এসব কী বলছিস? এটা তো কোনোভাবেই আর সম্ভব নয় বাপ! সে তো এখন অন্য কারোর আমানত…”
​আহনাফ দিশেহারা হয়ে মায়ের হাত দুটো আঁকড়ে ধরলো, __“না মা! তুমি তো মা, তুমি বলো তুমি আমাকে এনে দেবে! বলো না আম্মু?”
​রুবিনা খাতুন কীভাবে এই পাগলপ্রায় ছেলেকে শান্ত করবেন তা ভেবে পেলেন না। ছেলের এই ব্যাকুলতা দেখে তাঁর চোখের কোণ দিয়েও পানি গড়িয়ে পড়লো। তিনি ছেলের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে মনকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “আচ্ছা বাপ… এনে দেবো তোকে। তুই শান্ত হ এবার…”
​আহনাফ যেন এক নিষ্পাপ শিশুর মতো মায়ের কথায় ভরসা পেল। চোখ দুটো মুছে বললো, “সত্যি বলছ মা?”

​“হ্যাঁ বাপ, সত্যি…”
​প্রচণ্ড কান্না আর মানসিক কষ্টে ক্লান্ত হয়ে পড়া আহনাফ মায়ের কোলেই মাথা রেখে কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লো।
​রুবিনা খাতুন পরনের ওড়নার আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছলেন। যে জিনিস কোনোদিন সম্ভব নয়, যা সম্পূর্ণ পাপ—তাঁর একমাত্র সন্তান আজ সেই অসম্ভব চাওয়াটার পেছনেই নিজের জীবনটাকে শেষ করে দিচ্ছে।
​এদিকে—
​জিয়ান ফ্লাট থেকে বের হওয়ার পরপরই রিত্তিকা তার মায়ের মোবাইলে ফোন দিল। সে জানিয়ে দিল যে জিয়ান তাকে আজ ভার্সিটি থেকে সোজা তাদের বাসায় নিয়ে এসেছে । মা একটু ইতস্তত করলেও জামাইয়ের কথা শুনে আর না করলেন না।
​ফোন রেখে রিত্তিকা ধীরপায়ে পুরো ফ্লাটটা ঘুরে দেখতে লাগলো। ফ্লাটের প্রতিটি কোণ অত্যন্ত সূক্ষ্ম রুচিবোধ দিয়ে সাজানো। আধুনিক আসবাবপত্র, দেয়ালের পেইন্টিং থেকে শুরু করে পর্দার রং—সবকিছুতেই যেন এক স্নিগ্ধ অভিজাত্যের ছোঁয়া।

​পরদিন সকাল—
​ভোরের স্নিগ্ধ আলো এসে পড়েছে বেডরুমের জানালার গা বেয়ে। ঘরের ভেতর এক মিষ্টি শীতল আবহাওয়া।
​বিছানায় জিয়ানের চওড়া বুকের ওপর পরম নিশ্চিন্তে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে আছে রিত্তিকা। তার এক হাত জিয়ানের কোমরে জড়ানো, আর রিত্তিকার সুবাসিত চুলগুলো ছড়িয়ে আছে জিয়ানের পুরো বুক জুড়ে।
​সকালের নরম রোদ এসে রিত্তিকার মুখে পড়তেই সে হালকা নড়েচড়ে উঠলো। রিত্তিকার এই সামান্য নড়াচড়াতেই জিয়ানের ঘুম ভেঙে গেল। সে চোখ খুলে নিচে তাকালো। নিজের বুকের ওপর গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা মায়াবী মুখটার দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটের কোণে ভালোবাসার মিষ্টি হাসি ফুটে উঠলো।
​জিয়ান ঝুঁকে রিত্তিকার কপালে মিষ্টি করে একটা চুমু দিয়ে শান্ত গলায় বললো,

