Home ফিরে গেছে কত আলো ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪৫

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪৫

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪৫
শানজানা আলম

তাহিরা বেগম সকালে অথৈ এর বাবাকে চা দিতে দিতে বললেন, রাতে অথৈ ফোন করেছিল।
অথৈ এর বাবা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না।
তাহিরা বেগম বললেন, ভালো আছে মনে হলো, রেস্টুরেন্টে খেতে নেমেছে।
অথৈ এর বাবা বললেন, ভালো থাকবে। নিজের বোঝাপড়ায় বিয়ে করেছে। সেটা নিয়ে তো সমস্যা না। সমস্যা হচ্ছে মানুষ নানান কথা বলবে, ঐশি মামনি কষ্ট পাবে। দুই বোনের সম্পর্ক চিরকালের মতন শেষ হয়ে গেল।
তাহিরা বেগম বললেন, সেটা তো জানি, মনটাও মানে না। অথৈ কোনোদিন আমার কাছ ছাড়া হয় নি।
অথৈ এর বাবা বললেন, সাদিকের সাথে বিয়ে হলে এতদিনে দূরে চলে যেত।

তাহিরা বেগম বললেন,কয়েক ঘন্টার মধ্যে সব ওলট-পালট হয়ে গেল।
অথৈ কোনো বিয়েতে রাজী হলো না এহসানের জন্য! এত মানুষ থাকতে ওকে পছন্দ হলো!
অথৈ এর বাবা বললেন, ফোনে বেশি কথা বলার দরকার নেই। তোমাকে নিষেধ করে তো লাভ নেই, মেয়ের সাথে কথা বলবেই। কিন্তু ও যা করেছে, এরপরে ওর সাথে আমার পক্ষে কথা বলা ক্ষমা করা সম্ভব না।
তাহিরা বেগম বললেন, আমি ফোন করিনি। ও করেছিল, তাই কথা বলেছি।
ঐশি ফোন করেছিল?
এখনো না।
-আচ্ছা, আপাতত ফোন থেকে দূরে থাকো, কোনো আত্মীয় স্বজন যেন টের না পায়। নিজের বোনদের আবার বলে ফেলো না। এসব কেচ্ছা কাহিনির মতন ছড়াবে।
-কতদিন চেপে রাখবে?
-যতদিন পারা যায়!
অথৈ এর বাবা সহজ হলেন না। তাহিরা বেগম নিঃশ্বাস ফেললেন।

অফিসে পৌঁছে কাজ গুছিয়ে এহসান ভাইয়াকে ফোন করল। এগারোটার মত বাজে। এহসানের ফোন দেখে
ভাইয়া রিসিভ করলেন না। এহসান টেক্সট করল, ইটস আর্জেন্ট ভাইয়া, ভুঁইয়া পাড়ার জায়গাটা সেল দিতে চাই। কথা বলা জরুরি। টেক্সট দেখে
এহসানের ভাইয়া কল করলেন নিজে থেকেই।
-হ্যা কি হয়েছে? কোন জায়গা সেল করবি?
-ভাইয়া, ভুইয়া পাড়ার জায়গাটা আমি আমার অংশ সেল দিব। সুমন ভাই আর তুমি দুজন আছ, যে কিনবে আমাকে জানাও। মার্কেট প্রাইস ত্রিশ লাখের মতন আসবে।
-এহসান, এই জায়গা কেউ সেল করে? যা মন চায় তাই করতেছিস? নিজের ধ্বংস নিজে করতেছিস! এত ব্রাইট একটা ছেলে তুই! কেন এমন শুরু করেছিস!

-ভাইয়া, আমি কিছু দেনায় আছি। তাছাড়া অথৈকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছি, ওর দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করার জন্য সময় নিয়েছি মাসখানেক। সেটার ব্যবস্থা আমাকে করতে হবে। আমি আর কোথায় টাকা পাব। পৈতৃক জমি সেল করা অনেক ঝামেলার বিষয়। এই জায়গাটা সুমন ভাই একবার বলেছিলেন, উনি একা পেলে মার্কেট করবেন।
-তুই ছাড়বি শুনলে তো ও ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমি একা কিভাবে রাখব! এত ক্যাশ কই পাব। আমার কাছে এত টাকা নেই।

-ভাইয়া, আমার তোমাকে জানানো দরকার আগে, জানালাম। তুমি রাখার চেষ্টা করতে পারলে করো। নাহলে পরে ভেবে দেখব সুমন ভাইকে নক করা যায় কিনা।
– এহসান, জায়গাটা সুমনকে দিস না। আমি দেখি কি করা যায়। তোর এই মুহুর্তে কত টাকা হলে তুই দেনা থেকে উঠতে পারবি?
এহসান চিন্তা করল, অথৈ এর দেনমোহর ধরেছে পনের লাখ, ইচ্ছে করেই ঐশির চাইতে পাঁচ লাখ টাকা বেশি ধরেছে, এখনকার বাজার হিসেবে গয়না কিনতে হবে। টাকা দিলেও হতো, কিন্তু গোল্ডের দাম বাড়তি হয় সব সময়, গয়না কিনলেই ভালো হবে। সাড়ে তিন লাখ টাকা লোন আছে, অথৈ এর জন্য কেনাকাটা করতেও দুই আড়াইলাখ টাকা মিনিমাম লাগবে।
চিন্তা করে এহসান বলল, ভাইয়া আমার আসলে উপায় নেই, বিশ লাখ টাকার মতন প্রয়োজন।
বাকি দশলাখ রেখে দিব আপাতত, পরে সুবিধামত জায়গা পেলে বায়না করতে পারব।
এহসানের ভাইয়া বললেন, ঠিক আছে, দেখি কি করা যায়।

এহসানের ভাইয়া বাসায় ফিরে মায়ের সাথে বসলেন।
আম্মা, এহসান তো অথৈকে নিয়ে আসছে বিয়ে করে।
এহসানের আম্মা বললেন, হুম, ফোন করছিল তো আমাকে।
ভাইয়া জানতে চাইলেন, তা আপনাকে যেতে বলে নি?
বলসে সব গুছানো হলে নিবে- এহসানের মা বললেন ঠিকই, তবে তিনি খুশি হন নি। তিনি ভেবেছিলেন, এহসান এসে তাকে নিয়ে যাবে আজকে। নতুন বউ নিয়ে আসছে, শেখানো পড়ানো দরকার আছে৷ নতুন বউকে শোকরানার নামাজ পড়ানো দরকার আছে, কে জানে, পড়ে কিনা! এহসান তাকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে কোনো কথাই বলে নি। বড় ছেলের কাছে এহসানের মুখ রাখতে মিথ্যা কথা বললেন।

-মা, আমি বলতেছি, মেয়েটা ভালো হবে না। কালকে যে মেয়েকে আর আজকে তার দেনমোহর পরিশোধে জমি বেচার কথা বলতেছে এহসান। ভূঁইয়া পাড়ায় একটা জমি রাখছিলাম সুমনের সাথে, ইচ্ছা ছিল সুমনের থেকে আমরা দুই ভাই কিনে রাখব। তা এখন এহসান এইটা বেচতে চায়, আমাকে বলসে, আমি না কিনলে সুমনকে বলবে, সুমনের তো টাকার অভাব নাই৷ সে তো লাফ দিয়ে কিনবে, শেষে আমারও ছাড়তে হবে।
সুমন এহসানদের চাচাতো ভাই, এলাকায় কয়েকটা বিজনেস করে, ক্যাশ টাকা আছে আছে হাতে।
এহসানের মা বললেন, আমি কি করব, তোমরা বড় হয়ে গেছ, এহসান তো কাউরে গোণে না। আর দেনমোহর তো দেওয়া লাগবে ওরই, লাগবে না? আমার তো সেই দিন নাই, তোমার আব্বাও নাই। ওর ব্যবস্থা ওরই করা লাগবে।

ভাবী এসে বললেন, আম্মা, আপনি তো এহসানকে বিয়েতে না করেন নাই, বরং আপনি সায় দিছেন।
এহসানের মা বললেন, দিসি, এহসান ভালো থাকুক এজন্য বলসি, আমার ছেলে গেছে অথৈ কে আনতে, না নিয়ে ফিরে আসলে ওর মান থাকত!
-আনসে, এখন জায়গা জমি বেচা শুরু হইছে, অপয়া মেয়ে কোথাকার!- ভাবী রাগ লুকাতে চেষ্টা করেন না।
এহসানের ভাইয়া চিন্তা ভাবনা করে এহসানকে ফোন দিয়ে বললেন, আমি রাখব, কিন্তু এখন বিশ লাখ দিব, ছয় মাস পরে বাকি দশলাখ নিস।
এহসান বলল, ভাইয়া, আমার নগদ ত্রিশ লাখ টাকাই প্রয়োজন হবে। কারন হুট করে কোথাও শেয়ার পেলে আমি রাখার চেষ্টা করব। তখন তোমার জন্য চাপ হবে।
এহসান জানে, এখন তার দরকার বলে বিশ লাখে ভাইয়া জমি নিতে চাইবে, এহসানের প্রয়োজনের সময় বাকি টাকা পাওয়া যাবে না। এহসানও জোর করতে পারবে না। বৈষয়িক বিষয়ে সোজাসাপটা কথা না বললে, সেখানে সম্পর্ক নষ্ট হবে।
ভাইয়া বললেন, সকালেই তো বললি, তোর বিশ লাখ টাকা হলে চলবে।

-সেটা এখনো বলেছি ভাইয়া। আমি একটা প্রোপার্টি সেল করতেছি, সেটার বিপরীতে কিছু করার প্রস্তুতি রাখতে হবে আমাকে।
-এত ব্যবসায়িক চিন্তা ভাবনা নিজেদের মধ্যে করলে তো হয় না এহসান। তা ছাড়া তুই তো আগে বলিস নাই এই জায়গা সেল করবি! তাহলে আমার প্রিপারেশন থাকতো।
-ভাইয়া, আমার সময়টা ভালো যাচ্ছে না, জানোই তো, আমি তোমাকে জোর করতেছি না, আমি সুমন ভাইকে দিয়ে দিই। না হয় দুইজন মিলে রাখো। পুরোটা অর্ধেক হয়ে থাকুক।
এহসানের ভাইয়া সন্দিহান হয়ে বললেন, সুমনকে ফোন করেছিস?
-এখনো করি নি।
-ঠিক আছে, দেখি তোর ভাবীর সাথে কথা বলে। ম্যানেজ করতে পারলে আমি টাকা ট্রান্সফার করে দিচ্ছি৷ একদিন ছুটির দিনে গিয়ে রেজিস্ট্রি দিয়ে আসবি।
-আচ্ছা ভাইয়া, তুমি যেদিন যেতে চাও, সেদিনই যাব। অথৈকেও তো বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে। আম্মাকে নিয়ে আসব কয়েকটা দিনের জন্য, একটু গোছানো হোক।

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪৪

– ঠিক আছে।
এহসানের ভাইয়া টাকাটা পাঠিয়ে দিলেন সন্ধ্যার দিকে।
টাকা পাওয়ার পরে এহসানের মাথা থেকে বোঝা নামল। দেনমোহর পরিশোধ না করা অবধি এহসান শান্তি পাচ্ছিল না। ঐশির বিষয়টি এত নোংরামির পর্যায়ে গেছে, সবকিছু সুন্দর ভাবে না গুছিয়ে অথৈ এর কাছে যেতে দ্বিধা লাগছিল। ভালো একটা জায়গা ছাড়তে হলো, তা যতই ভালো হোক, অথৈ এর জন্য নিশ্চয়ই ছাড়া যায়। ভাগ্যে থাকলে এর চাইতে ভালো কিছু নিশ্চয়ই এহসান করতে পারবে।
এহসানের বাসায় ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হলো।

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪৬