Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৬

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৬

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৬
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

কাকডাকা ভোর । ফজরের নামাজ পরে সবে সবে মুসল্লীরা মসজিদ থেকে ঘরে ফিরছে । দিনের আলো সেরকম ভাবে ফোটেনি এখনো । তিতির বাগানে এসেছে । রাতে ওভাবে ঈশানের ছবি বুকে আগলে, কাঁদতে কাঁদতে কখন চোখ লেগে এসেছিলো টেরই পায় নি মেয়েটা। সকালে ঘুম ভেঙেছে সবার আগেই। আজকে বাড়ির কেউ-ই ওঠেনি এখনো। চন্দ্রা দেওয়ান বাদে। সে বরাবরই আজানের সঙ্গে সঙ্গে ওঠে। সদর দরজা খুলে বের হওয়ার সময়, বৃদ্ধার ঘর থেকে তেলওয়াতের আওয়াজ কানে আসছিলো। রাতের দিকে একপশলা বৃষ্টি হয়েছে বোধহয়। ঘাসগুলো ভেঁজা ভেঁজা। মোমের মতো ন গ্ন পা দুখানা ছুঁয়ে যাচ্ছে সেই সিক্ত সবুজ ঘাসগুলো । ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। তিতির মাথার ওপরের ওড়নাখানা নামিয়ে দিলো। খোপা আলগা করতেই ঝরঝরে চুলগুলো পিঠে ছড়িয়ে গেলো।

তমা গোটা রাতে চোখের পাতা এক করতে পারে নি। সকাল হওয়ার অপেক্ষাতেই বোধহয় ছিলো। দিনের আলো ফুটতেই বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। তিতির বরাবরই ভোর ভোরই ঘুম থেকে ওঠে। তবে বারান্দা থেকে ওদিকে দেওয়ান বাড়ির সীমানায় তিতিরকে একা একা বারান্দায় পায়চারি করতে দেখে, আর অপেক্ষা করলো না মেয়েটা। বিছানা থেকে ওড়না টা গায়ে জড়িয়ে ছুটে এলো এদিকটায়। তিতির সবেই বসেছে বেতের চেয়ার টায়। মাথার ওপরের আমগাছ টা ভর্তি হয়ে আছে ফলে। পাকা আমের ঘ্রান ভেসে আসছে নাকে। ওদিকের ছোট্ট বেতের গেটটা খুলে তমাকে একপ্রকার ছুটেই আসতে দেখা গেলো। অবাকই হলো মেয়েটা। এতো সকাল বেলা ঘুম থেকে ওঠার মানুষ তমা একদমই নয়। তমা হাঁপাতে হাঁপাতে সামনে এসে দাঁড়ালো একপ্রকার। তিতির ইশারা করতেই পাশের চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিয়ে একপ্রকার হড়বড়িয়ে বলে উঠলো,

—’ তোকে আমার কিছু বলার আছে, বার্বি। ‘
—’ হাঁপাচ্ছিস তো। রিল্যাক্স হ, শ্বাস নে আগে। শুনছি তারপর।’
তমা শ্বাস টানে জোরে জোরে। তারপর দ্রুত গলায় বলে,
—’ ডি ভোর্স লেটার টা…’
পথিমধ্যেই তমাকে থামিয়ে দিলো মেয়েটা। মলিন মুখ করে বললো,
—’ ওটা নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগবে না আমার এখন। থাকুক।’
দু’দিকে মাথা নাড়লো তমা। এতক্ষণে খানিকটা শান্ত হয়েছে সে।
—’ ওটা বড় ভাইয়া পাঠায়নি। ‘
—’ জানি আমি । ‘
ভ্রু কোঁচকায় তমা। গতকাল উকিল সাহেব বাড়িতে এসেছিলো। এসব খবর মায়ের থেকে পেয়েছে সে। তিতিরের সাথে সামনা-সামনি কথা বলবে বিধায়, তখন কল বা মেসেজও করেনি। তমা ব্যাস্ত গলায় বললো,
—’ কি করে জানলি ? মা তো বললো সব নাকি ভাইয়ারই লেখা। সাক্ষর, টাইপিং, স্টাইল।’
—’ তো? ‘
—’ তোর কেনো এটা মনে হলো যে, ভাইয়া পাঠায়নি ওটা? ‘
তমা এতক্ষণে খানিকটা আগ্রহী হয়েছে তিতিরের মন বুঝতে। ঈশানের সুখবর টা না হয় ধীরেসুস্থেই দেবে। তিতির আনমনা সুরে বললো,

—’ ছোট ছোট কিছু জিনিস অন্যদের নজর এড়িয়ে গেলেও, আমার যায়নি, তমা। ডি ভোর্স লেটারে ঈশান ভাইয়ের যে সাক্ষর ছিলো, সেটা দেখে টের পেয়েছি আমি। ‘
—’ সাক্ষর? কেনো সেম ছিলো না? ‘
—’ ছিলো। সবই একই রকম ছিলো। ‘
—’ তাহলে? ‘
সোজা হয়ে বসলো মেয়েটা। তিতিরও সোজা হলো। দু হাঁটুর ওপর কনুই ভর করে সামান্য ঝুঁকে এসে উদাস গলায় বললো,
—’ এলফাবেটের গড়মিল। যে-ই সাক্ষর করেছে, ঈশান ভাই নিজের ইংরেজি নামে, আদতে কোন অক্ষর ব্যবহার করে,তা সে জানে না। উহু, জানে না বললে ভুল হবে। এতো কিছু যখন নকল করতে পেরেছে,ওটাও জানতো। তবে সম্ভবত অভ্যাস বশত ভুল যাকে বলে আরকি। ‘
তমা’র বোধগম্য হয় না কিছুই। উত্তেজিত হয়ে এগিয়ে নিয়ে আসে চেয়ারটা।

—’ বুঝলাম না।’
তিতির ভ্রু জোড়া উঁচিয়ে শুধায়,
—’ ঈশান শব্দের বানান কি? ‘
—’ E S H A N? ‘
হাসলো তিতির। পুনরায় গা এলিয়ে দিয়ে বললো,
—‘ আমি যদি বলি’ I S H A A N. এভাবে লিখলে? ‘
—’ একই তো কথা। ‘
—’ উচ্চারণ একই হতে পারে। বানান দু’টোই সঠিক। যে যার নাম যেভাবে ব্যবহার করে আরকি। তাদের চয়েজ। তাই নয় কি? তুই ঈশান বানান যেভাবে বললি, তার সাথে আমার টা মিললো না কিন্তু। পার্থক্য বেশি নয় কিন্তু। একটা অক্ষরের। E আর I. যেই কাজটা করেছে, ঝোঁকের বশে এখানেই ঝামেলা টা করে ফেলেছে। ঈশান ভাই নিজের নামের বানান লেখে আমি যেভাবে বললাম। অথচ কাগজে সই করা ছিলো তুই যেভাবে বললি। অর্থাৎ ESHAN. এভাবে। একটা মানুষ নিজের নামের সই কখনো গোলমাল করবে না কক্ষনো না।’
তমা হত-বিহবল হয়ে তাকিয়ে রইলো। মুখটা হাঁ হয়ে গিয়েছে। চোখ গোলগোল করে আশ্চর্য গলায় বললো,

—’ তুই কি ডিটেকটিভ, ভাই? ওরকম একটা মূহুর্তে এতো সূক্ষ্ম বিষয়টা খেয়াল করলি কি করে? তা-ও নিজের নাম নয়। ‘
একপেশে হাসলো তিতির।
—’ নিজের নয় কোথায়? আমারই তো। ঈশান আরশাদ দেওয়ান পুরোটা আমার। ওইটুকু আমি খেয়াল করবো না? বিয়ের কাগজে ওনার সাক্ষর প্রথম দেখেছিলাম আমি। একটা মেয়ে ওই মূহুর্ত এ জীবনে ভুলবে? আমিও ভুলিনি।’
তমা আপ্লুত হলো বুঝি। তবে আর অন্য প্রসঙ্গ টানলো না। ঘনিয়ে এসে বসলো। চীতল গলায় বললো,
—’ কথা বলতে চাস বড় ভাইয়ার সাথে? ‘
—’ চাইবো না? তড়পাচ্ছি রীতিমতো। শ্বাস নিতে পারছি না। ‘
—’ বড় ভাইয়া জেলে নেই, বার্বি। ইভেন ছিলোও না কখনো।’
দুই ভ্রুর মাঝখানে সরু ভাজ পরলো মেয়েটার। বোনের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই তমা সতর্কতা বশত আশেপাশে নজর বুলালো একটাবার। তারপর গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললো,

—’ কাল রাতে বড় ভাইয়া আমাকে ফোন দিয়েছিলো। ‘
চক্ষু ছানাবড়া হলো মেয়েটার। ব্যাস্ত হলো। অশ্রুসিক্ত হলো তৎক্ষনাৎ।
—’ কখন? কি বললো? কেমন আছে সে? আমাকে কেনো কল করলো না? রেগে আছে আমার ওপর? জিজ্ঞেস করিস নি, কি করেছি আমি? কেনো আমার সাথে কথা বলছে না সে? করিস নি? ‘
বোনের কাঁধে হাত রেখে শান্ত হতে ইশারা করলো তমা।
—’ এতগুলো প্রশ্ন একসাথে করলে কোনটার জবাব দেবো। কোন প্রশ্নের উত্তর আগে চাস?’
—’ কেমন আছে উনি? ‘
এ যাত্রায় তমার নিজের চোখেই পানি চলে এলো। এতো এতো প্রশ্ন, সন্দেহ, বিপদ,মিথ্যা অপবাদ সবের ভিড়ে, মেয়েটা এখনো স্বামী কেমন আছে– সেই চিন্তায় মরিয়া হয়ে আছে। তমা শান্তনা দিয়ে বললো,
—’ ভালো আছে। তবে…’
—’ তবে? ‘
—’ যা হচ্ছে কারোর একজনের পরিকল্পনা মাফিক হচ্ছে। পরিকল্পনার একপাশে বড় ভাইয়াও সামিল। কিন্তু তোর সাথে বা পরিবারের সাথে যোগাযোগ করার কোনো উপায়ই নেই। তোদের বাড়ির সবার ফোন ইয়াজ মির্জা অনেক আগে নিজের কবজায় নিয়ে নিয়েছে। সব ফোন ট্র্যাক করা। যে কারণে বড় ভাইয়া চাইলেও যোগাযোগ করতে পারছে না তোর সাথে। ‘
অবাক হয়ে সবটা শুনলো তিতির৷

—’ ইয়াজ মির্জা! কিন্তু তাতে উনি লুকিয়ে কেনো? ওনার নামে এসব এলিগেশন কে দিচ্ছে?’
—’ হয়তো ইয়াজ মির্জাই। ‘
—’ এখন তোর ভাই কোথায় আছে। উনি না আসতে পারলো, আমি তো যেতে পারি। আমি যাবো ওনার কাছে। ‘
তমা গতরাতে ঈশানের সাথে বলা সব কথাগুলো খুলে বললো একে একে। ঈশান কি কি বলেছে সবটা। কতটা কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তিতিরের বাড়ি থেকে বের হওয়ার, সেটাও পইপই করে বুঝিয়ে দিলো সে।
পাতা ঝরার মৌসুমি নয় এখন। তবুও এই অসময়ে দমকা বাতাসে ঝরঝর করে ঝরছে ওদিককার মেহগনি গাছের পাতা। বাগানের এ দিকটা, যেদিকে তিতির তমা বসে আছে, পায়ের নিচ দিয়ে ভরে গিয়েছে সেই পাতায়। মালি এসে পরিষ্কার করবে বেলা হলে। তিতির ঝুঁকে তারই একটা পাতা হাতে তুলে নিলো। নিচু হতেই ঝরঝর করে ঝরা পাতার মতো, ঝরে পরলো মেয়েটার চোখের নোনাজল। চাপা গলায় বললো,
—’ আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, তমা। এরকম ভাবে না বলে চলে যেতে হলো ওনাকে। এতোদিনের দুরত্ব। অথচ কোনো বিদায় ছাড়াই। এই জিনিসের যে কতটা যন্ত্রনা। কি করে বোঝাই তোকে। ‘

ইয়াজ মির্জা ভোররাতে ঢাকা ত্যাগ করেছে, খবরটা পেতেই ঈশান- অমিত বেড়িয়েছে দু’জনেই। পুরান ঢাকা থেকে কাজল কে উদ্ধার করে, মিতুকেও সঙ্গে নিয়ে আসবে। এই পরিকল্পনা আজকে তার। সাজিদের বরখাস্ত নোটিস আচমকাই তুলে নেওয়া হয়েছে ওপর মহল থেকে। গতরাতেই সে সিলেট পৌছেছে। ঈশান একদিক থেকে তো নিশ্চিন্ত। সাজিদ, নাঈম রা থাকলে তার বাড়ির মানুষদের নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না। তবে তার বাবা, চাচারা যে গত দু’দিন যাবৎ ঢাকায় এসে কোর্টকাচারি তে ঘুরছে, তার জামিনের জন্য এটা কানে এসেছে তার। কিন্তু দেখা করার উপায় নেই আর না তো সত্যিটা জানানোর। এতে সতর্ক হয়ে যাবে শত্রুপক্ষ। শহরের জ্যাম, ভিরভাট্টা ঠেলে এগিয়ে চলছে ঈশানের গাড়ি। পরিত্যাক্ত যে ডেরায় কাজল কে রাখা হয়েছে, তার সন্ধান পেয়েছে খানিক আগেই। অমিতকে নিয়ে যাচ্ছে সেখানেই। ড্রাইভ করছে অমিত, পাশেই কপালে আঙুল ঠেকিয়ে চিন্তিত মুখে বসা ঈশান। শহর ছেড়ে এসেছে। হাইরোডের আশেপাশে এখন আর জনমানুষের আস্তানা নেই। ধুধু করা জমি আর জমি। রোদ ওঠেনি, তবে ভ্যাপসা গরম ছেড়েছে। এসির নিচ থেকে এক সেকেন্ড সরার উপায় নেই। এর মধ্যে সে যাচ্ছে যুদ্ধ করতে! অমিত নিজেও বেশ উত্তেজিতই হয়ে আছে। ইয়াজ মির্জা নিশ্চয় যেন মতে কাজল কে রাখেনি। ওখানে একদফা হৈ-হাঙ্গামা হবেই। অবশ্য সে প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে তারা। তারা দু’জন বললে ভুল হবে। তাদের আরও লোকজন এরইমধ্যে সম্ভবত পৌছেও গিয়েছে আশেপাশে!

চোখবুঁজে কি সব হিসেব করার মাঝেই ভাইব্রেট করে উঠলো ঈশানের ফোনখানা। সিটে মাথা এলিয়ে রাখা অবস্থাতেই হাত চলে গেলো পকেটে। ফোন বের করে মুখের সামনে এনে ধরতেই সোজা হয়ে বসলো। বিরবির করে উঠলো। ফোনটা এসেছে তমার নাম্বার থেকে। তবে এবার যে ফোনের ওপাশের ব্যাক্তিটি তমা নয়। তিতির। সেটা বুঝতে একটুও দেরি হলো না তার। বুকটা চিনচিন করে উঠলো। হাসলো একপেশে। ফোনটা রিসিভ করে কানে ঠেকিয়ে, জোরে শ্বাস নিলো একটা। বুকটা ধুকপুক করছে। হৃদপিণ্ড ছুটছে ঘোরার বেগে। সিটে মাথা ঠেকিয়ে, কেমন শান্তির শ্বাস টানলো ছেলেটা। ওপাশের মানুষটি চুপ করে আছে একই ভাবে।
আছরের আজান পরছে। ঈশানের এপাশে পথের আশেপাশে কোনো মসজিদ না থাকার সে ধ্বনি শুনতে না পেলেও, ফোনের ওপাশে তাদের বাড়ির পাশের মসজিদের শব্দ পেলো স্পষ্ট ভাবে। কতদিন পর!

এই আজানের শব্দটাও ভীষন নিজের নিজের লাগছে। দীর্ঘক্ষণ একটা শব্দও উচ্চারন করলো না কেউ৷ তবে ঈশানের ঘন নিঃশ্বাস আর ওপাশ থেকে তিতিরের চাপা কান্না। দু’জনেই অনূভব করে যাচ্ছে। ঈশান অসহায় হাসলো, কত বড় একটা কাজে যাচ্ছে, কত বিপদ তাতে। এক দু’টো গুলি অনায়াসে ঢুকে যেতে পারে তার দেহের নরম মাংসপিন্ডে। ঝাঁঝড়া করে দিতে পারে বুকটা। সবই জানা কথা। তারপরও একটা বারের জন্যই তো হৃদস্পন্ড দ্রুত হয়নি তার! মনেই পরছে না সে-সব কিছু। কিন্তু এই ফোন কল টা পাওয়ার পর! তিতির কিন্তু একটা শব্দও উচ্চারন করেনি, আর না তো একবারও নিশ্চিত হয়ে বলেছে সে আদৌ তিতির কি-না। কিন্তু ঈশানের অবচেতন মন, ঠিক বুঝে নিয়েছে। আর বোঝা মাত্রই ঝড় তুলে ফেলেছে বুকের বাঁ পাশটায়।
একে অপরকে স্পর্শ না করে, চোখের দেখা না দেখে, এমনকি কোনো শব্দও না শুনে– শুধুমাত্র অস্ত্বিত্ব অনূভব করেই, বুকের মধ্যে যে উথাল-পাতাল হচ্ছে। এর নামই কি ভালোবাসা নয়? কে বলে স্পর্শে ভালোবাসা বাড়ে? চোখের আড়াল হলে মনের আড়াল হয়! ভালোবাসার যুক্তিতে এ-সব কঠিন ভাবে মিথ্যা। দু’টো রুহ, ঠিক মিলে যায়। স্পর্শ দরকার পরে না।
ওপাশ থেকে তিতিরের কান্নার বেগ আরেকটু বাড়তেই, ঈশান সহ্য করতে পারলো না আর। মিহি সুরে আকুল গলায় ডেকে উঠলো,

—’ তিতির ? ‘
—’… ‘
—’ বউ? ‘
—’…’
—’ মাই লাভ?’
—’…’
—’ মিসেস ঈশান আরশাদ দেওয়ান? ‘
—’…’
—’ জান? ‘

একের পর আদুরে ডাকেও উত্তর করছে না তিতির। উল্টো ভাড়ি হচ্ছে কান্না। ঈশান ব্যাথাতুর হাসলো। অমিত আড়চোখে দেখছে সে-সব। আর বাকরুদ্ধ হয়ে আছে। ঈশান আরশাদ দেওয়ান যে এতো নরম গলায় কাউকে ডাকতে পারে,তা জানা ছিলো না তার। আজকে প্রথম এরকম শুনছে। খানিকটা সময় নিয়ে আরেকদফা মেয়েটাকে ডাক ছুড়লো,
—’ আর কি বলে ডাকা যায় বলতো? আমি তো এ-সব নিকনেম দেওয়ার ক্ষেত্রে বড্ড কাঁচা। শব্দভান্ডার ফুড়িয়ে এলো তো। অত্যাচারি নারী বলে ডাকবো? ‘
এতক্ষণে মুখের বুলি ফুটলো তিতিরের। হেঁচকি তুলতে তুলতে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
—’ চুপ, একদম চুপ। ‘
—’ একদম চুপ করে যাবো? ‘
তিতির ফুঁপিয়ে উঠলো। জড়িয়ে আসা কন্ঠে ব্যাকুল হয়ে বলে উঠলো,

—’ আমি আপনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে চাই, ঈশান আরশাদ দেওয়ান। বুকটা কি পরিমাণ বিদ্রোহ করছে, যদি জানতেন। এসে নিজের মাথাটা এই বুকে ছুঁয়িয়ে একটু শান্ত করে যেতে চাইতেন। এতোটা ছটফট করে, উ’ন্মাদ হয়ে আপনাকে জড়িয়ে ধরার ইচ্ছে এর আগে কখনো হয়নি। আমি আপনাকে কাছে চাই। খুব কাছে। মিশিয়ে নিতে চাই নিজের সাথে। না হলে ম’রে যাবো। আপনার স্পর্শ… ‘
তিতির শব্দ করে কেঁদে ওঠে। ঈশান একহাতে ফোনটা কানে চেপে, আলগোছে অন্য হাতটা ছোঁয়ালো নিজের বুকের ওপর। কি আশ্চর্য! তিতিরের একেকটা আকুল আবেদন একদম তীরের ফলার মতো হৃদপিন্ডে গিয়ে লাগছে। শরীরের রক্ত ফুটতে শুরু করেছে টগবগ করে। ফুল পাওয়ারের এসিতেও ঘাম ছেড়ে দিয়েছে শরীর। ঈশানের শ্বাস প্রশ্বাস জুড়িয়ে আসে। ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে।

—’ ঈশান ভাই?’
—’ হুমমম।’
—’ ভালোবাসি তো। প্রচন্ড ভালোবাসি। তাহলে কিসের শাস্তি দিতে এই দুরত্ব? কি ভুল করেছি আমি? এতগুলো দিন আপনাকে ছুঁতে পারছি না, আপনাকে দেখতে পারছি না। এতো এতো বিপদেও মুখ ডুবানোর জন্য আপনার বুকটা পাচ্ছি না। ওই শরীররের ঘ্রান টানতে পারছি না। যে ভুলই করি না কেনো, এইটুকু শাস্তি কি যথেষ্ট নয়? আর তো পারছি না। ‘
ঈশান বুজে নেয় সিক্ত চোখজোড়া। কতদিন পর কথা হচ্ছে। কত কথাই তো বলার ছিলো। কিন্তু সে-সব ভুলে শুধু নিশ্চুপ, মনোযোগী শ্রোতা হয়ে শুনে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে, তার বোকা বউটার ব্যাকুল কন্ঠস্বর। কি এক যন্ত্রনা! এতদিন ধরে মরুভূমির মতো পানিশূন্য হৃদয়টা আচমকাই ভিজিয়ে দিলো একপশলা প্রেম বৃষ্টি। এপাশ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে উতলা হলো মেয়েটা।

—’ কি করেছি আমি, সেটা তো বলবেন নাকি? ‘
তমা স্পেস দিয়েছে দু’জন কে। নিজে এসে দাঁড়িয়েছে বেলকনিতে। গোটা দিন পর, এ বেলা সাহস করে কল করেছে ঈশানকে। ঈশান হালকা গলায় বললো,
—’ এই মূহুর্তে একটা অদৃশ্য চু মু আঁকতে চাই। কোথাও দেবো চু মুটা? কপালে? গালে নাকি ঠোঁটে? হুম? ‘
কান্না ক্ষনিকের জন্য বন্ধ হয় মেয়েটার। পর মূহুর্তেই আহ্লাদী গলায় অভিযোগ জানিয়ে ওঠে,
—’ অ সভ্য আপনি। ফালতু একটা লোক। আমি কতটা অস্থির হয়ে আছি। জানেন? কোথায় আপনি। এ-সব কি হচ্ছে? ‘
—’ আগে আমি যেটা বললাম সেটার পারমিশন দে। চু’মুটা কোথায় দেবো? ‘
—’ এটা আহ্লাদ করার সময়?’
—’ ঠোঁটে? ‘
—’ আপনি…’
—’ নাকি বু’কে? ‘
—’ ফালতু।’
—’ অন্য কোথাও চাস? আমি কিন্তু… ‘
চেঁচিয়ে উঠলো তিতির। ঈশানের লাগামছাড়া কথাগুলো থামাতে বললো। ঈশান শব্দ করে হেসে ফেললো এ যাত্রায়। ইশশ্ কি যে প্রশান্তি। এমন শান্তি আর কোথায় গিয়ে মেলে তার। তবে সিরিয়াস হলো এবারে। স্বাভাবিক করলো কন্ঠস্বর।

—’ আমি ঠিক আছি, তিতির। শারীরিক ভাবে। কিন্তু ঝামেলায় আছি এটা নিশ্চয় তোকে আলাদা করে বোঝাতে হবে না,তাইনা? আমার অনুপস্থিতিতে কি হচ্ছে, সে-সব তো ফেস করছিসই। অ্যাম সরি, মাই লাভ। আমার জন্য এতসব হচ্ছে। তোকে এতটা হার্ট হতে হচ্ছে। আমি আমার কথা রাখতে পারিনি। আগলাতে পারিনি তোকে।’
শরীর শিথিল হয়ে এলো মেয়েটার। এলোমেলো বিছানায় গা এলিয়ে দিলো । চোখের কার্নিশ গড়িয়ে পরলো নোনাজল। ঈশান ক্ষমা চাইছে। অথচ ঈশানের এই কথাগুলোয় তিতিরের মনে পরে গেলো নূরির কথাগুলো। তাকে আগালতে গিয়ে ঈশান এতসব ফেস করছে। ইয়াজ মির্জা আদতে তাকে চাই। সেই জের থেকে ঈশানকে ঝামেলায় ফেলছে। ক্ষমা তো তার চাওয়া উচিত।

—’ আর কতদিন এ-সব? ‘
—’ এক-দু’দিন।’
—’ তারপর?’
—’ তুই কি চাস?’
—’ আপনাকে।’
—’ আর?’
—’ শুধু আপনাকে। আর কিচ্ছু না। ‘
ঈশান মৃদু হাসলো। ঠান্ডা গলায় বললো,
—’ ঢাকা আসতে চেয়েছিলি আমার খোঁজে? আসবি না কেমন? তোর বা বাড়ির কারোর এখন বাহিরে বের হওয়া ভীষন রিস্কি। আমাকে কাবু করতে তোদের গায়ে একটা আঁচড় দেওয়াই যথেষ্ট। আমাকে দূর্বল হওয়ার সুযোগ ওদের দেওয়া যাবে না। বাড়িতে অপেক্ষা কর। আমি সব সামলে জলদিই ফিরবো। ‘

—’ আপনি কে বলুন তো? সবার এতো কিসের শত্রুতা আপনার সাথে? কেনো এতসব হচ্ছে? ‘
থমকায় ঈশান। কে! সেটার জবাব কিভাবে দেবে। তিতির কি এতদিন মিথ্যা বলে আসার জন্য ভুল বুঝবে তাকে?
—’ তোর হাসবেন্ড। ‘
তিতির দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ঈশান ফোনের এপাশ থেকে এতোকিছু কি করে বলবে সে! সন্ধ্যা হয়ে আসছে। তাদের গন্তব্যও প্রায় এসে গিয়েছে। আর মিনিট পাচেকের রাস্তা। এত সময় কোথায়। অমিত অলরেডি গাড়ির গতি স্লো করে ফেলেছে। মোড় ঘুরছে আঁকাবাকা রাস্তার। ঈশান বাঁ কানে ফোনটা গুঁজে শান্ত গলায় বললো
—’ ফিরে বলি? ‘
—’ এই দু’দিনের বেশি আর এক সেকেন্ডও সময় দেবো না আমি আপনাকে।’
—’ বেশ। এবার রাখি? ‘
—’ একটা বার ভালোবাসি বলুন। ‘
—’ তাতে আমার লাভ কি?’
—’ অনেক কিছু। ‘
—’ যেমন? ‘
—’ অনন্তকালের জন্য আমি আপনার। ‘
—’ বলতেই হবে? ‘
—’ হুম। ‘

হাসলো ঈশান। একনজর অমিতের দিকে তাকিয়ে মুখের সমানে হাতটা নিয়ে গলার স্বর একদম খাদে নামিয়ে বলতে গেলো,
—’ ভালোবা…’
ঈশানের কথাটা শেষ হয় না। বেচারা শেষ করতে পারে না কথাটা। তার আগেই বিকট একটা শব্দে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারালো। দূর থেকে তীক্ষ্ণ একটা আওয়াজ হলো। একবার, দুবার! পরপর তাদের গাড়ির দু’দুটো চাকায় গুলি করা হলো বোধহয়।
—’ স্যাআর? ‘
—’ গাড়ি ঘোরাও অমিইত…’

ততক্ষণে দেরি হয়ে গিয়েছে অনেকটা। গাড়ির সামনের কাচ ভেঙেচুরে গুড়িয়ে গিয়েছে একপ্রকার। তিতিরের কানে স্পষ্ট এলো এসব কথাগুলো। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে মেয়েটা। চিৎকার করে ডেকে উঠলো ঈশানের নাম ধরে। তবে আর সাড়াশব্দ এলো না। লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে ততক্ষণে। দু’টো চাকার বেগতিক অবস্থার পরেও, বাঁয়ে ঘুরিয়ে ফেলেছে গাড়িটা। শো শো শব্দ করে তীক্ষ্ণ গিয়ারের শব্দ তুলে গাড়িটা ঘুরলো ঠিকই,ভিতরের ছেলে দুটো নিয়ন্ত্রণ হারালো নিজেদের। ঈশানের হাতের ফোন ছিটকে পরে গেছে ততক্ষণে। নিজে শক্ত হয়ে বসলেও, লম্বা মতো একটা কাচের টুকরো ছুঁয়ে গিয়েছে কপালের বাঁ পাশটা। অন্যটা এসে গেঁথে গিয়েছে ডানহাতের বাহুতে। অমিতের অবস্থাও তাই। গাড়ির থামতেই চিৎকার করে আদেশ ছুড়লো ঈশান। মাথা ঝুকিয়ে ফেললো অমিত। ঈশানের হাতের রিভলবারটি ততক্ষণে নিজের কাজ শুরু করে দিয়েছে। ভাঙা কাঁচের ফাঁক গলিয়ে চার চারটে গুলি ছোড়া হয়ে গিয়েছে ঈশানের। অমিত অগুনিত কাচ বেঁধা শরীরটা এক ঝটকায় সচল করতে চাইলো। নিজের পিস্তল খানা তাক করলো, যেদিক থেকে আক্রমণ আসছিলো। তবে পাওয়া গেলো না আর কাউকে। চোখে অন্ধকার দেখছে ঈশান। গলাটা শুকিয়ে আসছে। বুকের কাছটা ভেজা ভেজা লাগতেই গর্দান ঝুকিয়ে তাকালো নিজের বুকের বাঁ পাশটা। হৃদপিন্ডের খানিকটা ওপর দিয়ে, একদম কিনারা ঘেষে। পেশল শরীর ভেদ করতে পারেনি বোধহয়। খেদোক্তি বেড়িয়ে এলো ঈশানের মুখ দিয়ে।

—’ধ্যাত! ‘
অমিত সতর্ক দৃষ্টি ঈশানের তাক করতেই আঁতকে উঠলো। ঈশানের শার্টের বাঁ পাশটা ভিজে উঠেছে রক্তে। গাড়িটা নড়াচড়া করারও আর উপায় নেই। আর্তনাদ করে উঠলো ছেলেটা।
—’ স্যার, গুলি… ‘
—’ নামো গাড়ি থেকে। দেখো আর ক’টা আছে। আমি দু’টোকে স্যুট করেছি। আমি সম্ভবত জ্ঞান হারাবো…’
জড়িয়ে আসা গলায় কথাগুলো কোনোমতে বললো ছেলেটা। অমিতের এলোমেলো লাগলো নিজেকে। তবে সময় নষ্ট করলো না। ঈশানকে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করলো বিভিন্ন ভাবে। তবে সত্যিই জ্ঞান হারিয়েছে ছেলেটা।