__ “গুড মর্নিং, রিশা…”
​রিত্তিকা ঘুমের ঘোরেই বুজে থাকা চোখে একটা অস্পষ্ট আওয়াজ করলো, “হু…”
​জিয়ান রিত্তিকার গালে হাত বুলে দিয়ে বললো, “ওঠো সোনা, সাতটা বেজে গেছে কিন্তু।”
​রিত্তিকা জিয়ানের বুকে আরও একটু শক্ত করে মুখ গুঁজে জড়িয়ে ধরে আধো-ভাঙা গলায় আবদার করলো, “নাহ… আমি আরও ঘুমাবো!”
​জিয়ান মুচকি হাসলো। সে ধীরে ধীরে রিত্তিকাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজে উঠে দাঁড়ালো। ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বের হয়ে এলো। এসে দেখে রিত্তিকা এখনো আগের মতোই কাথা জড়িয়ে ঘুমে মগ্ন।
​আজ ভার্সিটিতে রিত্তিকার খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ক্লাস টেস্ট পরীক্ষা আছে। জিয়ানের ইচ্ছে করছিল মেয়েটাকে এভাবেই সারাদিন ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে , কিন্তু তার পড়ালেখার ক্ষতি সে হতে দেবে না।
​জিয়ান ধীরপায়ে গিয়ে বিছানার পাশে বসলো। রিত্তিকার পিঠে হাত রেখে আলতো করে ডেকে উঠলো, “রিশা… সোনা আমার, ওঠো।”

​রিত্তিকা চোখ না খুলেই বালিশে মুখ গুঁজে বিড়বিড় করলো, “না… ঘুমাবো…”
​জিয়ান তার কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো, “আজ কিন্তু ভার্সিটিতে তোমার টেস্ট পরীক্ষা আছে, ম্যাডাম!”
​’টেস্ট পরীক্ষা’ শব্দটা কানে পৌঁছাতেই রিত্তিকার ঘুমের ঘোর যেন এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল! সে ধড়ফড় করে চোখ খুলে বিছানায় উঠে বসলো।

​জিয়ান মুচকি হেসে রিত্তিকাকে সযত্নে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিলো। তারপর সোজা ওয়াশরুমে নিয়ে গিয়ে তাকে একটা টুলের ওপর বসিয়ে দিল। জিয়ান নিজেই টুথপেস্ট লাগিয়ে ব্রাশটা রিত্তিকার হাতে দিল, মুখ ধুইয়ে তোয়ালে দিয়ে পরম যত্বে জল মুছে দিল।
​আবারও তাকে আলতো করে কোলে তুলে এনে বেডরুমের ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসালো। জিয়ান নিজের হাতে চিরুনি নিয়ে রিত্তিকার সিল্কি চুলগুলো খুব সাবধানে আঁচড়াতে লাগলো। তারপর অত্যন্ত দক্ষ হাতে চুলগুলোর একটা সুন্দর বেনি বা বিনুনি বানিয়ে দিল। জিয়ান এখন আগের চেয়ে অনেক সুন্দর করে চুল বেনি করতে শিখে গেছে!
​বেনি করা শেষ হলে, জিয়ান ড্রয়ার থেকে ছোট্ট দুটো মুক্তোর দুল বের করে খুব সাবধানে রিত্তিকার দুটো কানে পরিয়ে দিল।

​রিত্তিকা আয়নার দিকে তাকিয়ে আর জিয়ানের প্রতিটি কাজ মুগ্ধ নয়নে দেখতে লাগলো। তার বুকের ভেতরটা এক অজানা অনুভূতির জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে।
​এই সেই প্রফেসর জিয়ান সাহেব? যে একদিন তাকে চরম অপছন্দ করতো, অপমান করতো, এমনকি ডিভোর্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত পর্যন্ত নিয়ে নিয়েছিল! আর আজ… সেই মানুষটাই তাকে নিজের হাতে এভাবে বাচ্চার মতো যত্ন করছে, নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে আগলে রাখছে!

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩৪

​রিত্তিকার চোখ দুটো খুশিতে ছলছল করে উঠলো। সে আয়নার মাধ্যমেই জিয়ানের দিকে তাকালো, আর জিয়ানও আয়নায় রিত্তিকার প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি একটা হাসি উপহার দিল।

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩৬