Home কাজলরেখা কাজলরেখা পর্ব ৬২

কাজলরেখা পর্ব ৬২

কাজলরেখা পর্ব ৬২
তানজিনা ইসলাম

আকাশের অবস্হা ভালো না। বিজলি চমকাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে অবিরত। ঘড়ির কাটায় রাত একটা। আঁধার সেই রাত আটটার মধ্যে আসবে বলেছিলো। ৩ ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও ওর দেখা নেই। চাঁদনী চিন্তায় অস্হির।ও কোনোভাবেই কনট্যাক্ট করতে পারছে না আঁধারের সাথে। আঁধার কলও ধরছে না। চাঁদনীর মন কু ডাকছে। বারবার ওর মনে হচ্ছে আঁধারের কিছু হয়েছে।
আকিব শিকদার আর ওর খাওয়া হয়নি। আকিব শিকদার অনেক্ক্ষণ ধরে বলছেন ওঁকে খেয়ে নিতে। চাঁদনী খাচ্ছে না। ওর গলা দিয়ে খাবার নামবে। আঁধারের জন্যই না এতো কষ্ট করে বিরিয়ানি রাধলো ও, হাত পুড়িয়ে। এখনো হাত জ্বলছে। সে বিরিয়ানি ও আঁধারকে ছাড়া কী করে খেয়ে নেবে। এ বৃষ্টির মাঝেও আকিব শিকদার আঁধারের ফ্ল্যাটের সামনে থেকে ঘুরে এলেন। আঁধার ফেরেনি।

চাঁদনী কাঁপছে। বিরতিহীন ও কল দিয়ে যাচ্ছে আঁধারকে। ওর মনে হচ্ছে আঁধার ভালো নেই। কিছু একটা হয়েছে ওর। ভেজা চোখে ঘড়ির দিকে তাকালো ও।
তৎক্ষনাৎ কল এলো ওর মোবাইলে, চাঁদনী তড়িঘড়ি করে ফোন হাতে নিলো। আঁধারের নাম্বার দেখে তাড়াহুড়ো করে রিসিভ করলো। রিসিভ করার পর কান্নার চোটে চাদনীর মুখ দিয়ে কথা এলো না।।অকস্মাৎই জোরে কেঁদে দিলো ও। হিচকি তুলে কেঁদে বললো
-“হ্যালো। আঁধার ভাই, এই কই তুমি? এতো রাতে কোথায়? কোথায় এখন? আসছো না কেন? আমার চিন্তা হচ্ছে তো। ফোনটা তো ধরা যায় অন্তত। এত্তো বাজে একটা মানুষ তুমি।”
চাদনী একনাগাড়ে কথাগুলো বলছিলো, কিন্তু ওপাশ থেকে একটা অচেনা কণ্ঠ ভেসে এলো,

-“হ্যালো শুনতে পাচ্ছেন।
-“আপনি কে?”
-“আমি একজন পথচারী। এটা যার নাম্বার সে একটু আগেই হাইওয়েতে বাইক এক্সিডেন্ট করেছে। আমরা তাকে হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি। আপনারা দ্রুত এখানে আসুন। পরিস্থিতি ভালো না।”
চাঁদনী ওর কানকে বিশ্বাস করতে পারলো না। অবাস্তব ঠেকলো সবকিছু ওর কাছে। হাত থেকে ফোনটা পরে গেলো। আকিব শিকদার ওর অবস্থা দেখে ওর কাছে এলেন। কাঁধে হাত রেখে বললেন
-“কী হয়েছে আম্মা?
চাঁদনী দ্রুত আকিব শিকদারকে জড়িয়ে ধরলো। বুকে ঝাঁপিয়ে পরে কাঁদতে কাঁদতে বললো
-“বাবা, আঁধার ভাই বাবা।
-“কি হয়েছে চাঁদ! আমাকে বল। কাঁদছিস কেনো? আঁধার কোথায়? কি হয়েছে আঁধারের?”
-“এক্সিডেন্ট হয়েছে। আমাকে নিয়ে চলো। প্লিজ নিয়ে চলো। আমি বলছিলাম না, আঁধার ভাইয়ের কিছু হয়েছে। আঁধার ভাই কখনো আমার কল ইগনোর করে না। কখনো লেইট করে না। সে আমাকে কথা দিলে, রাখে।

-“কী?কোন হসপিটালে আছে ও?
চাঁদনী অবুঝ দৃষ্টিতে তাকালো। ও জিজ্ঞেসই করতে পারেনি, ওঁকে কোন হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এক্সিডেন্টের কথা শোনার পর, আর একটা শব্দও ওর কানে ঢোকেনি।
আকিব শিকদার একই নম্বরে আবারো কল করলেন। সুইচড অফ শোনালো।
-“কল ধরছে না কেন? এক্ষুনি না কল করলো। এখন ধরছে না কেন? চলো বাবা আমরা বেরিয়ে পরি।”
আকিব শিকদার চাঁদনীকে ধরলেন। এই মেয়ে এখন হসপিটালের নাম না জেনেই রওনা দেবেন।
কয়েকবার কল করার পর কল রিসিভ হলো।আকিব শিকদার হসপিটালের নাম জেনে নিলেন।

হসপিটালের আলো ম্লান। একটা প্রাইভেট ক্লিনিকে আনা হয়েছে আঁধারকে। এক্সিডেন্ট কেইস তাই, আকিব শিকদার আর চাদনী আসার আগেই পুলিশ এসে উপস্থিত হয়েছে। রাস্তায় থাকার সময়ও আকিব শিকদারকে, পুলিশ বেশ কয়েকবার কল করেছে। ফ্যামিলির কারো স্ট্যাটমেন্ট দরকার। আঁধারকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওর বাঁচার চান্স একেবারে নেই বললেই চলে। ট্রাকের সাথে ওর বাইকের সংঘর্ষ হয়েছে।
আকিব শিকদার আর চাদনী এসে আমান আর মাহাদীর দেখা পেলো।দু’জন ওরা আসার আগে এসেই উপস্থিত হয়েছে। চাদনী পুরো রাস্তা কাঁদতে কাঁদতে এসেছে। এখনো সমানে হিচকি তুলে কাঁদছে।
আকিব শিকদার পুলিশের সাথে কথা বলতে গেলেন। চাদনী সারিবদ্ধ চেয়ারের একটিতে বসলো। মুখ হাত দিয়ে ঢেকে বসে থাকলো কতোক্ষণব্যাপী। হুট করেই কি থেকে কী হয়ে গেলো? সন্ধ্যা পর্যন্তও আঁধার একেবারে সুস্থ ছিলো। পাঁচ-ছয় ঘন্টা আগে কথা বলা মানুষটা এখন জীবন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। কী কী কথা বলেছে চাঁদনী। যা মুখে এসেছে তাই বলেছে। আঁধার কতো করে বলেছে ফিরে যেতে। ইশ! যদি চাদনী রাগ করে না আসতো। যদি চাদনী থেকে যেতো। আঁধার বারবার নিজের করা ভুলের মাফ চেয়েছে। চাঁদনী মাফ করেনি এমন না। তবুও নিজের জেদের জন্য চলে এসেছিলো। আজ ওর জেদের জন্য আঁধার কে এতোটা সাফার করতে হচ্ছে। চাঁদনীর এসব ভেবে আরো বেশি কান্না পেলো। আমান আর মাহাদী অদূরে দাঁড়িয়ে ছিলো। আমান এগিয়ে এলো চাঁদনীর কাছে। চাদনী উঠে দাঁড়ালো ওঁকে দেখে। চোখ মুছে বললো

-“ভাইয়া,
-“শান্ত হও চাঁদনী।কেঁদো না এভাবে।
-“আঁধার ভাই বাঁচবে তো?”
-“এই, পাগল মেয়ে! এসব কি বলছো? বাঁচবে না মানে? ওই ছত্রাকের কই মাছের প্রাণ। ওই নাটকবাজ এতো ইজিলি টপকাবে না। শুধু শুধু চোখের জল খরচ করছো। আরে, সুস্থ হয়ে যাবে ও। হাড়বজ্জাত টা মানুষকে জ্বালিয়ে না মারলে শান্তি পায় না। আমাদের জ্বালানোর জন্যই এমন করেছে।”
আমান জোরপূ্র্বক হাসার চেষ্টা করলো। কিন্তু ও জোর করেও হাসিটা আনতে পারলো না। ওর নিজের মুখও লাল হয়ে আছে। ছেলে বলেই বোধহয় কাঁদতে পারছে না। হাসি খুশি, সুস্থ সবল একটা ছেলের জন্মদিনে কেক কাটার জন্য অপেক্ষা করছিলো ওরা।অথচ চোখের পলকে কি হয়ে গেলো। খুশির বদলে একরাশ দুঃখ পেলো ওরা। আঁধারের যাওয়ার বদলে, খবর গেলো আঁধারের বাইক এক্সিডেন্ট হয়েছে। অবস্থা ভালো না।