তিতিরের চিৎকারে তমা হন্তদন্ত হয়ে এসে দাড়িয়েছে বোনের পাশে। তিতির ছটফট করে উঠলো। রক্তিম হয়ে উঠেছে আখিজোড়া। ফুঁপিয়ে উঠে কোনোমতে বললো,
—’ গুলির শব্দ! কাচ ভাঙার শব্দ। তারপর গাড়িটা কনট্রোল হারিয়েছে। এতটুকুই শুনেছি। তারপর…’
আঁতকে উঠলো তমা। তিতির দিশেহারার মতো পায়চারি করে উঠলো। মেয়েদের চিৎকার কানে গিয়েছে রাহেলা, নিশি দু’জনেরই। রাহেলা সন্ধ্যার নাস্তা নিয়ে আসছিলো তিতিরের ঘরে। আর নিশির কামড়াখানা ঈশানের ঘরের পাশেই হওয়ায়, এহেন চিৎকার কর্ণগোচর হয়েছে তারও। শাশুড়ী কে ঢুকতে দেখেই, একপ্রকার ঝাঁপিয়ে পরলো তিতির। কান্নার তোড়ে বলতে পারলো না কোনোকিছুই। তমা যতটুকু বুঝতে পেরেছে, ততটুকুই কোনোমতে বলে গেলো সংক্ষেপে। এতদিন যাবৎ নিজেকে শক্ত করে রাখা রাহেলা, আজকে সম্ভবত ভেঙে পরলেন চোখের পলকে। তার বুকের ওপর পরে থাকা ক্রন্দনরত মেয়েটাকে আগলে, কোনোমতে বললেন,

—’ কিচ্ছু হয়নি, মা। কাদিঁস না। দ্বারা দেখছি… ‘
কে কাকে শান্তনা দেবে আজকে! লাগাতার কল করেও আর নাগাল পাওয়া গেলো না ঈশানের। তিতির আর্তনাদ করে উঠলো এ যাত্রায়৷ দু’হাতে শাশুড়ী কে আঁকড়ে ধরে ব্যাকুল গলায় বললো,
—’ আমি যাবো তোমার ছেলের কাছে। গুলি, এক্সিডেন্ট… মামনী? নিয়ে চলো। ‘
তিতির কে আর কোনো কিছুর পরিপ্রেক্ষিতেই বুঝিয়ে ওঠা গেলো না কোনোকিছু। হাঁটু ভেঙে মেঝেতে বসে পরলো মেয়েটা। শাশুড়ীর পা দুখানা জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। তমা, নিশি দুজনেইও বসে পরলো বোনের পাশে। ব্যাকুল হয়ে থামতে চেষ্টা করলো মেয়েটাকে।
তিতিরের ফোনটা শব্দ করে বেজে উঠলো আচমকা। মেয়েটা বিছানার ওপর থেকে হুমড়ি খেয়ে ফোনটা কানে তুললো। দ্রুত গলায় শুধিয়ে বসলো,
—’ ঈশান ভাই? ‘
ওপাশ থেকে শুনতে পাওয়া গেলো বড্ড সিরিয়াস কন্ঠস্বর। সে-ও একপ্রকার চিন্তিত গলাতেই বলল,
—’ ঈশান আরশাদ দেওয়ানের পরিবার থেকে বলছেন? ‘
—’ জি জি, আমি তিতির। ওনার..ওনার ওয়াইফ।’
—’ নারায়নগঞ্জ সিটি হসপিটালে চলে আসুন। আপনার হাসবেন্ড এক্সিডেন্ট করেছে, গুলি লেগেছে ওনার। হসপিটালেে শিফট করা হচ্ছে। ‘

ফোন কেটেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো মেয়েটা। নিশি ছুটলো নয়নের খোঁজ করতে। সে বাড়ি নেই। বাবা চাচারা সবাই ঢাকা গিয়েছে। অফিসের দিকটা সামলাতে হচ্ছে তাকেই। ওদিকে নাঈম, নিয়াজকেও ফোনে পাওয়া গেলো না এই মূহুর্তে। তিতির আর এক সেকেন্ড অপেক্ষা করতে নারাজ। বলাবাহুল্য রাহেলার অবস্থাও। তাই। তবে ভরা সন্ধ্যা বেলা একজন পুরুষ মানুষকেও পাওয়া যাচ্ছে না এটা কিভাবে হয়। বাড়ির গাড়ি নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর উপায় কি। এক ড্রাইভার বাদে আর কাউকে পাওয়া গেলো না এই মূহুর্তে।
দিনের আলো নিভে গিয়েছে। তিতিররা বাড়ি ছেড়ে রওনা হয়েছে প্রায় দুই ঘন্টা হলো। ঘড়ির কাটায় সময় এখন রাত নয়টা বেজে তেরো মিনিট। তিতির নিশির বুকের ওপর পরে আছে। নিশি ক্রমাগত হাত বুলিয়ে যাচ্ছে মেয়েটাট মাথায়। তমা, রাহেলা পাশেই আছে। আর সঙ্গে এসেছে তমার বাবা। রাহেলা নিশ্চিন্ত হয়েছে একপ্রকার। এতো দূরের পথ, একজন ছেলেমানুষ সঙ্গে না থাকলে কি করে বের হতো তারা! ব্যাস্ত সড়ক পার হয়ে গাড়ি হবিগঞ্জের শুনশান রাস্তা পার হচ্ছে। তমার বাবা তরুন দেওয়ানের নির্দেশে এই মূহুর্তে বেশ দ্রুত গতিতেই চলছে গাড়িখানা।

এইটুকু জায়গা যত জলদি পার হওয়া যায় তাত ভালো। ঈদের আগমুহূর্ত। বেশ ব্যাস্ত পথঘাট। তারপরও এদিকটা বেশ জনমানবহীন। গোটা গাড়ির ভিতরের নিশ্চুপ সবাই। ক্ষনে ক্ষনে তিতিরের কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে শুধু। আর মিনিট দশেক এরকম পথ সম্ভবত। তারপরেই আবার ভিরভাট্টার মধ্যে পরবে। ড্রাইভারের সাথে টুকটাক আলেচনা হচ্ছে তরুণ সাহেবের। কোথায় কতটুকু জ্যাম বা কি হতে পারে এসব নিয়েই। আচমকা অন্ধকার পথের মাঝ বরাবর আলোর রেখা পরতেই হন্তদন্ত হয়ে গাড়িখানা থামাতে হলো। পথের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে এক আগন্তুক। ড্রাইভার ততক্ষণাত ব্রেক কষতে না পারলে, হয়তো একটা বড়সড় এক্সিডেন্ট ঘটিয়ে ফেলতো। খোদার কাছে শুকরিয়া আদায় করলো, সেটা না হওয়ায়। তরুন সাহেব ড্রাইভারকে কষিয়ে একটা ধমক বসাবে, তার আগেই ঘটে গেলো যা ঘটার। কোথা থেকে হুড়মুড়িয়ে বের হয়ে আসলো কিছু লোকজন। ঘিরে ধরলো পুরো গাড়িটা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শক্ত কিছু দিয়ে ভেঙেও ফেললো পিছনের গাড়ির কাঁচ। ওদিক থেকে ভিরের মধ্যে শুধু একটা অতি গম্ভীর কন্ঠস্বরের মালিক ছোট্ট করে আদেশ ছুড়লো,
—’ তিতিরপাখি টাকে বের করে নিয়ে এসো।’

ঈশান চোখ খুলতেই নাকে এসে বারি খেলো স্যাভলনের কড়া ঘ্রান। ঝাপসা দৃষ্টি খানিকটা স্পষ্ট হতেই তার ওপরে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো কয়েকটা পরিচিত মুখ। দূর্বল শরীরে একা উঠে বসতে চাইলো। সাহায্য করলো অমিত। পাশে তার আরও কয়েকজন লোক। বাঁ পাশের শার্টটা ছিড়ে ফেলা হয়েছে। সেখানে আষ্ঠেপৃষ্ঠে রয়েছে সফেদ ব্যান্ডেজ। অমিত হাফ ছাড়লো যেনো। ঈশানের কপাল দপদপ করছে। শিরা ফুলে উঠেছে ব্যাথায়। ডান হাতটা ব্যান্ডেজের ওপর ছুয়িয়ে বললো,
—’ শা’লা, অল্পের জন্য হৃদপিন্ড ফুটো করে ফেলেনি। এখানে আমার বউ থাকে! ‘
এমন সিচুয়েশনে ঈশানের এমন হেয়ালি কথাটায় হাসিই পেলো অমিতের। ঈশানের বাহু ধরে আরেকটু সোজা হয়ে বসতে সাহায্য করতে করতে বললো,
—’ ভাগ্যিস! বেঁচে গেছেন, স্যার। ‘
ব্যাথায় চোখমুখ খিঁচে এলো ছেলেটার। বিরক্তির ছাপ চোখেমুখে স্পষ্ট। আশেপাশে তাকিয়ে খেয়াল করলো জায়গাটা। গম্ভীর গলায় বললো,

—’ কোথায় এটা? ‘
—’ এখানকার এক ভাঙাচোরা বাড়ি। পরিত্যক্ত। ‘
ঈশান অমিতের হাত সরিয়ে দিয়ে ব্যাথাতুর মুখ নিয়ে তক্তপোশ থেকে নেমে দাঁড়ালো। শরীর টান টান করে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। কাজের শুরুতেই এরকম ব্যাঘাত। অসহ্য ঠেকছে তার। তারই আদতে ভুল। ওইরকম কাছাকাছি পৌছে, বউয়ের সাথে আদর সোহাগ করার চক্করে মনোযোগই হারিয়ে ফেলেছিলো এদিকটার। বেশ রাত হয়ে এসেছে। পরিকল্পনায় জল ঠেলে দিয়েছে পুরো। এখন সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে নাকি কাজল কে উদ্ধারে আবার ছুটবে বুঝে এলো না তার। হিসেব মতে ইয়াজ মির্জা সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। সেই হিসেবে বিপদ টা তিতিরেরই বেশি হবে। সাজিদকে ফোন দিতে তার ফোনটা অমিতের হাত থেকে নিয়ে চালু করতেই, টুংটাং বেশ কয়েকটা মেসেজ এসে ভরে গেলো ফোনটা। ভ্রু কুঁচকে মেসেজটা চেক করতেই হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠলো তার। থরথর করে কাঁপলো হাতটা। এতক্ষণে দুর্বল লাগলো শরীর। ভারি শরীরটা তক্তপোশের ওপর ধীরেসুস্থে বসতে বসতে ছবিটাতে ক্লিক করলো বেচারা। ঝকঝলে তকতকে একট বেডরুম। সফেদ চাদরের ওপর নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে তিতির। তবে বেডরুমটা ঈশানের নয়। শরীর শক্ত হয়ে এলো তার। ভেজা অনূভব করলো ব্যান্ডেজের ওপর। ছবির নিচে গিয়ে চোখে পরলো কয়েক লাইনের খাঁটি বাংলায় লেখা একটা মেসেজ। সেখানে লেখা,

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৫ (২)

—’ তোর বউ এখন আমার বিছানায় কাতরাচ্ছে। পাখি, ঠিক সময়, খাঁচা ছাড়া হয়ে গেলো। এখন গোটা টা সময়, আমার তিতির পাখিটাকে কোথায় রাখি বল তো? আমার বুকে, নাকি বিছানায়? তুই কোনটা সাজেস্ট করিস? টানা, এতো লো ড নিতে পারবে ও আমার? ‘

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৬ (২)