ডক্টর এখনো অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়নি। আকিব শিকদার প্রথমে অপূর্ব শিকদার কে খবর দিতে চাননি। কিন্তু পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেছে। আঁধারের অবস্থা ভালো না। একটু আগেই একজন নার্স এসে বন্ড সাইন নিয়ে গেছেন। আকিব শিকদার সাইন করেছেন আঁধারের বাবা হিসেবে। বিগত ৩ ঘন্টা ধরে, অটির ভেতরে ও। ডক্টররা কোনো সন্তোষজনক বার্তা দিচ্ছেন না। নার্সরা মেডিসিন নিয়ে যাওয়ার সময় কিছু জিজ্ঞেস করলেও বলছেন না। চাঁদনী আকিব শিকদারের কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে। কাঁদতে কাঁদতে গলা বসে গেছে ওর। ক্লান্ত লাগছে নিজেকে। আকিব শিকদার ফোন পাজামার পকেটে রাখলেন। অপূর্ব শিকদারকে এই মাত্র আঁধারের খবর জানিয়েছেন তিনি। চাঁদনী ক্লান্ত গলায় বললো

-“বাবা, ডক্টর কখন বেরোবেন?”
-“জানি না আম্মা।
-“আঁধার ভাই বাঁচবে তো? ফিরবে তো আমার কাছে?”
-“তুমি কেনো ফিরলে না?”
চাদনী মুখে হাত দিলো। কান্না আটকানোে চেষ্টা করে বললো
-“ভুল হয়ে গেছে। আর কক্ষনো এ ভুল করবো না আমি।
-“আঁধার অপেক্ষা করছিলো তোমার জন্য। কেনো গেলে না?”
-“তুমি জানো তো সব। আবার কেনো জিজ্ঞেস করছো?
-“মনটাকে মানাতে পারছি না যে চাঁদ। সুস্থ ছেলেটার এমন অবস্থা মেনে নেওয়া যাচ্ছি না। বড় ভাইয়াকে বলতে পারছিলাম না ব্যাপারটা কোনোমতে জানো! লজ্জা লাগছিলো। আমিও তো আঁধারের আরেকজন বাবা। অথচ আমি থাকতেও ছেলেটার…

-“আমার অপেক্ষার অবসান ঘটবে বাবা? তুমি বলো। জাস্ট একবার বলো আঁধার ভাই সুস্থ হয়ে যাবে।”
-“সুস্থ হয়ে যাবে চাঁদনী।কাদিস না। বড় ভাই রওনা দিয়েছে।
-“বড় বাবা আসছে?
-“হ্যাঁ, পরবর্তী পরিস্থিতি কি হয় বলায যাচ্ছে না।”
চাদনী মাথা তুলে, আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো
-“বাবা।”
-“তুই ভুল বুঝছিস আমাকে।আঁধার কে যদি এ হসপিটালে না রাখে। দরকার হলে ওঁকে আমাদের দেশের বাইরে নিয়ে যেতে হবে।”
চাঁদনী কিছু বলার আগেই ডাক্তার অটি থেকে বেরোলেন। সবাই দ্রুত গেলো ওনার কাছে। আঁকিব শিকদার দ্রুত বললেন

-“ডক্টর, ও কেমন আছে?”
-“সেটা জ্ঞান ফেরার পর বলা যাবে। আমরা কোনো কথা দিতে পারছি না।”
-“ও বাঁচবে তো ডক্টর?”

কাজলরেখা পর্ব ৬১

-“বলতে পারছি না। আমরা অপারেশন সাকসেস সেটাও বলতে পারছি না। তার ব্রেইন হেমারেজ হচ্ছে। তবে সবকিছু সৃষ্টিকর্তার হাতে। তিনি চাইলে, সে আবারও চোখ মেলতে পারে। ৩ দিনের মধ্যে জ্ঞান ফিরলে তার ফেরার একটু হলেও চান্স থাকবে। অন্যথায়,,
ডক্টর আর কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন।

কাজলরেখা পর্ব ৬২ (২)